হলুদ পোড়া গল্পের প্রশ্নের উত্তর
দ্বাদশ শ্রেণির চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা
উচ্চমাধ্যমিক বাংলা চতুর্থ সেমিস্টার পরীক্ষার প্রস্তুতির লক্ষ্যে KAMALESHFOREDUCATION.IN ওয়েবসাইটের পক্ষ থেকে হলুদ পোড়া গল্পের প্রশ্নের উত্তর । দ্বাদশ শ্রেণির চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা প্রদান করা হলো। যে সকল শিক্ষার্থীরা দ্বাদশ শ্রেণির তৃতীয় সেমিস্টারের পড়া সম্পূর্ণ করে চতুর্থ সেমিস্টারের প্রস্তুতি শুরু করতে চলেছে তাদের জন্য এখানে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত হলুদ পোড়া গল্পের গুরুত্বপূর্ণ বড়ো প্রশ্নের উত্তর -গুলি প্রদান করা হলো।
হলুদ পোড়া গল্পের প্রশ্নের উত্তর
দ্বাদশ শ্রেণির চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা :
হলুদ পোড়া গল্পের প্রশ্নের উত্তরঃ
১) ‘দাওয়াটি যেন স্টেজ’ – কোন্ ‘দাওয়া’? সেখানে কোন্ ম্যাজিক আমদানি করা হয়েছিল? ২+৩
উৎসঃ
বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট লেখক ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়’ রচিত দশটি ছোটগল্পের সংকলন ‘হলুদ পোড়া’ গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্প ‘হলুদ পোড়া’ আমাদের পাঠ্য রূপে গৃহীত হয়েছে।
‘দাওয়া’-র পরিচয়ঃ
‘দাওয়া’ শব্দটি সাঁওতালি শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘রোয়াক’ বা ‘বারান্দা’। নবীনের স্ত্রী দামিনী খাপছাড়া অসুখে আক্রান্ত হলে কুঞ্জ গুনিন তাদের বাড়িতে আসে। সে উপস্থিত মানুষদের ভয় দেখিয়ে জানায় – ‘ভর সাঁঝে ভর করেছেন, সহজে ছাড়বেন না।’ এরপর কুঞ্জ গুনিন ঘরের দাওয়া থেকে সকলকে উঠোনে নামিয়ে দিয়ে নবীনের ঘরের সেই দাওয়াকে স্টেজ হিসেবে ব্যবহার করে।
ম্যাজিকের বর্ণনাঃ
দাওয়ার খুঁটির সঙ্গে প্রথমেই নবীনের স্ত্রী দামিনীর চুল শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়। এরফলে দামিনী বসতে বা পালিয়ে যেতে সমর্থ থাকে না। মঞ্চ ও কুশীলব তৈরি হওয়ার পর কুঞ্জ গুনিন শুরু করে তার আসল ম্যাজিক। সে কখনও সামনে এগিয়ে, আবার কখনও পিছু হটে দুর্বোধ্য সব মন্ত্র উচ্চারণ করতে শুরু করে। মালসার আগুনে শিকড় পোড়ার গন্ধে চারিদিকে ভরে যায়। দামিনীর ঢুলুঢুলু চোখের চাহনি হঠাৎ বিস্ফারিত হয়ে ওঠে। আর ঘরের দাওয়ার স্টেজে এই সময় কুঞ্জ গুনিন শুরু করে – ‘জীবনের শেষ সীমানার ওপারের ম্যাজিক।’
এই ম্যাজিক এমন ঘরোয়া ও বাস্তবভাবে উপস্থাপিত করা হয় যে, প্রত্যেকেই ভয় ভুলে তীব্র উত্তেজনা ও কৌতূহলের মধ্য দিয়ে তা উপভোগ করতে থাকে। মানুষের বাস্তব জ্ঞানবুদ্ধি যেখানে শেষ, সেই শেষ বিন্দু থেকে শুরু করে অতীত রহস্য ও নানা অদেহী ভয়ংকর আত্মার আনাগোনা স্টেজে ঘটতে থাকে। স্টেজের সামনে যে ত্রিশ পয়ত্রিশ জন নারী-পুরুষ দর্শক উপস্থিত ছিল তারা মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।
কুঞ্জ গুনিন এভাবেই এক রোমাঞ্চকর ম্যাজিক নবীনের দাওয়ায় সকলের সম্মুখে উপস্থাপন করে।
২) ‘কুঞ্জ অন্য একটি প্রকৃয়ার আয়োজন করেছিল’ – কুঞ্জের অন্য একটি প্রকৃয়ার আয়োজন করতে হল কেন? এই আয়োজন সম্ভব হল না কেন? ৩+২
উৎসঃ
বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট লেখক ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়’ রচিত দশটি ছোটগল্পের সংকলন ‘হলুদ পোড়া’ গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্প ‘হলুদ পোড়া’ আমাদের পাঠ্য রূপে গৃহীত হয়েছে।
অন্য প্রক্রিয়ার আয়োজনের কারণঃ
