ইতিহাসের ধারণা (প্রথম অধ্যায়)

২/৪ নম্বর প্রশ্ন উত্তর  

Updated on:  

মাধ্যমিক ইতিহাসের প্রথম অধ্যায় ‘ইতিহাসের ধারণা’ (Class 10 History Chapter 1) এর মধ্যে আধুনিক ইতিহাসের উপাদান থেকে শুরু করে খেলাধুলো, খাদ্যাভ্যাস বা স্থানীয় ইতিহাস—সব কিছুরই সুন্দর ধারণা দেওয়া আছে এই অংশে। আজকের পোস্টে এই চ্যাপ্টার থেকে পরীক্ষায় আসার মতো বাছাই করা বেশ কিছু 2/4 নম্বরের প্রশ্ন-উত্তর আলোচনা করা হলো।

 

বোর্ড: বিষয়বস্তু

1 ক্লাস 10 ইতিহাস প্রথম অধ্যায় ২/৪ নম্বর প্রশ্ন উত্তর | ইতিহাসের ধারণা Class 10 History Question Answer

1.1 দশম শ্রেণির ইতিহাস প্রথম অধ্যায় 2 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | মাধ্যমিক ইতিহাস প্রথম অধ্যায় 2 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর

1.2 মাধ্যমিক ইতিহাস প্রথম অধ্যায় 4 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | প্রথম অধ্যায়। দশম শ্রেণি। বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন

ক্লাস 10 ইতিহাস প্রথম অধ্যায়

২/৪ নম্বর প্রশ্ন উত্তর 

ইতিহাসের ধারণা

Class 10 History Question Answer

 

উত্তর  কোন ইতিহাসবিদ কী ধরণের পদ্ধতি ব্যবহার করবেন, তা নির্ভর করে আলোচ্য বিষয়টির ওপর এবং সেই ইতিহাসবিদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। ইতিহাসের যে ধারায় ইতিহাস রচনার বিভিন্ন পদ্ধতি, ইতিহাসবিদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রভৃতি বিষয় পর্যালোচনা করে, তাকে Historiography বা ইতিহাসতত্ত্ব বলা হয়। আধুনিক ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে একে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

উত্তর :  যে ইতিহাস চর্চায় রাজা-মহারাজা বা অভিজাত প্রভৃতি শ্রেণী ছাড়াও সমাজের নিম্নবর্গীয় সাধারণ মানুষ, যেমন– কৃষক, শ্রমিক, নারী এমনকি সমাজে অবহেলিত মানুষ অন্তজ ও হিজরাদের কথাও গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করা হয়, তাকে সামাজিক ইতিহাস চর্চা বলা হয়। ইতিহাস চর্চা প্রথমে ১৯৬০ এর দশকে ইউরোপে এবং পরবর্তীকালে ১৯৭০ এর দশকে আমেরিকাতে শুরু হয়।

 

বিষয়বস্তু :–
ক) সমাজের কথা :- এই ইতিহাসে সাধারণ থেকে সর্বস্তরের মানুষের ইতিহাসের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

খ) সংস্কৃতির কথা  :- এই ইতিহাসে মানুষের বিভিন্ন সংস্কৃতি, যেমন– ধর্ম, শিক্ষা, আচার-আচরণ, খাদ্যাভ্যাস, বিনোদন, শিল্প, খেলাধুলা, পোশাক-পরিচ্ছদ প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা করা হয়।

গ) অর্থনৈতিক কথা :- এই ইতিহাস থেকে মানুষের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন পেশা, জীবিকা এবং তা থেকে জীবনযাত্রার কথা আলোচনা করা হয়।

উত্তর :  জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ, বর্ণ, শ্রেণি প্রভৃতি সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়সহ ভারতের তথা দক্ষিণ এশিয়ার নিম্নবর্গের মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, জনস্বাস্থ্য, দারিদ্র্যতা প্রভৃতি নিয়ে 1980-র দশকে যে ইতিহাসচর্চা শুরু হয় তাকে বলে সাবল্টার্ন  বা নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চা। ভারতে নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চা শুরু হয়েছিল 1982 খ্রিস্টাব্দে।

এই ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত ঐতিহাসিকগণ : ভারতের নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চা প্রথম শুরু করেন রনজিত গুহ এবং পরবর্তীকালে এই ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত হন পার্থ চট্টোপাধ্যায়, গৌতম ভদ্র, দীপেশ চক্রবর্তী, সুদীপ্ত কবিরাজ, জ্ঞানেন্দ্র পান্ডে প্রমুখ।

উত্তর :  সামাজিক ইতিহাস চর্চার একটি অন্যতম অঙ্গ হলো খেলাধুলার ইতিহাস চর্চা। যে ইতিহাস চর্চায় মানুষের বিভিন্ন খেলাধুলা ( যেমন– ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, হকি ) এবং শরীরচর্চা ( যেমন– কুস্তি, সাঁতার কাটা ) প্রভৃতি বিষয়ে চর্চা করা হয়, সেই ইতিহাসচর্চাকেই খেলাধুলার ইতিহাসচর্চা বলা হয়।

গুরুত্ব :–
ক) খেলার ইতিহাস থেকে সমাজে মানুষের শারীরিক সক্ষমতা, মানসিকতা, নারীর মর্যাদা, মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা প্রভৃতি বিষয়ে অবগত হওয়া যায়।
খ) খেলার ইতিহাসচর্চার মাধ্যমে জাতিগত ও লিঙ্গগত বৈষম্য দূর হয়। পাশাপাশি বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে খেলা দেশ ও জাতির নানা প্রয়োজনের উপযোগী হয়ে উঠতে পারে।

এই ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ঐতিহাসিক :– খেলার ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ঐতিহাসিক হলেন রিচার্ড হোল্টের, রামচন্দ্র গুহ, কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বোরিয়া মজুমদার প্রমুখ।

উত্তর :  ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে ১৫ আগস্ট কলকাতায় মোহনবাগান দল প্রতিষ্ঠিত হয়। ভূপেন্দ্র নাথ বসু নবপ্রতিষ্ঠিত ক্লাবের প্রথম সভাপতি হন এবং জ্যোতিন্দ্র নাথ বসু ছিলেন এর প্রথম সচিব।

১৯১১ খ্রিস্টাব্দের গুরুত্ব :– ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে মোহনবাগান অ্যাটলেটিক ক্লাব এবং ইংরেজদের ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট ক্লাব এর মধ্যে কলকাতায় ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই খেলাতে ভারতীয় খেলোয়াড়গণ খালি পায়ে খেলে ইংরেজীদেরকে ২-১ গোলে ( একটি গোল করেন অধিনায়ক শিবদাস ভাদুড়ি এবং অপর গোলটি করেন অভিলাষ ঘোষ ) পরাজিত করেন এবং মোহনবাগান দল IFA শিল্ড জয় করে। সেই যুগের স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমিকায় এই ঘটনা ছিল একরকম দেশ বিজয়ের মতো। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে মোহনবাগান দলের শিহরণ জাগরণ সাফল্য ভারতের মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবাদের জাগরণে বিশেষ ভূমিকা নেয়।

উত্তর :  কোনো একটি অঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভ্যাস প্রাথমিকভাবে সেই অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর নির্ভরশীল। যে ইতিহাস চর্চায় বিভিন্ন জায়গার মানুষের দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাস, খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক, খাদ্যাভ্যাসের বিবর্তন প্রভৃতি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণভাবে আলোচনা করা হয়, তাকেই খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাসচর্চা বলে।

গুরুত্ব :–
ক) খাদ্যাভাসের ইতিহাস চর্চার মধ্য দিয়ে নানা জনগোষ্ঠীর মানুষ তাদের বিভিন্ন প্রকার খাদ্য সম্পর্কে জানতে পারে।
খ) খাদ্যাভাসের ইতিহাস থেকে মানুষের কৃষি কাজের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানা যায়।
গ) খাদ্যাভাসের ইতিহাস থেকে মানুষের ধর্মীয় আচার-আচরণ সম্পর্কে জানা যায়।
ঘ) কোন জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক অবস্থান জানতে পারা যায়।

এই ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ঐতিহাসিক :– খাদ্যাভাসের ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ঐতিহাসিক হলেন জে. গ্রামিলিয়ন, তপন রায়চৌধুরী, অর্জুন আপ্পাদুরাই প্রমুখ।

উত্তর :  প্রাচীন কাল থেকেই ভারতবর্ষে বিভিন্ন বৈদেশিক জাতির আগমন ঘটেছে এমনকি তারা আমাদের ভারতবর্ষ শাসন করেছে। তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলেন মুঘল, ইংরেজ, পর্তুগিজ প্রভৃতি জাতি।

খাদ্যাভাসের বিবর্তন :–
ক) মুঘলের থেকে খাদ্যাভাসের বিবর্তন :– ভারতে মুঘলদের শাসন শুরু হলে বিভিন্ন মুঘল খাবার যেমন– তন্দুর চিকেন, পনির, রুটি, মোমো, সুগন্ধি শরবত, বিরিয়ানি প্রভৃতির প্রচলন হয়।

খ) পর্তুগিজদের থেকে খাদ্যাভাসের বিবর্তন :– ভারতের পর্তুগিজদের আগমন হলে ভারতীয়রা তাদের কাছ থেকে আলু চাষ এবং আলু থেকে তৈরি বিভিন্ন খাদ্য সম্পর্কে অবগত হতে পারে।

গ) ইংরেজদের থেকে খাদ্যাভাসের বিবর্তন :– ভারতে ব্রিটিশ শাসন পর্বে ভারতীয়রা অনেক কিছু বিদেশী খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হয়, যেমন– চা, বিস্কুট, পাউরুটি, কেক প্রভৃতি।

উত্তর :  পৃথিবীতে আদিম মানুষের হাত ধরে শিল্প ইতিহাসচর্চার উদ্ভব হয়। তারা বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিমা, হাততালি, মুখের আওয়াজ প্রভৃতির মাধ্যমে শিল্পচর্চার উদ্ভব হয়। দীর্ঘদিন ধরে সেই শিল্পচর্চার বিবর্তন এবং বিকাশ ঘটেছে। আর, যে ইতিহাস চর্চায় বিভিন্ন শিল্পচর্চা, যেমন– সংগীত, নৃত্য, নাটক, চলচ্চিত্র প্রভৃতি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়, তাকেই শিল্পচর্চার ইতিহাসচর্চা বলা হয়।

