দশম-শ্রেণি -বাংলা  

‘অসুখী একজন’ কবিতা

প্রশ্ন উত্তর (MCQ ও বড় প্রশ্ন)  

Updated on: 

আজকে    চিলির নোবেলজয়ী কবি পাবলো নেরুদা রচিত এবং নবারুণ ভট্টাচার্য অনূদিত ‘অসুখী একজন’ কবিতাটি নিয়ে আলোচনা করা হল ।  যা   দশম শ্রেণির পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত। এই কবিতার মাধ্যমে আমরা যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং তার মাঝেও ভালোবাসার চিরন্তন ও অবিনশ্বর রূপের এক নিদারুণ কাহিনি জানতে পারব।

 

বিষয়

বিবরণ

কবিতা

অসুখী একজন

কবি

পাবলো নেরুদা (বাংলা তর্জমা: নবারুণ ভট্টাচার্য)

গৃহীত

‘বিদেশি ফুলে রক্তের ছিটে’ কাব্যগ্রন্থ

বোর্ড: বিষয়বস্তু

1 অসুখী একজন – পাবলো নেরুদা (দশম শ্রেণী বাংলা কবিতা)

2 অসুখী একজন – পাবলো নেরুদা (সহজ বাংলা অর্থ)

3 অসুখী একজন কবিতার প্রশ্ন উত্তর (Asukhi Ekjon Pablo Neruda) অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (MCQ & VSAQ)

3.1 অসুখী একজন কবিতার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর (মান – ৩)

3.2 অসুখী একজন কবিতার রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর (মান – ৫)

 

অসুখী একজন 

পাবলো নেরুদা

 (দশম শ্রেণী বাংলা কবিতা)

 

আজকে পাবলো নেরুদার ‘অসুখী একজন’ কবিতার সারাংশ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর – এই পোস্টে   কবিতার সারসংক্ষেপ, নামকরণের বিশ্লেষণ ও গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ছাত্রছাত্রীরা পেয়ে যাবে, যা তাদের মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিশেষভাবে সাহায্য করবে।

 

উৎস ও পটভূমি:

 

‘অসুখী একজন’ কবিতাটি চিলির বিখ্যাত কবি পাবলো নেরুদার লেখা। কবিতাটির মূল স্প্যানিশ নাম ‘La Desdichada’ (The Unhappy One)। বাংলায় কবিতাটি তর্জমা করেছেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক নবারুণ ভট্টাচার্য তাঁর অনূদিত ‘বিদেশি ফুলে রক্তের ছিটে’ কাব্যগ্রন্থ থেকে আমাদের পাঠ্য কবিতাটি গৃহিত হয়েছে। এই কবিতায় যুদ্ধের এক ভয়াবহ ধ্বংসলীলার পটভূমিতে দাঁড়িয়ে মানুষের চিরন্তন ভালোবাসা এবং অপেক্ষার এক মর্মান্তিক রূপ তুলে ধরা হয়েছে।

 

অসুখী একজন:

কবিতার সারাংশ 

 

কবিতার কথক, যিনি একজন যোদ্ধা বা বিপ্লবী, তাঁর প্রিয়তমাকে দরজায় অপেক্ষায় রেখে বহুদূরে চলে যান। মেয়েটি জানত না যে তিনি আর কখনো ফিরে আসবেন না। এরপর দিনের পর দিন, বছরের পর বছর কেটে যায়। বৃষ্টির জলে কথকের পায়ের দাগ ধুয়ে যায়, সেখানে ঘাস জন্মায়। অর্থাৎ, সময়ের স্বাভাবিক নিয়মে প্রকৃতি তার নিজের মতো করে এগিয়ে চলে।

এরপর আসে এক ভয়ানক যুদ্ধ, যা ‘রক্তের এক আগ্নেয়পাহাড়ের মতো’ সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। শিশু ও বাড়িরা খুন হয়। সমতলে আগুন ধরে যায়। দেবালয়গুলি টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ে। কথকের ফেলে আসা সুন্দর বাড়ি, বারান্দা, ঝুলন্ত বিছানা, গোলাপি গাছ, চিমনি আর প্রাচীন জলতরঙ্গ— সবকিছুই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু এত ধ্বংসস্তূপের মাঝেও সেই মেয়েটির মৃত্যু হয় না। সে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে চিরকাল তার প্রিয়তমের ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকে। যুদ্ধের ধ্বংসলীলা ভালোবাসাকে ধ্বংস করতে পারে না।

