মাধ্যমিক বাংলা

‘পথের দাবী’ গল্প

প্রশ্ন উত্তর (MCQ ও বড় প্রশ্ন) 

Published on: 

  আজ  দশম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যক্রমের অমর কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত বিখ্যাত ‘পথের দাবী’ গদ্যাংশটি নিয়ে আলোচনা করব। এই পাঠ্যাংশের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এক অকুতোভয় বিপ্লবী ও স্বাধীনতা সংগ্রামী সব্যসাচী মল্লিক, যিনি ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দিতে ‘গিরিশ মহাপাত্র’ ছদ্মবেশ ধারণ করেছেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর অপরিসীম ত্যাগ, অসামান্য বুদ্ধিমত্তা এবং সেইসঙ্গে পরাধীন ভারতের অহংকারী ব্রিটিশ পুলিশের চরম অপদার্থতা ও বোকামি এই রচনায় এক অপূর্ব রোমাঞ্চকর রূপ পেয়েছে।

 

বোর্ড: বিষয়বস্তু

1 পথের দাবী – শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (দশম শ্রেণী বাংলা গল্প)

2 দশম শ্রেণী ‘পথের দাবী’ গল্পের অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর (SAQ) | Class 10 Pather Dabi Short Question Answer

3 ক্লাস 10 বাংলা পথের দাবী গল্পের ৩ নম্বর প্রশ্ন উত্তর | Pather Dabi Class 10 Bangla 3 Marks Question Answer

3.1 মাধ্যমিক বাংলা পথের দাবী বড়ো প্রশ্ন উত্তর (প্রশ্নমান – ৫) | Madhyamik Class 10th Bengali Pather Dabi 5 Marks Long Question Answer

পথের দাবী – শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

 (দশম শ্রেণী বাংলা গল্প)

 

পথের দাবী গল্পের – উৎস ও লেখক পরিচিতি 

 

আলোচ্য গদ্যাংশটি রবীন্দ্র সমসাময়িক বিখ্যাত ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা। হুগলি জেলার দেবানন্দপুরে জন্মগ্রহণ করা এই বর্ণময় জীবনের অধিকারী লেখকের লেখায় গ্রাম-জীবন এবং মধ্যবিত্ত মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা আশ্চর্য মুন্সিয়ানায় ভাষারূপ পেয়েছে। পাঠ্য রচনাটি তাঁর বিখ্যাত ‘পথের দাবী’ উপন্যাসের একটি অংশবিশেষ। বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগে ব্রিটিশ সরকার একসময় এই উপন্যাসটি বাজেয়াপ্ত করেছিল।

 

পথের দাবী গল্পের – সারাংশ

 

রেঙ্গুনের পুলিশ-স্টেশনে জগদীশবাবু উত্তর-ব্রহ্মের বর্মা-অয়েল-কোম্পানির তেলের খনির কারখানার বাঙালি মিস্ত্রিদের খানা-তল্লাশি করছিলেন। সেখানে পোলিটিক্যাল সাসপেক্ট সব্যসাচী মল্লিককে নিমাইবাবুর সম্মুখে হাজির করা হয়। এই ব্যক্তি ‘গিরীশ মহাপাত্র’ নাম ধারণ করেছিলেন। তাঁর চেহারা ছিল অত্যন্ত রুগ্ন এবং কাশির পরিশ্রমে সে হাঁপাচ্ছিল, কিন্তু তাঁর অদ্ভুত দুটি চোখের দৃষ্টি ছিল অত্যন্ত গভীর জলাশয়ের মতো।

তাঁর বেশভূষা ছিল অত্যন্ত অদ্ভুত— মাথায় নেবুর তেলে চোবানো চুল, গায়ে জাপানি সিল্কের রামধনু রঙের চুড়িদার পাঞ্জাবি, পরনে কালো মকমল পাড়ের শাড়ি, পায়ে সবুজ মোজা ও লোহার নাল বাঁধানো পাম্প শু। এই অদ্ভুত বেশভূষা এবং পকেট থেকে পাওয়া একটি গাঁজার কলিকা দেখে পুলিশ তাঁকে নিরীহ মনে করে ছেড়ে দেয়। অপূর্ব এই ঘটনার সাক্ষী ছিল এবং সে বুঝতে পারে যে পুলিশ মহা নির্বোধের মতো আসল বিপ্লবীকে চিনতে পারেনি।

