সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা প্রশ্ন উত্তর
(২/৪/৮ মার্কস)
Class 10 History Chapter 4
Long Question Answer
Published on:
মাধ্যমিক ইতিহাসের চতুর্থ অধ্যায় ‘সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা’ (History Chapter 4) এর মধ্যে মহাবিদ্রোহ বা সিপাহি বিদ্রোহের প্রকৃতি, মহারানীর ঘোষণাপত্র এবং বিভিন্ন সভা-সমিতির মাধ্যমে জাতীয়তাবাদের উত্থানের চমকপ্রদ ইতিহাস এই অংশে খুব সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আজকের আর্টিকেলে এই গুরুত্বপূর্ণ চ্যাপ্টারের বাছাই করা কিছু ২/৪/৮ প্রশ্ন ও উত্তর সাজিয়ে দেওয়া হলো।
বোর্ড: বিষয়বস্তু
1 মাধ্যমিক ইতিহাস চতুর্থ অধ্যায় ‘সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ’ বড় প্রশ্ন ও উত্তর (২/৪/৮ মার্কস) Madhyamik History Chapter 4 Question Answer
1.1 দশম শ্রেণির ইতিহাস চতুর্থ অধ্যায় (সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা) 2 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | Class 10 History Chapter 4 2 Marks Question Answer
1.2 মাধ্যমিক ক্লাস 10 ইতিহাস চতুর্থ অধ্যায় 4 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | Madhyamik Class 10 History Chapter 4 4 Marks Question Answer
1.3 দশম শ্রেণি ইতিহাস চতুর্থ অধ্যায় ৮ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | Madhyamik Class 10 History 4th Chapter 8 Marks Question Answer
মাধ্যমিক ইতিহাস চতুর্থ অধ্যায়
‘সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ’
প্রশ্ন ও উত্তর (২/৪/৮ মার্কস)
মাধ্যমিক ইতিহাস চতুর্থ অধ্যায়
‘সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ’
বড় প্রশ্ন ও উত্তর (২/৪/৮ মার্কস)
Madhyamik History Chapter 4 Question Answer
দশম শ্রেণির ইতিহাস চতুর্থ অধ্যায়
(সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা)
2 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর
Class 10 History Chapter 4
2 Marks Question Answer
1. মহাবিদ্রোহকে সামন্ততান্ত্রিক বিদ্রোহ বলা হয় কেন?
উত্তর: মার্কসবাদী ঐতিহাসিক রজনীপাম দত্ত, জহরলাল নেহেরু, রমেশচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ মহাবিদ্রোহকে রক্ষণশীল ও সামন্ততান্ত্রিক বিদ্রোহ বলেছেন। কারণ, ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে কিছু রাজ্যচ্যুত সামন্ত রাজা, ভূমিচ্যুত জমিদার ও তালুকদার নেতৃত্ব দিয়েছিল। এদের লক্ষ্য ছিল হৃত রাজ্য ও জমিদারি পুনরুদ্ধার।
2. ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের প্রতি শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মনোভাব কি ছিল?
উত্তর: শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটি বড় অংশ মনে করত ব্রিটিশ শাসন ভারতের পক্ষে কল্যাণকর। কলকাতার বিশিষ্ট ব্যক্তি কিশোরী চাঁদ মিত্র, শম্ভুচন্দ্র মুখার্জী এবং হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রমুখের মতে–১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ছিল মূলত সৈনিকদের বিদ্রোহ। এর সঙ্গে সাধারণ জনগণের যোগ ছিল না। হিন্দু ও মুসলমানের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ও মহামেডান অ্যাসোসিয়েশন সিপাহী বিদ্রোহের বিরোধিতা করে।
3. মহারানীর ঘোষণাপত্রের মূল উদ্দেশ্য কি ছিল?
উত্তর: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মহাবিদ্রোহের পরিপ্রেক্ষিতে মহারানীর ঘোষণাপত্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল– ১) কোম্পানির অপশাসনের অবসান ঘটিয়ে ব্রিটিশ রাজশক্তি কর্তৃক ভারতের প্রত্যক্ষ শাসনভার গ্রহণ করা। (২) ব্রিটিশ সরকারের নতুন নীতি ও আদর্শের সঙ্গে ভারতবাসীর যোগ সাধন ঘটানো।
4. সিপাহী বিদ্রোহের প্রকৃত কারণ কী ছিল?
উত্তর: সিপাহী বিদ্রোহের বিভিন্ন কারনগুলির মধ্যে প্রত্যক্ষ কারণ ছিল এনফিল রাইফেলে ব্যবহৃত কার্তুজ। এনফিল্ড রাইফেলের টোটার মুখে গরু ও শুয়োরের চর্বি মাখানো এক ধরনের মোরক দিয়ে ঢাকা থাকতো। রাইফেলে এই টোটা ভর্তি করার সময় মোরকটি দাঁত দিয়ে ছিঁড়তে হতো। এতে ভারতীয় মুসলমান ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের সিপাহীরাই ধর্মনাশের আশঙ্কায় বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।
5. ঝাঁসির রানী বিখ্যাত কেন?
উত্তর: লর্ড ডালহৌসি ভারতে স্বত্ববিলোপ নীতির প্রয়োগের মাধ্যমে ঝাঁসির রাজ্য দখল করলে প্রতিবাদে ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ সিপাহী বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁতিয়া তোপি ও ঝাঁসির রানী যুগ্মভাবে গোয়ালিয়র দখল করেন। শেষ পর্যন্ত ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ১৮ জুন রানী লক্ষ্মীবাঈ যুদ্ধক্ষেত্রে পান বিসর্জন দেন। রানী পরাজিত ও নিহত হলেও, ঐতিহাসিক, লেখক, চলচ্চিত্রকারগণ তার বীরত্বের কাহিনী বিভিন্নভাবে তুলে ধরেছেন। তাই তিনি বিখ্যাত ও চিরস্মরণীয়।
6. উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধকে সভা-সমিতির যুগ বলা হয় কেন?
