

উচ্চ মাধ্যমিক দ্বাদশ শ্রেণি-চতুর্থ সেমিস্টার
ইতিহাস
আলিগড় আন্দোলন, মুসলিম লিগের প্রতিষ্ঠা, হিন্দু মহাসভা

Table of Contents
উচ্চ মাধ্যমিক দ্বাদশ শ্রেণি-চতুর্থ সেমিস্টার
ইতিহাস
আলিগড় আন্দোলন, মুসলিম লিগের প্রতিষ্ঠা, হিন্দু মহাসভা
১। আলিগড় আন্দোলনের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।
অথবা, মুসলমানদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে আলিগড় আন্দোলনের অবদান কী ছিল?
আলিগড় আন্দোলন: উনবিংশ শতক নাগাদ ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে মুসলিম সমাজ পাশ্চাত্য শিক্ষাগ্রহণ না করার ফলে শিক্ষা ও চাকুরির ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে। এই অবস্থায় মুসলিম সমাজের ত্রাণকর্তা স্যার সৈয়দ আহমেদ খান (১৮১৭-৯৮ খ্রি.) পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের -উদ্দেশ্যে ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে আলিগড় অ্যাংলো– ওরিয়েন্টাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এই আলিগড় কলেজকে কেন্দ্র করে মুসলমান সমাজে যে সংস্কার আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল, তাকে আলিগড় আন্দোলন বলা হয়।
ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে পশ্চাৎপদ মুসলিম সমাজকে আধুনিকতা ও যুক্তিবাদী পথে চালনা করতে আলিগড় আন্দোলন বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল।
আলিগড় আন্দোলনের লক্ষ্য: আলিগড় আন্দোলনের ঘোষিত লক্ষ্যগুলির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল-মুসলমানদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটানো, সাম্প্রদায়িক সংহতি বাড়ানো এবং ভবিষ্যতের জন্য নেতৃত্ব তৈরি করা।
আলিগড় আন্দোলনের মূলনীতি: আলিগড় আন্দোলন চারটি মূল নীতির উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। এগুলি হল-
-
হিন্দু এবং মুসলমান হল দুটি পৃথক রাজনৈতিক সত্তা।
-
স্বায়ত্তশাসন এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে উচ্চ সরকারি পদে নিযুক্তি মুসলিমদের স্বার্থের পরিপন্থী।
-
মুসলিমরা সরকার-বিরোধী সব আন্দোলন থেকে দূরে থাকবেন, কারণ-ব্রিটিশ সরকারের হাতে মুসলিমদের স্বার্থ সুরক্ষিত।
-
তারা মূলত সাংস্কৃতিক উন্নয়নেই অংশ নেবেন এবং হিন্দু রাজনৈতিক বিক্ষোভকারীদের খর্ব করার জন্য যতটুকু প্রয়োজন, ঠিক ততটাই রাজনীতিতে অংশ নেবেন।
আলিগড় আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ: আলিগড় আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাণপুরুষ ছিলেন স্যার সৈয়দ আহমেদ খান। তাঁর সহযোগী নেতৃবৃন্দ ছিলেন- কবি আলতাফ হুসেন আলি, শিক্ষাবিদ ইউসুফ আলি, খুদাবক্স, মৌলবি নাজির আহমেদ, শিবলি নোমানি প্রমুখ।
আলিগড় আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য দিকসমূহ:
(i) আত্মপরিচয়ের উন্মেষ: আলিগড় আন্দোলন মুসলমানদের মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিল ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধ। স্যার সৈয়দ আহমেদ মুসলমানদের একটি স্বতন্ত্র সংস্কৃতির ধারক হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং তাদের পৃথক জাতিসত্তার তত্ত্ব তুলে ধরেন। ঐতিহাসিক অমলেশ ত্রিপাঠী স্যার সৈয়দকে ভারতে দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রথম প্রবক্তা বলে উল্লেখ করেছেন।
(ii) ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন: সৈয়দ আহমেদ উপলব্ধি করেন যে, ঔপনিবেশিক আমলে ইংরেজ শাসনের বিরোধিতা করা মুসলমান সমাজের পক্ষে হিতকর হবে না। তাই সরকারের ক্ষোভপ্রশমনের জন্য ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে তিনি দ্য লয়্যাল মহামেডানস অফ ইন্ডিয়া নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। এই পুস্তিকায় নানা তথ্য দিয়ে স্যার সৈয়দ আহমেদ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহে মুসলমান সমাজ সচেতনভাবে জড়িত বা সক্রিয় ছিলেন না।
(iii) আধুনিক শিক্ষার প্রসার: আলিগড় আন্দোলনের মাধ্যমে মুসলমানরা উপলব্ধি করেছিলেন যে, ইংরেজি শিক্ষা ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে অবহিত না হলে তারা হিন্দুদের থেকে পিছিয়ে পড়বে। তাই এই আন্দোলনের মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছিল।
(iv) অন্যান্য সংস্কার: শিক্ষার পাশাপাশি সমাজের নানা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্যেও একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয় আলিগড় আন্দোলনে। এখানে বহুবিবাহ, তালাক প্রথার বিরোধিতার পাশাপাশি নারীর অবস্থার উন্নয়ন ঘটানোর উপরেও জোর দেওয়া হয়।
আলিগড় আন্দোলনে থিওডোর বেক-এর ভূমিকা:
আলিগড় কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ থিওডোর বেক এই আন্দোলনে সক্রিয় উদ্যোগ নেন। তাঁর সহযোগিতায় একদিকে ইউনাইটেড ইন্ডিয়ান প্যাট্রিয়টিক অ্যাসোসিয়েশন (১৮৮৮ খ্রি.) নামক কংগ্রেসের প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থা গড়ে ওঠে। পাশাপাশি ইংরেজ সরকারের কাছ থেকে ভারতীয় মুসলিমদের জন্য বিশেষ আর্থরাজনৈতিক আনুকূল্য আদায়ের কাজেও বেক সৈয়দ আহমেদকে সাহায্য করেছিলেন।