অপূর্ব থানায় গিয়েছিল তার বাসায় চুরির খবর দিতে। অপূর্বর চাকর তেওয়ারি ফয়ায় বর্মা নাচ দেখতে যাওয়ার সুযোগে এই চুরি হয়, কিন্তু উপরের ক্রিশ্চান মেয়েটির কৃপায় টাকাকড়ি ছাড়া বাকি জিনিসপত্র বেঁচে যায়। পরে সহকর্মী রামদাস তলওয়ারকরের সঙ্গে টিফিন খাওয়ার সময় অপূর্ব পুলিশের নির্বুদ্ধিতা নিয়ে হাসাহাসি করে।

 

অপূর্বর কাকা নিমাইবাবু পুলিশের বড়ো কর্তা হয়েও দেশের স্বাধীনতাকামীদের শিকারের মতো তাড়া করে বেড়াচ্ছেন ভেবে অপূর্বর মনে গভীর আক্ষেপ ও দেশপ্রেম জেগে ওঠে। অপূর্ব স্মরণ করে কীভাবে বিনা দোষে ফিরিঙ্গি ছোঁড়ারা তাকে লাথি মেরে প্ল্যাটফর্ম থেকে বের করে দিয়েছিল এবং দেশি লোক হওয়ায় স্টেশনমাস্টার তাকে কুকুরের মতো দূর করে দিয়েছিল।

এরপর আফিসের কাজে ভামো যাওয়ার পথে স্টেশনে অপূর্বর সঙ্গে আবার গিরীশ মহাপাত্রের দেখা হয়। প্রথম শ্রেণির যাত্রী হওয়া সত্ত্বেও ট্রেনে অপূর্বকে বর্মা পুলিশের হাতে বারবার হেনস্থা হতে হয়, কারণ পুলিশ তাকে জানিয়ে দেয় যে ইউরোপিয়ান না হলে পুলিশের ইচ্ছানুযায়ী তাকে টেনে নীচে নামানো যেতে পারে।

 

পথের দাবী গল্পের – নামকরণের তাৎপর্য

 

‘পথের দাবী’ উপন্যাসের এই অংশে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক জ্বলন্ত প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে। ‘পথ’ বলতে এখানে পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের দুর্গম ও কণ্টককীর্ণ বিপ্লবের পথকে বোঝানো হয়েছে। সব্যসাচী মল্লিকের মতো বিপ্লবীরা সেই দুর্গম পথের পথিক। অন্যদিকে, অপূর্বর মতো সাধারণ মানুষের মনেও ফিরিঙ্গিদের অত্যাচারের ফলে দেশপ্রেম ও ন্যায়ের পথে চলার এক প্রচ্ছন্ন ‘দাবী’ বা অধিকারবোধ জাগ্রত হচ্ছে। গদ্যাংশটিতে পরাধীন দেশের মানুষের অপমানের জ্বালা এবং স্বাধীনতার সেই দুর্গম পথের আহ্বান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে বলেই “পথের দাবী” নামকরণটি সর্বতোভাবে সার্থক।

দশম শ্রেণী ‘পথের দাবী’ গল্প

অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর (SAQ)

Class 10 Pather Dabi Short Question Answer

 

১. ‘পথের দাবী’ পাঠ্যাংশটি কোন উপন্যাস থেকে নেওয়া হয়েছে?
উত্তর: পাঠ্যাংশটি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘পথের দাবী’ উপন্যাস থেকে নেওয়া হয়েছে।

২. পুলিশ-স্টেশনের হলঘরে কারা বসেছিল?
উত্তর: হলঘরে জন-ছয়েক বাঙালি বসেছিল, যারা উত্তর-ব্রহ্মে বর্মা-অয়েল-কোম্পানির তেলের খনির কারখানায় মিস্ত্রির কাজ করত।

৩. পোলিটিক্যাল সাসপেক্ট হিসেবে কাকে পুলিশের সামনে হাজির করা হয়েছিল?
উত্তর: পোলিটিক্যাল সাসপেক্ট হিসেবে সব্যসাচী মল্লিককে নিমাইবাবুর সম্মুখে হাজির করা হয়েছিল।

৪. সব্যসাচী মল্লিক পুলিশের কাছে নিজের কী নাম বলেছিলেন?
উত্তর: সব্যসাচী মল্লিক পুলিশের কাছে নিজের নাম বলেছিলেন ‘গিরীশ মহাপাত্র’।

