
অষ্টম শ্রেণীর ভূগোল
(আমাদের পৃথিবী)
অধ্যায় ভিত্তিক প্রশ্ন ও উত্তর
চতুর্থ অধ্যায়
‘চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহ’
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর:
অতিসংক্ষিপ্ত নৈর্ব্যক্তিক/সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর:
১. প্রশ্ন: বায়ুচাপ মাপা হয় কোন যন্ত্রের সাহায্যে?
উত্তর: ব্যারোমিটার।
২. প্রশ্ন: সমুদ্রপৃষ্ঠে বায়ুর গড় চাপ কত?
উত্তর: ১০১৩.২৫ মিলিবার।
৩. প্রশ্ন: বায়ুর চাপ কোন এককে মাপা হয়?
উত্তর: মিলিবার (mb) এককে।
৪. প্রশ্ন: উচ্চতা বাড়লে বায়ুর চাপ বাড়ে না কমে?
উত্তর: কমে।
৫. প্রশ্ন: প্রতি ১১০ মিটার উচ্চতায় কত মিলিবার বায়ুর চাপ কমে?
উত্তর: ১ মিলিবার।
৬. প্রশ্ন: পৃথিবীতে মোট কয়টি বায়ুচাপ বলয় আছে?
উত্তর: ৭টি।
৭. প্রশ্ন: নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় কত ডিগ্রি অক্ষাংশের মধ্যে অবস্থিত?
উত্তর: ০০ থেকে ৫° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশ।
৮. প্রশ্ন: ‘ডলড্রামস’ (Doldrums) বা শান্তবলয় কোথায় দেখা যায়?
উত্তর: নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ে।
৯. প্রশ্ন: কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় কত ডিগ্রি অক্ষাংশে অবস্থিত?
উত্তর: ২৫০ থেকে ৩৫° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশ।
১০. প্রশ্ন: অশ্ব অক্ষাংশ (Horse Latitude) কোথায় অবস্থিত?
উত্তর: কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয়ে।
১১. বলে? প্রশ্ন: উচ্চচাপ বলয় থেকে নিম্নচাপ বলয়ের দিকে বায়ুর চলাচলকে কী
উত্তর: বায়ুপ্রবাহ।
১২.প্রশ্ন: কোরিওলিস বল (Coriolis Force) প্রথম কে ব্যাখ্যা করেন?
উত্তর: গুস্তাভ দ্য কোরিওলিস।
১৩. প্রশ্ন: ফেরেলের সূত্র অনুযায়ী বায়ু উত্তর গোলার্ধে কোন দিকে বেঁকে যায়?
উত্তর: ডান দিকে।
১৪. প্রশ্ন: ফেরেলের সূত্র অনুযায়ী বায়ু দক্ষিণ গোলার্ধে কোন দিকে বেঁকে যায়?
উত্তর: বাম দিকে।
১৫. প্রশ্ন: নিয়ত বায়ু কয় প্রকার?
উত্তর: ৩ প্রকার (আয়ন বায়ু, পশ্চিমাবায়ু ও মেরুবায়ু)।
১৬. প্রশ্ন: বাণিজ্য বায়ু কাকে বলা হয়?
উত্তর: আয়ন বায়ুকে।
১৭. প্রশ্ন: আইটিসিজেড (ITCZ)-এর পূর্ণরূপ কী?
উত্তর: Inter-Tropical Convergence Zone.
১৮. প্রশ্ন: গর্জনশীল চল্লিশা (Roaring Forties) কত ডিগ্রি অক্ষাংশকে বলা হয়?
উত্তর: ৪০° দক্ষিণ অক্ষাংশ।
১৯. প্রশ্ন: ভয়ংকর পঞ্চাশ (Furious Fifties) কত ডিগ্রি অক্ষাংশকে বলা হয়?
উত্তর: ৫০° দক্ষিণ অক্ষাংশ।
২০. প্রশ্ন: তীক্ষ চিৎকারকারী ষাট (Screeching Sixties) কত ডিগ্রি অক্ষাংশকে বলা হয়?
উত্তর: ৬০° দক্ষিণ অক্ষাংশ।
২১. প্রশ্ন: সমুদ্র বায়ু কখন প্রবাহিত হয়?