জীবনের শেষ সীমানার ওপারের ম্যাজিক দেখানোর ম্যাজিসিয়ান হল কুঞ্জ গুনিন। চক্রবর্তী বাড়ির বউকে অশরীরী আত্মায় ভর করেছে-শুনতে পেরে কুঞ্জ মাঝি নবীন চক্রবর্তীর বাড়িতে এসে পৌঁছায়। তার ম্যাজিক দেখার জন্য দূর দূর থেকে অনেকে নবীনের বাড়িতে এসে ভিড় করে। কুঞ্জ সমবেত জনতাকে ভয় দেখাতে বলে – ‘ভর-সাঁঝে ভর করেছেন, সহজে ছাড়বেন না।’ তারপর মন্ত্র পড়ে জল ছিটিয়ে কুঞ্জ তার কাজ শুরু করে। এক পর্যায়ে দামিনীর চুল শক্ত করে দাওয়ার খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়, যাতে সে বসতে বা কোথাও যেতে না পারে। কখনও সামনে এগিয়ে, আবার কখনও পিছু হেঁটে দুলে দুলে দুর্বোদ্ধ সব মন্ত্র উচ্চারণ করতে থাকে কুঞ্জ। মালসার আগুনে শুকনো পাতা আর শিকড় পুড়িয়ে উৎকট গন্ধ সৃষ্টি করা হয়। তারপর একটা কাঁচা হলুদ পুড়িয়ে কুঞ্জ নবীনের স্ত্রী দামিনীর নাকের কাছে ধরে। দামিনী এবার বিস্ফারিত নেত্রে বলে ওঠে – ‘আমি শুভ্রা গো, শুভ্রা…বলাই খুড়ো আমায় খুন করেছে।’ নানাভাবে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দামিনীকে অন্য প্রশ্ন করা হলেও দামিনীর মুখ দিয়ে অন্য কোনো জবাব পাওয়া না গেলে কুঞ্জ গুনিন অন্য একটি প্রক্রিয়ার আয়োজন করতে বাধ্য হয়।
আয়োজন সম্ভব না হওয়ার কারণঃ
কুঞ্জ গুনিন অন্য একটি প্রক্রিয়ার আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাবে ঠিক সেই সময় ‘শা’ পুরের কৈলাস ডাক্তার এসে উপস্থিত হন। ফলে কুঞ্জ গুনিনের পক্ষে অন্য আয়োজন করা সম্ভবপর হয় না। কৈলাস ডাক্তার এসেই ষাঁড়ের মতোন গর্জন করে সকলকে গালাগালি দিয়ে আগুনের মালসা লাথি মেরে ছুড়ে ফেলে দেন। কুঞ্জ গুনিনকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন – ‘দাঁড়া হারামজাদা, তোকে ফাঁসিকাঠে ঝুলোচ্ছি।’ কৈলাস ডাক্তারের এই হুমকিতে ভীত কুঞ্জ মাঝি তৎক্ষণাৎ সেই স্থান পরিত্যাগ করে।
৩) ‘হলুদ পোড়া’ গল্প অবলম্বনে ধীরেন চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো। ৫
উৎসঃ
বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট লেখক ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়’ রচিত দশটি ছোটগল্পের সংকলন ‘হলুদ পোড়া’ গল্পগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ‘হলুদ পোড়া’ নামক প্রথম গল্পের অন্যতম একটি পুরুষ চরিত্র হল ধীরেন। গল্প ঘটনা বিশ্লেষণে আমরা তার চরিত্রের যে সকল বৈশিষ্ট্যাবলীর পরিচয় লাভ করি তা ক্রমান্বয়ে আলোচিত হল –
সমাজসংস্কারীঃ
ধীরেন নানা সামাজিক অসংগতিকে দূর করবার অভিপ্রায়ে সাতজন ছেলেকে নিয়ে এক তরুণ সমিতি গড়ে তুলেছিল। এমনকি নিজের টাকা দিয়ে সে শিক্ষার প্রসারে এক লাইব্রেরিও গরে তোলে। তার উদ্যোগে লাইব্রেরির বই সংখ্যা সাতচল্লিশ থেকে তিনশোতে পৌঁছে গিয়েছে। সে সমিতির নিয়মিত সিটিং সমাবেশের মধ্য দিয়ে সমস্ত কর্মকান্ডকে সচল রেখেছে।
যুক্তিবাদীঃ
ফিজিক্স অনার্স নিয়ে বি.এস.সি পাশ করেও যুক্তিবাদী মনোভাবের অধিকারী ধীরেন গ্রামের বিদ্যালয়ে ভূগোল বিষয়ে পাঠ দান করে চলেছে। ডাক্তারি পাশ করলে না পারলেও ডাক্তারি মতে চিকিৎসা করানোর পক্ষেই তার যুক্তিবাদী মন সায় দিয়েছে। সে অকপটে বলতে পেরেছে – “‘শা’ পুরের কৈলাস ডাক্তারকে একবার ডাকা দরকার। আমি চিকিৎসা করতে পারি, তবে কি জানেন, আমি তো পাস করা ডাক্তার নই।’ এমনকি শুভ্রার মৃত্যু বিষয়ে কোনো জল্পনাকেই তার যুক্তিবাদী মন গ্রহণ করতে চায় নি।
কর্তব্যবোধঃ
সন্তানসম্ভাবী শুভ্রা বাপের বাড়িতে আসলে দাদা ধীরেন তার রক্ষণাবেক্ষণের যাবতীয় দায়দায়িত্ব পালন করেছে। বাড়ির পেছনের ডোবাতে শুভ্রার যাতায়াতের সুবিধার্থে তালগাছের টুকরো বসিয়ে দিতেও আমরা ধীরেনকে প্রত্যক্ষ করি।
জনসেবাঃ
গ্রামের দরিদ্র মানুষের অল্পবিস্তর শারীরিক সমস্যায় আমরা ধীরেনকে বিনামূল্যে ওষুধ বিতরন করতে দেখি, যা তার জনসেবামূলক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরে। দুই বছরে চার ছেলের জন্মে পরিবারের ভরণপোষণের দায়ভার বৃদ্ধি পেলেও সে চার আনা আট আনা ফি নিয়ে এখনও ডাক্তারি করে, ওষুধ প্রদান করে।
এইরূপে সমগ্র গল্প জুড়ে অবস্থান করে ধীরেন চরিত্রটি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।




