প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ:

বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ প্রশ্ন উত্তর (২/৪/৮ মার্কস)

Class 10 History Chapter 3 Question Answer

Published on: 

দশম শ্রেণীর ইতিহাসের তৃতীয় অধ্যায় ‘প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ’ (History Chapter 3) এর মধ্যে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের বিভিন্ন কৃষক ও উপজাতি বিদ্রোহ, যেমন—সাঁওতাল, কোল, মুন্ডা বা নীল বিদ্রোহের ইতিহাস এই অংশে খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আজকের পর্বে এই চ্যাপ্টার থেকে বাছাই করা ২/৪/৮ মার্কসের কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-উত্তর সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো।

 

বোর্ড: বিষয়বস্তু

1 প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ Class 10 প্রশ্ন উত্তর | দশম শ্রেণির ইতিহাস তৃতীয় অধ্যায় প্রশ্ন উত্তর

1.1 মাধ্যমিক ইতিহাস তৃতীয় অধ্যায় 4 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | ক্লাস ১০ প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ 4 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর

1.2 মাধ্যমিক ইতিহাস তৃতীয় অধ্যায় বড়ো প্রশ্ন উত্তর | প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ ৮ মার্কস প্রশ্ন উত্তর

প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ

দশম শ্রেণির ইতিহাস তৃতীয় অধ্যায় প্রশ্ন উত্তর

 

উত্তর: মার্কসবাদী ঐতিহাসিক রজনীপাম দত্ত, জহরলাল নেহেরু, রমেশচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ মহাবিদ্রোহকে রক্ষণশীল ও সামন্ততান্ত্রিক বিদ্রোহ বলেছেন। কারণ, ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে কিছু রাজ্যচ্যুত সামন্ত রাজা, ভূমিচ্যুত জমিদার ও তালুকদার নেতৃত্ব দিয়েছিল। এদের লক্ষ্য ছিল হৃত রাজ্য ও জমিদারি পুনরুদ্ধার।

 

উত্তর: শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটি বড় অংশ মনে করত ব্রিটিশ শাসন ভারতের পক্ষে কল্যাণকর। কলকাতার বিশিষ্ট ব্যক্তি কিশোরী চাঁদ মিত্র, শম্ভুচন্দ্র মুখার্জী এবং হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রমুখের মতে–১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ছিল মূলত সৈনিকদের বিদ্রোহ। এর সঙ্গে সাধারণ জনগণের যোগ ছিল না। হিন্দু ও মুসলমানের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ও মহামেডান অ্যাসোসিয়েশন সিপাহী বিদ্রোহের বিরোধিতা করে।

 

উত্তর: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মহাবিদ্রোহের পরিপ্রেক্ষিতে মহারানীর ঘোষণাপত্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল– ১) কোম্পানির অপশাসনের অবসান ঘটিয়ে ব্রিটিশ রাজশক্তি কর্তৃক ভারতের প্রত্যক্ষ শাসনভার গ্রহণ করা। (২) ব্রিটিশ সরকারের নতুন নীতি ও আদর্শের সঙ্গে ভারতবাসীর যোগ সাধন ঘটানো।

 

উত্তর: সিপাহী বিদ্রোহের বিভিন্ন কারনগুলির মধ্যে প্রত্যক্ষ কারণ ছিল এনফিল রাইফেলে ব্যবহৃত কার্তুজ। এনফিল্ড রাইফেলের টোটার মুখে গরু ও শুয়োরের চর্বি মাখানো এক ধরনের মোরক দিয়ে ঢাকা থাকতো। রাইফেলে এই টোটা ভর্তি করার সময় মোরকটি দাঁত দিয়ে ছিঁড়তে হতো। এতে ভারতীয় মুসলমান ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের সিপাহীরাই ধর্মনাশের আশঙ্কায় বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।

 

উত্তর: লর্ড ডালহৌসি ভারতে স্বত্ববিলোপ নীতির প্রয়োগের মাধ্যমে ঝাঁসির রাজ্য দখল করলে প্রতিবাদে ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ সিপাহী বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁতিয়া তোপি ও ঝাঁসির রানী যুগ্মভাবে গোয়ালিয়র দখল করেন। শেষ পর্যন্ত ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ১৮ জুন রানী লক্ষ্মীবাঈ যুদ্ধক্ষেত্রে পান বিসর্জন দেন। রানী পরাজিত ও নিহত হলেও, ঐতিহাসিক, লেখক, চলচ্চিত্রকারগণ তার বীরত্বের কাহিনী বিভিন্নভাবে তুলে ধরেছেন। তাই তিনি বিখ্যাত ও চিরস্মরণীয়।

 

উত্তর: উনিশ শতকে ব্রিটিশদের উদ্যোগে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটে এবং ভারতবর্ষের মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের মানুষ শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি জাতীয়তাবাদের উদ্দীপিত হয়ে ওঠে। মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় উপলব্ধি করে যে ব্যক্তিগতভাবে বিচ্ছিন্ন আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করা সম্ভব নয়। এর একমাত্র উপায় হলো ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন। এই উদ্দেশ্যে সেই সময় বাংলা, মাদ্রাজ ও বোম্বেতে অনেক সভা-সমিতি গড়ে ওঠে। এই কারণে ড. অনিল শীল উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধকে সভা-সমিতির যুগ বলেছেন।

 

উত্তর: ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেশন আইন অনুসারে নিষ্কর ভূমির উপর কর গ্রহণ করা শুরু হলে, তার প্রতিবাদে টাকির জমিদার কালীনাথ রায়চৌধুরী, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রমুখের উদ্যোগে বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা গড়ে ওঠে। যেসব রাজকার্যের সঙ্গে ভারতবাসীর ভালো-মন্দের ঘনিষ্ঠ যোগ তারই আলোচনা ও বিবেচনা এই সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল।  এর প্রধান অধিবেশন বসে ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দের ৮ ডিসেম্বর, গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশের সভাপতিত্বে।

 

উত্তর: উনবিংশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্য শিক্ষা, নবজাগরণ, সমাজ সংস্কার আন্দোলন ও ইংরেজদের সাম্রাজ্যবাদী শাসনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় জন্ম নিয়েছিল রাজনৈতিক সচেতনতা। তাই তৎকালীন রাজনৈতিক বিষয়গুলি নিয়ে আলাপ-আলোচনার জন্য বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভার জন্ম হয়েছিল। রাজনৈতিক কার্যকলাপ ও চিন্তাভাবনার দিক থেকে এটাই প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানটির ত্রুটি বিচ্যুতি থাকলেও এর অবদানকে অস্বীকার করা যায় না।    তাই যোগেশচন্দ্র বাগলের ভাষায় বাঙালির তথা ভারতবর্ষের মধ্যে সর্বপ্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হল বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা।

