পেনশনের জন্য গণ্য হতে পারে অস্থায়ী চাকরি, কিন্তু সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের উপর জ্যেষ্ঠতার দাবি করা যাবে না

১২ অক্টোবর ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৭

Calcutta High Court

সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায়: পেনশনের জন্য গণ্য হতে পারে অস্থায়ী চাকরি, কিন্তু সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের উপর জ্যেষ্ঠতার দাবি করা যাবে না

রায়ের তারিখ: ৯ অক্টোবর ২০২৬ | প্রকাশিত সংবাদ: ১২ অক্টোবর ২০২৬

 

১. মামলার মূল বক্তব্য

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে যে, কোনও সরকারি কর্মচারী অস্থায়ী বা অ্যাড-হক (Ad hoc) পদে কাজ করে পরে নিয়মিত চাকরিতে নিযুক্ত হলে, তাঁর আগের চাকরির সময়কাল নির্দিষ্ট শর্তে পেনশন নির্ধারণের জন্য গণ্য হতে পারে। কিন্তু সেই সময়কালকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়মিতভাবে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের চেয়ে বেশি জ্যেষ্ঠতা দাবি করার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

আদালতের মতে, নিয়ম মেনে নিয়মিতভাবে নিযুক্ত কর্মচারীর জ্যেষ্ঠতা সাধারণত তাঁর নিয়োগের তারিখ থেকে নির্ধারিত হয়। অন্যদিকে, নিয়োগবিধি অনুসরণ না করে সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে নিযুক্ত কর্মচারী সাধারণত তাঁর প্রাথমিক অস্থায়ী নিয়োগের তারিখ থেকে জ্যেষ্ঠতা দাবি করতে পারেন না।

এই রায় সরকারি চাকরিতে পেনশনযোগ্য চাকরির মেয়াদ, নিয়মিতকরণ এবং জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট করেছে।

২. মামলার বিবরণ

মামলার নাম

H. Nagarajan & Ors. v. State of Tamil Nadu & Ors. (সংযুক্ত মামলা-সহ)

রায়ের তারিখ

৯ অক্টোবর ২০২৬

বিচারপতিদের বেঞ্চ

বিচারপতি এস. ভি. এন. ভাট্টি এবং বিচারপতি শ্রী চন্দ্রশেখর

মামলার নম্বর

Civil Appeal Nos. 8755, 8756 ও 8757 of 2013 এবং সংশ্লিষ্ট Transfer Cases

মামলাটির মূল প্রশ্ন ছিল—তামিলনাড়ু সরকারের বিভিন্নভাবে নিযুক্ত কর্মীদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতা কীভাবে নির্ধারিত হবে? প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়মিত নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীরা কি আগে অস্থায়ীভাবে নিযুক্ত বা অনুকম্পামূলক ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের তুলনায় বেশি জ্যেষ্ঠতা পাবেন?

সুপ্রিম কোর্টকে বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হয়েছিল, অস্থায়ী চাকরির প্রাথমিক তারিখকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তি করা যাবে কি না এবং নিয়মিতকরণের তারিখের কী গুরুত্ব রয়েছে।

৩. বিরোধের সূত্রপাত কীভাবে?

১৯৮১–১৯৮৪: অস্থায়ী নিয়োগ

তামিলনাড়ু সরকার ১৯৮১ থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যে জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং অন্যান্য মন্ত্রকীয় পদে নিয়োগের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তা সত্ত্বেও, তামিলনাড়ু স্টেট অ্যান্ড সাবঅর্ডিনেট সার্ভিসেস রুলস, ১৯৫৫-এর Rule 10(a)(i) অনুযায়ী কিছু কর্মীকে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ করা হয়।

এঁদের মধ্যে ছিলেন এম. প্রেমা এবং আরও কয়েকজন কর্মী।

 

১৯৮৩: প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা

তামিলনাড়ু পাবলিক সার্ভিস কমিশন (TNPSC) ২৭ নভেম্বর ১৯৮৩ তারিখে গ্রুপ IV পদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা গ্রহণ করে। নির্বাচিত প্রার্থীদের ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে নিয়োগ করা হয়।

এই প্রার্থীরা ১৯৮৩ ব্যাচের সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মী হিসেবে পরিচিত হন।

১৯৮৪: অস্থায়ী কর্মীদের নিয়মিতকরণ

সরকার বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে কিছু অস্থায়ী কর্মীর চাকরি ২৬ জুন ১৯৮৪ থেকে নিয়মিত করে।

পরে ১৯৮৭ সালের Special Absorption Rules-এর ১০ নম্বর ধারায় নির্ধারিত হয় যে, এই বিশেষ ব্যবস্থায় নিযুক্ত কর্মীরা ১৯৮৩ ব্যাচের সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের নিচে থাকবেন।