উত্তর: উনিশ শতকে ব্রিটিশদের উদ্যোগে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটে এবং ভারতবর্ষের মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের মানুষ শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি জাতীয়তাবাদের উদ্দীপিত হয়ে ওঠে। মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় উপলব্ধি করে যে ব্যক্তিগতভাবে বিচ্ছিন্ন আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করা সম্ভব নয়। এর একমাত্র উপায় হলো ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন। এই উদ্দেশ্যে সেই সময় বাংলা, মাদ্রাজ ও বোম্বেতে অনেক সভা-সমিতি গড়ে ওঠে। এই কারণে ড. অনিল শীল উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধকে সভা-সমিতির যুগ বলেছেন।
7. বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?
উত্তর: ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেশন আইন অনুসারে নিষ্কর ভূমির উপর কর গ্রহণ করা শুরু হলে, তার প্রতিবাদে টাকির জমিদার কালীনাথ রায়চৌধুরী, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রমুখের উদ্যোগে বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা গড়ে ওঠে। যেসব রাজকার্যের সঙ্গে ভারতবাসীর ভালো-মন্দের ঘনিষ্ঠ যোগ তারই আলোচনা ও বিবেচনা এই সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল। এর প্রধান অধিবেশন বসে ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দের ৮ ডিসেম্বর, গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশের সভাপতিত্বে।
8. ‘বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা’-কে প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলা হয় কেন?
উত্তর: উনবিংশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্য শিক্ষা, নবজাগরণ, সমাজ সংস্কার আন্দোলন ও ইংরেজদের সাম্রাজ্যবাদী শাসনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় জন্ম নিয়েছিল রাজনৈতিক সচেতনতা। তাই তৎকালীন রাজনৈতিক বিষয়গুলি নিয়ে আলাপ-আলোচনার জন্য বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভার জন্ম হয়েছিল। রাজনৈতিক কার্যকলাপ ও চিন্তাভাবনার দিক থেকে এটাই প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানটির ত্রুটি বিচ্যুতি থাকলেও এর অবদানকে অস্বীকার করা যায় না। তাই যোগেশচন্দ্র বাগলের ভাষায় বাঙালির তথা ভারতবর্ষের মধ্যে সর্বপ্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হল বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা।
9. ইলবার্ট বিল কি?
উত্তর: ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে ফৌজদারি আইন অনুযায়ী কোন ভারতীয় বিচারক ইউরোপীয়দের বিচার করতে পারতেন না। লর্ড রিপন বিচারব্যবস্থায় জাতিভেদ মূলক বৈষম্য দূর করার জন্য তার আইন পরিষদের সদস্য ইলবার্টকে একটি বিল তৈরি করতে বলেন। এতে ভারতীয় বিচারকদের ইউরোপীয় বিচারকদের সমান মর্যাদা, সম্মান ও ক্ষমতা দিয়ে ইলবার্ট যে বিল রচনা করেন তা ইলবার্ট বিল নামে পরিচিত।
10. দেশীয় ভাষায় সংবাদপত্র আইন কি?
উত্তর: জনমত গঠনের ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী সংবাদ মাধ্যম হলো সংবাদপত্র। ব্রিটিশ শাসনকালে দেশীয় ভাষায় সংবাদপত্র গুলি ব্রিটিশ বিরোধী সমালোচকের ভূমিকা পালন করেছিল। দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলির টুটি টিপে ধরে ভারতবাসীর কন্ঠ রোধ করার জন্য লর্ড লিটন দেশীয় ভাষায় সংবাদপত্র আইন বা ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট জারি করেন। শেষপর্যন্ত ভারতসভার আন্দোলনের চাপে লর্ড রিপন এই আইনটি সংশোধন করে নেয়।
11. সিভিল সার্ভিস আন্দোলন কেন গড়ে উঠেছিল?
উত্তর: লর্ড লিটনের আমলে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার্থীদের বয়স ২১ বছর থেকে কমিয়ে ১৯ বছর করা হলে এর প্রতিবাদে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হয়। একজন ১৯ বছরের ভারতীয় ছাত্রের পক্ষে বিদেশে গিয়ে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বসা ছিল কার্যত একটি কঠিন বিষয়। তাই ভারতসভার তরফে ইংল্যান্ড ও ভারতের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা গ্রহনের ক্ষেত্রে এবং পরীক্ষার্থীদের বয়স ২২ বছর করার দাবি তোলা হয়। ইংরেজ সরকার ভারতীয়দের এই দাবি মেনে বয়স সংশোধন করে ২১ বছর করেন।
12. ব্যঙ্গচিত্র কেন আঁকা হয়?
উত্তর: চিত্রশিল্পের অন্যতম শাখা রূপে ব্যঙ্গচিত্রে মূলত তীর্যক বা ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে প্রচলিত সামাজিক রীতি-নীতি, ত্রুটি-বিচ্যুতি ও মানুষের ইংরেজ অনুকরণ প্রভৃতি শিল্পীর ছবিতে ব্যঙ্গের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। শিল্পী শহুরে জীবনের বাঙালি বাবুদের কৃত্রিম সাহেবিয়ানা বা ইংরেজি সংস্কৃতি অনুকরণে তীব্র সমালোচনা করেন। যেমন– সংকর জাতের বাঙালি প্রভৃতি।
13. ‘বন্দেমাতরম্’ সংগীত বিখ্যাত কেন?
উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে বন্দেমাতরম সংগীতটি দেশ মাতার বন্দনা গীত রূপে রচনা করেন যা পড়ে আনন্দমঠ উপন্যাসের অন্তর্ভুক্ত হয় বঙ্কিমচন্দ্র রচিত আনন্দমঠ উপন্যাসের সন্তান দলের মন্ত্র ছিল বন্দেমাতারাম সংগীত যা ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবীদের বীজ মন্ত্র বন্দেমাতরম সংগীতে সুর দেন যদু ও এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে এই গানটি গাওয়া হয়
14. গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গ চিত্রের বৈশিষ্ট্য গুলি কি কি?