উত্তর: দিনের বেলা।
২২. প্রশ্ন: স্থল বায়ু কখন প্রবাহিত হয়?
উত্তর: রাতের বেলা।
২৩. প্রশ্ন: সাময়িক বায়ুর দুটি উদাহরণ দাও।
উত্তর: স্থল বায়ু ও সমুদ্র বায়ু।
২৪. প্রশ্ন: মৌসুমি বায়ু কোন ধরনের বায়ুপ্রবাহ?
উত্তর: সাময়িক বায়ু।
২৫. প্রশ্ন: ‘মৌসুম’ (Mausing) শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: ঋতু।
২৬. প্রশ্ন: অ্যানাবেটিক বায়ু কোথায় দেখা যায়?
উত্তর: পাহাড়ের ঢালে (দিনের বেলা উপরের দিকে ওঠা
২৭. প্রশ্ন: ক্যাটাবেটিক বায়ু কাকে বলে?
উত্তর: রাতের বেলা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে আসা শীতল বায়ু।
২৮. প্রশ্ন: চিনুক (Chinook) বায়ু কোথায় প্রবাহিত হয়?
উত্তর: উত্তর আমেরিকার রকি পার্বত্য অঞ্চলে।
২৯. প্রশ্ন: লু (Loo) কী ধরনের বায়ু?
উত্তর: স্থানীয় বায়ু (উষ্ণ ও শুষ্ক)।
৩০. প্রশ্ন: ভারতের থর মরুভূমি অঞ্চলে কোন স্থানীয় বায়ু দেখা যায়?
উত্তর: আঁধি।
৩১. প্রশ্ন: ফন (Foehn) বায়ু কোথায় দেখা যায়?
উত্তর: আল্পস পার্বত্য অঞ্চলে।
৩২. প্রশ্ন: বায়ুর গতিবেগ মাপার যন্ত্রের নাম কী?
উত্তর: অ্যানিমোমিটার।
৩৩. প্রশ্ন: বায়ুর দিক নির্ণায়ক যন্ত্রের নাম কী?
উত্তর: বাত পতাকা (Wind Vane) |
৩৪. প্রশ্ন: সমচাপ রেখা বা আইসোবার (Isobar) কাকে বলে?
উত্তর: সমান বায়ুচাপযুক্ত স্থানগুলিকে যুক্তকারী রেখা।
৩৫. প্রশ্ন: বায়ুপ্রবাহের প্রধান কারণ কী?
উত্তর: বায়ুচাপের পার্থক্য।
৩৬.প্রশ্ন: উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু ও দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু যেখানে মিলিত হয়
তাকে কী বলে?
উত্তর: আইটিসিজেড (ITCZ)।
৩৭. প্রশ্ন: বায়ুর উচ্চচাপকে কোন ইংরেজি অক্ষর দিয়ে প্রকাশ করা হয়?
উত্তর: H (High Pressure) |
৩৮. প্রশ্ন: বায়ুর নিম্নচাপকে কোন ইংরেজি অক্ষর দিয়ে প্রকাশ করা হয়?
উত্তর: L (Low Pressure)
৩৯. প্রশ্ন: উত্তর গোলার্ধে ঘূর্ণবাত কোন দিকে ঘোরে?
উত্তর: ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে।
৪০. প্রশ্ন: দক্ষিণ গোলার্ধে ঘূর্ণবাত কোন দিকে ঘোরে?
উত্তর: ঘড়ির কাঁটার দিকে।
৪১. প্রশ্ন: প্রতীপ ঘূর্ণবাতে বায়ুর চাপ কেন্দ্রে কেমন থাকে?
উত্তর: উচ্চচাপ।
৪২. প্রশ্ন: হারিকেন (Hurricane) কোথায় দেখা যায়?
উত্তর: ক্যারিবিয়ান সাগরে।
৪৩. প্রশ্ন: টাইফুন (Typhoon) কোথায় দেখা যায়?
উত্তর: দক্ষিণ চীন সাগরে।
প্রশ্ন: উইলি-উইলি (Willy-Willy) কোথায় দেখা যায়? ৪৪. যায়?
উত্তর: অস্ট্রেলিয়ায়।
৪৫. প্রশ্ন: টর্নেডো (Tornado) সবচেয়ে বেশি কোথায় দেখা যায়?
