Madhyamik History Question Paper 2026: চলতি বছরে মাধ্যমিক পরীক্ষা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে এবং বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ের পরীক্ষা হয়ে গিয়েছে। আজ অর্থাৎ ৬ই ফেব্রুয়ারি ছিল মাধ্যমিক ২০২৬বোর্ড পরীক্ষার তৃতীয় দিন, পরীক্ষা ছিলইতিহাসের বিষয়ের। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রশ্নপত্রটি সংগ্রহ করেছি।
মাধ্যমিক ইতিহাস প্রশ্নপত্র ২০২৬
বিষয়
ইতিহাস (History)
তারিখ
৬ই ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার (6th February, Friday)
যে সকল ছাত্র-ছাত্রীরা ২০২৬ সালের দশম শ্রেণীতে পড়াশোনা করেছে অর্থাৎ মাধ্যমিক 2027 পরীক্ষাদিতে চলেছে তাদের জন্যঅবশ্যই প্রশ্নপত্রটা সংগ্রহ করা বাঞ্ছনীয়। এই প্রশ্নপত্রটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ বিগত বছরের এই প্রশ্নপত্রটি দেখে তারা পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের প্যাটার্ন/কাঠামো, নম্বর বিভাজন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেয়ে যাবে।
মাধ্যমিক ইতিহাস প্রশ্নপত্র ২০২৬
(Madhyamik History Question Paper 2026)
মাধ্যমিক 2026পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে ইতিহাস বিষয়ের সংক্ষিপ্ত/ছোট/শর্ট প্রশ্নগুলির নমুনা উত্তর শেয়ার করা হয়েছে। যাতে তারা সকলেই তাদের পরীক্ষার খাতায় লিখে আসা উত্তরের সঙ্গে এই নমুনা উত্তর গুলো মিলিয়ে দেখে নিতে পারে যে, আনুমানিক তাদের কতগুলো প্রশ্নের উত্তর সঠিক হয়েছে এবং কতগুলো ভুল গেছে।
সকল পরীক্ষার্থীর জন্য বিশেষ বার্তা,পরীক্ষাতে যে প্রশ্নের উত্তর ভুল গেছে সেগুলো নিয়ে বেশি চিন্তা না করে পরবর্তী পরীক্ষাগুলোর দিকে মন দিতে হবে যেটা চলে গেছে সেটা ফিরে পাবে না কিন্তু যেটা আসেনি সেটাকে নিজের মতো করে তৈরি করতে পারবে।
নিচে ইতিহাস বিষয়ের শুধুমাত্র বহু বিকল্প ভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ) এবং সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (SAQ)-গুলোর উত্তর নিচে দেওয়া হয়েছে, এ বছরের পরীক্ষার্থীদের কাছে অনুরোধ অবশ্যই একবার তোমাদের করা উত্তরের সাথে মিলিয়ে দেখে নেবে।
বিভাগ ‘ক’
১. সঠিক উত্তরটি বেছে নিয়ে লেখো:
১.১ “লেটারর্স ফ্রম এ ফাদার টু হিজ ডটার”- গ্রন্থে মোট চিঠির সংখ্যা কটি? উত্তর: (গ) ৩০টি
১.২ ‘জীবন স্মৃতি’ গ্রন্থটি লিখেছেন –
উত্তর: (ঘ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
১.৩ রামমোহন রায় ‘ব্রহ্মসভা’ প্রতিষ্ঠা করেন –
উত্তর: (ঘ) ১৮২৮ খ্রিঃ
১.৪ ‘বামাবোধিনী’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন –
উত্তর: (গ) উমেশচন্দ্র দত্ত
১.৫ কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় –
উত্তর: (গ) ১৮৩৫ খ্রিঃ
১.৬ ভারতে প্রথম উপনিবেশিক অরণ্য আইন প্রণীত হয় –
উত্তর: (ক) ১৮৬৫ খ্রিঃ
১.৭ গয়ামুণ্ডা অন্যতম নেতা ছিলেন –
উত্তর: (গ) মুণ্ডা বিদ্রোহের (১৮৯৯-১৯০০)
১.৮ উনিশ শতককে ‘সভা সমিতির যুগ’ বলেছেন –
উত্তর: (ঘ) ডঃ অনিল শীল
