

সংস্কার : বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা
বড়ো প্রশ্ন উত্তর (২/৪/৮ মার্কস)
Class 10 History 2nd Chapter
Long Question Answer
Updated on:
দশম শ্রেণী ইতিহাসের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘সংস্কার: বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা’
(History Chapter 2) এর মধ্যে উনিশ শতকের বাংলার সমাজ, শিক্ষা সংস্কার এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার ভূমিকা নিয়ে এখানে সুন্দরভাবে আলোচনা করা হয়েছে। আজকের এই পোস্টে এই অধ্যায়ের বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ 2/4/8 মার্কস এর প্রশ্ন উত্তর সহ আলোচনা করা হল।
বোর্ড: বিষয়বস্তু
1 দশম শ্রেণির ইতিহাস দ্বিতীয় অধ্যায় প্রশ্ন উত্তর | মাধ্যমিক ইতিহাস দ্বিতীয় অধ্যায় 2 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর
1.1 মাধ্যমিক ইতিহাস দ্বিতীয় অধ্যায় 8 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | দশম শ্রেণির ইতিহাস দ্বিতীয় অধ্যায় প্রশ্ন উত্তর
1.2 মাধ্যমিক ইতিহাস দ্বিতীয় অধ্যায় বড় প্রশ্ন উত্তর | মাধ্যমিক ইতিহাস দ্বিতীয় অধ্যায় 8 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর

দশম শ্রেণির ইতিহাস দ্বিতীয় অধ্যায়
2 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর
1. সাময়িক পত্র কাকে বলে? উনিশ শতকের কয়েকটি সাময়িক পত্রের নাম লেখো।
উত্তর: নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রকাশিত পত্রিকা গুলিকে বলা হয় সাময়িক পত্র। আধুনিক ইতিহাস চর্চার এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এগুলো থেকে সাময়িক সমাজের নানা বিষয় জানা যায়।
কয়েকটি সাময়িক পত্রিকা :– উনবিংশ শতকের সাময়িক পত্রিকা গুলির মধ্যে অন্যতম ছিল দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের “তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা” (১৮৪৩ খ্রী.) উমেশচন্দ্র দত্তের “বামাবোধিনী” (১৮৬৩ খ্রী.) বিদ্যাভূষণের “সোমপ্রকাশ” (১৮৫৮ খ্রী.) প্রভৃতি।
2. বামাবোধিনী পত্রিকার দুটি উদ্দেশ্য লেখো।
উত্তর: ১৮৬৩ সালে আগস্ট মাসে উমেশ চন্দ্র দত্তের সম্পাদনায় এই মাসিক পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়।
উদ্দেশ্য: পত্রিকাটি প্রকাশের উদ্দেশ্য ছিল – (ক) নারী শিক্ষা বিস্তার ঘটানো। (থ) নারী অধিকার ও মর্যাদা বৃদ্ধি করা, কুসংস্কার দূর করা ও কুসংস্কার মুক্ত মন গড়ে তোলা। (গ) মানসিক শক্তির উন্নতি ঘটানো ইত্যাদি। এছাড়া এখানে রন্ধন পদ্ধতি, পরিবার পরিচালন, সন্তান পালন, ফ্যাশন ইত্যাদি বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হত।
3. নারী সমাজের উন্নয়নে হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকার ভূমিকা কি ছিল?
উত্তর: নারী সমাজের উন্নয়নের সমস্ত পত্রিকাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তার মধ্যে অন্যতম হলো হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকা।
গুরুত্ব: (ক) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহের সমর্থনে আন্দোলন শুরু করলে হরিশচন্দ্র তার এই পত্রিকার মাধ্যমে বিধবা বিবাহের সমর্থনে জনমত গড়ে তোলেন।
(খ) নারী শিক্ষা বিস্তারে এই পত্রিকায় ব্যাপক প্রচার চালানো হয়। (গ) পতিতাদের সমস্যার সমাধানে নারী অধিকার আদায়ের এতে বিভিন্ন প্রবন্ধ প্রকাশ করা হয়।
(ঘ) কৌলিন্য প্রথা, বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার ব্যবস্থা ইত্যাদি হয়।
4. কে, কি উদ্দেশ্যে এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন?
উত্তর: গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিং-এর পৃষ্ঠপোষকতায় ১৭৮৪ সালে স্যার উইলিয়াম জোন্স কলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন।
উদ্দেশ্য: প্রাচ্যের সাহিত্য, ইতিহাস, শিল্পকলা, বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে চর্চা করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। ভারতীয় সাহিত্যিক তিনি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদের ব্যবস্থা করেন।
গুরুত্ব: এই সোসাইটির উদ্যোগে প্রাচ্যবিদ্যার পুনর্জাগরণ ঘটে। ভারতীয় শিক্ষিত শ্রেণীর সঙ্গে ব্রিটিশদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
5. কবে, কি উদ্দেশ্যে জনশিক্ষা কমিটি বা জেনারেল কমিটি অফ পাবলিক ইন্সট্রাকশন গঠিত হয়?
উত্তর: ১৮৪৩ সালে জুলাই মাসের লর্ড আমহার্স্ট-এর নির্দেশে জেনারেল কমিটি অব পাবলিক ইন্সট্রাকশন (GCPI) বা জনশিক্ষা কমিটি গঠিত হয়।
উদ্দেশ্য: ১৮১৩ সালে সনদ আইন কোম্পানিকে ভারতে শিক্ষাবিস্তারের জন্য বার্ষিক এক লক্ষ টাকা ব্যয়ের নির্দেশ দেওয়া হলেও পরবর্তী ১০ বছরেও ওই অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। তাই জনশিক্ষা কমিটির মাধ্যমে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা ও জন শিক্ষার জন্য নীতি নির্ধারণের ব্যবস্থা করা হয়।
6. ১৮৫৯ সালে নীল বিদ্রোহের ক্ষেত্রে হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকার দুটি ভূমিকা লেখো।
উত্তর: ১৮৫৯ সালে নীল বিদ্রোহের ক্ষেত্রে হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকার গুরুত্ব অপরিসীম। (ক) এই পত্রিকাতেই দরিদ্র প্রজাদের উপর নীলকরদের অত্যাচারের কথা তুলে ধরা হয়। (থ) কিভাবে দাদনের মাধ্যমে চাষীদের নীল চাষে বাধ্য করা হতো তার কথা তুলে ধরা হয়। (গ) নীল বিদ্রোহের সংক্রান্ত বিভিন্ন সংবাদ নিয়মিত প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয়, ইত্যাদি।
7. প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দ্বন্দ্ব কি? অথবা, প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী কাদের বলা হত?
উত্তর: ১৮১৩ সালে চ্যাটার অ্যাক্ট অনুযায়ী ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ভারতীয়দের শিক্ষার উন্নতিকল্পে বার্ষিক এক লক্ষ টাকা ব্যয়ের নির্দেশ দেওয়া। কিন্তু ওই টাকা কিভাবে ব্যয় করা হবে তা সুনির্দিষ্ট ছিল না। এর ফলে যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় তা প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দ্বন্দ্ব নামে পরিচিত।
প্রাচ্যবাদী: এইচ টি প্রিন্সেপ, কোলবুক, উইলসন প্রমুখ পণ্ডিতগণ প্রাচ্য শিক্ষার জন্য সরকারি অর্থব্যয়ের দাবি জানান। এরা প্রাচ্যবাদী ও ওরিয়েন্টালিস্ট নামে পরিচিত।
পাশ্চাত্যবাদী: অপরদিকে টমাস ব্যাবিংটন মেকলে, আলেকজান্ডার ডাফ, সন্ডার্স প্রমুখ পাশ্চাত্য শিক্ষার জন্য ওই অর্থ ব্যয়ের দাবি তোলেন। এরা পাশ্চাত্যবাদী বা অ্যাংলিসিস্ট নামে পরিচিত। শেষপর্যন্ত পাশ্চাত্যবাদীদের দাবি কার্যকর হলে ভারতের পাশ্চাত্য শিক্ষাবিস্তারের পথ প্রশস্ত হয়।
8. কি উদ্দেশ্যে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপন করেন?
উত্তর: ১৮০০ সালে বড়লাট লর্ড ওয়েলেসলি কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপন করেন। ইংল্যান্ডের রাজ তৃতীয় উইলিয়ামের নাম অনুসারে এই কলেজের নাম রাখা হয় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ।
উদ্দেশ্য: ভারতে কর্মরত উচ্চ পদস্থ ইংরেজ কর্মচারীদের ভারতীয় ভাষা, আইন, সংস্কৃতি ও রাজনীতি প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষাদান করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।
গুরুত্ব: বাংলা সাহিত্যের কর্ম বিকাশে এই কলেজের কৃতি অধ্যাপকের ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
9. মেকলে মিনিট কি?
উত্তর: ১৮১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক এর শাসনকালে গভর্নর জেনারেলের পরিষদীয় আইনজ্ঞ, আইন সচিব ও জনশিক্ষা কমিটির সভাপতি টমাস ব্যাবিংটন মেকলে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার পক্ষে এক জোরালো দাবি সম্বলিত একটি প্রস্তাব পেশ করে। এটি মেকলে মিনিট নামে পরিচিত। এতে ভারতীয় শিক্ষা তথ্য প্রাচ্যশিক্ষা ও সাহিত্যের তীব্র নিন্দা করা হয় ও পাশ্চাত্য শিক্ষার গুরুত্বের কথা তুলে ধরা হয়। বেন্টিঙ্ক কর্তৃক তার সুপারিশ গৃহীত হলে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে দিগন্ত উন্মোচিত হয়। তারই সুপারিশে ১৮৩৫ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, বোম্বাইয়ে এলিফিনস্টোন কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।
10. ব্রাহ্মসমাজ পরিচালিত দুটি সমাজ সংস্কার মূলক কাজের নাম লেখো।
উত্তর: ১৮২৮ সালে রাজা রামমোহন রায় ব্রাহ্মসভা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৩০ সালে এটি ব্রাহ্মসমাজে পরিণত হয়। এই সমাজের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সমাজ সংস্কার। এই সমাজের প্রচেষ্টায় সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, জাতিভেদ প্রথা ইত্যাদির বিরুদ্ধে এবং অসম বিবাহ, নারী শিক্ষা, নারী স্বাধীনতা ইত্যাদির স্বপক্ষে আন্দোলন গড়ে ওঠে।
11. কে, কি উদ্দেশ্যে ক্যালকাটা স্কুলবুক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন?