উত্তর: গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে ভারতবাসীর মনে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটান। তার এই ব্যঙ্গচিত্রের বৈশিষ্ট্য গুলি হল – ক) গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর তা ব্যঙ্গচিত্র গুলি প্রধানত লিথোগ্রাফ পদ্ধতিতে এঁকেছেন যা মূলত সমালোচনা মূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে অঙ্কিত।
(খ) দেশের পরাধীনতার মর্মবেদনা ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। যা দিয়ে ভারতবাসীর মধ্যে জাতীয়তাবোধকে জাগাতে চেষ্টা করেন।
15. মঙ্গল পান্ডে কেন স্মরণীয়?
উত্তর: মঙ্গল পান্ডে ছিলেন ব্যারাকপুর সেনা ছাউনির ৩৪ নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির একজন সিপাহী। তিনি প্রথম গরু ও শুকরের চর্বি মিশ্রিত এনফিল্ড রাইফেলের টোটার মোরক দাঁতে কাটতে অস্বীকার করেন। এর বিরুদ্ধে ১৮৫৭ সালে ২৯ শে মার্চ তিনি প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। অতঃপর তাকে গ্রেফতার করা হলে বিদ্রোহের আগুন অন্যান্য ছাউনিতে ছড়িয়ে পড়ে। ৮ এপ্রিল বিচারে ফাঁসি হয় তার। এবং তিনি ছিলেন সিপাহী বিদ্রোহের প্রথম নায়ক ও শহীদ।
16. কানপুরের নানা সাহেব কেন স্মরণীয় ছিলেন?
উত্তর: ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের অন্যতম নায়ক ছিলেন পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও এর দত্তক পুত্র কানপুরের নানাসাহেব। তার আসল নাম গোবিন্দ ধন্দু পন্থ। কানপুর সহ উত্তর প্রদেশের নানা স্থানে তার নেতৃত্বে বিদ্রোহ পরিচালিত হয়। এক্ষেত্রে তাকে বিশেষভাবে সহায়তা করেন তারই বিশ্বস্ত অনুচর তাঁতিয়া তোপি। দিল্লির পতন হলে তিনি নেপালের জঙ্গলে পালিয়ে যান। তবে তার শেষ জীবন অজ্ঞাত হলেও রাজ্য উদ্ধারে তার প্রচেষ্টা তাকে স্মরণীয় করে রেখেছে।
17. কী উদ্দেশ্যে ‘ইন্ডিয়ান লিগ’ গঠিত হয়?
উত্তর: ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবোধ ও রাজনৈতিক চেতনা জাগরণ ঘটানোর উদ্দেশ্যে শিশির কুমার ঘোষ, হেমন্ত কুমার ঘোষ, কৃষ্ণমোহন বন্দোপাধ্যায় ও শম্ভু চন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রমূখ ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে গড়ে তোলেন ইন্ডিয়ান লিগ। এই সংস্থার মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষার জন্য বিদ্যালয় স্থাপন, জনগণ কর্তৃক কলকাতা পৌরসভার সদস্য নির্বাচনের দাবি জোরদার হয়। স্বল্পস্থায়ী হলেও ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলনে এই সভার গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
18. কি কারনে ইলবার্ট বিল প্রত্যাহার বা সংশোধন করা হয়েছিল?
উত্তর: উদারপন্থী শাসক লর্ড রিপন তার আইন সচিব ইলবার্ট এর মাধ্যমে ভারতীয় বিচার ব্যবস্থায় বৈষম্য দূর করার জন্য একটি বিল প্রস্তুত করেন। এটি ইলবার্ট বিল নামে পরিচিত।
ইলবার্ট বিলের সংশোধন: এই বিলে ভারতীয় বিচারকদের শ্বেতাঙ্গদের বিচারের অধিকার দান করা হলে, শাসক জাতি শ্বেতাঙ্গরা তা মানতে অস্বীকার করে। কলকাতা হাইকোর্টের ব্যারিস্টার ব্রানসনের নেতৃত্বে এর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে ‘ডিফেল অ্যাসোসিয়েশন’। ভারত ও ইংল্যান্ডের ইংরেজরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করে। বাধ্য হয়ে লর্ড রিপন জুড়ি ব্যবস্থা প্রবর্তন করে ইলবার্ট বিল সংশোধনের মাধ্যমে শ্বেতাঙ্গদের অধিপত্য মেনে নেন। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ভারতসভা এই বিলের স্বপক্ষে তীব্র আন্দোলন করে।
19. সূত্র জাগরণ সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দ কি অভিমত দান করেছেন?
উত্তর: ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থে স্বামী বিবেকানন্দ বৈদিক যুগ থেকে ব্রিটিশ শাসনকাল পর্যন্ত ভারতের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস আলোচনা ও ব্যাখ্যা করেছেন। এর মধ্যে দিয়ে দেখিয়েছেন ইতিহাস শ্রেণীর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। ভারতের চতুর্বর্ণের মধ্যে সংঘাতের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন প্রথমে ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা পরে ক্ষত্রিয়রা সর্বশেষে বৈশ্যরা সমাজে নিজেদের প্রাধান্য স্থাপন করেছে। কিন্তু যাদের শারীরিক পরিশ্রমের ফলে ব্রাহ্মণের প্রাধান্য ক্ষত্রিয়ের শক্তি বৈশ্যের সম্পদ প্রভৃতি বৃদ্ধি পেয়েছে, তারা আজ অবহেলিত, ‘ভারবাহি পশু, চলমান শশ্মানে’-এ পরিণত হয়েছে। তিনি ভবিষ্যৎবাণী করেছেন চক্রাকারে পহে শূদ্রের জাগরণ ও অধিপত্য অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হবে।
20. গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর কিভাবে ঔপনিবেশিক সমাজের সমালোচনা করেছেন?
