উচ্চমাধ্যমিক দ্বাদশ শ্রেণি -চতুর্থ সেমিস্টার

 

প্রদত্ত অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রবন্ধ রচনা লেখার নিয়ম

 

কোনো একটি বিষয়ে কোনো একজন লেখকের লেখার একটি অংশ দেওয়া থাকবে। প্রদত্ত অনুচ্ছেদটি হল রচনার প্রস্তাবনা বা ভূমিকা। এই প্রস্তাবনা বা ভূমিকাটিকে অবলম্বন করে পরীক্ষার্থী বিষয়বস্তুর গভীরে প্রবেশ করবে এবং পরিণতি মান করবে।

 

এই ধরনের প্রবন্ধ লেখার আগে যে বিষয়গুলি মনে রাখতে হবে-

 

  • প্রশ্নপত্রে প্রদত্ত অনুচ্ছেদটিকে মূল রচনার প্রস্তাবনা বা ভূমিকা হিসেবে গ্রহণ করে পরবর্তী অংশে সেই ভাবটিকে বিশ্লেষণ করতে হবে।

  • প্রবন্ধ রচনার সময়ে মূল লেখাটি যে গ্রন্থের অন্তর্গত, তা পড়া না থাকলেও অসুবিধা নেই।

  • প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্যের সমর্থনে প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি ও সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ব্যবহার করা যাবে।

  • প্রবন্ধের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে যেন তার নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও রূপরেখাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

  • সমাজ-সমস্যামূলক প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রতিকারের পথগুলিও উল্লেখ করতে হবে।

  • প্রবন্ধের শব্দসীমার প্রতি অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে।

  প্রদত্ত অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রবন্ধ রচনা

অপরাধের উৎস: বৈষম্যমূলক আর্থসামাজিক ব্যবস্থা  

সভ্যতার সিঁড়ি বেয়ে আমরা যত অগ্রগতির উচ্চ শিখরে উঠছি ততই আমাদের সমাজজীবনে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। সেই জটিলতার ছিদ্রপথেই সমাজে প্রবেশ করছে নানা অন্যায়-অপরাধমূলক কাজ। আদিম সাম্যভোগবাদী সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর থেকে মানুষের সমাজজীবনে ঘটে চলেছে নানা পরিবর্তন। ব্যক্তি সম্পত্তির উদ্ভব, উৎপাদন ব্যবস্থার নানা কাঠামো ও পদ্ধতিগত পরিবর্তন, উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যার প্রয়োগ, উদ্বৃত্ত উৎপাদন, উৎপাদনের উপকরণের মালিকানার পরিবর্তন, শিল্প-কলকারখানায় এবং কৃষিতে ভাড়া করা শ্রমিক নিয়োগ, ব্যাবসাবাণিজ্যের আন্তর্জাতিকতা, সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ প্রভৃতির চরিত্র পরিবর্তনে বর্তমান সমাজে আর্থসমাজ দৃষ্টিভঙ্গিতে সৃষ্টি হয়েছে চার শ্রেণির মানুষ-ধনী, উচ্চমধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণি। একদিকে মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণি অন্যদিকে অগণিত দরিদ্র শ্রেণির মানুষ। একদিকে মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী শোষক সম্প্রদায়, অন্যদিকে সংখ্যাতীত বঞ্চিত শোষিত নির্যাতিত মানুষ। একদিকে ভোগবিলাসের প্রাচুর্য, আর একদিকে অনাহারে-অর্ধাহারে অপুষ্টিক্লিষ্ট মানুষের দীনতা। এই বৈষম্যমূলক সমাজে দেখা দিয়েছে তাই নানা ব্যাধি- চুরি-ডাকাতি, রাহাজানি, খুনখারাপি কার্যকলাপ। অথচ কোনো মানুষই চোর-ডাকাত-খুনি হয়ে জন্মায় না। কঠিন-কঠোর বাস্তব সমাজজীবন তাদের সেসব পথে ঠেলে দেয়।

