প্রথম পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়ন
দশম শ্রেণি
বিষয়- ইতিহাস

প্রথম ইউনিট টেস্ট-সেট-২
সময় : ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট                   পূর্ণমান : ৪০

 

বিভাগ – ‘ক’

১। সঠিক উত্তরটি নির্বাচন করো : 1×10=10

১.১ নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চার প্রাধান্য দেওয়া হয়—
(ক) রাজা-মহারাজাদের
(খ) পৌরাণিক কাহিনিকে
(গ) অভিজাত সমাজকে
(ঘ) সাধারণ মানুষকে

উত্তরঃ (ঘ) সাধারণ মানুষকে

১.২ The story of my experiment with truth-এর রচয়িতা—
(ক) গান্ধিজি (খ) সুভাষচন্দ্র বসু
(গ) রাজেন্দ্র প্রসাদ (ঘ) জওহরলাল নেহরু

উত্তরঃ (ক) গান্ধিজি

১.৩ ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষাবিস্তারের সূচনা হয়—
(ক) মহারাষ্ট্রে (খ) পাঞ্জাবে (গ) বাংলায় (ঘ) বিহারে

উত্তরঃ (গ) বাংলায়

১.৪ বামাবোধিনী প্রকাশিত হয়েছিল—
(ক) দৈনিক (খ) সাপ্তাহিক (গ) পাক্ষিক
(ঘ) মাসিক পত্রিকা হিসেবে

উত্তরঃ (ঘ) মাসিক পত্রিকা হিসেবে

১.৫ নীলদর্পণ নাটকটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন—
(ক) জেমস লং (খ) মাইকেল মধুসূদন দত্ত
(গ) হরিশচন্দ্র মুখার্জি (ঘ) কালিপ্রসন্ন সিংহ

উত্তরঃ (খ) মাইকেল মধুসূদন দত্ত

১.৬ সতীদাহ বিরোধী আইন পাস হয়—
(ক) 1828 খ্রিস্টাব্দে (খ) 1829 খ্রিস্টাব্দে
(গ) 1856 খ্রিস্টাব্দে (ঘ) 1857 খ্রিস্টাব্দে

উত্তরঃ (খ) 1829 খ্রিস্টাব্দে

১.৭ ‘বিপ্লব’ শব্দটির অর্থ—
(ক) আন্দোলন
(গ) বিদ্রোহ
(খ) ক্ষণস্থায়ী সামাজিক পরিবর্তন
(ঘ) প্রচলিত কোনো ব্যবস্থার দ্রুত, ব্যাপক ও আমূল পরিবর্তন

উত্তরঃ (ঘ) প্রচলিত কোনো ব্যবস্থার দ্রুত, ব্যাপক ও আমূল পরিবর্তন

১.৮ রানি শিরোমণি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন—
(ক) রংপুর বিদ্রোহে (খ) চুয়াড় বিদ্রোহে
(গ) কোল বিদ্রোহে (ঘ) মুন্ডা বিদ্রোহে

উত্তরঃ (খ) চুয়াড় বিদ্রোহে

১.৯ আনন্দমঠ উপন্যাসটি যে-বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়—
(ক) ওয়াহাবি আন্দোলন (খ) ফরাজি আন্দোলন
(গ) নীল বিদ্রোহ (ঘ) সন্ন্যাসী-ফকির

উত্তরঃ (ঘ) সন্ন্যাসী-ফকির

১.১০ নিজেকে ‘ধরতি আবা’ বলে ঘোষণা করেন—
(ক) সিধু (খ) কানু (গ) বিরসা মুন্ডা (ঘ) ভৈরব

উত্তরঃ (গ) বিরসা মুন্ডা

বিভাগ – ‘খ’

 

২। নীচের প্রশ্নগুলির নির্দেশ অনুযায়ী উত্তর দাও : 1×6=6

২.১ ক্রিকেট ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া বইটির লেখক কে ?

উত্তরঃ ক্রিকেট ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া বইটির লেখক বোরিয়া মজুমদার।

২.২ ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ কার লেখা?