আলিগড় আন্দোলনের মূল্যায়ন: উনবিংশ শতকে মুসলিম সমাজে বিশেষ সাড়া জাগালেও, আলিগড় আন্দোলন সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত ছিল না।
সীমাবদ্ধতা : সৈয়দ আহমেদ খান পরিচালিত এই আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণভাবে ধর্মীয় মোড়কে আবৃত এবং মূলত উচ্চবিত্ত মুসলমানদের মধ্যে সীমিত। সাধারণ মানুষের উপর এর বিশেষ প্রভাব পড়েনি। মুসলিম সমাজের অধিকাংশ এমনকি নারীরাও খুব বেশিমাত্রায় এই নবজাগরণের অংশীদার হতে পারেন নি।
গুরুত্ব: নানাবিধ ত্রুটিবিচ্যুতি সত্ত্বেও আলিগড় আন্দোলন মুসলিম সমাজকে আশার আলো দেখায়। তারা অনেকাংশে কুসংস্কারমুক্ত হয় এবং আধুনিকমনস্ক হয়ে ওঠেন। এই আন্দোলন মুসলিম সমাজকে ভারতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করে। ঐতিহাসিক কে কে আজিজ তাঁর দ্য মেকিং অফ পাকিস্তান গ্রন্থে লিখেছেন, ‘এই আন্দোলন ছিল অংশত সাহিত্য-বিষয়ক, অংশত শিক্ষা-বিষয়ক, অংশত ধর্মীয় এবং সম্পূর্ণভাবে সাংস্কৃতিক।’
২। সর্বভারতীয় মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠার পটভূমি বা প্রেক্ষাপট আলোচনা করো।
অথবা, মুসলিম লিগের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে আলোচনা করো।
প্রাক্-স্বাধীন ভারতীয় রাজনীতির অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হল মুসলমানদের নিজস্ব রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে সর্বভারতীয় মুসলিম লিগের প্রতিষ্ঠা।
সর্বভারতীয় মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠার পটভূমি/ প্রেক্ষাপট:
মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠার পটভূমি ছিল নিম্নরূপ-
(i) প্রাক্-মুসলিম লিগ মুসলমানদের সাংগঠনিক পরিস্থিতি: স্যার সৈয়দ আহমেদ খান জাতীয় কংগ্রেসকে হিন্দু সংগঠন বলে চিহ্নিত করেন। তিনি কংগ্রেসের বিরোধিতা করার কাজে মুসলমানদের সংগঠিত করার লক্ষ্যে ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে ইউনাইটেড ইন্ডিয়ান প্যাট্রিয়টিক অ্যাসোসিয়েশন এবং ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন স্থাপন করেন। তাছাড়া এই দুই সংগঠনের মূল লক্ষ্য ছিল, ব্রিটিশ শাসনকে সুদৃঢ় করা এবং মুসলমান সমাজের স্বার্থরক্ষা। কিন্তু তারপরেও মুসলিম নেতাদের একাংশ মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক রাজনৈতিক দল গঠনের উপর জোর দেন। তারই পরিণতি হল মুসলিম লিগের প্রতিষ্ঠা।
(ii) রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা: স্যার সৈয়দ আহমেদ খান ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখে মুসলমান সমাজের উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণের চেষ্টা করেন। কিন্তু নতুন প্রজন্মের মুসলিম যুবনেতারা ব্রিটিশ সরকারের আন্তরিকতা বিষয়ে সন্দিহান ছিলেন। সৈয়দ আহমেদের মৃত্যুর পর (১৮৯৮ খ্রি.) আলিগড় আন্দোলন পশ্চিমী বুদ্ধিজীবীদের জ্ঞানচর্চার পরিবর্তে রক্ষণশীল ধর্মগুরুদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। আলিগড়ের তরুণ মুসলমানরা রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন। তাঁদের মনে হয় যে, তাঁরা যথার্থভাবে সংগঠিত নয়। এমতাবস্থায় সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখার তাগিদে হিন্দু ও ব্রিটিশ সরকার উভয়েরই বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হওয়া তথা একটি রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করার বিশেষ প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
(iii) নতুন দল গঠনের প্রাথমিক ভাবনা: মুসলমান তরুণ প্রজন্ম ও ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে সম্পর্কের নীতিগত বিরোধ আলিগড় ঘরানার পুরোনো নেতাদের উদ্বিগ্ন করে। তাঁরা এবং ব্রিটিশ সরকার উপলব্ধি করে যে, কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মুসলমানদের একটি নিজস্ব তথা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন প্রয়োজন। এই সময়ের দুটি প্রশাসনিক ঘটনা মুসলমানদের জন্য পৃথক দল গঠনের প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করে।
(a) বঙ্গবিভাগের সিদ্ধান্ত : লর্ড কার্জন কর্তৃক ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গবিভাগের সিদ্ধান্ত মুসলমানদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। তাদের আশা ছিল, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে নতুন প্রদেশ গঠিত হলে পূর্ব বাংলায় মুসলিমদের কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু বঙ্গবিভাগের প্রধান কারিগর বাংলার ছোটোলাট ব্যাম্পফিল্ড ফুলার। আকস্মিক পদত্যাগ (২০ আগস্ট, ১৯০৬ খ্রি.) করলে মুসলমানদের মনে ভয় ধরে। তাঁরা ভাবতে শুরু করেন যে, হয়তো বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যাবে। ফলে মুসলিমরা নিজেদের দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য নিজস্ব দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