নামকরণের তাৎপর্য:

 

সাহিত্যে নামকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা রচনার অন্তরের কথাটি প্রকাশ করে। ‘অসুখী একজন’ কবিতায় কথক তাঁর প্রিয়তমাকে দরজায় দাঁড় করিয়ে রেখে চলে যান। যুদ্ধ এসে পৃথিবীর সমস্ত কিছু ধ্বংস করে দিলেও, মেয়েটির মৃত্যু হয় না। প্রিয় মানুষের জন্য তার এই অন্তহীন অপেক্ষা তাকে এক চিরকালীন বেদনায় ভরিয়ে রাখে। অনন্তকাল ধরে প্রিয়জনের ফিরে আসার আশায় প্রহর গোনা এই মেয়েটি বুকের ভেতর এক পাহাড়সমান দুঃখ নিয়ে বেঁচে থাকে। যুদ্ধ তার সবকিছু কেড়ে নিলেও, তার অপেক্ষাকে কেড়ে নিতে পারেনি। তাই অনন্ত অপেক্ষায় রত এই দুঃখিনী মেয়েটির জীবনবেদনা ও ট্র্যাজেডি বোঝাতেই কবিতার নামকরণ “অসুখী একজন” অত্যন্ত সার্থক ও ব্যঞ্জনাধর্মী হয়েছে।

 

অসুখী একজন 

পাবলো নেরুদা

 (দশম শ্রেণী বাংলা কবিতা)

অসুখী একজন –

পাবলো নেরুদা 

 (সহজ বাংলা অর্থ)

 

স্তবক ১:“আমি তাকে ছেড়ে দিলাম, অপেক্ষায় দাঁড় করিয়ে রেখে দরজায় আমি চলে গেলাম দূর… দূরে। সে জানত না আমি আর কখনো ফিরে আসব না।”

সরল অর্থ: কবিতার কথক (যিনি একজন বিপ্লবী বা যোদ্ধা) তাঁর প্রিয়তমা মেয়েটিকে বাড়ির দরজায় নিজের ফিরে আসার অপেক্ষায় দাঁড় করিয়ে রেখে বহুদূরে চলে যান। মেয়েটি জানত না যে কথক আর কোনোদিন তার কাছে ফিরে আসবেন না। এখানে চিরকালীন এক বিরহ এবং না-ফেরার বেদনার কথা বলা হয়েছে।

 

স্তবক ২:“একটা কুকুর চলে গেল, হেঁটে গেল গির্জার এক নান, একটা সপ্তাহ আর একটা বছর কেটে গেল। বৃষ্টিতে ধুয়ে দিল আমার পায়ের দাগ, ঘাস জন্মাল রাস্তায়।”

 

সরল অর্থ: সময় তার নিজস্ব নিয়মে স্বাভাবিকভাবে বয়ে চলতে থাকে। প্রতিদিনের সাধারণ ঘটনাগুলো ঘটতে থাকে—কুকুর হেঁটে যায়, গির্জার সন্ন্যাসিনী বা নান হেঁটে যান। এভাবেই সপ্তাহ পেরিয়ে বছর কেটে যায়। বৃষ্টির জলে কথকের পায়ের দাগ ধুয়ে মুছে যায় এবং তাঁর চলে যাওয়া সেই রাস্তায় ঘাস জন্মায়। অর্থাৎ, সময়ের প্রলেপে স্মৃতি বা ফেলে যাওয়া চিহ্ন ধীরে ধীরে মুছে যেতে থাকে।

 

স্তবক ৩:“আর একটার পর একটা পাথরের মতো, পরপর পাথরের মতো, বছরগুলো নেমে এল তার মাথার ওপর।”

 

সরল অর্থ: প্রিয় মানুষটির ফিরে আসার আশায় দিন গোনা সেই মেয়েটির কাছে অপেক্ষার প্রতিটি বছর যেন এক-একটি ভারী পাথরের মতো যন্ত্রণাদায়ক হয়ে তার মাথার ওপর নেমে আসে। এখানে অন্তহীন অপেক্ষার তীব্র মানসিক কষ্ট ও সময়ের অসীম বোঝার কথা বোঝানো হয়েছে।