উত্তরঃ ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ কালীপ্রসন্ন সিংহের লেখা।

∆ নীচের বাক্যগুলি সত্য / মিথ্যা নির্বাচন করো :

২.৩ হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ।

উত্তরঃ সত্য

২.৪ ‘ফরাজি’ শব্দের অর্থ হল নবজাগরণ।

উত্তরঃ মিথ্যা

∆ নিম্নলিখিত বিবৃতিগুলির সঠিক ব্যাখ্যা নির্বাচন করো :

২.৫ বিবৃতি : ব্রিটিশ সরকার অরণ্য আইন পাস করে—

ব্যাখ্যা-১ : অরণ্যকে আদিবাসীদের হাতে তুলে দিতে।

ব্যাখ্যা-২ : ভারতীয় জমিদারদের হাতে তুলে দিতে।

ব্যাখ্যা-৩ : অরণ্য সম্পদের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে।

উত্তরঃ ব্যাখ্যা-৩ : অরণ্য সম্পদের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে।

২.৬ বিবৃতি : বিরসা মুন্ডা এক নতুন ধর্মমত প্রচার করেন, কারণ—

ব্যাখ্যা-১ : তিনি ধর্মীয়ভাবে মুন্ডাদের ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন।

ব্যাখ্যা-২ : তিনি একজন ধর্মগুরু হতে চেয়েছিলেন।

ব্যাখ্যা-৩ : তিনি সর্বধর্মসমন্বয়ী মনোভাব গড়তে চেয়েছিলেন

উত্তরঃ ব্যাখ্যা-১ : তিনি ধর্মীয়ভাবে মুন্ডাদের ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন।

বিভাগ – ‘গ’

৩। নীচের প্রশ্নগুলির দু-তিনটি বাক্যে উত্তর দাও (যে-কোনো চারটি) : 2×4=8

 

৩.১ নতুন সামাজিক ইতিহাস বলতে কী বোঝো ?

উত্তরঃ ১৯৬০ ও ১৯৭০ – এর দশকে ইউরোপ ও আমেরিকায় ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে প্রচলিত রাজনৈতিক, সামরিক, সাংবিধানিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের পরিবর্তে সমাজের অবহেলিত দিকগুলিসহ সমগ্র সমাজের ইতিহাস রচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় যা নতুন সামাজিক ইতিহাস নামে পরিচিত।

৩.২ চার্লস উডের ডেসপ্যাচের প্রধান চারটি সুপারিশ লেখো।

উত্তরঃ চার্লস উডের সুপারিশঃ ভারতের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসারের জন্য চার্লস উডের বিভিন্ন সুপারিশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল–

(১) নিম্নতম শ্রেণি থেকে উচ্চতর শ্রেণি পর্যন্ত যথাযথ সমন্বয়মূলক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন।

(২) সরকারি শিক্ষাবিভাগ স্থাপন, প্রত্যেক প্রেসিডেন্সি শহরে (অর্থাৎ — কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ শহরে) একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন।

(৩) গণশিক্ষা, নারীশিক্ষা, মাতৃভাষার উন্নয়ন এবং শিক্ষক – শিক্ষণ ব্যবস্থার প্রবর্তন।

(৪) প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের উপযুক্ত ব্যবস্থা প্রবর্তন।

(৫) সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা প্রদান নীতির প্রবর্তন প্রভৃতি।

৩.৩ নব্যবঙ্গ আন্দোলন বলতে কী বোঝো ?

উত্তরঃ হিন্দু কলেজের তরুণ অধ্যাপক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর প্রভাবে পাশ্চাত্যের যুক্তিবাদী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলার তরুণ বুদ্ধিজীবীদের একাংশ যে উগ্র সংস্কারপন্থী আন্দোলন সৃষ্টি করেন তা ইয়ং বেঙ্গল বা নব্যবঙ্গ আন্দোলন নামে পরিচিত।

৩.৪ ফরাজি আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য কী ছিল ?

