দশম-শ্রেণি
মাধ্যমিক বাংলা
হারিয়ে যাওয়া কালি কলম
প্রশ্ন উত্তর (MCQ ও বড় প্রশ্ন)
Updated on:
আজকে আলোচনার বিষয় দশম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যবইয়ের ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধটি । যার প্রাবন্ধিক হলেন প্রখ্যাত লেখক নিখিল সরকার, যিনি বাংলা সাহিত্যজগতে ‘শ্রীপান্থ’ ছদ্মনামে সুপরিচিত। এখানে প্রবন্ধটির উৎস, সারাংশ, নামকরণের তাৎপর্য এবং প্রশ্ন উত্তর নিয়ে আলোচনা করা হল।
বিষয় |
বিবরণ |
|---|---|
প্রবন্ধ |
হারিয়ে যাওয়া কালি কলম |
প্রাবন্ধিক |
শ্রীপান্থ |
প্রকৃত নাম |
নিখিল সরকার |
বোর্ড: বিষয়বস্তু
1 ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ – শ্রীপান্থ (দশম শ্রেণী – বাংলা – প্রবন্ধ)
2 ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ বহুবিকল্পভিত্তিক (MCQ) প্রশ্নোত্তর (১ নম্বর) Hariye Jawa Kali Kolom Sripantha
2.1 ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ অতি সংক্ষিপ্ত (SAQ) প্রশ্নোত্তর (১ নম্বর)
2.2 ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর (৩ নম্বর)
2.3 ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর (৫ নম্বর)
‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’
শ্রীপান্থ
(দশম শ্রেণী – বাংলা – প্রবন্ধ)
হারিয়ে যাওয়া কালি কলম উৎস ও লেখক পরিচিতি
‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধটির রচয়িতা হলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সাংবাদিক শ্রীপান্থ । শ্রীপান্থ হলো তাঁর ছদ্মনাম, তাঁর প্রকৃত নাম নিখিল সরকার । তিনি দীর্ঘদিন আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করেছেন এবং কলকাতার সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর গভীর গবেষণা রয়েছে । আলোচ্য প্রবন্ধটিতে তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণার সঙ্গে কলমের বিবর্তনের ঐতিহাসিক তথ্য চমৎকারভাবে মিশে গেছে।
হারিয়ে যাওয়া কালি কলম সারাংশ
প্রাবন্ধিক শ্রীপান্থ এমন একটি লেখালেখির আপিসে কাজ করেন, যেখানে তিনি ছাড়া আর কারও হাতে কলম নেই । সবার সামনেই রয়েছে কাচের স্ক্রিন বা পরদা এবং টাইপরাইটারদের মতো কি-বোর্ড । অথচ, প্রাবন্ধিকের ছোটোবেলা কেটেছে গ্রামবাংলার পরিবেশে, যেখানে তাঁরা রোগা বাঁশের কঞ্চি কেটে কলম তৈরি করতেন । তাঁরা কলাপাতা কেটে কাগজের মতো সাইজ করে তাতে স্কুলের ‘হোম-টাস্ক’ করতেন । কাঠের উনুনে রান্নার পর কড়াইয়ের তলায় জমা কালি লাউপাতা দিয়ে ঘষে তুলে, তা পাথরের বাটিতে রাখা জলে গুলে তাঁরা নিজেরাই লেখার কালি তৈরি করতেন ।