 

স্তবক ৪:“তারপর যুদ্ধ এল, রক্তের এক আগ্নেয়পাহাড়ের মতো। শিশু আর বাড়িরা খুন হল… সেই মেয়েটির মৃত্যু হল না।”

 

সরল অর্থ: এরপর রক্তের আগ্নেয়গিরির মতো ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়ে দেশে যুদ্ধ শুরু হয়। সেই ভয়াবহ যুদ্ধে নিরীহ শিশু এবং সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়, বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু এত ধ্বংসলীলার মাঝেও অপেক্ষারত সেই মেয়েটির মৃত্যু হয় না। কারণ, মেয়েটি হলো শাশ্বত ভালোবাসার প্রতীক, যাকে অস্ত্রের যুদ্ধ ধ্বংস করতে পারে না।

 

স্তবক ৫:“সমস্ত সমতলে ধরে গেল আগুন, শান্ত হলুদ দেবতারা, যারা হাজার বছর ধরে ডুবে ছিল ধ্যানে, উলটে পড়ল টুকরো টুকরো হয়ে, তারা আর স্বপ্ন দেখতে পারল না।”

 

সরল অর্থ: যুদ্ধের লেলিহান আগুনে সমস্ত সমতল ভূমি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। মন্দিরে হাজার বছর ধরে ধ্যানে মগ্ন থাকা শান্ত হলুদ দেবতারাও যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা পান না; তাঁদের মূর্তিও টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ে। অর্থাৎ, এই চরম বিপদের দিনে ঈশ্বর বা প্রচলিত ধর্মও মানুষকে রক্ষা করতে বা শান্তিময় ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে ব্যর্থ হয়।

স্তবক ৬:“সেই মিষ্টি বাড়ি, সেই বারান্দা, যেখানে আমি ঝুলন্ত বিছানায় ঘুমিয়েছিলাম, গোলাপি গাছ, ছড়ানো করতলের মতো পাতা, চিমনি, প্রাচীন জলতরঙ্গ, সব চূর্ণ হয়ে গেল, জ্বলে গেল আগুনে।”

 

সরল অর্থ: কথকের ফেলে আসা সুন্দর ‘মিষ্টি বাড়ি’, বারান্দার ঝুলন্ত বিছানা, গোলাপি রঙের গাছ, হাতের তালুর মতো ছড়ানো পাতা, চিমনি আর প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র (জলতরঙ্গ)—সবকিছুই যুদ্ধের ভয়াবহ আগুনে পুড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ, যুদ্ধের নির্মমতা মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি এবং সাজানো সংসারকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।

 

স্তবক ৭:“যেখানে ছিল শহর, সেখানে ছড়িয়ে রইল কাঠকয়লা, দোমড়ানো লোহা, মৃত পাথরের মূর্তির বীভৎস মাথা, রক্তের একটা কালো দাগ। আর সেই মেয়েটি আমার অপেক্ষায়।”

 

সরল অর্থ: একসময়ের প্রাণবন্ত শহরটি যুদ্ধের পর এক শ্মশান বা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সেখানে কেবল ছড়িয়ে থাকে পোড়া কাঠকয়লা, বাঁকানো লোহা, ভেঙে পড়া মূর্তির বীভৎস মাথা এবং শুকিয়ে কালো হয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। কিন্তু এই ভয়ংকর ধ্বংস, মৃত্যু ও শূন্যতার মাঝেও সেই মেয়েটি কথকের ফিরে আসার আশায় চিরকাল অপেক্ষা করে থাকে। মানুষের ভালোবাসা এবং অনন্ত অপেক্ষার মৃত্যু কোনো যুদ্ধই ঘটাতে পারে না।

 

অসুখী একজন 

পাবলো নেরুদা

 (দশম শ্রেণী বাংলা কবিতা)

অসুখী একজন কবিতার প্রশ্ন উত্তর

  অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

(MCQ & VSAQ)

 