৫. গিরীশ মহাপাত্রের গায়ে কী জামা ছিল?
উত্তর: তাঁর গায়ে ছিল জাপানি সিল্কের রামধনু রঙের চুড়িদার পাঞ্জাবি।

৬. গিরীশ মহাপাত্রের পকেট থেকে কী কী পাওয়া গিয়েছিল?
উত্তর: তাঁর পকেট থেকে একটি লোহার কম্পাস, মাপ করবার কাঠের একটা ফুটরুল, কয়েকটা বিড়ি, একটা দেশলাই এবং একটা গাঁজার কলিকা পাওয়া গিয়েছিল।

৭. অপূর্বর ঘরের চুরির সময় তার চাকর তেওয়ারি কোথায় গিয়েছিল?
উত্তর: তেওয়ারি ফয়ায় বর্মা নাচ দেখতে গিয়েছিল।

৮. চুরির সময় অপূর্বর টাকাকড়ি ছাড়া বাকি সমস্ত জিনিস কে বাঁচিয়েছিল?
উত্তর: উপরের ক্রিশ্চান মেয়েটির কৃপায় অপূর্বর টাকাকড়ি ছাড়া বাকি সমস্ত জিনিস বেঁচে গিয়েছিল।

৯. “কিন্তু বুনো হাঁস ধরাই যে এদের কাজ” — কথাটি কে, কাকে বলেছিল?
উত্তর: কথাটি অপূর্বর সহকর্মী রামদাস তলওয়ারকর অপূর্বকে বলেছিল।

১০. অপূর্বর কাকা নিমাইবাবুর চাকরি কে করে দিয়েছিলেন?
উত্তর: অপূর্বর বাবা একদিন নিমাইবাবুর চাকরি করে দিয়েছিলেন।

১১. গিরীশ মহাপাত্রের বয়স কত ছিল বলে মনে হয়েছিল?
উত্তর: গিরীশ মহাপাত্রের বয়স ত্রিশ-বত্রিশের অধিক নয় বলে মনে হয়েছিল।

১২. গিরীশ মহাপাত্রের মাথার চুলের বর্ণনা দাও।
উত্তর: তাঁর মাথার সামনের দিকে বড়ো বড়ো চুল ছিল, কিন্তু ঘাড় ও কানের দিকে একেবারে ছোটো করে ছাঁটা ছিল এবং মাথায় চেরা সিঁথি ছিল।

১৩. গিরীশ মহাপাত্রের চুলে কীসের গন্ধ ছিল?
উত্তর: তাঁর চুলে নিদারুণ নেবুর তেলের গন্ধ ছিল

১৪. গিরীশ মহাপাত্রের পায়ে কী রঙের মোজা ছিল?
উত্তর: তাঁর পায়ে সবুজ রঙের ফুল মোজা ছিল।

১৫. “নেবুর তেলের গন্ধে ব্যাটা থানাসুদ্ধ লোকের মাথা ধরিয়ে দিলে!” – কথাটি কে বলেছিলেন?
উত্তর: কথাটি জগদীশবাবু বলেছিলেন।

১৬. অপূর্বর সহকর্মীর নাম কী ছিল?
উত্তর: অপূর্বর সহকর্মীর নাম ছিল রামদাস তলওয়ারকর।

১৭. রামদাসের স্ত্রী অপূর্বর জন্য কী পাঠাতেন?
উত্তর: রামদাসের স্ত্রী অপূর্বর জন্য নিজের হাতের তৈরি যৎসামান্য মিষ্টান্ন পাঠাতেন।

১৮. অপূর্বর ঘরের চুরির সময় কে তার জিনিসপত্র গুছিয়ে ফর্দ করে দিয়েছিল?
উত্তর: উপরের ক্রিশ্চান মেয়েটি অপূর্বর জিনিসপত্র গুছিয়ে নিখুঁত ফর্দ করে দিয়েছিল।

১৯. স্টেশনে ফিরিঙ্গি ছোঁড়ারা অপূর্বকে কী করেছিল?
উত্তর: ফিরিঙ্গি ছোঁড়ারা স্টেশনে বিনা দোষে অপূর্বকে লাথি মেরে প্ল্যাটফর্ম থেকে বের করে দিয়েছিল।