প্রবন্ধটিতে কলমের বিবর্তনের এক সুদীর্ঘ ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। প্রাচীন মিশরে নীল নদের তীরের নল-খাগড়া ভেঙে, সুমেরীয় বা ফিনিসীয়রা হাড় দিয়ে, এবং রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার ব্রোঞ্জের শলাকা (স্টাইলাস) দিয়ে লিখতেন । চিনারা চিরকাল তুলিতে লিখে এসেছে । একসময় পালকের কলম বা ‘কুইল’-এর খুব চল ছিল । এরপর লুইস অ্যাডসন ওয়াটারম্যান দোয়াতের কালি পড়ে গিয়ে একটি চুক্তিপত্র নষ্ট হওয়ার ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আবিষ্কার করেন ফাউন্টেন পেন । এককালে মুঘল দরবার বা জমিদারদের কাছে লিপি-কুশলী বা ‘ক্যালিগ্রাফিস্ট’-দের প্রচুর সম্মান ছিল। কিন্তু আজ কমপিউটারের যুগে এই ঐতিহ্যবাহী দোয়াত-কলম অবলুপ্তির পথে এবং জাদুঘরে যাওয়ার অপেক্ষায়।
হারিয়ে যাওয়া কালি কলম নামকরণের তাৎপর্য
প্রবন্ধের নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আলোচ্য প্রবন্ধটিতে লেখক সেই যুগের কথা বলেছেন যখন বাঁশের কলম, মাটির দোয়াত, ঘরে তৈরি কালি আর কলাপাতা ছিল লেখালেখির প্রধান উপকরণ । সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফাউন্টেন পেন বা ঝরনা কলম এসে দোয়াত আর কলমকে বাজার থেকে হঠিয়ে দেয় । আর বর্তমান যন্ত্রযুগে কমপিউটার যেন এই কলমকে জাদুঘরে পাঠাবে বলে প্রতিজ্ঞা করেছে । লেখকের নিজের আপিসেই কেউ আর কলম ব্যবহার করেন না । একসময় যা ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, আজ তা কালের গর্ভে প্রায় বিলীন। দোয়াত-কালি-কলমের এই অবলুপ্তির বেদনা এবং স্মৃতিকথাই যেহেতু প্রবন্ধটির মূল উপজীব্য, তাই “হারিয়ে যাওয়া কালি কলম” নামকরণটি সর্বতোভাবে সার্থক ও বিষয়ানুগ হয়েছে।
‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’
বহুবিকল্পভিত্তিক (MCQ)
প্রশ্নোত্তর (১ নম্বর)
১. কলমকে বলা হয়—
(ক) তলোয়ারের চেয়েও শক্তিধর
(খ) লাঠির চেয়েও শক্তিধর
(গ) বন্দুকের চেয়েও শক্তিধর
(ঘ) কামানের চেয়েও শক্তিধর
উত্তর: (ক) তলোয়ারের চেয়েও শক্তিধর ।
২. খাগের কলম একমাত্র কখন দেখা যায়?
(ক) দুর্গাপুজোর সময়
(খ) সরস্বতী পুজোর সময়
(গ) লক্ষ্মীপুজোর সময়
(ঘ) কালীপুজোর সময়
উত্তর: (খ) সরস্বতী পুজোর সময় ।
৩. চিনারা চিরকাল কীসে লিখে আসছে?
(ক) পালকে
(খ) খাগের কলমে
(গ) তুলিতে
(ঘ) ব্রোঞ্জের শলাকায়
উত্তর: (গ) তুলিতে ।
৪. ‘অক্ষরজ্ঞানহীন‘-কে লোকে কী বলে?
(ক) ওর কাছে ক’অক্ষর গোমাংস
(খ) মূর্খ
(গ) পণ্ডিত
(ঘ) বোকা
উত্তর: (ক) ওর কাছে ক’অক্ষর গোমাংস ।
৫. কার চুক্তিপত্র সই করতে গিয়ে দোয়াত উলটে গিয়েছিল?
(ক) লুইস অ্যাডসন ওয়াটারম্যানের
(খ) শৈলজানন্দের
(গ) শ্রীপান্থের
(ঘ) লর্ড কার্জনের
উত্তর: (ক) লুইস অ্যাডসন ওয়াটারম্যানের ।
৬. চারখন্ড রামায়ণ কপি করে অষ্টাদশ শতকে একজন লেখক কত টাকা পেয়েছিলেন?
(ক) পাঁচ টাকা
(খ) সাত টাকা
(গ) দশ টাকা
(ঘ) আট টাকা
উত্তর: (খ) সাত টাকা (সঙ্গে কিছু কাপড় আর মিঠাই) ।
৭. ছেলেবেলায় দেখা একজন দারোগাবাবুর কলম কোথায় গোঁজা থাকত?
(ক) কানে
(খ) কাঁধের পকেটে
(গ) পায়ের মোজায়
(ঘ) চুলে
উত্তর: (গ) পায়ের মোজায় ।
৮. কোন বিখ্যাত সাহিত্যিক অনেক ধরে ধরে টাইপ-রাইটারে লিখে গেছেন?