১. ‘অসুখী একজন’ কবিতাটি কার লেখা এবং বাংলায় কে তর্জমা করেছেন?
উত্তর: কবিতাটি চিলির কবি পাবলো নেরুদার লেখা এবং বাংলায় তর্জমা করেছেন নবারুণ ভট্টাচার্য।

২. কবিতাটি কোন কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে?
উত্তর: নবারুণ ভট্টাচার্য অনূদিত ‘বিদেশি ফুলে রক্তের ছিটে’ কাব্যগ্রন্থ থেকে।

৩. “আমি তাকে ছেড়ে দিলাম” — কথক কাকে কোথায় ছেড়ে দিয়েছিলেন?
উত্তর: কথক তাঁর প্রিয়তমা মেয়েটিকে তাঁর জন্য অপেক্ষায় রেখে বাড়ির দরজায় ছেড়ে দিয়েছিলেন।

৪. “তারপর যুদ্ধ এল” — যুদ্ধ কীভাবে এসেছিল?
উত্তর: যুদ্ধ রক্তের এক আগ্নেয়পাহাড়ের মতো ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে এসেছিল।

৫. যুদ্ধে কাদের মৃত্যু হল?
উত্তর: ভয়ংকর যুদ্ধে শিশু আর বাড়িরা খুন হল, অর্থাৎ সাধারণ নিরীহ মানুষ ও শিশুদের মৃত্যু হল।

৬. “সব চূর্ণ হয়ে গেল, জ্বলে গেল আগুনে।” — কী কী চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল?
উত্তর: কথকের মিষ্টি বাড়ি, বারান্দা (যেখানে তিনি ঝুলন্ত বিছানায় ঘুমোতেন), গোলাপি গাছ, ছড়ানো করতলের মতো পাতা, চিমনি এবং প্রাচীন জলতরঙ্গ যুদ্ধের আগুনে চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।

৭. “সেই মেয়েটির মৃত্যু হলো না।” — কেন মেয়েটির মৃত্যু হলো না?
উত্তর: মেয়েটি হলো ভালোবাসার প্রতীক। যুদ্ধের মতো ভয়ংকর ধ্বংসলীলা পার্থিব সবকিছু ধ্বংস করতে পারলেও মানুষের শাশ্বত ভালোবাসা ও অনন্ত অপেক্ষাকে ধ্বংস করতে পারে না। তাই মেয়েটির মৃত্যু হলো না।

৮. ‘অসুখী একজন’ কবিতায় ‘অসুখী’ কে?
উত্তর: কবিতায় ‘অসুখী’ হলো সেই মেয়েটি, যে তার প্রিয়জনের ফিরে আসার আশায় অনন্তকাল ধরে দরজায় অপেক্ষা করে আছে।

 

অসুখী একজন 

পাবলো নেরুদা

 (দশম শ্রেণী বাংলা কবিতা)

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর

(মান – ৩)

 

১. “সেই মেয়েটির মৃত্যু হলো না।” – কোন্ মেয়েটির কথা বলা হয়েছে? তার মৃত্যু হলো না কেন?

 

উত্তর: চিলির নোবেলজয়ী কবি পাবলো নেরুদা রচিত এবং নবারুণ ভট্টাচার্য অনূদিত ‘অসুখী একজন’ কবিতায় কথক যাঁকে দরজায় অপেক্ষায় রেখে বহুদূরে চলে গিয়েছিলেন, এখানে সেই মেয়েটির কথা বলা হয়েছে।

 

মৃত্যু না হওয়ার কারণ: যুদ্ধ আসার ফলে রক্তের আগ্নেয়পাহাড়ের মতো সব ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। শিশু আর সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, সমতলে আগুন ধরে গিয়েছিল, এমনকি দেবালয়ের দেবতারাও চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এত ধ্বংসের মাঝেও মেয়েটির মৃত্যু হয়নি, কারণ মেয়েটি হলো মানুষের শাশ্বত ভালোবাসা ও চিরন্তন অপেক্ষার প্রতীক। যুদ্ধ মানুষের ঘরবাড়ি, সভ্যতা বা প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের অকৃত্রিম ভালোবাসাকে ধ্বংস করতে পারে না।

 

২. “তারা আর স্বপ্ন দেখতে পারল না।” – ‘তারা’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে? তারা স্বপ্ন দেখতে পারল না কেন?