(b) লর্ড মর্লে-এর ভূমিকা: ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের বাজেট বক্তৃতায় ভারত-সচিব লর্ড মর্লে ভারতে প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার চালু করার ইঙ্গিত দেন, মুসলিম নেতারা এতে শঙ্কিত হন। কারন তারা নিশ্চিত ছিলেন যে, ভারতে স্বশাসিত প্রতিষ্ঠা গুলিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরাই কর্তৃত্ব করবেন কারণ, জাতীয় কংগ্রেসের মাধ্যমে হিন্দুরা সংগঠিত ছিলেন। স্বভাবতই কংগ্রেসের অনুরূপ মুসলমানদের জন্য নিজস্ব একটি রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়ে ওঠে।
(iv) সিমলা দৌত্য: আলিগড় কলেজের সচিব মহসিন-উল-মুলক ইতিমধ্যে ঢাকার নবাব সলিমউল্লাহ-র সঙ্গে আলোচনা করে বড়োলাট লর্ড মিন্টোর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্যোগ নেন। এ বিষয়ে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন আলিগড় কলেজের ইংরেজ অধ্যক্ষ মিস্টার আর্চবোল্ড এবং বড়োলাটের সচিব ডানলপ স্মিথ। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ১ অক্টোবর আগা খানের নেতৃত্বে ৩৫ জন সদস্যবিশিষ্ট মুসলিম প্রতিনিধি দল সিমলায় লর্ড মিন্টোর সঙ্গে দেখা করেন, যা সিমলা দৌত্য নামে খ্যাত।
(v) স্মারকলিপি পেশ: লর্ড মিন্টোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মুসলিম প্রতিনিধি দল তাঁর হাতে একটি স্মারকলিপি তুলে দেয়। এতে সরকারি চাকুরি এবং প্রতিনিধিমূলক প্রশাসনিক সংস্থায় সংখ্যালঘু হিসেবে হিন্দুদের সমানুপাতে মুসলিম প্রতিনিধি পাঠানোর দাবি করা হয়। লর্ড মিন্টো মুসলমান প্রতিনিধিদের কথা শোনেন এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে, পূর্ববঙ্গীয় মুসলমানদের স্বার্থ বিপন্ন হবে না।
মুসলিম লিগ গঠন: বড়োলাট মিন্টোর মৌখিক প্রতিশ্রুতি তরুণ মুসলমানদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। ফলস্বরূপ, একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল গড়ে তোলার নতুন উদ্যোগ শুরু হয়। ঢাকার নবাব সলিমউল্লাহ-র উদ্যোগে স্যার সৈয়দ আহমেদ খান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত মহামেডান এডুকেশন কনফারেন্স-এর বার্ষিক অধিবেশনের দিন স্থির হয় ঢাকা শহরে। এখানেই ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ৩০ ডিসেম্বর মুসলমানদের জন্য একটি নতুন দল গঠিত হয়, যা সর্বভারতীয় মুসলিম লিগ বা অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগ নামে পরিচিত। এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি মনোনীত হন আগা খান এবং প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন মহসিন-উল-মুলক এবং ভিকার-উল-মুলক।
[৪ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর]
১। তহজিব-অল-আখলাখ পত্রিকার উদ্দেশ্যগুলি কী ছিল?
অথবা, টীকা লেখো: তহজিব-অল-আখলাখ।
স্যার সৈয়দ আহমেদ খান তাঁর সংস্কারমুখী চিন্তাভাবনা মুসলমান সমাজের মধ্যে সহজে ও দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে তহজিব-অল-আখলাখ নামে একটি উর্দু পত্রিকা প্রকাশ করেন। তহজিব-অল-আখলাখ শব্দের অর্থ হল চরিত্রের পরিশুদ্ধি। উর্দু ভাষায় লেখা ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে একাধিক প্রবন্ধ তহজিব-অল-আখলাখ পত্রিকায় প্রকাশ করে সাধারণ মুসলিমদের হৃদয় পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা চালানো হয়।
তহজিব অল-আখলাখ পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্যসমূহ:
(i) সমাজসংস্কার: তহজিব-অল-আখলাখ পত্রিকার মাধ্যমে ভারতের মুসলিম সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করা হয়। এটি মুসলিমদের রক্ষণশীল মানসিকতা বর্জন করে প্রগতিশীল ও আধুনিক জীবনধারা গড়ে তোলার জন্য প্রচার চালায়।
(ii) শিক্ষার প্রসার: বর্তমান কালের চাহিদা অনুসারে আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ করার বিষয়টি তুলে ধরা হয় তহজিব-অল-আখলাখ পত্রিকায়। এতে মুসলিম মনীষীদের রচনা, ইসলামীয় ইতিহাস, বিজ্ঞান ও দর্শন এসব বিষয়ে আলোচনা করা হত।
(iii) নৈতিকতা ও শিষ্টাচার: তহজিব-অল-আখলাখ পত্রিকায় নৈতিকতা, সৎ আচরণ, এবং সুশিক্ষার উপর জোর দেওয়া হয়। তাছাড়া মুসলমানদের উন্নত অভ্যাস ও আচরণ গ্রহণে উৎসাহিত করাও ছিল এই পত্রিকার অন্যতম উদ্দেশ্য।
(iv) ধর্মীয় সংস্কার: ধর্ম সম্পর্কে সৈয়দ আহমেদ খান তাঁর ভাবনা ব্যাখ্যা করেন এই পত্রিকায়। প্রকৃত ঐস্লামিক ধর্মতত্ত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আধুনিক যুক্তিবাদের ভিত্তিতে সাধারণ মুসলমানদের মন থেকে ধর্ম বিষয়ক ভ্রান্ত ধারণা তথা বিশ্বাস দূর করা ছিল তহজিব-অল-আখলাখ পত্রিকা প্রকাশের অপর উদ্দেশ্য।
১৮৮১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তহজিব-অল-আখলাধ পত্রিকায় প্রকাশিত অসংখ্য প্রবন্ধ মুসলমান সমাজের চিন্তাচেতনার পরিবর্তনের কাজে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল। ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দের পর এই পত্রিকা আলিগড় ইনস্টিটিউট গেজেট পত্রিকার সঙ্গে মিশে যায়।
২। থিওডোর বেক কে ছিলেন?