১.৯ ‘বন্দেমাতরম’ সংগীতটি রচিত হয় –
উত্তর: (গ) ১৮৭৫ খ্রিঃ
১.১০ ‘ভারত সভা’ প্রতিষ্ঠিত হয় –
উত্তর: (ঘ) ১৮৭৬ খ্রিঃ
১.১১ ‘বসুবিজ্ঞান মন্দির’ প্রতিষ্ঠা করেন –
উত্তর: (গ) জগদীশচন্দ্র বসু
১.১২ ভারতে ‘হাফটোন প্রিন্টিং’ পদ্ধতি প্রবর্তন করেন –
উত্তর: (খ) উপেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরী
১.১৩ নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস-এর প্রথম সভাপতি ছিলেন- উত্তর: (ঘ) লালা লাজপত রায়
১.১৪ বারদৌলি সত্যাগ্রহ আন্দোলন হয়েছিল-
উত্তর: (ঘ) গুজরাটে
১.১৫ ‘দেশপ্রাণ’ নামে পরিচিত ছিলেন –
উত্তর: (ঘ) বীরেন্দ্রনাথ শাসমল
১.১৬ দু’-কড়ি বালা দেবী যুক্ত ছিলেন –
উত্তর: (গ) বিপ্লবী আন্দোলনে
১.১৭ কনকলতা বড়ুয়া শহীদ হন-
উত্তর: (ঘ) ভারত ছাড়ো আন্দোলনে
১.১৮ দলিতদের ‘হরিজন’ আখ্যা দিয়েছিলেন –
উত্তর: (ঘ) গান্ধিজি
১.১৯ ভারতীয় সেনাবাহিনী গোয়া দখল করেন –
উত্তর: (গ) ১৯৬১ খ্রিঃ
১.২০ হরি সিংহ রাজা ছিলেন –
উত্তর: (খ) কাশ্মীর রাজ্যের
বিভাগ ‘খ’
উপবিভাগ: ২.১
(একটি বাক্যে উত্তর দাও)
(২.১.১) ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার প্রথম সম্পাদক-কে ছিলেন?
(২.২.১) বিপিনচন্দ্র পালের জীবনী মূলক গ্রন্থের নাম ‘সত্তর বৎসর’।
উত্তর: ঠিক
(২.২.২) প্রথম ভারতীয় শব ব্যবচ্ছেদকারী হলেন মধুসুদন দত্ত।
উত্তর: ভুল (সঠিক উত্তর: মধুসূদন গুপ্ত)
(২.২.৩) গনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একজন ব্যঙ্গ চিত্রশিল্পী।
উত্তর: ভুল (সঠিক উত্তর: গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর)
(২.২.৪) জাতীয় শিক্ষা-পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে।
উত্তর: ঠিক
উপবিভাগ: ২.৩
(‘ক’ স্তম্ভের সঙ্গে ‘খ’ স্তম্ভ মেলাও)
(২.৩.১) বল্লভভাই প্যাটেল — বারদৌলি আন্দোলন
(২.৩.২) ডঃ বি. আর. আম্বেদকর — দলিত আন্দোলন
(২.৩.৩) রসিদ আলি — ছাত্র আন্দোলন
(২.৩.৪) মেজর জেনারেল জয়ন্তনাথ চৌধুরী — হায়দ্রাবাদ
উপবিভাগ: ২.৪
(কেবলমাত্র দৃষ্টিহীন পরীক্ষার্থীদের জন্য)
(২.৪.১) সরলাদেবী চৌধুরানীর আত্মজীবনী গ্রন্থের নাম ‘জীবনের ঝরাপাতা’
(২.৪.২) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে
(২.৪.৩) সুই মুণ্ডা ছিলেন কোল বিদ্রোহের অন্যতম নেতা
(২.৪.৪) সাঁওতাল বিদ্রোহের একজন নেতা ছিলেন সিধু বা কানু
উপবিভাগ: ২.৫
(বিবৃতি ও সঠিক ব্যাখ্যা নির্বাচন)
(২.৫.১) বিবৃতি: এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে স্যার চার্লস উডের শিক্ষা সংক্রান্ত নির্দেশনামাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তর: ব্যাখ্যা ২: তিনি ছিলেন কোম্পানির বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতি
(২.৫.২) বিবৃতি: ভারতের ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার অরণ্য আইন প্রবর্তন করেছিলেন।
উত্তর: ব্যাখ্যা ৩: এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ চরিতার্থ করা
(২.৫.৩) বিবৃতি: আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ছিলেন এদেশে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার অন্যতম পথিকৃত।
