ভূমিকা : দ্বাদশ শ্রেণির চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা পরীক্ষার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘ডাকঘর’ নাটক পড়তে হবে। শুধুমাত্র এই নাটক থেকে পরীক্ষায় 40 নম্বরের মধ্যে মোট 10 নম্বর আসবে। অর্থাৎ এই নাটক থেকে পরীক্ষায় 5 নম্বর মানের প্রশ্ন 4 টি থাকবে, তারমধ্যে যে-কোন 2 টি করতে হবে। তাহলে মোট 2×5=10 নম্বর। এখান থেকে পরিষ্কার বুঝতে পারছি দ্বাদশ শ্রেণির চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা পরীক্ষার জন্য এই নাটকটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমি সুবিধার জন্য এই পর্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘ডাকঘর’ নাটক থেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর সহ দিলাম।

🔹 ‘ডাকঘর’ নাটকের প্রশ্ন উত্তর
[প্রতিটি প্রশ্নের মান-5]
1. ‘ডাকঘর’ নাটকে অমল চরিত্রটি সম্পর্কে নিজের ভাষায় আলোচনা করো। ৫ [WBCHSE Model Question)
উত্তর : বাংলা সাহিত্যের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘ডাকঘর’ নাটক থেকে উদ্ধৃতাংশটি নেওয়া হয়েছে।
এই নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র অমল এক অসুস্থ ও গৃহবন্দী বালক, যার মধ্যে অসীম কল্পনাশক্তি এবং বাইরের জগতের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা বিদ্যমান। অমলের পিতা-মাতা নেই। মাধব দত্ত তাকে দত্তক নিয়েছেন। কিন্তু অমলের প্রকৃত আশ্রয় বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অনন্ত বিস্তারে। তাই অসুস্থ অমল কবিরাজের কথায় ঘরে থাকলেও জানালার সামনে বসে বাইরের পৃথিবীকে দেখে, তার সঙ্গে মিশতে চায়।
অমল চরিত্রের মধ্যে যেসব বৈশিষ্ট্যগুলি আমি লক্ষ্য করেছি সেগুলি হল :
(ক) তার কল্পনাপ্রবণ মন : অমলের মন খুব কল্পনাপ্রবণ। অসুস্থ হলেও তার মন সজীব থাকে। সে দইওয়ালার মুখে গল্প শুনে মুগ্ধ হয়। দূরের গ্রামের সৌন্দর্য কল্পনা করে সে আনন্দ পায়।
(খ) বাইরের জগতের প্রতি তার আকাঙ্ক্ষা : বাইরের জগতের প্রতি অমলের গভীর আকাঙ্ক্ষা আছে। গৃহবন্দী জীবন তাকে বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে কৌতূহলী করে তোলে। সে ডাকপিয়নের আগমনের প্রতীক্ষায় থাকে এবং তার মাধ্যমে দূরের গ্রামের ও অসীমের সাথে যোগাযোগের স্বপ্ন দেখে।
(ঘ) মানবিক ও অসীম সত্তার প্রতীক : অমল শুধু এক অসুস্থ বালক নয়, সে মানবাত্মার প্রতীক। তার অসুস্থতা আর ঘরে বন্দি থাকা জীবনের সীমাবদ্ধতা ও মৃত্যুর দিকে যাত্রার প্রতীক। আবার তার অসীমের প্রতি টান বিশ্বপথিক মনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে।
(ঙ) সরলতা ও নিষ্পাপতা : অমলের মনে কোনো কপটতা নেই। সে খুবই সরল ও নিষ্পাপ। এই নিষ্পাপ মনই তাকে ঈশ্বরের প্রতি আকুল হতে সাহায্য করে।
(চ) আশা ও প্রতীক্ষার প্রতীক : অমল ডাকপিয়নের মধ্যে আশা ও সংযোগের প্রতীক খুঁজে পায়। তার অপেক্ষা আর স্বপ্ন বাস্তবতার বাইরে এক অনন্তের পথে যাত্রাকে বোঝায়।
উপসংহার : অমল এক শিশুর মতো সরল, আশাময় এবং অসীমের প্রতি টানে ভরপুর। এই গুণগুলিই তাকে ‘ডাকঘর’ নাটকের মূল ভাব ও রূপকের কেন্দ্রবিন্দুতে এনে দিয়েছে।

2. “…. তোমার দুটি পায়ে পড়ি, আমি পণ্ডিত হব না”- কে, কাকে উদ্দেশ করে মন্তব্যটি করেছে? তার পণ্ডিত হতে না চাওয়ার কারণ কী? ২+৩
উত্তর : বাংলা সাহিত্যের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘ডাকঘর’ নাটক থেকে উদ্ধৃতাংশটি নেওয়া হয়েছে।
উল্লিখিত মন্তব্যটি অমল মাধব দত্তকে উদ্দেশ করে করেছে।
পণ্ডিত হতে না চাওয়ার কারণ : অসুস্থ অমলকে সুস্থ করার জন্য কবিরাজের নির্দেশমতো ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। কিন্তু অমলের মন বাইরে যেতে চায়। উঠোনের যেখানটায় পিসিমা জাঁতা দিয়ে ডাল ভাঙেন, আর কাঠবিড়ালি সেই ভাঙা ডালের খুদ দু-হাতে তুলে নিয়ে ল্যাজের উপরে ভর করে খেতে থাকে- সেখানে অমল যেতে চায়। কবিরাজের নিষেধের কথা মাধব দত্ত বলেন। এছাড়া, বড়ো বড়ো পণ্ডিতেরা তার মতো ঘর থেকে বেরোয় না, তারা ঘরে বসে শুধু পুথি পড়েন -এ কথাও তিনি বলেন। তিনি আরও বলেন, এভাবে অমল বড়ো হলে একদিন পণ্ডিত হবে, “বসে বসে এত বড়ো বড়ো পুথি পড়বে।” তখন অমল পণ্ডিত হতে তার তীব্র আপত্তির কথা জানায়। কারণ পণ্ডিতদের পুথি ছাড়া অন্য কোনো দিকে নজর নেই, আর অমলের এই পৃথিবীর সবকিছু ঘুরে দেখে বেড়ানোতেই আনন্দ। জানলার কাছে বসে অমল যে পাহাড়টি দেখে, সে সেই পাহাড় পার হয়ে যেতে চায়। পৃথিবী কথা বলতে পারে না, তবুও যেন নীল আকাশে হাত বাড়িয়ে তাকে ডেকে পাঠায়। পুথির মধ্যে নয়, মুক্ত দিগন্তে অবাধ বিচরণে অমল তার আত্মার আনন্দ খুঁজে পায়। এজন্য সে পণ্ডিত হতে চায়নি।