থিওডোর বেক (১৮৫৯-১৮৯৯ খ্রি) ছিলেন একজন ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ। স্যার সৈয়দ আহমেদের আমন্ত্রণে তিনি মাত্র ২৪ বছর বয়সে আলিগড় অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজের অধ্যক্ষ পদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আমৃত্যু তিনি অধ্যক্ষ পদে কর্মরত ছিলেন।
থিওডোর বেক:
(i) আলিগড় আন্দোলনে ভূমিকা: ইংরেজি শিক্ষার বিরোধী পশ্চাৎপদ মুসলিম সমাজকে আধুনিকতা ও যুক্তিবাদের পথে চালনা করার জন্য স্যার সৈয়দ আহমেদ খান আলিগড় কলেজকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন, সেই আলিগড় আন্দোলনে স্যার সৈয়দের প্রধান সহযোগী ছিলেন থিওডোর বেক।
(ii) রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা: ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে থিওডোর বেকের উদ্যোগে স্যার সৈয়দ আহমেদ খান কংগ্রেসের বিকল্প সংগঠন হিসেবে ইউনাইটেড ইন্ডিয়ান প্যাট্রিয়টিক অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে মূলত বেকের উদ্যোগেই মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন নামক অপর একটি সংগঠন স্থাপিত হয়।
(iii) পত্রিকা প্রকাশ: থিওডোর বেক সম্পাদিত আলিগড় ইন্সটিটিউট গেজেট নামক পত্রিকায় কংগ্রেস বিদ্বেষ ও হিন্দু বিদ্বেষ প্রকাশিত হয়েছিল, যা পরবর্তীকালে মুসলমানদের মনে অসন্তোষ সৃষ্টি করে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের ভাবনাকে দুর্বল করে দিয়েছিল।
(iv) ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে ভূমিকা: ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ভারতীয় মুসলমানদের জন্য বিশেষ আর্থিক ও রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের কাজেও থিওডোর বেক সৈয়দ আহমেদকে সাহায্য করেন।
(v) সৈয়দ আহমেদের উপর প্রভাব : অনেকে মনে করেন যে, মুসলমান সমাজের সংস্কারক ও শিক্ষাবিদ স্যার সৈয়দ আহমেদ কর্তৃক জাতীয় কংগ্রেসের বিরোধিতা করা এবং কংগ্রেসের সংস্পর্শ থেকে মুসলমানদের দূরে রাখার সিদ্ধান্তে থিওডোর বেকের বিশেষ ভূমিকা ছিল। এমনও বলা হয়ে থাকে, বেকের প্ররোচনাতেই আলিগড় আন্দোলন বিশুদ্ধ সমাজসংস্কার আন্দোলনের পথ থেকে সরে গিয়ে সাম্প্রদায়িক ভেদ-ভাবনা সৃষ্টির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
(vi) সিডন্স ইউনিয়ন ক্লাব এর প্রতিষ্ঠাতা: থিওডোর বেক ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজে সিডন্স ইউনিয়ন ক্লাব (Siddons Union Club)-এর প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ছিলেন। রাজনীতি, মুসলিম সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি ইত্যাদি নানা বিষয়ে এই ক্লাবে আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক চলত। বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেন।
(vii) আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ গ্রহণ: স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের মৃত্যুর পর আলিগড় মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজকে একটি মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করার জন্য থিওডোর বেক সৈয়দ মেমোরিয়াল ফান্ডে অর্থ সংগ্রহ করেন। পরে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে কলেজটি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়।
৩। দ্বিজাতি তত্ত্ব বলতে কী বোঝো?