উত্তরঃ কোরানের পবিত্র আদর্শ অনুসরণ করে চলা, ইসলামীয় ভাবধারার পুনরুজ্জীবন করা, জমিদারদের শোষণের হাত থেকে কৃষকদের মুক্ত করা, ব্রিটিশ শাসনের উচ্ছেদ করে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করা, জমিদার মহাজনের বিরোধিতা করা, সাম্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করাই ছিল ফরাজি আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য।

 

৩.৫ কোল বিদ্রোহের দুটি কারণ লেখো।

 

উত্তরঃ কোল বিদ্রোহের কারণগুলি হল—

প্রথমত : ছোটোনাগপুর অঞ্চলে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক উচ্চহারে রাজস্ব বৃদ্ধি, জমিদার – মহাজন – ব্যবসায়ীদের শোষণ ছিল কোল বিদ্রোহের মূল কারণ।

দ্বিতীয়ত : অন্য কারণগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল — দেশি মদের ওপর কর বসানো, কোলদের ঐতিহ্যবিরোধী আফিম চাষ করতে বাধ্য করা, বেগার খাটানো, নারীদের সম্মান হানি হওয়া।

তৃতীয়ত : এ ছাড়া বনজ সম্পদের ওপর কোলদের আজন্ম অধিকার ব্রিটিশরা ছিনিয়ে নিলে কোলরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে ।

বিভাগ – ‘ঘ’

 

৪। নীচের প্রশ্নগুলির সাত-আটটি বাক্যে উত্তর দাও (যে-কোনো দুটি) : 4×2=8

 

৪.১ আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা ইতিহাসচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ কেন ?

উত্তরঃ আধুনিক ভারত ইতিহাস রচনার উপাদান বহু ও বৈচিত্র্যময়। এই উপাদানগুলির মধ্যে লিখিত উপাদানের গুরুত্ব অপরিসীম। আর এই লিখিত উপাদান হিসাবে আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথার গুরুত্ব তাৎপর্যপূর্ণ।

(i) আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা : লেখক বা কোন ব্যক্তি তার অতীত জীবনের ফেলে আসা দিনগুলির কথা, অতীতের অভিজ্ঞতার কথা, নিজস্ব জীবনের বিভিন্ন ঘটনা যখন কোন জীবনী গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন তা আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথারূপে পরিগণিত হয়।

(ii) বিভিন্ন আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা : ভারত ইতিহাসে আমরা প্রচুর আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথামূলক জীবনী গ্রন্থের উল্লেখ পাই। এগুলির মধ্যে বিপিনচন্দ্র পালের ‘সত্তর বৎসর’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনস্মৃতি’, সরলাদেবীর ‘জীবনের ঝরাপাতা’, কেশবচন্দ্র সেনের ‘জীবনবেদ’, আশালতা সরকারের ‘আমি সূর্যসেনের কন্যা’, মনিকুন্তলা সেনের ‘সেদিনের কথা, সুফিয়া কামালের ‘একাত্তরের ডাইরি’ প্রভৃতি নাম উল্লেখযােগ্য।

গুরুত্বঃ আধুনিক ইতিহাস রচনায় আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথার গুরুত্ব অপরিসীম। এগুলি– (১) লেখকের দৃষ্টিভঙ্গীর পরিচয় দেয় (২) সমসাময়িক কালের রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক জীবনের চিত্র ফুটিয়ে তােলে। (৩) স্থানীয় ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করে। (৪) জাতীয় ইতিহাসের বহু অনালােচিত, অনালােকিত এবং উপেক্ষিত বিষয়ের উপর আলােকপাত করে। (৫) অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রদান করে ও জাতীয় চেতনা গড়ে তােলে।

৪.২ টীকা লেখো : বামাবোধিনী।

ভূমিকা : উনিশ শতকে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সাময়িকপত্রগুলির মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল ব্রাহ্মনেতা কেশবচন্দ্রের সেনের অনুগামী উমেশচন্দ্র দত্ত (১৮৪০- ১৯০৭ খ্রি.) সম্পাদিত বামাবোধিনী পত্রিকা।

সামাজিক প্রেক্ষাপট : উনিশ শতকের মধ্যভাগেও বাংলায় স্ত্রীশিক্ষার প্রতি সাধারণ মানুষের বিশেষ সমর্থন ছিল না। তাই এই সময় পর্যন্ত নারীশিক্ষার বিশেষ প্রসার ঘটেনি। এই পরিস্থিতিতে নারীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে তাদের সচেতন করে তোলার উদ্দেশ্যে উমেশচন্দ্র দত্ত বিশেষ উদ্যোগ নেন।