উত্তর: বাংলা চিত্রশিল্প ও কার্টুন শিল্পের ক্ষেত্রে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। তিনি বিভিন্ন ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক সমাজের তীব্র আলোচনা করেছেন। এছাড়া এগুলিতে বাঙালি চরিত্রের নানা দিক, বাঙালির ইংরেজ প্রীতি ও ঔপনিবেশিক শাসনের বিভিন্ন দিক ইত্যাদির কথা তুলে ধরেছেন। তিন খন্ডে প্রকাশিত ‘অদ্ভুত লোক’, ‘বিরুপ বস্ত্র’, ‘নয়া হুল্লোর’ গ্রন্থে তার ব্যঙ্গচিত্র গুলি অন্তর্ভুক্ত। এগুলি প্রবাসী ও মর্ডান রিভিউ প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি গড়ে তোলেন ‘ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট’ (১৯০৭ খ্রী.) নামক এক শিল্প প্রতিষ্ঠান।
21. সভা সমিতির যুগ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ১৯ শতকে একদিকে ব্রিটিশের শোষণ ও অত্যাচার বৃদ্ধি অপরদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ও জাতীয়তাবাদের উন্মেষ প্রভৃতির ফলে ভারতীয়রা সংঘবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের করে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বহু সভা সমিতি গড়ে ওঠে। তাই কেম্ব্রিজ বিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ড. অনিল শীল উনবিংশ শতাব্দীকে ‘সভা সমিতির যুগ’ নামে অভিহিত করেছেন।
22. মহারানীর ঘোষণাপত্র কি?
উত্তর: ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ১ নভেম্বর ইংল্যান্ডের মহারানী ভিক্টোরিয়া ভারতের শাসন সংক্রান্ত বিষয়ে একটি আইন পাস করে যা মহারানীর ঘোষণাপত্র নামে পরিচিত। এতে বলা হয় –
(ক) ব্রিটিশ সরকার অতঃপর ভারতীয়দের ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যাপারে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করবে না।
(খ) জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি যোগ্যতা সম্পন্ন ভারতীয়ই সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত হতে পারবে।
(গ) এতে স্বত্ববিলোপ নীতি পরিত্যাক্ত হয় ও দেশীয় রাজাদের দত্তপুত্র গ্রহণের অধিকার দান করা হয়।
(ঘ) সরকার ভারতে আর সাম্রাজ্য বিস্তার করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
(ঙ) দেশীয় রাজ্যগুলির সঙ্গে কোম্পানির স্বাক্ষরিত চুক্তি মেনে চলার আশ্বাস দেওয়া হয় ইত্যাদি। বলা বাহুল্য প্রতিশ্রুতি গুলি ঘোষণা পত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল, সেগুলো পালন করা হয়নি।
মাধ্যমিক ক্লাস 10 ইতিহাস চতুর্থ অধ্যায়
4 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর
Madhyamik Class 10 History Chapter 4
4 Marks Question Answer
1. ১৮৫৭-এর মহাবিদ্রোহকে কি সামন্তশ্রেণির বিদ্রোহ বলা যায়?
ভূমিকা:–সিপাহি বিদ্রোহের প্রকৃতি বিচার করতে গিয়ে একটি বিষয় উঠে আসে যে, এই বিদ্রোহ ছিল ‘সামন্তশ্রেণির বিদ্রোহ’। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, রজনীপাম দত্ত প্রমুখ এই মতের প্রবক্তা।
তাঁদের যুক্তি
১) বিদ্রোহের নেতৃত্ব:– সিপাহি বিদ্রোহের নেতৃত্ব ছিল সামন্তশ্রেণির হাতে। নানাসাহেব, লক্ষ্মীবাঈ, হজরতমহল, কুনওয়ার সিং প্রমুখ এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
২) সিপাহি বিদ্রোহের প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র:– সিপাহি বিদ্রোহের একটা প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র বর্তমান ছিল।
৩) প্রতিবিপ্লব সৃষ্টি:– ড. সুরেন্দ্রনাথ সেনের মতে, সিপাহি বিদ্রোহের নেতাদের লক্ষ্য ছিল প্রতিবিপ্লব ঘটানো। কেননা সিপাহি বিদ্রোহ সফল হলে সামন্তরা পুরোনো আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনরায় চালু করে প্রতিবিপ্লব সৃষ্টি করতেন।
৪) বিদ্রোহে সামন্তদের অংশগ্রহণ:– ইংরেজ শাসনে নতুন ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় সামন্তরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সিপাহি বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিল।
তাই ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে, এই বিদ্রোহ ছিল অভিজাততন্ত্র ও সামন্ততন্ত্রের ‘মৃত্যুকালীন আর্তনাদ’।
সমালোচনা:– অধ্যাপক সুশোভন সরকার বলেন, সামন্ত জমিদার ও তালুকদারদের হাতে বিদ্রোহের নেতৃত্ব ছিল বলে একে ‘সামন্ততান্ত্রিক বিপ্লব’ বা ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ আখ্যাদান অযৌক্তিক। তিনি বলেন, ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতে সামন্ততান্ত্রিক চিন্তাধারা ছিল যথেষ্ট শক্তিশালী। বিদ্রোহ সফল হলে কুসংস্কারমুক্ত নতুন সংগঠনের আবির্ভাব ঘটতো। অনেকে বলেন, সামন্তব্যবস্থার সমর্থক রাজারা বিদ্রোহে যোগ দেননি বরং বিদ্রোহ দমনে ছিলেন সক্রিয়।
মূল্যায়ন:– পি সি যোশী বলেন বিভিন্ন দেশের ইতিহাসে সামন্তদের গৌরবজনক ভূমিকা থাকলেও ভারতের ক্ষেত্রে তা অস্বীকার করা অনুচিত। প্রকৃতপক্ষে দেশীয় রাজন্যবর্গ এই বিদ্রোহের মাধ্যমে মধ্যযুগীয় ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হন। তাই রমেশচন্দ্র মজুমদার এই বিদ্রোহকে ‘অভিজাততন্ত্র ও সামন্ততন্ত্রের মৃত্যুকালীন আর্তনাদ’ বলে অভিহিত করেন।
2. বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভাকে প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলা হয় কেন?