গুরুত্ব :–
ক) শিল্পচর্চার মাধ্যমে জাতির ধর্মীয় জীবন, দৈনন্দিন কার্যাবলী, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, ভাষা, জীবিকা প্রভৃতি বিষয় জানা যায়।
খ) শিল্পচর্চার মাধ্যমে মানুষের সংস্কৃতির কথা জানা যায়।
গ) জাতীয়তাবাদের জাগরনের শিল্পচর্চা কি ভূমিকা নিয়েছিল সে বিষয়েও বিস্তারিত জানতে পারা যায়।

উত্তর :  শিল্পচর্চার মধ্যে অন্যতম হল সংগীত। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ, আবেগ, বেদনা প্রভৃতি অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ হল সংগীত

গুরুত্ব :–
ক) সংগীতের মধ্য দিয়ে একটি যুগের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ফুটে ওঠে।
খ) সংগীতকার, পৃষ্ঠপোষক ও সমঝদার থেকে একটি সামাজিক চিত্র পাওয়া যায়।
গ) সংগীতের বিষয়বস্তু থেকে মানসিকতা ও সমাজচিত্র ফুটে ওঠে।

সংগীতের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি :– সংগীত চর্চার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রজনীকান্ত সেন এবং সরলা দেবী চৌধুরানী

উত্তর :  কোন ঘটনাকে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা না করে মঞ্চে বিভিন্ন চরিত্রের অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শনীয় করে তোলাকে নাটক বলে। ভরত মুনির রচনা পঞ্চম বেদ থেকে তৎকালীন ভারতীয় সংস্কৃতিতে নাটকের গুরুত্ব অনুমান করা যায়।

গুরুত্ব :–
ক) নাটকের ইতিহাস চর্চার মধ্য দিয়ে সমকালীন সামাজিক, সাংস্কৃতিক এমনকি রাজনীতিরও ছবি আমরা পেতে পারি।
খ) নাটকের মাধ্যমে লোকশিক্ষা হয় এবং নাটকের কাহিনী মানুষের মনে স্মৃতি হয়ে থেকে যায়।

নাটকের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি :– নাটকের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি হলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিজন ভট্টাচার্য, উৎপল দত্ত, সত্যজীবন মুখোপাধ্যায়, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ।

উত্তর :  নাট্যাভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন (১৮৭৬) হলো ব্রিটিশ ভারতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শিল্পচর্চার মাধ্যমে পরাধীনতা ও উপনিবেশিক শাসকদের প্রতি প্রতিবাদ প্রতিরোধের জন্য তৎকালীন সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত একটি পদক্ষেপ।

এই আইন-প্রণয়নের কারণ :– উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে বিভিন্ন নাটকের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের দোষ-ত্রুটি, তাদের শাসন, নির্মম অত্যাচারের কথা তুলে ধরা হলে ভারতবাসীর মধে ব্রিটিশ বিরোধিতা তীব্র হয়ে ওঠে এবং দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবোধের বিস্তার ঘটতে থাকে। তাই ব্রিটিশ সরকার এই আইনের প্রনয়ণ করে।

এই আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য :– ব্রিটিশ সরকারের নাট্যাভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য গুলি হল–
ক) নাটক ও অভিনয়ের মধ্য দিয়ে জনগণের মধ্যে  দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবোধের বিস্তার ঘটছিল তা বন্ধ করা।
খ) ব্রিটিশ সরকারের জনপ্রিয়তা ও ভাবমূর্তি রক্ষা করা।
গ) যেকোনো রাজনীতি বিষয়ক এবং ব্রিটিশ বিরোধি নাটক ও অভিনয় নিয়ন্ত্রিত করা।

উত্তর :  চিত্রশিল্প এবং সাহিত্যিক উপাদানের উপর নির্ভর করে গ্রামীণ সংস্কৃতি কিংবা ব্রত আচরণের মাধ্যমে মানুষের আদিমতম আনন্দের বহিঃপ্রকাশই হলো নৃত্য। প্রাচীন ও আদি মধ্যযুগে দেবদাসী গণিকা প্রথায় নৃত্যকলা চর্চার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

গুরুত্ব :–
ক) নৃত্যকলার মাধ্যমে কোন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির পরিচয় পাওয়া যায়।
খ) নৃত্যকলার মাধ্যমে বিভিন্ন উচ্চাঙ্গ এবং ধর্মীয় নিত্য সম্পর্কে জানতে পারা যায়।
গ) নৃত্য শিল্পের প্রতি এবং শিল্পীদের প্রতি সমাজের মনোভাব বিশ্লেষণ করা যায়

নৃত্যকলার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি :– নৃত্যকলার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি হলেন উদয়শঙ্কর, পন্ডিত বিরজু মহারাজ, শম্ভু মহারাজ, কেলুচরণ মহাপাত্র প্রমুখ।

উত্তর :  শিল্প চর্চার ইতিহাসের একটি অন্যতম অংশ হলো চলচ্চিত্র। কোনো ঘটনাকে বর্ণনা না করে তাকে গান, নাচ, কথাবার্তা সবকিছু সমন্বয়ের মাধ্যমে পর্দায় দর্শনীয় করে তোলাকে চলচ্চিত্র। সংগীত, নাটক ও নৃত্যের থেকে চলচ্চিত্র কিছুটা আলাদা। বিশেষ করে গনমনোরঞ্জনের কথা মাথায় রেখে চলচ্চিত্রকে সামাজিক ইতিহাসের উপাদান হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

গুরুত্ব :–
ক) চলচ্চিত্র কখনো বিনোদন আবার কখনো জাতীয়তাবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে
খ) কোন ঘটনার বিরোধিতা বা প্রতিবাদ এর ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকলা।
গ) এর মাধ্যমে জনশিক্ষা হয়।

চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি :  চলচিত্রের সঙ্গে যুক্ত একজন অন্যতম ব্যক্তি হলেন সত্যজিৎ রায়। এছাড়াও চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ঋত্বিক ঘটক, এম. এস. সতায়ু, গোবিন্দ নিহালনি প্রমুখ।

উত্তর  সত্যজিৎ রায় ছিলেন একজন বিশ্ব বিখ্যাত অন্যতম বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক। তিনি ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনী অবলম্বনে ‘পথের পাঁচালী’ নামক চলচ্চিত্রটি সকল মানুষের মধ্যে পরিবেশন করেন। আর তার এই প্রতিভার জন্য তিনি গোটা বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে স্বীকৃতি লাভ করেন। এছাড়াও তিনি আরো কয়েকটি চলচ্চিত্র পরিবেশন করেন যার মধ্যে অন্যতমগুলি হল হীরক রাজার দেশে’, ‘অশনি সংকেত’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘অপুর সংসার’, ‘অপরাজিত’ প্রভৃতি। এসব চলচ্চিত্রগুলির মাধ্যমে তিনি বাংলায় চলচ্চিত্রকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন।

উত্তর :  প্রথম বাংলা নির্বাক চলচ্চিত্রটি হল ‘বিল্বমঙ্গল’ এবং প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্রটি হল ‘জামাইষষ্ঠী’। ‘বিল্বমঙ্গল‘ চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন জ্যোতিষ ব্যানার্জি এবং ‘জামাইষষ্ঠী‘ চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন অমর চৌধুরী।

উত্তর :  যে ইতিহাস চর্চায় বিভিন্ন স্থানের মানুষের দীর্ঘদিনের পোশাক পরিচ্ছদের বর্ণনা এবং তার বিবর্তনকে আলোচনা করা হয়, তাকেই পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাস বলে। পোষাক-পরিচ্ছদের সঙ্গে মানুষের সংস্কৃতি, রুচিশীলতা, আত্মসচেতনতা অতপ্রতভাবে জড়িত। এই কারণেই পোশাক পরিচ্ছদের ইতিহাসকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

গুরুত্ব :–
ক) পোশাক-পরিচ্ছদ ইতিহাস থেকে সামাজিক প্রথা ও ধর্মীয় বাধানিষেধ প্রভৃতি বিষয়ে জানা যায়।
খ) পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাসের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় মানুষের সংস্কৃতির সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়।

এই ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত ঐতিহাসিকগণ :– পোশাক-পরিচ্ছদের ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ঐতিহাসিক হলেন কার্ল কোহলার, ইরফান হাবিব, তপন রায়চৌধুরী প্রমুখ।

দশম শ্রেণির ইতিহাস প্রথম অধ্যায়

2 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর 

 

উত্তর :  প্রাচীনকাল প্রযুক্তিবিদ্যার প্রয়োগে যানবাহন এর উদ্ভব থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিবিদ্যার প্রভাবে যানবাহনের বিবর্তন প্রভৃতির কথা যে ইতিহাসে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়, তাকেই যানবাহন ও যোগাযোগব্যবস্থায় ইতিহাসচর্চা বলা হয়।

গুরুত্ব :–
ক) যানবাহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাস থেকে যানবাহন ব্যবস্থায় বিবর্তনের কথা জানতে পারা যায়।
খ) মানুষের চাহিদা সম্পর্কে জানতে পারা যায়।
গ) যানবাহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিবর্তিত রূপ বিষয়ে জানতে পারা যায়।

উত্তর :  যে ইতিহাস চর্চায় মানুষের ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফি তৈরি, ছবি আঁকা ও ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে বিবর্তনের কথা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বলা হয়ে থাকে তাকে, দৃশ্য শিল্পের ইতিহাস বলা হয়। দৃশ্য শিল্পের ইতিহাসে দুটি অংশ রয়েছে ফটোগ্রাফির ইতিহাস এবং ছবি আঁকার ইতিহাস।

ফটোগ্রাফি :– বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, কোন মহান ব্যক্তি অথবা কোন হত্যাকান্ড প্রভৃতি বিষয়গুলিকে ক্যামেরাবন্দি করাকে ফটোগ্রাফি বলে। গুরুত্ব –
ক) ফটোগ্রাফির মাধ্যমে অতীতের কোন বিষয়ের আলোকচিত্র পাওয়া যায়।
খ) ফটোগ্রাফির মাধ্যমে কোন মহান ব্যক্তির আলোকচিত্র পাওয়া যায়।