 

উত্তর: আলোচ্য অংশে ‘তারা’ বলতে দেবালয়ে থাকা শান্ত হলুদ দেবতাদের কথা বোঝানো হয়েছে, যাঁরা হাজার বছর ধরে ধ্যানে ডুবে ছিলেন।

 

স্বপ্ন দেখতে না পারার কারণ: হাজার বছর ধরে মানুষ ওই দেবতাদের পুজো করে এসেছে এবং বিশ্বাস করে এসেছে যে দেবতারা তাদের রক্ষা করবেন, ভালো রাখবেন, অর্থাৎ শান্তিময় ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু যখন রক্তের আগ্নেয়পাহাড়ের মতো ভয়ংকর যুদ্ধ এল, তখন সেই দেবালয়গুলিও টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ল। দেবতারাও এই ধ্বংসলীলা থেকে নিজেদের বা সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে পারলেন না। তাই মানুষের মনে দেবতাদের প্রতি যে অন্ধ বিশ্বাস ছিল, তা ভেঙে গেল। এই কারণেই বলা হয়েছে, দেবতারা আর স্বপ্ন দেখতে পারলেন না।

 

৩. “যেখানে ছিল শহর / সেখানে ছড়িয়ে রইল কাঠকয়লা” – শহর কীভাবে কাঠকয়লায় পরিণত হলো?

 

উত্তর: ‘অসুখী একজন’ কবিতায় যুদ্ধের এক ভয়ংকর ধ্বংসাত্মক রূপ ফুটে উঠেছে। যুদ্ধ আসার আগে শহরটি ছিল প্রাণবন্ত। কথকের মিষ্টি বাড়ি, বারান্দা, গোলাপি গাছ, চিমনি আর প্রাচীন জলতরঙ্গ নিয়ে এক সুন্দর পরিবেশ ছিল সেখানে। কিন্তু যুদ্ধ আসার পর তা এক মুহূর্তে বদলে যায়। যুদ্ধের ভয়াবহ আগুনে সবকিছু ভস্মীভূত হয়ে যায়। বাড়িঘর, দেবালয় থেকে শুরু করে প্রকৃতি—সবকিছুই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। যুদ্ধের লেলিহান শিখায় পুড়ে গোটা শহরটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, এবং সেই ধ্বংসের চিহ্নস্বরূপ সেখানে কেবল কাঠকয়লা, দোমড়ানো লোহা আর পাথরের মূর্তির বীভৎস মাথা ছড়িয়ে থাকে।

 

অসুখী একজন 

পাবলো নেরুদা

 (দশম শ্রেণী বাংলা কবিতা)

রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

(মান – ৫)

 

১. “আর সেই মেয়েটি আমার অপেক্ষায়।” – ‘অসুখী একজন’ কবিতা অবলম্বনে মেয়েটির অপেক্ষার যে মর্মান্তিক ছবি ফুটে উঠেছে, তা নিজের ভাষায় লেখো।

উত্তর: পাবলো নেরুদার ‘অসুখী একজন’ কবিতায় যুদ্ধের পটভূমিতে এক চিরন্তন প্রেমের এবং অনন্ত অপেক্ষার ছবি মর্মস্পর্শী ভাষায় ফুটে উঠেছে।

 

অপেক্ষার সূচনা: কবিতার শুরুতে আমরা দেখি, কথক তাঁর প্রিয়তমা মেয়েটিকে বাড়ির দরজায় দাঁড় করিয়ে রেখে বহু দূরে চলে যান। মেয়েটি জানত না যে কথক আর কখনো ফিরে আসবেন না। প্রিয় মানুষটির ফিরে আসার আশায় তার অপেক্ষা শুরু হয়।

 

সময়ের প্রবহমানতা: মেয়েটির অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর কেটে যায়। বৃষ্টির জলে কথকের পায়ের দাগ ধুয়ে যায়, সেখানে ঘাস জন্মায়। প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে বদলাতে থাকে, কিন্তু মেয়েটির অপেক্ষার কোনো শেষ হয় না।

 

