তখন 32000 প্রাথমিক শিক্ষক শিক্ষিকার একসঙ্গে চাকরি বাতিল হয়েছিল। তাদের আবার যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে । নতুন করে বসতে হবে পরীক্ষায়। সবার সঙ্গে। নতুন করে তৈরি হবে প্যানেল। অভিযোগ ? “যোগ্য” কারা বোঝা যাচ্ছে না তাই 32000 কেই অযোগ্য ধরে নিয়ে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। ভগবানের বিধান। চারদিকে তখন প্রবল ভগবান আরাধনার আবহ। তখন সেই বিধানের পক্ষেই গলা ফাটাচ্ছিলেন ঐ 32000 বাদে বাকি শিক্ষক শিক্ষিকাদের একটা বড় অংশ। মিডিয়া বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া যা খাইয়ে দেয় বৃহত্তর জনগণ তাই খায়। কী খাচ্ছি বিচার করে না। প্রবল প্রচারের সামনে নিজের বিচার বোধকে নিষ্ক্রিয় করে রাখে। তখন সেই বিধানের বিপরীতে মত দেওয়া মানে মৌচাকে ঢিল ছোঁড়া। সেই কঠিন দিনে স্রোতের বিপরীতে গিয়ে এই বিধানের বিরুদ্ধে এটা লিখেছিলাম 2023 সালের 20 May। বৃহৎ একটি টিচার্স গ্রুপে। সমস্ত শিক্ষক শিক্ষিকাদের উদ্দেশ্যে। ভুক্তভোগী টিচারদের দিকে বিদ্রূপ নিক্ষেপ না করে পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে। সেই লেখাটা আর একবার দিলাম। আজ সেটাকে প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে।

———————————————————————-
“Fair is Foul, Foul is Fair “ – শেকসপিয়র এর সেই বিখ্যাত উক্তির মতোই গুলিয়ে যাচ্ছে “যোগ্য” আর “অযোগ্য” শব্দ দুটির অর্থ। ৩২০০০ আজ “যোগ্য” নাকি “অযোগ্য” তা নির্ধারণের জন্য অগ্নিপরীক্ষায় বসতে চলেছে। আর তাদের লক্ষ্য করে বাকি ” যোগ্যদের ” থেকে উড়ে আসছে চোখা চোখা চোখা সব বাক্যবাণ । সঙ্গে ব্যঙ্গ বিদ্রূপও। ঐ ” যোগ্যদের ” মধ্যে যারা একটু সহানুভূতিশীল তারা আবার এই ৩২০০০ এর উদ্দেশ্যে সহৃদয়তাপূর্ন উপদেশ দিচ্ছে ,- ” চিন্তা কোরো না ব্রাদার । তোমরা যদি যোগ্য হও তাহলে অগ্নিপরীক্ষায় ঠিকই সফল হবে আর তারপর আমাদের মতই “যোগ্যতার” স্ট্যাম্পপ্রাপ্ত হয়ে সসম্মানে নিজের পেশায় প্রতিষ্ঠিত হবে “। ওরা এসব বলছে কারন ওরা ভাবছে ওরা ইতিমধ্যে স্ট্যাম্পপ্রাপ্ত হয়ে গেছে এবং ওদের এই অগ্নি পরীক্ষায় কখনই বসতে হবে না। তাই ওরা ধর্তব্যের মধ্যেই আনছে না এই সত্যকে যে যদি নিয়োগে কিছু দুর্নীতি হয় বা নিয়োগকারী সংস্থা যদি নিয়ম না মেনে নিয়োগ করে থাকে তাহলে তার দায় মাথায় নিয়ে যে প্রার্থী সঠিকভাবে নির্বাচিত হয়েছে তাকে আবার অগ্নি পরীক্ষায় বসতে বলা শুধু অনুচিত নয় চরম অন্যায়। একটা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সফল হতে গেলে যেমন লাগে যোগ্যতা, দক্ষতা, তেমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ঐ বিশেষ দিনটিতে তার পারফরম্যান্স আর কিছু চান্স ফ্যাক্টর। একজনকে ছয় বছর পরে হঠাৎ করে আবার একবার পরীক্ষায় বসতে বললে কিছুতেই তাকে আগের পরীক্ষার situation দেওয়া সম্ভব নয় যেটা দিয়ে সে প্রমাণ করতে পারে যে আগের পরীক্ষাটা সে ঠিকঠাক ভাবেই উৎরে ছিল। সেই সময়ের প্রস্তুতি থাকা সম্ভব নয়। বাকিদের প্রস্তুতি লেভেল আগের মতো থাকবে না। যারা পরীক্ষা নেবেন তারা আগের মাপদন্ডেই বিচার করবেন সেটা হবে না। সবচেয়ে বড় কথা বিশেষ দিনটিতে পারফরম্যান্স আর চান্স ফ্যাক্টরগুলি কিছুতেই মিলবে না। ফলে আগের পরীক্ষাটা যারা হয়ত খুব ভালো দিয়ে চাকরিটা পেয়েছিল নতুন পরীক্ষায় তাদের মধ্যে বেশ কিছুজন খুব খারাপ করবে। আবার আগে যারা খারাপ দিয়েছিল তাদের মধ্যে অনেকেই ভালো করবে। ফলে এই চাকুরিরতদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। এটা নিশ্চিত। আবার এমন হতেই পারে এই ৩২০০০ এর মধ্যে যারা সত্যিই কোনও দুর্নীতির মাধ্যমে চাকরিটা পেয়েছিল তারা পরবর্তী সময়ে প্রস্তুতির