উত্তর: ১৮১৭ সালে মহাত্মা ডেভিড হেয়ারের উদ্যোগে ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
উদ্দেশ্য : ইংরেজি ও ভারতীয় ভাষায় উন্নতমানের পাঠ্য বই রচনা করা অবদামে কিংবা বিনামূল্যে বই বিতরণ করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
গুরুত্ব : ভারতীয় শিক্ষার উন্নয়ন ও বিস্তারে এই সোসাইটির অবদান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
12. ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে শ্রীরামপুর ত্রয়ী বা শ্রীরামপুর মিশনের ভূমিকা কি ছিল?
উত্তর: ভারতে শিক্ষা বিস্তারে শ্রীরামপুর মিশনের ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাপটিস্ট মিশনের ভিনজন সদস্য যথা – উইলিয়াম কেরি, উইলিয়াম ওয়ার্ড এবং জোসুয়া মার্শম্যান এর প্রচেষ্টায় ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে দিগন্তু উন্মুক্ত হয় ভারতের ইতিহাসে এরা শ্রীরামপুর ত্রয়ী নামে পরিচিত।
অবদান : এদের প্রচেষ্টায় শ্রীরামপুরে একটি বিদ্যালয় স্থাপিত হয় বর্তমানে এটি শ্রীরামপুর কলেজ নামে পরিচিত। এছাড়া সেখানে একটি কাগজের কল ও ছাপাখানা স্থাপিত হয়। ২৬ টি আঞ্চলিক ভাষায় বাইবেল অনুবাদ ও ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হয়। দিকদর্শন, সমাচার দর্পণ, ফ্রেন্ড অফ ইন্ডিয়া প্রভৃতি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
13. উইলিয়াম কেরি কি কারনে বিখ্যাত?
উত্তর: উইলিয়াম কেরি ছিলেন ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি সোসাইটির একজন খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব এবং ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্যের একজন বিখ্যাত পন্ডিত। মার্শম্যান ও উইলিয়াম ওয়ার্ডের সহযোগিতায় তিনি (ক) হুগলির শ্রীরামপুরে একটি বিদ্যালয়, ছাপাখানা ও কাগজের কল স্থাপন করেন। (খ) তাকে বাংলা গদ্য সাহিত্যের পথ প্রদর্শক বলা হয়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা ও সংস্কৃত সাহিত্যের অধ্যাপক রূপে তিনি যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেন। (গ) বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ ও উন্নয়নে, ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়।
14. শিক্ষার “চুইয়ে পড়া নীতি” বা “ফিলট্রেশন থিওরি” বা “ক্রমনিম্ন পরিশ্রুত নীতি” কি?
উত্তর: ভারতের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রচার না ঘটিয়ে কেবলমাত্র উচ্চবিত্ত মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটানো এবং তারপরে তাদের মাধ্যমে ভারতের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার ঘটানো নীতি হলো শিক্ষার চুইয়ে পড়া নীতি বা ফিলট্রেশন থিওরি বা ক্রমনিম্ন পরিশ্রুত নীতি।
উদ্দেশ্য: একদিকে সরকারের ব্যয় সংকোচ ঘটানো ও অন্যদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তার ঘটানোই ছিল এর উদ্দেশ্য।
15. মধুসূদন গুপ্ত কেন স্মরণীয়? অথবা; কে, কবে শব ব্যবচ্ছেদ ঘটান?
উত্তর: ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে ডা. মধুসূদন গুপ্ত এক অভিস্মরণীয় নাম।
শব ব্যবচ্ছেদ: ১৮৩৬ সালে ১০ই জানুয়ারি কলকাতা মেডিকেল কলেজের ছাত্র রুপে শব ব্যবচ্ছেদ করে এক যুগান্তকারী ঘটনা ঘটান। তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম শব ব্যবচ্ছেদকারী ছাত্র। এক্ষেত্রে তাকে সহায়তা করেন রাজকৃষ্ণ দে, দ্বারকনাথ গুপ্ত, উমাচরণ শেঠ, নবীনচন্দ্র দত্ত প্রমুখ ছাত্র।
অন্যান্য কৃতিত্ব: অনুবাদ গ্রন্থ, যেমন– লন্ডন ফার্মাকোপিয়া, অ্যানাটমি গ্রন্থ দুটি বাংলায় ও অ্যানাটমিস্টস ভ্যাডে মেকাশ গ্রন্থটি সংস্কৃত অনুবাদ তার কৃতিত্বের স্বাক্ষর বহন করে।
16. ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ বিভক্ত হলো কেন?
উত্তর: কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে গঠিত ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করলেও অচিরে এর সদস্যের মধ্যে আদর্শগত সংঘাত শুরু হয়।
কারন : পুরুষের বহুবিবাহ নিষিদ্ধ, অসম বিবাহের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ, খ্রিস্টধর্ম প্রীতি, শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ভক্তিবাদ ও হিন্দুদের প্রতি বিশ্বাস সর্বোপরি নিজের অপ্রাপ্তবয়স্ত ১৪ বছরের কন্যা সুনীতি দেবীর সঙ্গে কোচবিহারের রাজপুত্র নৃপেন্দ্র নারায়ণের বিবাহদানকে কেন্দ্র করে কেশবচন্দ্রের সঙ্গে তার অনুগামীদের বিরুদ্ধে দেখা দেয়।
পরিনতি : এরই ফলশ্রুতিতে আনন্দমোহন বসু, শিবনাথ শাস্ত্রী, জয়কৃষ্ণ গোস্বামী প্রমুখ ১৮৭৮ সালে গড়ে তোলেন সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ। অপরদিকে ১৮৮০ সালে কেশবচন্দ্র সেন গড়ে তোলে নববিধান ব্ৰহ্মসমাজ।
17. কে কি উদ্দেশ্যে ব্রাহ্ম সমাজ গঠন করেন ?
উত্তর: ১৮২৮ সালে ২০ আগস্ট রাজা রামমোহন রায় ব্রাহ্মসভা প্রতিষ্ঠা করেন ১৮৩০ সালে এটি ব্রাহ্মসমাজে পরিণত হয়।
উদ্দেশ্য: হিন্দু সমাজে আমার দিকগুলি বাদ দিয়ে তাকে কুসংস্কার ও একেশ্বরবাদী করার বাসনায় তিনি ব্রাহ্মসমাজ গড়ে তোলেন। পৌত্তলিকতার অবসান ঘটানো, মানবতাবাদের প্রসার ইত্যাদি ঘটানো ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।
18. ডিরোজিও কেন স্মরণীয় ?
উত্তর: প্রবল যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও ছিলেন ইয়ং বেঙ্গল দলের নেতা। অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা ও কলেজে তরুণ অধ্যাপক তিনি একধারে ছিলেন কবি, দার্শনিক ও শিক্ষাব্রতী।
তিনি তার অসাধারণ মেধার দ্বারা হিন্দু কলেজের ছাত্রদের মনে যুক্তিবাদ, ন্যায়বিচার বোধ ও স্বদেশ হিভেষনার বীজ বপন করেন। কুসংস্কার ও রক্ষণশীলতার মূলে আঘাত হেনে ডিরোজিও ও তার অনুগামীরা বাংলাদেশে নবজাগরণের পথ প্রশ্নস্ত করেন। মাত্র ২৩ বছর বয়সে ১৮৩১ সালে ঝড়ের পাখির অকাল প্রয়াণ ঘটে।
19. ইয়ং বেঙ্গল বা নব্য বেসন আন্দোলন বলতে কী বোঝো?
উত্তর: প্রবন যুক্তিবাদী অধ্যাপক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও -এর প্রভাবে হিন্দু কলেজকে কেন্দ্র করে এক দল উগ্র পাশ্চাভ্যবাদী যুব সম্প্রদায় যে প্রগতিশীল আন্দোলন গড়ে তোলে, তা ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন নামে পরিচিত। যদিও ওই আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি তথাপি ক্ষণস্থায়ী এই আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ নবযুগের আবির্ভাবকে ত্বরান্বিত করে।
20. ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা ত্রুটিগুলি কি ছিল?
উত্তর: ডিরোজিও ও তার শিষ্যদের ঐকান্তিক প্রয়াসে বাংলাদেশে নবজাগরণের পথ প্রশস্ত হলেও এই আন্দোলন দুটি মুক্ত ছিল না।
ত্রুটি: (ক) ওই গোষ্ঠীর কোনো গঠনমূলক কর্মসূচি ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল না তারা শুধু সমাজ ও ধর্মকে আক্রমণ করে হিন্দু সমাজকে আতঙ্কিত করে। (খ) এই আন্দোলন শুধুমাত্র শহরের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
(গ) মুসলমান সমাজের সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক ছিল না।
(ঘ) পশ্চিমবঙ্গের আদর্শের প্রতি অত্যাধিক আনুগত্য হেতু এই গোষ্ঠীর সদস্যরা নিজেদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
(ঙ) দরিদ্র কৃষক ও শ্রমিকদের কল্যাণী নেননি।
ভাই ডক্টর অনিল শীল বলেন অত্যাধিক বাড়াবাড়ির জন্য ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠী জনপ্রিয় হারায়।
21. সমাজ সংস্কারে নব্যবঙ্গদের ভূমিকা কি ছিল?
