ভাষাবিজ্ঞান ও তার বিভিন্ন শাখা
দ্বাদশ শ্রেণি
তৃতীয় সেমেস্টার
XII |3rd Semester
ভাষাবিজ্ঞান ও তার বিভিন্ন শাখা

ভাষাবিজ্ঞান ও তার শাখা-প্রশাখা
|ভাষা |দ্বাদশ শ্রেণি |
তৃতীয় সেমেস্টার|উচ্চ মাধ্যমিক বাংলা
দ্বাদশ শ্রেণি |তৃতীয় সেমেস্টার
ভাষাবিজ্ঞান ও তার শাখা-প্রশাখা
=================================
ভাষার বিজ্ঞানই হল ভাষাবিজ্ঞান। অন্যভাবে বললে, ভাষা নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত চর্চাই হল ভাষাবিজ্ঞানের উদ্দেশ্য। ভাষাবিজ্ঞান বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতোই নিত্য প্রগতিশীল এবং নিত্য সক্রিয় একটি বিদ্যা (Discipline)। বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতোই ভাষাবিজ্ঞানের গতি হল বিশেষ (Particular) থেকে সাধারণের (General)-এর দিকে; এ পদ্ধতি হল আরোহমূলক। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ভাষা সম্পর্কে আলোচনার প্রথম ধাপ হচ্ছে তথ্যসংগ্রহ (Data Collection) ও নথিভুক্তকরণ (Recording)। তারপর সেই প্রাপ্ত তথ্যকে বিশ্লেষণ (Analysis) করে তার যথাযথ বর্ণনা (Objective Description)।
ভাষাবিজ্ঞান মানুষের মুখের ভাষার চর্চা করে। লিখিত ভাষা ভাষাবিজ্ঞানের আলোচনায় আসে না। লেখা শুরু হয়েছে পাঁচ ছয় কি সাত হাজার বছর আগে। মুখের ভাষাকে লিখন পদ্ধতি কখনো সম্পূর্ণ প্রকাশ করতে পারে না। লিখিত ভাষার বহু সীমাবদ্ধতা আছে। দ্বিতীয় যে কারণে ভাষাবিজ্ঞান কেবল মৌখিক ভাষাকে গুরুত্ব দেয় তা এই যে, যেখানে বহু সহস্র কোটি মানুষ কথা বলে বা মৌখিকভাবে ভাষা ব্যবহার করে, সেখানে তার মাত্র কয়েক শতাংশ মানুষ লিখতে জানে। তাই মুখের ভাষাকেই ভাষাবিজ্ঞানীরা আসল ভাষা বলে মানেন। সুতরাং; ভাষাবিজ্ঞান হল সামগ্রিকভাবে ভাষার (অর্থাৎ মানুষের মুখের ভাষার) গঠন, প্রকৃতি, পদ্ধতি সম্বন্ধে বিজ্ঞানসম্মত চর্চার নাম।
ভাষাবিজ্ঞান শুধু ভাষার ভিতরের বিজ্ঞানসম্মত আলোচনাই নয়, ভাষা মানবসভ্যতায় কীভাবে কাজ করে তাও সামগ্রিকভাবে ভাষাবিজ্ঞানের বিষয়।
তুলনামূলক, ঐতিহাসিক এবং বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান :
=================================
ভাষাবিজ্ঞানের আলোচনা নানারকম হতে পারে। তার মধ্যে তিনটি বহুল প্রচলিত শাখা হলো- তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞান, ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান এবং বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান।
তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞান:
=================================
তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের সূত্রপাত করেছিলেন স্যার উইলিয়াম জোন্স (১৭৮৬)। জোন্স সংস্কৃত, গ্রিক, লাতিন, ফারসি ভাষার মধ্যে প্রচুর মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, এই ভাষাগুলির মধ্যে একটিঐক্যসূত্র আছে কারণ এই ভাষাগুলি একটি মূলভাষা থেকে উৎপন্ন। সেটি হলো ইন্দো-ইয়োরোপীয়। সমগ্র ঊনবিংশ শতাব্দী জুড়ে ইয়োরোপ এবং পরবর্তীকালে আমেরিকায় তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের প্রচুর চর্চা হয়। একথা অনস্বীকার্য যে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান চর্চার সূত্রপাত তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞান চর্চার হতে। তুলনামূক ভাষাবিজ্ঞান সমগোত্রজ ভাষাগুলির মধ্যে তুলনা করে এবং তাদের উৎস ভাষাকে বা মূলভাষাকে পুনর্নির্মাণ করে।
ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান:
=================================
প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা কীভাবে বিভিন্ন স্তর যেমন পালি, প্রাকৃত, অপভ্রংশ, অবহট্টর মধ্যে দিয়ে বাংলা ভাষার জন্ম দিয়েছে তা মূলত ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাষার যে বিবর্তন হয় এবং সেই বিবর্তনের ফলে যে যে পরিবর্তন ভাষার সংগঠনে দেখা যায় তা নির্দেশ করা ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের কাজ। বিশেষ করে শব্দ ও পদমধ্যস্থ ধ্বনি পরিবর্তন ভাষার কালগত রূপান্তরের অন্যতম কারণ। ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান এই ধ্বনি পরিবর্তনের কারণ ও বিভিন্ন ধরনের ধ্বনি পরিবর্তন যা ভাষার মধ্যে ক্রিয়া করে তা অনুসন্ধান করে।
বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান:
=================================
বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান সমকালীন প্রচলিত ভাষার গঠনরীতির বিচার বিশ্লেষণ করে। বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের সূত্রপাত হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে প্রধানত ইয়োরোপ এবং পরবর্তীকালে মার্কিন দেশে। যে ভাষার কোনো অতীত নিদর্শন নেই অথবা যে ভাষা এখনও পর্যন্ত লিপিবদ্ধ হয়নি সেই ভাষার আলোচনার জন্য বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের গুরুত্ব অপরিসীম। এই শাখার মতে কোনো ভাষার আলোচনার প্রধান বিষয় চারটি-ধ্বনিবিজ্ঞান ও ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব এবং শব্দার্থতত্ত্ব। ধ্বনিবিজ্ঞান আলোচনা করে কীভাবে বাগ্যন্ত্রের সাহায্যে ধ্বনিসমষ্টি উচ্চারিত হয়।
ধ্বনিতত্ত্বের আলোচনায় আমরা পাই কোনো একটি বিশেষ ভাষার ব্যবহৃত ধ্বনিগুলির বিচার বিশ্লেষণ। রূপতত্ত্বের বিষয় পদের গঠন, পদের চেয়ে ছোটো ভাষার একক রূপের নানান প্রযুক্তি। বাক্যতত্ত্বের বিষয় হল বাক্যের সার্বিক আলোচনা ও বিচার বিশ্লেষণ। শব্দার্থতত্ত্বের বিষয় শব্দের অর্থ পর্যালোচনা। বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান ভাষার সংগঠনে আলোচনার উপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করে। ভাষাকে যদি মানবদেহের সঙ্গে কল্পনা করি তাহলে ভাষার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি হল ধ্বনি, ধ্বনিগুচ্ছ, রূপ, পদ, বাক্য ইত্যাদি।
ভাষাবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা ও তাদের মধ্যে সম্পর্ক:
=================================
ভাষাবিজ্ঞানের মূল আলোচ্য বিষয় হল মানুষের ভাষা এবং ভাষার সঙ্গে জীবনের বিভিন্ন সংলগ্ন দিকগুলি। ভাষা বাস্তবে একটি অত্যন্ত জটিল বিষয়। ভাষার মধ্যে প্রবেশ করে ভাষার জটিল রহস্যকে উন্মোচন করা ভাষাবিজ্ঞানের অন্যতম উদ্দেশ্য। একদিকে ভাষা এবং অন্যদিকে ভাষার সঙ্গে অন্যান্য সংলগ্ন মানবজীবনের নানা দিক- এই দুই দিক সমান তালে আলোচনা করতে ভাষাবিজ্ঞানের গবেষকদের প্রধানত দু-দলে ভাগ হয়ে যেতে হয়। ক. প্রধান ভাষাবিজ্ঞান ও খ. ফলিত ভাষাবিজ্ঞান।
প্রধান ভাষাবিজ্ঞান :
=================================
ভাষার কেন্দ্রীয় চরিত্র, বিন্যাস এবং তার গঠন প্রণালী আলোচিত হয়। একে বলে প্রধান ভাষাবিজ্ঞান।
ফলিত ভাষাবিজ্ঞান :
=================================
ভাষার সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক এবং ভাষার সঙ্গে অন্যান্য বিদ্যাচর্চার বিভিন্ন ক্ষেত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক বিচার ও বিশ্লেষণ করা হয়। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভাষার অবদান বা প্রয়োগ (application) ফলিত ভাষাবিজ্ঞানের অন্যতম আলোচ্য বিষয়।
প্রধান ভাষাবিজ্ঞান ভাষার যে গঠনপ্রণালী বা ভাষার যে কেন্দ্রীয় বিন্যাস আলোচনা করে তা প্রধানত পাঁচটি শাখায় হয়। এই পাঁচটি শাখা হল ধ্বনিবিজ্ঞান (Phonetics), ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology), রূপতত্ত্ব (Morphology), বাক্যতত্ত্ব (Syntax) ও শব্দার্থতত্ত্ব (Semantics)।
ফলিত ভাষাবিজ্ঞানে আমরা আলোচনা করি বিদ্যাচর্চার বিভিন্ন শাখার সঙ্গে মানবভাষার কী সম্পর্ক। যেমন সমাজ বা সমাজবিজ্ঞানের সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক যার নাম সমাজভাষাবিজ্ঞান, মানবমনের প্রকৃতি ও গতিপ্রকৃতির সঙ্গে মানব ভাষার সম্পর্ক যার নাম মনোভাষাবিজ্ঞান, মানব মস্তিষ্কের অত্যন্ত জটিল গঠনের ও তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে মানবভাষার সম্পর্ক যার নাম স্নায়ুবিজ্ঞান, নৃতত্ত্বের সঙ্গে মানবভাষার সম্পর্ক যার নাম নৃভাষাবিজ্ঞান প্রভৃতি। সাহিত্য বিশ্লেষণে অথবা সাহিত্যের নান্দনিক দিকটি ঠিকভাবে তুলে ধরতে যে ভাষাবিজ্ঞানের সাহায্য বিশেষ জরুরি সেটি হলো শৈলীবিজ্ঞান। এখানে ভাষা ও সাহিত্যের দিকটি আলোচিত হয়। যে শাখায় অভিধান তৈরিতে ভাষাবিজ্ঞানের প্রয়োগ আলোচনা করা হয় তার নাম অভিধানবিজ্ঞান।
ভাষাবিজ্ঞান
=================================