ফলে বা আগে উল্লেখিত চান্স ফ্যাক্টরগুলোর কল্যাণে এবার ভালো ফল করবে এবং যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। তাই এই ভাবে “যোগ্য” নির্ধারণ করতে যাওয়া একটি ভুল ধারণা। তবে যারা দুর্নীতির মাধ্যমে চাকরি পেয়েছে পারলে তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু সেটা না করতে পেরে চাকরিরত সকলকেই আবার নিয়োগ প্রক্রিয়ার পরীক্ষার মধ্যে ঠেলে দেওয়া সঠিক বিচার হতে পারে না। একজন ইন সার্ভিস কর্মী যোগ্য কি না নির্ধারণ করা যেতে পারে কর্মক্ষেত্রে তার কাজ দেখে। সেখানে তার performance evaluation হতেই পারে। এটা বেসরকারি সংস্থাগুলো করে থেকে। এই নীতি সরকারি ক্ষেত্রেও চালু করা যেতে পারে। তখন কিন্তু সমস্ত কর্মীকে এর আওতায় আসতে হবে। নিজের কাজের ক্ষেত্রে পারফরম্যান্স ভালো হলে কাজ থাকবে । প্রমোশন হবে। বেতন বৃদ্ধি হবে। না হলে টা টা বাই বাই। একবার যোগ্যতার স্ট্যাম্প লাগিয়ে সারাজীবন গায়ে হাওয়া লাগিয়ে কাটিয়ে দেওয়া যাবে না। তখন যোগ্যতার ফেরিওয়ালারা কিন্তু মহানায়ক চিরঞ্জিতের সেই বিখ্যাত ডায়ালগ ” মা, আমি তো পরীক্ষা দেবো না” বলে যতই কান্নাকাটি করুক ছাড় পাবে না। একদল অন্যের দিকে যে ভাবে “অযোগ্য অযোগ্য” বলে চিৎকার করছে। এরা নিজেদের অজান্তেই নিজেদের কবর খুঁড়ছে । এই ৩২০০০ যারা এখন এই সমস্ত বাক্যবাণে আহত , ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে এই রায় বেরোনোর আগে পর্যন্ত এদেরও একটা বড় অংশ এর আগে যখন অন্যদের চাকরি খাওয়া হচ্ছিল তখন তাদের দিকে একই বাক্যবাণ নিক্ষেপ করেছিল। আজ এদের দিকে আর একদল করছে। এরা জানে না এদের এই আত্মঘাতী কাজে গোটা শিক্ষক সমাজটাই সাধারণ জনগণের চোখে অযোগ্য, দূর্নীতিগ্রস্ত বলে প্রতিপন্ন হয়ে যাচ্ছে। একদল অন্যের দিকে যে ভাবে “অযোগ্য অযোগ্য ” বলে চিৎকার করছে তাতে জনগণের কাছে এই বার্তাই যাবে যে গোটা শিক্ষক সমাজটাই অযোগ্য এবং দুর্নীতি করে চাকরি পেয়েছে। তখন কিন্তু স্থান, কাল, পাত্রের সীমারেখা থাকবে না। ফলে এমনিতেই রুগ্ন হয়ে আসা সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা আরও বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। অভিভাবকরা ছেলে মেয়েদের একেবারে বাধ্য না হলে সরকারি স্কুলে পাঠাবে না। সরকার সুযোগটা লুফে নিয়ে শিক্ষকদের বোঝা হিসাবে দেখাবে। এর অবধারিত পরিণতি হিসাবে সমস্ত শিক্ষকদের অগ্নিপরীক্ষায় বসতে হবে। কোনও বাছ বিচার হবে না। সবচেয়ে বড় কথা এতে জনগণের প্রবল সমর্থন থাকবে। যেহেতু সরকারি ব্যবস্থায় শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তই কমে যাবে তাই এই অগ্নিপরীক্ষায় খুব কম জনই সফল হবে। বাকিরা “অযোগ্য” স্ট্যাম্প নিয়ে বিদায় নেবেন। তারা যোগ দেবে সেই সমস্ত “অযোগ্য”দের দলে যাদের প্রতি একদা বিদ্রূপ বাণ নিক্ষেপ করেছে।এর একমাত্র লাভ তুলবে আসল দুর্নীতির নায়করা যারা পকেটে টাকা ঢুকিয়েছে । আর তাদের কুকর্মের দায় মাথায় নিয়ে বলিদান দেবে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েগুলো যারা অনেক স্বন্ন নিয়ে এই পেশায় এসেছিল। সরকারের টাকা বাঁচবে । সরকার খুশি। বেসরকারি স্কুলের রমরমা হবে। কর্পোরেট খুশি। টিচারদের হেনস্তায় হতাশাগ্রস্ত বৃহত্তর জনগন খুশি। আর কি চাই। সাপ মরলো , লাঠিও ভাঙলো না। আর তথাকথিত “যোগ্য” মাস্টারমশাই দিদিমণি রা নিশ্চিত থাকুন ততদিনে আপনাদের যোগ্যতার স্ট্যাম্পটা মুছে দিয়ে “অযোগ্য” স্ট্যাম্পটা কড়া করে লাগিয়ে দেওয়া হবে আর আপনাদের যুক্তি, হাহাকার, যোগ্যতার সার্টিফিকেট সব মিডিয়ার ঢাকের শব্দে ঢেকে দেওয়া হবে। হয় সেদিনের জন্য অপেক্ষা করুন । নয়ত আর একবার ভেবে দেখুন যা করছেন তা ঠিক করছেন কি না ।