লোকটা জানলই না কবিতার কবিতা, কবি পরিচিতি, কবিতার ব্যাখ্যা, শব্দার্থ, হাতে কলমে প্রশ্ন ও উত্তর, অতিরিক্ত প্রশ্নোত্তর অষ্টম শ্রেণির বাংলা
Lokta Janloi Na Kobitar Question Answer
Class 8 Bengali wbbse
লোকটা জানলই না
—সুভাষ মুখোপাধ্যায়
বাঁ দিকের বুক-পকেটটা সামলাতে সামলাতে
হায়-হায়
লোকটার ইহকাল পরকাল গেল।
অথচ
আর একটু নীচে
হাত দিলেই সে পেত
আলাদিনের আশ্চর্য-প্রদীপ
তার হৃদয়
লোকটা জানলই না।
তার কড়িগাছে কড়ি হলো
লক্ষ্মী এলেন
রণ-পায়ে।
দেয়াল দিল পাহারা
ছোটোলোক হাওয়া
যেন ঢুকতে না পারে।
তারপর
একদিন গোগ্রাসে গিলতে গিলতে
দু আঙুলের ফাঁক দিয়ে
কখন
খসে পড়ল তার জীবন
লোকটা জানলই না।।
কবি পরিচিতিঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯- ২০০৩) : বাংলা কবিতায় এক উল্লেখযোগ্য নাম কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। ১৯৪০ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ পদাতিক প্রকাশিত হয়। তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে অগ্নিকোণ, চিরকুট, ফুল ফুটুক, যত দূরেই যাই, কাল মধুমাস, ছেলে গেছে বনে, জল সইতে, প্রভৃতি। তাঁর গদ্য রচনার দৃষ্টান্ত কাঁচা-পাকা, ঢোল গোবিন্দের আত্মদর্শন প্রভৃতি গ্রন্থে ছড়িয়ে রয়েছে।
সারসংক্ষেপঃ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ‘লোকটা জানলই না’ কবিতায় নিজের অর্থসম্পদ রক্ষা করতে ব্যস্ত একটি মানুষের ছবি এঁকেছেন। তিনি সারা জীবন ধরে অর্থের পিছনে ছুটে বেড়িয়েছেন। জীবনের লাভক্ষতির হিসাব করতে গিয়ে তিনি স্বাভাবিক অনুভূতিগুলি হারিয়ে ফেলেছেন। এভাবেই বাঁ দিকের বুক পকেট অর্থাৎ অর্থ-বিষয়-সম্পদ সামলাতে সামলাতেই তাঁকে একদিন পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিতে হয়। অথচ আরেকটু নীচে হাত দিলেই যে তিনি পেয়ে যেতেন আল্লা দিনের আশ্চর্য প্রদীপ তাঁর হৃদয়কে। অর্থাৎ মানুষের জীবনের সুন্দর দিকগুলি ধরা দিত তাঁর মনে। নিজের অজান্তেই তিনি নিজের চারিদিকে অদৃশ্য প্রাচীর গড়ে তুলেছিলেন। বাইরের প্রকৃতি তার রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ নিয়ে তাঁর মনে কোনো ছাপ ফেলতে পারেনি। প্রচুর ধনসম্পদের অধিকারী হয়েও জীবনের প্রকৃত অর্থ তিনি বুঝতে পারেননি। এভাবেই জীবন কাটাতে কাটাতে একদিন সব আর্থিক হিসাব-নিকাশকে অসম্পূর্ণ রেখেই তাঁকে পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিতে হয়। কিন্তু আশ্চর্যের কথা, মানুষটি নিজের এই দুর্ভাগ্যের কথা কোনোদিনই জানতে পারলেন না।
অত্যন্ত সহজসরল ভাষায়, গল্প বলার ভঙ্গিতে রচিত এই কবিতায় আধুনিক মানুষের জীবনের এক শোচনীয় পরিণামের কথাই কবি শুনিয়েছেন। অর্থের প্রতি অতিরিক্ত লোভ কীভাবে মানুষের মনুষ্যত্বকে প্রতিনিয়ত গ্রাস করে চলেছে, মানুষের সঙ্গে মানুষের ব্যবধানকে ক্রমশ কঠিন করে তুলছে, এই কবিতায় সেকথাই প্রকাশিত হয়েছে।
নামকরণঃ নামকরণের মধ্য দিয়েই কবি তাঁর কবিতা সম্পর্কে পাঠকদের প্রাথমিক ধারণাটি দেন। তাই পাঠকের কাছে নামকরণের একটি আকর্ষণ রয়েছে। ‘লোকটা জানলই না’ কবিতাটি একটি অর্থসর্বস্ব মানুষের জীবনের কাহিনি। একশ্রেণির মানুষ টাকাপয়সা রোজগার করেই জীবন কাটায়। আর অন্য কোনো দিকে তাদের কোনো আকর্ষণ থাকে না। এই কবিতার লোকটিও তাই। তিনি সারাজীবন ধরে ধনসম্পদ সামলাতে গিয়ে জীবনের সুন্দর দিকগুলির খোঁজই পাননি। তাঁর হৃদয় বা মন কীসে সত্যিকারের সুখী হতে পারে, তা তিনি সারাজীবনেও বুঝে উঠতে পারেননি। তাঁর ইহকাল পরকাল অর্থাৎ বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এইভাবেই ব্যর্থ হয়েছে। বাইরের জগৎ, প্রকৃতি আর মানুষের স্পর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন এই মানুষটিকে একদিন পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয়। তিনি জানতেও পারেন না সত্যিকারের বাঁচা কাকে বলে। সারা কবিতায় লোকটার এই অজ্ঞতার কথাই বলা হয়েছে। তাই কবিতার নামকরণ অবশ্যই উপযুক্ত ও সার্থক হয়েছে।
শব্দার্থ ও টিকা—
সামলাতে সামলাতে– আগলে রাখতে; রক্ষা করতে।
ইহকাল– জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়; জীবিতকাল।
পরকাল– মৃত্যুর পরে প্রাপ্ত অবস্থা।
আলাদিন– ‘আরব্য রজনী’ উপন্যাসের উল্লেখযোগ্য চরিত্র হল আলাদিন, তার একটি আশ্চর্য প্রদীপ ছিল। আশ্চর্য-প্রদীপ– ‘আরব্য রজনী’র উল্লেখযোগ্য চরিত্র আলাদিনের একটি আশ্চর্য প্রদীপ ছিল। ওই প্রদীপটি ঘষলে তার মধ্য থেকে অলৌকিক দৈত্য বেরিয়ে আসত। সে আলাদিনের কথা অনুসারে অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলত।
কড়ি– শামুক জাতীয় সামুদ্রিক জীববিশেষের খোল, প্রাচীনকালে ভারতবর্ষে এটি মুদ্রারূপে ব্যবহৃত হত। লক্ষ্মী– ধনসম্পদ ও সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী।
রণ-পা– বাঁশ ও কাঠের দ্বারা কৃত্রিমভাবে তৈরি লম্বা পা।
পাহারা– প্রহরা দেওয়া।
ছোটোলোক– সমাজে যারা অবনত।
গোগ্রাস– বড়ো বড়ো গ্রাস।
ফাঁক– ব্যবধান।
খসে পড়ল– (এক্ষেত্রে) মৃত্যু হল।
হাতে কলমে প্রশ্নের উত্তর :
‘লোকটা জানলই না’ কবিতা অষ্টম শ্রেণি বাংলা