যুদ্ধের ধ্বংসলীলা ও অটুট ভালোবাসা: এরপর আসে ভয়ংকর যুদ্ধ, যা রক্তের এক আগ্নেয়পাহাড়ের মতো সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। শিশু ও বাড়িরা খুন হয়, সমতলে আগুন ধরে যায়, দেবালয় ভেঙে পড়ে। কথকের ফেলে আসা সুন্দর বাড়ি এবং শহরের সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ধ্বংসলীলা মেয়েটির মৃত্যু ঘটাতে পারে না।

 

অপেক্ষার মর্মান্তিক পরিণতি: যুদ্ধ সমস্ত পার্থিব বস্তুকে ধ্বংস করতে পারলেও মেয়েটির বুকের ভেতরের ভালোবাসাকে ধ্বংস করতে পারে না। সে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে চিরকাল তার প্রিয়তমের ফিরে আসার আশায় বুক বেঁধে থাকে। অনন্তকাল ধরে এই প্রিয়জনের জন্য প্রহর গোনা এবং তার এই বেদনাময় অপেক্ষাই কবিতায় অত্যন্ত মর্মান্তিক হয়ে উঠেছে।

২. ‘অসুখী একজন’ কবিতায় যুদ্ধের যে ভয়াবহ ধ্বংসলীলার ছবি ফুটে উঠেছে, তা বর্ণনা করো।

উত্তর: বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি পাবলো নেরুদার ‘অসুখী একজন’ কবিতায় যুদ্ধের এক চরম ভয়াবহ ও সর্বগ্রাসী রূপ তুলে ধরা হয়েছে, যা মানবসভ্যতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।

 

যুদ্ধের আগমন: কবিতায় যুদ্ধকে ‘রক্তের এক আগ্নেয়পাহাড়’-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আগ্নেয়গিরি থেকে যেমন লাভা বেরিয়ে চারপাশ ছাই করে দেয়, যুদ্ধও ঠিক তেমনি ধ্বংসের বার্তা নিয়ে আসে।

 

প্রাণের বিনাশ: যুদ্ধ শুরু হতেই সমতলে আগুন ধরে যায়। যুদ্ধের এই নির্মম আঘাতেই সাধারণ নিরীহ মানুষ এবং নিষ্পাপ শিশুদের মৃত্যু হয়। অর্থাৎ, যুদ্ধ মানবতাকে চরম আঘাত করে।

 

বিশ্বাস ও ধর্মের বিপর্যয়: যুদ্ধের হাত থেকে ধর্ম বা দেবতারাও রক্ষা পান না। হাজার বছর ধরে ধ্যানে মগ্ন থাকা শান্ত হলুদ দেবতারা মন্দির থেকে টুকরো টুকরো হয়ে উলটে পড়ে। এর অর্থ হলো, মানুষের চিরাচরিত বিশ্বাস ও ভরসার জায়গাও যুদ্ধের ভয়াবহতায় ধুলিসাৎ হয়ে যায়।

 

স্মৃতি ও বাসস্থানের ধ্বংস: কথকের ফেলে আসা সুন্দর ‘মিষ্টি বাড়ি’, ঝুলন্ত বিছানা, গোলাপি গাছ, ছড়ানো পাতার মতো গাছ, চিমনি আর প্রাচীন জলতরঙ্গ—সবকিছুই যুদ্ধের আগুনে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়।

 

শহরের পরিণতি: একসময়ের প্রাণবন্ত শহরটি যুদ্ধের শেষে এক শ্মশানে পরিণত হয়। সেখানে কেবল ছড়িয়ে থাকে কাঠকয়লা, দোমড়ানো লোহা আর পাথরের মূর্তির বীভৎস মাথা। আর এই সবকিছুর ওপর জমে থাকে রক্তের এক কালো দাগ, যা যুদ্ধের নির্মমতার চিরস্থায়ী প্রমাণ।

 

আজকের এই পোস্ট এর মধ্যে অসুখী একজন কবিতার উৎস, সারাংশ, নামকরণের সার্থকতা, সহজ বাংলা ভাষায় লাইন ধরে অর্থ আলোচনা করা হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের সুবিধার্থে কিছু প্রশ্ন উত্তর সহজ ভাষায় করে দেওয়া হয়েছে।

 

SOURCE-EDT

©Kamaleshforeducation.in (2023)

error: Content is protected !!
Scroll to Top