উচ্চমাধ্যমিক দ্বাদশ শ্রেণি -চতুর্থ সেমিস্টার

 

প্রদত্ত অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রবন্ধ রচনা লেখার নিয়ম

 

কোনো একটি বিষয়ে কোনো একজন লেখকের লেখার একটি অংশ দেওয়া থাকবে। প্রদত্ত অনুচ্ছেদটি হল রচনার প্রস্তাবনা বা ভূমিকা। এই প্রস্তাবনা বা ভূমিকাটিকে অবলম্বন করে পরীক্ষার্থী বিষয়বস্তুর গভীরে প্রবেশ করবে এবং পরিণতি মান করবে।

 

এই ধরনের প্রবন্ধ লেখার আগে যে বিষয়গুলি মনে রাখতে হবে-

 

  • প্রশ্নপত্রে প্রদত্ত অনুচ্ছেদটিকে মূল রচনার প্রস্তাবনা বা ভূমিকা হিসেবে গ্রহণ করে পরবর্তী অংশে সেই ভাবটিকে বিশ্লেষণ করতে হবে।

  • প্রবন্ধ রচনার সময়ে মূল লেখাটি যে গ্রন্থের অন্তর্গত, তা পড়া না থাকলেও অসুবিধা নেই।

  • প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্যের সমর্থনে প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি ও সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ব্যবহার করা যাবে।

  • প্রবন্ধের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে যেন তার নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও রূপরেখাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

  • সমাজ-সমস্যামূলক প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রতিকারের পথগুলিও উল্লেখ করতে হবে।

  • প্রবন্ধের শব্দসীমার প্রতি অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে।

২। [নিত্যনতুন আবিষ্কার আর প্রচণ্ড গতিকে সঙ্গে নিয়ে মানুষ যে অপরিমেয় ভোগ ও স্বাচ্ছন্দ্যের পথে চলেছে, সেই সার্বিক অগ্রগতির পথে বর্তমানে নানা সংকটময় পরিস্থিতি উপস্থিত। এর মধ্যে ভয়ংকর সংকটটি হল বিশ্ব উন্নায়ন (Global Warming)। পৃথিবীর আবহাওয়া উয় থেকে উন্নতর হওয়ার ফলে সমস্ত গ্লেসিয়ার ও চির-তুহিন মেরু অঞ্চলের সাম্রাজ্য দ্রুত হারে গলছে, মরুভূমি অঞ্চলগুলির পরিধি বাড়ছে। বহু জলচর ও স্থলচর প্রাণী ইতিমধ্যে অবলুপ্ত বা বিলুপ্তির পথে। আত্মসচেতনতা বাড়িয়ে পৃথিবীর প্রাণকে রক্ষা করাই আমাদের সবচেয়ে বড়ো কর্তব্য।]

  প্রদত্ত অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রবন্ধ রচনা

বিশ্ব উষ্ণায়ন :

‘একটা পৃথিবী চাই
মায়ের আঁচলের মতো

আর যেন ওই আঁচল জুড়ে

গান থাকে যখন শিশুদের ঘুম পায়।’

-বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

পৃথিবী জন্মমুহূর্তে ছিল এক উয় আগ্নেয়পিণ্ড। ধীরে ধীরে তা শীতল হয়ে বাসযোগ্য পৃথিবী হয়ে উঠেছে। একবিংশ শতকের প্রথম দশকে এসে মানুষ নিত্যনতুন আবিষ্কার আর প্রচণ্ড গতিকে সঙ্গে নিয়ে ভোগ, স্বাচ্ছন্দ্যের পথে এগিয়ে চলেছে। বিজ্ঞানের জয়রথ চড়ে গ্রহান্তরে এঁকে দিয়েছে পদচিহ্ন। কিন্তু সভ্যতার এই সমুদ্রমন্থনে উঠেছে পরিবেশদূষণরূপী কালকূট বিষও। ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা। গ্লোবাল ওয়ার্মিং জীবনের মৃত্যুঘণ্টা হয়ে বেজে চলেছে অহরহ। তাই আত্মসচেতনতা বাড়িয়ে প্রাণকে রক্ষা করাই আমাদের মূল্য কর্তব্য।