ছবি আঁকা :– শিল্পকর্ম বা অলংকরনের মাধ্যমে কোনো একটি দৃশ্যকে রেখায় প্রকাশ করাকে ছবি আঁকা বলে। গুরুত্ব –
ক) ছবি আঁকা থেকে সমকালীন সমাজ, সংস্কৃতি বা রাজনীতি বিষয়ে জানতে পারা যায়।
খ) চিত্রকলার মাধ্যমে দেশবাসীর মনে জাতীয়তাবাদের জাগরণ ঘটানো সম্ভব হয়।

উত্তর :  কিভাবে কোনো একটি অঞ্চলে স্থাপত্য গড়ে ওঠে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থাপত্যশৈলী ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যে পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা যায় সেই সব বিষয়ে যে ইতিহাসে আলোচনা করা হয়, তাকে স্থাপত্যের ইতিহাসচর্চা বলে।

গুরুত্ব :–
ক) প্রাচীন যুগ থেকে কিভাবে স্থাপত্যের কাঠামোর পরিবর্তন হয়ে এসেছে সে বিষয়ে অবগত হওয়া যায়।
খ) স্থাপত্য ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে সংস্কৃতিক সমন্বয় ফুটে উঠে।
গ) স্থাপত্য ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে স্থাপত্য নিদর্শন থেকে পৃষ্ঠপোষকতা, সমকালীন আর্থিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক অবস্থার কথা জানা যায়।

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য :– কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন হল তাজমহল, কুতুব মিনার, লালকেল্লা, হাজারদুয়ারি, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল প্রভৃতি।

উত্তর :  যে ইতিহাস চর্চায় কোনো একটি ভৌগলিক অঞ্চল বা স্থানের জনজাতি বা গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের খ্যাতি, শিল্পের স্থাপন, শিল্পের বিকাশ, লোক-পরম্পরা, সংস্কৃতি ইত্যাদির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়, তাকেই স্থানীয় বা আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চা বলে।

গুরুত্ব :–
ক) স্থানীয় ইতিহাস চর্চায় স্থানীয় জনগণের সুখ-দুঃখ, তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সংস্কৃতিক জীবনের নানা দিক আলোচিত হয়।
খ) স্থানীয় বিয়ের নারী-পুরুষ সাধারণ মানুষের আত্ম বলিদান প্রভৃতি বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়।
গ) স্থানীয় ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে জাতীয় ইতিহাস পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে।

এই ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত ঐতিহাসিকগণ : স্থানীয় ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ঐতিহাসিক হলেন রাধারমন সাহা, সতীশচন্দ্র মিত্র, সুধীরকুমার মিত্র প্রমুম।

উত্তর :  যে ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে কোন একটি শহরের উদ্ভব, তার বিকাশ, বিস্তার, শিল্প-স্থাপত্য, শহরবাসীর জীবনযাত্রা, কার্যের পদ্ধতি, বিনোদন ব্যবস্থা, অবক্ষয় ইত্যাদির কথা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা করা হয়, তাকে শহরের ইতিহাসচর্চা বলে। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের দশকে আমেরিকাতে শহরের ইতিহাস চর্চার প্রথম সূত্রপাত ঘটে।

গুরুত্ব :–
ক) শহরের ইতিহাস চর্চার মধ্য দিয়ে সমকালীন নগরায়ন ও সভ্যতার বিবর্তন সম্পর্কে জানা যায়।
খ) শহরের উদ্ভব, শহরের ধ্বংস, ধ্বংসের কারণ, সমকালীন, অর্থনীতি, রাজনীতি, মানুষের রুচিবোধ, আচরণ প্রভৃতি বিষয় শহরের ইতিহাস চর্চা থেকেই জানা যায়।

এই ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত ঐতিহাসিকগণ :– শহরের ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ঐতিহাসিক হলেন ড. অনিরুদ্ধ রায়, জে. এইচ. দভে প্রমুখ।

উত্তর :  যে ইতিহাস চর্চায় দুই পক্ষের সামরিক বাহিনীর সংগঠন, যুদ্ধের কারণ, যুদ্ধের উপকরণ, যুদ্ধের কৌশল, যুদ্ধক্ষেত্রের বিবরণ, যুদ্ধের ফলাফল প্রভৃতি বিষয় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়, তাকে সামরিক ইতিহাসচর্চা বলে। এক কথায় সামরিক ইতিহাসচর্চার মূল বিষয় সশস্ত্র সংগ্রাম।

গুরুত্ব :–
ক) সামরিক ইতিহাস চর্চা থেকে বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধের বিবর্তন বা পরিবর্তন সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়।
খ) যুদ্ধে ব্যবহৃত বিভিন্ন অস্ত্র ও জনতা যে ব্যবহার সম্পর্কে জানা যায়।
গ) কিভাবে যুদ্ধের বিবর্তন ঘটেছে সে সম্পর্কেও জানা যায়।
ঘ) যুদ্ধে কোন পক্ষের জয় হয়েছে এবং কোন পক্ষের পরাজয় হয়েছে সে সম্পর্কেও জানা যায়।

এই ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত ঐতিহাসিকগণ :– সামরিক ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ঐতিহাসিক হলেন কৌশিক রায়, সুবোধ ঘোষ, যদুনাথ সরকার, বার্নেট প্রমুখ।

উত্তর :  মানুষ কিভাবে পরিবেশকে নিজের মতো গড়ে নিতে চাইছে এবং সমাজবদ্ধ ব্যবস্থাকে উন্নত করতে গিয়ে মানুষ জল, বায়ু ও ভূমিকে কিভাবে দূষণ করছে এবং পরিবেশ আন্দোলনের মানুষ কিভাবে অংশগ্রহণ করছে এই সমস্ত বিষয়কে যেই ইতিহাসে আলোচনা করা হয়, তাকেই পরিবেশের ইতিহাসচর্চা বলে।

গুরুত্ব :–
ক) পরিবেশ ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে পরিবেশ থেকে মানুষের চাহিদা সম্পর্কে জানতে পারা যায়।
খ) পরিবেশ ইতিহাস চর্চার ফলে মানব সভ্যতার উপরে পরিবেশের প্রভাব ও জলবায়ুর পরিবর্তনের কথা জানতে পারা যায়।
গ) বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষ তাদের নিজেদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে রক্ষা করার জন্য যে আন্দোলন গড়ে তোলে তা সম্পর্কেও জানা যায়।

কয়েকটি পরিবেশ আন্দোলন : কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ আন্দোলন হল চিপকো আন্দোলন, তেহরী-গাড়োয়াল আন্দোলন, নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন প্রভৃতি।

উত্তর :  প্রাচীনকালে কিভাবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উদ্ভব ঘটেছে, কিভাবে বিবর্তিত হয়েছে এবং তার ফলে সামাজিক মানুষের অগ্রগতি সম্পর্কে যে ইতিহাস চর্চায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়, তাকেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাস চর্চা বলে।

গুরুত্ব :–
ক) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাস চর্চার ফলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কিভাবে ক্রমান্বয়ে আধুনিক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে সে সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়।
খ) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্বারা যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার গুলি ঘটেছে সে বিষয়ে অবগত হওয়া যায়।
 এই ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত ঐতিহাসিকগণ : বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি হলেন সমর সেন, ইরফান হাবিব প্রমুখ।

উত্তর :  প্রাচীনকালে চিকিৎসা বিদ্যার উৎপত্তি এবং দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা বিদ্যার বিবর্তন এবং প্রভৃতি ঔষধ আবিষ্কার বিষয়ে যে ইতিহাসে আলোচনা করা হয় তাকে চিকিৎসা বিদ্যার ইতিহাসচর্চা বলে।

গুরুত্ব :–
ক) চিকিৎসা বিদ্যার ইতিহাস থেকে চিকিৎসা বিদ্যার কেমন ছিল সে বিষয়ে জানতে পারা যায়।
খ) দীর্ঘদিন ধরে কিভাবে চিকিৎসা বিদ্যা আধুনিক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে সে বিষয়ে তথ্য জানতে পারা যায়।

উত্তর :  ইতিহাসের মূল বিষয়বস্তু হলো সমগ্র মানবজাতি। তার মধ্যে প্রচলিত ইতিহাস চর্চা পুরুষকেন্দ্রিক হওয়ায় নারীর ইতিহাস চর্চকে উপেক্ষা করা হয়েছে। ইতিহাসে নারী কি ভূমিকা পালন করেছে, কিভাবে নারী অধিকার সাম্য প্রতিষ্ঠা করেছে, কিভাবে বিভিন্ন আন্দোলনে যোগদান করেছে তার চর্চাকেই নারী ইতিহাস চর্চা বলে।

গুরুত্ব :–
ক) নারী ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে জানতে পারা যায় যে নারী কিভাবে সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতির উপরে প্রাধান্য বিস্তার করেছে।
খ) আমার ইতিহাস চর্চা থেকে সমাজে নারীর অবস্থান মর্যাদা প্রকৃতি বিষয় জানতে পারা যায়।
গ) পরিবারে নারীর আচরণ, লিঙ্গ বৈষম্য, নারী নির্যাতন সম্পর্কে তথ্য জানা যায়।
 এই ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত ঐতিহাসিকগণ : নারী ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ঐতিহাসিক হলেন জেরাল্ডিন ফোর্বস, সিমন দ্য বোভোয়ার

উত্তর :  সরকারি নথিপত্র বলতে বোঝায় পুলিশ, গোয়েন্দা বা সরকারি প্রতিবেদন, বিবরণ ও চিঠিপত্র প্রভৃতিকে। সরকারি নথিপত্র যেখানে সংরক্ষিত থাকে তাকে মহাফেজখানা বা লেখ্যাগার বলে।

গুরুত্ব :–
ক) সরকারি নথিপত্র থেকে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলার রিপোর্ট জানতে পারা যায়।
খ) বিভিন্ন সরকারি চুক্তিপত্র জানতে পারা যায়।
গ) সরকারি নথিপত্র থেকে গোয়েন্দা বিভাগের দ্বারা তদন্ত করা বিভিন্ন গোপন খবর যেমন– গণআন্দোলন, বিপ্লবীদের গতিবিধি, জনগণের ক্ষোভ প্রভৃতি জানতে পারা যায়।
ঘ) সরকারি নথিপত্র থেকে বিভিন্ন এলাকার উন্নয়ন, রাজস্ব আদায়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি বিষয়ক তথ্য জানতে পারা যায়।