১৯ শতকে একদিকে ব্রিটিশের শোষণ ও অত্যাচার বৃদ্ধি অপরদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ও জাতীয়তাবাদের উন্মেষ প্রভৃতির ফলে ভারতীয়রা সংঘবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের করে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বহু সভা সমিতি গড়ে ওঠে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ‘বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা’। পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষ দিক থেকে দেখলে এটি হলো ভারতের প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠা:– ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেশন আইন অনুসারে নিষ্কর ভূমির উপর কর গ্রহণ করা শুরু হলে, তার প্রতিবাদে টাকির জমিদার কালীনাথ রায়চৌধুরী, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রমুখের উদ্যোগে বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা গড়ে ওঠে।
উদ্দেশ্য:– যেসব রাজকার্যের সঙ্গে ভারতবাসীর ভালো-মন্দের ঘনিষ্ঠ যোগ তারই আলোচনা ও বিবেচনা এই সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল।
অধিবেশন:– এর প্রধান অধিবেশন বসে ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দের ৮ ডিসেম্বর, গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশের সভাপতিত্বে।
কারণ:– উনবিংশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্য শিক্ষা, নবজাগরণ, সমাজ সংস্কার আন্দোলন ও ইংরেজদের সাম্রাজ্যবাদী শাসনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় জন্ম নিয়েছিল রাজনৈতিক সচেতনতা। তাই তৎকালীন রাজনৈতিক বিষয়গুলি নিয়ে আলাপ-আলোচনার জন্য বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভার জন্ম হয়েছিল। এটাই ছিল প্রথম প্রতিষ্ঠান যেখানে প্রথমবার ব্রিটিশ বিরোধী এবং সাম্রাজ্যবাদী শাসনের বিরুদ্ধে আলাপ আলোচনা করা হয়। এই কারণেই যোগেশচন্দ্র বাগুল বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভাকে প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বলে অভিহিত করেছেন।
উপসংহার:– রাজনৈতিক কার্যকলাপ ও চিন্তাভাবনার দিক থেকে এটাই প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানটির ত্রুটি বিচ্যুতি থাকলেও এর অবদানকে অস্বীকার করা যায় না। তাই যোগেশচন্দ্র বাগলের ভাষায় বাঙালির তথা ভারতবর্ষের মধ্যে সর্বপ্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হল বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা।
3. টীকা লেখো:— জমিদার সভা।
ভূমিকা:– উনিশ শতকে বাংলায় অনেক সভাসমিতি গড়ে উঠেছিল এই কারণে ড. অনিল শিল উনিশ শতককে সভাসমিতির যুগ বলে অভিহিত করেছেন। জমিদার সভা ছিল এই রাজনৈতিক সংগঠনগুলির মধ্যে একটি অন্যতম প্রতিষ্ঠান।
জমিদার সভার প্রতিষ্ঠাকাল ও প্রতিষ্ঠাতা:– ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দের ১২ নভেম্বর রাজা রাধাকান্ত দেব, দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, কালীনাথ রায় চৌধুরী প্রমুখের উদ্যোগে এই সভা প্রতিষ্ঠা হয়। রাজা রাজাকান্ত দেব ছিলেন এর প্রথম সভাপতি এবং দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন এই সভার প্রাণপুরুষ।
উদ্দেশ্য:– জমিদার সভা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য গুলি ছিল –
(i) জমিদার শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করা।
(ii) ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রকে নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা। (iii) ভারতবর্ষের সর্বত্র চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করা।
কার্যাবলি:–
(i) শাসনতান্ত্রিক উপায়ে দাবি আদায়:– শাসনতান্ত্রিক উপায়ে দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে এই সভা এক দৃষ্টান্ত তুলে ধরে।
(ii) রাজনৈতিক অধিকার দাবি:– জমিদারদের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে এই সভা গড়ে উঠলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক অধিকারের দাবি জানায়।
(iii) শাখা স্থাপন ও প্রচার:– এই সভা তার আদর্শ ও লক্ষ্য প্রচারের জন্য দেশের বিভিন্ন জায়গায় শাখা গড়ে তোলে, ফলে দেশজুড়ে এক সংগঠিত আন্দোলন গড়ে ওঠে।
(iv) অবদান:– জমিদার সভা ভারতে আধুনিক প্রতিষ্ঠানিক রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি নতুন ধারার সূচনা করে। এই সভার আবেদনে সরকার ১০ বিঘা পর্যন্ত ব্রহ্মত্তর জমির খাজনা মুকুব করে। ড. রাজেন্দ্র নাথ মিত্র বলেন এই প্রতিষ্ঠানই ভারতে জাতীয় আন্দোলনের অগ্রদূত। এখান থেকে ভারতবাসী নিয়তান্ত্রিক উপায়ে দাবি দাবা আদায়ে শিক্ষা লাভ করে। এই সভা সরকারের কাছ থেকে চেম্বার অফ কমার্স এর মর্যাদা লাভ করে।