উত্তর: সমাজ সংস্কারে নব্যবঙ্গদের ভূমিকা বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
(ক) এই গোষ্ঠী হিন্দু ধর্মের পৌত্তলিকতা, অস্পৃশ্যতা, জাতিভেদ, সতীদাহ প্রভৃতি কুপ্রথার বিরুদ্ধে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা প্রতিবাদে সোচ্চার হয়।
(খ) তাদের উদ্যোগে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটে, নারী শিক্ষা বিস্তারের পথ প্রশস্ত হয়।
(গ) জুরির মাধ্যমে বিচার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রভৃতি ক্ষেত্রে এই গোষ্ঠী সোচ্চার হয়।
(ঘ) ভারতবর্ষের মধ্যে যুক্তিবাদদের ও মানবতাবাদী মানষিকতা সৃষ্টিতে ও র্যাডিক্যাল চিন্তাভাবনার প্রসারে এই দলের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
22. শ্রীরামকৃষ্ণদেবের সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শ কি ছিল?
উত্তর: আধুনিক ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হলেন শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। তথাকথিত শিক্ষা দীক্ষা ও সংস্কৃতিহীন পাশ্চাত্য-জ্ঞান বর্জিত এই দরিদ্র ব্রাহ্মণ জীবন ও সাধনার দ্বারা উপলব্ধি করেছিলেন ভারতীয় দর্শন সংস্কৃতি ও সাধনার সত্যতা।
তিনি বলেন যে প্রত্যেক ধর্মের মধ্যে আছে সভ্য এবং প্রত্যেক ধর্মের মধ্য দিয়ে ঈশ্বর লাভ করা যায় অর্থাৎ যত মত তত পথ। তার মতে বৈষ্ণব, হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান প্রভৃতি সকল ধর্মের সাধনার মধ্য দিয়ে ঈশ্বর লাভ সম্ভব।
23. লালন ফকির কে ছিলেন?
উত্তর: আধ্যাত্মবাদী বাউল সাধক লালন ফকির ছিলেন উনিশ শতকে বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জগতের এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। লেখাপড়া না জানলেও হিন্দু ও মুসলিম ধর্ম শাস্ত্র বিষয়ে তার ছিল অগাধ জ্ঞান। জাত-পাতের কিংবা কোনো বিশেষ ধর্মের রীতিনীতি পালনের তিনি ছিলেন ঘোর বিরোধী। সকল ধর্মের উর্ধ্বে তিনি মানবধর্মকে স্থান দিয়েছেন। তার বিখ্যাত বাউল সংগীত গুলোতে মানবতাবাদের আদর্শ প্রচারিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার গান ও দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল।
24. নব্য বেদান্ত বাদ কি?
উত্তর: স্বামী বিবেকানন্দের ধর্মীয় চিন্তাধারার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নব্য বেদান্তবাদ। তার ধর্ম ভাবনা সকল কর্ম প্রচেষ্টা ও সাধনার মূল ভিত্তি ছিল বেদান্ত। তিনি বেদান্তের যে নতুন ব্যাখ্যা দেন, তা নব্য বেদান্ত নামে পরিচিত।
অদ্বৈত বেদান্ত দমন: অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনে বলা হয়েছে ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা, ব্রহ্ম ছাড়া জগতের পৃথক কোনো অস্তিত্ব নেই।
নব্য বেদান্ত ব্যাখ্যা: তিনি প্রাচীন অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনে নতুন নিজস্ব ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন সর্বত্রই যেহেতু ব্রহ্মের উপস্থিতি তাই সাধারণ মানুষের সেবা করলেই ব্রহ্মের সেবা হবে। তিনি আরো বলেন যে, আচার অনুষ্ঠান কেন্দ্রিক ধর্ম হলো ধর্মের গৌণ রূপ আর মুখ্য রূপ হলো মানবসেবা, জীবনসেবা একেই তিনি প্র্যাকটিক্যাল বেদান্ত বা কর্মে পরিণত বেদান্ত বলেছেন।
25. বাংলার নবজাগরণের সঙ্গে ইতানির নবজাগরণের দুটি অমিল বা বৈসাদৃশ্য লেখো।
উত্তর: অমলেশ ত্রিপাঠী, অধ্যাপক অনিল শীল, অশোক মিত্র, বিনয় ঘোষ, সুপ্রকাশ রায়, ড. বরুন দে, ড. সুমিত সরকার প্রমুখ ইটালি নবজাগরণের সাথে বাংলার নবজাগরণের তুলনা অর্থহীন বলে মনে করেন।
বৈসাদৃশ্য: (ক) ইতালির নবজাগরণ ঘটেছিল স্বাধীন ও মুক্ত পরিবেশে কিন্তু বাংলার নবজাগরণ ঘটেছিল বন্ধ পরিবেশে।
(খ) ইতালির স্বাধীন ও স্বনির্ভর বুর্জোয়া শাসক শ্রেণী নবজাগরণে নেতৃত্ব দান করলেও বাংলার নবজাগরণের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন কৃষক শোষণকারী কিছু জমিদার, কিছু ইংরেজ সহযোগী ব্যবসায়ী, উকিল, ডাক্তার, মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবী প্রমুখ।

মাধ্যমিক ইতিহাস দ্বিতীয় অধ্যায়
8 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর
1. উনিশ শতকে নারী সমাজের কল্যাণে বামাবোধিনী পত্রিকার ভূমিকা কি ছিল? ০৪
উত্তর: ব্রাহ্ম নেতা কেশবচন্দ্র সেন ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নারী প্রগতির অন্যতম প্রবক্তা। মূলত, তাঁরই অনুপ্রেরণায় একদল যুবক 1862-63 খ্রিস্টাব্দ নাগাদ অন্তঃপুরস্থ মহিলাদের শিক্ষাদানের উদ্যোগ নেন। পাশাপাশি তাঁদের প্রয়াসেই 1863 খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে বামাবোধিনী সভা নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। প্রকৃতপক্ষে, এই সভারই মুখপত্র ছিল বামাবোধিনী পত্রিকা (আগস্ট, 1863)। এই পত্রিকার স্বত্বাধিকারী ও সম্পাদক ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের আর-এক নেতা উমেশচন্দ্র দত্ত। এই পত্রিকাটি স্বভাবতই কলকাতা থেকে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হত।
উদ্দেশ্য: বামাবোধনী পত্রিকার প্রধান উদ্দেশ্য গুলি ছিল- নারী সমাজের উন্নতি ঘটানো, নারী শিক্ষার প্রসার ঘটানো ও সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার দূর করা ইত্যাদি।
সমাজ কল্যাণ:
১) নারী শিক্ষার প্রসার: ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার সমাজের সকল মানুষই নারী শিক্ষার বিরোধী ছিল। তাদের মতে নারীরা শুধুমাত্র বাড়ির কাজ করবে তাদের শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজন নেই। কিন্তু বামাবোধিনী পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় স্ত্রী শিক্ষা বা নারী শিক্ষার দাবি জানানো হয় এবং শিক্ষাদানের তালিকা প্রস্তুত করা হয়।
২) কুসংস্কারের বিরোধিতা: বামাবোধিনী পত্রিকা থেকে সমকালীন সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন কুসংস্কারের, যেমন- বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, পণপ্রথা, বৈধব্য যন্তনা, কৌলিন্য প্রথা প্রভৃতির বিরোধিতা করা হয়।
৩) নারী প্রগতি: এই পত্রিকাতে নারীর স্বাস্থ্য রক্ষা, শিশু পালন, গৃহ কার্য ইত্যাদির কথা লেখা হতো। আবার নারীকে শিক্ষিত, যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক করার জন্য রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, জ্যোতিবা ফুলে প্রমুখের চিন্তাধারা আলোচিত হয়।
৪) নারীদের কার্যকলাপ: এই পত্রিকা পত্রিকায় নারীদের বিভিন্ন কর্মের যেমন– নারীদের কবিতা লেখা, গল্প লেখা ইত্যাদির কথা উল্লেখ করা হয়। নারীদের সাফল্য, কৃতিত্ব ও রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করার জন্য উৎসাহ দান করা হয়।
উপসংহার: উনিশ শতকে নারী সমাজের উন্নতিতে বামাবোধিনী পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। বামাবোধিনী পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতে নারীদের বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা লেখা হতো যাতে তাদের ভ্রম ও কুসংস্কার সকল দূর হয়ে যায়।
2. হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকা থেকে বাংলা সমকালীন সমাজের কি পরিচয় পাওয়া যায় ? ০৪
উত্তর: উনিশ শতকে বাংলার প্রকাশিত সংবাদপত্র গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকা। এই পত্রিকাটি ১৮৫৩ সালে ৬ই জানুয়ারি প্রথম প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি সাপ্তাহিক পত্রিকা থাকলেও ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে দৈনিক পত্রিকায় পরিণত হয়। পত্রিকাটি প্রথম সম্পাদক ছিলেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ পরে এই পত্রিকার সহায়ক সম্পাদক হন হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। উনিশ শতকে গ্রামীণ সমাজ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিভিন্ন দিকের বর্ণনা পাওয়া যায় এই পত্রিকা থেকে।
সমাজের পরিচয়: এই পত্রিকা থেকে বাংলা সমাজের যে উল্লেখযোগ্য দিকগুলি পাওয়া যায় তা হলো–
১) বাংলায় ইংরেজ শোষণ: উনিশ শতকে বাংলায় ব্রিটিশ সরকার সরকারের পুলিশ জমিদার ও মহাজনদের শোষণ ও অত্যাচারের কথা হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকা নিয়ন্ত্রিত।
২) কৃষিকাজ: গ্রামীণ সমাজে জমিদারের উপস্থিতি থাকলেও কৃষকদের আউশ, আমন ধান চাষের মাধ্যমে সারা বছরে খাদ্যশস্য জোগাড় করত। তবে নীল চাষের প্রসার ঘটলে কৃষকদেরকে তাদের জমিতে নীল চাষ করতে বাধ্য করতো।
৩) অলাভজনক নীল চাষ: অলাভজনক নীল চাষে কৃষকদের অসম্মতি থাকলেও যে কৃষক একবার নীলকর সাহেবদের কাছ থেকে নীল চাষের জন্য দাতন গ্রহণ করেছিল, তাদের নীল চাষ থেকে অব্যবহৃত ছিল না। শেষ পর্যন্ত চাষিরা নীলকরদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল।
