প্রথম পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন
দশম শ্রেণি
বিষয়- ইতিহাস

প্রথম ইউনিট টেস্ট-সেট-১
সময় : ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট                   পূর্ণমান : ৪০

 

বিভাগ – ক

১। সঠিক উত্তরটি নির্বাচন করো : ১x১০=১০

১.১ ভারতে নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চা শুরু করেন—
(ক) রমেশচন্দ্র মজুমদার (খ) যদুনাথ সরকার
(গ) বোরিয়া মজুমদার (ঘ) রণজিৎ গুহ

উত্তরঃ (ঘ) রণজিৎ গুহ

১.২ ‘বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধ মালা’ রচনা করেন—
(ক) অক্ষয়কুমার মৈত্র (খ) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(গ) অশোক মিত্র (ঘ) বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়

উত্তরঃ (খ) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

১.৩ ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন—
(ক) দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ (খ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
(গ) উমেশচন্দ্ৰ দত্ত (ঘ) হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

উত্তরঃ (খ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

১.৪ অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন—
(ক) নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী (খ) ব্রাহ্মসমাজ
(গ) প্রার্থনা সমাজ (ঘ) স্বামী বিবেকানন্দ

উত্তরঃ (ক) নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী

১.৫ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস চ্যান্সেলার ছিলেন—
(ক) উইলিয়াম কোলভিল
(খ) স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
(গ) স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
(ঘ) ডেভিড হেয়ার

উত্তরঃ (ক) উইলিয়াম কোলভিল

১.৬ হিন্দু কলেজ কত খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ?
(ক) ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে (খ) ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে
(গ) ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে (ঘ) ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে

উত্তরঃ (ক) ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে

১.৭ বারাসত বিদ্রোহের নেতা ছিলেন—
(ক) দুদুমিঞা (খ) তিতুমীর
(গ) বিরসা মুন্ডা (ঘ) রামরতন মল্লিক

উত্তরঃ (খ) তিতুমীর

১.৮ চূয়াড় বিদ্রোহের নেতা ছিলেন—
(ক) নুরুলউদ্দিন (খ) সিধু (গ) মজনু শাহ (ঘ) দুর্জন সিং

উত্তরঃ (ঘ) দুর্জন সিং

১.৯ কোন্‌ বিদ্ৰোহ ‘উলগুলান’ নামে পরিচিত ?
(ক) মুন্ডা বিদ্রোহ (খ) কোল বিদ্রোহ
(গ) সাঁওতাল বিদ্রোহ (ঘ) ভীল বিদ্রোহ

উত্তরঃ (ক) মুন্ডা বিদ্রোহ।

১.১০’বাংলার নানাসাহেব’ বলা হয়—
(ক) রফিক মণ্ডলকে
(খ) রামরতন মল্লিককে
(গ) বিচরণ বিশ্বাসকে
(ঘ) দিগম্বর বিশ্বাসকে

উত্তরঃ (খ) রামরতন মল্লিককে।

বিভাগ – ‘খ’

২। নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির নির্দেশ মতো উত্তর দাও : ১×৬=৬

২.১ পূর্ণবাক্যে উত্তর দাও : ১×২=২

২.১.১ কোন বিদ্রোহের পটভূমিতে বঙ্কিমচন্দ্ৰ ‘আনন্দমঠ উপন্যাসটি রচনা করেন ?

উত্তরঃ সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহের পটভূমিতে বঙ্কিমচন্দ্ৰ ‘আনন্দমঠ উপন্যাসটি রচনা করেন 

২.১.২ ‘হুতোম পেঁচা’ কার ছদ্মনাম ?