(ক) অন্নদাশঙ্কর রায়
(খ) সত্যজিৎ রায়
(গ) শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
(ঘ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
উত্তর: (ক) অন্নদাশঙ্কর রায় ।
৯. যাঁরা ওস্তাদ কলমবাজ বা লিপি-কুশলী, তাঁদের কী বলা হয়?
(ক) স্টেনোগ্রাফার
(খ) ক্যালিগ্রাফিস্ট
(গ) মুনশি
(ঘ) টাইপিস্ট
উত্তর: (খ) ক্যালিগ্রাফিস্ট ।
‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’
অতি সংক্ষিপ্ত (SAQ)
প্রশ্নোত্তর (১ নম্বর)
১. ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধটির রচয়িতা কে এবং তাঁর প্রকৃত নাম কী?
উত্তর: প্রবন্ধটির রচয়িতা শ্রীপান্থ এবং তাঁর প্রকৃত নাম নিখিল সরকার ।
২. প্রাবন্ধিকের আপিসের সবাই কীসে লেখালেখি করেন?
উত্তর: প্রাবন্ধিক ছাড়া তাঁর আপিসের সবাই কাচের স্ক্রিন বা পরদা এবং কি-বোর্ড ব্যবহার করে লেখালেখি করেন ।
৩. ছোটোবেলায় প্রাবন্ধিকেরা কীসে স্কুলের হোম-টাস্ক করতেন?
উত্তর: তাঁরা কলাপাতা কেটে কাগজের মতো সাইজ করে নিয়ে তাতে হোম-টাস্ক করতেন ।
৪. শৈশবে লেখকেরা কীভাবে লেখার কালি তৈরি করতেন?
উত্তর: বাড়ির কাঠের উনুনে রান্না হওয়ার পর কড়াইয়ের তলায় জমা কালি লাউপাতা দিয়ে ঘষে তুলে, তা জলে গুলে কালি তৈরি করতেন ।
৫. প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের অধীশ্বর জুলিয়াস সিজার কী দিয়ে লিখতেন?
উত্তর: তিনি ‘স্টাইলাস’ নামক একটি ব্রোঞ্জের ধারালো শলাকা দিয়ে লিখতেন ।
৬. ফাউন্টেন পেন বা ঝরনা কলম কে আবিষ্কার করেছিলেন?
উত্তর: লুইস অ্যাডসন ওয়াটারম্যান ফাউন্টেন পেন আবিষ্কার করেছিলেন ।
৭. পালকের কলমের ইংরেজি নাম কী?
উত্তর: পালকের কলমের ইংরেজি নাম হলো ‘কুইল’ ।
৮. বিখ্যাত লেখক শৈলজানন্দ কার কাছ থেকে ফাউন্টেন পেনের নেশা পেয়েছিলেন?
উত্তর: তিনি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকে ফাউন্টেন পেনের নেশা পেয়েছিলেন ।
৯. লিপি-কুশলীদের ইংরেজিতে কী বলা হয়?
উত্তর: যাঁরা ওস্তাদ কলমবাজ বা লিপি-কুশলী, তাঁদের বলা হয় ‘ক্যালিগ্রাফিস্ট’ ।
১০. কোন স্বনামধন্য বাঙালি লেখক নিজের হাতের কলম অসাবধানতাবশত বুকে ফুটে গিয়ে মারা গিয়েছিলেন?
উত্তর: ‘কঙ্কাবতী’ ও ‘ডমরুধর’-এর লেখক ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় কলম বুকে ফুটে গিয়ে মারা গিয়েছিলেন ।
১১. প্রাচীনরা ভালো কালি তৈরির কী ব্যবস্থাপত্র দিয়েছিলেন?
উত্তর: ভালো কালি তৈরির জন্য প্রাচীনদের ব্যবস্থাপত্র ছিল— ‘তিল ত্রিফলা সিমুল ছালা/ছাগ দুগ্ধে করি মেলা/লৌহপাত্রে লোহায় ঘসি/ছিঁড়ে পত্র না ছাড়ে মসি।’
১২. প্রাবন্ধিকেরা ছেলেবেলায় কোথায় হোম-টাস্ক করা কলাপাতা ফেলে আসতেন এবং কেন?