৪) সামাজিক প্রথা: মেয়েদের বাল্যবিবাহ, পুরুষদের বহুবিবাহ ও মদ্যপান প্রভৃতির উল্লেখ পাওয়া যায়।
৫) মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের অবস্থান: উনিশ শতকে খাদ্যশস্যের বদলে অধিকারী ফসল উৎপাদন করে তা বিদেশে রপ্তানি করলে কৃষিপণ্য ও খাদ্যশস্যের দাম বৃদ্ধি পেলে সমাজ জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়া শিক্ষিত ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
মূল্যায়ন: হিন্দু পেট্রিয়ট পত্রিকা যেভাবে বাংলার সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হয়েছিল তা মূলত জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ফুটে ওঠা চিহ্ন। প্রবল পরাক্রান্ত ইংরেজ শাসনের রক্তচুষা উপেক্ষা করে যে নির্বাক সাংবাদিক দৃষ্টান্ত হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় লিখেছিল তা কথায় অনন্য।
3. হুতোম প্যাঁচার নকশা গ্রন্থে থেকে উনিশ শতকে বাংলার সমাজের কি পরিচয় পাওয়া যায় ? ০৪
উত্তর: কালীপ্রসন্ন সিংহ হুতোম প্যাঁচার ছদ্মনামে হুতোম প্যাঁচার নকশা গ্রন্থটি রচনা করেন। এই গ্রন্থটি ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে কলকাতা ও তার আশেপাশের বৃত্তবান বাবু সমাজের এক বাস্তবচিত্র অঙ্কন করেছেন।
সমাজের পরিচয়:
১) ধনী সমাজের কথা: কালীপ্রসন্ন সিংহ ছিলেন এক ধনী পরিবারের সন্তান। ফলে তিনি ধনী সম্প্রদায়ের মানুষদের দেখেছেন খুব কাছ থেকে। এই গ্রন্থে তিনি ধনী সম্প্রদায়ের হীরনতা, কপটতা ও ভন্ডামীর কথা তুলে ধরেছেন। এবং তাদের বিরুদ্ধে লেখনি ধারণ করেছেন। তার আক্রমণের ভাষা ছিল তীক্ষ্ণ ও ঝাঁজালো।
২) বাবু সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা: ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী এবং গ্রাম থেকে কলকাতায় চলে আসা জমিদাররা যে বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন তা বাবু সংস্কৃতি নামে পরিচিত লাভ করে। এই গ্রন্থে তিনি কলকাতায় এই বাবু সমাজের ধনীবৈভব, ভোগপ্রবণতা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরেন।
৩) কলকাতার সামাজিক সংস্কৃতি: হুতোম প্যাঁচার নকশা গ্রন্থে কলকাতার সামাজিক জীবনের অনেক উপাদান সম্পর্কে জানা যায়। যেমন – পৌষ পার্বণ, কলকাতার বারোয়ারি পুজো, মাহেশের স্নানযাত্রা, দুর্গোৎসব, রাসলীলা, রথযাত্রা ইত্যাদি। এগুলিকে গ্রন্থে ব্যঙ্গ ও সমালোচনার মোড়ক উপস্থাপনা করা হয়েছে।
৪) অন্ধকার সমাজের আলোকপাত: এই গ্রন্থের সমাজের অপসংস্কৃতি মূলক দিকগুলিকে ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরা হয়েছে। যেমন – মদ্যপান, বাইজি নাচ, অশ্লীল ভাষাযুক্ত আখরাই গান, ভ্রুণ হত্যা।
উপসংহার: কালীপ্রসন্ন সিংহ তার হুতোম প্যাঁচার নকশায় তৎকালীন সমাজ জীবন ও ব্যক্তিজীবনের ক্ষতস্থান গুলিকে চিহ্নিত করেছেন। পরিশেষে একথা বলা যায় উনিশ শতকে কলকাতায় বাবু সমাজের যে পরিবর্তন এসেছিল তার মূল কারণ ছিল বাঙ্গালীদের ইংরেজ অনুকরণ ও পাশ্চাত্য শিক্ষা।
4. গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকা থেকে বাংলা সমকালীন সমাজের কি পরিচয় পাওয়া যায় ? ০৪
উত্তর: ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া থেকে গ্রামবার্তা প্রকাশিকা মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন হরনাথ মজুমদার। যিনি কাঙ্গাল হরিনাথ নামে পরিচিত। তিনি এ পত্রিকার জন্য সংবাদ সংগ্রহ করতেন। গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ সংবাদ গুলিকে সকলের সামনে তুলে ধরা। গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকা কখনো আর্থিক স্বচ্ছলতার মুখ দেখতে পারেনি। বিভিন্ন সদহৃব্যক্তির আর্থিক সহায়তায় ২৫ বছর এই পত্রিকাটি চালু ছিল। অবশেষে মাত্র এক টাকা ঋণের দায় এই পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।
সমাজের পরিচয়:
১) সরকারের শাসন: ব্রিটিশ সরকারের শাসন ও অত্যাচারে বাংলার দরিদ্র মানুষের জীবন কিরূপ দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল তা কাঙাল হরিনাথ তার গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকায় তুলে ধরেন।
২) জমিদারের শাসন: চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের ফলে জমিদাররা কোম্পানি মদতে এবং জোতদারের সহায়তায় বাংলার গ্রাম অঞ্চলে যে প্রবল অত্যাচার ও শাসন চালায় তা ধারাবাহিকভাবে এই পত্রিকায় প্রকাশ করেন হরিনাথ মজুমদার।
৩) বিদ্রোহ ও দুর্ভিক্ষ সংবাদ: ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দ সিরাজগঞ্জে বিদ্রোহ শুরু হলে গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকা প্রজাদের পক্ষ নেই ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দ দুর্ভিক্ষ শুরু হলে কাঙ্গাল হরিনাথ তার প্রতিকার মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এবং দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের হয়ে প্রচার করেন।
৪) নীলকরদের অত্যাচার: কাঙাল হরিনাথ কিছুদিন নীলকুঠিতে কাজ করার সময়, নীলকরদের অত্যাচার স্বচক্ষে দেখেন। নীল চাষীদের এই শাসন ও অত্যাচারের বিবরণ তিনি নিয়মিত এই পত্রিকায় প্রকাশ করতেন।
৫) নারীদের অবস্থা: এই পত্রিকা থেকে সমাজে নারীদের দুরবস্থা সম্পর্কে জানা যায় এবং এটাও জানা যায় যে কিছু উদার মনষ্ক মানুষ নারী শিক্ষা প্রসারের জন্য সচেষ্ট হয়েছিলেন।
৬) শিক্ষার প্রসার: উনিশ শতকে নিরক্ষর মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। এই কারণে এই পত্রিকার মাধ্যমে শিক্ষার প্রসারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং কিছু লেখা প্রকাশ করা হয়।
উপসংহার: গ্রামবার্তা পত্রিকায় গ্রাম বাংলার ছবি তুলে ধরা হত। এই পত্রিকায় বাংলার সাধারণ মানুষের শোষণ ও অত্যাচারের কাহিনী নিয়মিত তুলে ধরে বাংলার মানুষকে সচেতন করার যে উদ্যোগ করা হয়েছিল তা অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য।
5. ‘প্রাচ্য শিক্ষা – পাশ্চাত্য শিক্ষা বিষয়ক দ্বন্দ্ব’ বলতে কী বোঝো? বা শিক্ষাবিস্তারে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দ্বন্দ্ব বা বিতর্ক বলতে কী বোঝো? ০৪
উত্তর: এদেশে কোম্পানির শাসনের প্রথম দিকে মোটামুটিভাবে প্রাচ্যশিক্ষার ওপরেই জোর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৮১৩ সালে চ্যাটার অ্যাক্ট অনুযায়ী ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ভারতীয়দের শিক্ষার উন্নতিকল্পে বার্ষিক এক লক্ষ টাকা ব্যয়ের নির্দেশ দেওয়া। কিন্তু ওই টাকা কিভাবে ব্যয় করা হবে তা সুনির্দিষ্ট ছিল না। এর ফলে প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদীদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব বা বিতর্কের সৃষ্টি হয় তা ‘প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দ্বন্দ্ব’ নামে পরিচিত। এই টাকা কোন খাতে খরচ হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহনের জন্য ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে ‘জেনারেল কমিটি অফ পাবলিক ইন্সট্রাকশন’ বা ‘জনশিক্ষা কমিটি’ গঠিত হয়।
প্রাচ্যবাদী: বাংলা তথা ভারতবর্ষের সংস্কৃত, ফারসি ও আরবি শিক্ষা দীর্ঘদিন ধরে চালু ছিল, এই শিক্ষা প্রাচ্যশিক্ষা নামে পরিচিত। এই প্রাচ্য শিক্ষা বিস্তারের সমর্থক বা প্রাচ্যবাদী নেতা ছিলেন এইচ. টি. প্রিন্সেপ, কোলব্রুক, উইলসন প্রমূখ। তাদের মতে প্রাচ্য শিক্ষায় হলো প্রকৃত শিক্ষা। কারণ এদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে এই শিক্ষা ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং প্রায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী এই শিক্ষার সঙ্গেই যুক্ত।
পাশ্চাত্যবাদী: বাংলায় ইংলিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর কলকাতা এবং বিভিন্ন শহরে বেসরকারি উদ্যোগে কিছু কিছু স্কুল, কলেজ গড়ে উঠতে থাকে। এই স্কুলে পাস করা ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন বাণিজ্যিক এবং সরকারি ক্ষেত্রে চাকরি পেতো। এই ধরনের স্কুলের সংখ্যা ও ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বেড়েই চলে। এই শিক্ষা পাশ্চাত্য শিক্ষা নামে পরিচিত। এই শিক্ষার সমর্থক বা পাশ্চাত্যবাদী নেতা হলেন ট্রেভেলিয়ান, আলেকজান্ডার ডাফ, স্যান্ডার্স প্রমুখ। তাদের মতে, ইংরেজি যেহেতু আন্তর্জাতিক ভাষা তাই সনদ আইনে বরাদ্দ করা ১ লক্ষ টাকাকে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের জন্যই ব্যয় করা উচিত।
রাজা রামমোহন রায়ের চিঠি: রাজা রামমোহন রায় ছিলেন শিক্ষিত ভারতীয়দের প্রতিনিধি। প্রাচ্য-পাশ্চাত্য বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে রাজা রামমোহন রায় ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের জন্য লর্ড আমহার্স্টকে একটি পত্র লেখেন। যেহেতু রাজা রামমোহন রায় ভারতীয় প্রতিনিধি ছিলেন তাই লর্ড আমহার্স্ট তার মতকেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