বামাবোধিনী সভা প্রতিষ্ঠা : বাঙালি ‘বামা” অর্থাৎ নারীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ও নারী সচেতনতা বৃদ্ধি করে তাদের অধিকার ও মর্যাদা আদায়ের যোগ্য করে তোলা, নারীদের মনের কথা তুলে ধরা, নারীজাতির স্বার্থে বিভিন্ন বইপত্র প্রকাশ প্রভৃতির উদ্দেশ্যে উমেশচন্দ্র দত্ত কয়েকজন তরুণ ব্রাহ্মকে নিয়ে ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে বামাবোধিনী সভা প্রতিষ্ঠা করেন।

পত্রিকার প্রথম প্রকাশ : বামাবোধিনী সভার পক্ষ থেকে ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে বামাবোধিনী পত্রিকার প্রকাশ শুরু হয়। এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন উমেশচন্দ্র দত্ত। এই পত্রিকার প্রকাশে উমেশচন্দ্র দত্তকে বিশেষভাবে সহায়তা করেছিলেন ক্ষেত্রমোহন দত্ত, বসন্তকুমার দত্ত প্রমুখ।

সম্পাদনা : কলকাতার সিমুলিয়ার বামাবোধিনী সভার কার্যালয় থেকে পত্রিকাটি প্রকাশিত হত। উদারমনস্ক সংস্কারকদের নিয়ে বামাবোধিনী পত্রিকা-র সম্পাদকমণ্ডলী গঠন করা হয়। বামাবোধিনী পত্রিকার শেষ সম্পাদক ছিলেন আনন্দকুমার দত্ত। নানা উত্থানপতনের মধ্য দিয়ে পত্রিকাটি ১৯২২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৬০ বছর ধরে প্রকাশিত হয়।

উপসংহার : বামাবোধিনী পত্রিকা সমকালীন বাংলার নারী সমাজের অন্তরের কথা তুলে ধরতে সক্ষম হয়। এই পত্রিকায় নামে ও বেনামে বিভিন্ন নারী তাঁদের নিজস্ব লেখালেখি প্রকাশ করার সুযোগ পাওয়ায় সাহিত্য জগতে নতুন লেখিকাদের আবির্ভাব ঘটে।

 

৪.৩ সাঁওতাল বিদ্রোহের ফলাফল ও গুরুত্ব লেখো।

 

ভূমিকা : ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের সাঁওতাল বিদ্রোহ আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ হলেও এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল বা গুরুত্বকে কখনােই ছােটো করে দেখা হয় না। এই বিদ্রোহের গুরুত্ব হল—

(i) সাঁওতাল পরগনা গঠন : সাঁওতাল বিদ্রোহের অবসান হলে সাঁওতালদের জন্য একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড গঠনে প্রয়ােজনীয়তা বুঝতে পেরে ব্রিটিশ সরকার একপ্রকার বাধ্য হয়েই সাঁওতাল অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে ‘সাঁওতাল পরগনা’ নামক পৃথক একটি এলাকা গঠন করে।

(ii) পৃথক উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি : সরকার সাঁওতালদের একটি পৃথক উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে এবং সাঁওতাল পরগনায় সরকারি কোনাে আইন কার্যকরী হবে না বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

(iii) সাঁওতাল এলাকায় কোনো বাঙালি ও বহিরাগত জমিদার ও মহাজনদের প্রবেশ নিষেধ।

(iv) এই বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকারদের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সুদের হার ধার্য করে দেয় সাঁওতালরা।

উপসংহার : পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, অন্যান্য উপজাতি বিদ্রোহ কার্যকারী হলেও এই বিদ্রোহের আগুন ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল।

বিভাগ – ‘ঙ’

 

৫। নীচের প্রশ্নগুলির বারো-পনেরোটি বাক্যে উত্তর দাও (যে-কোনো একটি) : 8×1=8

 