উত্তর: প্রাবন্ধিকেরা ফেরার পথে কোনও পুকুরে সেই কলাপাতা ফেলে দিয়ে আসতেন । বাইরে ফেললে গোরু খেয়ে নিলে অমঙ্গল হবে এবং গোরুকে অক্ষর খাওয়ানো পাপ— এই বিশ্বাস থেকেই তাঁরা এমনটা করতেন ।
১৩. লর্ড কার্জন বাঙালি সাংবাদিকদের কী বলতেন?
উত্তর: লর্ড কার্জন বাঙালি সাংবাদিকদের গরম ইংরেজি লেখা দেখে তাঁদের ‘বাবু কুইল ড্রাইভারস’ বলতেন ।
১৪. একসময় বলা হতো- ‘কলমে কায়স্থ চিনি…‘ — এরপরের অংশটি কী?
উত্তর: প্রবাদটির পরের অংশ হলো ‘…গোঁফেতে রাজপুত।’
১৫. ফাউন্টেন পেনের আদি নাম কী ছিল?
উত্তর: ফাউন্টেন পেনের আদি নাম ছিল ‘রিজার্ভার পেন’ ।
১৬. প্রাবন্ধিক কোথায় সোনার দোয়াত কলমের কথা প্রথম চাক্ষুষ করেছিলেন?
উত্তর: সুভো ঠাকুরের বিখ্যাত দোয়াত সংগ্রহ দেখতে গিয়ে প্রাবন্ধিক সোনার দোয়াত কলমের সত্যতা সম্পর্কে জেনেছিলেন ।
‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর
(৩ নম্বর)
১. “তাই নিয়ে আমাদের প্রথম লেখালেখি” – কী নিয়ে লেখকদের প্রথম লেখালেখি শুরু হয়েছিল তা সংক্ষেপে লেখো।
উত্তর: প্রাবন্ধিক শ্রীপান্থ তাঁর ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ করে জানিয়েছেন যে, তাঁদের প্রথম লেখালেখি শুরু হয়েছিল খুব সাধারণ কিছু গ্রামীণ সরঞ্জাম দিয়ে।
-
তাঁরা রোগা বাঁশের কঞ্চি কেটে কলম তৈরি করতেন ।
-
কালি রাখার জন্য ব্যবহার করতেন মাটির দোয়াত ।
-
লেখার পাত হিসেবে কাগজের বদলে শৈশবে তাঁদের ভরসা ছিল কলাপাতা, যা তাঁরা কাগজের মতো সাইজ করে কেটে নিতেন ।
-
লেখার কালি তাঁরা নিজেরাই বাড়িতে তৈরি করতেন; কাঠের উনুনের কড়াইয়ের তলায় জমা কালি লাউপাতা দিয়ে ঘষে তুলে জলের সঙ্গে মিশিয়ে এই কালি তৈরি হতো ।
অর্থাৎ, বাঁশের কলম, মাটির দোয়াত, ঘরে তৈরি কালি আর কলাপাতা—এইসব নিয়েই তাঁদের প্রথম লেখালেখি শুরু হয়েছিল ।
২. “আশ্চর্য, সবি আজ অবলুপ্তির পথে” – এখানে কোন্ কোন্ জিনিসের অবলুপ্তির কথা বলা হয়েছে? তাদের অবলুপ্তির কারণ কী?
উত্তর: এখানে ফাউন্টেন পেন, বল পয়েন্ট পেন, সোনার অঙ্গ ও হিরের হৃদয়যুক্ত দামি জড়োয়া কলম, দোয়াত-কলম এবং লেখালেখির অন্যান্য প্রাচীন সরঞ্জাম অবলুপ্তির পথে বলে আক্ষেপ করা হয়েছে ।
অবলুপ্তির কারণ: এই সমস্ত জিনিসের অবলুপ্তির প্রধান কারণ হলো আধুনিক প্রযুক্তির আগ্রাসন, বিশেষত কম্পিউটার । লেখক যেখানে কাজ করেন, সেখানে সকলের সামনেই এখন কলমের বদলে চৌকো আয়নার মতো কাচের স্ক্রিন এবং কি-বোর্ড । যন্ত্রযুগের এই কম্পিউটার-নির্ভরতার ফলেই ঐতিহ্যবাহী কলম এবং অন্যান্য লেখার সরঞ্জাম আজ জাদুঘরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে ।
৩. “কলম তাদের কাছে আজ অস্পৃশ্য” – কলম কাদের কাছে এবং কেন অস্পৃশ্য হয়ে উঠেছে?