উত্তর :  যে সাহিত্যে রচয়িতা তার নিজের জীবনের এবং সমকালীন সমাজ ঘটে যাওয়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীকে নিজে তৎকালীন সময়ে লিখে রাখেন, তাকেই আত্মজীবনী বলে। এককথায় আত্মজীবনী হচ্ছে লেখকের স্বরচিত জীবনচরিত বা আত্মকথা। আত্মজীবনী বিশ্বের অন্যান্য সাহিত্যের মতো বাংলা সাহিত্যেও একটি বিশেষ স্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আত্মজীবনী হলো বিপিনচন্দ্র পালের ‘সত্তর বৎসর‘, সরলা দেবী চৌধুরানীর ‘জীবনের ঝরাপাতা‘, রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি‘ প্রভৃতি।

কোনো ব্যক্তির জীবনে এবং সমকালীন সময়ে সমাজে ঘটে যাওয়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার তথ্য সেই ব্যক্তির মস্তিষ্কে ধারণ করা থাকে, যাকে এককথায় স্মৃতি বলে। আর সময় বা দরকার অনুযায়ী যখন সেই ব্যক্তি তার মস্তিষ্ক থেকে সেই তথ্যকে নিজের মুখে প্রকাশ করেন তখন তাকেই স্মৃতিকথা বলে। এই প্রক্রিয়ায় প্রথমে তথ্য আহরণ করে মস্তিষ্কে জমা করা হয় এবং দরকার অনুযায়ী সেই তথ্য আবার ভান্ডার থেকে খুঁজে নিয়ে আসা হয়।

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিকথা হলো দক্ষিণারঞ্জন বসুর ‘ছেড়ে আসা গ্রাম‘, স্বর্ণকুমারী দেবীর ‘আমাদের গৃহে অন্তঃপুর শিক্ষা ও তাহার সংস্কার’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছেলেবেলা‘ প্রভৃতি।

উত্তর :  ইতিহাসের উপাদান হিসেবে স্মৃতি কথার ও আত্মজীবনীর গুরুত্ব অপরিহার্য। ইতিহাসে আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথার গুরুত্বগুলি হল–

ক) আত্মজীবনী এবং স্মৃতিকথা থেকে তৎকালীন সমাজ, সংস্কৃতি কেমন ছিল তা বিষয়ে অবগত হওয়া যায়।

খ) আত্মজীবনী এবং স্মৃতিকথা থেকে সমকালীন প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ পাওয়া যায়।

গ) আত্মজীবনী এবং স্মৃতি কোথা থেকে বিভিন্ন শহর বা গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা, মানুষের স্বদেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ, ধর্ম সংস্কার, রাজনীতি প্রভৃতি বিষয় জানা যায়।

উত্তর :  অন্যান্য লিখিত উপাদানের থেকে চিঠিপত্রের কিছুটা আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। চিঠিপত্রে লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং মতামতের প্রকাশ ঘটে থাকে। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধিকে লেখা জওহরলাল নেহরুর চিঠিগুলিতে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ছোঁয়া থাকলেও এগুলির একটি সর্বজনীন আবেদন রয়েছে। আলোচ্য‘Letters from a father to his daughter’ গ্রন্থের চিঠিগুলি লেখা হয়েছিল 1928 থেকে 1930 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। ভারত তখন রাজনৈতিকভাবে খুবই অস্থির। নেহরু অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায় ন-দশ বছরের ছোটো ইন্দিরাকে পৃথিবী এবং মানবসভ্যতার গোড়ার দিকের ইতিহাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারণার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।

গুরুত্ব :–
ক) ভারতবর্ষের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা হিসেবে জহরলাল নেহেরুর রাজনৈতিক চিন্তা ও চেতনার ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এই চিঠিগুলোর মূল্য বা গুরুত্ব অপরিসীম।

খ) জহরলাল নেহেরুর একগুচ্ছ চিঠি থেকে ব্যাক্তি জহরলাল নেহেরুর পরিচয় বিস্তারিতভাবে জানতে পারা যায়।

গ) জহরলাল নেহেরু এই চিঠি গুলির মাধ্যমে নিজের জাতি পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গোটা সমাজকে একই বিশ্ব পরিবারের অঙ্গ হিসেবে চেনা এবং নিজের সন্তানকে এই উদার ভাবনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

উত্তর :  সংবাদপত্র বা খবরের কাগজ হল একটি লিখিত প্রকাশনা যার মধ্যে থাকে বর্তমান ঘটনা, তথ্যপূর্ণ নিবন্ধ, বিশ্বের তাৎক্ষণিক সংবাদ প্রভৃতি। এটি সাধারণত স্বল্প-মূল্যের কাগজে এবং কম খরচে মুদ্রণ করা হয়। পৃথিবীর আধুনিক বিপ্লব ও সংগ্রামের ইতিহাসে সংবাদপত্রের গুরুত্ব অপরিসীম। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্র হল ইন্ডিয়া গেজেট;(১৭৮০),বেঙ্গল জার্নাল;(১৭৮৫ খ্রিঃ), দি ক্যালকাটা ক্রনিকল (১৭৮৬), ক্যালকাটা কুরিয়র (১৭৯৫),ইন্ডিয়া অ্যাপেলো (১৭৯৫),বেঙ্গল হরকরা(১৭৯৮) ইত্যাদি।

সাময়িক পত্র, সাময়িকী বা ম্যাগাজিন বলতে নির্দিষ্ট সময় পরপর প্রকাশিত এক ধরনের পত্রিকা যা কাগজে প্রকাশিত হয়ে থাকে। সাময়িক পত্রগুলিতে বিভিন্ন বিষয়বস্তুর সমাহার থাকে যেগুলিকে বিস্তারিত এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা করা হয়। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাময়িক পত্রিকা হলো বামাবোধিনী, সোমপ্রকাশ, প্রবাসী প্রভৃতি।

উত্তর :  সংবাদপত্র ও সাময়িক পত্রের মধ্যে পার্থক্যগুলি হল–

ক) সংবাদপত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য এটি প্রতিদিন প্রকাশিত হয়। কিন্তু, সাময়িক পত্রিকা কিছুদিন সময় অন্তর (যেমন– এক সপ্তাহ, একমাস, একপক্ষ) প্রকাশিত হয়।

খ) সংবাদপত্রে বর্তমান বা তাৎক্ষণিক ঘটনাকে সংবাদ আকারে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু, সাময়িক পত্রিকাতে কিছুদিন ধরে ঘটে চলা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপরে বিস্তারিত এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা করা হয়ে থাকে।

গ) সংবাদপত্রে রাজনীতি, ব্যবসা, খেলাধুলা, শিল্প-বিজ্ঞান প্রভৃতির বিষয়ের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়ে থাকে। কিন্তু, সাময়িক পত্রিকা গুলিতে বিভিন্ন ব্যক্তিগত মতামত, বিনোদনমূলক লেখা, জাতীয়তাবাদী লেখা, আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা প্রভৃতি প্রকাশিত হয়।

উত্তর :  শুধুমাত্র সংবাদ পরিবেশনই নয় জনমত গঠন, জাতীয়তাবাদের বিকাশ, দেশাত্মবোধ জাগরণেও সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। তৎকালীন সময়ে যে সমস্ত পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার মধ্যে অন্যতম হলো এই সোমপ্রকাশ পত্রিকা। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ই নভেম্বর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অনুপ্রেরণায় দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ সোমপ্রকাশ পত্রিকা প্রকাশ করেন।

প্রকাশনা বন্ধ :– ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে সাম্রাজ্যবাদী শাসক লর্ড লিটন ‘দেশীয় ভাষায় সংবাদপত্র আইন’ পাস করে যার মাধ্যমে সরকারের সমালোচনাকারী পত্রিকা গুলোকে বন্ধের নির্দেশ দেয়। কিন্তু সোমপ্রকাশ এর বিরোধিতা করে ফলে সরকার তার জরিমানা ঘোষণা করে। কিন্তু জরিমানা দিতে রাজি না হওয়ায় ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে সরকার সোমপ্রকাশ পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীকালে ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে সোমপ্রকাশ পত্রিকার পুনঃপ্রকাশ হলেও তা আর আগের মতো জনপ্রিয়তা ফিরে পায়নি। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে সোমপ্রকাশ পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়।

উত্তর  উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে প্রকাশিত সাময়িকপত্রগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় ছিল ‘বঙ্গদর্শন‘। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে সমকালীন বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘বঙ্গদর্শন‘ প্রকাশিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত আনন্দমঠ উপন্যাস এবং বন্দেমাতরম সংগীত এই পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশ পায়। সমসাময়িক দর্শন, ধর্ম এবং রাজনৈতিক বিষয়ে ইউরোপে প্রচলিত তত্ত্বের সঙ্গে বাঙালির পরিচয়ের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল বঙ্গদর্শন। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বঙ্গদর্শন পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন আর তার সম্পাদনার সময়কালকেই বঙ্গদর্শনের যুগ বলা হয়েছে।

মাধ্যমিক ইতিহাস প্রথম অধ্যায়

4 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর

প্রথম অধ্যায়।

দশম শ্রেণি। বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন

 

1.  আধুনিক ইতিহাসে খেলার ইতিহাস চর্চার গুরুত্ব উল্লেখ করো।   ০৪

উত্তর:  নতুন সামাজিক ইতিহাস চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হল খেলা। সংগঠিত, নিয়মিত নিয়মনিষ্ঠ, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, বিনোদন ও দক্ষতামূলক শারীরিক কার্যকলাপকেই খেলা বলে। চরিত্র গঠনে খেলাধুলার ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও খেলাধুলা জাতীয়তাবোধকে জাগরিত করে, জাত পাতের বিরুদ্ধে মানুষকে প্রতিবাদী করে তোলে এবং লিঙ্গ বৈষম্য বিরুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। বিংশ শতক থেকেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে খেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খেলা হল– ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, টেনিস, ব্যাডমিন্টন, কাবাডি প্রভৃতি। চরিত্র গঠনে খেলাধুলার ভূমিকা যতটাই গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রেও ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।