৫.১ আধুনিক ইতিহাসচর্চার বৈচিত্র্যগুলি লেখো ।

উত্তরঃ ইতিহাস হল মানব সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের ধারাবাহিক বিবরণ। এখানে থাকে সমগ্র মানব সমাজের সমগ্র অংশের সুখ-দুঃখ হাসি-কান্নার বা উত্থান-পতনের বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ। তাই আধুনিক ইতিহাসচর্চায় বৈচিত্র্য এসেছে।

নতুন সামাজিক ইতিহাস : কিন্তু অতীতে ইতিহাসে শুধুমাত্র রাজা- মহারাজা কিংবা অভিজাতদের কথা লেখা থাকতো। বর্তমানে এই ধারায় পরিবর্তন এসেছে। এখন এখানে সাধারণ মানুষ, নিম্নবর্গীয় সমাজ এমনকি প্রান্তিক অন্তজদের আলোচনাও সমানভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। তাই এই ইতিহাস নতুন সামাজিক ইতিহাস নামে পরিচিত।

জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্কস, ভারতীয় ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার ও ইরফান হাবিব, ফরাসি ঐতিহাসিক মার্ক ব্লখ এই ধরার ইতিহাস চর্চা করেছেন।

খেলার ইতিহাস : আধুনিক ইতিহাসের চর্চায় খেলার ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ, এই ইতিহাস সমাজ-সংস্কৃতির আলোচনায় ও জাতীয়তাবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে।

এধরনের ইতিহাস চর্চায় জে এ ম্যাসান, রিচার্ড হোল্ড (‘স্পোর্টস অ্যান্ড দ্য ব্রিটিশ – আ মডার্ন হিস্ট্রি’), রামচন্দ্র গুহ, বোরিয়া মজুমদার (ক্রিকেট ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাস : মানব সভ্যতার ইতিহাস চর্চায় খাদ্যাভ্যাস একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ কোনো জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন থেকে তাদের ওপর অন্য কোন সংস্কৃতির প্রভাবের বিষয়টি উপলব্ধি করা যায়। যেমন ঢাকা প্রাদেশিক সরকারের মর্যাদা পেলে সেখানকার অধিবাসীদের রন্ধনপ্রণালীতে পারসিক খাদ্যরীতির মিশেল ঘটে। ফলে ‘ঢাকাই খাবার’এর উদ্ভব হয়।

পোশাক-পরিচ্ছেদের ইতিহাস : পোশাক- পরিচ্ছদ একই সঙ্গে ব্যক্তির অর্থ-সামাজিক অবস্থান, রুচি ও সংস্কৃতির পরিচয় তুলে ধরে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট যুগের পরিবেশগত পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা করা যায় পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবহার থেকে। যেমন, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির মহিলাদের অনুকরণেই উনিশ শতকে বাঙালি সমাজে ব্রাহ্মিকা পদ্ধতিতে শাড়ি পড়ার সূত্রপাত হয়।

শিল্পচর্চার ইতিহাস : শিল্পচর্চা জাতির আত্মপরিচয়ের সাথে সংপৃক্ত। সাংস্কৃতিক দিক থেকে একটি জাতি কীভাবে পরিপুষ্ট হয়ে ওঠে তা তাদের শিল্পচর্চার ইতিহাস থেকে জানা যায়। শিল্পচর্চার মধ্যে সামগ্রিকভাবে পড়ে সংগীত, নৃত্য, নাটক, চলচ্চিত্র। মান্না দে-র লেখা ‘জীবনের জলসাঘর’ থেকে সংগীতের ইতিহাস জানা যায়। মধুসূদন দত্ত, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রমুখের নাটকের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদের প্রসার ঘটে।

স্থাপত্যের ইতিহাস : আধুনিক ইতিহাসচর্চায় স্থাপত্যের ইতিহাস যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে। এই শিল্প কোন সময়ের অর্থ-সামাজিক অবস্থা ও সংস্কৃতির বিবর্তনকে বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। আলেকজান্ডার কানিংহাম, পার্সি ব্রাউন, জেমস ফার্গুসন প্রমুখের স্থাপত্যের ইতিহাসচর্চা প্রাচীন ভারতের ইতিহাসচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।