উত্তর: প্রাবন্ধিক শ্রীপান্থের মতে, পকেটমারদের কাছে কলম আজ অস্পৃশ্য হয়ে উঠেছে ।
কেন অস্পৃশ্য: একসময় কলম বেশ মূল্যবান বস্তু ছিল, তাই পকেটমাররা তা চুরি করত। কিন্তু বর্তমানে কলম অত্যন্ত সস্তা এবং সর্বভোগ্য হয়ে গেছে । রাস্তায় এক হাতে দশ কলমধারী ফেরিওয়ালা দেখা যায় এবং তা এতই সস্তা যে প্রত্যেকের পকেটেই কলম থাকে । কলম এখন সর্বজনীন হয়ে ওঠায় এর চুরি যাওয়ার মতো আর্থিক মূল্য বা আকর্ষণ আর পকেটমারদের কাছে নেই । তাই তারা আর কলম নিয়ে হাতসাফাইয়ের খেলা দেখায় না এবং কলম তাদের কাছে কার্যত অস্পৃশ্য হয়ে গেছে ।
‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’
ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর
(৫ নম্বর)
১. “আমরা কালি তৈরি করতাম নিজেরাই” – প্রাবন্ধিক এবং তাঁর সঙ্গীরা ছেলেবেলায় কীভাবে নিজেদের ব্যবহারের জন্য কালি তৈরি করতেন, তার চমকপ্রদ বিবরণ দাও।
উত্তর: প্রাবন্ধিক শ্রীপান্থ সেকালে বাড়ির রান্না কাঠের উনুনে হতো বলে কড়াইয়ের তলায় বেশ কালি জমত । সেই কালি লাউপাতা দিয়ে ঘষে তুলে একটি পাথরের বাটিতে রাখা জলে গুলে নেওয়া হতো ।এবং তাঁর সঙ্গীরা ছেলেবেলায় নিজেদের ব্যবহারের জন্য খুব সহজ পদ্ধতিতে কালি তৈরি করতেন । এই কালি তৈরির কাজে তাঁদের মা, পিসি এবং দিদিরাও সাহায্য করতেন । তাঁদের কালি তৈরির পদ্ধতিটি ছিল নিম্নরূপ:
উপাদান সংগ্রহ:
কালির মান বৃদ্ধি: কালিটিকে আরও পোক্ত করতে তাঁদের মধ্যে যারা ওস্তাদ ছিল, তারা ওই কালো জলে হরতকী ঘষত । আবার কখনও কখনও মাকে দিয়ে আতপ চাল ভেজে পুড়িয়ে তা বেটে ওই জলের সঙ্গে মেশানো হতো ।
ছ্যাঁকা দেওয়া ও ছাঁকা: সব উপাদান ভালো করে মেশাবার পর একটা খুন্তির গোড়ার দিকটা আগুনে পুড়িয়ে লাল টকটকে করে সেই জলে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো । জল অল্প থাকার কারণে অনেক সময় তা টগবগ করে ফুটত । সবশেষে সেই মিশ্রণটিকে ন্যাকড়ায় ছেঁকে মাটির দোয়াতে ঢেলে নিলেই চমৎকার কালি তৈরি হয়ে যেত ।
২. “ফাউন্টেন পেন বাংলায় কী নামে পরিচিত?” – নামটি কার দেওয়া বলে উল্লেখ করা হয়েছে? ফাউন্টেন পেনের জন্ম-ইতিহাস প্রবন্ধ অবলম্বনে নিজের ভাষায় লেখো।
উত্তর: ফাউন্টেন পেন বাংলায় ‘ঝরনা কলম’ নামে পরিচিত । প্রাবন্ধিকের মতে, এই নামটি সম্ভবত বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া ।
ফাউন্টেন পেনের জন্ম-ইতিহাস: ফাউন্টেন পেন আবিষ্কার করেন লুইস অ্যাডসন ওয়াটারম্যান । এই আবিষ্কারের পিছনে একটি চমৎকার প্রেক্ষাপট রয়েছে। সেকালের অন্যান্য ব্যবসায়ীদের মতো ওয়াটারম্যানও কাজের সময় দোয়াত ও কলম সঙ্গে নিয়ে বের হতেন । একবার তিনি অন্য এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তিপত্র সই করতে গিয়েছিলেন । চুক্তিপত্রের দলিল কিছুটা