কর্মরত প্রাইমারী ও আপার প্রাইমারী টিচারদের TET দিতে হবে। এমন আশঙ্কা ঘনিয়েছে। কালপ্রিট কে ? সত্যিই কি বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের আমলে ammendment হওয়া RTE Ammendment Act , 2017 এর জন্য দায়ী ? সত্যিই দায় কার ? আসুন দেখি।
——————————————————
১) RTE Act, 2009 এ কর্মরতদের TET নিয়ে কী বলেছে ?
উত্তর – ক) RTE Act, 2009 এর ধারা 23(1) বলেছিল যে কেন্দ্রীয় সরকার গঠিত Academic Authority (পড়ুন NCTE) নির্ধারিত মিনিমাম কোয়ালিফিকেশন না থাকলে কেউ প্রাইমারী ও আপার প্রাইমারী টিচার হিসাবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাবেন না।
খ ) RTE Act 2009 এর ধারা 23(2) বলছে যে RTE Act এর লাগু হওয়ার দিন যদি কোনো রাজ্যের কর্মরত টিচারদের RTE Act, 2009 এর ধারা 23(1) এ উল্লেখিত মিনিমাম কোয়ালিফিকেশন (পরবর্তী NCTE নোটিফিকেশন অনুযায়ী এটাই TET) না থাকে তাহলে পাঁচ বছরের মধ্যে তাদের সেটি অর্জন করতে হবে।
গ) তাই এই অ্যাক্ট লাগু হওয়ার পর যখনই NCTE তার 23/08/2010 এর নোটিফিকেশনে TET কে বাধ্যতামূলক করে দিল সেদিন থেকেই এটা সমস্ত কর্মরত প্রাইমারী/ আপার প্রাইমারী টিচারদের জন্যও বাধ্যতামূলক হয়ে গেল।
ঘ) এই মিনিমাম কোয়ালিফিকেশন অর্জন করতে হতো অর্থাৎ টেট পাস করতে হতো পাঁচ বছরের মধ্যে অর্থাৎ 2015 সালের মধ্যে। যদিও NCTE এর যে নোটিফিকেশনে ( 23/08/2010 তারিখের) TET বাধ্যতামূলক করা হলো তাতেই বলা হলো যে সেই নোটিফিকেশন প্রকাশের আগে যাদের নিয়োগ তাদের ক্ষেত্রে টেট বাধ্যতামূলক হবে না। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট আশ্চর্যজনক ভাবে নোটিফিকেশনের এই কথাগুলিকে পুরো অগ্রাহ্য করে শুধু RTE Act এর উপরে উল্লেখিত ধারা 23 অনুযায়ী রায় দিয়ে দিল যে সমস্ত কর্মরত প্রাইমারী ও আপার প্রাইমারী টিচারদের টেট দিতে হবে সে তাঁদের নিয়োগ যে বছরেই হোক না কেন। আসলে সুপ্রিম কোর্ট RTE অ্যাক্ট দেখেছে। নোটিফিকেশন দেখেনি। কারন কোর্টের কাছে একটা নোটিফিকেশনের চেয়ে একটা অ্যাক্টের গুরুত্ব অনেক বেশি।
ঙ) সুতরাং এটা বলাই যায় যে এই সমস্যার মূলে 2009 এর RTE Act এর ধারা 23।
২) প্রশ্ন – তাহলে অনেকে যে বলছেন যত সমস্যার মূলে নাকি সংশোধিত RTE Act, 2017 ?
উত্তর – এটা যাঁরা বলছেন ঠিক বলছেন না। 2017 এর সংশোধনীতে কেবল কর্মরত টিচারদের বাধ্যতামূলক কোয়ালিফিকেশন অর্জন ( অর্থাৎ TET পাস করার ) সময়সীমা যেটা 2015 সালে শেষ হয়ে গিয়েছিল সেটাকে 01/04/2015 থেকে আরো চার বছরের জন্য বাড়িয়েছিল। নতুন করে টেট বাধ্যতামূলক করেনি।
৩) প্রশ্ন- তাহলে RTE Act 2017 দিয়ে নতুন কী করল ?