3. “বড়ো হলে আমি রাজার ডাক-হরকরা হব।” – এই ইচ্ছা বক্তা কখন এবং কেন প্রকাশ করেছিল? ২+৩
উত্তর : বাংলা সাহিত্যের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘ডাকঘর’ নাটক থেকে উদ্ধৃতাংশটি নেওয়া হয়েছে।
উল্লিখিত মন্তব্যটি ‘ডাকঘর’ নাটকে অমল করেছে।
প্রহরী বলল যে, রাস্তার ওপারের বড়ো বাড়িতে রাজার নতুন ডাকঘর হয়েছে। সেখানে রাজার কাছ থেকে চিঠি আসে। একদিন অমলের নামেও সেখানে চিঠি আসবে। অমল যখন শোনে যে, রাজার কাছ থেকে ডাক-হরকরা তার চিঠি নিয়ে দেবে, আর কাজে তারা ঘরে ঘরে দেশে দেশে যায়, তখনই অমল বড়ো হয়ে ডাকহরকরা হওয়ার ইচ্ছা করে।
বক্তার এই উক্তির কারণ : অমল চায় বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ। বন্ধন থেকে মুক্তি। তাই সে পণ্ডিত হতে চায় না। লাঠির ডগায় পুঁটলি বেঁধে যে লোক কাজ খুঁজতে যায়, যে দইওয়ালা ‘দই দই ভালো দই’ বলে ডাক দেয়, অমল তাদের মতো বেরিয়ে যেতে চায়। প্রহরীর ঘণ্টার শব্দ শুনে তার ইচ্ছে হয় সময়ের সঙ্গে চলতে। রাজার ডাকহরকরার মধ্যে সে পায় এই সহজ বাধাহীন ভ্রমণ। বুকে গোল গোল সোনার তকমা পরে যারা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে, গরিব-বড়লোক ভেদ না করে সকলের ঘরে ঘরে চিঠি বিতরণ করে, তাদের কাজকেই অমল ‘সবচেয়ে ভালো’ মনে করেছে। এজন্যই সে বড়ো হয়ে ‘রাজার ডাকহরকরা’ হতে চেয়েছে।
4. “বড়ো বড়ো পণ্ডিতেরা সব তোমারই মতো…।”- কাকে উদ্দেশ করে, কে মন্তব্যটি করেছেন? মন্তব্যটির তাৎপর্য লেখো। ২+৩
উত্তর : বাংলা সাহিত্যের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘ডাকঘর’ নাটক থেকে উদ্ধৃতাংশটি নেওয়া হয়েছে।
এই নাটকে মাধব দত্ত অমলকে উদ্দেশ করে উল্লিখিত মন্তব্যটি করেছেন।
এই মন্তব্যটির তাৎপর্য : অসুস্থ অমলকে সুস্থ করার জন্য কবিরাজ বলেছিলেন, তাকে ঘরের মধ্যে রাখতে হবে, যাতে শরতের রোদ আর বাতাস তাকে ছুঁতে না পারে। কিন্তু অমলের মনে বাইরে যাওয়ার ইচ্ছে জাগে। উঠোনে যেখানে পিসিমা জাঁতা দিয়ে ডাল ভাঙেন, আর কাঠবিড়ালি সেই ডালের খুদ দু-হাতে তুলে ল্যাজের উপর ভর করে খায়, সেখানে অমল যেতে চায়। কিন্তু পিসেমশাই মাধব দত্ত কবিরাজের নিষেধের কথা বলেন। কবিরাজ অনেক বড়ো বড়ো পুথি পড়েছেন, তাই তাঁর কথা ভুল হতে পারে না—এমনটাই মাধব দত্ত মনে করেন। পুথি পড়লে সব জানা যায় শুনে অমল আক্ষেপ করে, কারণ সে কোনো পুথি পড়েনি। তখন মাধব দত্ত বলেন, পণ্ডিতেরা সবাই অমলের মতো, তারা ঘর থেকে বেরোয় না। এই কথায় তিনি বোঝাতে চান, সমস্তক্ষণ পুথি পড়ার পরে তাঁরা অন্য কোনো দিকে তাকানোর অবসর পান না। অর্থাৎ পণ্ডিতরা বাস্তব থেকে দূরে এবং পুথিসর্বস্ব-তা নিয়েই তির্যক ইঙ্গিত উঠে আসে মাধব দত্তের কথায়।