 

উত্তর: ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে ফৌজদারি আইন অনুযায়ী কোন ভারতীয় বিচারক ইউরোপীয়দের বিচার করতে পারতেন না। লর্ড রিপন বিচারব্যবস্থায় জাতিভেদ মূলক বৈষম্য দূর করার জন্য তার আইন পরিষদের সদস্য ইলবার্টকে একটি বিল তৈরি করতে বলেন। এতে ভারতীয় বিচারকদের ইউরোপীয় বিচারকদের সমান মর্যাদা, সম্মান ও ক্ষমতা দিয়ে ইলবার্ট যে বিল রচনা করেন তা ইলবার্ট বিল নামে পরিচিত।

 

উত্তর: জনমত গঠনের ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী সংবাদ মাধ্যম হলো সংবাদপত্র। ব্রিটিশ শাসনকালে দেশীয় ভাষায় সংবাদপত্র গুলি ব্রিটিশ বিরোধী সমালোচকের ভূমিকা পালন করেছিল। দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলির টুটি টিপে ধরে ভারতবাসীর কন্ঠ রোধ করার জন্য লর্ড লিটন দেশীয় ভাষায় সংবাদপত্র আইন বা ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট জারি করেন। শেষপর্যন্ত ভারতসভার আন্দোলনের চাপে লর্ড রিপন এই আইনটি সংশোধন করে নেয়।

 

উত্তর: লর্ড লিটনের আমলে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার্থীদের বয়স ২১ বছর থেকে কমিয়ে ১৯ বছর করা হলে এর প্রতিবাদে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হয়। একজন ১৯ বছরের ভারতীয় ছাত্রের পক্ষে বিদেশে গিয়ে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বসা ছিল কার্যত একটি কঠিন বিষয়। তাই ভারতসভার তরফে ইংল্যান্ড ও ভারতের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা গ্রহনের ক্ষেত্রে এবং পরীক্ষার্থীদের বয়স ২২ বছর করার দাবি তোলা হয়।  ইংরেজ সরকার ভারতীয়দের এই দাবি মেনে বয়স সংশোধন করে ২১ বছর করেন।

 

উত্তর: চিত্রশিল্পের অন্যতম শাখা রূপে ব্যঙ্গচিত্রে মূলত তীর্যক বা ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে প্রচলিত সামাজিক রীতি-নীতি, ত্রুটি-বিচ্যুতি ও মানুষের ইংরেজ অনুকরণ প্রভৃতি শিল্পীর ছবিতে ব্যঙ্গের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। শিল্পী শহুরে জীবনের বাঙালি বাবুদের কৃত্রিম সাহেবিয়ানা বা ইংরেজি সংস্কৃতি অনুকরণে তীব্র সমালোচনা করেন। যেমন– সংকর জাতের বাঙালি প্রভৃতি।

 

উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে বন্দেমাতরম সংগীতটি দেশ মাতার বন্দনা গীত রূপে রচনা করেন যা পড়ে আনন্দমঠ উপন্যাসের অন্তর্ভুক্ত হয় বঙ্কিমচন্দ্র রচিত আনন্দমঠ উপন্যাসের সন্তান দলের মন্ত্র ছিল বন্দেমাতারাম সংগীত যা ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবীদের বীজ মন্ত্র বন্দেমাতরম সংগীতে সুর দেন যদু ও এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে এই গানটি গাওয়া হয় ।

 

উত্তর: গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে ভারতবাসীর মনে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটান। তার এই ব্যঙ্গচিত্রের বৈশিষ্ট্য গুলি হল – ক) গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর তা ব্যঙ্গচিত্র গুলি প্রধানত লিথোগ্রাফ পদ্ধতিতে এঁকেছেন যা মূলত সমালোচনা মূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে অঙ্কিত। (খ) দেশের পরাধীনতার মর্মবেদনা ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। যা দিয়ে ভারতবাসীর মধ্যে জাতীয়তাবোধকে জাগাতে চেষ্টা করেন।

15. মঙ্গল পান্ডে কেন স্মরণীয়?

উত্তর: মঙ্গল পান্ডে ছিলেন ব্যারাকপুর সেনা ছাউনির ৩৪ নম্বর নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির একজন সিপাহী। তিনি প্রথম গরু ও শুকরের চর্বি মিশ্রিত এনফিল্ড রাইফেলের টোটার মোরক দাঁতে কাটতে অস্বীকার করেন। এর বিরুদ্ধে ১৮৫৭ সালে ২৯ শে মার্চ তিনি প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। অতঃপর তাকে গ্রেফতার করা হলে বিদ্রোহের আগুন অন্যান্য ছাউনিতে ছড়িয়ে পড়ে। ৮ এপ্রিল বিচারে ফাঁসি হয় তার। এবং তিনি ছিলেন সিপাহী বিদ্রোহের প্রথম নায়ক ও শহীদ।

 

উত্তর: ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের অন্যতম নায়ক ছিলেন পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও এর দত্তক পুত্র কানপুরের নানাসাহেব। তার আসল নাম গোবিন্দ ধন্দু পন্থ। কানপুর সহ উত্তর প্রদেশের নানা স্থানে তার নেতৃত্বে বিদ্রোহ পরিচালিত হয়। এক্ষেত্রে তাকে বিশেষভাবে সহায়তা করেন তারই বিশ্বস্ত অনুচর তাঁতিয়া তোপি। দিল্লির পতন হলে তিনি নেপালের জঙ্গলে পালিয়ে যান। তবে তার শেষ জীবন অজ্ঞাত হলেও রাজ্য উদ্ধারে তার প্রচেষ্টা তাকে স্মরণীয় করে রেখেছে।

 

উত্তর: ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবোধ ও রাজনৈতিক চেতনা জাগরণ ঘটানোর উদ্দেশ্যে শিশির কুমার ঘোষ, হেমন্ত কুমার ঘোষ, কৃষ্ণমোহন বন্দোপাধ্যায় ও শম্ভু চন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রমূখ ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে গড়ে তোলেন ইন্ডিয়ান লিগ। এই সংস্থার মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষার জন্য বিদ্যালয় স্থাপন, জনগণ কর্তৃক কলকাতা পৌরসভার সদস্য নির্বাচনের দাবি জোরদার হয়। স্বল্পস্থায়ী হলেও ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলনে এই সভার গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