ফলাফল: শেষ পর্যন্ত ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে ৭ই মার্চ লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক পাশ্চাত্য শিক্ষাকে সরকারি শিক্ষানীতি হিসেবে গ্রহণ করেন। এরপর ভারতের পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তিত হয় এবং প্রসার ঘটতে থাকে। পরিশেষে বলা যায় যে, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য বিতর্কে পাশ্চাত্যবাদীদেরই জয় হয়েছিল।
6. টিকা লেখো – উডের ডেসপ্যাচ বা উডের প্রতিবেদন বা উডের নির্দেশ নামা। ০৪
উত্তর: ভারতের পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দের উদের নির্দেশনামা। বোর্ড অফ কন্ট্রোলের সভাপতি স্যার চার্লস উড ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের জন্য ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ১৯ শে জুলাই একটি নির্দেশনামা বা প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, যা উডের ডেসপ্যাচ বা উডের প্রতিবেদন নামে পরিচিত।
সুপারিশ: স্যর চার্লস উডের সুপারিশপত্রে বলা হয়েছিল যে–
১) কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে
২) একটি স্বতন্ত্র শিক্ষা দফতর প্রতিষ্ঠা করতে হবে
৩) শিক্ষক-শিক্ষণ বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে
৪) বিদ্যালয়গুলিকে সরকারি অনুদান দিতে হবে
৫) মাতৃভাষায় শিক্ষা দান করতে হবে
৬) স্ত্রীশিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে
৭) প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ফলাফল: স্যার চার্লস উডের এইসব সুপারিশ গুলির উপর ভিত্তি করে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। এই সুপারিশ অনুযায়ী,
১) ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে বড়োেলাট লর্ড ডালহৌসি বাংলা, বোম্বাই, পাঞ্জাব প্রভৃতি প্রদেশে শিক্ষাদপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন।
২) 1857-58 খ্রিস্টাব্দে কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়।
পরিশেষে বলা যায়, ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষাবিস্তারের ইতিহাসে উডের প্রতিবেদনের ফলে ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সারা ভারতে সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যা হয় ১৩৬৩টি, যা ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে ছিল মাত্র ১৬৯টি। এই সময়ে বেসরকারি উদ্যোগেও বহু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
গুরুত্ব: উডের নির্দেশনামা প্রকাশের আগে পর্যন্ত ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের গতি ছিল অত্যন্ত ধীর। উডের প্রতিবেদনের ফলে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বহু স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতের শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এর জন্য চার্লস উডের নির্দেশ নামাকে ভারতের শিক্ষা বিস্তারে মহাসনদ বা ম্যাগনাকার্টা বলা হয়।
7. শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভূমিকা উল্লেখ করো। ০৪
উত্তর: শিক্ষাবিস্তারের ক্ষেত্রে যে সমস্ত ব্যক্তি স্মরণীয় তাদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বাংলার জনশিক্ষা, উচ্চশিক্ষা ও নারীশিক্ষার প্রসারে এবং বাংলা গদ্যের বিকাশে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
শিক্ষা বিস্তার:
১) সংস্কৃত কলেজ: উনিশ শতকের সমাজে যে জাতিভেদ প্রথা ও বর্ণবৈষম্য সমাজকে দুর্বল করেছিল সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক হিসেবে বিদ্যাসাগর সেই বর্ণবৈষম্য প্রথা দূর করেন। আগে কেবলমাত্র ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য সন্তানরাই সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হতে পারত। বিদ্যাসাগর এই প্রথা বাতিল করে সংস্কৃত কলেজের দরজা সকল বর্ণের হিন্দু ছাত্রদের জন্য খুলে দেন।
২) মাতৃভাষায় শিক্ষা বিস্তার: তিনি সংস্কৃত ভাষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষাগ্রহণের ওপর জোর দেন। অবশ্য একই সঙ্গে তিনি ইংরেজি ও পাশ্চাত্য শিক্ষার গুরুত্বও উপলব্ধি করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ভারতীয় ও পাশ্চাত্য শিক্ষার সমন্বয়। তাই তিনি মাতৃভাষায় পাশ্চাত্য শিক্ষাগ্রহণের ওপর জোর দেন।
৩) গ্রামে বিদ্যালয় স্থাপন: লর্ড হার্ডিঞ্জের সহায়তার তিনি বাংলার নানা অঞ্চলে প্রায় 100টি বাংলা স্কুল প্রতিষ্ঠ করেন। এদের মধ্যে মাত্র 33টি স্থায়ী হয়েছিল। অতঃপর বিদ্যাসাগরের পরিকল্পনা অনুসারে বাংলার ছোটোলাট হ্যালিডের আমলে (1854-69 খ্রিস্টাব্দে) বাংলায় বহু মডেল স্কুল স্থাপিত হয়। বিদ্যাসাগর নিজ উদ্যোগে বাংলার বিভিন্ন জেলায় 20টি মডেল স্কুল প্রতিষ্ঠ করেন।
৪) মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন স্থিপন: ইংরেজি শিক্ষার প্রসারকল্পে বিদ্যাসাগর কলকাতায় মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন (1868 খ্রিস্টাব্দে) প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে এর নাম বিদ্যাসাগর কলেজ।
৫) গ্রন্থ রচনা: এছাড়াও তিনি পাঠ্যক্রমেও পরিবর্তন ঘটান। সংস্কৃত ব্যাকরণ হিসেবে মুগ্ধবোধ গ্রন্থটি ভ্রান্ত ও অসম্পূর্ণ বলে সেটি বাতিল করেন এবং শুদ্ধ ব্যাকরণ শিক্ষার জন্য সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা ও ব্যাকরণ কৌমুদি রচনা করেন। গণিত গ্রন্থ হিসেবে প্রচলিত ভাস্করাচার্যের লীলাবতী ও বীজগণিত তিনি বাতিল করে দেন। পরিবর্তে ইংরেজি গণিত গ্রন্থ পাঠের ব্যবস্থা করেন। জনশিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে বিদ্যাসাগর বর্ণপরিচয়, কথামালা, নীতিবোধ, বোধোদয়, চরিতাবলি ইত্যাদি বহু গ্রন্থ রচনা করেন।
উপসংহার: উনবিংশ শতাব্দীর শিক্ষাবিস্তারের ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগর যে ভূমিকা গ্রহণ করেন তা এককথায় অবিস্মরণীয়। শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারক রূপে বিদ্যাসাগর দৃঢ়তা ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। তাঁর প্রশংসা করে ঐতিহাসিক অমলেশ ত্রিপাঠী তাঁকে ‘ঐতিহ্যবাহী আধুনিকতাবাদী’ বলে অভিহিত করেছেন।
8. নারী শিক্ষা বিস্তারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভূমিকা উল্লেখ করো। ০৪
উত্তর: জনশিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগর শুধু বালকদের কথা ভাবেননি, বালিকাদের কথাও ভেবেছিলেন। কারণ, নারীশিক্ষার প্রসার ছিল তাঁর বৃহত্তর নারীমুক্তি আন্দোলনেরই অন্যতম অঙ্গ। নারীশিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে বিদ্যাসাগরের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁকে ‘নারীশিক্ষা বিস্তারের পথিকৃৎ’ বলা হয়।
নারীশিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্য: বিদ্যাসাগরের নারীশিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্য ছিলো– (i) বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ প্রবর্তন, বহুবিবাহ রোধ করে বিভিন্ন সামাজিক কুপ্রথার বিরুদ্ধে প্রবল জনমত গড়ে তোলে নারী মুক্তি ঘটানো। (ii) নারীকে শিক্ষিত করে তোলা সম্ভব হলে পরবর্তী প্রজন্ম শিক্ষিত হয়ে উঠবে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন।
নারীশিক্ষা বিস্তার:
১) ক্যালকাটা ফিমেল স্কুল: নারী শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন,বিদ্যাসাগর প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা দক্ষিণারঞ্জনের বাড়িতে ক্যালকাটা ফিমেল স্কুল গড়ে তোলেন। এবং বিদ্যাসাগর এই স্কুলের ছাত্রী যোগ জোগাড়ে উদ্যোগী হন।
২) ভগবতী বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা: বিদ্যাসাগর তার নিজের জন্মস্থান মেদিনীপুরে বীরসিংহ গ্রামে মা ভগবতী দেবীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন ভগবতী বিদ্যালয়।
৩) নারীশিক্ষা ভান্ডার: বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত বালিকা বিদ্যালয়গুলিকে সরকার আর্থিক সাহায্যদান বন্ধ করলে বিদ্যাসাগর নারীশিক্ষা ভান্ডার নামে একটি তহবিল গঠন করেছিলেন।
৪) স্ত্রী-শিক্ষা সম্মেলন: বিদ্যাসাগর নারী শিক্ষার যথাযথ প্রসারের জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে নদীয়া, বর্ধমান, হুগলী, মেদিনীপুর জেলায় বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
উপসংহার :– বিদ্যাসাগর নারী শিক্ষার প্রসার ও নারী সমাজ উন্নতির জন্য যুক্তির চেয়ে হিন্দু ধর্ম শাস্ত্রের উপর বেশি নির্ভর করেছিলেন।
9. পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা উল্লেখ করো। ০৪