যেদিন থেকে আর্থসমাজ ব্যবস্থায় এই অবক্ষয় শুরু হয়েছে তবে থেকেই এই অন্যায়-অপরাধমূলক কাজ ঘটে আসছে এবং তা আরও তীব্র মাত্রা লাভকরছে। আর এই অন্যায়-অপরাধ দমন করার জন্য রাষ্ট্রব্যবস্থা তৎপর হয়ে উঠেছে। তাই গড়ে উঠেছে আইন-আদালত প্রশাসন। আইনের চোখে চোর দোষী, তার শাস্তি হয় আইনমাফিক। পরের দ্রব্য অপহরণ করাই হল চুরি এবং তা অন্যায় ও অপরাধ। আইনের চোখে চোর অপরাধী ও শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু চোর কেন চুরি করল, সেটাও আমাদের জানতে হবে। নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে যদি অভাবের তাড়নায় কেউ চুরি করতে বাধ্য হয়, তবে তা অপরাধ কিনা তা বিচার করার সময় এসেছে। দিনান্ত পরিশ্রম করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলেও যখন একজন দু-বেলা দু-মুঠো অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের সংস্থান করতে পারে না, রোগে ছেলে-মেয়ে-বউ-এর চিকিৎসা করতে পারে না, চোখের সামনে বিনা চিকিৎসায় ও বিনা পথ্যে আপনজনকে মৃত্যু মুখে ঢলে পড়তে দেখে; তখন যদি কোনো ব্যক্তি স্নেহ-ভালোবাসা-মায়া-মমতার টানে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও চুরি করে অনাহারক্লিষ্ট স্বজনের মুখে গ্রাস তুলে দিতে, রোগের চিকিৎসা করাতে; তখন কি তা খুবই অমানবিক, অন্যায়, অপরাধ? যখন একজন মানুষ লেখাপড়া শিখে কাজের জন্য হন্যে হয়েও বেকার থাকতে বাধ্য হয়, জঠর যন্ত্রণায় কাতর হয়ে চুরি করতে বাধ্য হয়, তখন কি তা অমার্জনীয়? আমরা সংবেদনশীল দৃষ্টি মেলে অনুসন্ধান করব না-কেন মানুষ চুরি করে? কোথায় অপরাধের উৎস?

বৈষম্যমূলক আর্থসমাজব্যবস্থার মধ্যে অপরাধমূলক কাজের বিষবীজ উপ্ত রয়েছে। সমাজের একশ্রেণির মানুষ কম আয়াসেই ভোগবিলাসের আতিশয্যে বংশপরম্পরায় জীবন অতিবাহিত করেছে, আর-এক বৃহৎ শ্রেণির মানুষ অক্লান্ত পরিশ্রম করেও ন্যূনতম অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারছে না। যেসকল কৃপণ যক্ষের মতো ধনদৌলত আগলে রেখেছে; যারা সমাজে কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করে নিজস্বার্থ সিদ্ধ করছে, সে সকল ব্যক্তিই সমাজের ভাগ্যনির্ধারক। তারাই সমাজের প্রভাবশালী, তারাই সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তির ভাবমূর্তি হয়ে বিরাজ করে, এদেরই কারণে সমাজে এত অভাব-অনটন, এত বেকার, এত অন্যায়-অবিচার-অপরাধ। অথচ আইনের চোখে এরা নিরপরাধ। এরাই কৌশলে আইন-আদালত-প্রশাসনকে কুক্ষিগত করে শ্রমজীবী -কৃষক-শ্রমিক-মজদুর শ্রেণির মানুষের মুখের গ্রাস, পরিধানের বস্ত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই কেড়ে নিয়েছে। এদেরই কারণে সমাজে এত অন্যায়-অবিচার-অপরাধ ঘটে। যতদিন সমাজে এই ব্যবস্থা, এই কৃপণ ধনী থাকবে; ততদিন সমাজে চোর চুরি করবে, ডাকাত ডাকাতি করবে, খুনি খুন করবে।

বস্তুত আর্থসমাজব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করার সময় এসেছে। চোর দোষী; কিন্তু তদপেক্ষা শত গুণ দোষী কৃপণ ধনী, যাদের কারণে সমাজে চোর-ডাকাত-খুনির জন্ম হয়। চোর-ডাকাত-খুনি হয়ে কেউ জন্মায় না। সমাজব্যবস্থাই মানুষকে সৎ, মহৎ ও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে; আবার সেই সমাজই মানুষকে চোর-ডাকাত-খুনিও করতে পারে। বৈষম্যমূলক আর্থসমাজ ভেঙে সাম্যবাদী আর্থসমাজব্যবস্থা গড়ে উঠলে মানবসমাজ অনেক সমস্যা ও অন্যায়-অবিচার-অপরাধ থেকে মুক্ত হতে পারবে। তাই আইন-আদালতের শাসনব্যবস্থায় গড়ে উঠুক সুস্থ স্বাভাবিক উন্নত সমাজব্যবস্থা, যার ভিত্তি হবে-মানবতা, সততা ও সংবেদনশীলতা।

 

SOURCE-WBC

©Kamaleshforeducation.in (2023)

 

error: Content is protected !!
Scroll to Top