খেলার ইতিহাসচর্চার সূত্রপাত :– পৃথিবীর বেশিরভাগ খেলা ইংল্যান্ডের শুরু হলেও খেলার ইতিহাস চর্চাতে ইউরোপের গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯৭০-এর দশকে ইউরোপে প্রথম খেলার ইতিহাসচর্চার সূত্রপাত ঘটে। এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় জে. এ. ম্যাঙ্গান, রিচার্ড হোল্ট প্রমুখ। খেলার ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ হল জে. এ. ম্যাঙ্গান -এর লেখা ‘দ্য গেমস এথিক খেলা জাতি ও দেশের মানুষের কাছে যেমন একটি বিনোদনের বিষয় অনু দিয়ে খেলার ইতিহাস চর্চার মধ্য দিয়ে জাতিগত লিঙ্গগত ভেদাভেদ এর মত কুসংস্কার থেকে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়। অ্যান্ড ইমপিরিয়ালিজম’।

 

খেলার ইতিহাসের গুরুত্ব :– আধুনিক ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে খেলার গুরুত্ব অপরিসীম
সমাজের রূপ :– কোন সমাজে নারীরা যদি খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করে তাহলে তার থেকে জানতে পারা যায় নারীর স্বাধীনতা। এছাড়াও খেলার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ফুটে ওঠে
জাতীয়তাবোধ জাগরন :– খেলা মানুষের মনে জাতীয়তাবাদী চেতনা, দেশাত্মবোধ এবং গণ আবেগ সৃষ্টি করে। জাতীয়তাবোধের জাগরণে খেলাধুলার প্রধান উদাহরণ হল ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের আইএফএ শিল্ড। এখানে মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব ব্রিটিশদের ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট দলের সঙ্গে খালি পায়ে খেলে তাদের পরাজিত করে। এর থেকে সারা দেশ জুড়ে জাতীয়তাবাদী উন্মাদনার সৃষ্টি হয়।
কুসংস্কার দূরীকরণ :–

ঐতিহাসিকগণ ও তাদের গ্রন্থ :– বিভিন্ন ঐতিহাসিকগণ যেমন– জে. এ. ম্যাঙ্গান, রিচার্ড হোল্ট, আসিস নন্দী, সৌভিক সাহা, কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বোরিয়া মজুমদার, রামচন্দ্র গুহ প্রমূখ তাদের গ্রন্থের মাধ্যমে খেলার ইতিহাস চর্চা করেছেন। ড. বোরিয়া মজুমদার তার ‘টোয়েন্টি টু ইয়ার্ডস টু ফ্রিডম : এ সোশ্যাল হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়ান ক্রিকেট‘ গ্রন্থে, ঐতিহাসিক নলীন মেহতা তার ‘অলিম্পিকস : দ্য ইন্ডিয়া স্টোরি’ গ্রন্থে, কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার ‘খেলা যখন ইতিহাস‘ গ্রন্থে এবং রামচন্দ্র গুহ তার ‘এ করনার অফ দা ফিল্ড : দ্যা ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি অফ এ ব্রিটিশ স্পোর্টস’ গ্রন্থে বিভিন্ন খেলা বিষয়ে আলোচনা বা চর্চা করেছেন।

মূল্যায়ন :–বর্তমানে খেলার ইতিহাসচর্চার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আধুনিক শহুরে সভ্যতার চাপে গ্রামের বিভিন্ন খেলা লুকোচুরি, কানামাছি, কুমির-ডাঙা, ডাংগুলি, হাডুডু, কিৎ কিৎ ইত্যাদি লোকক্রীড়াগুলি লুপ্তপ্রায়। নতুন সামাজিক ইতিহাসচর্চায় এই সমস্ত লোকক্রীড়াগুলির গুরুত্ব অপরিসীম। খেলাকুলা যদিও বিনোদন তবুও সমাজ-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। দেশ, জাতি, দেশের মানুষ ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটে খেলাধুলার মধ্য দিয়ে। আর তাই এই বিষয়ে গবেষণা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। খেলার ইতিহাস তাই সমাজবিজ্ঞানের মতোই গতিশীল ইতিহাস

 

2.  আধুনিক ইতিহাসে পরিবেশ ইতিহাসচর্চার গুরুত্ব উল্লেখ করো।   ০৪

উত্তর:  সামগ্রিক ইতিহাস চর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো এই পরিবেশ ইতিহাসচর্চা। মানুষ কিভাবে পরিবেশকে নিজের মতো গড়ে নিতে চাইছে এবং সমাজবদ্ধ ব্যবস্থাকে উন্নত করতে গিয়ে মানুষ জল, বায়ু ও ভূমিকে কিভাবে দূষণ করছে এবং পরিবেশ আন্দোলনের মানুষ কিভাবে অংশগ্রহণ করছে এই সমস্ত বিষয়কে যেই ইতিহাসে আলোচনা করা হয়, তাকেই পরিবেশের ইতিহাসচর্চা বলে। বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে পরিবেশ ইতিহাস চর্চা প্রথম শুরু হয়, এরপর থেকে তা ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়ে গণ-আন্দোলনের সূচনা হয়। তবে প্রথমদিকে বিজ্ঞান গবেষক রাই এই বিষয়টিকে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেন।

 পরিবেশের ইতিহাসের গুরুত্ব :–
১) শিক্ষা :– পরিবেশ ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে ইতিহাস, ভূগোল এবং জীববিদ্যার বিভিন্ন বিষয়ে সম্পর্কে জানতে পারা যায়। এছাড়াও বিভিন্ন অঞ্চল ও সেখানকার জীববৈচিত্র সম্পর্কে আমরা জানতে পারি।
২) মানুষের চাহিদা :–  পরিবেশ ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে পরিবেশ থেকে মানুষের চাহিদা সম্পর্কে জানতে পারা যায়। যেমন– নগরায়নের জন্য মানুষ বিভিন্ন অরণ্য নষ্ট করে এবং বিভিন্ন জলাভূমি বুঝিয়ে সেখানে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট নির্মাণ করছে
৩) জলবায়ুর পরিবর্তন :– পরিবেশ ইতিহাস চর্চার ফলে মানব সভ্যতার উপরে পরিবেশের প্রভাব ও জলবায়ুর পরিবর্তনের কথা জানতে পারা যায়।
৪) পরিবেশ আন্দোলন :– বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষ তাদের নিজেদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে রক্ষা করার জন্য যে আন্দোলন গড়ে তোলে তা সম্পর্কেও জানা যায়। যেমন– চিপকো আন্দোলন, তেহরী-গাড়োয়াল আন্দোলন, নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন প্রভৃতি।

 ঐতিহাসিকগণ এবং তাদের গ্রন্থ :– র‌্যাচেল কারসন তার ‘ দ্য সি অ্যারাউন্ড আস’ এবং ‘ সাইলেন্ট স্প্রিং’ গ্রন্থে পরিবেশ সচেতনতা বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এছাড়াও ক্ল্যারেন্স গ্ল্যাকেন তার ‘ ট্রেসেস অন দ্য রেডিয়ান শোর’ গ্রন্থে পরিবেশের ইতিহাস চর্চা করেছেন।

মূল্যায়ন :– পরিবেশের ইতিহাস আমাদের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করে। এ ছাড়া এই ইতিহাস পরিবেশ আন্দোলন ও মানুষের অধিকার রক্ষার আন্দোলনগুলির বিষয়ও আমাদের সামনে তুলে ধরে।

3.  আধুনিক ইতিহাসে নারী ইতিহাস চর্চার গুরুত্ব উল্লেখ করো।   ০৪

উত্তর: ইতিহাসের বিষয়বস্তু সমগ্র মানবজাতি, যার অর্ধেক অংশ হলো নর আর অর্ধেক অংশ হলো নারী। অথচ প্রচলিত ইতিহাস চর্চা পুরুষ কেন্দ্রিক হওয়ায় নারীর গুরুত্বকে উপেক্ষা করা হয়েছে। প্রথমে আমেরিকা ও ব্রিটেনের ঐতিহাসিক ও গবেষকগণের হাত ধরে নারী ইতিহাসচর্চার আবির্ভাব হয়। ইতিহাসে নারী কি ভূমিকা পালন করেছে তার চর্চা হলো নারী ইতিহাসচর্চা।

 নারী ইতিহাসের গুরুত্ব :–

১) ইতিহাসের নারীর ভূমিকা :– যুগেযুগে ইতিহাসের নারীর অসমান্য অবদান রয়েছে। নারীসমাজ আজ শিক্ষা, খেলা, রাজনীতি, সংস্কৃতি, ধর্ম, উপাসনা, প্রশাসন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসাবিদ্যা প্রভৃতি সকল ক্ষেত্রেই সুপ্রতিষ্ঠিত। নেফারতিতি, ক্লিওপেট্রা, সুলতানা রাজিয়া, রানি দুর্গাবতী, রানি লক্ষ্মীবাই, মাতঙ্গিনী হাজরা, শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধি প্রমুখ নারীরা নিজেদের যোগ্যতা দ্বারা প্রাচীন ও মধ্যযুগের রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বারা বর্তমানে একবিংশ শতাব্দীতে দেশের বিভিন্ন জায়গায়, যেমন- সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতির উপর নারীরা প্রাধান্য বিস্তার করেছে।

২) অধিকার ও সাম্য প্রতিষ্ঠা :– এই নারী ইতিহাস চর্চার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বপ্রথম লেখালেখি করেন ফ্রান্সের সিমন-দ্যা-বোভোয়ার

৩) অগ্রগতির মাপকাঠি :– কোন দেশের সভ্যতা, সমাজ, নারীর অবস্থান ও মর্যাদা নির্ভর করে সেই জাতির সভ্যতার উৎকর্ষতার ওপর। তাই নারীর ইতিহাস চর্চা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

৪) সচেতনতা বৃদ্ধি :– নারী ইতিহাস চর্চার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক সাম্য, গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীনতা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পাই। নারীরা পিছিয়ে থাকলে সমগ্র জাতি পিছিয়ে পড়বে এ বিষয়ে সচেতন হয়ে নারীর ক্ষমতা পথ সুগম করার জন্য নারী ইতিহাস চর্চা গুরুত্বপূর্ণ।

 নারী ইতিহাসচর্চার গ্রন্থ :– নারী ইতিহাসচর্চার কয়েকটি গ্রন্থ হল– বারাকানের লেখা গ্রন্থ ‘Women in English Social History‘, সৌদামিনী দেবীর লেখা গ্রন্থ ‘পিতৃস্মৃতি‘, উমাদেবীর লেখা গ্রন্থ বাবার কথা‘ প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