উত্তর: আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে।
৪৬. প্রশ্ন: শান্ত আবহাওয়ার সূচক কোন বায়ুপ্রবাহ?
উত্তর: প্রতীপ ঘূর্ণবাত।
৪৭. প্রশ্ন: নিরক্ষীয় শান্তবলয়ে বায়ু কোন দিকে প্রবাহিত হয়?
উত্তর: বায়ু প্রধানত উর্ধ্বমুখী হয় (অনুভূমিক প্রবাহ থাকে না)।
৪৮. প্রশ্ন: বায়ুচাপের ঢাল (Pressure Gradient) বাড়লে বায়ুর গতিবেগ বাডে না কমে?
উত্তর: বাড়ে।
৪৯. প্রশ্ন: সিরক্কো (Sirocco) বায়ু কোথায় প্রবাহিত হয়?
উত্তর: সাহারা মরুভূমি থেকে ভূমধ্যসাগরের দিকে।
৫০. প্রশ্ন: খামসিন (Khamsin) বায়ু কোন দেশে দেখা যায়?
উত্তর: মিশরে।

রচনামূলক / বর্ণনামূলক প্রশ্ন ও উত্তর:
========================================================================
১. প্রশ্ন: বায়ুর চাপের পার্থক্যের কারণগুলি কী কী?
উত্তর: বায়ুর চাপের পার্থক্যের প্রধান কারণগুলি হলো-
(১) উষ্ণতা: বায়ু উষ্ণ হলে হালকা হয়ে উপরে উঠে যায় এবং চাপ কমে।
(২) জলীয় বাষ্প: জলীয় বাষ্প সাধারণ বায়ুর চেয়ে হালকা, তাই বায়ুতে জলীয় বাষ্প বাড়লে চাপ কমে।
(৩) উচ্চতা: সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যত উপরে ওঠা যায়, বায়ুর ঘনত্ব ও চাপ ততই কমে।
(৪) পৃথিবীর আবর্তন: আবর্তনের ফলে বায়ু বাইরের দিকে ছিটকে যায়, ফলে নিরক্ষীয় অঞ্চলে চাপ কম হয়।
২. প্রশ্ন: নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় বা ‘ডলড্রামস’ কেন সৃষ্টি হয়?
উত্তর: নিরক্ষীয় অঞ্চলে সারাবছর সূর্য লম্বভাবে কিরণ দেয়, ফলে এখানকার বায়ু উষ্ণ ও হালকা হয়ে উপরে উঠে যায়। এছাড়া এখানে জলভাগ বেশি থাকায় বায়ুতে জলীয় বাষ্প বেশি থাকে। এই কারণে এখানে সবসময় নিম্নচাপ বিরাজ করে। নিরক্ষীয় অঞ্চলে বায়ুর কোনো অনুভূমিক প্রবাহ না থাকায় এখানে শান্ত অবস্থা থাকে, যাকে ‘ডলড্রামস’ বা শান্তবলয় বলে।
৩. প্রশ্ন: ‘অশ্ব অক্ষাংশ’ (Horse Latitude) বলতে কী বোঝো?
উত্তর:কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয়ে (২৫০-৩৫০ অক্ষাংশ) বায়ু ওপর থেকে নিচে নেমে আসে বলে এখানে বায়ুর কোনো পার্শ্বপ্রবাহ থাকে না। প্রাচীনকালে এই অঞ্চলে বায়ুর অভাবে পালতোলা জাহাজগুলি থেমে যেত। পানীয় জল ও খাদ্যের অভাব মেটাতে নাবিকরা তখন জাহাজ হালকা করতে জ্যান্ত ঘোড়া সমুদ্রে ফেলে দিতেন। এই কারণে এই অক্ষাংশকে অশ্ব অক্ষাংশ বলা হয়।
৪. প্রশ্ন: কোরিওলিস বল (Coriolis Force) কী?