উত্তরঃ কালীপ্রসন্ন সিংহের ছদ্মনাম ‘হুতোম পেঁচা’

২.২ ঠিক বা ভুল নির্ণয় করো : ১×২=২

২.২.১ ‘কথাকলি’ অসমের নৃত্যশৈলী।

উত্তরঃ মিথ্যা।

২.২.২ বিপিনচন্দ্ৰ পালের আত্মজীবনীর নাম ‘সত্তর’ বৎসর।

উত্তরঃ সত্য।

২.৩ নীচের বিবৃতিগুলির সঠিক ব্যাখ্যা নির্বাচন করো : ১×২=২

২.৩.১ বিবৃতি : তিতুমীরের আন্দোলনকে ‘বারাসাত বিদ্ৰোহ’বলা হয়।
ব্যাখ্যা ১: তিতুমীর ছিলেন বারাসাতের বাসিন্দা।
ব্যাখ্যা ২ : বারাসাতের দরিদ্র জনগণের স্বার্থেই তিতুমীরের আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল।
ব্যাখ্যা ৩: তিতুমীরের আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র ছিল বারাসাত মহকুমার নারকেলবেড়িয়া।

উত্তরঃ ব্যাখ্যা ৩: তিতুমীরের আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র ছিল বারাসাত মহকুমার নারকেলবেড়িয়া।

২.৩.২ বিবৃতি : ইংরেজরা হরিশচন্দ্র সম্পাদিত ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকার বিরোধী ছিল।
ব্যাখ্যা ১: ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকা বাংলার জনগণে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে উৎসাহিত করত।
ব্যাখ্যা ২: এই পত্রিকা পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের বিরোধিতা করেছিল।
ব্যাখ্যা ৩: এই পত্রিকা সাঁওতাল বিদ্রোহ ও নীল বিদ্রোহ কে সমর্থন করেছিল।

উত্তরঃ ব্যাখ্যা ৩: এই পত্রিকা সাঁওতাল বিদ্রোহ ও নীল বিদ্রোহ কে সমর্থন করেছিল।

বিভাগ- ‘গ’

৩। ২-৩টি বাক্যে উত্তর দাও (যে-কোনো ৪টি) : ২x৪=৮

৩.১ চিপকো আন্দোলন কী ?

উত্তরঃ ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে উত্তরাখণ্ডে এই আন্দোলন শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দি চিপকো শব্দের অর্থ আলিঙ্গন করা। গাছকে জড়িয়ে ধরে ছিল বলে এই আন্দোলনের নাম চিপকো।

৩.২ ‘উডের ডেসপ্যাচ’ কী ?

উত্তরঃ লর্ড হার্ডিঞ্জ ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারের জন্য ১৮৪৪ সালে ঘোষণা করেন যে, সরকারি চাকরিতে ইংরেজি ভাষা জানা ব্যক্তিদের অগ্রাধিকারৎদেওয়া হবে। এই কাজকে আরও উৎসাহিত করার জন্য ১৮৫৪ সালে কোম্পানির বোর্ড অফ কন্ট্রোলের সভাপতি চার্লস উড একটি নির্দেশনামা প্রকাশ করেন। এই নির্দেশনামা ‘উডের ডেসপ্যাস’ নামে পরিচিত।

৩.৩ নব্যবঙ্গ কাদের বলা হয় ?

উত্তরঃ ডিরােজিও ও তাঁর অনুগামীদের নব্যবঙ্গ’ বা ইয়ং বেঙ্গল বলা হয়।

৩.৪ দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি প্রথা কী ?

উত্তরঃ দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি গড়ে তোলা হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তা ও শাসন ব্যবস্থার উন্নতির জন্য। এই এজেন্সি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল সীমান্ত অঞ্চলের উপজাতি জনগোষ্ঠীর সাথে শান্তি স্থাপন এবং ব্রিটিশ শাসনের অধীনে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা

৩.৫ সাঁওতাল বিদ্রোহের দুজন নেতার নাম লেখো।

 

বিভাগ – ‘ঘ’

৪। ৭-৮টি বাক্যে বিশ্লেষণমূলক উত্তর দাও (যে-কোনো ২টি) : ৪x২=৮

৪.১ আধুনিক যুগের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে সরকারি নথিপত্রের গুরুত্ব আলোচনা করো।

