উচ্চমাধ্যমিক দ্বাদশ শ্রেণি -চতুর্থ সেমিস্টার

 

প্রদত্ত অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রবন্ধ রচনা লেখার নিয়ম

 

কোনো একটি বিষয়ে কোনো একজন লেখকের লেখার একটি অংশ দেওয়া থাকবে। প্রদত্ত অনুচ্ছেদটি হল রচনার প্রস্তাবনা বা ভূমিকা। এই প্রস্তাবনা বা ভূমিকাটিকে অবলম্বন করে পরীক্ষার্থী বিষয়বস্তুর গভীরে প্রবেশ করবে এবং পরিণতি মান করবে।

 

এই ধরনের প্রবন্ধ লেখার আগে যে বিষয়গুলি মনে রাখতে হবে-

 

  • প্রশ্নপত্রে প্রদত্ত অনুচ্ছেদটিকে মূল রচনার প্রস্তাবনা বা ভূমিকা হিসেবে গ্রহণ করে পরবর্তী অংশে সেই ভাবটিকে বিশ্লেষণ করতে হবে।

  • প্রবন্ধ রচনার সময়ে মূল লেখাটি যে গ্রন্থের অন্তর্গত, তা পড়া না থাকলেও অসুবিধা নেই।

  • প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্যের সমর্থনে প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি ও সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ব্যবহার করা যাবে।

  • প্রবন্ধের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে যেন তার নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও রূপরেখাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

  • সমাজ-সমস্যামূলক প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রতিকারের পথগুলিও উল্লেখ করতে হবে।

  • প্রবন্ধের শব্দসীমার প্রতি অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে।

  প্রদত্ত অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রবন্ধ রচনা

গাছের কথা :

সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকে বৃক্ষপ্রাণ শ্যামল স্নিগ্ধ করে রেখেছে এই ধরিত্রীকে। অরণ্যের প্রাণেই জীবজগতের প্রাণ। বর্ণে-গন্ধে-পুষ্পে-পত্রে গাছই জগদ্ধাত্রী। মানুষ শুরু থেকেই পেয়েছে বৃক্ষের পরম আশ্রয়। বৃক্ষবীজ যেন জাগতিক প্রাণশক্তিরই প্রতীক। প্রত্যেক বীজ থেকে গাছ হয়তো জন্মায় না, কিন্তু বীজের ভিতর থাকে ভবিষ্যৎ উদ্ভিদের সম্ভাবনা। আর বীজ যখনই সবুজ পাতায় মুখরিত হয়ে ওঠে, তখন সে শোনে শিকড়ে তার অরণ্যের বিশাল চেতনা।

মানুষের জীবন, প্রকৃতির ভারসাম্য সবকিছুর মূলেই আছে এই গাছের ভূমিকা। বৃক্ষ-পত্র-পুষ্প-কাণ্ড-মূল-এই সকলই ব্যাবহারিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আরণ্যক ঋষিরা তাই মন্ত্রোচ্চারণে বৃক্ষবন্দনা করতেন। বৃক্ষের শ্যামলিমা দ্বারা রুক্ষতাকে ঢেকে দিতে রবীন্দ্রনাথও তাই পালন করেছিলেন হলকর্ষণ, বর্ষামঙ্গল। প্রার্থনা জানিয়েছিলেন-

“এসো শ্যামল সুন্দর আন তব তাপহরা তৃষাহরা সঙ্গসুধা…”

পৃথিবীর আদিপ্রাণ এই বৃক্ষ মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছায়া। একান্ত নিভৃত বীজ থেকে ক্রমে ক্রমে সে কিশলয়, সবল কাণ্ড-পুষ্প-পত্র-ফলশোভিত বনস্পতিতে রূপান্তরিত হয়। আবার পাতাঝরা বৃক্ষ যেন বার্ধক্যের ক্ষণপ্রতীক।