উত্তর: পৃথিবীর আবর্তনের ফলে ভূপৃষ্ঠের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ু বা সমুদ্রস্রোতের ওপর একপ্রকার শক্তির সৃষ্টি হয় যা তাদের গতিপথকে বাঁকিয়ে দেয়। এই শক্তিকেই কোরিওলিস বল বলে। এই বলের প্রভাবেই বায়ু সরাসরি উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপের দিকে না গিয়ে উত্তর গোলার্ধে ডান দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়।
৫. প্রশ্ন: ফেরেলের সূত্রটি (Ferrel’s Law) ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: কোরিওলিস বলের প্রভাবে বায়ুপ্রবাহের দিক পরিবর্তন সম্পর্কে বিজ্ঞানী ফেরেল একটি সূত্র দেন। সূত্রটি হলো- “ভূপৃষ্ঠের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ুপ্রবাহ উত্তর গোলার্ধে তার গতির দিকের ডান দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে তার গতির দিকের বাম দিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়।”
৬. প্রশ্ন: আয়ন বায়ুকে ‘বাণিজ্য বায়’ বলা হয় কেন?
উত্তর: প্রাচীনকালে পালতোলা জাহাজের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য চলত। আয়ন বায়ু সারাবছর নিয়মিতভাবে ও নির্দিষ্ট পথে প্রবাহিত হয় বলে এই বায়ুর ওপর নির্ভর করে বণিকরা সমুদ্রে জাহাজ চালাতেন। তাই এই বায়ুর গতিপথ বাণিজ্যের অনুকূল হওয়ায় একে বাণিজ্য বায়ু বা ‘Trade Wind’ বলা হয়।
৭. প্রশ্ন: গর্জনশীল চল্লিশা (Roaring Forties) কী?
উত্তর: দক্ষিণ গোলার্ধে জলভাগ বেশি থাকায় এবং স্থলভাগের বাধা না থাকায় ৪০০ থেকে ৬০০ দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে পশ্চিমাবায়ু অত্যন্ত প্রবল বেগে প্রবাহিত হয়। বিশেষ করে ৪০° দক্ষিণ অক্ষাংশে এই বায়ুর গর্জনের মতো আওয়াজ হয় বলে একে ‘গর্জনশীল চল্লিশা’ বলা হয়।
৮. প্রশ্ন: সমুদ্র বায়ু ও স্থল বায়ুর মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: দিনের বেলা সমুদ্রের দিক থেকে স্থলভাগের দিকে প্রবাহিত শীতল বায়ুকে সমুদ্র বায়ু বলে। এটি দুপুরে বা বিকেলে সবথেকে বেশি প্রবল হয়। অন্যদিকে, রাতের বেলা স্থলভাগ থেকে সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত বায়ুকে স্থল বায়ু বলে। এটি ভোরবেলা সবথেকে বেশি শক্তিশালী হয়।
৯. প্রশ্ন: অ্যানাবেটিক ও ক্যাটাবেটিক বায়ুর মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: দিনের বেলা সূর্যের তাপে পাহাড়ের ঢালের বায়ু উত্তপ্ত হয়ে উপরের দিকে উঠে যায়, একে অ্যানাবেটিক বায়ু বলে। আর রাতের বেলা পাহাড়ের উপরিভাগ দ্রুত শীতল হওয়ায় ভারী বায়ু ঢাল বেয়ে নিচের দিকে নেমে আসে, একে ক্যাটাবেটিক বায়ু বলে ।
১০.প্রশ্ন: ঘূর্ণবাত (Cyclone) ও প্রতীপ ঘূর্ণবাতের (Anti-cyclone) মধ্যে ৩টি পার্থক্য লেখো।
উত্তর: (১) ঘূর্ণবাতের কেন্দ্রে নিম্নচাপ থাকে, প্রতীপ ঘূর্ণবাতের কেন্দ্রে উচ্চচাপ থাকে।
(২) ঘূর্ণবাতে আকাশ মেঘলা ও দুর্যোগপূর্ণ থাকে, কিন্তু প্রতীপ ঘূর্ণবাতে আকাশ পরিষ্কার ও শান্ত থাকে।
(৩) ঘূর্ণবাত উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে ঘোরে, প্রতীপ ঘূর্ণবাত ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরে।
১১.প্রশ্ন: ঘূর্ণবাতের চোখের (Eye of the Cyclone) বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: শক্তিশালী ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাতের একদম কেন্দ্রে প্রায় ১০-৩০ কিমি ব্যাসার্ধের একটি শান্ত অঞ্চল থাকে, একে ঘূর্ণবাতের চোখ বলে। এখানে বায়ুর চাপ সবচেয়ে কম থাকে, মেঘ থাকে না এবং বায়ু শান্ত থাকে। তবে এর ঠিক চারপাশেই বায়ুর গতিবেগ ও বৃষ্টিপাত সবচেয়ে বেশি হয়।
১২. প্রশ্ন: চিনুক (Chinook) বায়ুকে ‘তুষার ভক্ষক’ বলা হয় কেন?