উত্তর – RTE Ammendment mmendment Act, 2017 নতুন কিছুই করেনি শুধু মূল RTE Act, 2009 এর ধারা 23 তে মিনিমাম কোয়ালিফিকেশন অর্জন করার জন্য পাঁচ বছরের যে সময় দিয়েছিল সেটাকে সংশোধন করে ঐ সময় সীমা আরো চার বছর এক্সটেণ্ড করে দিল মাত্র।
আসুন দেখি ধারা (23) টি RTE Act, 2009 তে কেমন ছিল আর সংশোধিত RTE Act, 2017 তে কেমন হলো –
RTE Act,2009 এর ধারা 23(2) তে বলেছিল –
“Provided a teacher who at the commencement of this act , does not possess minimum qualification as laid down under sub section (1) shall acquire such minimum qualification as may be specified in that notification”
RTE সংশোধিত Act, 2017 তে বলা হলো RTE Act, 2009 এর ধারা 23 এর উপরোক্ত কথাগুলির পরে নিম্নলিখিত কথাগুলি যোগ করতে হবে –
” Provided further that every teacher appointed or in position as on the 31st March,2015, who does not possess minimum qualification as laid down under sub section 1, shall acquire such minimum qualification within a period of four years from the date of commencement of the RTE ( Ammendment) Act 2017″
সুতরাং এটা পরিষ্কার যে RTE Ammendment Act,2017 নতুন কিছু নীতি নিয়ে এসে শিক্ষকদের উপর টেট চাপিয়ে দেয়নি। সেটা 2009 এর মূল অ্যাক্ট থেকেই চেপে ছিল। 2017 এর Ammendment বরং ছাড়ের সময়সীমা আরো কিছুটা বৃদ্ধি করে সাময়িক রিলিফ দিয়েছিল মাত্র। তাই এই দুর্দশার জন্য RTE Ammendment Act, 2017 কে দায়ী করা অহেতুক ও অপ্রয়োজনীয়।
৪) প্রশ্ন – তাহলে কর্মরত টিচারদের হঠাৎ করে এই দুর্দশার মধ্যে ফেলার দায় কার ?
উত্তর – টিচারদের এই উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলার দায় নিম্নলিখিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলির –
ক) RTE ACT, 2009 যে সরকারের আমলে তৈরি হয়েছিল তাঁদের দায় —
নিঃসন্দেহে তাঁরা এই আইনে অনেক ভালো ভালো বিষয় এনেছেন শিক্ষার্থীদের জন্য এবং শিক্ষা পরিকাঠামোর উন্নয়নের জন্য। কিন্তু শিক্ষক শিক্ষিকাদের পেশাগত নিরাপত্তা বা উন্নতি বিধানের জন্য এই অ্যাক্ট নীরব থেকেছে। টিচারদের পেশাগত কোনো বিষয়কেই এই আইন সুনিশ্চিত করেনি। টিচারদের বেতন, প্রমোশন ইত্যাদির ব্যাপারে কেবল বলে গেছে Appropriate Government অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট রাজ্যের রাজ্য সরকার যেমন বুঝবে তেমন করবে। অর্থাৎ শিক্ষকদের ভালোর ব্যাপারটা সবটাই ঠেলেছে রাজ্যের ঘাড়ে। কিন্তু টিচারদের বাঁশ দেওয়ার দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে এই অ্যাক্ট। সে TET ই হোক বা টিচিং Hours ই হোক বা প্রাইভেট টিউশন হোক বা শিক্ষার্থীদের দৈহিক শাস্তি নিষিদ্ধকরণই হোক। প্রশ্ন উঠবেই যে RTE Act, 2009 কেন এরকম নিয়ম করলো যেখানে টিচাররা যে কোয়ালিফিকেশনে চাকরি পেয়েছেন সেই চাকরি রক্ষা করতে তাঁদের নির্দিষ্ট সময় সীমার মধ্যে সেই কোয়ালিফিকেশনের বাইরে বিশেষ কোয়ালিফিকেশন অর্জন করতে হবে ? দেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষিক শিক্ষিকাকে বিপদে ফেলে কেন আইনে এইভাবে রেট্রসপেকটিভ এফেক্ট দেওয়া হয়েছিল ? এই প্রশ্নগুলি উঠবেই।
খ) বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের দায় —