অতীত কালে মানুষ প্রকৃতিকে ভালোবাসত, উপাসনা করত, প্রকৃতির অন্তর্গত প্রাণশক্তিটিকে সমপ্রাণের মর্যাদা দিত। ক্রমে মানবকে গ্রাস করল সভ্যতাদর্প। সে ভুলে গেল বৃক্ষপ্রাণের মর্ম। ভুলে গেল বৃক্ষও মানুষের মতো সগুণের আধার। তারাও একে অন্যকে সাহায্য করে, তাদেরও বন্ধুত্ব হয়, তারাও স্বার্থত্যাগ করে। এমনকি মা বৃক্ষ জীবন দিয়ে সন্তানকে রক্ষা করে। সভ্যতাদর্পী মানুষ গাছের এই সত্যস্বরূপ ভুলে মেতে উঠল প্রকৃতি ধ্বংসে। সাময়িক আরাম, সুখভোগ আর আপন তৃপ্তির জন্য সে নিজেকে, নিজের উত্তরাধিকারকে আর প্রকৃতিকে বিপন্নতার চরম সীমায় নিয়ে গেল। জগদীশচন্দ্র যে সবুজে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন, মানুষ সেই বৃক্ষপ্রাণের আর্তনাদ ভুলে গেল। কবির সচেতন স্বর দাবি জানাল-

“দাও ফিরে সে অরণ্য লও এ নগর।”

তবু সবুজের অভিযান হল না। বরং নির্বিচারে সবুজ হত্যায় সভ্যতার নির্লজ্জ রূপটি মানুষকে নিয়ে এল উন্নায়নের আবর্তে। পৃথিবীর অন্যান্য জীবের ন্যায় অঙ্কুরিত সবুজ প্রাণ একদিন বীজের ঢাকনা ভেদ করে নিজেকে প্রকাশ করেছিল। সৃষ্টির প্রথম দিনে পৃথিবীর বক্ষে প্রাণসঞ্চার করতে অন্যান্য জীবের সঙ্গে বৃক্ষপ্রাণের যেন এক গভীর বোঝাপড়া ছিল। গাছ আশ্রয় দিয়েছে, প্রান্তিক মানুষদের খাদ্যের সংস্থান করেছে। এমনকি জীবিকার সন্ধানও দিয়েছে। মাটির বুকে পড়ে থাকা অবহেলিত বীজেরাও কোনো একদিন সবুজের সাম্রাজ্যের মহিরুহে পরিণত হয়েছে।

গাছপালা জড় নয়। সবুজ ধ্বংস প্রকৃতার্থে প্রাণেরই বিনাশ। আধুনিক মানুষ তাই ঘাতক মানুষ। বৃক্ষ ধ্বংস করে সে দূষণ, মারণব্যাধি ডেকে এনেছে। উন্নয়নের বিকৃত লালসায় সে প্রকৃতির ভারসাম্যকে বিনাশ করেছে। বস্তুবাদী চেতনার যন্ত্রণা, লালসার বিষ তাই আজ মানবসভ্যতার শিরায় শিরায় বইছে। গাছের মূক জীবন তবু আজও মানুষকে সাহচর্য দিয়ে চলেছে। সে এত ধ্বংসেও নিঃসাড়ে পালন করে চলেছে তার ধর্ম। মানুষের অতি প্রজননের বিষ ঢেকে দিতে সে আপ্রাণে বীজ সৃষ্টি করছে। কিন্তু বর্তমান পৃথিবী বড়োই হৃদয়হীন! সে আপন স্বার্থ চরিতার্থতায় উন্মুখ। সবুজের আর্তনাদে তাই এই পৃথিবী বড়োই উদাসীন।

বসুন্ধরার মূল প্রাণশক্তি মানুষ নয়, গাছ। তার জন্য জগতের ভারসাম্য বজায় থাকে, জীবের জীবন বিকশিত হয়। গাছ হল পালিকা, ধাত্রী। সবুজশূন্য পৃথিবী মৃত্যুপুরী। সবুজহীনতায় প্রাণের বিনাশ। প্রকৃতিকে সে ধরে রেখেছে বলেই যে মানবজীবন প্রবাহিত-এ সত্যের বিস্মৃতি মানবসভ্যতার অভিশাপ।

 

SOURCE-WBC

©Kamaleshforeducation.in (2023)

 

error: Content is protected !!
Scroll to Top