২০. অপূর্বর মতে কারা বুনো হাঁসের পিছনে ছুটোছুটি করে টাকা অপব্যয় করছে?
উত্তর: অপূর্বর মতে পুলিশেরা পোলিটিক্যাল সাসপেক্টদের ধরতে গিয়ে বুনো হাঁসের পিছনে ছুটোছুটি করে টাকা অপব্যয় করছে।

মাধ্যমিক বাংলা

  পথের দাবী গল্পের নম্বর প্রশ্ন উত্তর 

3 Marks Question Answer

 

১. “বাবুটির স্বাস্থ্য গেছে, কিন্তু শখ ষোলোআনাই বজায় আছে…” – বাবুটি কে? তার শখের পরিচয় দাও।

উত্তর: প্রদত্ত উদ্ধৃতিটিতে ‘বাবুটি’ বলতে পোলিটিক্যাল সাসপেক্ট সব্যসাচী মল্লিকের ছদ্মবেশী রূপ গিরীশ মহাপাত্রকে বোঝানো হয়েছে।

 

শখের পরিচয়: গিরীশ মহাপাত্রের অদ্ভুত সাজগোজ তার শখের পরিচয় দেয়। তার মাথায় চেরা সিঁথি এবং চুলে প্রচুর নেবুর তেল মাখা ছিল, যার উগ্র গন্ধে চারদিক ভরে উঠেছিল। তার গায়ে ছিল জাপানি সিল্কের রামধনু রঙের চুড়িদার পাঞ্জাবি, যার বুকপকেট থেকে বাঘ-আঁকা রুমাল দেখা যাচ্ছিল। পরনে বিলাতি মিলের কালো মকমল পাড়ের সূক্ষ্ম শাড়ি, পায়ে সবুজ রঙের ফুলমোজা (যা হাঁটুর ওপর লাল ফিতে দিয়ে বাঁধা) এবং লোহা-বাঁধানো বার্নিশ করা পাম্প-শু ছিল। এছাড়াও তার হাতে হরিণের শিঙের হাতল দেওয়া বেতের ছড়ি ছিল।

২. “বাবাই একদিন এঁর চাকরি করে দিয়েছিলেন।” – বক্তা কে? তিনি কার সম্পর্কে এ কথা বলেছেন? বক্তার এই উক্তির কারণ কী?

উত্তর: উদ্ধৃতিটির বক্তা হলেন অপূর্ব। তিনি পুলিশের বড়োবাবু ও তার কাকা নিমাইবাবু সম্পর্কে এ কথা বলেছেন।

উক্তির কারণ: অপূর্ব তার সহকর্মী রামদাসকে জানাচ্ছিল যে পুলিশের বড়োবাবু নিমাইবাবু তার আত্মীয় এবং বাবার বন্ধু। অপূর্বর বাবাই তাঁর চাকরি করে দিয়েছিলেন। অপূর্বর আক্ষেপ ছিল যে, নিমাইবাবু তার আত্মীয় হওয়া সত্ত্বেও দেশের স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীদের (যাঁরা দেশের মানুষের অনেক বেশি আপন) ব্রিটিশদের হয়ে শিকারের মতো তাড়া করে বেড়াচ্ছেন। এই লজ্জাজনক ও বেদনাদায়ক বিষয়টি বোঝাতেই অপূর্ব এই উক্তিটি করেছিল।

 

৩. “তার লাঞ্ছনা এই কালো চামড়ার নীচে কম জ্বলে না তলওয়ারকর!” – বক্তা কে? কোন লাঞ্ছনার কথা বলা হয়েছে?

উত্তর: উদ্ধৃতিটির বক্তা হলেন অপূর্ব।

লাঞ্ছনার পরিচয়: অপূর্ব রেঙ্গুন যাওয়ার পথে বিনা দোষে কয়েকজন ফিরিঙ্গি যুবকের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছিল। তারা তাকে লাথি মেরে প্ল্যাটফর্ম থেকে বের করে দেয়। অপূর্ব যখন এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে যায়, তখন সাহেব স্টেশনমাস্টার কেবলমাত্র দেশি লোক হওয়ার অপরাধে তাকে কুকুরের মতো স্টেশন থেকে তাড়িয়ে দেয়। পরাধীন দেশে বর্ণবৈষম্যমূলক এই অপমান ও শারীরিক লাঞ্ছনার কথাই অপূর্ব তার সহকর্মী রামদাসের কাছে আক্ষেপ করে বলেছিল।

 

৪. “মনে হলে দুঃখে লজ্জায় ঘৃণায় নিজেই যেন মাটির সঙ্গে মিশিয়ে যাই।” – কার মনে এমন অনুভূতি হয়েছিল? এর কারণ কী?

