প্রদত্ত অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রবন্ধ রচনা
৬। [“যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে/নীচে পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।” রবীন্দ্রনাথ এভাবেই নিরক্ষরতার অভিশাপ সম্বন্ধে সচেতন করেছেন জাতিকে। নিরক্ষর মানুষ চলার পথে বারে বারে বাধাপ্রাপ্ত হয়। জীবনের সর্বক্ষেত্রে সাক্ষরতা প্রয়োজনীয়। পড়াশোনা মানুষকে একতাবদ্ধ করে। যে-কোনো অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়তে গেলে একতা জরুরি। আর শিক্ষাই ঐক্য আনে।]
প্রদত্ত অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে প্রবন্ধ রচনা
নিরক্ষরতার শাপমোচন :
কোনো দেশের উন্নতির মূল হল সার্বিক শিক্ষা, দেশবাসীর অক্ষরজ্ঞান। দেশের মানুষ যদি নিরক্ষর থাকে তবে তা দেশের বোঝা, জাতির অপমান। এই অপমান দূর করতে প্রয়োজন সকল দেশবাসীকে সাক্ষরতার আলোয় আলোকিত করা। আর তার ফলেই আমরা আমাদের কাম্য সুখ ও স্বাধীনতা লাভ করতে পারব। কিন্তু নিরক্ষরতা আজও এই দুর্ভাগা দেশের হতভাগ্য জনগণের নিষ্ঠুরতম অভিশাপ। সেই অভিশাপ দূর করতে হবে, আর তবেই জ্ঞান ও চিন্তার নবধারা বিকশিত হয়ে উঠবে।
নিরক্ষরতার অন্যতম কারণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য। একটা সময় পর্যন্ত প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষরা শিক্ষার অগ্রাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। এমনকি তাদের ধারণা ছিল যে, শিক্ষা তাদের জন্য নয়। এ ছাড়া কন্যাসন্তান পরের ধন বলেও শিক্ষায় অনেকে তাদের অধিকার দেয় না। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলি থেকে নিরক্ষরতা শব্দটি প্রায় মুছেই গিয়েছে। কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীর দুই দশকে দাঁড়িয়েও আমরা অর্থাৎ ভারতবাসীরা এখনও নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারিনি। ১৯৯১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতবর্ষে সাক্ষরতার হার ছিল ৫২.১১, ভারতবর্ষের কোনো কোনো রাজ্য অবশ্য সাক্ষরতায় যথেষ্ট সফলতা অর্জন করেছে। পশ্চিমবঙ্গেও সাক্ষরতা অভিযানে গুরুত্ব দেওয়ার ফলে সাক্ষরতার হার বেড়েছে। ২০১১ সালের জনগণনা অনুসারে মোট সাক্ষরতার পরিমাণ ৭৪.০৪, পশ্চিমবঙ্গে ৭১.১৬।
অক্ষরজ্ঞান মানুষের দৃষ্টিশক্তির মতো। যার সাহায্যে প্রতিটি মানুষ এই পৃথিবীকে, পরিবেশকে জানতে পারে, চিনতে পারে। নিরক্ষরতার অভিশাপে মানুষ অভিশপ্ত জীবনযাপন করে। তাই আমরা দেখতে পাই দেশের একটি অংশের জনগণকে অশিক্ষার অন্ধকারে অজ্ঞান, অচৈতন্য করে রাখার অপচেষ্টা চলেছে, যাতে তাদের পশুর মতো খাটিয়ে নেওয়া যায়। এর ফলে সমাজের এক শ্রেণির মানুষ সকল সুখভোগের অধিকার গ্রহণ করে আর সরল নিরক্ষর মানুষগুলিকে ছুঁড়ে ফ্যালে দারিদ্র্যের আস্তাকুঁড়ে।
গণতন্ত্রের সাফল্যের প্রয়োজনে সবার আগে চাই সচেতন নাগরিকতা। সাক্ষরতা। আর শিক্ষার প্রসার ছাড়া সচেতন নাগরিকতার প্রকাশ ঘটা সম্ভব নয়। এ যেন দৃষ্টিহীনের তীব্র বেগে ছুটে যাওয়ার পরিণামের শামিল। তাই সবার আগে প্রয়োজন দেশব্যাপী নিরক্ষরতা দূরীকরণের এক সুপরিকল্পিত, নিশ্ছিদ্র, বিশাল আয়োজন। ইতিমধ্যেই সারা দেশব্যাপী শুরু হয়েছে সাক্ষরতা অভিযান। সর্বশিক্ষা অভিযানের মতো পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে ভারতের প্রতিটি রাজ্যে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং বিদ্যালয়ে সার্বিক সাক্ষরকরণ একটি অবশ্যকরণীয় কাজ বলে স্বীকৃত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ এই কাজে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছে। তারা এই উদ্দেশ্যে বিস্তৃত পরিকল্পনা নিয়েছে। বিদ্যালয়ে বিদ্যালয়ে প্রেরিত হয়েছে বিভিন্ন বইপত্র, প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলি।
আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না- এই অভিযোগ যুগ যুগ ধরে আমরা শুনে আসছি। কিন্তু সাক্ষরতার এই নব উদ্যমে এই ত্রুটিকে সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে নিরক্ষরতার জন্য দায়ী সাক্ষর জনসমাজ। আর এই নিরক্ষরতার সুযোগেই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে বঞ্চনা-শোষণ-পীড়ন। আর এর ফলেই জন্ম নিয়েছে অন্ধ কুসংস্কার ও সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য। তাই দেরিতে হলেও সাক্ষরতার যে আকাঙ্ক্ষিত অভিযান শুরু হয়েছে তাতে আমাদের স্থান নিতে হবে প্রথম সারিতে।
সাক্ষরতা অভিযানের পথ মিশে যাবে পাড়াগাঁয়ের মেঠো পথে। সেই পথেই জনগণ পরস্পরের মধ্যে খুঁজে পাবে দুঃখ-বেদনার স্বরূপ, সেই পথেই তারা খুঁজে পাবে সুসংহত ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উপায়। সাক্ষরতাই অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে কোনো জাতির আত্মরক্ষার হাতিয়ার। সাক্ষরতাই তাদের ঐক্যবদ্ধ করে অস্তিত্বরক্ষার সংগ্রামে সচেষ্ট করবে। মনে রাখতে হবে, কয়েকটি বিদ্যালয় স্থাপনের দ্বারা দেশব্যাপী নিরক্ষরতা দূরীকরণ সম্ভব নয়। এজন্য চাই সকল দেশবাসীর একান্ত প্রচেষ্টা ও পরিকল্পনা। গ্রামপঞ্চায়েত, অঞ্চল পঞ্চায়েত এবং জেলা পরিষদগুলিকে এ বিষয়ে উদ্যোগী করা যেতে পারে। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের নাগরিক। তাই দেশের নিরক্ষরতা দূরীকরণে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সচেতন ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। তাদের হাত ধরেই নিরক্ষরতার অভিশাপ মুছে গিয়ে শিক্ষার আলোয় সারা দেশ আলোকিত হয়ে উঠবে।