উত্তর: উত্তর আমেরিকার রকি পার্বত্য অঞ্চলের পূর্ব ঢাল বেয়ে নেমে আসা একপ্রকার উষ্ণ ও শুষ্ক বায়ু হলো চিনুক। বসন্তকালে এই বায়ু প্রবাহিত হলে শীতের জমে থাকা তুষার দ্রুত গলে যায় এবং ঘাস জেগে ওঠে, যা পশুপালনে সাহায্য করে। বরফ গলিয়ে দেয় বলেই একে ‘তুষার ভক্ষক’ বা ‘Snow Eater’ বলা হয়।
১৩. প্রশ্ন: সমচাপ রেখার (Isobar) তিনটি বৈশিষ্ট্য লেখো।
উত্তর: (১)সমচাপ রেখাগুলি বায়ুচাপকে মিলিবার এককে দেখায়।
(২) দুটি সমচাপ রেখা খুব কাছাকাছি থাকলে বায়ুচাপের ঢাল বেশি হয় এবং বায়ু প্রবল বেগে বয়।
(৩) সমচাপ রেখাগুলি কখনও একে অপরকে স্পর্শ বা ছেদ করে না।
১৪. প্রশ্ন: ভারতের ওপর মৌসুমি বায়ুর প্রভাব আলোচনা করো।
উত্তর: মৌসুমি বায়ু ভারতের জলবায়ুর প্রধান নিয়ন্ত্রক। গ্রীষ্মকালে আর্দ্র দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ভারতে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়, যার ওপর ভারতীয় কৃষিকাজ নির্ভরশীল। আবার শীতকালে শুষ্ক উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ভারতে সাধারণত বৃষ্টিপাত হয় না এবং আবহাওয়া শুষ্ক থাকে।
১৫. প্রশ্ন: উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে পশ্চিমাবায়ুর প্রবাহের দিক কেন আলাদা?
উত্তর: ফেরেলের সূত্র অনুযায়ী বায়ু উত্তর গোলার্ধে ডান দিকে বেঁকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে বেঁকে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত হয়। এই ভিন্ন অভিমুখে বেঁকে যাওয়ার কারণ হলো পৃথিবীর আবর্তন জনিত কোরিওলিস বল।
১৬. প্রশ্ন: বায়ুচাপ বলয়গুলির সৃষ্টির কারণ সংক্ষেপে আলোচনা করো। উত্তর: পৃথিবীতে বায়ুচাপ বলয় সৃষ্টির প্রধান কারণগুলো হলো-
(১) পৃথিবীর গোলকৃতি আকৃতির কারণে সূর্যরশ্মির পতন কোণের পার্থক্য, (২) জল ও স্থলের অসম বন্টন,
(৩) বায়ুর উচ্চতা ও জলীয় বাষ্পের তারতম্য এবং
(৪) পৃথিবীর আবর্তন গতির ফলে সৃষ্ট কোরিওলিস বল। এই কারণগুলোর প্রভাবেই নির্দিষ্ট অক্ষাংশে উচ্চচাপ ও নিম্নচাপ বলয় তৈরি হয়েছে।
১৭. প্রশ্ন: আয়ন বায়ু ও পশ্চিমাবায়ুর মধ্যে পার্থক্য লেখো।
উত্তর: আয়ন বায়ু ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে নিরক্ষীয় নিম্নচাপের দিকে প্রবাহিত হয়, অন্যদিকে পশ্চিমাবায়ু ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে উপমেরু নিম্নচাপের দিকে প্রবাহিত হয়। আয়ন বায়ুর প্রভাবে মহাদেশের পূর্ব ভাগে বৃষ্টি হয়, কিন্তু পশ্চিমাবায়ুর প্রভাবে মহাদেশের পশ্চিম ভাগে বৃষ্টিপাত বেশি হয়।
১৮. প্রশ্ন: মহীভাবক ও গিরিজনি আলোড়নের ফলে বায়ুচাপে কী প্রভাব পড়ে?