মূল্যায়ন :– পরিশেষে বলা যায় নারীদের ভূমিকা বাদ দিয়ে ইতিহাস চর্চা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। নারী ইতিহাস চর্চার বিকল্পের ফলে ইতিহাস চর্চা নবদিগন্তের উন্মোচন হয়। নারী ইতিহাস চর্চা হলো এক ধরনের সংশোধনবাদী ইতিহাস চর্চা এই ইতিহাস চর্চার ফলে ইতিহাস বিকৃতির সম্ভাবনা রয়েছে। নারীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলার ক্ষেত্রে নারীর ইতিহাসচর্চা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে; আবার এই ইতিহাসচর্চার মধ্য দিয়ে প্রান্তিক মহিলাদের ব্যাপারে জানতে আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছে।

4.  আধুনিক ইতিহাসের উপাদান হিসাবে সরকারি নথিপত্রের গুরুত্ব উল্লেখ করো।   ০৪

উত্তর:  আধুনিক ভারতের ইতিহাস রচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল সরকারি নথিপত্র। এই নথিপত্রের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল— (১) সরকারি প্রতিবেদন ও বিবরণ, (২) বেসরকারি ও সরকারি চিঠিপত্র, ডায়রি ও কাগজপত্র, (৩) পুলিশ, গোয়েন্দা ও সরকারি কর্মচারীদের রিপোর্ট, (৪) বিভিন্ন সরকারি কমিশনের প্রতিবেদন প্রভৃতি। এগুলি থেকে সমসাময়িক বিভিন্ন ঘটনার পিছনে সরকারের ভূমিকা, মনোভাব, ভারতের জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপে সরকারের নজরদারি ইত্যাদির কথা জানা যায় ৷

 সরকারি নথিপত্রের গুরুত্ব :–

১) সরকারি প্রতিবেদন ও বিবরণ :– ভারতে কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানির সরকার বিভিন্ন বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক ও সামরিক ঘটনাবলির বিবরণ ও সরকারের সিদ্ধান্ত সংবলিত কাগজপত্র ও দলিলপত্র সংরক্ষণের নীতি গ্রহণ করে। কোম্পানির পরিচালক সভা ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে এজন্য একটি নির্দেশ প্রদান করে। কোম্পানির সিদ্ধান্তের ফলশ্রুতিতে দিল্লির জাতীয় মহাফেজখানা, কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বাই শহরের লেখ্যাগার গড়ে ওঠে ও নথি সংরক্ষিত হয়। এ ছাড়া ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে মহারানির প্রত্যক্ষ শাসন গ্রহণ পর্যন্ত ও তার পরের বহু দলিল যথাক্রমে লন্ডনের ‘ইন্ডিয়া অফিস’ ও ‘ভারত সচিব‘-এর দপ্তরে সংরক্ষিত।

২) বেসরকারি ও সরকারি চিঠিপত্র, ডায়রি ও কাগজপত্র : সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও আধিকারিকরা নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন চিঠিপত্র আদানপ্রদান করত। এগুলি থেকে ইতিহাসের বহু তথ্য জানা যায়। এগুলির মধ্যে লর্ড মেকলের চিঠিপত্র, লর্ড ডাফরিনের চিঠিপত্র, কোম্পানির চিঠিপত্র প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও বিভিন্ন ব্যক্তির লেখা চিঠিপত্র আধুনিক ইতিহাসচর্চার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধি, সুভাষচন্দ্র বসু, জওহরলাল নেহরু প্রমুখের চিঠি ইতিহাসের উপাদান হিসাবে উল্লেখযোগ্য।

৩) পুলিশ, গোয়েন্দা ও সরকারি কর্মচারীদের রিপোর্ট :– আধুনিক ভারতের ইতিহাসচর্চায় পুলিশ ও গোয়েন্দা রিপোর্টের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এই রিপোর্টগুলিতে ব্রিটিশ-বিরোধী গণআন্দোলন, গুপ্ত সমিতির কার্যকলাপ, বিপ্লবীদের কার্যকলাপ ইত্যাদি বিষয়ে সরকারের কাছে গোপন তথ্য সরবরাহ করা হত। নিক্সন রিপোর্ট, ডেনহ্যাম রিপোর্ট, সিডিশন রিপোর্ট ইত্যাদি থেকে ভারতের বৈপ্লবিক আন্দোলনের কথা জানা যায়।

৪) বিভিন্ন সরকারি কমিশনের প্রতিবেদন :– ব্রিটিশ শাসনকালে সরকার অর্থ, শিক্ষা, রাজস্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি কমিশন নিয়োগ করে। এগুলি থেকে আধুনিক ইতিহাসচর্চার বহু তথ্য জানা যায়। এগুলির মধ্যে ‘নীল কমিশন‘ (১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ), হান্টার কমিশন (১৮৮২ খ্রিস্টাব্দ), ‘সাইমন কমিশন‘ (১৯২৭ খ্রিঃ) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

 ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা :– সরকারি নথিপত্র আধুনিক ইতিহাসচর্চার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও এগুলি গ্রহণের সময় যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়, কারণ (i) এতে সরকারের বক্তব্যটুকুই গুরুত্ব পায়, (ii) অনেকসময় গোয়েন্দা ও পুলিশ রিপোর্টও ভুলে ভরা ও বিকৃত হয়, (iii) সরকারি নথিপত্রগুলি অধিকাংশই সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা। নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক তথ্য লাভের জন্য গবেষক ও ঐতিহাসিককে। যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

5.  আধুনিক ইতিহাসের উপাদান হিসেবে আত্মজীবনী ও স্মৃতি কথার গুরুত্ব উল্লেখ করো।   ০৪

উত্তর:  ইতিহাস লেখার জন্য বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করতে হয় তার মধ্যে লিখিত উপাদান হলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। লিখিত উপাদানের মধ্যে আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথার থেকে বহু তথ্য পাওয়া যায়।

 আত্মজীবনী ও স্মৃতি কথা কী? :– আত্মজীবনী স্মৃতিকথা গুলি এক এক ধরনের সাহিত্য লেখক তার চোখে দেখা বিভিন্ন ঘটনা ও নিজের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেন। প্রত্যেক আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথায় লেখকের ব্যক্তি জীবনে বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের পরিচয় ফুটে ওঠে। আবার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয় জানা যায়।

 আত্মজীবনী ও স্মৃতি কথার গুরুত্ব :–

১) প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ :– ইংরেজ শাসনকালে ভারতের বিভিন্ন জাতি ও নেতৃবিন্দ তাদের প্রত্যক্ষ করা বিভিন্ন ঘটনাবলী আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথায় লিখেছেন, যার উল্লেখ সরকারি নথিপত্রে পাওয়া যায় না। যেমন – বিপিনচন্দ্র পালের সত্তর বৎসর, মৌলানা আবুল কালাম আজাদের ইন্ডিয়া উইন্স ফ্রিডম প্রভৃতি।

২) রাজনীতি সংক্রান্ত তথ্য :– আত্মজীবনী ও স্মৃতিকতামূলক গ্রন্থের লেখক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না হলেও তাদের গ্রন্থে রাজনীতি সংক্রান্ত তথ্য উল্লেখ করে থাকেন। যেমন – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনস্মৃতি -তে হিন্দু মেলার কথার উল্লেখ পাওয়া যায়।

৩) সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তথ্য :– আধুনিক ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বহু তথ্য আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা মূলক গ্রন্থে পাওয়া যায়। যেমন – বিপিনচন্দ্র পালের সত্তর বৎসর  গ্রন্থে ব্রহ্মসমাজের সংস্কার আন্দোলনের কথা জানা যায়।

মূল্যায়ন :– তবে এইসব উপাদান ব্যবহারের ক্ষেত্রে লেখকের মানসিক অবস্থা, অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য লেখার ভুল-ভ্রান্তি লিখিত উপাদান প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় ও পরোক্ষ অভিজ্ঞতায় সংগৃহীত এবং লেখকের বিশ্বাসযোগ্যতা আছে কিনা সবটাই যাচাই করে তবেই ইতিহাস চর্চায় কাজে লাগাতে হবে। একক্ষেত্রে বলা যায় এগুলি শুধু তথ্য হিসেবেই নয় বিভিন্ন ঘটনার বিশ্লেষণের ও অন্যান্য ফাঁক ভরাট করতে আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা গুরুত্বপূর্ণ।

6.  আধুনিক ইতিহাসের উপদান হিসেবে বিপিনচন্দ্র পালের আত্মজীবনী “সত্তর বৎসর” গুরুত্বপূর্ণ কেনো?     ০৪

উত্তর:  ভারতের জাতীয়তাবাদী ও চরমপন্থী নেতা বিপিনচন্দ্র পালের আত্মজীবনী প্রবাসী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে ১৮৫৮ –৮০ খ্রী. পর্যন্ত সময়কালের পরিস্থিতি বর্ণিত হয়েছে। এই গ্রন্থটি প্রথমে প্রবাসী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এবং পরবর্তীকালে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। তাই এটি আধুনিক ভারতের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ গৌণ উপাদান হিসাবে গণ্য হয়েছে।

সত্তর বৎসর’ –এর গুরুত্ব :–

১) প্রথম জীবনের তথ্য :বিপিনচন্দ্র পালের আত্মজীবনী “সত্তর বৎসর”-এ রয়েছে তার প্রথম জীবনের বিভিন্ন তথ্য, যেমন- জন্ম, বংশপরিচয়, গ্রামে হিন্দু মুসলমানের সম্পর্ক,স্কুলের পড়াশুনা ইত্যাদি পাওয়া যায়।

২) সংস্কৃতি :– সত্তর বৎসর থেকে গ্রামীণ সংস্কৃতি অর্থাৎ দোল, দুর্গোৎসব, যাত্রা,গান, পূর্বন পাঠ বিবাহ প্রথার পাশাপাশি কলকাতা তৎকালীন সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও বিধি- নিষেধ, মদ্যপান ইত্যাদির কথা জানা যায় ।

৩) সমাজ সংস্কার :– উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে প্রচলিত সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এবং শিক্ষা বিস্তারে ব্রাহ্মসমাজের অবদানের কথা সত্তর বৎসরে উল্লেখিত, আছে এমনকি তিনি নিজেও যোগদান করেছিলেন সে কোথাও জানা যায়।

৪) সমকালীন রাজনীতি :– সত্তর বৎসর থেকে আনন্দমোহন বসু ও সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ছাত্র সভা গঠনের কথা, ভারত সভা গঠনের কথা ও নবগোপাল মিত্র প্রতিষ্ঠিত হিন্দু মেলা নামক জাতীয়তাবাদী প্রতিষ্ঠার কথা জানা যায়।