উত্তর: রামমোহন রায় ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষার একান্ত অনুরাগী ও সমর্থক। ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করা ছাড়াও অন্যান্যদের প্রচেষ্টাতেও তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। তার পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজকে কুসংস্কার এর অন্ধকার থেকে সাধারণ মানুষকে দূরে রাখা। এইজন্যই তিনি পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে উদ্যোগী হয়েছিলেন।
পাশ্চাত্য শিক্ষাবিস্তার:
১) লর্ড আমহার্স্টকে চিঠি :– রাজা রামমোহন রায় ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড আমহার্স্টকে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের জন্য চিঠি লিখেন। এর ফলে ইংরেজ উদ্যোগে ভারতের পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তার ঘটতে থাকে।
২) হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা: ভারতীয়দের নবজাগরণের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হিন্দু কলেজ (১৮১৭) প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে রাজা রামমোহন রায় ডেভিড হেয়ারের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।
৩) ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটিতে যোগদান: ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে ডেভিড হেয়ারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি’ -তে একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন রামমোহন রায়। ক্যালকাটা স্কুলবুক সোসাইটির মূল উদ্দেশ্য ছিল খুব কম খরচে বা বিনামূল্যে সকলের মধ্যে বই বিতরণ করে শিক্ষা বিস্তার ঘটানো।
৪) বেদান্ত কলেজ প্রতিষ্ঠা: রাজা রামমোহন রায় ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে বেদান্ত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই কলেজে বৈদান্ত্রিক দর্শন, পাশ্চাত্য সমাজবিদ্যা ও পদার্থ বিজ্ঞান শিক্ষার ব্যবস্থা করেন।
৫) জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইন্সটিটিউশন: ভারতে ইংলিশ সরকার পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের উদ্যোগী হলে রাজা রামমোহন রায় তাকে সমর্থন করে। মূলত রাজা রামমোহন রায়ের প্রচেষ্টাতেই স্কটল্যান্ডের মিশনারি আলেকজান্ডার ডাক ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে গড়ে তোলেন জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশন।
উপসংহার: পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে রাজা রামমোহন রায়ের উদ্দেশ্য ছিল কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গঠন এবং পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ঘটিয়ে আধুনিক সমাজ গঠন করা। রাজা রামমোহন রায় ছিলেন প্রকৃত পাশ্চাত্য শিক্ষাপ্রেমিক। এজন্য অনেকে তাঁর সমালোচনা করলেও তাঁকে ‘নব ভারতের অগ্রদূত’ বলে অভিহিত করা হয়।
10. শিক্ষাবিস্তারে রাজা রাজাকান্ত দেবের ভূমিকা কি ছিল? ০৪
উত্তর:বাংলা তথা ভারতের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আঠারো শতক ছিল অন্ধকার যুগ। কিন্তু উনিশ শতক ছিল নবজাগরণের যুগ। রাজা রাধাকান্ত দেব সংস্কৃত ফরাসি ভাষায় অসাধারণ পন্ডিত এবং রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের নেতা হিসাবে পরিচিত। রাজা রাজাকান্ত দেব পাশ্চাত্য শিক্ষা, নারী শিক্ষা ও চিকিৎসা শিক্ষার পক্ষপাতী ছিলেন।
শিক্ষা বিস্তার:
১) পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তার:রাজা রাধাকান্ত দেব ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় হিন্দু কলেজ (যা বর্তমানে প্রেসিডেন্সি কলেজ) প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ডেভিড হেয়ার, বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়, স্যার হাইড ইস্ট প্রমুখের সঙ্গে মিলিতভাবে ভূমিকা পালন করেন। তিনি এই কলেজের পরিচালকমন্ডলীর সদস্য ছিলেন। তিনি ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই স্কুল বুক সোসাইটি এবং ক্যালকাটা স্কুল সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
২) নারীশিক্ষার প্রচার: তিনি – ক) ‘স্কুল সোসাইটি’র সম্পাদক রূপে বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা নেন।
খ) বেথুনকে ‘ক্যালকাটা ফিমেল স্কুল’ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন।
গ) গৌর মোহন বিদ্যালঙ্কারকে ‘স্ত্রীশিক্ষা বিধায়ক’ পুস্তিকা রচনায় উৎসাহ দেন।
ঘ) ইংরেজি শিক্ষিকা দ্বারা পরিবারের মহিলাদের শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেন।
ঙ) নিজের বাড়িতে ফিমেল জুভেনাইল সোসাইটির ছাত্রীদের নিয়মিত পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করেন।
৪) গ্রন্থ অনুবাদে উৎসাহ দান :– ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে ‘হিন্দু মেট্রোপলিটন’ কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এর পরিচালন সমিতির সভাপতি নিযুক্ত হন। রাজাকান্ত দেবের বিভিন্ন ইংরেজি সাহিত্য ও পাশ্চাত্য বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ বাংলা ভাষায় অনুবাদের জন্য হিন্দু কলেজে ছাত্রদের উৎসাহিত করেন।
মূল্যায়ন: বিশিষ্ট রক্ষণশীল হিন্দু নেতা রাজার রাজাকান্ত দেব পাশ্চাত্য শিক্ষা বিরোধী ছিলেন না। নারী শিক্ষার সামগ্রিকভাবে শিক্ষার প্রসারে তিনি আন্তরিকভাবে আগ্রহী ছিলেন।
11. পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বিটনের ভূমিকা কি ছিল? ০৪
উত্তর: উনিশ শতকে বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষাবিস্তারে যে সকল ইংরেজরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বিটন (বেথুন সাহেব)। ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে লর্ড ডালহৌসির আইন মন্ত্রী রূপে ভারতে আসেন। শিক্ষার প্রসারে বিশেষত নারী শিক্ষা বিস্তার ও পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
শিক্ষা বিস্তার :
মাতৃভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য শিক্ষা: তিনি তিনি ভারতে এসে এ দেশের মানুষদের দুঃখ দুর্দশা দেখে এদেশের মানুষদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে সিদ্ধান্ত নেন এবং দ্রুতগতিতে শিক্ষার বিস্তার ঘটানোর জন্য মাতৃভাষাতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটাতে থাকেন।
বিদ্যাসাগরের যোগদান: বেথুনের বিদ্যালয়ের খ্যাতি ও মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পায় বিদ্যাসাগর তাঁর স্কুলে যোগ দেওয়ার পরে। বেথুনের অনুরোধে বিদ্যাসাগর ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে এই বিদ্যালয়ের পরিচালন কমিটির সেক্রেটারি হন।
সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারীদের শিক্ষা: বেথুনের বিদ্যালয়ে রামগোপাল ঘোষ, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো ব্যক্তি যুক্ত থাকায় এখানে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েরা শিক্ষালাভের জন্য আসত। অভিভাবকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি ছাত্রীদের ভরতির ব্যবস্থা দেখাশোনা করত।
বেথুন স্কুল প্রতিষ্ঠা: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শিক্ষা কমিটির সভাপতি বিটন সাহেব ভারতবর্ষের নারীদেরকথি ভেবে ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দের ৭ মে উত্তর কলকাতায় স্থাপন করেন ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’। বর্তমানে এটি বেথুন স্কুল নামে পরিচিত। তিনি তাঁর যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি এই বিদ্যালয়ের জন্য দান করেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এই বিদ্যালয়ের অবৈতনিক সম্পাদক নিযুক্ত হন।
বেথুন কলেজ প্রতিষ্ঠা: শুধু স্কুল শিক্ষা নয়, নারীদের মধ্যে আধুনিক উচ্চশিক্ষার প্রসারের জন্য কলকাতার একটি মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে এটি বেথুন কলেজ নামে পরিচিত। এটি হল ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম মহিলা কলেজ। কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় ও চন্দ্রমুখী বসু ছিলেন এই কলেজের প্রথম ছাত্রী।
অন্যান্য কৃতিত্ব: ‘ফিমেল জুভেনাইল সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা, ‘কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরী’ স্থাপন, ‘বঙ্গানুবাদ সমাজ’ গঠন প্রভৃতিতে তাঁর ভূমিকা প্রশংসনীয়। ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দের ১২ আগস্ট কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়। বেথুন তিনি বাংলা ভাষায় গ্রন্থ অনুবাদ করেন।
উপসংহার: ভারতে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য শিক্ষার মেলবন্ধনে, নারী শিক্ষার বিস্তার প্রভৃতি ক্ষেত্রে তাঁর অবদান চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