উত্তর: পরাধীনতার গ্লানিতে ভুগতে থাকা অপূর্বর মনে এমন অনুভূতি হয়েছিল।

 

কারণ: ফিরিঙ্গি যুবকদের হাতে বিনা দোষে অপূর্বর লাথি খাওয়া এবং সাহেব স্টেশনমাস্টারের দ্বারা অপমানিত হয়ে বিতাড়িত হওয়ার সময় সেখানে অনেক হিন্দুস্থানি লোক উপস্থিত ছিল। কিন্তু অপূর্বর এই অপমানে তাদের কারও গায়েই লাগেনি, বরং অপূর্বর হাড়-পাঁজরা ভেঙে যায়নি দেখে তারা সবাই খুশি হয়েছিল। স্বদেশবাসীদের এই প্রতিবাদহীনতা এবং চরম দাসত্বসুলভ মনোভাব দেখেই অপূর্বর মনে দুঃখে, লজ্জায় ও ঘৃণায় এমন তীব্র অনুভূতি হয়েছিল।

 

৫. “বাবুজি, এ-সব কথা বলার দুঃখ আছে।” – বক্তা কে? কোন্ কথার পরিপ্রেক্ষিতে বক্তা এ কথা বলেছেন?

উত্তর: উদ্ধৃতিটির বক্তা হলেন অপূর্বর সহকর্মী রামদাস তলওয়ারকর।

প্রেক্ষাপট: অপূর্ব যখন জানায় যে তার আত্মীয় নিমাইবাবু দেশের টাকায়, দেশের লোক দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের তাড়া করে বেড়াচ্ছেন, তখন সে স্পষ্টভাবে বলে যে ওই বিপ্লবীরাই তার অনেক বেশি আপন। ইংরেজ সরকারের রাজত্বে বাস করে ব্রিটিশ-বিরোধী এবং বিপ্লবীদের সমর্থনে প্রকাশ্যে এমন কথা বলা অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং এর পরিণতি যেকোনো সময় ভয়াবহ হতে পারে। বন্ধুকে এই সতর্কবার্তা দিতেই রামদাস উপরোক্ত মন্তব্যটি করেছিলেন

৬. “যাকে খুঁজছেন তাঁর কালচারের কথাটা একবার ভেবে দেখুন”- কাকে খোঁজা হচ্ছিল? যাকে খোঁজা হচ্ছিল তার কালচারের পরিচয় দাও। (১+২)

উত্তর: কাকে খোঁজা হচ্ছিল: পোলিটিক্যাল সাসপেক্ট বা রাজবিদ্রোহী সব্যসাচী মল্লিককে খোঁজা হচ্ছিল।

 

কালচারের পরিচয়: সব্যসাচী মল্লিক ছিলেন একজন অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত, রুচিশীল এবং মার্জিত সংস্কৃতির মানুষ। তিনি বিজ্ঞান ও চিকিৎসাশাস্ত্রে অসাধারণ পারদর্শী ছিলেন এবং বিলাতের ‘ডাক্তার’ উপাধিধারী ছিলেন। পুলিশের সামনে হাজির করা সন্দেহভাজন ব্যক্তিটির (গিরীশ মহাপাত্র) উৎকট বেশভূষা এবং রুচিহীন শখ দেখে অপূর্ব বুঝতে পেরেছিল যে, বিলাতফেরত শিক্ষিত সব্যসাচীর সংস্কৃতির বা ‘কালচারের’ সঙ্গে এই অদ্ভুত লোকটির কোনোভাবেই মিল থাকতে পারে না।

 

৭. ‘তার আমি জামিন হতে পারি’ / ‘যাকে খুঁজছেন সে যে এ নয়’ – বক্তা কে? কেন তিনি এ কথা বলেছেন? (১+২ / ৩)

উত্তর: বক্তা: উদ্ধৃতিটির বক্তা হলেন অপূর্ব ।

 