উত্তর: ব্যাখ্যা ৩: তিনি ছিলেন বেঙ্গল কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস্-এর প্রতিষ্ঠাতা
(২.৫.৪) বিবৃতি: মোপলা বিদ্রোহ অনুষ্ঠিত হয় ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে।
উত্তর: ব্যাখ্যা ২: এটি ছিল সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ
বিভাগ ‘গ’ (দুটি বা তিনটি বাক্যে উত্তর)
৩.১ আধুনিক ভারত ইতিহাসের উপাদানরূপে সরকারি নথিপত্রের সীমাবদ্ধতা কী?
সরকারি নথিপত্র মূলত ইংরেজ শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা। এতে সাধারণ মানুষের আন্দোলনকে ‘বিদ্রোহ’ বা ‘হাঙ্গামা’ হিসেবে দেখা হতো এবং বিদ্রোহীদের ওপর অত্যাচারের কাহিনি অনেক সময় গোপন রাখা হতো। অর্থাৎ, এতে তথ্যের নিরপেক্ষতার অভাব থাকতে পারে।
৩.২ ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ গুরুত্বপূর্ণ কেন?
১৯১১ খ্রিস্টাব্দ দুটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ— প্রথমত, এই বছর মোহনবাগান ক্লাব ব্রিটিশ দল ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিনেন্টকে হারিয়ে প্রথম ভারতীয় দল হিসেবে আই.এফ.এ শিল্ড জয় করে। দ্বিতীয়ত, ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়।
৩.৩ খ্রিস্টান মিশনারীদের প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল?
খ্রিস্টান মিশনারীদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভারতে খ্রিস্টধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটানো। এই উদ্দেশ্যে তাঁরা পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারে উদ্যোগী হন এবং বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন।
৩.৪ “সর্বধর্ম সমন্বয়” বলতে কী বোঝায়?
শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব প্রচারিত এই আদর্শের মূল কথা হলো— জগতের প্রতিটি ধর্মের লক্ষ্য এক ও অভিন্ন, অর্থাৎ পরমেশ্বরের সান্নিধ্য লাভ। তিনি বলেছিলেন “যত মত, তত পথ”, অর্থাৎ বিভিন্ন ধর্ম হলো একই ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর ভিন্ন ভিন্ন রাস্তা।
৩.৫ “বিপ্লব” বলতে কী বোঝায়?
যখন কোনো প্রচলিত আর্থ-সামাজিক বা রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল, দ্রুত এবং ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে, তখন তাকে বিপ্লব বলা হয়। বিপ্লব সাধারণত দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অসন্তোষের ফল এবং এটি প্রচলিত কাঠামোর পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন ব্যবস্থার জন্ম দেয়।
৩.৬ ফরাজি আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার কারণ কী ছিল?
ফরাজি আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ ছিল— যোগ্য নেতৃত্বের অভাব, আন্দোলনের অতিরিক্ত ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং ব্রিটিশ সরকারের কঠোর দমননীতি। এছাড়া ধনী হিন্দু জমিদার ও ব্রিটিশ নীলকররা একজোট হয়ে এই আন্দোলন দমন করেছিল।
৩.৭ ‘হিন্দু মেলা’র প্রধান দুটি উদ্দেশ্য কী ছিল?
১. ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা ও দেশপ্রেম জাগ্রত করা।
২. দেশীয় ভাষা, সাহিত্য এবং দেশীয় শিল্পের চর্চা ও প্রসার ঘটানো।
৩.৮ ‘আনন্দ মঠ’ উপন্যাসটি কীভাবে জাতীয়তাবাদী চেতনা বিস্তারে সাহায্য করেছিল?
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দ মঠ’ উপন্যাসে বর্ণিত ‘সন্তান দল’-এর দেশপ্রেম এবং ‘বন্দেমাতরম’ সংগীতটি পরাধীন ভারতের বিপ্লবীদের কাছে মন্ত্রের মতো কাজ করেছিল। এটি দেশমাতৃকাকে পূজা করার আদর্শ ছড়িয়ে দিয়ে জাতীয়তাবোধকে তুঙ্গে নিয়ে যায়।
৩.৯ পঞ্চানন কর্মকার কে ছিলেন?
পঞ্চানন কর্মকার ছিলেন একজন দক্ষ বাঙালি মুদ্রাক্ষর শিল্পী। তিনি চার্লস উইলকিন্সকে বাংলা হরফের টাইপ বা ছাঁদ তৈরিতে বিশেষভাবে সাহায্য করেছিলেন এবং শ্রীরামপুর মিশনে আধুনিক বাংলা মুদ্রণ শিল্পের ভিত মজবুত করেছিলেন।
৩.১০ বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট কেন প্রতিষ্ঠিত হয়?
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় সরকারি শিক্ষা বর্জনকারী ছাত্রদের কারিগরি শিক্ষা প্রদানের জন্য ১৯০৬ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসারের মাধ্যমে এদেশীয় ছাত্রদের স্বাবলম্বী করে তোলা।
৩.১১ স্বদেশি আন্দোলনে বাংলার কৃষকরা কেন যোগ দেয়নি?
স্বদেশি আন্দোলন ছিল মূলত শহরকেন্দ্রিক এবং উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের নেতৃত্বাধীন। এই আন্দোলনে কৃষকদের ভূমি রাজস্ব হ্রাস বা মহাজনদের শোষণ থেকে মুক্তির কোনো নির্দিষ্ট কর্মসূচি ছিল না, তাই বাংলার বৃহৎ কৃষক সমাজ এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগ দেয়নি।
৩.১২ ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি কেন গঠিত হয়?
১৯২৭-২৮ সালে শ্রমিক ও কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য এবং জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে বামপন্থী আদর্শ প্রচারের উদ্দেশ্যে এই দল গঠিত হয়। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকে সংঘবদ্ধ করাই ছিল এর প্রধান লক্ষ্য।
৩.১৩ ‘কার্লাইল সার্কুলার’ বলতে কী বোঝায়?
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন থেকে ছাত্রদের দূরে রাখতে ব্রিটিশ সরকারের সচিব আর. ডব্লিউ. কার্লাইল এক দমনমূলক নির্দেশিকা জারি করেন। এতে বলা হয়, কোনো ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়কে সরকারি সাহায্য বা স্বীকৃতি দেওয়া হবে না— এটিই কার্লাইল সার্কুলার।
৩.১৪ ‘দলিত’ কাদের বলা হয়?
ভারতীয় বর্ণব্যবস্থায় যারা তথাকথিত ‘অস্পৃশ্য’ বা সামাজিকভাবে নিগৃহীত ও অবহেলিত শ্রেণি হিসেবে পরিচিত ছিল, তাদের দলিত বলা হয়। জ্যোতিরাও ফুলে এবং ডঃ বি আর আম্বেদকর এই বঞ্চিত শ্রেণিকে সামাজিক অধিকার দেওয়ার জন্য লড়াই করেছিলেন।
৩.১৫ ‘ভারতভুক্তির দলিল’ (Instrument of Accession) বলতে কী বোঝায়?
১৯৪৭ সালে ভারতীয় স্বাধীনতা আইনের মাধ্যমে দেশীয় রাজ্যগুলোকে ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়। এই রাজ্যগুলো যে আইনি দলিলে স্বাক্ষর করে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, তাকেই ‘ভারতভুক্তির দলিল’ বলা হয়।
৩.১৬ ‘রাজ্যপুনর্গঠন কমিশন’ (১৯৫৩) কেন গঠিত হয়?