উত্তরঃ আধুনিক ভারতের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সরকারি নথিপত্র। এই সরকারি নথিপত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল সরকারি প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বিভিন্ন পদাধিকারী যেমন পুলিশ, গোয়েন্দা বা সরকারি আধিকারিকদের রিপোর্ট, প্রতিবেদন, বিবরণ ও চিঠিপত্র ইত্যাদি।

∆ সরকারি নথিপত্রের গুরুত্ব—

(১) সরকারি প্রতিবেদন: সরকারের আধিকারি, গুরুত্বপূর্ণ কর্মচারী, পুলিশ বা গোয়েন্দা, প্রভৃতিরা বিভিন্ন ঘটনার প্রতিবেদন পাঠাতো সরকারের কাছে। এই প্রতিবেদনগুলি থেকে ওই সময়ের বিভিন্ন আন্দোলন বা গুপ্তবিপ্লবী কার্যকলাপ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায়।

(২) বিশেষ কমিশনের প্রতিবেদন :সরকার বিশেষ বিশেষ সমস্যার জন্য কমিশন গঠন করতো এবং সেই কমিশন সরকারকে রিপোর্ট জমা দিত। এই রিপোর্টেগুলো থেকেও বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়। যেমন, সাইমন কমিশনের প্রতিবেদন থেকে সমকালীন শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উপাদান সংগ্রহ করা যায়। তাই এই প্রতিবেদনগুলিও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

(৩) চিঠিপত্রের আদান-প্রদান : সরকারি ব্যবস্থায় চিঠিপত্র আদান-প্রদান করা একটি স্বাভাবিক ঘটনা। বিশেষ করে প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় শাসনকর্তাদের চিঠিপত্রের ব্যাপক আদান-প্রদান ঘটত। যেমন, বাঙালিদের রাজনৈতিক ঐক্য ভাঙার জন্য লর্ড কার্জন যে চক্রান্ত করেছিলেন তা সরকারি চিঠিপত্র থেকে জানা যায়।

(৪) সরকারি কর্মীর বিবরণ : ব্রিটিশ সরকারের কর্মচারীরা অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা নিজের চোখে দেখেছেন এবং তাদের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করে গেছেন। এক্ষেত্রে ফরেস্টের বিবরণ থেকে সিপাহী বিদ্রোহ এবং লর্ড কার্জনের স্বরাষ্ট্রসচিব হার্বাট রিজলের ব্যক্তিগত দিনলিপি থেকে ব্রিটিশ আমলের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায়।

মূল্যায়ন : তবে সরকারি নথিপত্র থেকে ইতিহাস রচনা করতে গেলেও ও গবেষকদের সর্তকতা অবলম্বন করতে হয়। কারণ পুলিশ গোয়েন্দা ও সরকারি আধিকারিকদের রিপোর্ট অনেক ক্ষেত্রে ভুল ও বিকৃত থাকে। তবে এইসব তথ্যকে অন্য তথ্যের সঙ্গে যাচাই করে ইতিহাস রচনা করলে প্রকৃত ইতিহাস রচনা করা সম্ভব।

৪.২ নারীশিক্ষা বিস্তারে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ভূমি সংক্ষেপে আলোচনা করো।

উত্তরঃনারী শিক্ষা প্রসারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের (১৮২০-১৮৯১) ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নারী শিক্ষার জন্য কলকাতা সহ বিভিন্ন স্থানে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন, যা নারী শিক্ষার পথ খুলে দেয়। তিনি বিধবা বিবাহ ও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন।

বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন : ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কলকাতা সহ বিভিন্ন স্থানে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন, যা নারী শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিধবা বিবাহ ও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে : তিনি বিধবা বিবাহ ও বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং এর জন্য আন্দোলনও করেছেন।

নারী শিক্ষা ভান্ডার: তিনি নারী শিক্ষার প্রসারে সহায়তা করার জন্য “নারী শিক্ষা ভান্ডার” নামে একটি তহবিলও চালু করেন।

শিক্ষিত সমাজে নারীদের অবদান : তিনি মনে করতেন, শিক্ষিত নারীরা সমাজের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা : ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও ড্রিংকওয়াটার বিটন উদ্যোগী হয়ে কলকাতায় হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা ভারতের প্রথম ভারতীয় বালিকা বিদ্যালয়।