দৃশ্যশিল্পের ইতিহাস : ইতিহাসের লিখিত উপাদানগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে রচিত হয় না। এক্ষেত্রে দৃশ্যশিল্পগুলি (ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফি) বিষয়কে কোনোরকম অস্পষ্টতা ছাড়াই ফুটিয়ে তোলে। এজন্য আধুনিক ইতিহাসচর্চায় দৃশ্যশিল্পের ইতিহাস বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবেশের ইতিহাস : মানব সভ্যতার উপর পরিবেশের প্রভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মানুষের প্রতিক্রিয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। এর জন্য ঘটছে বিভিন্ন পরিবেশ আন্দোলন। চিপকো আন্দোলন, নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন এমনি কিছু পরিবেশ আন্দোলনের উদাহরণ। সুতরাং পরিবেশের ইতিহাস আধুনিক ইতিহাসচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হয়ে উঠেছে।

বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাস : মানব সভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাসে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

 

৫.২ সমাজসংস্কারে রাজা রামমোহন রায় ও ব্রাহ্মসমাজের ভূমিকা আলোচনা করো।

 

উত্তরঃ ব্রাহ্মধর্ম ও ব্রাহ্মসমাজের প্রবর্তক রাজা রামমোহন রায়ের সমাজ সংস্কারের উদ্দেশ্য ছিল সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার যেমন— সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, কৌলিন্য প্রথা, জাতিভেদ প্রথা প্রভৃতি অমানবিক প্রথার উচ্ছেদ সাধন এবং নারীশিক্ষার প্রসার, বিধবা বিবাহ প্রবর্তন, নারীজাতির সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি।

১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের ২৭শে সেপ্টেম্বর রাজা রামমোহন রায়ের মৃত্যুর পর বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে মতপার্থক্য তৈরি হলে ব্রাহ্মসমাজ তিনটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

রাজা রামমোহন রায়ের মৃত্যুর পর ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামমোহন রায় তাঁর ধর্মমতকে কোনো বিশেষ সম্প্রদায় রূপে গড়ে তুলতে চাননি, কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্মসমাজকে একটি বিশেষ সম্প্রদায় রূপে গড়ে তোলেন এবং ‘ব্রাহ্মধর্মের অনুষ্ঠান পদ্ধতি’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’ এবং ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে ‘তত্ত্ববোধিনী পাঠশালা’ স্থাপিত হয় এবং ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’।

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় নারীশিক্ষা ও বিধবা বিবাহের পক্ষে এবং বহুবিবাহের বিরুদ্ধে প্রচার চালান। কিন্তু অচিরেই বেদের অভ্রান্ততা, ব্রাহ্ম আচার্যদের উপবিত ধারণ প্রভৃতি নানা প্রশ্নে মত পার্থক্য তৈরি হলে ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মসমাজ থেকে বহিস্কৃত হয়ে কেশবচন্দ্র সেন ও তার অনুগামীরা ‘ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রাহ্মসমাজ ‘আদি ব্রাহ্মসমাজ’ নামে পরিচিত হয়।

কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে সমাজ সংস্কার আন্দোলন উনিশ শতকে এক নতুন মাত্রা পায় এবং তিনি ইন্ডিয়ান মিরর, বামাবোধিনী পত্রিকায় নারীশিক্ষার প্রসার, নারী স্বাধীনতা, অসবর্ণ বিবাহ প্রভৃতির পক্ষে এবং বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রচার চালান। নারী কল্যাণের জন্য ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে ‘বামাবোধিনী’ ও ব্রাহ্মিকা সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। কেশবচন্দ্র সেনের আন্দোলনের চাপে সরকার ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে ‘তিন আইন’ পাস করে— বাল্য বিবাহ ও বহুবিবাহ রদ, অসবর্ণ বিবাহকে আইন সিদ্ধ করে। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে ‘সঙ্গত সভা’ প্রতিষ্ঠা করে নিপীড়িত মানুষের সেবা ও ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে নৈশ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে বয়স্কদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেন।