স্বাধীন ভারতে ভাষার ভিত্তিতে রাজ্যগুলির সীমানা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা খতিয়ে দেখার জন্য ফজল আলি-র নেতৃত্বে ১৯৫৩ সালে রাজ্যপুনর্গঠন কমিশন গঠিত হয়। এর প্রধান কাজ ছিল প্রশাসনিক সুবিধার ভিত্তিতে রাজ্য ভাগ করার পরামর্শ দেওয়া।
বিভাগ ‘ঘ’
৪.১ উনিশ শতকে নব্যবঙ্গ গোষ্ঠীর সমাজ সংস্কার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল কেন?
হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর অনুগামী নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠী সমাজ সংস্কারে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নিলেও তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। এর প্রধান কারণগুলি হলো:
উগ্রতা ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি: নব্যবঙ্গীয়রা হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির সমালোচনা করতে গিয়ে অত্যন্ত উগ্র রূপ ধারণ করেছিলেন। তাঁদের খাদ্য ও পানীয়ের অভ্যাস তৎকালীন রক্ষণশীল হিন্দু সমাজকে ক্ষুব্ধ করেছিল।
জনবিচ্ছিন্নতা: তাঁদের এই আন্দোলন ছিল মূলত শহরকেন্দ্রিক এবং ইংরেজি শিক্ষিত মুষ্টিমেয় কিছু তরুণের মধ্যে সীমাবদ্ধ। গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগের সঙ্গে তাঁদের কোনো যোগসূত্র ছিল না।
গঠনমূলক কর্মসূচির অভাব: তাঁরা প্রচলিত ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করলেও বিকল্প কোনো শক্তিশালী সমাজকাঠামো বা দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার পরিকল্পনা দিতে পারেননি।
অকাল মৃত্যু ও নেতৃত্বহীনতা: ১৮৩১ সালে ডিরোজিওর অকাল প্রয়াণের ফলে এই গোষ্ঠী সুযোগ্য নেতৃত্ব হারিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পড়ে।
৪.২ উনিশ শতকের নবজাগরণকে ‘সীমাবদ্ধ নবজাগরণ’ বলা হয় কেন?
বাংলার উনিশ শতকের নবজাগরণ ইউরোপীয় রেনেসাঁসের মতো সর্বব্যাপী ছিল না বলে অনেক ঐতিহাসিক একে ‘সীমাবদ্ধ নবজাগরণ’ বলেছেন। এর কারণ:
শহরকেন্দ্রিকতা: এই নবজাগরণ ছিল মূলত কলকাতা শহরকেন্দ্রিক। গ্রাম বাংলার বৃহত্তর জনসমাজে এর কোনো প্রভাব পড়েনি।
উচ্চবিত্তের আন্দোলন: এটি ছিল উচ্চবিত্ত ও ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ। কৃষক ও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ এই আধুনিকতার স্পর্শ পায়নি।
ঔপনিবেশিক চরিত্র: ঐতিহাসিক অনিল শীলের মতে, এই জাগরণ ছিল ব্রিটিশদের তৈরি একটি কাঠামো, যা শাসকদের অনুগত এক শ্রেণির মানুষের জন্ম দিয়েছিল মাত্র।
ধর্মীয় সীমাবদ্ধতা: এই নবজাগরণ মূলত হিন্দু সমাজের উচ্চবর্গের একাংশকে প্রভাবিত করেছিল; মুসলিম সমাজ বা নিম্নবর্গের মানুষ এর বাইরেই থেকে গিয়েছিল।
৪.৩ উনিশ শতককে ‘সভা সমিতির যুগ’ বলা হয় কেন?