উত্তর: এই আলোড়নগুলির ফলে যখন ভূমিরূপের উচ্চতা বাড়ে (যেমন পাহাড়-পর্বত সৃষ্টি), তখন সেই অঞ্চলে বায়ুচাপ কমে যায়। কারণ উচ্চতা বাড়লে বায়ুর স্তর পাতলা হয়ে যায় এবং বায়ুর ঘনত্ব কমে যায়, যা নিম্নচাপ সৃষ্টিতে সাহায্য করে।
১৯. প্রশ্ন: প্রতীপ ঘূর্ণবাতে কেন শান্ত ও পরিষ্কার আবহাওয়া দেখা যায়? উত্তর: প্রতীপ ঘূর্ণবাতের কেন্দ্রে উচ্চচাপ থাকে এবং বায়ু কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে বেরিয়ে যায়। উপর থেকে শীতল ও ভারী বায়ু নিচে নেমে আসে বলে এই বায়ুতে জলীয় বাষ্প কম থাকে। ফলে মেঘ ও বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না এবং আবহাওয়া শান্ত ও রৌদ্রোজ্জ্বল থাকে।
২০. প্রশ্ন: পালতোলা জাহাজের যুগে বাণিজ্য বায়ুর গুরুত্ব কী ছিল?
উত্তর: পালতোলা জাহাজগুলি সম্পূর্ণভাবে বায়ুর গতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। আয়ন বায়ু বা বাণিজ্য বায়ু সারাবছর একটি নির্দিষ্ট দিকে নিয়মিতভাবে প্রবাহিত হয়। এই বায়ুর দিক অনুসরণ করে জাহাজ চালানো সহজ ও নিরাপদ ছিল বলে প্রাচীনকালে বিশ্ব বাণিজ্যে এই বায়ুর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
২১. প্রশ্ন: বায়ুচাপের ঢাল (Pressure Gradient) বলতে কী বোঝো?
উত্তর: দুটি স্থানের মধ্যে বায়ুচাপের যে পার্থক্য থাকে, তাকে বায়ুচাপের ঢাল বলে। সমচাপ রেখাগুলি খুব কাছাকাছি থাকলে চাপ বলের ঢাল বাড়ে, ফলে বায়ু প্রবল বেগে প্রবাহিত হয়। আবার রেখাগুলি দূরে থাকলে ঢাল কমে এবং বায়ুর গতিও কমে যায়।
২২. প্রশ্ন: মেরু বায়ুর বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।
উত্তর: মেরু উচ্চচাপ বলয় থেকে উপমেরু নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত বায়ুকে মেরু বায়ু বলে।
(১) এই বায়ু অত্যন্ত শীতল ও শুষ্ক হয়।
(২) উত্তর গোলার্ধে এটি উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ গোলার্ধে দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত হয়।
(৩) এই বায়ুর প্রভাবে মাঝে মাঝে তুষারপাত ও তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ঘটে।
২৩. প্রশ্ন: ঘূর্ণবাতের শক্তি কীভাবে বৃদ্ধি পায়?
উত্তর: যখন কোনো স্থানে নিম্নচাপ কেন্দ্র খুব শক্তিশালী হয় এবং আশেপাশের উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে প্রচুর পরিমাণে আর্দ্র বায়ু দ্রুত গতিতে কেন্দ্রের দিকে ছুটে আসে, তখন ঘূর্ণবাতের শক্তি বাড়ে। ঘনীভবন প্রক্রিয়ায় লীনতাপ নির্গত হলে ঘূর্ণবাত আরও শক্তিশালী ও বিধ্বংসী হয়ে ওঠে।
২৪. প্রশ্ন: স্থানীয় বায়ু কাকে বলে? দুটি উদাহরণ দাও।
উত্তর: বছরের কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কোনো ছোট অঞ্চলের ওপর বায়ুচাপের পার্থক্যের কারণে যে বায়ু প্রবাহিত হয়, তাকে স্থানীয় বায়ু বলে। উদাহরণ হিসেবে ভারতের রাজস্থানের ‘আঁধি’ এবং উত্তর ভারতের গ্রীষ্মকালীন শুষ্ক বায়ু ‘লু’-এর নাম বলা যায়।
২৫. প্রশ্ন: মৌসুমী বায়ুকে কেন সাময়িক বায়ু বলা হয়?