মূল্যায়ন:– জমিদার সভার কার্যাবলীর প্রধান সাফল্য হলো প্রতি গ্রামে দশ বিঘা পর্যন্ত নিষ্কর জমি রাখতে সরকারের সম্মতি আদায় করা। তবে জমিদার সভা ছিল একান্তভাবেই জমিদার ও বনিয়াদের একটি সংগঠন। ব্রিটিশ রাজের অনুগত্য প্রদর্শনে তারা সচেষ্ট থাকতেন।
4. টীকা লেখো:– হিন্দু মেলা।
ভূমিকা:– ১৯ শতকে বাংলা তথা ভারতের জাতীয় জাগরণ যে সমস্ত সমিতি গঠিত হয়েছিল তার মধ্যে জাতীয় মেলা বা চৈত্র মেলা বা হিন্দু মেলা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাঙালির সামাজিক সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রতিষ্ঠা:– পন্ডিত রাজনারায়ণ বসুর ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে এবং তার সহযোগিতায় নবগোপাল মিত্র ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে চৈত্র সংক্রান্তির দিন কলকাতায় হিন্দু মেলা প্রতিষ্ঠা করেন, এই জন্য সংগঠনটি চৈত্র মেলা নামে পরিচিত। হিন্দু মেলার প্রথম সম্পাদক হন জ্ঞানেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সহ সম্পাদক হন নবগোপাল মিত্র।
উদ্দেশ্য:–
১) হিন্দু ধর্মের ঐতিহ্য প্রচার:– হিন্দু ধর্মের ঐতিহ্য ও গৌরব গাঁথা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশেষ করে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে প্রচার করা।
২) পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অগ্রগতিরোধ:– উনিশ শতকে পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি দ্রুত গতিতে প্রসারিত হতে থাকে। কিন্তু মেলার মাধ্যমে ভারতে পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রসার প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।
৩) দেশাত্মবোধের প্রসার:– ভারতবাসীর মধ্যে দেশাত্মবোধের চেতনা জাগিয়ে তোলা হিন্দু মেলার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল। এছাড়াও বাঙালি হীনমন্দতা দূর করা ও জাতীয় প্রতীকগুলিকে মর্যাদা দান করা ছিল হিন্দু মেলার উদ্দেশ্য।
গুরুত্ব:– হিন্দু মেলা কথাটির মাধ্যমে একে সম্প্রদায়িক সভা মনে হলেও বাস্তবে এখানে বিভিন্ন ধর্মাবলোম্বিদের সমন্বয় ঘটেছে। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের “মিলে সবাই ভারত সন্তান” গান দিয়ে এর উদ্বোধন হতো। এর প্রদর্শনীতে বিভিন্ন পেশার নারী পুরুষ সমবেত হতো, এই মেলাকে কেন্দ্র করে সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা সমৃদ্ধ হয়।
5. ভারতীয় জাতীয়তাবোধের বিকাশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের’গোরা’ উপন্যাসটির ভূমিকা লেখো।
ভূমিকা:– উনিশ শতকে জাতীয়তাবোধের জাগরণে যে সমস্ত উপন্যাস কালজয়ী হয়ে রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘গোরা’ উপন্যাস। এই উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে অসাম্প্রদায়িক বাতাবরণে ভারত-আত্মার এক চিরন্তন বাণী। অধ্যাপক সুমিত সরকার এই উপন্যাসটিকে “ভারত অনুসন্ধানের প্রতীক” বলে মন্তব্য করেছেন।
জাতীয়তাবাদের বিকাশে’গোরা’ উপন্যাস
প্রকাশকাল:– ১৯০৭ সাল থেকে ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রবাসী পত্রিকায় ‘গোরা’ উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। এটি ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থাগারে প্রকাশিত হয়।
প্রকৃত ভারতের রূপ:– গোরা উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ‘গোরা’। সে উপলব্ধি করে শিক্ষিত সম্প্রদায়ের চেয়ে পল্লী গ্রামের সামাজিক বন্ধন বেশি শক্ত হলেও, এ সমাজ প্রয়োজনে মানুষকে সাহায্য করে না। বরং আচার বিচার মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে। গোরা তাই এই সমাজের বিরোধিতা করেন।
স্বদেশীয় আদর্শ প্রচার:– রবীন্দ্রনাথের গোরা প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার ঐতিহ্যে মুগ্ধ। সে সংকল্প করে যে – ‘স্বদেশের প্রতি স্বদেশবাসীর শ্রদ্ধা সে ফিরিয়ে আনবেই।’ গোরা স্বদেশী ও আদর্শ ও দেশপ্রেমের আদর্শ প্রচারে একনিষ্ঠ।
মানব ধর্মের প্রতি গুরুত্ব:– ব্রহ্মধর্ম অনুরাগী গোরা খ্রিস্টান মিশনারীদেরও আক্রমণ করতে ছাড়েনি। উপন্যাসের শেষে পারলৌকিক ধর্মের পরিবর্তে, মানব ধর্মের উপর গুরুত্ব আরোপ করে ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাই উন্নিত করা হয়।
জাতীয়তাবাদ ও তার স্বরূপ:– গোড়া উপন্যাসের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে ঐক্য, যা জাতীয়তাবাদকে জাগরিত করেছে। জাতীয়তাবাদ ও তার স্বরূপ কি হতে পারে গোরা উপন্যাসে তা ব্যক্ত হয়েছে।
উপসংহার:– রবীন্দ্রনাথের গোরা উপন্যাসের গোরা হল ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মূর্তপ্রতীক। উপন্যাসের শেষে গোরা বলেন “আমি ভারতীয়, আমার কাছে হিন্দু বা মুসলিম বা খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে কোন বিভেদ নেই, আজ ভারতের সব বর্ণই আমার বর্ণ।”
6. ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে’ভারতমাতা’ চিত্রের অবদান কী ছিলো?