লেখা হয়েছে, ঠিক এমন সময় হঠাৎ দোয়াত উপুড় হয়ে কাগজের ওপর কালি পড়ে যায় । বাধ্য হয়ে ওয়াটারম্যান পুনরায় কালির সন্ধানে ছোটেন । কিন্তু কালি নিয়ে ফিরে এসে তিনি জানতে পারেন যে, ইতিমধ্যে অন্য এক তৎপর ব্যবসায়ী সেই চুক্তিপত্র সই করে পাকা করে ফেলেছেন । এই ঘটনায় চরম বিমর্ষ হয়ে ওয়াটারম্যান মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন যে, এর একটা বিহিত তাঁকে করতেই হবে । এই প্রতিজ্ঞা এবং জেদের বশবর্তী হয়েই শেষপর্যন্ত তিনি কালির অফুরন্ত ফোয়ারাযুক্ত কলম অর্থাৎ ‘ফাউন্টেন পেন’ আবিষ্কার করেন ।
৩. “কলমকে বলা হয় তলোয়ারের চেয়ে শক্তিধর” – প্রাবন্ধিক কেন এ কথা বলেছেন? ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধে প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত কলমের বিবর্তনের যে রূপ ফুটে উঠেছে, তা আলোচনা করো।
উত্তর: প্রাবন্ধিক জানিয়েছেন যে, ফাউন্টেন পেনের অনুষঙ্গ হিসেবে ‘ব্যারেল’, ‘কার্টিজ’-এর মতো বন্দুক বা অস্ত্রের শব্দ শোনা গেলেও, তাতে বারুদের গন্ধ থাকে না । আসলে তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ জয় করা যায় ঠিকই, কিন্তু মানুষের মন জয় করা বা সমাজের আমূল পরিবর্তন আনা যায় না। অন্যদিকে, কলম বা লেখনীর মাধ্যমে যুগে যুগে ক্রুর ও মিথ্যাচারী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করা হয়েছে । কলম সমাজের অন্যায় মুছে ফেলে মানুষের চিন্তাধারায় বিপ্লব আনতে পারে বলেই একে তলোয়ারের চেয়েও শক্তিশালী বলা হয়েছে ।
কলমের বিবর্তনের রূপ: ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’ প্রবন্ধে প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত কলমের নানামুখী বিবর্তনের চিত্র ফুটে উঠেছে:
প্রাচীন যুগ: প্রাচীন মিশরে নীল নদীর তীরের নল-খাগড়া ভেঙে ভোঁতা করে তুলি বানিয়ে লেখার চল ছিল । ফিনিসীয়রা বনপ্রান্ত থেকে কুড়িয়ে নেওয়া হাড়কে কলম হিসেবে ব্যবহার করত । রোম সাম্রাজ্যে জুলিয়াস সিজার ব্রোঞ্জের শলাকা ব্যবহার করতেন, যার পোশাকি নাম ছিল ‘স্টাইলাস’ । চিনারা চিরকালই তুলি দিয়ে লিখে এসেছে ।
মধ্যযুগ ও ব্রিটিশ আমল: একসময় বিশ্বের নানা জায়গায় পাখির পালক দিয়ে লেখার চল ছিল, যার ইংরেজি নাম ‘কুইল’ । উইলিয়াম জোন্স বা কেরি সাহেবের মতো মানুষদের ছবিতে দোয়াতে পালকের কলম গোঁজা থাকতে দেখা যায় । বাংলার গ্রামাঞ্চলে রোগা বাঁশের কঞ্চি কেটে কলম তৈরি করা হতো ।
আধুনিক যুগ: সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাঁশ, খাগ বা পালকের কলমের জায়গা দখল করে নেয় ফাউন্টেন পেন বা ঝরনা কলম । এরপর আসে আরও আধুনিক ‘বল-পেন বা ডট পেন’ । এবং বর্তমানে এই সমস্ত কলমকেও জাদুঘরে পাঠাতে উদ্যত হয়েছে যন্ত্রযুগের আধুনিক কম্পিউটার ।





