শতবর্ষ স্মরণে সলিল চৌধুরী জীবনী রচনা

Salil Chowdhury Jibani Prabandho Rochona

Published on: 

সলিল চৌধুরী – জীবনী রচনা | আজ   নিয়ে এলাম বাংলা তথা ভারতীয় সঙ্গীতজগতের এক বহুমুখী প্রতিভা, চিন্তাশীল ও প্রতিবাদী শিল্পী সলিল চৌধুরীএর উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনী রচনা। তিনি ছিলেন একাধারে সুরকার, গীতিকার, কবি ও সমাজসচেতন চিন্তাবিদ। ভারতীয় লোকসংগীত ও পাশ্চাত্য সঙ্গীতের অনন্য মেলবন্ধনে তিনি সৃষ্টি করেছেন এমন সব কালজয়ী গান, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও প্রভাবশালী।

 

উচ্চমাধ্যমিকসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সলিল চৌধুরী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই যারা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তারা এই জীবনী রচনাটি মনোযোগ দিয়ে পড়ে রাখতে পারে   —নম্বর তোলার দিক থেকে এটি অবহেলা করার মতো  নয়।

 

বোর্ড: বিষয়বস্তু

1 প্রবন্ধ রচনা: জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি – সুরের জাদুকর সলিল চৌধুরী

1.1 ভূমিকা:

1.2 জন্ম ও বংশপরিচয়:

1.3 শিক্ষাজীবন:

1.4 সংগ্রামী জীবন ও গণসংগীত:

1.5 চলচ্চিত্রের বর্ণময় জগত:

1.6 সংগীতের বৈশিষ্ট্য ও সুরশৈলী:

1.7 সাহিত্যকৃতি:

1.8 পুরস্কার ও সম্মাননা:

1.9 ব্যক্তিগত জীবন:

1.10 উপসংহার:

প্রবন্ধ রচনা:

জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি – সুরের জাদুকর সলিল চৌধুরী

 

“অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি— জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি। নয়া ইতিহাস লিখছে ধর্মঘট, রক্তে রক্তে আঁকা প্রচ্ছদপট।”

 

ভূমিকা:

বিংশ শতাব্দীর বাংলা তথা ভারতীয় সংগীত জগতে যে কয়েকজন নক্ষত্র তাদের প্রতিভার দীপ্তিতে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, সলিল চৌধুরী তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি কেবল একজন সুরকার ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে গীতিকার, কবি, গল্পকার এবং অসামান্য সংগীত পরিচালক। বাঁশি, পিয়ানো, এসরাজসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি তাঁর গুণগ্রাহীদের কাছে ‘সলিলদা’ নামেই বেশি পরিচিত। আজ তাঁর জন্মশতবর্ষে এই মহান শিল্পীকে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই।

 

জন্ম ও বংশপরিচয়:

১৯২৫ সালের ১৯শে নভেম্বর দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুর-রাজপুর অঞ্চলের এক হিন্দু কায়স্থ পরিবারে সলিল চৌধুরীর জন্ম হয়। তাঁর পিতার নাম জ্ঞানেন্দ্র চৌধুরী এবং মাতার নাম বিভাবতী দেবী। আট ভাই-বোনের মধ্যে সলিল ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর বাবা ছিলেন আসামের লতাবাড়ি চা-বাগানের ডাক্তার। বাবার কাছেই তাঁর সংগীত শিক্ষার হাতেখড়ি।

 

এছাড়া দাদা নিখিল চৌধুরীর ‘মিলন পরিষদ’ নামক ঐক্যবাদন দলের মাধ্যমেই তিনি সংগীতের বিশাল জগতেও প্রবেশ করেন। তাঁর শৈশবের বড় একটা অংশ কেটেছিল আসামের চা-বাগানের প্রকৃতির কোলে, যা পরবর্তীকালে তাঁর সুরে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল।

 

শিক্ষাজীবন:

সলিল চৌধুরীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় সুভাষগ্রামে তাঁর মামাবাড়ি থেকে। পরে হরিনাভি বিদ্যালয়ে তাঁর আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা শুরু হয়। সেখান থেকেই তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন এবং আই.এস.সি (উচ্চমাধ্যমিক সমতুল্য) পাশ করেন। পরবর্তীকালে তিনি কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে স্নাতক (বি.এ) ডিগ্রি লাভ করেন। তবে প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি তিনি ছোটবেলা থেকেই পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সংগীত এবং ভারতীয় লোকসংগীতের পাঠ নিয়েছিলেন।

 

সংগ্রামী জীবন ও গণসংগীত:

 

সলিল চৌধুরীর সংগীত জীবন কেবল বিনোদনের জন্য ছিল না, তা ছিল প্রতিবাদের হাতিয়ার। ১৯৪৪ সালে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখায় যোগ দেন এবং ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ’ (IPTA)-এর সক্রিয় সদস্য হন। সেই সময়ে তাঁর রচিত ও সুরারোপিত গানগুলো সাধারণ মানুষের মনে বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়েছিল। ‘রানার’, ‘অবাক পৃথিবী’, ‘গাঁয়ের বধূ’ এবং ‘বিচারপতি’-র মতো গানগুলো আজও আমাদের শিহরণ জাগায়। তাঁর সেই বিখ্যাত গান—

“বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে এই জনতা…”

 

শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি গানকে করেছিলেন অন্যতম প্রধান অস্ত্র।

                                            চলচ্চিত্রের বর্ণময় জগত:

 

১৯৪৯ সালে ‘পরিবর্তন’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্র সংগীত পরিচালক হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরপর তিনি আর ফিরে তাকাননি। ১৯৫৩ সালে বিমল রায়ের কালজয়ী ছবি ‘দো বিঘা জমিন’-এর মাধ্যমে তিনি হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন। ১৯৫৮ সালে ‘মধুমতী ছবির সুর তাঁকে সারা ভারতে জনপ্রিয় করে তোলে। তিনি প্রায় ৭৫টি হিন্দি, ৪০টি বাংলা এবং ২৬টি মালায়ালম ছবিতে সুর দিয়েছেন। এছাড়াও মারাঠি, তামিল, তেলেগু, ওড়িয়া ও অসমিয়া ছবিতেও তিনি কাজ করেছেন। ১৯৬৪ সালে বিখ্যাত মালায়ালম ছবি চেমি্দ্দন-এর সংগীত পরিচালনা তাঁকে দক্ষিণ ভারতেও কিংবদন্তি করে তোলে।

সংগীতের বৈশিষ্ট্য ও সুরশৈলী:

 

সলিল চৌধুরীর সুরের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অদ্ভুত মেলবন্ধন। তাঁর গানে যেমন ছিল পল্লীগীতির মাটির টান, তেমনই ছিল পাশ্চাত্য সিম্ফনি বা অর্কেস্ট্রার রাজকীয় ব্যবহার। গিটার, বেহালা, পিয়ানো ও বাঁশির সমন্বয়ে তিনি এমন এক সুরের জগত তৈরি করতেন, যা শ্রোতাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। কর্ডের (Chord) ব্যবহার এবং হারমোনি তৈরিতে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়।

সাহিত্যকৃতি:

সুরকার পরিচয়ের আড়ালে তাঁর সাহিত্যিক সত্তাও ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। তাঁর লেখনীতে সহজ ভাষা এবং সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের কথা ফুটে উঠত। তাঁর লেখা কবিতা সংকলন ‘একগুচ্ছ চাবি’ এবং ‘নিরুপায় সাহিত্যরসিকদের কাছে সমাদৃত। তাঁর লেখা গল্প ‘ড্রেসিং টেবিল এবং নাটকগুলো বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। তাঁর গল্প অবলম্বনে তৈরি হয়েছে একাধিক সফল চলচ্চিত্র।

পুরস্কার ও সম্মাননা:

 

জীবদ্দশায় তিনি বহু সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৫৮ সালে ‘মধুমতী ছবির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের ‘ফিল্মফেয়ার’ পুরস্কার পান। এছাড়াও তিনি আরও বেশ কয়েকবার এই পুরস্কার জিতেছেন। ১৯৮৮ সালে তিনি সম্মানজনক ‘সংগীত নাটক একাদেমি’ পুরস্কার এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে ‘আলাউদ্দিন স্মৃতি পুরস্কার-এ ভূষিত করে।

 

ব্যক্তিগত জীবন:

 

সলিল চৌধুরীর ব্যক্তিগত জীবনও ছিল ঘটনাবহুল। তিনি প্রথমে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন চিত্রশিল্পী জ্যোতি চৌধুরীর সঙ্গে। তাঁদের তিন কন্যা—অলোকা, তুলিকা ও লিপিকা। পরবর্তীতে তিনি বিখ্যাত সংগীতশিল্পী সবিতা চৌধুরীকে বিবাহ করেন। তাঁদের দুই পুত্র সুকান্ত ও সঞ্জয় এবং দুই কন্যা অন্তরা ও সঞ্চারী—যারা সকলেই সংগীত জগতের সঙ্গে যুক্ত।

 

উপসংহার:

১৯৯৫ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর এই মহান সুরসাধক ও কথাশিল্পী কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু শিল্পীর মৃত্যু হয়, শিল্পের নয়। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের পর বাংলা গানে এমন বহুমুখী ও বিচিত্রগামী প্রতিভা খুব কমই এসেছে। তিনি তাঁর গানের মাধ্যমে শোষিত মানুষের কথা বলে গেছেন আজীবন। তাঁর নিজের লেখা গানের ভাষায় বলা যায়—

“প্রত্যহ যারা ঘৃণিত আর পদানত দেখো
আজ তারা সবেগে সমুদ্যত…
তাদেরই দলের পিছনে আমিও আছি।”

 

শতবর্ষ পরেও সলিল চৌধুরী তাঁর কালজয়ী সৃষ্টির মাধ্যমে বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।

 

 SOURCE-EDT

©Kamaleshforeducation.in (2023)

 

error: Content is protected !!
Scroll to Top