12. চিকিৎসাবিদ্যার বিকাশে কলকাতা মেডিকেল কলেজের ভূমিকা উল্লেখ করো। ০৪
উত্তর: বড়লাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক বাংলায় চিকিৎসা বিদ্যার প্রসারের জন্য একটি কমিটি গঠন করেন। সেই কমিটির সুপারিশে ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতে পাশ্চাত্য চিকিৎসা বিদ্যার বিকাশ শুরু হয়।
চিকিৎসাবিদ্যার বিকাশ: আধুনিক চিকিৎসা চর্চায় কলকাতা মেডিকেল কলেজের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ক) উদ্দেশ্য: সরকারের উদ্দেশ্য ছিল এই কলেজ থেকে সব অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জেন্ট হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করা ছাত্রদের সামরিক ও অসামরিক কেন্দ্রে নিয়োগ করা।
খ) পাঠ্য বিষয়: মেডিকেল কলেজে তথ্যগত ও ব্যবহারিক অ্যানাটমি ও রসায়নবিদ্যা ও ব্যবহারিক মেডিসিন চিকিৎসায় ওষুধ প্রস্তুতিকরণ শেখানো হতো। প্রথমদিকে পাঠদানের মাধ্যম ইংরেজি হলেও পরবর্তীকালে দেশীয় ভাষার ব্যবহার শুরু হয়।
গ) হাতে কলমে শিক্ষা: কলকাতা মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থীদের হাতে কলমে শিক্ষা দিত। এই উদ্দেশ্যে ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে এখানে শব ব্যবচ্ছেদ করা হয়। এই শব ব্যবচ্ছেদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় মধুসূদন গুপ্ত।
ঘ) ছাত্রদের বিদেশে প্রেরণ: মেডিকেল কলেজে সুপারেনটেনডেন্ট ড. ব্রামলির কল্পনায় মেধাবী ছাত্রদের ইংল্যান্ডে প্রেরণ করে উচ্চমানের মেডিকেল শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। ভোলানাথ বসু, দ্বারকানাথ বসু, সূর্য কুমার চক্রবর্তী ছিলেন বিলেত ফেরত ডাক্তার।
উপসংহার: কলকাতা মেডিকেল কলেজ ছিল এশিয়া মহাদেশের দ্বিতীয় কলেজ। এই কলেজের ছাত্র মধুসূদন গুপ্ত ডক্টর গুডিভ এর তত্ত্বাবধানে প্রথম শব ব্যবচ্ছেদ করেন। কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রতি বছর আধুনিক পাশ্চাত্য চিকিৎসা বিদ্যা লাভ করে বহু ছাত্র দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চিকিৎসকের কাজে যুক্ত হয়। এই কলেজের প্রথম ব্যাচে পাশ করা উমেশচন্দ্র সেঠ ও রাজকৃষ্ণ দে প্রমুখ ডাক্তারদের ঢাকা, মুর্শিদাবাদ ও পাটনা প্রভৃতি স্থানে হাসপাতালে নিযুক্ত করে এদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রসার ঘটানো হয়।
13. উচ্চশিক্ষার বিকাশে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা উল্লেখ করো। ০৪
উত্তর: ১৮৫৪ সালে স্যর চার্লস উডের নির্দেশনামা প্রকাশ হলে সেখানে বলা হয় প্রতিটি প্রেসিডেন্ট শহরে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। সেই নির্দেশ অনুযায়ী ১৮৫৭ সালের ২৪ জানুয়ারি লর্ড ক্যানিং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে সাক্ষর করেন আর সেই দিনই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
উচ্চশিক্ষার বিস্তার
১) উদ্দেশ্য: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পিছনে উদ্দেশ্য গুলিছিলো-1. ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পারি এক্তিয়ারভুক্ত এলাকার প্রজাদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটানো
2. কলা, বিজ্ঞান, সাহিত্য বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার মাধ্যমে দক্ষতা নিরূপন করা
3. সমস্ত কলেজগুলিকে অনুমোদন দেওয়া, পরীক্ষা গ্রহন করা, উপাধি দান করা প্রভৃতি।
২) আচার্য ও উপাচার্য: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম আচার্য হন লর্ড ক্যানিং এবং প্রথম উপাচার্য হন স্যার জেমস্ উইলিয়াম কোলভিল।
৩) প্রবেশিকা পরিক্ষা: ১৮৫৭ সালে মার্চ মাসে পড়াশোনার জন্য প্রথম প্রবেশিকা পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় কলকাতা টাউন হলে। এতে ২৪৪ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহন করে।
৪) স্নাতক গন: ১৮৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম স্নাতক হন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, যদুনাথ বসু এবং ১৮৭৬ সালে স্নাতক হন কৃষ্ণমোহন ব্যানার্জী, ১৮৮৩ সালে প্রথম মহিল স্নাতক হন চন্দ্রমুখী বসু ও কাদম্বীনি গাঙ্গুলি।
৫) বৃত্তি প্রদান: বোম্বাই-এর একজন ধ্বনি ব্যক্তি হলেন প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্য অর্থ প্রদান করেন, যা প্রেমচাঁদ ও রায়চাঁদ বৃত্তি, ইশান চন্দ্র বৃত্তি নামে পরিচিত।
৬) অর্থদান: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষনার কাজে অর্থিক সাহায্য করার জন্য তারকনাথ পালিত, রাসবিহারী ঘোষ প্রমুখ অর্থ প্রদান করেন।
উপসংহার : ভারতের শিক্ষার ইতিহাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। প্রতিষ্ঠার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ লাভ করে। নানা বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পঠনপাঠনের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থান এবং অন্য দেশ থেকে তিনি বহু পণ্ডিতকে কলকাতায় একত্রিত করেছিলেন।
14. ব্রাহ্ম আন্দোলনে কেশবচন্দ্র সেন এর ভূমিকা কি ছিল? ০৪
উত্তর : ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে কেশবচন্দ্র সেন ব্রাহ্ম সমাজে যোগদান করলে ব্রাহ্ম আন্দোলন নববলে বলীয়ান হয়ে ওঠে। তাঁর ঐকান্তিক ভক্তিভাব, পাণ্ডিত্য, বাগ্মিতা, ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি শিক্ষিত তরুণ সম্প্রদায়কে উদ্বুদ্ধ করে। তাঁর প্রচেষ্টায় ব্রাহ্ম আন্দোলন বাংলার গণ্ডি পেরিয়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
ধর্ম সংস্কার:
আচার্যপদ গ্রহণ :– কেশবচন্দ্র সেনের ছিল বহুমুখী প্রতিভা। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন কেশবচন্দ্রের বহুমুখী প্রতিভার জন্য দেবেন্দ্রনাথ তাঁকে ‘ব্রহ্মানন্দ’ উপাধি এবং আচার্যপদ দান করেন।
ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা :– অসবর্ণ বিবাহ, বিধবা বিবাহ, উপবীত ধারণ, সংস্কৃতের স্থলে বাংলায় মন্ত্র উচ্চারণ ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে দেবেন্দ্রনাথ ও কেশবচন্দ্রের মধ্যে তীব্র বিরোধ বাধে। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে কেশবচন্দ্র ব্রাহ্মসমাজ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ’।
নববিধান ব্রাহ্মসমাজ :– কিছুদিনের মধ্যে চৈতন্য প্রীতি, খ্রিস্টপ্রীতি, মূর্তিপূজা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, নিজের অপ্রাপ্তবয়স্কা ১৪ বছরের কন্যা সুনীতিদেবীর সঙ্গে কোচবিহারের নাবালক রাজপুত্রের হিন্দুমতে বিবাহদান ইত্যাদিকে কেন্দ্র কেশবচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর অনুগামী সদস্যদের বিরোধ বাধে। এরপর ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘নব বিধান’ ‘ব্রহ্মসমাজ’ গড়ে তোলেন।
সমাজ সংস্কারে কেশবচন্দ্র :– সমাজ সংস্কারে কেশবচন্দ্র অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন। জাতিভেদ, অসবর্ণ বিবাহ, বিধবা বিবাহ, নারীদের সমাজের উচ্চস্থানে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ‘বামাবোধিনী সভা’ স্থাপনে ও ‘সঙ্গত সভা’, ‘ব্রাহ্ম বন্ধু সভা’ প্রতিষ্ঠা করে তিনি তরুণদের উৎসাহিত করেন। তাঁরই প্রচেষ্টায় সরকার ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে ‘তিন আইন’ পাস করে বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ রদ এবং অসবর্ণ বিবাহকে স্বীকৃতি দেয়।
উপসংহার :— কেশবচন্দ্রের নেতৃত্বে ব্রাহ্ম আন্দোলনে জোয়ার আসে। সমাজের বহু কুসংস্কার দূর হয়, শিক্ষাক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার কেশবচন্দ্রের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনকে • ‘প্রথম সর্বভারতীয় আন্দোলন’ বলে অভিহিত করেন।
15. রামকৃষ্ণ দেবের সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শ ব্যাখ্যা করো। ০৪
উত্তর : উনিশ শতকে বাংলায় ধর্ম ও সমাজ সংস্কারে যে সকল মহাপুরুষের আবির্ভাব হয়েছিল তাঁদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলেন ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব (১৮৩৬-৮৬ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি সর্বধর্ম সমন্বয়ের বাণী প্রচার করে হিন্দু সম্প্রদায়কে উজ্জীবিত করেন।
পরিচয় :– ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি হুগলি জেলার কামারপুকুরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম জীবনে তাঁর নাম ছিল গদাধর চট্টোপাধ্যায়। রানি রাসমণির নির্দেশে তিনি দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী কালীমন্দিরের পুরোহিত নিযুক্ত হন। সেখানেই তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনের সূচনা ঘটে। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১৬ আগস্ট তিনি লোকান্তরিত হন।