দক্ষিণবঙ্গের পরিদর্শক পদে নারী শিক্ষার প্রসার :তিনি বিদ্যালয় পরিদর্শকের সরকারি পদে থাকার সুযোগে (১৮৫৭-৫৮ খ্রি.) বাংলার বিভিন্ন স্থানে ৩৫ টি বালিকা বিদ্যালয় এবং ১০০ টি বাংলা স্কুল স্থাপন করেন।

৪.৩ কোল বিদ্রোহের কারণগুলি লেখো।

ভূমিকা: ছােটোনাগপুর, সিংভূম, মানভূম প্রভৃতি অঞ্চলে বসবাসকারী উপজাতি জনগােষ্ঠী কোল নামে পরিচিত। কোলরা আবার হাে, মুন্ডা, ওঁরাও প্রভৃতি সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল। ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে রাঁচি জেলায় ব্রিটিশ শাসন ও শােষণের বিরুদ্ধে কোলরা যে বিদ্রোহ ঘােষণা করেছিল তা কোলবিদ্রোহ নামে পরিচিত।

∆ বিদ্রোহের কারণ : কোল বিদ্রোহের কারণগুলি হল—

(১) রাজস্ব বৃদ্ধি : কৃষি ও বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল কোল উপজাতির মানুষেরা ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল অরণ্যচারী মানুষ। ইংরেজ কোম্পানির ছােটোনাগপুর অঞ্চল দখলের পর সেখানে নতুন নতুন ভূমিরাজস্ব নীতির ফলে কোলরা ক্ষুব্ধ হয় এবং বিদ্রোহ ঘােষণা করে।

(২) অরণ্যের অধিকার : আধুনিক সভ্যতা থেকে বহু দূরে অরণ্যভূমি অঞলে স্বাধীনভাবে জীবিকা নির্বাহকারী কোলরা ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তাদের চিরাচরিত অরণ্যের অধিকার হারালে তাদের জীবিকার সমস্যা দেখা দেয়।

(৩) বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ ও শোষণ :ইংরেজ সরকার বহিরাগতদের কোল সম্প্রদায়ের জমিদার হিসেবে নিয়ােগ করলে তারা চড়া রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে বিচার ও আইন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে কোল সমাজের ওপর আঘাত হানে। রাজস্ব আদায়ের নামে জমিদার ও তার কর্মচারীরা শােষণ ও অত্যাচারের পাশাপাশি কোলদের জমি থেকে উৎখাত করে যা কোল বিদ্রোহের অন্যতম কারণ।

(৪) মহাজন ও ব্যবসায়ীদের শােষণ : ব্রিটিশ সরকার নগদ অর্থে খাজনা প্রদানের নিয়ম চালু করায় কোলরা তাদের ফসল বিক্রি করতে গিয়ে মহাজন ও ব্যবসায়ীদের দ্বারা নানাভাবে প্রতারিত ও শােষিত হয়।

অন্যান্য কারণ: এ ছাড়াও বিভিন্ন কর, উপকর, কোলদের ইচ্ছা ও ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে আফিম চাষ করাতে বাধ্য করা, দেশি সুদের ওপর উচ্চ হারে কর চাপানাে, কোল রমণী ও পুরুষদের ওপর অত্যাচার প্রভৃতি কারণে কোলরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।

বিভাগ- ‘ঙ’

৫। ১২-১৫টি বাক্যে একটি প্রশ্নের উত্তর দাও : ৮×১=৮

৫.১ আধুনিক ভারতে ইতিহাসের উপাদান হিসেবে বঙ্গদর্শন পত্রিকার গুরুত্ব কী ?