৫) শিক্ষাব্যবস্থা :– ‘সত্তর বৎসর’থেকে সমকালীন শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। সেই সময় প্রত্যেক গ্রামে টোল ও ফারসি শেখার জন্য মাদ্রাসা ও মক্তব ছিল। পূর্বে নবাবদের কাজকর্মের জন্য ফারসি-জানা লোকের প্রয়োজন হত বলে অনেক হিন্দু ছাত্র মাদ্রাসায় ফারসি শিখত। ইনি নিজেও প্রথমে ফারসি শেখার জন্য এক মৌলবির কাছে ভরতি হয়েছিলেন।

৬) সমাজে নারীশিক্ষা :– ‘সত্তর বৎসর’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, সেকালে মেয়েদের লেখাপড়া শেখার রীতি ছিল না। তখন কুসংস্কার ছিল মেয়েরা লেখাপড়া শিখলে বিধবা হয়। তবে উত্তরবঙ্গে এবং গৌড়ীয় বৈষুব সম্প্রদায়ের মধ্যে নারীশিক্ষা প্রচলিত ছিল।

উপসংহার :– উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের পথ বিবর্তনের সাক্ষী সত্তর বৎসর। বিপিনচন্দ্র পালই একমাত্র ব্যক্তি যিনি আত্মজীবনীতে দেশের কথা তুলে ধরেছেন।

7.  আধুনিক ইতিহাসের উপাদান হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী ‘জীবনস্মৃতি’ গুরুত্বপূর্ণ  কেন? ০৪

উত্তর:  আধুনিক ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্ম জীবনী ‘জীবনস্মৃতি’। লেখকর আত্মকথন প্রথমে প্রবাসী পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয় এবং পরবর্তীকালে এটি ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থাগারে প্রকাশিত হয়। এই আত্মজীবনীতে ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত লেখকের আত্মকথা ও দেশকথা বর্ণিত হয়েছে।

  ‘জীবনস্মৃতি’ –র গুরুত্ব :–

১) ঠাকুরবাড়ি অন্দরমহল :– আত্মজীবনীতে রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনস্মৃতি সূত্র ধরে ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে রুচি খাদ্যাভ্যাস ও পারিবারিক সম্পর্ক, বিধি নিষেধ, নারীদের স্বাধীনতা, শিশুদের জীবনযাত্রা, বালক রবীন্দ্রনাথের সংগীত চর্চা, বয়ঃপ্রাপ্তির কথা সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এগুলি আধুনিক বাংলার সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ।

২) স্বদেশিকতা :– আত্মজীবনীর স্বল্প পরিসরে স্বদেশীকতা নিয়ে অভ্যন্ত সরল ভাষায় তিনি অনাবদ্ধ আলোচনা করেছেন তা যেকোনো ইতিহাসে শিক্ষার্থীকে মুগ্ধ করে। সেই যুগে অভিজাত বাঙালি পরিবারে বিভিন্ন বিদেশি প্রথার প্রচলন শুরু হলেও স্বদেশীপতি অনুরাগ জাগ্রত ছিল। স্বয়ং তার কথায় আমাদের পরিবারে হৃদয়ের মধ্যে একটা স্বদেশী শক্তি ভিমান স্থির দীপ্তিতে জাগিতে ছিল।

৩) রাজনৈতিক ঘটনাগুলি :– জীবনস্মৃতিতে কবি রাজনারায়ন বসুর সভাপতি অনুষ্ঠিত স্বদেশীকতার গোপন সভা এবং তাতে ঠাকুরবাড়ির বালকদের যোগদান, দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে ধুতি ও পাজামা সমন্বয়ে একটি সর্বভারতীয় পরিচ্ছদ প্রচলনের চেষ্টা। স্বদেশীনায় বা কারখানায় বা কাপড়ের কল প্রতিষ্ঠায় যুবকদের উদ্দ্যোগ পদ্ধতি উল্লেখ করেছেন।

৪) হিন্দু মেলা প্রসঙ্গ : আত্মকথনে কবি নবগোপাল মিত্রের নেতৃত্বে হিন্দুমেলার প্রতিষ্ঠা ও তার কার্যকলাপে এক বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন।

৫) রাজনৈতিক তথ্য :– ‘জীবনস্মৃতি’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ সমকালীন রাজনৈতিক ঘটনাবলির বিস্তৃত বিবরণ দেননি। তিনি প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের দেশাত্মবোধক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতেন বলে এই গ্রন্থ থেকে জানা যায়।

  উপসংহার :– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘এই স্মৃতির ভাণ্ডারে অত্যন্ত যথাযথরূপে ইতিহাস সংগ্রহের চেষ্টা ব্যর্থ হইতে পারে।’ রবীন্দ্রনাথঠাকুরের এই গ্রন্থ থেকে ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেও আধুনিক ইতিহাসচর্চায় তাঁর জীবনস্মৃতির গুরুত্ব অপরিসীম। অসম্পূর্ণতা ও স্বল্প পরিসরে দোষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার একধারে সর্বকালীন সমাজ রাজনৈতিক জীবনের চলমান প্রতিচ্ছবি সহজ সরল সাবলীল ভাষায় রচিত তার এই আত্মজীবনের আধুনিক ইতিহাসকে চিত্রকর্ষক ও সমৃদ্ধ করে তুলেছে।

8.  আধুনিক ইতিহাসের উপাদান হিসেবে সরলা দেবী চৌধুরানীর আত্মজীবনী “জীবনের ঝরাপাতা” গুরুত্বপূর্ণ কেন? ০৪

উত্তর  সরলাদেবী চৌধুরানি ছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বোন স্বর্ণকুমারী দেবীর মেয়ে। তার আত্মজীবনী ‘জীবনের ঝরাপাতা-তে ব্যক্তিজীবনের কাহিনীর পাশাপাশি জাতীয় জীবনের কথাও জানা যায়। জীবনের ঝরাপাতা আত্মজীবনিটি প্রথমে ধারাবাহিকভাবে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আধুনিক ভারতে ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে ইহার থেকে অনেক মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়।

  ‘জীবনের ঝরাপাতা’ –র গুরুত্ব :–

১) ঠাকুর পরিবারের ইতিহাস :– ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের বিভিন্ন ঘটনা, যেমন – সঙ্গীত চর্চা, ঈশ্বরচর্চা, শিশুদের একসঙ্গে বাড়তে থাকা, ভৃত্যদের কাজকর্ম, উৎসব-অনুষ্ঠান, অতিথি অভ্যর্থনা প্রভৃতি এই গ্রন্থ থেকে জানা যায়। যা আধুনিক বাংলার সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

২) রাজনৈতিক ইতিহাস :– জীবনের ঝরাপাতা’ থেকে বিপ্লববাদী রাজনীতি ও ভারতের স্বদেশী আন্দোলনের কথা জানা যায় । ‘জীবনের ঝরাপাতা’য় সশস্ত্র ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নানা তথ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তিনি নিজেও এই ধরনের সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তা জীবনের ঝরাপাতা’ থেকে জানা যায়।

৩) সামাজিক পরিচয় :– জীবনের ঝরাপাতা থেকে উনবিংশ শতাব্দীতে নারীর অবস্থান, বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক বিধি-নিষেধ ও নারী শিক্ষা, নারী স্বাধীনতা প্রভৃতি বিষয় জানা যায়। তাছাড়াও তৎকালীন সময়ে সামাজিক ক্ষেত্রে নারীদের উপর বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ ছিল।

৪) স্বাদেশিকতা :– সরলাদেবী চৌধুরাণী স্বদেশি দ্রব্যের উৎপাদন ও ব্যবহারের প্রচার করার জন্য ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। তিনি ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে এলাহাবাদে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনের সময়ে নিখিল ভারত মহিলা সম্মেলন আহ্বান করেন এবং এই সম্মেলনের উদ্যোগে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে ‘ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নারীদের অবস্থার উন্নয়নের জন্য আন্তরিকভাবে সচেষ্ট ছিলেন।

  উপসংহার :– জীবনের ঝরাপাতা গ্রন্থটি নারী প্রগতি, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, ঠাকুরবাড়ি ও কলকাতার সমাজ জীবনের এক জীবন্ত দলিল। তবে জীবনের ঝরাপাতার কয়েকটি সীমাবদ্ধতা ছিল, এ কারণে এটা পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়।      

9.  ইতিহাসের উপাদান হিসেবে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার গুরুত্ব লেখো। ০৪

উত্তর      বঙ্গদর্শন পত্রিকা
ভূমিকা :– ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দের ১২ এপ্রিল বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয়।  বঙ্গদর্শন পত্রিকায় সাহিত্য রচনার পাশাপাশি ইতিহাস পুরাতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব, বিজ্ঞান ও বাঙালি জীবন চর্চা, প্রভৃতি বিষয় প্রকাশিত হয়। তাই বঙ্গদর্শন থেকে প্রাপ্ত উপাদানকে ইতিহাসের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

 ‘বঙ্গদর্শন পত্রিকা’ –র গুরুত্ব :–

১) কৃষক প্রজাদের দুরবস্থা :– বঙ্গদর্শন পত্রিকার বিভিন্ন প্রবন্ধে কৃষক প্রজাদের ওপর জমিদার মহাজন ও ব্রিটিশ কর্মচারীদের অত্যাচার ও শোষণের কথা তুলে ধরা হয়েছে। কৃষকদের অশিক্ষা ও দরিদ্রের সুযোগ নিয়ে কিভাবে ঋণের জ্বাল বেঁধে রাখতো তার পরিচয় পাওয়া যায়।

২) স্বার্থসংঘাত :– বঙ্গদর্শন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ব্রিটিশ শাসনকালে ইংরেজ শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে এর স্থান উদাসীন থাকায় কৃষক শ্রেণীর সঙ্গে শিক্ষিত মানুষের সামাজিক সংঘাত শুরু হয়।

৩) জাতীয়তা বোধের বিকাশ :– বাঙালি তথা ভারতীয়র মধ্যে জাতীয়তাবাদী বিকাশে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা গুরুত্ব ছিল উল্লেখযোগ্য। বঙ্কিমচন্দ্র ‘বন্দেমাতরম্’ দেশাবধক গান ‘আনন্দ মঠ’ উপন্যাস প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশ করেন।