দ্বিজাতি তত্ত্ব: দ্বিজাতি তত্ত্ব হল একটি রাজনৈতিক মতবাদ, যা ঔপনিবেশিক ভারতের রাজনীতি ও সমাজে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। দ্বিজাতি শব্দের অর্থ হল দুই জাতি। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, ভারতে হিন্দু ও মুসলমান দুটি পৃথক জাতি এবং তাদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বর্তমান। দুই জাতির ভাষা, সংস্কৃতি, সভ্যতা, রাজনৈতিক লক্ষ্য সবকিছুই ভিন্ন।
দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রবক্তা: অনেক ঐতিহাসিকের মতে, সৈয়দ আহমেদ খানের তত্ত্ব থেকে প্রথম দ্বিজাতি তত্ত্বের আভাস মেলে। তবে পরবর্তীকালে মহম্মদ আলি জিন্নাহ-সহ বেশ কয়েকজন নেতা এই তত্ত্বের ব্যাপক প্রচার চালান।।
দ্বিজাতি তত্ত্বের বৈশিষ্ট্য:
(i) ধর্মের অধিক গুরুত্ব : দ্বিজাতি তত্ত্বে ধর্মকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে হিন্দু ও মুসলমানকে জাতিগতভাবে আলাদা বলে বিবেচনা করা হয়।
(ii) রাজনৈতিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা: ঔপনিবেশিক শাসনামলে মুসলমানদের একাংশ মনে করতেন যে তারা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে হিন্দুদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে। তাই তাঁরা রাজনৈতিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয়।
(iii) সহাবস্থান অস্বীকার : এই তত্ত্ব অনুযায়ী, হিন্দু ও মুসলমান কখনোই একই রাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণভাবে বাস করতে পারবে না। তাই উভয় সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রয়োজন।
(iv) পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি: ভারতে দ্বিজাতি তত্ত্বের যে প্রভাব পড়েছিল তার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ভারত বিভাজন ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি।
৪। সিমলা দৌত্য সম্পর্কে টীকা লেখো।
অথবা, ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের সিমলা দৌত্যে মুসলিম নেতাদের দাবিগুলি কী ছিল? এর গুরুত্ব আলোচনা করো।
ভারত-সচিব লর্ড মর্লে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর বাজেট বক্তৃতায় ইঙ্গিত দেন যে, ব্রিটিশ সরকার শীঘ্রই ভারতে প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার চালু করবে। এতে আশঙ্কা প্রকাশ করেন মুসলিম নেতারা। কারণ, তাদের ধারণা ছিল ভারতে নতুন স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরাই কর্তৃত্ব করবে। আসলে হিন্দুরা জাতীয় কংগ্রেসের মাধ্যমে সুসংগঠিত। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের অনুরূপ মুসলমানদের জন্য নিজস্ব একটি রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়।
সিমলা দৌত্য :
প্রেক্ষাপট: মুসলমানদের নিজস্ব রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার দাবি যখন জোরালো হয়ে উঠেছে, সেই সময় আলিগড় কলেজের সচিব মহসিন-উল-মুলক ঢাকার নবাব সলিমউল্লাহ-র সঙ্গে আলোচনা করে বড়োলাট লর্ড মিন্টোর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্যোগ নেন। আলিগড় কলেজের ইংরেজ অধ্যক্ষ মিস্টার আর্চবোল্ড এই বিষয়ে বড়োলাটের সচিব ডানলপ স্মিথের সাহায্য প্রার্থনা করেন। স্মিথের উদ্যোগে লর্ড মিন্টো মুসলমান প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে রাজি হন।
সাক্ষাৎকার: ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ১ অক্টোবর ৩৫ জন সদস্য বিশিষ্ট মুসলিম প্রতিনিধি দল সিমলায় লর্ড মিন্টোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। সদস্যদের প্রায় সবাই ছিলেন আলিগড় কেন্দ্রিক উচ্চবিত্ত তথা উচ্চবর্গের মুসলমান। এই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন আগা খান। এই সাক্ষাৎকার সিমলা দৌত্য (Simla Deputation) নামে খ্যাত।
প্রতিনিধি দলের দাবিসমূহ: মুসলিম প্রতিনিধি দল এই সাক্ষাতে বড়োলাটের হাতে একটি স্মারকলিপি তুলে দেন। এতে বলা হয়, ‘মুসলমানরা একটি স্বতন্ত্র সম্প্রদায়। তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হিন্দুদের রাজনৈতিক স্বার্থ থেকে পৃথক। তাই সরকারি চাকুরি এবং প্রতিনিধিত্বমূলক প্রশাসনিক সংস্থায় সংখ্যালঘু হিসেবে হিন্দুদের সমানুপাতে মুসলমান প্রতিনিধি পাঠানোর দাবি বৈধ।’
এর পাশাপাশি কোনও পরীক্ষা ছাড়া সরকারি চাকুরিতে শিক্ষিত মুসলিমদের উচ্চপদে নিযুক্তি, পৌরসভা, জেলা বোর্ড এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে মুসলিমদের জন্য বেশিসংখ্যক আসন সংরক্ষণ, পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং সামরিক, বেসামরিক ক্ষেত্রে ও হাইকোর্টে অধিকসংখ্যক মুসলিম নিয়োগ করার দাবি তোলা হয়। লর্ড মিন্টো মুসলমান প্রতিনিধিদের কথা শুনে প্রতিশ্রুতি দেন যে, পূর্ববঙ্গীয় মুসলমানদের স্বার্থ বিপন্ন হবে না।