শিক্ষা-দীক্ষা :– তথাকথিত শিক্ষা-দীক্ষা, পাণ্ডিত্য, পাশ্চাত্য জ্ঞান কোনোটাই তাঁর ছিল না। তবে নিজের সহজ-সরল ভাষায়, উপমার সাহায্যে তিনি ধর্মীয় মতাদর্শ প্রচার করেন। এতে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকলেই প্রভাবিত হন।
ধর্ম সংস্কার:
ধর্মীয় মতাদর্শ :– তিনি বুঝেছিলেন সাধনার সকল পথই সত্য ও সঠিক এবং সকল পথের মধ্য দিয়ে অন্তরের ভক্তির দ্বারাই ঈশ্বরকে লাভ করা যায়। বিভিন্ন ধর্মের আচরণ বিধি নিজে পালন করে এই সত্যে পৌঁছান ‘যত মত তত পথ’।
শিবজ্ঞানে জীবসেবা :– তিনি বলেন, জীবে দয়া নয়, ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’ করতে হবে। তিনি বলেন, ঈশ্বরের নামে সংসার ত্যাগ বা কর্মত্যাগ না করে সংসারে আসক্তি, ত্যাগ ও নিষ্কাম কর্মের কথা বলেন।
মানবতাবাদ :– মানব মহিমার জয়গান গেয়ে তিনি মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব, সেবাধর্ম ইত্যাদির কথা প্রচার করেন। তিনি বলেন, জীবসেবা ও মানবসেবা হল ঈশ্বরসেবার প্রকারভেদ মাত্র। তিনি বলেন, প্রত্যেক মানুষই মুক্ত পুরুষ ও ঈশ্বরের সন্তান ও অনন্ত শক্তির অধিকারী। পাপী-তাপী, মদ্যপ, নাস্তিক সকলেই চৈতন্য লাভের পথিক।
নারীমুক্তির আদর্শ :– তিনি নারীকে সাক্ষাৎ জগন্মাতার প্রতিমূর্তি ভাবতেন। নারী জাতির দুর্দশামোচন ও সে কাজে নারীর নেতৃত্বকে স্বীকৃতি জানিয়ে নারীর মহিমা তুলে ধরেন।
উপসংহার :– তাঁর সর্বধর্ম সমন্বয়ের বাণী যেমন একদিকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের মধ্যে জ্ঞানের আলো জ্বালায় তেমনি অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করে, জাতীয়তাবাদকে সুদৃঢ় করে। ক্ষয়ি হিন্দুধর্মে তিনি প্রাণসঞ্চার ঘটান।
16. স্বামী বিবেকানন্দের নব্য বেদান্ত এর আদর্শ ব্যাখ্যা করো। ০৪
উত্তর :শ্রীরামকৃষ্ণ শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন নব্যভারতের রূপকার ও আত্মবিশ্বাসের মূর্তপ্রতীক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও তিনি রামকৃষ্ণের “শিবজ্ঞানের জীবসেবা” ও “যত মত তত পথ” এই বাণী দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি বনের বেদান্তকে ঘরে আনার কথা বলেন এবং বেদান্তক মানবকল্যাণের কাজে ব্যবহারের কথা বলেন, যা নব্য বেদান্ত নামে পরিচিত।
ধর্ম সংস্কার :–
১) স্বামীজীর ধর্ম সংস্কারের আদর্শ: বিবেকানন্দ ভারতের সনাতন ধর্মের বেদান্তের আদর্শকে বাস্তবে রূপদান করতে চেয়েছিলেন। বেদান্ত শব্দের অর্থ হলো ‘বেদের অন্ত’ অর্থাৎ ‘বেদের শেষ’ এবং বেদের শেষ হলো উপনিষদসমূহ। বেদান্ত দর্শনের মূল বিষয় হলো ব্রহ্মের স্বরূপ সম্বন্ধে জ্ঞান লাভের ইচ্ছা থেকেই বেদান্ত দর্শনের উদ্ভব। ধর্মীয় ব্যাখ্যার সঙ্গে বিবেকানন্দ মানবসেবার আদর্শ যোগ করে তিনি বলেন জীবনের সাথে বেদান্তকে মিলাতে হবে। সেই জন্য তিনি পাশ্চাত্য কর্মযোগে আত্মবিশ্বাসের অধ্যবস্যায় প্রভৃতি গ্রহণ করার কথা বলেন।
২) ধর্মের সহজ ব্যাখ্যা :– তিনি ইসলাম, খ্রিস্ট, হিন্দু সমস্ত ধর্মেই সিদ্ধিলাভ করেন। তাই তিনি সমস্ত ধর্মের মানুষকেই ঈশ্বরদর্শনের জন্য ধর্মের সহজ পথ দেখিয়ে দিতে পেরেছিলেন।
৩) নারীমুক্তির আদর্শ :– নারী ছিল তাঁর কাছে জগন্মাতার প্রতিমূর্তি। নারীর দুর্দশা মোচন ও সমাজে নারীর নেতৃত্বকে তিনি স্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
২) জীবাত্মা ও পরমাত্মা: গুরু রামকৃষ্ণের মতো বিবেকানন্দ বলেন মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশ এবং পরমাত্মা অংশ হলো জীবাত্মা। তার কাছে বেদান্তের নতুন অ্যাখ্যা হল মানুষ সেবাই ঈশ্বর সেবা।
৩) দরিদ্র সেবা: ভারতবর্ষের পথেপ্রান্তরে ভ্রমণকরে বিবেকানন্দ দরিদ্র ও অজ্ঞ ভারতবাসীর মধ্যে ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। এই দরিদ্রনারায়ন সেবার জন্য তিনি এগিয়ে আসতে বলেন। জীবের মধ্যেই তিনি ভগবানের প্রত্যক্ষ করে বলেছিলেন-যত জীব তত শিব।
মূল্যায়ন: বিবেকানন্দ হিন্দু ধর্মের সারসত্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন বেদ-ই হিন্দু ধর্মের সবচেয়ে প্রাচ্যগ্রন্থ। কন্যাকুমারী শিলাখণ্ডে বসে তিনি চিন্তা করেছিলেন ব্যক্তিগত মুখ্য লাভের চেয়ে ভারতবাসীর সেবাই চরম লক্ষ্য হওয়া উচিত।তিনি বলেন- Motion is the sign of life. গুরু রামকৃষ্ণের আদর্শ অনুসরণ করে ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ৫ মে বেলুড় মঠ রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন।

মাধ্যমিক ইতিহাস দ্বিতীয় অধ্যায় বড়
8 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর
1. ঊনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণের প্রকৃতি কেমন ছিল ? ০৮
উত্তর : ঊনবিংশ শতকে বাংলার সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন ও মানসিক ক্ষেত্রে যে নবযুগের সূত্রপাত ঘটেছিল তাকে কেউ কেউ নবজাগরণ বলেছিলেন। এই নবজাগরণের গভীরতার প্রভাব নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক আছে মধ্যযুগীয় অন্ধকার কুসংস্কারের বদলে যে যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম হয়েছিল তা ভারতকে আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতার মন্ত্রী দীক্ষিত করেছিল এক কথায় অনেকে একে নবজাগরণ বা রেনেসাস নামে উল্লেখ করেছেন।
নবজাগরণের প্রকৃতি: ঊনিশ শতকে বাংলায় নবজাগরণের প্রকৃতি নিয়ে ঐতিহাসিক ও পন্ডিতমহলে বিতর্কের অন্ত নেই, এ বিতর্কের বেশ কয়েকটি দিক আছে। যেমন –
১) অনুসন্ধানে মানসিকতা: পাশ্চাত্য শিক্ষা সংস্কৃতির প্রভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালির অনেকেই রক্ষণশীলতা বর্জন করে যুক্তিবাদী হয়ে ওঠে এবং তারা ধর্ম ও সমাজে নানা বিষয়ে যুক্তি দ্বারা মূল্যায়ন করতে থাকে।
২) সমাজ ও ধর্ম সংস্কার: বাংলা ধর্ম সমাজের কুসংস্কারগুলি দূর করে আধুনিক করে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয় হিন্দু ধর্মের মধ্যে থেকে হিন্দু ধর্মের সংস্কার সাধারন ছিল এই নবজাগরণের একটি দিক।
৩) তথা কথিত নবজাগরণ ও সীমিত প্রভাব: অশোক মিত্র বাংলা নবজাগরণকে “So Called Renaissance” – বলে পরিহাস করে বলেন যে, ব্রিটিশ ভূমিব্যবস্থায় যারা লাভবান হয়েছিল সেই জমিদার সম্প্রদায় দরিদ্র কৃষককে শোষণ করে যে বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়েছিল তা কলকাতায় চালন করলে শহরবাসী হয়ে এক সাংস্কৃতিক নবজাগরণ ঘটিয়েছিল। একেই ভুল করে নবজাগরণ বলা হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে এর প্রভাব ও সংযোগ ছিল অতি সীমিত।
৪) ইউরোপীয় নবজাগরণের সঙ্গে তুলনা: ইউরোপের রেনেসাঁস-এর আদর্শ বাংলার নবজাগরণকে প্রভাবিত করেছিল এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। নবজাগরণ যদি হয় ঐতিহ্যের পুনর্জন্ম, তাহলে বাংলার নবজাগরণকেও নবজাগরণ বলা চলে। অবশ্য অধ্যাপক সুশোভন সরকার উভয় নবজাগরণের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন। যেগুলি হল – ক) ইতালির নবজাগরণের প্রাণচঞ্চল্য ও দুর্বার শক্তি, বাংলার নবজাগরণ ছিল না। খ) ইতালির মত মুক্ত ও স্বাধীন পরিবেশ বাংলায় ছিল না। গ) ইতালি নবজাগরণ যেখানে গ্রিক চিন্তা ও আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত ছিল সেখানে বাংলার নবজাগরণ সংস্কৃতিতে পরিণত।
: বিশ্লেষণ: বাংলার নবজাগরণের চরিত্র ও প্রকৃতি নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যেমন– ক) বাংলার নবজাগরণের ব্যাপ্তি ছিল খুবই সীমিত। ইহা ছিল মূলত কলকাতা কেন্দ্রিক। গ্রামবাংলার মানুষ সুফল পায়নি।
খ) এই নবজাগরণ শুধুমাত্র পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙ্গালীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তা দরিদ্র ও মেহনতী মানুষের মধ্যে কোনো প্রত্যক্ষ যোগ তৈরি করতে পারেনি।
গ) বাংলার নবজাগরণ ছিল অতিমাত্রায় ব্রিটিশ নির্ভর।
ঘ) বাংলার নবজাগরণ প্রকৃতপক্ষে হিন্দু নবজাগরণবাদে পর্যবেশিত হয়।
উপসংহার: উনিশ শতকে নবজাগরণের ফলে ভারতীয়রা পাশ্চাত্য জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সুযোগ পায়। পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে সময়, শাস্ত্র এবং শ্রমিক পরিশ্রেনির যে ধারণা ছিল তার সম্বন্ধে ভারতীয়রা জানতে পারে। ঐতিহাসিক সুশোভন সরকার বাংলার নবজাগরণের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে নিলেও এই নবজাগরণে ভারতের যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদ এর প্রসার ঘটায়।
আজকের পোস্টে দশম শ্রেণী ইতিহাসের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘সংস্কার: বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা’ থেকে ২/৪/৮ মার্কস এর বাছাই করা প্রশ্ন উত্তর শেয়ার করা হল যেগুলি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিশেষ ভাবে সহায়তা করবে।
SOURCE-EDT