কিন্তু কেশবচন্দ্রের খ্রিস্টপ্রীতি, চৈতন্যপ্রীতি, গুরুবাদ ও ভক্তিবাদে আকর্ষণ, হিন্দু রীতিতে নাবালিকা কন্যা সুনীতি দেবীর বিবাহ ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজের অভ্যন্তরে প্রবল দ্বন্দ্ব তৈরি করে। শিবনাথ শাস্ত্রী, আনন্দমোহন বসু, দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখরা ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই মে ‘ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ’ থেকে বেরিয়ে গিয়ে ‘সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। বিভাজনের পর কেশবচন্দ্র সেনের ব্রাহ্মসমাজের নাম হয় ‘নববিধান ব্রাহ্মসমাজ’।

‘সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ’ এর নেতা শিবনাথ শাস্ত্রী নারীশিক্ষা ও নারী স্বাধীনতা প্রভৃতি কাজে আত্মনিয়োগ করেন । বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে এবং বিধবা বিবাহের পক্ষে প্রচার চালান।

৫.৩ নীল বিদ্রোহের কারণ ও বৈশিষ্ট্য লেখো।

 

উত্তরঃ নীল বিদ্রোহের কারণঃ ইংরেজ নীলকরদের অমানুষিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংঘটিত নীল বিদ্রোহের কারণগুলি হল –

(i) অলাভজনক নীলচাষ : ইউরোপীয় নীলকররা ধান বা পাট চাষের বদলে চাষিকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে অলাভজনক নীলচাষে বাধ্য করলে নীলচাষি–নীলকর বিরোধ তীব্র হয়।

(ii) দাদন প্রথা : নীলকররা নীলচাষিকে চাষের জন্য বিঘা প্রতি দু’টাকা ‘দাদন’ বা অগ্রিম নিতে বাধ্য করে ও বলপূর্বক নীলচাষে বাধ্য করে।

(iii) উপযুক্ত মূল্যের অভাব : উৎপন্ন নীলের উপযুক্ত মূল্য না পাওয়ায় তারা বংশানুক্রমে আর্থিক দায়গ্রস্ত থাকত, এমনকি অনেক সময়ে নীলকরদের বেগার শ্রমদান করতেও বাধ্য হত।

(iv) নীলকরদের অত্যাচার : নীলকুঠির লাঠিয়ালরা অবাধ্য চাষিদের ওপর হামলা, তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, চাষির স্ত্রী-কন্যাদের অপহরণ ও লাঞ্ছনা, কৃষকদের গবাদি পশু আটকে রাখা ইত্যাদি নানা নির্যাতন চালাত। এই রকম অত্যাচার প্রায় দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে চলেছিল ।

 

নীল বিদ্রোহের বৈশিষ্ট্যঃ এই বিদ্রোহে যে বৈশিষ্ট্যগুলি লক্ষ করা যায়, সেগুলি হল—

 

(i) কৃষকদের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ : অন্যান্য কৃষক আন্দোলনের তুলনায় নীলবিদ্রোহের তীব্রতা ছিল ব্যাপকতর।

(ii) জমিদারদের অংশগ্রহণ : অন্যান্য কৃষক বিদ্রোহের মতো নীলবিদ্রোহ জমিদার বা মহাজন – বিরোধী আন্দোলন ছিল না। বরং রানাঘাটের শ্রীগোপাল পাল, সাধুহাটির মথুরানাথ আচার্য প্রমুখ বেশ কিছু জমিদার এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেন।

(iii) শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের সমর্থন : শিশিরকুমার ঘোষ, গিরিশ ঘোষ, মনমোহন ঘোষ, কিশোরীচাঁদ মিত্র প্রমুখ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ব্যক্তিরা নীলবিদ্রোহকে সমর্থন করেন।

(iv) হিন্দু-মুসলিম ঐক্য : নীলবিদ্রোহ কোনোভাবেই সাম্প্রদায়িক আন্দোলন ছিল না। নিপীড়িত হিন্দু-মুসলমান কৃষক একযোগে নীলকরদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।

(v) সংবাদপত্রের ইতিবাচক ভূমিকা : ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’, ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’, ‘সোমপ্রকাশ’ প্রভৃতি পত্রপত্রিকা নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনী প্রকাশ করে নীল বিদ্রোহের ইতিবাচক জনমত গঠনে সহযোগিতা করে।

 

SOURCE-HZN

©kamaleshforeducation.in(2023)

 

 

error: Content is protected !!
Scroll to Top