ভূমিকা : ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে প্রকাশিত সাময়িক পত্রিকাগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় ছিল বঙ্গদর্শন। ১৮৭২ খ্রি. সমকালীন বাংলার বাঙালির রাজনীতি ইতিহাস, পুরাতত্ত্ব, দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য, সমাজতত্ত্ব প্রভৃতি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বঙ্গদর্শন পত্রিকায় তুলে ধরেছেন।

জাতীয়তাবাদ বিস্তার : উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের বাংলার জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষের ইতিহাসে বঙ্গদর্শন এক অপরিহার্য উপাদান। বিখ্যাত আনন্দমঠ উপন্যাস এবং ‘বন্দেমাতরম’ সংগীত এই পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়।

সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা : বাঙালি মানসে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার আঁতুড়ঘরও ছিল এই পত্রিকা। বঙ্গদর্শন পত্রিকাতেই বঙ্কিমচন্দ্রের সাম্য প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয় যা বাঙালি সমাজে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার প্রসারে যথেষ্ট সহায়তা করে।

সমকালীন তথ্য : বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত রচনাগুলি থেকে সে সময় বাংলার ইংরেজ সরকারও জমিদারদের শোষণ-অত্যাচার, সামাজিক পরিস্থিতি, সাধারণ মানুষের অবস্থা, সাহিত্য, রাজনীতি, দর্শন, বিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব প্রভৃতি সম্পর্কে বহু তথ্য পাওয়া যায়।

জনমত গঠনের ভূমিকা : এই পত্রিকার জনপ্রিয়তা ছিল অপরিসীম। অধীর আগ্রহে এই মাসিক পত্রিকাটির জন্য বাঙালি মন অস্থির হয়ে উঠত। রবীন্দ্রনাথ তার ছোটো বেলায় পত্রিকাটির নতুন সংখ্যা হাতে পাওয়ার জন্য মুখিয়া থাকত। এ রকম অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তার কারণেই জনমত গঠনের ক্ষেত্রেও এই পত্রিকা তাৎপর্যপূর্ণ পালন করেছিল।

উপসংহার :১৮০০-র দশকে বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকাটি পুন:প্রকাশে রবীন্দ্রনাথ উদ্যোগী হয়েছিলেন। ঊনিশ শতকের বাঙালির সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনের ইতিহাস রচনায় বঙ্গদর্শনের গুরুত্ব অপরিসীম।

৫.২ উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণ কি সত্যিই নবজাগরণ ছিল ? তোমার মতের স্বপক্ষে যুক্তি দাও।

উত্তরঃ উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণকে “নবজাগরণ” হিসাবে অভিহিত করা যেতে পারে, কারণ এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তন যা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উন্নতিতে সহায়ক হয়েছিল।

বাংলার নবজাগরণ সত্যিই নবজাগরণ ছিল কিনা তার স্বপক্ষে যুক্তি হল—

সামাজিক সংস্কার : এই সময়কালে বিভিন্ন সামাজিক কুসংস্কার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া গিয়েছিল। যেমন, সতীদাহ প্রথা, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহের মতো কুপ্রথাগুলির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল।

শিক্ষার প্রসার: পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায় এবং ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান ও চিন্তাধারার উন্মোচন হয়।

সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক বিকাশ :বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি ঘটে, নতুন সাহিত্যিক ধারা ও চিন্তাধারার বিকাশ হয়।

রাজনৈতিক সচেতনতা : এই সময়কালে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায় এবং দেশপ্রেমের ভাবনা জাগৃত হয়।

নতুন চিন্তাধারার উন্মোচন :নতুন জ্ঞান ও চিন্তাধারার উন্মোচন হয়, যা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনে।

বিভিন্ন ব্যক্তির অবদান : রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বিদ্যাসাগর, নবগোপাল মিত্র, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দনাথ ঠাকুর সহ অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এই নবজাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তথাকথিত নবজাগরণ: কিছু ঐতিহাসিক ও সমালোচক এই নবজাগরণকে “তথাকথিত” বা “ফ্যাসড” নবজাগরণ বলে অভিহিত করেছেন, কারণ এটি মূলত উচ্চবিত্ত হিন্দু সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এর তেমন প্রভাব পড়েনি।

অশোক মিত্র : তিনি ১৯৫১ সালের আদমশুমারি বা Census তৈরির সময় বাংলায় উনিশ শতকের জাগরণকে “তথাকথিত নবজাগরণ” বলে অভিহিত করেছেন।