ভূমিকা:— পরাধীন ভারতবর্ষে ভারতীয় জাতীয়তাবোধ সৃষ্টিকারী চিত্র গুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ‘ভারতমাতা’ চিত্রটি। জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ভারতমাতা’ চিত্রটির মাধ্যমে বিশ শতকে জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রসার ঘটান। এই চিত্রে ভারতমাতা হলো ভারত মায়ের প্রতীক।
প্রেক্ষাপট:— অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের ব্রিটিশ বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের সমান্তরালে সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনই ছিল ‘ভারতমাতা’ অঙ্কনের অনুপ্রেরণা।
শান্তির প্রতীক:– অবনীন্দ্রনাথের ‘ভারতমাতা’-র হাতে কোনো অস্ত্র নেই। এর দ্বারা অবনীন্দ্রনাথ তার স্বদেশী ভাবনায় সশস্ত্র আন্দোলনকে দূরে রেখেছে।
স্বদেশীয়ানার বিকাশ:– অবনীন্দ্রনাথের চতুর্ভুজা ‘ভারতমাতা’-র চার হাতে রয়েছে বেদ, ধানের শীষ, জপের মালা ও শ্বেত বস্ত্র। এগুলি মূলত ভারতীয় সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। এগুলির মাধ্যমে দেশবাসীর মনে স্বদেশীয়ানা ও জাতীয়তাবাদ জাগিয়ে আনার চেষ্টা করে।
জাতীয়তাবাদের চেতনা:— শিল্পী ‘ভারতমাতা’-র মধ্য দিয়ে মানবী ও দেবী শক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছে। জাতীয়তাবাদকে মাতৃত্বের ধারণা সঙ্গে তুলনা করেছেন। ‘ভারতমাতা’ চিত্রটি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন কালে জাতীয়তাবাদের প্রতীক হিসেবে পরিণত হয়েছে।
মতামত:– ‘ভারতমাতা’ চিত্রটির মধ্যে কেউ কেউ হিন্দু স্বদেশীকতার প্রভাব খোঁজার চেষ্টা করেছেন। মুসলিম সমাজও বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি। তবে বাস্তবে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিন্দু স্বদেশীকতার উগ্র সমর্থক ছিলেন এমন প্রমানও পাওয়া যায় না। ভগিনী নিবেদিতা ভারতমাতার প্রশংসা করে বলেছেন যে – “এই চিত্রটির মাধ্যমে বিমূর্ত জাতীয়তাবাদকে মূর্ত করে তোলা হয়েছে।”
7. আনন্দমঠ উপন্যাসটি কীভাবে জাতীয়তাবাদী চেতনা বিস্তারে সহযোগিতা করেছিল?
ভূমিকা:– উনবিংশ শতাব্দীতে ভারতীয় জাতীয়তাবোধের বিকাশে যেসব ব্যক্তি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিল তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বঙ্কিমচন্দ্র। তিনি আনন্দমঠ উপন্যাসটি রচনার মধ্য দিয়ে ভারতবাসীর মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগিয়ে তোলেন। এজন্য উপন্যাসটির “দেশপ্রেমের গীতা” নামে পরিচিত।
জাতীয়তাবোধের বিস্তারে ‘আনন্দমঠ’ এর ভূমিকা
১) উপন্যাসটির পটভূমি:– আনন্দমঠ উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ই ডিসেম্বর। এই উপন্যাসটি সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ ও ছিয়াওরের মন্বন্তরের পটভূমিকায় রচিত।
২) ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা:– বঙ্কিমচন্দ্র তার আনন্দমঠ উপন্যাসে ভারতের ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থার তীব্র বিরোধিতা করে। ব্রিটিশ শাসনের করুন অবস্থার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি ব্রিটিশ অত্যাচারের বিরুদ্ধে সকল ভারতীয়দের এক হওয়ার আহ্বান জানায়।
৩) দেশকে’মা’ বলে সম্বোধন:– আনন্দমঠ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র স্বদেশভূমিকে ‘মা’ বলে সম্মোধন করেছেন যা দেশবাসীর মনে জাতীয়তাবাদের অনুপ্রেরণা জোগায়।
৪) সন্তান দলের আদর্শ:– আনন্দমঠ উপন্যাসের মূল চরিত্র সন্তান দল। তাদের আদর্শ অনুসরণ করে দেশের যুবসমাজকে দেশমাতার পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের জন্য এগিয়ে আসার আহ্বান জানান বঙ্কিমচন্দ্র।
৫) বন্দেমাতরম সংগীত:– এই উপন্যাসের অন্তর্গত বন্দেমাতরম গানটি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জাতীয় মন্ত্রে পরিণত হয়। এই মন্ত্র উচ্চারণ করে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়তে থাকে।
8. জাতীয়তাবাদের বিকাশে বর্তমান ভারতের ভূমিকা লেখো।
ভূমিকা:– উনিশ শতকে জাতীয়তাবাদের জাগরনের যে গ্রন্থগুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দের বর্তমান ভারত ছিল অন্যতম। এই গ্রন্থটি দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভারতের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে পাশ্চাত্যের সঙ্গে তুলনা করে ভারতবাসীর কাছে জাতীয়তাবাদের যে নতুন রূপ তুলে ধরেছে তা অনবদ্য ।
প্রকাশকাল:– ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান ভারত গ্রন্থটি রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের উদ্বোধন পত্রিকাতে প্রথম ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে এটি গ্রন্থাগারে প্রকাশিত হয় ।
শূদ্র জাগরণ:– ভারতীয় সমাজের বর্ণ বৈষম্য ও শূদ্রদের বঞ্চনার জন্য তিনি তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন “এবার ভারতে শূদ্রজাগরণ ঘটবে এবং শূদ্রসহ সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে।”
স্বদেশ মন্ত্র:– তিনি ভারতবাসীকে পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বহু কল্যাণকর ভাব থাকলেও অকল্যাণকর ভাবও রয়েছে। তিনি ভারতবাসীকে ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে বরণের আহ্বান জানান ।
নারী জাতির প্রতি আহবান:– নারীজাতির উন্নয়ন ছাড়া যে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয় সেকথা এখানে তিনি সুন্দরভাবে তুলে ধরেন। তিনি সীতা, সাবিত্রী, রানী লক্ষী বাই, দময়ন্তী এদের আদর্শ তুলে ধরেন এবং ভারতীয় নারীদের তাদের অনুসরণের কথা বলেন
উপসংহার:– বর্তমান ভারত ভারতীয় জাগরণে আধুনিক ভারত গঠনে নিঃসন্দেহে এক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এই গ্রন্থে স্বদেশ প্রেমের যে আদর্শ ও বিশ্বাস গড়ে তুলেছিলেন তা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল ।
