পাঠ-পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা


এ’কথা অনস্বীকার্য যে, পরিকল্পিত কর্মসূচির গুণগত মান পরিকল্পনা বিহীন কর্মের তুলনায় অনেক উচ্চমানের হয়। শিক্ষণ এমনই একটি কর্মসূচি যেখানে পূর্বপরিকল্পনা একান্ত প্রয়োজন। উপযুক্ত শিখনের (Learning) জন্য শিক্ষার্থীর মানসিক প্রস্তুতি যেমন দরকার ঠিক সেইভাবেই আদর্শ পদ্ধতিতে শ্রেণি শিক্ষণের জন্য শিক্ষকের-ও প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। শিক্ষণ-প্রস্তুতির (Teaching preparation) এইসব বিভিন্ন দিকের মধ্যে যথাযথ পরিকল্পনা রচনা করা শিক্ষকের একটি প্রধান দায়িত্ব। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের কৃতকার্যতা অনেকাংশে তার পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে। পরিকল্পনা বিহীন শ্রেণি-শিক্ষণে শিক্ষকের শ্রেণি-পরিচালনা সঠিক পক্ষে ধাবিত হতে পারে না, শিক্ষণীয় বিষয়ের মূলভাবে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় না, শিক্ষক না পারেন শিখনের মূল লক্ষে পৌঁছাতে, না পারেন শিক্ষার্থীদের হৃদয় স্পর্শ করতে। অর্থাৎ পরিকল্পনার অভাবে, পাঠদানের মধ্যে সামঞ্জস্যহীনতা লক্ষ্য করা যেতে পারে। তাই সুষ্ঠু পাঠদানের নীতি হিসাবে শিক্ষণ-পরিকল্পনা (Planning for Teaching) একান্ত প্রয়োজন।


শিক্ষণ বিষয়ে শিক্ষকের চিন্তাধারার প্রতিফলন-ই হলো পাঠপরিকল্পনা। শিক্ষার উন্নতি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষকের দক্ষতা ও নিষ্ঠার ওপর নির্ভর করে। যে কোন দক্ষ ও নিষ্ঠাবান শিক্ষক পরিকল্পনা ছাড়া চলতে পারেন না। শিক্ষককে সাধারণঃ তিন ধরনের পরিকল্পনা রচনা করতে হয়।

এগুলি হলো:==
(১) পাঠ্যক্রম বা পাঠ্যবিষয় নির্বাচন সংক্রান্ত পরিকল্পনা (Curriculum planning বা course planning)


(২) পাঠ্য বিষয়াংশ বা একক-সক্রোন্ত পরিকল্পনা (Planning topic বা unit)
(৩) একক পাঠ-পরিকল্পনা (Lesson Planning)


প্রারম্ভিক শিক্ষাক্ষেত্রে (Elementary), জাতীয় পাঠক্রমের রূপরেখা,২০০৫ এবং শিক্ষার অধিকার আইন ২০০৯-এই নথি দুটিকে অনুসরণ করে নতুন পাঠ্যক্রম, পাঠ্যসূচি এবং পাঠ্য-পুস্তক বিশেষজ্ঞ কমিটি, বিদ্যালয় শিক্ষা দপ্তর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার দ্বারা পরিকল্পনা ও নির্মাণ করা হয়েছে।


পাঠ-পরিকল্পনা রচনা


শ্রেণিকক্ষে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিভিন্ন কাজের উদ্দেশ্যে পৌঁছানোর জন্য বিভিন্ন করনীয় বিষয়ের বিভাগ-ই হলো পাঠ-পরিকল্পনা। “(Lesson plan is the title given to a statement of the achievements to be realised and the specific means by which these are to be attained as a result of the activities engaged in, during the period, the class spends with the teacher”- N. L. Bossing) এই সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করলে আমরা পাঠপরিকল্পনার বিশেষভাবে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দেখতে পাই।


প্রথমত: পাঠপরিকল্পনার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে। কারণ আংশিক ভাবে এটি একটি উদ্দেশ্যের বিবরণ।


দ্বিতীয়ত: পাঠপরিকল্পনায় পাঠপরিচালনার বিস্তারিত বিবরণ থাকে।

শিক্ষার্থীর সক্রিয়তাই তার শিখনের ভিত্তি, একথা স্বীকার করে, শিক্ষার্থীর কর্মের উপর-ই গুরুত্ব আরোপ করা হয়।


তৃতীয়ত: শিক্ষণের ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা গৌণ, একথা পাঠ-পরিকল্পনার সংজ্ঞায় স্বীকৃত, শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শুধুমাত্র পরিচালকের ভূমিকায় থাকবেন।