বিনয় ঘোষ : তিনি বাংলার নবজাগৃতি গ্রন্থে এই নবজাগরণকে ঐতিহাসিক প্রতারণা আখ্যা দিয়ে বলেন যে, নবজাগরণ হয়নি যা লেখা হয়েছে।

সীমাবদ্ধতা : নবজাগরণের প্রভাব মূলত শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত হিন্দু সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, যেখানে মুসলিম বা নিম্নবিত্ত মানুষেরা এর থেকে দূরে ছিল।

উপসংহার : যদিও নবজাগরণকে “তথাকথিত” বা “ফ্যাসড” বলা যেতে পারে, তবে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় যা বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও সমাজের উন্নতিতে সহায়ক হয়েছিল।

৫.৩ বাংলার ফরাজি আন্দোলন সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করো। ৮

ভূমিকা : উনিশ শতকে বাংলায় সংঘটিত কৃষকবিদ্রোহগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ফরাজি আন্দোলন (১৮২০-৬২ খ্রি.)। এই আন্দোলন প্রথমদিকে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে পরিচালিত হলেও ক্রমশ রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ ধারণ করে।

উৎপত্তি : ‘ফরাজি’ কথার অর্থ হল ‘ইসলাম নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক কর্তব্য’ বা ‘ইসলাম ধর্মের আদর্শে বিশ্বাস’। ফরিদপুর জেলার হাজি শরিয়ত উল্লাহইসলামধর্ম সংস্কারের উদ্দেশ্যে ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে ‘ফরাজি’ নামে একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন।

আদর্শ :হাজি শরিয়ত উল্লাহ ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষকে ‘দার-উল-হারব’ বা ‘বিধর্মীর দেশ’ বলে অভিহিত করেন। তিনি তাঁর অনুগামীদের কলমা (আল্লার প্রতি বিশ্বাস), নামাজ (আত্মার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা), রোজা (উপবাস), জাকাত (দানধ্যান), হজ (তীর্থযাত্রা) প্রভৃতি পালনের পরামর্শ দেন।

রাজনৈতিক রূপ :ফরাজি আন্দোলন শীঘ্রই রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করে। হাজি শরিয়ত উল্লাহ তাঁর অনুগামীদের জমিদার ও নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর পরামর্শ দেন। আন্দোলন ফরিদপুর জেলায় শুরু হয়ে ধীরে ধীরে তা ঢাকা, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, খুলনা, যশোহর, ২৪ পরগনা প্রভৃতি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে।

দুদু মিঞার ভূমিকা : শরিয়ত উল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্রদুদু মিঞার নেতৃত্বে লক্ষ লক্ষ দরিদ্র কৃষক আন্দোলনে শামিল হয়। তিনি ঘোষণা করেন যে, জমির মালিক আল্লাহ, তাই কৃষকরা অন্য কাউকে খাজনা দিতে বাধ্য নয়। তিনি শক্তিশালী লাঠিয়াল বাহিনী ও গুপ্তচর বাহিনী গড়ে তুলে অত্যাচারী জমিদার ও নীলকরদের বাসভবন আক্রমণ করেন।

নোয়া মিঞার ভূমিকা : দুদু মিঞার মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নোয়া মিঞা আন্দোলনকে ধীরে ধীরে ধর্মীয় রূপ দেন। ফলে আন্দোলন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে।

উপসংহার : শরিয়ত উল্লাহ ও দুদু মিঞার উত্তরসুরি নোয়া মিঞার আমলে ফরাজি আন্দোলনের ধর্মীয় চরিত্র এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে হিন্দুরা এই আন্দোলন থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়। ড. অভিজিৎ দত্ত বলেছেন যে, হিন্দু-বিরোধিতা, জোর করে অর্থ আদায়, নেতৃত্বের অভাব প্রভৃতির ফলে ফরাজি আন্দোলন তার গতি হারিয়ে ফেলে।

SOURCE-HZN

©kamaleshforeducation.in(2023)

 

 

error: Content is protected !!
Scroll to Top