সিমলা দৌত্যের গুরুত্ব: ভারতে মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে সিমলা দৌত্য সফল হয়। মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন, সম্প্রদায় হিসেবে হিন্দুদের সমান প্রশাসনিক সুবিধা লাভ করা ইত্যাদি বিষয়ে বড়োলাটের মৌখিক প্রতিশ্রুতি অবশ্যই নৈতিক ভাবে স্বতন্ত্র মুসলিম রাজনীতিকে শক্তিশালী করে তোলে। অন্যদিকে, ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে খন্ডিত ও দুর্বল করার কাজেও সিমলা দৌত্য দায়ী। ছিল। তাছাড়া, তরুণ প্রজন্মের মুসলিমদের সন্তুষ্ট করা-সেই লক্ষ্যপূরণে সিমলা দৌত্য ব্যর্থ হয়েছিল।
৫। টীকা লেখো: সর্বভারতীয় হিন্দু মহাসভা। অথবা, হিন্দু মহাসভা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।
হিন্দু মহাসভা: বিংশ শতকের সূচনায় হিন্দুদের স্বার্থ সুরক্ষিত করার উদ্দেশ্যে সর্বভারতীয় হিন্দু মহাসভা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
হিন্দু মহাসভা গঠনের প্রেক্ষাপট:
(i) পাঞ্জাব হিন্দুসভা স্থাপন: ১৯০৭/১৯০১ খ্রিস্টাব্দে হিন্দুদের স্বার্থরক্ষার উদ্দেশ্যে স্থাপিত হয় পাঞ্জাব হিন্দুসভা। বিভিন্ন হিন্দু সংস্কারবাদী ও পুনরুজ্জীবনবাদী সংগঠনগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করে হিন্দুদের স্বার্থ সংরক্ষণ করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য
(ii) আম্বালা-র বার্ষিক সম্মেলন: আম্বালাতে অনুষ্ঠিত বার্ষিক সম্মেলনে (১৯১৩ খ্রি.) পাল্লার হিন্দুসভা সিদ্ধান্ত নেয় যে, ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে হরিদ্বার কুম্ভমেলায় সর্বভারতীয় হিন্দু নেতাদের সমাবেশ আহ্বান করে একটি সর্বভারতীয় হিন্দু সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়াস নেওয়া হবে। এই উদ্দেশ্যে গঠিত কমিটি হরিদ্বার, লখনউ, দিল্লি প্রভৃতি স্থানে গিয়ে সর্বভারতীয় সংগঠনের প্রস্তুতি বিষয়ে হিন্দু নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
হিন্দু মহাসভা গঠন: ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে কুম্ভমেলা চলাকালীন হরিদ্বারে সর্বদেশক হিন্দুসভা নামক সর্বভারতীয় সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই সম্মেলনে স্বয়ং গান্ধিজি ও স্বামী শ্রহ্মানন্দ উপস্থিত ছিলেন বলে জানা যায়। সভাপতির ভাষণে রাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী হিন্দুদের মধ্যে ঐক্যবোধ জাগ্রত করার ও সমাজসংস্কারে ব্রতী হওয়ার আহ্বান জানান। শ্রী মদনমোহন মালব্য মূল সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। সর্বদেশক। হিন্দুসভা-র ষষ্ঠ অধিবেশনে এর নতুন নামকরণ। হয়-অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভা (১৯২১ খ্রি)। এর সভাপতি হন মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী।
হিন্দু মহাসভার আদর্শ : ঐক্যবদ্ধ ও স্বশাসিত । ভারতরাষ্ট্র গঠন ছিল এই প্রতিষ্ঠানের আদর্শ। এ ছাড়া এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক সংস্কারমূলক কর্মসূচির বাস্তবায়ন ঘটানো।
হিন্দু মহাসভার বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দ : হিন্দু মহাসভা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মুন্সিরাম (তিনি পরে স্বামী শ্রহ্মানন্দ নামে পরিচিত), ভগবান দাস, রামভূষণ দত্ত, লালা হংসরাজ, তেজবাহাদুর সপ্রু, মোতিলাল ঘোষ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। তবে হিন্দু মহাসভার প্রাণপুরুষ ছিলেন মদনমোহন মালব্য।
হিন্দু মহাসভার কর্মসূচি: হিন্দু মহাসভা লখনউ চুক্তির (১৯১৬ খ্রি.) বিরোধিতা করে। মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। প্রশাসনিক পদে ও আইনসভার সদস্য পদে আরও বেশিসংখ্যক হিন্দুকে নিয়োগের দাবি তোলে। খিলাফৎ ও অসহযোগ আন্দোলনের সময় সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের অবনতি ঘটলে, হিন্দু মহাসভাও সাম্প্রদায়িক স্বার্থ রক্ষার জন্য তৎপর হয়। গয়াতে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে (১৯২২ খ্রি.) হিন্দুত্রাণ কমিটি ও হিন্দুরক্ষা মন্ডল তৈরি করা হয়। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে বেনারসে হিন্দু মহাসভার সম্মেলন আহূত হয়। সম্মেলনের সভাপতি মদনমোহন মালব্য ঘোষণা করেন যে, হিন্দুদের অধঃপতন রোধ করা এবং সম্প্রদায়গতভাবে হিন্দুদের উন্নয়ন ঘটানো এই সভার লক্ষ্য। হিন্দুদের সংগঠিতভাবে আত্মশক্তি অর্জনের জন্য তিনি শরীরচর্চা করতে এবং ক্ষত্রিয়দের মতো সাহস ও বীরত্ব অর্জন করতে পরামর্শ দেন। নন
৬। মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইন সম্পর্কে যা জানো লেখো।
মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইন: ভারতের রাজনীতি যখন বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল, কংগ্রেসের নরমপন্থী ও চরমপন্থী বিরোধ যখন চরমে ঠিক সেই পরিস্থিতিতে ইংরেজ সরকার ভারতীয়দের মধ্যে ব্রিটিশ-বিরোধিতা লক্ষ করে আইনসংস্কারের কথা চিন্তা করে। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে আইনের খসড়া রচিত হয় এবং সেই বছরই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারতীয় পরিষদ আইনটি (Indian Councils Act, 1909) পাস হয়। তৎকালীন ভারত-সচিব লর্ড মর্লে এবং ভাইসরয় লর্ড মিন্টো এই আইন পাসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাই এই আইন মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইন (Morley-Minto Reforms) নামে পরিচিত।
