

একটি গ্রামের আত্মকথা
বাংলা প্রবন্ধ রচনা
(Ekti Gramer Atmakatha)
Published on:
একটি গ্রামের আত্মকথা – বাংলা প্রবন্ধ রচনা (Ekti Gramer Atmakatha) | মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই যারা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছ, তাদের জন্য এই প্রবন্ধটি মনোযোগ দিয়ে পড়া এবং প্রয়োজনে সংগ্রহ করে রাখো কাজে দেবে।
একটি গ্রাম সময়ের স্রোতে বদলে যাওয়া সমাজব্যবস্থা, কৃষকের হাসি-কান্না, উৎসব-পার্বণের ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার স্পর্শে রূপান্তরিত গ্রামীণ জীবনের বাস্তব চিত্র — সবই এই আত্মকথার মধ্যে প্রাণ পায়।
◆ বিষয়বস্তু ◆
1 প্রবন্ধ রচনা: একটি গ্রামের আত্মকথা
1.1 ভূমিকা:
1.2 জন্ম ও শৈশব:
1.3 সমতলে প্রবেশ ও যৌবন:
1.4 মানবসভ্যতার সাথে সম্পর্ক:
1.5 দুঃখ ও আক্ষেপ:
1.6 উপসংহার:

প্রবন্ধ রচনা: একটি গ্রামের আত্মকথা
“আমাদের ছোট গাঁ মায়ের সমান,
আলো দিয়ে, বায়ু দিয়ে বাঁচাইছে প্রাণ।” — বন্দে আলী মিয়া
ভূমিকা:
আমি একটি গ্রাম, এক অজ্ঞাত কুলশীল গ্রাম। ভারতবর্ষের বুকে আমার মতো এমন লক্ষ লক্ষ গ্রাম ছড়িয়ে রয়েছে, কিন্তু আমি পড়ে আছি এই রূপসী বাংলার কোনো এক নিভৃত কোণে, যেখানে অবহেলা ও দারিদ্র্য আমার নিত্যসঙ্গী। অভাব-অনটন আর রোগশোক আজও আমার পিছু ছাড়েনি। একবিংশ শতকের এই উন্নতিশীল ও আধুনিক ভারতের আমি এক ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একসময় আমাকে নিয়ে তাঁর কবিতায় এক মদির ছবি এঁকেছিলেন —
“তুমি যাবে ভাই – যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়,
গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়।”
— জসীমউদ্দীন
কিন্তু আজ এই খণ্ডিত বাংলায় আমার মতো ছোটো গ্রামের চেহারার সঙ্গে কবির দেখা সেই গ্রামের আর কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।
জন্ম ও শৈশব:
আমার জন্ম হয়েছিল অনেক দূরে, এক দুর্গম পাহাড়ের বরফগলা জল থেকে। পাহাড়ের চূড়ায় যখন সূর্যের প্রথম আলো পড়ত, তখন আমি আনন্দে চিকচিক করে উঠতাম। শৈশবে আমি ছিলাম দুরন্ত, চঞ্চল। পাহাড়ের বুক চিরে, পাথর ডিঙিয়ে, ঝর্ণার মতো লাফিয়ে লাফিয়ে নিচে নামাই ছিল আমার খেলা। তখন আমার গতি ছিল প্রবল, আর জল ছিল স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ।
“ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রামগুলি।” — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সমতলে প্রবেশ ও যৌবন:
পাহাড়ের গণ্ডি পেরিয়ে যেদিন আমি প্রথম সমতলে পা রাখলাম, সেদিন আমার রূপ গেল বদলে। আমার দুরন্তপনা কমল, কিন্তু আমি হলাম আরও প্রশস্ত, আরও গভীর। দু’পাশের মাঠ-ঘাট, প্রান্তর আমার জলে তৃষ্ণা মেটাল। আমার দু’কূলে গড়ে উঠল মানুষের বসতি, গ্রাম, নগর আর সভ্যতা। কৃষকেরা আমার জল দিয়ে মাঠে সোনার ফসল ফলালো। আমি হয়ে উঠলাম তাদের কাছে মায়ের মতো।
মানবসভ্যতার সাথে সম্পর্ক:
মানুষের সাথে আমার সম্পর্ক বড়ই নিবিড়। জেলেরা আমার বুকে জাল ফেলে মাছ ধরে, মাঝিরা নৌকায় পাল তুলে ভাটিয়ালি গান গায়। কত মানুষ আমার জলে স্নান করে পুণ্য অর্জন করে বলে বিশ্বাস করে। আমার দু’পাশেই গড়ে উঠেছে কত বড় বড় শহর, বন্দর ও তীর্থস্থান। মানুষের সভ্যতা আমার ওপর নির্ভরশীল, আর এই ভেবে আমার খুব গর্ব হয়।
“গ্রামছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ আমার মন ভুলায় রে।” — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুঃখ ও আক্ষেপ:
কিন্তু আমার বুকে আজ অনেক কষ্টও জমা হয়ে আছে। মানুষ যাদের আমি মায়ের মতো লালনপালন করলাম, তারাই আজ আমাকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে। বড় বড় শহরের কলকারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া, রাসায়নিক বর্জ্য, প্লাস্টিক আর আবর্জনা দিনের পর দিন আমার বুকে ফেলা হচ্ছে। আমার সেই স্বচ্ছ জল আজ দূষিত, বিষাক্ত হয়ে গেছে। মানুষের এই অপরিসীম লোভ আর অবহেলায় আমি আজ সত্যিই বড্ড ক্লান্ত আর ব্যথিত।
“আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে—এই বাংলায় হয়তো মানুষ নয়—হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে…” — জীবনানন্দ দাশ

উপসংহার:
আমি জানি, পরিবর্তনই পৃথিবীর শাশ্বত নিয়ম। আমি আধুনিকতাকে অস্বীকার করি না, শহরের সাথে পাল্লা দিয়ে উন্নতি হোক—তাও আমি চাই। কিন্তু আমি চাই না, আমার সেই আদি অকৃত্রিম রূপটা চিরতরে হারিয়ে যাক। আমার বুকের মানুষগুলো আবার শিকড়ের টানে ফিরে আসুক, আমার হারিয়ে যাওয়া সবুজ আবার নতুন করে বেঁচে উঠুক — এই আশাতেই আমি আজও প্রহর গুনছি।
“ফিরে চল মাটির টানে, যে মাটি আঁচল পেতে চেয়ে আছে মুখের পানে।” — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
SOURCE-EDT
|
|