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর RTE Ammendment Act, 2017 এর মাধ্যমে টাইম extend করে শুধুমাত্র ক্ষতে মলম লাগিয়েছে। আইন সংশোধন করে অথবা পার্মানেন্ট সমাধানের ব্যবস্থা করেনি। সম্প্রতি এই সরকারের শিক্ষামন্ত্রী আবার এক হাস্যকর দাবি জানিয়ে বলেছেন যে পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তন করলে তবেই তিনি সারা দেশের টিচারদের এই বিপদ থেকে বাঁচাবেন। পশ্চিমবঙ্গের জন্য সারা দেশের টিচাররা কেন ভুগবে সেটাও বোঝা গেল না। আসলে বর্তমানে অনেক কিছুই বোধের বাইরে থেকে যাচ্ছে। এটাও তেমনই একটা।
গ) সুপ্রিম কোর্টের দায় –
সুপ্রিমকোর্ট RTE Act এর একটা প্রভিশনে আটকে থেকে রায় দিল। অথচ ঐ অ্যাক্টেরই প্রভিশন দ্বারা গঠিত অ্যাকাডেমিক অথরিটি NCTE তার 2010 এর যে নোটিফিকেশনে TET কে বাধ্যতামূলক করল তাতেই পরিষ্কার করে বলে দিয়েছিল যে সেই নোটিফিকেশন প্রকাশের আগে যাদের নিয়োগ তাদের ক্ষেত্রে টেট বাধ্যতামূলক হবে না। কিন্তু সুপ্রিমকোর্ট সেটাকে ইগনোর করল। কেন করল সেই প্রশ্নের উত্তর অজানা।
ঘ) বর্তমান রাজ্য সরকার গুলির দায় –
রাজ্য সরকারের প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এই ভুক্তভোগী টিচাররা। তাঁদের চাকরির নিরাপত্তার দায়িত্বও রাজ্য সরকারের। যখনই এরকম একটা আইন এল তখন থেকেই সতর্ক হওয়া দরকার ছিল সরকারের। যেহেতু উক্ত নোটিফিকেশন অনুযায়ী টেট যতবার খুশি নেওয়া যায় এবং কর্মরত শিক্ষকদের জন্য আলাদা করে টেট নিতেও বাধা নেই। তাই এতদিন চাইলে সব টিচারকে টেট পাস করিয়ে নেওয়া যেত। সব জায়গায় খেলা হয়। এখানে একটু ছোট্ট করে খেলা করলেই তো সবাই টেট কোয়ালিফায়েড হয়ে যেত এতদিনে। কিন্তু সেই সদিচ্ছা রাজ্যের পক্ষ থেকে দেখা যায়নি। বলা যেতে পারে এরকম সংকট আসতে পারে তা তাঁরা বুঝতেই পারেননি। অথবা বোঝার চেষ্টা করেননি।
ঙ) কর্মরত টিচারদের দায় –
টিচাররা নিজেরা যতদিন না পর্যন্ত নিজেদের চাকরি নিয়ে সচেতন হবেন ততদিন কেউ তাঁদের রক্ষা করতে পারবে না। নিজেরা সর্বদাই নিজেদের মধ্যে বিবাদ ও বিভেদ লাগিয়ে রাখলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। অনেক আগে থেকেই এই অ্যাক্টের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করার দরকার ছিল। সেটা তাঁরা করেননি। এখন এই দুর্ভোগের দায় তাঁদের নিতেই হবে।
৫) প্রশ্ন – তাহলে টিচাররা এখন কী করবে ? টেটের বই নিয়ে পড়তে বসে যাবে না হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসবে ?
উত্তর – প্রথমেই বলে রাখি এখনই উতলা হওয়ার কিছু নেই। বারবার বলেছি কেসটা সর্বভারতীয়। শুধু এই রাজ্য রিলেটেড হলে গভীর চিন্তার বিষয় ছিল। কিন্তু এটার সঙ্গে সমগ্র দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন জীবিকা জড়িত। তাই একটা সমাধান সূত্র বেরোবেই। আমি এখনও দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি কর্মরতদের টেট দিতে হবে না। দিতে হলেও ব্যাপারটা শুধুমাত্র একটা ফর্মালিটি হবে। সবাই উতরে যাবেন। বেশ কিছু রাজ্য শুধুমাত্র কর্মরত শিক্ষকদের জন্য আলাদা করে টেট নিচ্ছে। উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার। তাই ভয় পাওয়ার কিছু নেই। শুধু মনে রাখুন দেশ ব্যাপী লক্ষ লক্ষ টিচারকে চাকরি থেকে বের করে একসঙ্গে অবসরকালীন সুযোগ সুবিধা প্রদান করা প্রায় অসম্ভব। স্কুলগুলোর পরিকাঠামো শেষ হয়ে যাবে। শিক্ষাক্ষেত্রে এত বড় বিশৃঙ্খলা হতে দেবে না। তবু যদি কেউ টেট এর প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন তাঁকে আমি নিরুৎসাহিত করবো না। আপাতত এখনই উৎসাহিতও করবো না। –