শর্তসমূহ:
(i) কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের গঠন: এই আইনে কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের সদস্যসংখ্যা ১৬ থেকে বাড়িয়ে ৬০ করা হয়। পরবর্তীতে ভারত-সচিব এই সংখ্যাটা ৬৯ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেন। উদ্দেশ্য ছিল, কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে সরকারি সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে সুনিশ্চিত করা। এই আইনে প্রথম যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রস্তাবিত হয়।
(ii) ভোটাধিকার: ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দের আইনে সারা ভারতে একরকম ভোটাধিকার আইন ছিল না। বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন নিয়ম প্রচলিত ছিল। এই আইনে প্রথম সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে নির্বাচন প্রথা চালু হয়। আইনসভার সদস্যরা সাধারণ ভোটদাতাদের ভোটে নির্বাচিত হতেন না। বড়োলাটের আইন পরিষদে জমিদার শ্রেণির কিংবা বণিকসভা-সহ ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষ সদস্যদের নির্বাচন করতেন। তবে মুসলিম প্রার্থীদের বিশেষ সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, লর্ড মিন্টো এই ব্যবস্থা প্রবর্তন করায় তাঁকে সাম্প্রদায়িক ভোটদানের জনক বলা হয়।
(iii) ভারতীয়দের যোগদান : ভারতীয়রা ভাইসরয়ের কার্যনির্বাহী পরিষদে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। সত্যেন্দ্র প্রসন্ন সিনহা প্রথম ভারতীয় আইন সদস্য হিসেবে ভাইসরয়ের কার্যনির্বাহী পরিষদে যোগদান করেন।
(iv) আইন পরিষদের সদস্যদের ক্ষমতা: কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের সদস্যদের বাজেট আলোচনা ও সংশোধনী প্রস্তাবদানের ক্ষমতা দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্যসংখ্যাও এই আইনে বৃদ্ধি করা হয়। এক্ষেত্রে নির্বাচিত সদস্যদের তুলনায় মনোনীত সদস্যদের সংখ্যা বেশি রাখা হবে বলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যদিও বাংলা-সহ কিছু কিছু প্রদেশ এর ব্যতিক্রম ছিল।
মূল্যায়ন : পার্সিভ্যাল স্পিয়ার মর্লে-মিন্টো আইনের প্রশংসা করে বলেছেন যে, ‘ভারতের স্বায়ত্তশাসন লাভের পথে ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দের আইন ছিল একটি প্রধান দিকচিহ্ন বিশেষ।’ এই আইনের দ্বারা অভিজাত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সরকারের আইন রচনার কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। তবে এই আইনে প্রকৃত পার্লামেন্ট বা জনপ্রতিনিধি সভা গঠনের ব্যবস্থা করা হয়নি। তাছাড়া মর্লে-মিন্টো আইনে মুসলমানদের স্বতন্ত্র নির্বাচনের অধিকার দিয়ে দ্বিজাতি তত্ত্ব-কে পরোক্ষভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
৭। সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা বলতে কী বোঝায়? এর মূলনীতিগুলি উল্লেখ করো।
অথবা, টীকা লেখো: সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা।
সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা: ভারতে বসবাসকারী হিন্দুদের সঙ্গে মুসলিম, শিখ, অনুন্নত হিন্দু, ভারতীয় খ্রিস্টান, হরিজন প্রভৃতি সম্প্রদায়ের বিভেদ সৃষ্টির দ্বারা ঐক্যে ফাটল ধরানো এবং ব্রিটিশবিরোধী জাতীয় আন্দোলনকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র্যামসে ম্যাকডোনাল্ড আইনসভায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পৃথক নির্বাচনের যে অধিকার প্রদানের কথা ঘোষণা করেন, সেটি ইতিহাসে সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা (Communal Award) নীতি নামে পরিচিত।
নীতিসমূহ: সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতি-র মূল বক্তব্যগুলি নিম্নরূপ-
(i) স্বার্থ অটুট রাখা: সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতিতে পৃথক নির্বাচন নীতি অনুসরণ করে মুসলমান, শিখ, ভারতীয় খ্রিস্টান, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ও নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণের মাধ্যমে প্রত্যেকের নিজ নিজ সম্প্রদায়ের স্বার্থ অটুট রাখার উদ্যোগ গৃহীত হয়।
(ii) প্রাদেশিক পরিষদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য: বলা হয়, এই বাঁটোয়ারা কেবলমাত্র প্রাদেশিক পরিষদের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
(iii) পৃথক নির্বাচনি ব্যবস্থা ও সর্বজনীন ভোটাধিকার : শ্রমিক, বণিক, শিল্পপতি, জমিদার, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে নির্দিষ্ট আসন ও পৃথক নির্বাচনি এলাকা দান করা হয়। অন্যদিকে, সাধারণ নির্বাচনি এলাকায় সকলের ভোটাধিকার নির্দিষ্ট হয়।
(iv) দলিত হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটাধিকার: তপশিলি হিন্দুরা সংখ্যালঘু বলে ঘোষিত হয় এবং তাদের জন্য আসন সংরক্ষিত হয়।
৮। নিষ্কৃতি দিবস’ বলতে কী বোঝায়?