উক্তির কারণ: পুলিশ রাজবিদ্রোহী সব্যসাচী মল্লিক সন্দেহে গিরীশ মহাপাত্রকে আটক করেছিল। কিন্তু অপূর্ব গিরীশ মহাপাত্রের আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে তার অদ্ভুত ও রুচিহীন বেশভূষা দেখতে পায় । তার চুলে অপর্যাপ্ত লেবুর তেল , গায়ে রামধনু রঙের চুড়িদার, পরনে মকমল পাড়ের শাড়ি ও পায়ে সবুজ ফুলমোজা ছিল। এই উৎকট সাজগোজ এবং রুগ্ন চেহারা দেখে অপূর্বর দৃঢ় বিশ্বাস হয় যে, এমন অদ্ভুত রুচির মানুষ কখনোই উচ্চশিক্ষিত ডাক্তার ও স্বনামধন্য বিপ্লবী সব্যসাচী মল্লিক হতে পারেন না। এই কারণেই আসল বিপ্লবীর কালচারের কথা ভেবে অপূর্ব নির্দ্বিধায় জানিয়েছিল যে সে ওই লোকটির জামিন হতে পারে।

 

৮. “কিন্তু ইহা যে কত বড় ভ্রম”- কোন্ ভ্রমের কথা বলা হয়েছে? (৩)

উত্তর:-ভ্রমের পরিচয়: আফিসের কাজে রেঙ্গুন থেকে ভামো যাওয়ার পথে ট্রেনে অপূর্ব প্রথম শ্রেণির (ফার্স্ট ক্লাস) যাত্রী হিসেবে ভ্রমণ করছিল। রাতে খাওয়া-দাওয়া সেরে সে যখন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যায়, তখন তার ভরসা ছিল যে সকাল পর্যন্ত অন্তত তার ঘুমের আর কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না। কিন্তু তার এই নিশ্চিন্ত হওয়ার ধারণাই ছিল ‘ভ্রম’ বা ভুল। কারণ, ফার্স্ট ক্লাসের যাত্রী হওয়া সত্ত্বেও সেই রাতের মধ্যেই তিনবার পুলিশের লোকেরা এসে তার ঘুম ভাঙিয়ে নাম, ধাম ও ঠিকানা লিখে নিয়ে তাকে চরমভাবে হয়রানি করেছিল।

মাধ্যমিক বাংলা

পথের দাবী বড়ো প্রশ্ন উত্তর

(প্রশ্নমান – ৫)  

১. ‘পলিটিক্যাল সাসপেক্ট সব্যসাচী মল্লিককে নিমাইবাবুর সম্মুখে হাজির করা হইল’- এরপর থানায় যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল তা নিজের ভাষায় লেখো।

উত্তর: পোলিটিক্যাল সাসপেক্ট সব্যসাচী মল্লিককে ছদ্মবেশী গিরীশ মহাপাত্র রূপে পুলিশের বড়োবাবু নিমাইবাবুর সম্মুখে হাজির করা হলে থানায় এক বিচিত্র ও হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

 

আসামির রুগ্ন দশা ও অদ্ভুত বেশভূষা: লোকটি কাশতে কাশতে আসে এবং তার রুগ্ন চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল সে যেন আর বেশিদিন বাঁচবে না। কিন্তু তার অদ্ভুত সাজপোশাক দেখে বড়োবাবু হাসিমুখে মন্তব্য করেন যে, তার স্বাস্থ্য গেলেও শখ ষোলোআনাই বজায় আছে। অপূর্বর এই লোকটির রুচিহীন অদ্ভুত বেশভূষা (যেমন চুলে প্রচুর লেবুর তেল, গায়ে রামধনু রঙের চুড়িদার, পায়ে সবুজ মোজা ও পাম্প-শু) দেখে হাসি পেয়ে যায়। অপূর্ব বড়োবাবুকে জানায় যে, এই অদ্ভুত লোকটি কোনোভাবেই উচ্চশিক্ষিত ও মার্জিত সংস্কৃতির বিপ্লবী সব্যসাচী মল্লিক হতে পারে না, সে নির্দ্বিধায় এর জামিন হতে রাজি আছে।

 

তল্লাশি ও পুলিশের বিরক্তি: এরপর নিমাইবাবু লোকটির খানা-তল্লাশি করেন এবং তার পকেট থেকে অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে একটি গাঁজার কলকে পাওয়া যায়। লোকটি নির্লজ্জভাবে দাবি করে যে সে গাঁজা খায় না, পথে কুড়িয়ে পেয়েছে এবং অন্যের উপকারের জন্য সেটি রেখে দিয়েছে। তার এই নির্জলা মিথ্যাকথায় জগদীশবাবু রেগে যান। পরিশেষে, জগদীশবাবু জানান যে এই লোকটির ওপর নজর রাখার কোনো প্রয়োজন নেই, কারণ তার চুলে মাখা লেবুর তেলের উৎকট গন্ধে থানাসুদ্ধ লোকের মাথা ধরে গেছে। এরপর তাকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