 

উত্তর: উদারপন্থী শাসক লর্ড রিপন তার আইন সচিব ইলবার্ট এর মাধ্যমে ভারতীয় বিচার ব্যবস্থায় বৈষম্য দূর করার জন্য একটি বিল প্রস্তুত করেন। এটি ইলবার্ট বিল নামে পরিচিত।

 

ইলবার্ট বিলের সংশোধন: এই বিলে ভারতীয় বিচারকদের শ্বেতাঙ্গদের বিচারের অধিকার দান করা হলে, শাসক জাতি শ্বেতাঙ্গরা তা মানতে অস্বীকার করে। কলকাতা হাইকোর্টের ব্যারিস্টার ব্রানসনের নেতৃত্বে এর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে ‘ডিফেল অ্যাসোসিয়েশন’। ভারত ও ইংল্যান্ডের ইংরেজরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করে। বাধ্য হয়ে লর্ড রিপন জুড়ি ব্যবস্থা প্রবর্তন করে ইলবার্ট বিল সংশোধনের মাধ্যমে শ্বেতাঙ্গদের অধিপত্য মেনে নেন। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ভারতসভা এই বিলের স্বপক্ষে তীব্র আন্দোলন করে।

 

উত্তর: ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থে স্বামী বিবেকানন্দ বৈদিক যুগ থেকে ব্রিটিশ শাসনকাল পর্যন্ত ভারতের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস আলোচনা ও ব্যাখ্যা করেছেন। এর মধ্যে দিয়ে দেখিয়েছেন ইতিহাস শ্রেণীর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। ভারতের চতুর্বর্ণের মধ্যে সংঘাতের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন প্রথমে ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা পরে ক্ষত্রিয়রা সর্বশেষে বৈশ্যরা সমাজে নিজেদের প্রাধান্য স্থাপন করেছে। কিন্তু যাদের শারীরিক পরিশ্রমের ফলে ব্রাহ্মণের প্রাধান্য ক্ষত্রিয়ের শক্তি বৈশ্যের সম্পদ প্রভৃতি বৃদ্ধি পেয়েছে, তারা আজ অবহেলিত, ‘ভারবাহি পশু, চলমান শশ্মানে’-এ পরিণত হয়েছে। তিনি ভবিষ্যৎবাণী করেছেন চক্রাকারে পহে শূদ্রের জাগরণ ও অধিপত্য অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হবে।

 

উত্তর: বাংলা চিত্রশিল্প ও কার্টুন শিল্পের ক্ষেত্রে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। তিনি বিভিন্ন ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক সমাজের তীব্র আলোচনা করেছেন। এছাড়া এগুলিতে বাঙালি চরিত্রের নানা দিক, বাঙালির ইংরেজ প্রীতি ও ঔপনিবেশিক শাসনের বিভিন্ন দিক ইত্যাদির কথা তুলে ধরেছেন। তিন খন্ডে প্রকাশিত ‘অদ্ভুত লোক’, ‘বিরুপ বস্ত্র’, ‘নয়া হুল্লোর’ গ্রন্থে তার ব্যঙ্গচিত্র গুলি অন্তর্ভুক্ত। এগুলি প্রবাসী ও মর্ডান রিভিউ প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি গড়ে তোলেন ‘ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট’ (১৯০৭ খ্রী.) নামক এক শিল্প প্রতিষ্ঠান।

 

উত্তর: ১৯ শতকে একদিকে ব্রিটিশের শোষণ ও অত্যাচার বৃদ্ধি অপরদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ও জাতীয়তাবাদের উন্মেষ প্রভৃতির ফলে ভারতীয়রা সংঘবদ্ধ হয়ে আন্দোলনের করে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বহু সভা সমিতি গড়ে ওঠে। তাই কেম্ব্রিজ বিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ড. অনিল শীল উনবিংশ শতাব্দীকে ‘সভা সমিতির যুগ’ নামে অভিহিত করেছেন।

 

উত্তর: ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ১ নভেম্বর ইংল্যান্ডের মহারানী ভিক্টোরিয়া ভারতের শাসন সংক্রান্ত বিষয়ে একটি আইন পাস করে যা মহারানীর ঘোষণাপত্র নামে পরিচিত। এতে বলা হয় – (ক) ব্রিটিশ সরকার অতঃপর ভারতীয়দের  ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যাপারে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করবে না। (খ) জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি যোগ্যতা সম্পন্ন ভারতীয়ই সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত হতে পারবে। (গ) এতে স্বত্ববিলোপ নীতি পরিত্যাক্ত হয় ও দেশীয় রাজাদের দত্তপুত্র গ্রহণের অধিকার দান করা হয়। (ঘ) সরকার ভারতে আর সাম্রাজ্য বিস্তার করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। (ঙ) দেশীয় রাজ্যগুলির সঙ্গে কোম্পানির স্বাক্ষরিত চুক্তি মেনে চলার আশ্বাস দেওয়া হয় ইত্যাদি। বলা বাহুল্য প্রতিশ্রুতি গুলি ঘোষণা পত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল, সেগুলো পালন করা হয়নি।

মাধ্যমিক ইতিহাস তৃতীয় অধ্যায়  

 প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ

4 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর

 

1. ঔপনিবেশিক অরণ্য আইন কী? ব্রিটিশ সরকার কি উদ্দেশ্যে এ আইন প্রণয়ন করেছিল?  ১+৩

উত্তর : ভারত ছিল ব্রিটেনের উপনিবেশ। ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর ব্রিটিশ সরকার ভারতে অরণ্য সম্পদের উপর ভারতীয়দের অধিকার খর্ব করে সরাসরি নিজেদের অধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে, ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে ও ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে কতগুলি আইন প্রণয়ন করেন যা ঔপনিবেশিক অরন্য আইন নামে পরিচিত।

 

◾️ ঔপনিবেশিক অরণ্য আইন প্রবর্তনের উদ্দেশ্য :- ঔপনিবেশিক অরণ্য আইন প্রবর্তনের পিছনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা সক্রিয় ছিল—

 

১) অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য :– অরণ্য আইন প্রবর্তনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতে বিশাল বনভূমিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে তা ব্রিটিশ অর্থনীতির স্বার্থে ব্যবহার করা।

 

২) সামরিক উদ্দেশ্য :— অরণ্য আইন প্রবর্তনের পিছনে ব্রিটেনের সামরিক কারণ দায়ী ছিল। ইংল্যান্ডের রাজকীয় নৌ-বাহিনীর জন্য জাহাজ তৈরির প্রয়োজনীয় কাঠের অন্যতম সরবরাহ ক্ষেত্র ছিল এই ভারতীয় অরণ্য।

 

৩) কৃষিযোগ্য জমি বৃদ্ধি :— ইংরেজরা বনভূমি পরিষ্কার করে কৃষিযোগ্য জমির পরিমাণ বৃদ্ধি করতে চেয়েছিল যাতে রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে সরকারের আয় বৃদ্ধি পায়।

 

৪) রেলপথের প্রসার :— তৎকালীন গ্যারান্টি প্রথার মাধ্যমে যে সকল রেলওয়ে কোম্পানি ভারতে রেলপথ বিস্তারে কাজ করছিল তাদের রেল লাইনের স্লিপার ও অন্যান্য অংশ তৈরির জন্য প্রচুর কাঠের প্রয়োজন ছিল সেই কাঠের জোগানের জন্য অরন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল।

 

উপসংহার : সার্বিকভাবে বলা যায় ব্রিটিশ সরকার নিজেদের স্বার্থে উপনিবেশিক অরণ্য আইন প্রণয়ন করেছিল। ভারতীয় অরণ্য সম্পদের উপর সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করায় ছিল এর উদ্দেশ্য। তার কারণে অরণ্যচারী উপজাতি সম্প্রদায় অরণ্যের উপর তাদের চিরাচরিত অধিকার হারায়।

 

2. চুয়াড় বিদ্রোহের বিবরণ দাও। 

উত্তর ব্রিটিশ কোম্পানির শাসনকালে মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ধলভুম ও বর্তমান ঘাটশিলা নিয়ে জঙ্গলমহল গঠিত ছিল। এই অঞ্চলের অধিকাংশ কৃষিজীবীরা চুয়াড় নামে পরিচিত ছিল। ব্রিটিশ শাসকদের শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে ধলভূমের জমিদার জগন্নাথ সিংহ বিদ্রোহের সূচনা করেন।

 

১) উচ্চহারে রাজস্ব আদায় :– ব্রিটিশ কোম্পানির নতুন ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থায় মাধ্যমে চুয়াড়দের জমির উপর উচ্চহারে রাজস্ব ধার্য করে, ফলে তারা ক্ষিপ্ত হয়।

 

২) পাইকান জমি হাতছাড়া :– চুয়াররা জমিদারদের অধীনে বা সৈনিকের কাজ করত। বেতনের পরিবর্তে তারা নিষ্কর জমি ভাগ পেতো। এইসব জমিকে পাইকান জমি বলা হত কিন্তু ঔপনিবেশিক আইন চালু হলে চুয়াররা তাদের পাইকার জমি হারায় ফলে তাদের জীবিকা নির্বাহ দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

 

৩) অত্যাচার :– কোম্পানির রাজস্ব আদায়কারী কর্মচারীরা রাজস্ব আদায়ের নামে চুয়াড়দের উপর নির্মম অত্যাচার শুরু করলে চুয়াড়রা স্থানীয় জমিদারের নেতৃত্ব ঐক্যবদ্ধ হয়।

 

◾️বিদ্রোহের বিস্তার :– ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে চুয়াড় বিদ্রোহ ব্যাপক আকার ধারন করে জঙ্গল-মহলসহ মেদনীপুর জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিদ্রোহকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রাইপুরের জমিদার দুর্জন সিংহ, মেদনীপুরের রানি শিরোমনি প্রমুখ। তারা সমবেতভাবে মেদিনীপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে আক্রমন চালায়। বিদ্রোহীরা একে একে কাশিজোর, বাসুদেবপুর, তমলুক, জলেশ্বর, বলরামপুর, প্রভৃতি পরগনায় আক্রমন ও লুঠ চালাতে থাকে। বিদ্রোহীদের আক্রমণের হাত থেকে সরকারি দপ্তরও বাদ যায়নি।

 

◾️বিদ্রোহের অবসান :– বিদ্রোহীদের চাপে ইংরেজ পুলিশ ও কর্মচারিরা বিদ্রোহের মূল কেন্দ্র রায়পুর ছেড়ে পালিয়ে গেলেও শীঘ্রই সমস্ত ব্রিটিশ সেনাবাহিনী জমিদার ও চুয়াড়দের পরাজিত করে। রানি শিরোমণিকে হত্যা করে এবং দুর্জন সিংহকে গ্রেফতার করে এর ফলে বিদ্রোহ থেমে যায়।

 

◾️গুরুত্ব :– চুয়াড় বিদ্রোহ ব্যার্থ হলেও এই বিদ্রোহের পর চূয়াড়দের নিয়ন্ত্রনে আনার উদ্দেশ্যে বিট্রিশ সরকার চুয়াড় অধুষ্যিত এলাকায় শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। এছাড়া তাদের রাজস্বের পরিমান কমায়। বিষ্ণুপুর শহরটিকে কেন্দ্র করে দুর্গম বনাঞ্চল নিয়ে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ‘জঙ্গলমহল’ নামে একটি পৃথক জেলা গড়ে ওঠে।

 

3. ঊনিশ শতকে বাংলার সমাজ সংস্কার আন্দোলন সম্পর্কে বর্ণনা দাও। 

উত্তর : উনিশ শতকে পাশ্চাত্য চিন্তাধারায় সংস্পর্শে এসে বাংলার প্রগতিশীল উদারপন্থী গণ কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন, যা সমাজ সংস্কার আন্দোলন নামে পরিচিত।

 

 

১.) রাজা রামমোহন ও সতীদাহ প্রথা বিরোধী আন্দোলন :— ভারতের সমাজ সংস্কার আন্দোলনের পথিকৃত ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। মনুসংহিতা ও অন্যান্য শাস্ত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি প্রমাণ করেন যে শাস্ত্রে বিধবাদের পুড়িয়ে মারার কোন নিয়ম নেই। রামমোহন রায় সংবাদ কৌমুদি পত্রিকা প্রকাশ করে সতীদাহ প্রথার তীব্র বিরোধিতা করেন। বড়লার লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে ১৭ নম্বর রেগুলেশন আইন জারি করে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন।  রামমোহন নারীদের সম্পত্তি উত্তরাধিকারের স্বীকৃতি সমর্থন এবং পুরুষদের বহুবিবাহের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন। তিনি জাতিভেদ প্রথার বিরোধী ছিলেন ও অসবর্ণ বিবাহের সমর্থনে ছিলেন।