 

অনুকম্পামূলক নিয়োগের বিরোধ

এস. প্রেম কুমার এবং টি. এ. কান্নাপ্পা নামে দুই কর্মী অনুকম্পামূলক ভিত্তিতে জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। তাঁদের নিয়োগের তারিখ ছিল যথাক্রমে ২৫ নভেম্বর ১৯৮৫ এবং ৫ আগস্ট ১৯৮৫।

পরে তাঁদের চাকরি প্রাথমিক নিয়োগের তারিখ থেকে নিয়মিত করা হয়। তাঁরা দাবি করেন, তাঁদের প্রাথমিক নিয়োগের তারিখের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা উচিত।

এর ফলে তিনটি শ্রেণির কর্মীদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়:

  • প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় নির্বাচিত সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মী।

  • বিশেষ ব্যবস্থায় অস্থায়ীভাবে নিযুক্ত হয়ে পরে নিয়মিত হওয়া কর্মী।

  • অনুকম্পামূলক ভিত্তিতে নিযুক্ত কর্মী।

৪. সুপ্রিম কোর্টের মূল আইনি নীতি

ক. সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের জ্যেষ্ঠতা

আদালত জানায়, নিয়োগবিধি মেনে যথাযথ নির্বাচনপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিযুক্ত কর্মীদের জ্যেষ্ঠতা সাধারণত তাঁদের নিয়োগের তারিখ থেকে নির্ধারিত হয়।

চাকরিতে পরে নিশ্চিতকরণ বা Confirmation হওয়ার তারিখের ভিত্তিতে তাঁদের জ্যেষ্ঠতা পিছিয়ে দেওয়া যায় না।

খ. অস্থায়ী বা অ্যাড-হক চাকরির সময়কাল

যে কর্মী নিয়োগবিধি অনুযায়ী নিয়মিতভাবে নিযুক্ত হননি এবং কেবল সাময়িক প্রয়োজন মেটানোর জন্য নিয়োগ পেয়েছিলেন, তিনি সাধারণত প্রাথমিক নিয়োগের তারিখ থেকে জ্যেষ্ঠতা দাবি করতে পারেন না।

অর্থাৎ, দীর্ঘদিন অস্থায়ীভাবে কাজ করেছেন—এই যুক্তি একাই তাঁকে নিয়মিতভাবে নির্বাচিত কর্মীদের উপরে জ্যেষ্ঠতা দেয় না।

গ. পেনশন ও জ্যেষ্ঠতা আলাদা বিষয়

আদালত স্বীকার করেছে যে, কিছু ক্ষেত্রে অস্থায়ী বা অ্যাড-হক চাকরির সময়কাল পেনশন নির্ধারণের জন্য গণ্য করা যেতে পারে।

কিন্তু সেই সুবিধা পাওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট কর্মী সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের তুলনায় বেশি জ্যেষ্ঠতা পাবেন, এমন নয়।

মূল পার্থক্য: পেনশনের জন্য চাকরির সময় গণনা করা এবং জ্যেষ্ঠতার তালিকায় অবস্থান নির্ধারণ করা দুটি পৃথক আইনি প্রশ্ন।

ঘ. অনুকম্পামূলক নিয়োগের সীমা

অনুকম্পামূলক নিয়োগের উদ্দেশ্য হলো চাকরিরত অবস্থায় কোনও সরকারি কর্মচারীর মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করা।

আদালত জানায়, এই ধরনের নিয়োগ নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনপ্রক্রিয়ার বিকল্প নয়। তাই অনুকম্পামূলক ভিত্তিতে আগে চাকরিতে যোগ দেওয়ার কারণে কোনও কর্মীকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়মিতভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের উপরে রাখা যায় না।

৫. বিশেষ নিয়োগপ্রাপ্ত ও অনুকম্পামূলক কর্মীদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতা

আদালত শুধু সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের অগ্রাধিকার দিয়েই থেমে থাকেনি। বিশেষ ব্যবস্থায় নিযুক্ত কর্মী এবং অনুকম্পামূলক ভিত্তিতে নিযুক্ত কর্মীদের পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা কীভাবে নির্ধারণ হবে, সেটিও বিবেচনা করেছে।

সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, এই দুই শ্রেণির কর্মীদের পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা তাঁদের চাকরি নিয়মিতকরণের তারিখের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।

তবে সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধিতে যদি জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক পদ্ধতি থাকে, তাহলে সেই বিধিই অনুসরণ করতে হবে।

৬. আদালত কোন পূর্ববর্তী রায়ের নীতি অনুসরণ করেছে?