৪) বাঙালির মান :- বঙ্গদর্শন পত্রিকার মাধ্যমে রাজনীতি, ধর্ম, সমাজ সংস্কৃতিতে বাঙালির মনোভাব বোঝা যায়। এই পত্রিকা সমকালীন শিক্ষিত বাঙালি সম্প্রদায়ের চিন্তাধারা তুলে ধরতো।

৫) সমকালীন তথ্য :– বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা থেকে সমকালীন সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, ধর্ম, সংস্কার আন্দোলন প্রভৃতি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। এই পত্রিকা থেকে ব্রিটিশ সরকারের শাসন ও শোষণের পরিচয় পাওয়া যায়।

৬) সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার প্রসার :– এই পত্রিকায় ‘সাম্য’-সহ বিভিন্ন প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এর ফলে বাঙালি সমাজে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার প্রসার ঘটে।

  উপসংহার :– বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রাচ্য-পাশ্চাত্য জ্ঞান চর্চায় পারদর্শী ছিলেন। তার পত্রিকা বাঙালির মানসিক জাগরণের সৃষ্টি করেছিল। বঙ্গদর্শন পত্রিকার সমকালীন বাঙালি জাতির সমাজ সংস্কৃতির ইতিহাসকে সমসীমায় প্রকাশিত করেন।

10.  আধুনিক ইতিহাসচর্চার উপাদানরূপে ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকার গুরুত্ব লেখো। ০৪

উত্তর  উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলায় প্রকাশিত সাময়িক পত্রিকাগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকা। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ নভেম্বর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অনুপ্রেরণায় ও সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের সম্পাদনায় এটি প্রকাশিত হয়। এই সংবাদপত্রটির কতকগুলি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। ইতিপূর্বের পত্রিকাগুলি শালীনতা বর্জিত, জটিল, গতানুগতিক, ধোঁয়াশাযুক্ত হলেও ‘সোমপ্রকাশ’ ছিল মার্জিত রুচি সম্পন্ন, এর ভাষা ছিল সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল, নির্ভীক সমালোচনায় ভরা। এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটি প্রতি সোমবার প্রকাশিত হত বলে এর নাম হয় ‘সোমপ্রকাশ’। এটি ছিল উদারপন্থী, শিক্ষিত বাঙালির প্রধান মুখপত্র।

  ‘সোমপ্রকাশ পত্রিকা’ –র গুরুত্ব :–  আধুনিক ইতিহাসচর্চায় ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকার গুরুত্ব অপরিসীম।

১) বিশুদ্ধ রাজনীতি :– বিশুদ্ধ রাজনৈতিক কথা আলোচনার ক্ষেত্রে যে সমস্ত পত্রিকার নাম আছে তাদের মধ্যে ‘সোমপ্রকাশ’ ছিল সর্বাগ্রগণ্য। এতে সরকার, জমিদার, মহাজনদের বঞ্চনা, শোষণ, অত্যাচারের কথা স্তারিতভাবে পাঠকদের কাছে তুলে ধরা হয়। এর ফলে পাঠকদের বুঝতে অনেক সুবিধা হতো। এছাড়াও আগ্রা দরবার, পুরসভা, দেশীয় ও ইওরোপীয় বিচারপতি, হিন্দু-মুসলমান সমস্যা, ব্রিটিশ শাসনের স্বরূপ, জাতীয় কংগ্রেস প্রভৃতি বিষয়ে নির্ভীক আলোচনার মাধ্যমে জনমত গঠনের গুরুদায়িত্ব পালন করে

২) কৃষকদের শোচনীয় অবস্থা :– এই পত্রিকায় ব্রিটিশ শাসকদের অত্যাচার, নীলকরদের অত্যাচার, জমিদার-মহাজনদের অত্যাচার ও বঞ্চনার ফলে চাষিদের শোচনীয় যে অবস্থা হয় তার কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। এর ফলে শিক্ষিত বাঙালি প্রতিবাদে সোচ্চার হয়।

৩) সমকালীন ও সামাজিক তথ্য :– এই পত্রিকা থেকে সমকালীন সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, ধর্ম, সংস্কার আন্দোলন প্রভৃতি বিষয়ে নানান গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। এই পত্রিকার মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের শাসন ও শোষণের কদর্য রূপের সঙ্গে সাধারণ ভারতীয়রা পরিচিত হয়। সামাজিক চেতনাবোধের জাগরণের ক্ষেত্রেও এই পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, কৌলিন্য প্রথা, মদ্যপানের বিরুদ্ধে ও বিধবা বিবাহ, নারীশিক্ষার প্রসারের পক্ষে প্রচার চালিয়ে এই পত্রিকা জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

৪) ব্রিটিশ বিরোধিতা :– সাম্রাজ্যবাদী শাসক লর্ড লিটন ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে ‘দেশীয় ভাষা সংবাদপত্র আইন’ বা ‘ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে ভারতবাসীর ব্রিটিশ-বিরোধিতা বন্ধ করার ব্যবস্থা করলে এবং ‘ইলবার্ট বিল’ প্রকাশ হলে এই পত্রিকা প্রতিবাদে সোচ্চার হয়।

 উপসংহার :– আধুনিক ভারতের ইতিহাসচর্চায় ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকা নিঃসন্দেহে এক মূল্যবান উপাদান। এর রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক মূল্য অপরিসীম। ব্রিটিশ-বিরোধী লেখা প্রকাশের দায়ে ‘সোমপ্রকাশ’ সংবাদপত্র আইনের কোপে পড়ে। তবে জরিমানা বা মুচলেকা দিতে রাজি না হওয়ায় পত্রিকাটির প্রকাশ বন্ধ করা হয়। পরে বাংলার লেফটন্যান্ট গভর্নর স্যার রিচার্ড টেম্পলের অনুরোধে পত্রিকাটির পুনঃপ্রকাশ হলেও তা পূর্বের জনপ্রিয়তা আর ফিরে পায়নি।

11.  ইতিহাসের বা গবেষণার তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের সুবিধা এবং অসুবিধা গুলি কি কি? ০৪

উত্তর:  কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমকে ইন্টারনেট বলে। বর্তমানে ইন্টারনেটের ব্যবহার দ্রুত হারে বেড়ে চলেছে কারণ ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটছে। ইন্টারনেটের সাহায্যে বিভিন্ন তথ্য খুব সহজে, বিনামূল্যে বা কম খরচে, ঘরে বসে পাওয়া যায়। তবে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে যেমন সুবিধা হয়েছে তেমন কিছু অসুবিধা রয়েছে, যেমন– ভুল তথ্য, সঠিক তথ্যের অভাব, পরস্পর বিরোধী তথ্য প্রভৃতি।

 ইন্টারনেটের সুবিধা :–

১) সহজলভ্য তথ্য :– ইন্টারনেটে খুব সহজেই ঘরে বসে দেশ-বিদেশ এককথায় গোটা পৃথিবীর তথ্য নিমেষের মধ্যেই পাওয়া যায়। এর ফলে খুব সহজে ইন্টারনেট থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ইতিহাস রচনা করা যায়।

২) সহজে তথ্য ও ছবি সংগ্রহ :– ইন্টারনেটে সাহায্যে কোন একটি ঘটনার মূল তথ্য এবং ঘটনার ছবি সহজেই পাওয়া যায়। এছাড়াও ইন্টারনেটের সাহায্যে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গার বিভিন্ন লাইব্রেরীর ওয়েবসাইট থেকে বিভিন্ন বইয়ের এবং প্রতিবেদনের কপি পাওয়া যায়।

৩) কম খরচ : ইন্টারনেটে বেশিরভাগ তথ্যই বিনামূল্যে পাওয়া যায়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেমন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বই সংগ্রহ করার জন্য স্বল্প অর্থ খরচ করতে হয়।

৪) কম সময় :– ইন্টারনেটে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি সুবিধা হল যে খুব কম সময়ের মধ্যে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।

 ইন্টারনেটের অসুবিধা :–

১) ভুল তথ্য :– ইন্টারনেটে থেকে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য কতটা বিশ্বাসযোগ্য বা নির্ভুল তা বুঝতে পারা খুবই কঠিন। তবে ইন্টারনেটে পাওয়া বেশিরভাগ তথ্যই সঠিক হয়ে থাকে।

২) বিরোধী তথ্য :– ইন্টারনেটে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে নির্ভর করতে হয় বিভিন্ন ওয়েবসাইটের ওপর। তবে বিভিন্ন ওয়েবসাইটের বিভিন্ন ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। এর ফলে তথ্যের বিরোধিতার সৃষ্টি হয়, যা ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।

৩) প্রযুক্তির অভাব :– ইন্টারনেটে তথ্য সংগ্রহের জন্য সর্ব প্রথমে প্রয়োজন বিভিন্ন যন্ত্র ও প্রযুক্তিগত সহায়তা, যা সব সময় সব জায়গায় পাওয়া সম্ভব নয় কারণ সব জায়গায় প্রযুক্তিগত উন্নতি সমান হয় না।

৪) অসম্পূর্ণ তথ্যে :– অনেক ক্ষেত্রেই ইন্টারনেটে কোন প্রয়োজনীয় ঘটনার উপর আংশিক তথ্য পাওয়া যায়, ফলে সেই ঘটনার বিষয় বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে অসুবিধা সৃষ্টি হয়।

উপসংহার :– ইন্টারনেট থেকে তথ্যসংগ্রহ করে ইতিহাস রচনা করতে গেলে ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত তথ্য যতটা সম্ভব মূল নথি বা উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া উচিত। তবেই প্রকৃত ইতিহাস রচনা করা সম্ভব হবে। তথ্যসংগ্রহের ক্ষেত্রে ইন্টারনেট একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। ইতিহাসের তথ্যসংগ্রহে ইন্টারনেট বিশেষভাবে সহায়ক। কিন্তু এই ব্যবস্থা ত্রুটিমুক্ত নয়।

 

আজকের পোস্টে মাধ্যমিক ইতিহাস প্রথম অধ্যায় ‘ইতিহাসের ধারণা’ থেকে ২/৪ নম্বর এর প্রশ্ন উত্তর  শেয়ার করা হল। প্রশ্নের উত্তর গুলি খুব সহজ ভাষায় করে দেওয়া হয়েছে, যেগুলি   পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়তা করবে।  

 

SOURCE-EDT

©Kamaleshforeducation.in (2023)

 

error: Content is protected !!
Scroll to Top