উত্তর: মৌসুমী বায়ু ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে তার দিক পরিবর্তন করে। গ্রীষ্মকালে এটি সমুদ্র থেকে স্থলের দিকে এবং শীতকালে স্থল থেকে সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয়। যেহেতু এটি সারাবছর একইভাবে চলে না, কেবল নির্দিষ্ট ঋতুতে প্রবাহিত হয়, তাই একে সাময়িক বায়ু বলা হয়।
২৬. প্রশ্ন: টর্নেডো ও হারিকেনের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: টর্নেডো স্থলভাগে উৎপন্ন হওয়া খুব ছোট কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী ঘূর্ণবাত (গড় গতিবেগ ৩০০-৪০০ কিমি/ঘন্টা)। অন্যদিকে হারিকেন হলো সমুদ্রে উৎপন্ন হওয়া বিশাল আকার ও বিধ্বংসী ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাত। টর্নেডো দেখতে ফানেলের মতো হয়, হারিকেন বিশাল মেঘপুঞ্জের মতো।
২৭. প্রশ্ন: অশ্ব অক্ষাংশে কেন বৃষ্টিপাত প্রায় হয় না?
উত্তর: কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয়ে (অশ্ব অক্ষাংশ) বায়ু ওপর থেকে নিচে নেমে আসে। নিচে নেমে আসার সময় বায়ু সংকুচিত ও উষ্ণ হয়, ফলে এর জলীয় বাষ্প ধারণ করার ক্ষমতা বেড়ে যায়। বায়ু অসম্পৃক্ত থাকে বলে এখানে ঘনীভবন বা মেঘ সৃষ্টির সুযোগ থাকে না, তাই বৃষ্টিপাতও হয় না।
২৮. প্রশ্ন: বায়ুপ্রবাহের দিক পরিবর্তনে ঘর্ষণ বলের ভূমিকা কী?
উত্তর: ভূপৃষ্ঠের উঁচু-নিচু ভূমিরূপ, গাছপালা বা বাড়িঘরের সাথে বায়ুর ঘর্ষণ ঘটে। এই ঘর্ষণ বল বায়ুর গতিবেগ কমিয়ে দেয়। গতিবেগ কমলে কোরিওলিস বলের প্রভাবও কমে যায়, যার ফলে বায়ু কিছুটা সোজাসুজি উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপের দিকে প্রবাহিত হওয়ার চেষ্টা করে।
২৯. প্রশ্ন: তাপবলয় ও চাপবলয়ের মধ্যে সম্পর্ক কী?
উত্তর: সূর্যের উত্তাপের ওপর বায়ুর চাপ সরাসরি নির্ভর করে। যেখানে উত্তাপ বেশি (যেমন নিরক্ষীয় অঞ্চল), সেখানে বায়ু হালকা হয়ে নিম্নচাপ বলয় তৈরি করে। আবার যেখানে উত্তাপ খুব কম (যেমন মেরু অঞ্চল), সেখানে বায়ু শীতল ও ভারী হয়ে উচ্চচাপ বলয় তৈরি করে। অর্থাৎ তাপবলয়ই চাপবলয় গঠনের প্রধান ভিত্তি।
৩০. প্রশ্ন: কালবৈশাখী ও আঁধি কোন ধরনের বায়ুপ্রবাহ?
উত্তর: কালবৈশাখী ও আঁধি- দুটিই হলো স্থানীয় বায়ুপ্রবাহ। গ্রীষ্মকালে বিকেল বা সন্ধ্যায় স্থানীয়ভাবে নিম্নচাপ সৃষ্টির ফলে এই ঝোড়ো বায়ু প্রবাহিত হয়। কালবৈশাখী পশ্চিমবঙ্গের বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টি ঘটায়, আর আঁধি রাজস্থানে ধূলিঝড় সৃষ্টি করে।


©kamaleshforeducation.in(2023)