নিষ্কৃতি দিবস: ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে অধিকাংশ আসনে কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভকরে। মুসলিম লিগ বেশিরভাগ আসনেই পরাজিত হয়। এসময় মুসলিম লিগের সঙ্গে যৌথভাবে মন্ত্রীসভা গঠনে আপত্তি জানিয়ে কংগ্রেস ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ প্রদেশে মন্ত্রীসভা গঠন করে। এই ঘটনা মুসলিম লিগ ও মহম্মদ আলি জিন্নাহকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এরূপ পরিস্থিতিতে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে, ব্রিটিশ সরকার ভারতের নির্বাচিত আইনসভাগুলির সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই ভারতবর্ষকে যুদ্ধে যুক্ত করলে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে কংগ্রেসের মতপার্থক্য দেখা দেয়।
কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া: ইংরেজদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সাহায্য করার পরিবর্তে কংগ্রেস যুদ্ধ শেষে ভারতের স্বাধীনতা দাবি করে। কিন্তু সেই দাবি না মানা হলে কংগ্রেস ক্ষুব্ধ হয় এবং প্রাদেশিক কংগ্রেস মন্ত্রীসভাগুলি পদত্যাগ করে।
বড়োলাট লিনলিথগোর বক্তব্য: বড়োলাট লিনলিথগো মুসলমানদের আশ্বস্ত করে জানান যে, তাদের সম্মতি ছাড়া কোনও সাংবিধানিক পরিবর্তন আনা হবে না। এই ঘটনাকে জিন্নাহ মুসলমানদের বিজয় হিসেবে গ্রহণ করেন।
মুসলিম লিগের প্রতিক্রিয়া: এই ঘটনার প্রেক্ষিতে মহম্মদ আলি জিন্নাহ ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ২২ ডিসেম্বর মুক্তি দিবস বা নিষ্কৃতি দিবস পালন করার আহ্বান জানান। এই সময় থেকেই জিন্নাহ দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রচারে জোর দেন।
৯। মুসলিম লিগ ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে কী দাবি করেছিল?
১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ২৩ মার্চ মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশন ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় কংগ্রেস যেমন লাহোর অধিবেশনে (১৯২৯ খ্রি.) পূর্ণ স্বরাজ প্রস্তাব পাস করে, তেমনই মুসলিম লিগ এই অধিবেশনে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব পাস করে। একে লাহোর প্রস্তাব বলা হয়।
লাহোর প্রস্তাব : মহম্মদ আলি জিন্নাহর সভাপতিত্বে এই অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। প্রস্তাবটির খসড়া প্রস্তুত করেন পাঞ্জাবের নেতা সিকান্দার হায়াৎ খান এবং তা উত্থাপন করেন বাংলার প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক। প্রস্তাবে বলা হয়, ভৌগোলিক ও স্থানগত পুনর্বিন্যাস করে মুসলিম প্রদেশগুলির পুনর্গঠন করতে হবে। এইগুলি হবে স্বশাসিত ও সার্বভৌম। জিন্নাহ দ্বিজাতি তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন এবং মুসলিমদের আলাদা রাষ্ট্রের দাবি তোলেন।
লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে মুসলিম লিগের দাবি : ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশগুলির সমন্বয়ে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ গঠন করার দাবি করে। মুসলমানদের ‘সংখ্যালঘু’ অবস্থার পরিবর্তে একটি ‘জাতি’-তে পরিণত করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এই প্রস্তাবে পাকিস্তান শব্দের কোনও উল্লেখ ছিল না। তবুও পরবর্তীকালে পত্রপত্রিকাগুলিতে একে পাকিস্তান প্রস্তাব নামে প্রচার করা হয়।
১০। ১১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশনের গুরুত্ব কী ছিল?
১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ২২ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশন ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই অধিবেশনেই ২৩ মার্চ ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হয়, যা পরবর্তীকালে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পাকিস্তান প্রস্তাব হিসেবেও খ্যাতি লাভ করে। উল্লেখ্য যে, প্রস্তাবটি খসড়া প্রস্তুত করেন পাঞ্জাবের নেতা সিকান্দার হায়াৎ খান এবং তা উত্থাপন করেন বাংলার প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক।
মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশনের গুরুত্ব:
(i) নতুন রাষ্ট্র গঠনের দাবি: মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশনে বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশগুলির সমন্বয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ গঠন করার প্রস্তাব পেশ করেন। মূলত এই অধিবেশনেই উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের দাবি করা হয়েছিল।
(ii) পৃথক জাতি হিসেবে স্বীকৃতি: এই অধিবেশনে মুসলমানদের সংখ্যালঘু অবস্থার পরিবর্তে একটি জাতিতে পরিণত করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়। মুসলিম লিগ জানিয়ে দেয় মুসলমানরা হিন্দুদের থেকে ভিন্ন জাতি এবং তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্ম রয়েছে।
(iii) মুসলিম লিগের রাজনৈতিক অবস্থান: মহম্মদ আলি জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লিগের রাজনৈতিক কৌশল নতুন দিকনির্দেশনা লাভ করেছিল। লিগের রাজনৈতিক কর্মসূচি সুনির্দিষ্ট হয়। এই অধিবেশনের পরবর্তীকালে জিন্নাহ পৃথক রাষ্ট্রের দাবিতে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে।
(iv) লিগের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি: লাহোর অধিবেশনে মুসলিম লিগের প্রতিনিধিরা হাজার হাজার মুসলিমের সমর্থন লাভ করেছিলেন। এর পরবর্তীকালে মুসলমানদের বৃহৎ অংশ মুসলিম লিগের পাশে এসে দাঁড়ায়।
(v) দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি: পৃথক রাষ্ট্রের দাবিকে কেন্দ্র করে সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পেয়েছিল, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান নামক নতুন রাষ্ট্র গঠন।
(vi) স্বাধীনতা আন্দোলনে নতুন গতি: লাহোর অধিবেশন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত করেছিল একটি নতুন মাত্রা। ক্রমেই ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারে মুসলিম লিগের মতামতকে উপেক্ষা করলে পরবর্তীকালে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
SOURCE-WBS

©Kamaleshforeducation.in (2023)


