দশম শ্রেণি বাংলা

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান প্রবন্ধের বিষয়বস্তু  

Question Answer Class 10 Bengali wbbse
 

সাহিত্য সঞ্চয়ন
দশম শ্রেণি বাংলা (প্রথম ভাষা)

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান
—রাজশেখর বসু

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান প্রবন্ধের বিষয়বস্তু  

দশম শ্রেণি বাংলা  

Class 10 Bengali wbbse

 

সাহিত্য সঞ্চয়ন
দশম শ্রেণি বাংলা (প্রথম ভাষা)

লেখক পরিচিতি : রাজশেখর বসু (১৮৮০-১৯৬০) : জন্ম নদিয়া জেলার বীরনগরে। পিতা দার্শনিক পণ্ডিত চন্দ্রশেখর বসু দ্বারভাঙ্গা রাজ এস্টেটের ম্যানেজার ছিলেন। বাংলা সাহিত্যে ‘পরশুরাম’ ছদ্মনামে রসরচনার জন্য রাজশেখর বসু চিরস্মরণীয়। ‘গড্ডলিকা’, ‘কজ্জলী’, ‘হনুমানের স্বপ্ন’ প্রভৃতি রসরচনার তিনি অনন্য স্রষ্টা। তাঁর লেখা প্রবন্ধগ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে: ‘লঘুগুরু’, ‘বিচিন্তা’, ‘ভারতের খনিজ’, ‘কুটির শিল্প’ ইত্যাদি। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর অবিস্মরণীয় কীর্তি ‘চলন্তিকা’ বাংলা অভিধান প্রকাশিত হয়। তিনি ‘বাল্মীকি রামায়ণ’, ‘মহাভারত’, ‘মেঘদূত’, ‘হিতোপদেশের গল্প’ অনুবাদ করেন। তিনি ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’, ‘অকাদেমি পুরস্কার’ লাভ করেন এবং ‘পদ্মভূষণ’ উপাধিতে ভূষিত হন। কলকাতা ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৫৭ ও ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে ‘ডক্টরেট’ উপাধি প্রদান করেন।

 

উৎস : ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান’ প্রবন্ধটি ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘বিচিন্তা’ গ্রন্থের অন্তর্গত।

 

বিষয়সংক্ষেপ : বিজ্ঞান নিয়ে যারা বাংলা ভাষায় চর্চা করেন। প্রাবন্ধিক তাদের দুটি ভাগে ভাগ করেছেন।যারা ইংরেজি জানেন না বা খুব অল্প জানেন,তারা রয়েছেন প্রথম শ্রেণিতে। অল্পবয়স্ক ছেলেমেয়েরা এবং অল্পশিক্ষিত বয়স্ক মানুষেরা এই শ্রেণিতে পড়েন। দ্বিতীয় শ্রেণিতে আছেন সেইসব মানুষেরা যাঁরা ইংরেজি জানেন এবং ইংরেজি ভাষায় সামান্য হলেও বিজ্ঞান পড়েছেন।

প্রথম শ্রেণির পাঠকদের সঙ্গে বিজ্ঞানের বিশেষ পরিচয় নেই, যদিও কয়েকটি সাধারণ পারিভাষিক শব্দ ও মোটাদাগের বৈজ্ঞানিক তথ্য তাঁদের জানা থাকতে পারে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি তথ্য সম্পর্কে তাঁরা অজানা। তাঁরা যখন বাংলা ভাষায় লেখা কোনো বৈজ্ঞানিক রচনা পড়েন, তখন বৈজ্ঞানিক বিষয়টি শিখে নিলেই তাদের চলে,ভাষা সেখানে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় না। কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণিতে যাঁরা আছেন, অর্থাৎ যাঁরা ইংরেজি জানেন এবং ইংরেজিতেই বিজ্ঞান পড়েছেন তাঁদের ক্ষেত্রে বাংলায় লেখা কোনো বাক্য সহজ মনে হয় না, অর্থও পরিষ্কার হয় না।এই শ্রেণির পাঠকদের যেহেতু ভাষাই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় এবং সেই সমস্যা এড়িয়ে বিষয়টি জানতে হয়, তাই এই পাঠকদের বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান পড়তে হলে অন্য পাঠকদের তুলনায় বেশি প্রচেষ্টা করতে হয়। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চায় কয়েকটি বাধার কথা প্রাবন্ধিক উল্লেখ করেছেন। প্রথম বাধা হল পরিভাষার সমস্যা। বাংলায় পারিভাষিক শব্দের অভাব দূর করতে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ উদ্যোগ নিয়েছিল।সেখানে লেখকরা নানা বিষয়ের পরিভাষা রচনা করেছেন।এরপরে ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞানের অধ্যাপক, ভাষাতত্ত্ববিদ, সংস্কৃতজ্ঞ ও কয়েকজন লেখককে নিয়ে পরিভাষা রচনার একটি প্রচেষ্টা চালায় এবং সেটি অনেক বেশি সফল হয়। লেখকের মতে বিজ্ঞান রচনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনমতো বাংলা শব্দ না পাওয়া গেলে ইংরেজি শব্দই বাংলা বানানে ব্যবহার করা যায়। যেমন, অক্সিজেন, প্যারাডাইক্লোরোবেনজিন, ইত্যাদি।