 

২.) ব্রাহ্ম সমাজের সমাজ সংস্কার আন্দোলন :– রামমোহন প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মসমাজ পরবর্তীকালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে বিভিন্ন সমাজ সংস্কার আন্দোলন গড়ে তোলে। কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে ব্রাহ্মসমাজের আন্দোলনের ফলে ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে তিন আইন দ্বারা বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ নিষিদ্ধ হয় এবং অসবর্ণ বিবাহ সিদ্ধ হয়।

 

৩.) বিদ্যাসাগর ও বিধবা বিবাহ আন্দোলন :– বিদ্যাসাগর নারীর অকাল বৈধব্য জীবনের দুঃখ ও দুর্দশা দেখে বিচলিত হয়েছিলেন। তিনি সমাজের বিধবা বিবাহ প্রচলনের জন্য চেষ্টা করেন। এর জন্য তিনি অনেক পুস্তক রচনা করেন এবং গণস্বাক্ষর গ্রহণ করে সরকারের কাছে আবেদনপত্র পেশ করেন। শেষ পর্যন্ত ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ শে জুলাই আইন জারি করে বিধবা বিবাহ সম্মত বলে ঘোষণা করেন।

 

৪.) ডিরোজিও ও ইয়ং বেঙ্গলের সমাজ সংস্কার আন্দোলন :– ডিরোজিও ছিলেন কলকাতা হিন্দু কলেজের শিক্ষক। তার অনুগামীরা ইয়ং বেঙ্গল বা নব্য বঙ্গ গোষ্ঠী নামে পরিচিত। ইয়ং বেঙ্গল সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। জাতিভেদ প্রথা অস্পৃশ্যতা, সতীদাহ প্রথা ও প্রচলিত হিন্দু ধর্ম তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল। তারা মাতৃভূমি ভারতবর্ষকে ভালবাসতেন। কিন্তু ভারতীয় সমাজ সংস্কার গুলোকে ঘৃণা করতো। তবে তাদের উগ্র কালাপাহাড়ি মনোভাবের জন্য সমাজ থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।

 

ক) গঙ্গায় সন্তান বিসর্জনের বিরুদ্ধে আন্দোলন :– বঙ্গোপসাগরে সন্তান বিসর্জন দেওয়ার মতো নিষ্টুর প্রথা ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দ ও ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে দুটি রেগুলেশন জারি করে সরকার এই নিষ্ঠুর অবসান ঘটায় ।

খ) নরবলি প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন :– ভারতে অনেক উপজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে ও ধর্মীয় উদ্দেশ্যে কোনো কোনো রাজ পরিবারে নরবলি প্রথা প্রচলিত ছিল। লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে এই প্রথার নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন।

 

◾️উপসংহার :— পরিশেষে বলা যায় প্রগতিশীল ভারতীয়দের সমাজ সংস্কার আন্দোলন একটি মহৎত্তর প্রচেষ্টা। ইংরেজ সরকার এই সংস্কার আন্দোলনের পক্ষে কিছু আইন প্রণয়ন করেছিল। তবে কুসংস্কারের চিরাচরিত কাঠামো একেবারে ভেঙে ফেলতে পারেনি।

 

4. নীল বিদ্রোহে বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের বা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের ভূমিকা লেখো।   

উত্তর : ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় নীলচাষিদের নেতৃত্বে যে বিদ্রোহ সংঘটিত হয় তাতে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখক, সম্পাদক, আইনজীবী প্রভৃতি শ্রেণি বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

 

১) সংবাদপত্রের ভূমিকা :— বিভিন্ন পত্রপত্রিকাতে নীলকর ও তাদের নায়েব-গোমস্তাদের নির্মম অত্যাচারের কথা, অসহায় কৃষকদের দুরবস্থার কথা সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়। ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’, ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকা, ‘সংবাদ প্রভাকর’, ‘সমাচার চন্দ্রিকা’, ‘সোমপ্রকাশ’, ‘সমাচার দর্পণ’ প্রভৃতি পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 

২) আইনজীবীদের ভূমিকা :— নীল বিদ্রোহে বাঙালি আইনজীবীদের ভূমিকা বিশেষ প্রশংসনীয়। এইসময় নীলকররা চাষিদের নামে অজস্র মিথ্যা মামলা দায়ের করে। এগুলি চালাবার মতো আর্থিক ক্ষমতা দীনদুঃখী কৃষকদের ছিল না। আইনজীবীরাই স্বতঃপ্রণোদিতভাবে কৃষকদের হয়ে মামলা লড়েন। তাঁরাই অত্যাচারী নীলকরদের বিরুদ্ধে কৃষকদের উৎসাহিত করেন। প্রখ্যাত আইনজীবী প্রসন্নকুমার ঠাকুর, শম্ভুনাথ পণ্ডিত, ম্যাজিস্ট্রেট হেমচন্দ্র কর প্রমুখের ভূমিকা প্রশংসনীয় ছিল যথেষ্ট প্রশংসনীয়।

 

৩) সাহিত্যিকদের ভূমিকা :— বিভিন্ন সাহিত্যিক তাঁদের সাহিত্যকর্মের দ্বারা নীলকরদের বিরুদ্ধে চাষিদের উৎসাহিত করেন। নাটক, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ইত্যদির মাধ্যমে শিক্ষিত শ্রেণির দৃষ্টি আকর্ষণ ও সরকারের স্বরূপ তুলে ধরার প্রয়াস চলে। জনমত সৃষ্টিতে দীনবন্ধু মিত্র, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অক্ষয়কুমার দত্ত প্রমুখের ভূমিকা বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

 

৪) নীল দর্পণ নাটকের ভূমিকা :— এক্ষত্রে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ (১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে) নাটক। গ্রন্থটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং প্রকাশিত হয় ব্রিটিশ ধর্মযাজক রেভারেন্ড জেমস লঙ-এর নামে। এর জন্য লঙ সাহেবের একমাস কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা হয়। কালীপ্রসন্ন সিংহ ঐ টাকা দিয়ে মহানুভবতার পরিচয় দান করেন।