 

২. ‘লোকটি কাশিতে কাশিতে আসিল’—লোকটির চেহারা ও সাজপোশাকের বর্ণনা দাও।

উত্তর: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’ উপন্যাসের পাঠ্যাংশে পোলিটিক্যাল সাসপেক্ট সব্যসাচী মল্লিকের ছদ্মবেশ ধারণকারী গিরীশ মহাপাত্রের এক বিচিত্র চেহারা ও সাজপোশাকের বর্ণনা পাওয়া যায়।

চেহারা: লোকটির গায়ের রং ছিল অত্যন্ত ফর্সা, যা রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গিয়েছিল। তার বয়স ত্রিশ-বত্রিশের বেশি নয়, কিন্তু তাকে অত্যন্ত রোগা দেখাচ্ছিল। একটু কাশলেই সে হাঁপিয়ে উঠছিল এবং তার জীর্ণ শরীর দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোনো দুরারোগ্য রোগে তার শরীর ক্ষয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং তার আয়ু আর বেশিদিন নেই। তবে তার রুগ্ন মুখের অদ্ভুত দুটি চোখের দৃষ্টি ছিল অত্যন্ত গভীর, যেখানে তার ক্ষীণ প্রাণশক্তিটুকু লুকিয়ে ছিল বলে মনে হয়।

 

সাজপোশাক: তার মাথার সামনের দিকে বড়ো চুল থাকলেও ঘাড় ও কানের দিকে চুল এতটাই ছোট করে ছাঁটা ছিল যে নেই বললেই চলে। মাথার চেরা সিঁথিতে অপর্যাপ্ত পরিমাণে নেবুর তেল মাখা ছিল, যার উৎকট গন্ধে ঘর ভরে উঠেছিল। তার গায়ে ছিল জাপানি সিল্কের রামধনু রঙের চুড়িদার পাঞ্জাবি, আর বুকপকেট থেকে একটি বাঘ-আঁকা রুমালের কিছুটা অংশ দেখা যাচ্ছিল। পরনে ছিল বিলাতি মিলের কালো মকমল পাড়ের সূক্ষ্ম শাড়ি। পায়ে ছিল সবুজ রঙের ফুলমোজা, যা হাঁটুর ওপর লাল ফিতে দিয়ে বাঁধা ছিল এবং তলায় লোহা-বাঁধানো বার্নিশ করা পাম্প-শু। এছাড়া তার হাতে ছিল হরিণের শিঙের হাতল দেওয়া একটি বেতের ছড়ি।

 

৩. ‘পরদিন অপরাহ্নবেলায় সুদূর ভামো নগরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করিয়া সে ট্রেনে চাপিয়া বসিল’- উদ্দিষ্ট ব্যক্তির ট্রেন যাত্রার বর্ণনা দাও।

উত্তর: ‘পথের দাবী’ পাঠ্যাংশে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি অর্থাৎ অপূর্বর ভামো নগর অভিমুখে ট্রেন যাত্রার এক তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

যাত্রার শুরু ও স্বাচ্ছন্দ্য: আফিসের কাজে অপূর্ব ভামোর উদ্দেশে প্রথম শ্রেণির (ফার্স্ট ক্লাস) যাত্রী হিসেবে ট্রেনে উঠেছিল। তার কামরায় সে ছাড়া অন্য কোনো যাত্রী ছিল না। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হলে সে বিনা জলেই সায়ংসন্ধ্যা সমাপন করে । এরপর তার ব্রাহ্মণ আরদালির ব্যবস্থা করে যাওয়া পিতলের পাত্রের খাবার সে আহার করে এবং তৃপ্ত চিত্তে ঘুমাতে যায়। তার ভরসা ছিল যে সকাল পর্যন্ত অন্তত তার ঘুমের আর কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না।