ঐতিহাসিক অনিল শীল উনিশ শতককে ‘সভা সমিতির যুগ’ বলে অভিহিত করেছেন।
কারণ:
রাজনৈতিক চেতনা: এই সময়ে ভারতীয়দের মধ্যে প্রথম সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক চেতনা ও জাতীয়তাবোধ গড়ে ওঠে।
সংগঠন প্রতিষ্ঠা: এ সময় দাবিদাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে একের পর এক সভা-সমিতি গড়ে ওঠে। যেমন— বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা (১৮৩৬), জমিদার সভা (১৮৩৮), ভারত সভা (১৮৭৬) ইত্যাদি।
আন্দোলনের রূপরেখা: এই সমিতিগুলো সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সরকারি চাকরিতে ভারতীয়দের নিয়োগ এবং অস্ত্র আইনের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে শুরু করে। এই সংগঠনগুলোই পরবর্তীকালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (১৮৮৫) প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করেছিল।
৪.৪ বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভাকে প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলা হয় কেন?
১৮৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভাকে ভারতের প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা হয় কারণ:
সংঘবদ্ধ প্রয়াস: এর আগে রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগে নানা সমিতি হলেও, এটিই ছিল প্রথম সংগঠন যেখানে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনার নিয়মিত ব্যবস্থা ছিল।
সরকারি নীতির সমালোচনা: এই সভা কোম্পানি সরকারের বিভিন্ন কর নীতি এবং নিষ্কর জমির ওপর কর আরোপের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন: রাজনৈতিক দাবি আদায়ের জন্য আবেদন-নিবেদন ও জনমত গঠনের যে আধুনিক পদ্ধতি, তা এই সভার মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল।
৪.৫ শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে ছাপা বইয়ের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করো।
ছাপাখানা ও ছাপা বই এদেশের শিক্ষা বিস্তারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল:
সহজলভ্যতা ও স্বল্প মূল্য: ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার আগে হাতে লেখা বই ছিল অত্যন্ত দামি ও দুর্লভ। ছাপাখানায় প্রচুর বই ছাপা হওয়ার ফলে বইয়ের দাম কমে যায় এবং তা সাধারণ মানুষের নাগালে আসে।
পাঠ্যপুস্তকের জোগান: ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি (১৮১৭) গঠনের পর অজস্র পাঠ্যপুস্তক ছাপা হতে থাকে, যা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বিস্তারে বিশেষ সহায়তা করে।
মাতৃভাষার প্রসার: ছাপাখানার দৌলতে প্রচুর বাংলা বই বাজারে আসায় মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার প্রসার ঘটে। ফলে শিক্ষার গণতন্ত্রীকরণ সম্ভব হয়।
৪.৬ বাংলা মুদ্রণ শিল্পে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন বাংলা মুদ্রণ শিল্পের এক বিস্ময়কর প্রতিভা। তাঁর ভূমিকা ছিল বহুমুখী:
ইউ রায় অ্যান্ড সন্স: ১৮৯৫ সালে তিনি নিজের ছাপাখানা ‘ইউ রায় অ্যান্ড সন্স’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা উন্নতমানের মুদ্রণের জন্য বিশ্বখ্যাত হয়েছিল।
হাফটোন ব্লক প্রযুক্তি: তিনি ভারতে প্রথম ‘হাফটোন ব্লক’ তৈরির কৌশল উদ্ভাবন করেন। এর ফলে বইয়ে ছবি ছাপানোর মান অনেক উন্নত হয়।
নতুন যন্ত্রের আবিষ্কার: মুদ্রণ শিল্পের উন্নতির জন্য তিনি ‘স্ক্রিন অ্যাডজাস্টার’ এবং ‘ডায়াফ্রাম’ নামক যন্ত্র উদ্ভাবন করেন, যা বিদেশেও সমাদৃত হয়েছিল।
শিশু সাহিত্য: তাঁর হাতেই সুন্দর মুদ্রণ ও অলংকরণসহ ‘সন্দেশ’ পত্রিকা এবং ‘টুনটুনির বই’ প্রকাশিত হয়, যা শিশু শিক্ষার প্রসারে সহায়ক হয়েছিল।
বিভাগ ‘ঙ’
৫. পনেরো-ষোলোটি বাক্যে উত্তর দাও (যেকোনো একটি):
৫.১ মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭) চরিত্র বিশ্লেষণ করো:
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ভারতের ইতিহাসের একটি অত্যন্ত বিতর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই বিদ্রোহের চরিত্র নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা মতভেদ রয়েছে। এর বিভিন্ন দিকগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
১. সিপাহি বিদ্রোহ:
ব্রিটিশ ঐতিহাসিক জন লরেন্স, জন সীলে এবং অনেক সমসাময়িক ইংরেজ মনে করেন এটি ছিল নিছক একটি ‘সিপাহি বিদ্রোহ’। তাঁদের মতে, চর্বিমিশ্রিত টোটার ব্যবহার এবং সিপাহিদের ব্যক্তিগত অসন্তোষ থেকেই এই বিদ্রোহের জন্ম।
২. সামন্ততান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া:
ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার এবং ডঃ রজনী পাম দত্ত এই বিদ্রোহকে ‘সামন্ততান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁদের মতে, ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ, নানা সাহেব এবং মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ মূলত তাঁদের হারানো রাজ্য ও ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জন্য লড়াই করেছিলেন।
৩. ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ:
বিপ্লবী বিনায়ক দামোদর সাভারকার তাঁর ‘The Indian War of Independence’ গ্রন্থে এই বিদ্রোহকে ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’ (First War of Independence) বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এটি ছিল বিদেশি শাসন থেকে ভারতকে মুক্ত করার একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা।
৪. গণবিদ্রোহের চরিত্র:
বিদ্রোহটি শুরু সিপাহিদের মাধ্যমে হলেও শীঘ্রই এটি উত্তর ও মধ্য ভারতের সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। অযোধ্যা এবং বিহারের সাধারণ কৃষক ও কারিগররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিদ্রোহে যোগ দেওয়ায় এটি একটি ব্যাপক ‘গণবিদ্রোহ’-এর রূপ নেয়। ঐতিহাসিক জে. বি. নর্টন এই মতের সমর্থক।
৫. জাতীয় বিদ্রোহ:
বেঞ্জামিন ডিজরেলি এবং ঐতিহাসিক কার্ল মার্কস একে ‘জাতীয় বিদ্রোহ’ বলে মনে করেন। কারণ এই বিদ্রোহে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ই ব্রিটিশ শাসনের উচ্ছেদের লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ কেবল সিপাহি বিদ্রোহ বা কেবল সামন্ততান্ত্রিক বিদ্রোহ ছিল না। এটি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের দীর্ঘদিনের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে ভারতের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সম্মিলিত এবং সশস্ত্র প্রতিবাদ। এটিই ছিল পরবর্তীকালে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূল অনুপ্রেরণা।
৫.২ এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে ডেভিড হেয়ার এবং ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুনের ভূমিকা:
উনিশ শতকে বাংলার শিক্ষা সংস্কার ও পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে দুজন ইউরোপীয় ব্যক্তিত্বের নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে— ডেভিড হেয়ার এবং জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন।
১. ডেভিড হেয়ারের ভূমিকা:
স্কটল্যান্ড নিবাসী ঘড়ি প্রস্তুতকারক ডেভিড হেয়ার এদেশের শিক্ষার উন্নতির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা:পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে রামমোহন রায় ও রাধাকান্ত দেবের সহযোগিতায় তিনি ‘হিন্দু কলেজ’ (বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেন।
স্কুল বুক সোসাইটি: ছাত্রদের জন্য উন্নতমানের পাঠ্যপুস্তক তৈরির উদ্দেশ্যে ১৮১৭ সালে তিনি ‘ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করেন।
স্কুল সোসাইটি: ১৮১৮ সালে তিনি ‘ক্যালকাটা স্কুল সোসাইটি’ স্থাপন করেন, যার মাধ্যমে বহু অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়।
মেডিকেল কলেজ: পাশ্চাত্য চিকিৎসাশাস্ত্র প্রসারে ১৮৩৫ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠায় তিনি সক্রিয় উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
২. ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুনের ভূমিকা:
ভারতে নারীশিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে জে. ই. ডি. বেথুন বা বেথুন সাহেবের নাম চিরস্মরণীয়।
হিন্দু ফিমেল স্কুল প্রতিষ্ঠা: ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতায় ‘হিন্দু ফিমেল স্কুল’ (বর্তমানে বেথুন স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল বাংলার প্রথম আধুনিক উচ্চমানের বালিকা বিদ্যালয়।
নারী শিক্ষার প্রসার:তিনি বিশ্বাস করতেন যে নারীজাতির উন্নতি ছাড়া সমাজের উন্নতি সম্ভব নয়। রক্ষণশীল সমাজের প্রবলবিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি বালিকাদের স্কুলে পাঠানোর জন্য অভিভাবকদের উৎসাহিত করতেন।
বিদ্যাসাগরের সহযোগিতা: তাঁর এই মহৎ কাজে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁকে সবরকম সহযোগিতা করেছিলেন। বিদ্যাসাগর এই স্কুলের সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছেন।
ব্যক্তিগত ত্যাগ: বেথুন সাহেব তাঁর ব্যক্তিগত অর্জিত অর্থের প্রায় পুরোটাই নারী শিক্ষার জন্য দান করে গেছেন।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, ডেভিড হেয়ার ছিলেন সাধারণ ও উচ্চশিক্ষার প্রসারের প্রাণপুরুষ, আর বেথুন সাহেব ছিলেন নারী শিক্ষার অগ্রদূত। তাঁদের নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টার ফলেই বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষার ভিত মজবুত হয়েছিল এবং সমাজ সংস্কারের পথ প্রশস্ত হয়েছিল।
৫.৩ সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারী ও ছাত্র সমাজের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।
বিশ শতকের ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশেষ করে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারী ও ছাত্র সমাজের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত এবং গৌরবোজ্জ্বল।
ছাত্র সমাজের ভূমিকা:
আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু: ছাত্ররাই ছিল বিপ্লবী আন্দোলনের মূল শক্তি। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই ছাত্ররা পিকেটিং, বিলিতি পণ্য বর্জন এবং গুপ্ত সমিতির সদস্য হিসেবে সক্রিয় হয়।
গোপন সমিতি: যুগান্তর ও অনুশীলন সমিতির মতো গুপ্ত সমিতিগুলিতে স্কুল-কলেজের ছাত্ররাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করত।
উল্লেখযোগ্য অবদান: ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী এবং পরবর্তীকালে বিনয়-বাদল-দীনেশের অলিন্দ যুদ্ধ ছিল ছাত্র শক্তিরই বহিঃপ্রকাশ। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনেও সূর্য সেনের বাহিনীতে মূলত ছাত্ররাই ছিল।
নারী সমাজের ভূমিকা:
বিপ্লবীদের আশ্রয়দান:নারী সমাজ প্রথমদিকে বিপ্লবীদের আশ্রয় দেওয়া, অস্ত্র লুকিয়ে রাখা এবং এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার কাজ করত।
সরাসরি সংঘাত:১৯৩০-এর দশক থেকে নারীরা সরাসরি সশস্ত্র সংঘাতে অংশ নেন।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার:পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি শহীদের মৃত্যু বরণ করেন।
কল্পনা দত্ত: সূর্য সেনের সহযোগী হিসেবে তিনি চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ও ডিনামাইট ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন।
শান্তি ও সুনীতি: কুমিল্লার জেলাশাসক স্টিভেন্সকে গুলি করে হত্যা করে তারা নারী শক্তির পরাক্রম দেখান।
বীণা দাস: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে লাটসাহেব স্ট্যানলি জ্যাকসনকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে দুঃসাহসিকতার পরিচয় দেন।
উপসংহার:
ব্রিটিশদের কঠোর দমননীতি এবং ‘কার্লাইল সার্কুলার’-এর মতো বাধা থাকা সত্ত্বেও ছাত্র ও নারীদের এই নির্ভীক অংশগ্রহণ স্বাধীনতা আন্দোলনকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। তাঁদের আত্মত্যাগ সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী মানসিকতা দৃঢ় করতে সাহায্য করেছিল।