 

সীমাবদ্ধতা :— বুদ্ধিজীবীদের একাংশ নীল বিদ্রোহ সমর্থন করেনি। কারণ তাঁদের মনে হয়েছিল নীল চাষের মাধ্যমে গ্রামগুলি সমৃদ্ধ হবে, চাষিদের আর্থিক অবস্থা ভালো হবে। সেই কারণে রামমোহন রায়, দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রমুখ নীলকরদের অত্যাচারের অবসান চেয়েছেন, কিন্তু তা সরকার বিরোধী আন্দোলন হয়ে উঠুক এটা চাননি।

মাধ্যমিক ইতিহাস তৃতীয় অধ্যায় বড়ো প্রশ্ন উত্তর 

প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ

৮ মার্কস প্রশ্ন উত্তর

 

1. টীকা লেখো :- কোল বিদ্রোহ।  

উত্তর কোলরা ছিল বর্তমান বিহারের ছোটনাগপুর, সিংভূম, মানভূম প্রভৃতি অঞ্চলে বসবাসকারী উপজাতি। এদের উপর ব্রিটিশ সরকার ও বহিরাগত জমিদারের তীব্র শোষণের ফলে তারা যে বিদ্রোহ করেছিল, তা কোল বিদ্রোহ নামে পরিচিত।

 

১) উচ্চ হারে রাজস্ব আদায় :- আগে কোলরা রাজস্ব দিত না, কিন্তু ছোটনাগপুর অঞ্চলে শাসনভার ইংরেজ কোম্পানির হাতে যাওয়ার পর এখানে ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা চালু হয়। এবং মহাজনেরা উচ্চ হারে রাজস্ব আদায় শুরু করেছিল।

 

২) জমি থেকে উৎখাত :- ইজারাদাররা কোলদের সর্বস্ত্র কেড়ে নিতে থাকে। এমনকি জমি থেকেও তাদের উৎখাত করতে শুরু করে।

 

৩) বেকার খাটা :- রাস্তা তৈরি ও অমান্য কাজে কোলদের বেগার শ্রম দিতে হতো যার ফলে তাদের মনের ক্ষোভের সঞ্চার ঘটে।

 

৪) নির্যাতন : কোলদের উপর নানাভাবে নির্মম নির্যাতন চালানো হতো। এক্ষেত্রে অনেক সময়ে কোল নারীদের সম্মান নষ্ট করা হতো। এছাড়াও কোলদের আফিম চাষের জন্য বাধ্য করা হতো।

 

৫) নিজস্ব আইনে আঘাত :- নিজস্ব আইন-কানুন, বিচার পদ্ধতি ধ্বংস করে তাদের উপর জোর করে ব্রিটিশদের আইন-কানুন ও বিচার পদ্ধতি চাপিয়ে দেওয়া হতো তাই কোলরা বিদ্রোহের পথে পা বাড়ায়।

 

▪️ বিদ্রোহের সূচনা :- কোলদের উপর শোষণ ও অত্যাচারের প্রতিবাদে বুদ্ধু ভগত, জোয়া ভগত, সিংরাই, ঝিন্দরাই মানকি, সুই মুন্ডা প্রমুখেরা কোলদের সমবেত করেন। ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে রাঁচি জেলার মুন্ডা এবং ওয়াও সম্প্রদায়ের কৃষকরা সর্বপ্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করে তা আস্তে আস্তে সিংভূম, হাজারীবাগ, পালামৌ ও মানভূমের পশ্চিম অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

 

▪️ বিদ্রোহ দমন :- বিদ্রোহ দমনের জন্য ইংরেজরা ক্যাপ্টেন উইলকিনসনের নেতৃত্বে কলকাতা, পাটনা, দানাপুর, সম্বলপুর থেকে সৈন্য এনেছিল। আধুনিক অস্ত্র ও গোলন্দাজ বাহিনীর সাহায্যে হাজার হাজার কোল নর-নারী ও শিশুদের নির্মমভাবে হত্যা করে ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার কোল বিদ্রোহ দমন করেছিল।

 

বিদ্রোহের গুরুত্ব বা ফলাফল : ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার বিদ্রোহ দমন করলেও এই বিদ্রোহের গুরুত্ব বা ফলাফল ছিল–
ক) বিদ্রোহের ফলে কোল অধ্যুষিত অঞ্চলে সরকারি নীতির কিছু পরিবর্তন ঘটে।
খ) কোলদের জন্য দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি নামে একটি পৃথক ভূখণ্ড নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়।
গ) জমিদারদের দখল করা জমি কোলদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। 

 

2. সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ ও গুরুত্ব লেখো।   ৪+৪

উত্তর ভারতের ছোটনাগপুর, পালামৌ, মানভূম, বাঁকুড়া ও মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসী উপজাতি হল সাঁওতাল। এরা কঠোর পরিশ্রমী শান্তি প্রিয় কৃষিজীবী সম্প্রদায়। সাঁওতালরা ১৮৫৫–৫৬ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ অত্যাচারী ব্রিটিশ সরকার ও তাদের সহযোগী মহাজনদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।  

 

◾️সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ :— সাঁওতালরা বিভিন্ন কারণে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। যেমন–

 

১) সাঁওতালদের জমি গ্রাস :— সাঁওতালরা কঠোর পরিশ্রম করে দামিন-ই-কোহ পাথুরে জঙ্গলাকীর্ণ জমিকে চাষযোগ্য জমিতে পরিণত করে তোলে। তাদের ওই জমিগুলি মহাজনরা নানা অজুহাতে দখল করে নিলে সাঁওতালদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়।

 

২) উচ্চ হারে রাজস্ব আরোপ :— আদিবাসী সাঁওতালরা পতিত ও পাথুরে জমিকে চাষযোগ্য করে তুললে কোম্পানির জমিদারগণ ওই জমির উপর উচ্চ হাড়ে রাজস্ব আরোপ করলে সাঁওতালরা ক্ষুব্ধ হয়।

 

৩) সাঁওতাল ঐতিহ্যে আঘাত :— সাঁওতালরা তাদের নিজস্ব রাজনীতি ও ঐতিহ্য দ্বারা চালিত হলেও বাংলার ছোট লাট ফ্রেডারিক হ্যালিডের নির্দেশে সেগুলি বাতিল হয়।