পুলিশের হয়রানি ও বর্ণবৈষম্য: অপূর্বর নিশ্চিন্তে ঘুমানোর ধারণাটি যে কত বড়ো ভুল ছিল, তা সে কয়েকটা স্টেশন পরেই বুঝতে পারে । সেই রাতের মধ্যেই বার-তিনেক বর্মা পুলিশের লোকেরা তার ঘুম ভাঙিয়ে তার নাম, ঠিকানা ইত্যাদি লিখে নিয়ে তাকে চরম হয়রানি করে। প্রথম শ্রেণির যাত্রী হয়েও রাতের বেলা এমন অকারণ হয়রানির প্রতিবাদ করলে বর্মা সাব-ইনস্পেক্টর সাহেব চরম ঔদ্ধত্যের সঙ্গে হাসতে হাসতে জানায় যে, অপূর্ব ইউরোপিয়ান নয়, তাই তার জন্য ওই নিয়ম খাটে না। সাব-ইনস্পেক্টর তাকে এও জানায় যে পুলিশ চাইলে তাকে ট্রেন থেকে টেনে নামিয়ে দিতে পারে। ব্রিটিশ শাসিত পরাধীন দেশে ইউরোপিয়ানদের জন্য এক নিয়ম এবং ভারতীয়দের জন্য অন্য নিয়ম—পুলিশের এই বর্ণবৈষম্যমূলক ও স্বেচ্ছাচারী আচরণের চরম শিকার হতে হয়েছিল অপূর্বকে।

 

৪. ‘পথের দাবী’ পাঠ্যাংশে ব্রিটিশ আমলের পুলিশ প্রশাসনের খামখেয়ালিপনা, অপদার্থতা ও দেশবাসীর প্রতি অকারণ হয়রানির যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো।

উত্তর: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’ উপন্যাসের পাঠ্যাংশে তৎকালীন ব্রিটিশ পুষ্ট পুলিশ প্রশাসনের অপদার্থতা ও সাধারণ ভারতীয়দের ওপর তাদের স্বেচ্ছাচারিতার নগ্ন রূপ ফুটে উঠেছে।

 

অপদার্থতা ও বোকামি: পুলিশের বড়োবাবু নিমাইবাবু এবং জগদীশবাবু অত্যন্ত বিপজ্জনক রাজবিদ্রোহী সব্যসাচী মল্লিককে নিজেদের সামনে পেয়েও চিনতে চরমভাবে ব্যর্থ হন। গিরীশ মহাপাত্রের ছদ্মবেশ, উৎকট সাজগোজ এবং চুলে মাখা নেবুর তেলের গন্ধে তারা এতটাই বিরক্ত ও বিভ্রান্ত হয়েছিলেন যে, আসল অপরাধীকে তারা নির্দ্বিধায় ছেড়ে দেন। পুলিশের এই চূড়ান্ত নির্বুদ্ধিতা দেখে অপূর্ব হাসিতে ফেটে পড়েছিল এবং মন্তব্য করেছিল যে এতবড়ো আহম্মক পুলিশ সে আর কখনো দেখেনি।

স্বেচ্ছাচারিতা ও হয়রানি: আসল অপরাধীকে ধরতে ব্যর্থ হয়ে পুলিশ সাধারণ নিরীহ দেশবাসীকে হয়রানি করতেই বেশি পটু ছিল। অপূর্ব ফার্স্ট ক্লাসের যাত্রী হওয়া সত্ত্বেও ভামো যাওয়ার পথে রাতের বেলায় পুলিশ তিনবার তার ঘুম ভাঙিয়ে নাম-ঠিকানা লিখে নেয়। এর প্রতিবাদ করলে বর্মা সাব-ইনস্পেক্টর অত্যন্ত ঔদ্ধত্যের সঙ্গে জানায় যে, অপূর্ব ইউরোপিয়ান নয় বলে তাকে চাইলে সে ট্রেন থেকে টেনে নামিয়ে দিতে পারে। ইউরোপিয়ানদের জন্য এক নিয়ম এবং ভারতীয়দের জন্য অন্য নিয়ম—পুলিশের এই বর্ণবৈষম্যমূলক ও স্বেচ্ছাচারী আচরণই পাঠ্যাংশে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

 

এই পোস্টে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত পথের দাবী’ গল্পটি সবিস্তারে আলোচনা করা হল। গল্পটির থেকে কিছু গুরুত্ব প্রশ্ন উত্তর শেয়ার করা হল, যেগুলো তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে সাহায্য করবে ।

 

SOURCE-EDT

 ©kamaleshforeducation.in(2023)

error: Content is protected !!
Scroll to Top