পাশ্চাত্য দেশের তুলনায় এদেশের জনসাধারণের বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচয় অত্যন্ত কম। ফলে বাংলায় পপুলার সায়েন্স লেখা সহজ কাজ নয়। তবে প্রাবন্ধিক মনে করেন, এদেশে বিজ্ঞানশিক্ষার প্রসার ঘটার সঙ্গে সঙ্গে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। বিজ্ঞান আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় রচনাপদ্ধতি অনেক লেখকই আয়ত্ত করতে পারেননি। অনেকক্ষেত্রে তাঁদের ভাষা আড়ষ্ট ও ইংরেজি শব্দের আক্ষরিক অনুবাদ হয়ে দাঁড়ায়। ইংরেজি শব্দের অর্থ মিলিয়ে বাংলা প্রতিশব্দ ব্যবহার করতে গিয়ে তাঁরা অদ্ভুত অদ্ভুত শব্দ প্রয়োগ করেন। ইংরেজিতে কোনো বাক্য ভেবে নিয়ে তা বাংলায় প্রকাশ করতে গিয়ে রচনার ভাষা উৎকট হয়ে পড়ে।অনেকে মনে করেন পারিভাষিক শব্দ একেবারে বাদ দিয়ে দিলে বিষয়টি বেশি সহজ হয়। কিন্তু সবসময় তা ঘটে না। যেমন, ‘আলোকতরঙ্গ’-এর বদলে ‘আলোর নাচন’ লিখলে তা বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ হয় না। বাক্যের অর্থও স্পষ্ট হয় না।এ প্রসঙ্গেই প্রাবন্ধিক শব্দের তিন প্রকার শক্তির কথা বলেছেন। তিনি অভিধা,লক্ষণা ও ব্যঞ্জনা-এই তিনপ্রকার শক্তির মধ্যে বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে ‘অভিধার ব্যবহারই যথাযথ বলে মনে করেছেন। প্রবন্ধের শেষে রাজশেখর বসু বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ রচয়িতাদের আর একটি দোষের কথা বলেছেন। অল্পবিদ্যার ওপর নির্ভর করে বিজ্ঞান রচনার ফলে অনেক ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভুল থেকে যায়। তাই সম্পাদকের উচিত কোনো বৈজ্ঞানিক রচনা প্রকাশের আগে অভিজ্ঞ লোককে দিয়ে তা যাচাই করিয়ে নেওয়া।

নামকরণ : যে-কোনো সাহিত্যের ক্ষেত্রেই নামকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নামকরণের মাধ্যমেই পাঠক বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে। কখনও চরিত্রধর্মী, আবার কখনও বিষয়মুখী। ব্যঞ্জনাধর্মী নামকরণও অনেক সাহিত্যিকের প্রথম পছন্দ। প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসু তাঁর ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান’ রচনায় বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান রচনার ক্ষেত্রে অনেকগুলি সমস্যার কথা বলেছেন। প্রথমেই তিনি পাঠকদের অবস্থান স্পষ্ট করতে চেয়েছেন। পাঠকদের মধ্যে ইংরেজি না জানা অল্পবয়স্ক ছেলেমেয়ে এবং অল্পশিক্ষিত বয়স্ক লোক যেমন একদিকে আছেন, তেমনই অন্যদিকে আছেন ইংরেজি জানা ও ইংরেজিতে বিজ্ঞান পড়া অল্প কিছু পাঠক। প্রথম শ্রেণিতে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা বিজ্ঞান সেভাবে পড়েননি, কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠকদের ক্ষেত্রে ভাষার সমস্যা রয়েছে। তাই ইংরেজি প্রবন্ধ পড়ায় অভ্যস্ত সেইসব মানুষের কাছে বাংলায় রচিত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের অর্থ স্পষ্ট হয় না।

প্রথমেই আসে পারিভাষিক শব্দের অভাবের কথা। এই সমস্যার সমাধানে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় উদ্যোগী হয়। তবুও বহু ইংরেজি শব্দকে এখনও আমাদের বাংলা বানানে লিখতে হয়। এদেশের জনসাধারণের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান খুব কম, সেই কারণে এখানে ইউরোপ বা আমেরিকার মতো পপুলার সায়েন্স রচনা করা কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়ায়। তাই সবার প্রথমে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারের প্রয়োজন। সহজ ও স্পষ্ট বাংলায় লেখা, অলংকার, উৎপ্রেক্ষা বাদ দিয়ে শব্দের মূল অর্থকে সামনে রাখা-এগুলি বিজ্ঞানের প্রসারে প্রয়োজন। এ ছাড়াও খেয়াল রাখতে হবে বৈজ্ঞানিক তথ্য যথাযথভাবে না জেনে যেন প্রবন্ধ রচনা করা না হয়। তাতে রচনার মধ্যে তথ্যের ভুল থাকার সম্ভাবনা বেশি। এই প্রবন্ধের লক্ষ্যই হল বাংলায় বিজ্ঞান রচনাকে আরও সহজ এবং জনপ্রিয় করে তোলার জন্য যেসব সমস্যা আছে, তা দূর করা। প্রবন্ধের বিভিন্ন উদাহরণ সহযোগে সেই সমস্যাগুলি তিনি আলোচনা করেছেন এবং তার সমাধানের পথ দেখিয়েছেন। তাই এই কারণেই তাঁর দেওয়া নামটি সার্থক হয়েছে।

 

SOURCE-HZN

©kamaleshforeducation.in(2023)

error: Content is protected !!
Scroll to Top