পরিবেশ ও বিপন্ন মানুষ :
প্রদত্ত অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রবন্ধ রচনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার বিস্তারে মানুষ ক্রমশ প্রকৃতির উপর তার আধিপত্য কায়েম করেছে। মানুষ তার নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের সন্ধানে ক্রমশ প্রকৃতির স্বাভাবিকত্বের উপর হস্তক্ষেপ করেছে। ফলে অরণ্যনিধন বেড়েছে। প্রথমে চাষবাসের জন্য, পরবর্তীকালে নগরায়ণ ও শিল্পাঞ্চলের জন্য ব্যাপক বৃক্ষনিধন ঘটেছে। তাই মানুষের আবির্ভাবলগ্নে পৃথিবীর স্থলভাগের সবটুকু অরণ্য থাকলেও এখন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অরণ্যটুকুও নেই। সুস্থভাবে বাঁচার জন্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রয়োজন ৩৩-৩৫ শতাংশ বনভূমি। সেখানে পৃথিবীতে ও ভারতে বর্তমান বনভূমির হার যথাক্রমে ৩০ শতাংশ ও ২৩-১ শতাংশ। প্রয়োজনীয় বনভূমি না থাকার ফলে কমছে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ, বাড়ছে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ। বায়ুদূষণের ফলে বাড়ছে তাপমাত্রা। অনাবৃষ্টির ফলে প্রভাব পড়ছে কৃষিকাজে, কমছে ভূগর্ভস্থ জল। ভূমিক্ষয় রোধ না হওয়ার জন্য বাড়ছে বন্যা। অবলুপ্ত হচ্ছে বিভিন্ন প্রকার পশুপাখি।
কারণ সুদীর্ঘকাল যাবৎ যান্ত্রিক প্রগতির অতি দানবীয় পদচারণায় বিশ্ব পরিণত হয়েছে ‘যক্ষপুরী’তে, সম্পদ পুঞ্জিত করাই যার একমাত্র লক্ষ্য। তাতে পৃথিবীর ‘আদিপ্রাণ’ গাছ-ই হয়েছে মানবজাতির মুখের গ্রাস। ফলে ধরিত্রী মা আজ ব্যথিত হৃদয়ে শরশয্যায় শায়িতা। তবে মানবসন্তানের সভ্যতার দম্ভ ও সম্পদ লালসার মধ্যেই যে বিশ্ব তথা তাদেরই সর্বনাশের বীজ লুকিয়ে, তারা তা বুঝতে পারেনি। বিনাশের অন্তিম লগ্নে উপস্থিত হয়ে তাই মানুষ আবার সবুজের উপাসনায় ব্রতী হয়েছে।
আসলে প্রকৃতির মধ্যে বাস করে অরণ্য নিধনের ফলে বিশ্ব আজ উন্নায়ন, দূষণ ও মারণব্যাধিতে আক্রান্ত। ‘Development’ বা ‘Progress’-এর নামেই এই ভোগ চরিতার্থের মাত্রা নির্ণীত হয়ে চলেছে। চলেছে সীমিত সম্পদ বাড়িয়ে তোলার রূঢ় আয়োজন। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য হচ্ছে বিঘ্নিত; প্রকৃতি হয়ে চলেছে লাঞ্ছিত। ভোগের উন্মত্ত তাণ্ডবে, সভ্যতার গগনস্পর্শী দম্ভে প্রকৃতি ও অন্যান্য প্রাণীকুলকে উপেক্ষা করেই মানুষ পরিবেশের উপর অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। ভোগলিঙ্গু মানুষ প্রকৃতির সম্পদ যথেচ্ছভাবে হরণ করতে প্রস্তুত। আর এই বস্তুবাদী ভোগে প্রকৃতি-বিচ্ছিন্ন মানুষ এমনই আচ্ছন্ন যে মানবিক বোধটুকু পর্যন্ত হারাতে বসেছে। সবুজহীন মানবমনে সন্দেহ-ঘৃণা-ক্ষোভগ্রিন হাউস প্রভাবের মতোই ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়েছে। প্রকৃতির কোমলতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই মানবজীবনে নেমে এসেছে এমন যন্ত্রণাময় কঠোর দুর্ভোগ। অরণ্যঘাতক মানুষ বুঝেছে তারা মরুদানবের গ্রাসের মুখোমুখি। শুধু পার্থিব মৃত্যু নয়, আত্মিক মৃত্যুভাবনাতেও মানুষ আজ ক্লান্ত। কিন্তু সব ক্লান্তি কাটিয়ে তাকেই খুঁজতে হয়েছে উত্তরণের পথ; সেখানেও কবিগুরুর বাণী হয়েছে অক্ষয় প্রেরণা-“মরুবিজয়ের কেতন উড়াও শূন্যে হে প্রবল প্রাণ/ধূলিরে ধন্য কর করুণার পুণ্যে হে কোমলপ্রাণ।” এই সংগীত কণ্ঠে নিয়ে আবার মানুষই নব-অরণ্য সৃজনের প্রয়াসী হয়েছে। এই আকুলতায় বনমহোৎসব পালন শুরু হয়েছে ১৯৫০ সাল থেকে। শুরু হয়েছে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। যা মানুষকে ‘প্রথম যুগের বচন’ শুনিয়ে বলতে চেয়েছে গাছ-ই সকল প্রাণের উৎস, তার মধ্যেই আছে অফুরান জীবন। বনসৃজনের এই উদ্যোগকে বাস্তবে সার্থক করে তোলার মধ্যেই আছে বসুন্ধরার আয়ু বৃদ্ধির সম্ভাবনা।
প্রকৃতির দূষণের মধ্যে বাস করে, গ্রিন হাউসের সন্ত্রাসে আক্রান্ত হয়ে, বিপন্নতার হাতে বলি হতে হতে আজ আমরা প্রকৃত বন্ধুকে চিনতে পেরেছি। আমরা বুঝতে পেরেছি গাছ আছে, তাই আমি আছি। সবুজশূন্য পৃথিবী মৃত্যু উপত্যকা, প্রাণের সেখানে শুধুই পরাজয়।
সবশেষে বলা যায়, যে তথাকথিত সভ্যতার অহংকারে আমরা নির্বিচারে সবুজ ধ্বংস করেছি-তাতে আমরা হয়তো পেয়েছি সাময়িক আরাম, ভোগ-সুখ; কিন্তু পাইনি শান্তি, আনন্দ, মুক্তি। তাই আজ আর করুণা প্রার্থনা নয়, মানবের প্রত্যয়ী কণ্ঠে ঘোষিত হোক- “ফিরিব তোমারে ঘিরি, কবির বিরাজ/তোমার আত্মীয় মাঝে, কীট পশুপাখি/তবু গুল্ম লতারূপে বারম্বার ডাকি/ আমারে লইবে তব প্রাণতপ্ত বুকে।” ‘বসুন্ধরার প্রতি’ এই অঙ্গীকারই হয়ে উঠুক আমাদের জীবনের মহামন্ত্র। আর এই প্রাণধর্মী, মননধর্মী ভাষাই হোক বিশ্বমানবের হৃদয়ের ভাষা।