ভূভাগ ক্রমাগত দূষিত হতে থাকায় বায়ুমণ্ডলে গ্রিন হাউস গ্যাসগুলি (CO, CH, CFC, N₂O, NO2, CO, SO2, NO প্রভৃতি) মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বিষাক্ত গ্যাসগুলি ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপের কিছু অংশ শোষণ করে নিয়ে বায়ুমণ্ডলের গড় উন্নতা বৃদ্ধি করে চলেছে। উন্নতার এই বৃদ্ধিকেই গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্ব উন্নায়ন বলে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের ভোগবিলাসিতা অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি। আমরা বর্তমান পরিবেশ, পরিবার ও কাজকর্মের পরিসরকে নতুনভাবে দেখতে শিখেছি। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবনযাপনের পদ্ধতিতেও তাই রূপান্তর এসেছে। ফল স্বরূপ প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে।

বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য মূলত দায়ী করেছেন গ্রিন হাউস গ্যাসগুলিকে। পরিবেশবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়-শিল্পবিপ্লবের সাতশো বছর আগে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ ছিল ২৪০ পিপিএম। ২০৫০ সালে এর পরিমাণ হতে পারে প্রায় ৪৫০ পিপিএম। অতিরিক্ত যানবাহন, কলকারখানার ধোঁয়া, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত

যন্ত্রের ব্যবহার, জমিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার, পারমাণবিক বিস্ফোরণ, তেজস্ক্রিয় বিকিরণ-এসবের ব্যবহারের ফলে বায়ুমণ্ডলে ওজোনস্তরে ছিদ্রের সৃষ্টি হচ্ছে এবং চির-বরফাবৃত মেরু অঞ্চলের সাম্রাজ্য দ্রুতহারে গলছে, মরুভূমি অঞ্চলগুলির পরিধি বাড়ছে। জলচর প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটছে।

১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বসুন্ধরা শীর্ষ সম্মেলন। ২০০২ সালে জোহানেসবার্গেও একই উদ্দেশ্যে সম্মেলন হয়। ২০০৪ সালে জাপানের কিয়োটো শহরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বিশ্বের ১৫৬টি দেশ অংশগ্রহণ করে। ২০০৭ সালে ইন্দোনেশিয়ায় বালিতে গ্রিন হাউস গ্যাস রোধের জন্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও পশ্চিমি উন্নত দেশগুলির অসহযোগিতায় বিশেষ কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। তবে এ ব্যাপারে আমাদের প্রত্যেকের সদিচ্ছা দরকার। প্রথমে দরকার বন সংরক্ষণ। যথাসম্ভব শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র ব্যবহার কমাতে হবে। এল ই ডি আলোর ব্যবহার অতি জরুরি। এতে বিদ্যুৎ সাশ্রয় ঘটবে। সাইকেলের ব্যবহার বাড়াতে হবে। পরিবেশবান্ধব হয়ে বিশ্ব উন্নায়ন রোধ করার কাজে ছাত্রসমাজকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ জরুরি।

আধুনিক বিশ্বের অগ্নিগর্ভ সমস্যা হল বিশ্ব উন্নায়ন। ভোগবাদের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত দেখা যাচ্ছে সমাজের প্রতিটি স্তরে। মিষ্টি জলের অভাব দেখা দিচ্ছে। বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী চিরতরে বিলুপ্ত হচ্ছে। একশো বছর আগে রবীন্দ্রনাথ নাগরিক জীবনের যন্ত্রণায় আর্ত হয়ে লিখেছিলেন-‘দাও ফিরে সে অরণ্য লও এ নগর।’ কিন্তু ভোগবাদী মানুষের অর্থনৈতিক লোভলালসা বিজ্ঞানের অপপ্রয়োগ ঘটিয়ে প্রকৃতির উপর অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য যে বৃক্ষ পরিবেষ্টিত শ্যামল ধরিত্রীই কাম্য-সেখানে আমরা আত্মসচেতন হওয়ার পরিবর্তে স্বার্থসিদ্ধির লোভে নিজেদের সর্বনাশসাধনে নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে উঠেছি।

 

SOURCE-WBC

©Kamaleshforeducation.in (2023)

 

error: Content is protected !!
Scroll to Top