পাঠ-পরিকল্পনা রচনার প্রথম অংশে কতগুলি প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা হয়। এইসব তথ্য সামগ্রিকভাবে পাঠ-পরিকল্পনাকে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে, এই কারণে। পাঠ-পরিকল্পনার প্রথমে এইসব তথ্য সরবরাহ করা প্রয়োজন। পাঠ-পরিকল্পনার এই অংশে দু’ধরনের তথ্য লেখা হয়-শিক্ষক, বিদ্যালয়, শিক্ষার্থী সংক্রান্ত তথ্য এবং পাঠ্যবিষয় সংক্রান্ত তথ্য। সাধারণত শিক্ষক, বিদ্যালয়, শিক্ষার্থী সংক্রান্ত অংশে বিদ্যালয়ের নাম, শ্রেণি, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, শিক্ষার্থীদের গড় বয়স, পাঠের সময়, শিক্ষকের নাম, তারিখ ইত্যাদি লেখা হয়। অন্যদিকে বিষয়-সংক্রান্ত তথ্যে-বিষয়, একক, উপ-একক, অদ্যকার-পাঠ সম্পর্কে লেখা হয়। এই পর্যায়ে পাঠসংক্রান্ত তথ্য পরিবেশন করার সময় শিক্ষকের বিশেষভাবে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। কারণ এই অংশে শিক্ষক তার পাঠ সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা পরিবেশন করবেন। প্রথমত: ‘বিষয়’ অংশে যে কোন একটি বিষয়, তিনি যা পড়াচ্ছেন, তার নাম লিখবেন। যেমন, বাংলা, ইংরাজি, গণিত বা পরিবেশ-পরিচিতি। নবপ্রবর্তিত পাঠ্য-পুস্তকে প্রত্যেকটি পাঠ এক-একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এই পাঠের মধ্যে একাধিক উপ-একক যে বিষয়ের সূত্রে গাঁথা আছে, এই ব্যাপারে শিক্ষকের স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। তিনি একটি পাঠ অর্ধ-সমাপ্ত রেখে পরবর্তী পাঠ কখনই আরম্ভ করতে পারবেন না।

পাঠ পরিকল্পনা রচনার দ্বিতীয় অংশ-কে তিনটি সোপানে বিভক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

প্রথম সোপান- প্রস্তুতি পর্ব (Preparation Stage)
দ্বিতীয় সোপান- উপস্থাপন পর্ব (Presentatino Stage)
তৃতীয় সোপান- উপস্থাপন পরবর্তী পর্ব (Post presentation Stage)
প্রস্তুতি পর্ব (Preparation Stage)
এই স্তরে শিক্ষার্থীদের নিযুক্তিকরণের (Engagement) উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
শিক্ষক-শিক্ষিকা আজকের শিক্ষণীয় পাঠের সঙ্গে সম্পকযুক্ত বলা, গান করা, নাটকের ভঙ্গিমার দ্বারা অথবা ছবি, পোস্টার দেখানো-র মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের-নিযুক্ত করবেন। শিক্ষার্থীরা মনোযোগী হবে, তাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে আজকের বিষয়কে সংযুক্ত করার চেষ্টা করবে। শিক্ষক/শিক্ষিকা কোনোরকম পাঠ-ঘোষণা করবেন না।

উপস্থাপন পর্ব (Presentation Stage)

এই সোপানে উদ্ভাবন (Exploration), ব্যাখ্যা (Explanation), এবং বিস্তৃতি করণের Elabosation)-উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষিকা সমগ্র শ্রেণিকে কয়েকটি মিশ্র (hederogeneous) দলে ভাগ করবেন। প্রত্যেক দলকে কর্মপত্র (Work Sheet) দেবেন অথবা অন্য কাজে যুক্ত করবেন। প্রত্যেক শিক্ষার্থী নিজস্ব দলের মধ্যে কাজের সঙ্গে যুক্ত হবে। শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে, নিজস্ব ক্ষমতা অনুযায়ী উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা করবে। শিক্ষক/শিক্ষিকা আজকের শিক্ষণীয় বিষয় অভিমুখে শ্রেণি পরিচালনা করবেন, প্রয়োজনে তথ্য দেবেন। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, জানা বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত করে, আলোচনা করে, প্রশ্ন করে নিজেরা শুনে, ভেবে…. শিখবে।

উপস্থাপন-পরবর্তী স্তর (Post presentation Stage)

এই পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন সার্বিক মূল্যায়নের নীতি (CCE) অনুসারে শিক্ষিকা শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করবেন। শিক্ষার্থীরা দলের মধ্যে পরস্পরের মূল্যায়ন করবে এবং নিজের মূল্যায়নও করবে। মূল্যায়নের ফলাফল দিয়ে শিক্ষিকার সঙ্গে আলোচনাও করবে।

=======================

*Regards*
*KAMALESH..*.✒️
÷÷÷÷÷÷ * KAMALESH*÷÷÷÷÷÷÷
*🙏*PLZ SHARE IT WITH YOUR FRIENDS*

 

©Kamaleshforeducation.in (2023)

error: Content is protected !!
Scroll to Top