 

৪) মহাজনদের শোষণ :নতুন ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থায় নগদ অর্থে খাজানা দিতে হতো। সাঁওতালরা নগদ অর্থের জন্য মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিতো ও ফসল বিক্রি করতো মহাজনরা, ঋণ দেওয়ার সুযোগে ৫০–৫০০ % হারে সুদ আদায় করত এবং বেগার শ্রম দিতে বাধ্য করতো।

 

৫) ব্যবসায় দুর্নীতি :— অসাধু ব্যবসায়ীরা সাঁওতালদের সরলতা ও অশিক্ষার সুযোগে সাঁওতালদের কাছ থেকে কিছু কেনার সময় ‘কেনারাম’ নামক বেশি ওজনের বাটখারা এবং সাঁওতালদের বিক্রি করার সময় কম ওজনের ‘বেচারাম’ বাটখারা ব্যবহার করত।

 

৬) ধর্মান্তরিত করণের প্রচেষ্টা :— সাঁওতালরা ছিল প্রকৃতির পূজারী খ্রিস্টান মিশনারীরা সুকৌশলে সাঁওতালদের ধর্মান্তরিত করতে গেলে সাঁওতালরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।

 

গুরুত্ব :— সাঁওতাল বিদ্রোহ দমনে বিশাল ব্রিটিশ বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে। সিধু, কানুসহ বেশ কয়েকজন নেতাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ১০০০০ সাঁওতালকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ওই বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও এই বিদ্রোহের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল। সেগুলি হল—

 

১) সাঁওতাল পরগনা গঠন :— উত্তরে গঙ্গার কাছাকাছি তেলিয়া গড়াই পরগনার সঙ্গে বীরভূম ও ভাগলপুর থেকে ৯০০০ বর্গ কিমি জায়গা জুড়ে সাঁওতাল পরগনা গঠন করেছিল ব্রিটিশ সরকার।

 

২) পৃথক উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি :— সাঁওতালদের পৃথক উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সাঁওতাল পরগনার শান্তিরক্ষার জন্য পুলিশের পরিবর্তে মাঝি ও সাঁওতাল গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা প্রদান করা হয় ।

 

৩) সুদের হার নির্দিষ্ট করা :— সাঁওতালদের অধিসৃত অঞ্চলে বাঙালি মহাজনদের প্রবেশ নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করা হয়েছিল এবং সুদের হার নির্দিষ্ট করা হয়েছিল।

 

উপসংহার :— সাঁওতাল বিদ্রোহ আপাত দৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছিল ঠিকই কিন্তু এই বিদ্রোহ ব্রিটিশ সরকারকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছিল। সাঁওতাল বিদ্রোহ গুরুত্ব প্রসঙ্গে ডা. রমেশ চন্দ্র মজুমদার বলেছেন যদি ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহকে স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে মনে হয় তাহলে সাঁওতাল বিদ্রোহকে স্বাধীনতা সংগ্রামের মর্যাদা দেওয়া উচিত। 

 

3. নীল বিদ্রোহের কারণ ও গুরুত্ব লেখো।  ০৮   

উত্তর : নীলচাষ ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন চাষ। বাংলার নীল চাষিরা ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দ নীলচাষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করেন। এই বিদ্রোহ নীলবিদ্রোহ নামে পরিচিত। নীল বিদ্রোহের প্রথম সূচনা হয় তৎকালীন নদীয়া জেলার চৌগাছা গ্রামে। ক্রমে এই বিদ্রোহ বাঁকুড়া, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, দিনাজপুর, পাবনা, ফরিদপুর, খুলনা, প্রভৃতি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। নীল বিদ্রোহের প্রধান নেতা হল বিষ্ণূচরন বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাস। কাদের মোল্লা প্রমুখ।

 

◾️নীল বিদ্রোহের কারণ :— নীল বিদ্রোহের পিছনে কারনগুলি হল–

 

১) নীলকরদের অত্যাচার : নীলকররা নীলচাষিদের নানাভাবে অত্যাচার করে নীলচাষ করতে বাধ্য করত, অনৈচ্ছিক চাষিদের প্রহার করা, আটকে রাখা, স্ত্রী-কন্যার সম্মানহানি করা, চাষের সরঞ্জাম লুঠ করা। ঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া প্রভৃতি নানাভাবে চাষিদের অত্যাচার করত।

 

২) দাদন প্রথা :– নীলকররা নীলচাষের জন্য চাষিকে বিঘা পিছু মাত্র ২ টাকা অগ্রিম দাদন দিত। কোনো চাষি একবার দাদন নিলে তা আর কখনোই নীলকরদের খাতায় পরিষদ হত না।

 

৩) প্রতারনা ও কারচুপি :– নীলকররা নীলচাষিদের বিভিন্নভাবে প্রতারনা রত। নীল কেনার সময় নীলের ওজন কম দেখাতো।

 

৪) জমির মাপে কারচুপি :– নীলকরদের কাছে দাদন নিয়ে যে জমিতে চাষিকে নীলচাষ করতে হতো, তা মাপের সময় নীলকররা ব্যাপক কারচুপি করত। তারা গড়ে প্রতি ২.৫ বিঘা জমিকে ১বিঘা বলে গণ্য করত। ফলে চাষিকে নীলচাষে জমি ব্যবহার করতে হত।

 

৫) অবিচার :– অত্যাচারিত নীলচাষিরা আদালতে গিয়েও সুবির পেত না। আইন ছিল নীলকরদের স্বার্থরক্ষার জন্য চাষিদের জন্য নয়। তাছাড়া পুলিশ প্রশাসন সবই ছিল নীলকরদের পক্ষে।

  উপরিউক্ত কারণগুলির জন্যই নীলচাষিদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ফলস্বরূপ বিষ্ণুচরন বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাস -এর নেতৃত্বে নীলকরদের বিরূদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষনা করে ।

 

◾️নীল বিদ্রোহের ফলাফল ও গুরুত্ব :– উনিশ শতকে ইউরোপ থেকে আগত নীলকর সাহেবদের শোষন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাংলার নীলচাষিরা ১৮৫৯-৬০ খ্রিস্টাব্দে শক্তিশালী বিদ্রোহ গড়ে তোলে। এই বিদ্রোহের ফলাফলগুলি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

 