আদালত Direct Recruit Class II Engineering Officers’ Association v. State of Maharashtra মামলার নীতির উপর নির্ভর করেছে।

এই নীতির সারমর্ম হলো:

  • নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত নিয়োগ হলে জ্যেষ্ঠতা নিয়োগের তারিখ থেকে গণ্য হতে পারে।

  • নিয়োগবিধি অনুসরণ না করে সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে নিয়োগ হলে সেই সময়কাল সাধারণত জ্যেষ্ঠতার জন্য গণ্য হয় না।

  • কোনও কোনও ক্ষেত্রে অস্থায়ী চাকরির মেয়াদ পেনশন নির্ধারণে বিবেচিত হতে পারে, কিন্তু তার ফলে নিয়মিত নিয়োগপ্রাপ্তদের উপর জ্যেষ্ঠতার অধিকার তৈরি হয় না।

৭. সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

আদালত মাদ্রাজ হাইকোর্টের ৩ এপ্রিল ২০০৬-এর রায় সংশোধন করেছে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি হলো:

1. ১৯৮৩ ব্যাচের সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের বিশেষ ব্যবস্থায় নিযুক্ত কর্মীদের উপরে জ্যেষ্ঠতা দিতে হবে।

2. এস. প্রেম কুমার ও টি. এ. কান্নাপ্পাকে ১৯৮৩ ব্যাচের সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের উপরে স্থান দেওয়া যাবে না।

3. বিশেষ ব্যবস্থায় নিযুক্ত কর্মী ও অনুকম্পামূলক ভিত্তিতে নিযুক্ত কর্মীদের পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা তাঁদের নিয়মিতকরণের তারিখ অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে, যদি প্রযোজ্য নিয়োগবিধিতে অন্য কোনও স্পষ্ট পদ্ধতি না থাকে।

4. সংশ্লিষ্ট মামলাগুলির নিষ্পত্তি উপরোক্ত নির্দেশ অনুযায়ী করা হয়েছে।

৮. পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষক ও সরকারি কর্মীদের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব

এই রায় চাকরির জ্যেষ্ঠতা, নিয়মিতকরণ এবং পেনশন নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি তামিলনাড়ু সরকারের নির্দিষ্ট নিয়োগবিধি এবং নির্দিষ্ট শ্রেণির কর্মীদের বিরোধ থেকে উদ্ভূত।

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষক বা অন্য সরকারি কর্মীদের ক্ষেত্রে একই নীতি প্রযোজ্য হবে কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধি, নিয়মিতকরণের আদেশ, চাকরির প্রকৃতি এবং প্রযোজ্য পেনশনবিধির উপর।

বিশেষ করে, অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকরা তাঁদের পূর্ববর্তী চাকরির মেয়াদ পেনশনে গণনা করার দাবি করলে, সেই দাবির আইনি ভিত্তি আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে হবে। এই রায় থেকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না যে সব ধরনের অস্থায়ী চাকরি সব পরিস্থিতিতে পেনশনের জন্য গণ্য হবে।

৯. পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

প্রশ্ন

উত্তর

আদালত

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

রায়ের তারিখ

৯ অক্টোবর ২০২৬

বিচারপতি

এস. ভি. এন. ভাট্টি ও শ্রী চন্দ্রশেখর

মূল বিরোধ

জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ

অস্থায়ী চাকরির সময়

সাধারণত স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তি নয়

পেনশন

প্রযোজ্য নিয়মে অনুমোদিত হলে পূর্ববর্তী চাকরির সময় গণ্য হতে পারে

সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের অবস্থান

নির্দিষ্ট মামলায় অস্থায়ী ও অনুকম্পামূলক নিয়োগপ্রাপ্তদের উপরে

বিশেষ ও অনুকম্পামূলক কর্মীদের পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা

সাধারণত নিয়মিতকরণের তারিখ অনুযায়ী, যদি নিয়োগবিধিতে অন্য পদ্ধতি না থাকে

১০. উপসংহার

এই রায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, চাকরির মেয়াদ গণনা, চাকরি নিয়মিতকরণ, পেনশন এবং জ্যেষ্ঠতা—এই চারটি বিষয়কে এক করে দেখা যায় না।

কেউ আগে অস্থায়ীভাবে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন বলে তিনি নিয়মিত নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীর চেয়ে বেশি জ্যেষ্ঠতা পাবেন, এমন কোনও স্বয়ংক্রিয় নিয়ম নেই। একইভাবে, অস্থায়ী চাকরির সময়কাল পেনশনের জন্য গণ্য হওয়ার সুযোগ থাকলেও তা জ্যেষ্ঠতার দাবি প্রতিষ্ঠা করে না।

সরকারি চাকরিতে প্রতিটি দাবি নির্ধারণ করতে হবে সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধি, নিয়মিতকরণের আদেশ এবং প্রযোজ্য পেনশনবিধির আলোকে।

©Kamaleshforeducation.in (2023)

 

error: Content is protected !!
Scroll to Top