9. টীকা লেখো:— ভারতসভা।
ভূমিকা:– উনিশ শতকের ভারতের প্রেসিডেন্সি শহরগুলিতে একাধিক রাজনৈতিক সভাসমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এগুলির মধ্যে অন্যতম প্রধান ছিল ভারতসভা বা ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন।
ভারতসভার প্রতিষ্ঠাকাল ও প্রতিষ্ঠাতা:– ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাই আনন্দমোহন বসু, শিবনাথ শাস্ত্রী ও সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে কলকাতার অ্যালবার্ট হলে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন বা ভারতসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতসভার ‘প্রাণপুরুষ’ ছিলেন।
ভারতসভা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যসমূহ
১) জনমত গঠন:– ভারতসভা প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে দেশে শক্তিশালী জনমত গঠন করা। সুরেন্দ্রনাথ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা, দেশীয় ভাষা সংবাদপত্র আইন, অস্ত্র আইন, ইলবার্ট বিল প্রভৃতি বিষয়ে ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে জনমত গঠন করেছিলেন।
২) রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলা:– ভারতসভা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল অর্থবহ রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলা । জাতীয়তাবাদী নেতারা উপলব্ধি করেছিলেন যে, রাজনৈতিক সংগঠন ছাড়া ভারতীয়দের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব নয়, তাই তারা ভারতসভা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
৩) ধর্ম ও বর্ণের ঊর্ধ্বে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা:– ভারতসভা জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও সংকীর্ণ প্রাদেশিকতা দূর করে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। সুরেন্দ্রনাথ সমগ্র ভারত ভ্রমণ করে লখনউ, মিরাট, লাহোর প্রভৃতি অঞ্চলে ভারতসভার শাখা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
৪) জনগণকে গণ আন্দোলনে শামিল করা:– ভারতসভার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সরকারের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে ভারতীয়দের গণ আন্দোলনে শামিল করা। এই সভার সদস্যরা গণ আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় সংশোধন আনতে চেয়েছিলেন।
উপসংহার:— অতএব দেশের জনগণকে বৃহত্তর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শামিল করা তথা সাধারণ ভারতবাসীর স্বার্থ সুরক্ষার উদ্দেশ্যে ভারতসভা নামক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটির জন্ম হয়েছিল।
10. গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অঙ্কিত ব্যঙ্গচিত্র সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।
ভূমিকা:– গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারের একজন সদস্য। তিনি বঙ্গীয় ঘরানার একজন চিত্রকর ও ব্যঙ্গচিত্রশিল্পী হিসেবে বিখ্যাত হয়ে আছেন। তাঁকে আধুনিক চিত্রশিল্পের পথিকৃৎ বলা হয় ।
গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অঙ্কনশিক্ষা:– ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে ১৪ বছর বয়সে গগনেন্দ্রনাথের বাবা মারা যান। ফলে তাঁর স্কুলশিক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তিনি নিজের ইচ্ছেমতো ছবি আঁকা শেখেন।
তিনি হরিনারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে জলরঙে ছবি আঁকা শেখেন। পরে জাপানি শিল্পীদের দ্বারা (ওকাকুরা ও তাইকোয়ান) প্রভাবিত হন। তিনি তাঁর শিল্পে আধুনিকতাবাদী চিত্ররীতির পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু করেন। শিল্প-সংস্কৃতির ঐতিহাসিক পার্থ মিত্রের মতে, ১৯৪০-এর দশকের আগে আমাদের দেশে গগনেন্দ্রনাথই ছিলেন একমাত্র শিল্পী, যিনি পাশ্চাত্যের চিত্ররীতি কিউবিজম্-এর ভাষা ও নির্মাণশৈলীকে তাঁর ছবিতে কাজে লাগান। তবে তিনি কখনোই ইউরোপীয় রীতির অন্ধ অনুকরণ করেননি।
গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অঙ্কিত ব্যঙ্গচিত্রের বিভিন্ন দিক:— গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অঙ্কিত ব্যঙ্গচিত্রগুলির মধ্যে সবথেকে উল্লেখযোগ্য হল অদ্ভুতলোক, বিরূপ বজ্র (১৯১৭খ্রি.) এবং নব হুল্লোড় (১৯২১ খ্রি.)। এছাড়া জাঁতাসুর, বিদ্যার কারখানা প্রভৃতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁর ব্যঙ্গচিত্র সম্ভারকে দক্ষতায় ও মৌলিকতায় অতুলনীয় বলে শিল্প সমালোচকগণ মন্তব্য করেছেন। এই ব্যঙ্গচিত্র তথা চিত্রশিল্পের বিভিন্ন দিকগুলি হল—
১) চৌষট হাজার–মন্ত্রীদের প্রাপ্য বেতন নিয়ে অঙ্কিত ব্যঙ্গচিত্র।
২) মন্টেগু–চেমসফোর্ড শাসনসংস্কারের সমালোচনা করে অঙ্কিত ব্যঙ্গচিত্র — ‘State Funeral of HE. Old Bengal’।
৩) ঔপনিবেশিক ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অঙ্কিত ব্যঙ্গচিত্র। এতে তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে কলকারখানার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
৪) বহু ভারতীয়ের মেকি দেশাত্মবোধকে ব্যঙ্গ করে অঙ্কিত চিত্র।
উপসংহার:– গগনেন্দ্রনাথ তাঁর শিল্পকলার মাধ্যমে সমাজের নানান বিষয়কে তুলে ধরেছিলেন। ‘প্রবাসী’ ও ‘মডার্ন রিভিয়ু’-তে তাঁর ব্যঙ্গচিত্রগুলি ছাপা হত। শুধু বাংলার নয়, সমগ্র ভারতের ব্যঙ্গচিত্র শিল্পের মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
দশম শ্রেণি ইতিহাস চতুর্থ অধ্যায়
৮ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর
Madhyamik Class 10 History
4th Chapter 8 Marks Question Answer