১) জাতীয় কমিশন :– বিদ্রোহের পর সরকার ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে নীলকমিশন গঠন করেন। কমিশনের পক্ষ থেকে নীলকরদের চরম অত্যাচার ও নির্যাতনের কাহিনী প্রকাশিত হয়।

 

২) হিন্দু ও মুসলমান ঐক্য :– নীলকরদের অত্যাচার বাংলায় হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যবোধকে দৃঢ় করে। উভয় সম্প্রদায়ের কৃষকরা যৌথ ভাবে শাসক সম্প্রদায়ে বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ।

 

৩) শিক্ষিত ব্যক্তি বর্গের সমর্থন :– নীল বিদ্রোহকালে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র, শিশির কুমার ঘোষ সহ বহু শিক্ষিত ব্যাক্তিত্ব তাদের লেখনির মাধম্যে জনমত গঠনে এগিয়ে এসেছে। এর ফলে কৃষকদের সঙ্গে শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত শ্রেনির যোগসূত্র গড়ে ওঠে।

 

৪) স্বাধীনতা আন্দোলনের পথ প্রদর্শক :– নীল বিদ্রোহ,পরবর্তী কালে ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলনগুলি পথপ্রদর্শক ছিল। এই আন্দোলনই ভারতবাসীকে স্বাধীনতার প্রেরণা জাগিয়ে ছিল।

 

◾️উপসংহার :– উপরিক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায় নীল বিদ্রোহ ছিল ভারতের কৃষক আন্দোলনের এক গৌরব উজ্জ্বল অধ্যায়। এই বিদ্রোহে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কৃষকরা যেভাবে আন্দোলন গড়ে তোলে তা পরবর্তিকালের কৃষক আন্দোলনগুলিকে প্রেরণা জোগায়। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়কে ব্রিটিশ মোহ থেকে মুক্ত করে এই বিদ্রোহ।    

 

4. ফরাজি আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য লেখো? এই আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ লেখো?   ৪+৪

উত্তর আরবি ভাষায় ‘ফরাজি’ শব্দটির অর্থ হল ‘ইসলাম নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক কর্তব্য’। ১৯ শতকে ভারতে মুসলমানদের মধ্যে কুসংস্কার, অনাচার দূর করে তাদেরকে পবিত্র ইসলাম ধর্মের অনুগামী করে তুলার জন্য হাজি শরিয়ত উল্লাহ এক পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলন গড়ে তোলেন এটি ফরাজি আন্দোলন নামে পরিচত। এই আন্দোলন ১৮১৮-১৯০৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চলেছিল।

◾️আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য :—

১) ইসলামের শুদ্ধিকরণ : এই আন্দোলন ছিল ইসলামের শুদ্ধিকরন আন্দোলন। শরিয়ত উল্লাহ তার অনুগামীদের ইসলামের পবিত্র আদর্শ মেনে চলার কথা বলেন।

 

২) কৃষক আন্দোলন :– প্রথমে ধর্মীয় আন্দোলন রূপে শুরু হলেও পরে তা ইংরেজ, জমিদার, মহাজন, বিরোধী কৃষক আন্দোলনে পরিণত হয়।

 

৩) দরিদ্র ও মুসলমানদের আধিক্য :– মূলত দরিদ্র মুসলিম কৃষকদের মধ্যে ফরাজি আন্দোলনের প্রভাব পরে। এই কৃষকরাই জমিদার ও নীলকর দ্বারা বিশেষ ভাবে শোষিত হত।

 

৪) দক্ষ করার প্রশাসনিক ব্যবস্থা গঠন :– অত্যাচারী শাসকদের প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে ফরাজিরা দক্ষ গুপ্তচর ও লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে তোলে। এমনকি তাদের নিজস্ব আদলতও ছিল।

 

◾️ফরাজি আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ :– ফরাজি আন্দোলনে দরিদ্র মুসলিম কৃষক শ্রেণি যোগ দিয়েছিল। একটি প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলন রুপে ফরাজি আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটলেও নানা কারণে ব্যর্থতাই পর্যবসিত হয়।

 

১) সংকীর্ণ’ কর্মবোধ :– সংকীর্ণ ধর্মবোধ ও চেতনার ওপর ভিত্তি করে এই আন্দোলন গড়ে ওঠেছিল। তাই উদারপ্রন্থী মুসলমান সমাজ এই আন্দোলন থেকে দূরে সরে থাকে। ফলে সংহতির অভাবে এই আন্দোলন ব্যর্থ হয়।

 

২) সুযোগ্য নেতৃত্বের অভাব :– শরিয়ত উল্লাহ ও তার পুত্র দুদুমিঞার মৃত্যুর পর ফরাজিদের মধ্যে আর কোনো সুযোগ্য নেতার আবির্ভাব ঘটেনি। দুদুমিঞার দীর্ঘ কারাবাসে আন্দোলন নেতৃত্বহীন হয়ে পরে।

 

৩) সুস্পষ্ট লক্ষ্যের অভাব :– কোনো সুপষ্ট লক্ষ্য না থাকায় এই আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছিল। প্রথম দিকে ইসলাম ধর্মের সংস্কার, পরবর্তী সময়ে নীলচাষ ও জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ শেষে আবার ধর্মীয় উদ্দেশ্যে এই আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল।

 

৪) সীমাবদ্ধতা :– এই আন্দোলন একটি ভৌগলিক অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এই আন্দোলন ব্যাপক হারে বিস্তার লাভ করেনি।

 

৫) চরম দমন নীতি :– ফরাজিরদের আন্দোলন ইংরেজ সরকারদের যথেষ্ট উদবিগ্ন করে তুলেছিল। তাই তারা জমিদার ও নীলকরদের সহাতায় এই আন্দোলন দমন করেছিল।

 

◾️উপসংহার :নানা কারণে ফরাজি আন্দোলন ব্যর্থ হলেও এই আন্দোলনের গুরত্ব ছিল অনস্বীকার্য। এর ফলে মুসলাম সমাজ থেকে বহু কুসংস্কার দূর হয়। ফরাজিদের প্রচেষ্টা পরবর্তী প্রজন্মকে বিদ্রোহের প্রেরণা কথা জাগিয়ে ছিল।

 

আজকের পোস্টে প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ (তৃতীয় অধ্যায়)  থেকে ২/৪/৮ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর আলোচনা করা হল, যেগুলি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।  

 

SOURCE-EDT

©Kamaleshforeducation.in (2023)

 

error: Content is protected !!
Scroll to Top