স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের বিদ্যালয়ে লেট করে উপস্থিত হওয়া অথবা বিদ্যালয় ছুটির আগেই চলে যাওয়ার নিয়মাবলী। অর্থাৎ LATE ARRIVAL and EARLY DEPARTURE এর নিয়মগুলি কেমন সেটা নিয়েই আজকের আলোচনা।
এটা নিয়ে আগে লেখা হয়েছে । তবুও বিষয়টি আর একবার বেছে নেওয়ার কারন হলো সাম্প্রতিক একটি খবর। লেট করে স্কুলে আসার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষককে নাকি গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেছেন এলাকার মানুষ। খবরের সত্যতা কতটা জানি না। তবে গতকাল থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর ছড়িয়েছে খবরটা।এভাবে আইন হাতে তুলে নেওয়া যায় কি না সে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আমি সেই প্রশ্নে যাচ্ছি না। আমি দেখতে চাইছি স্কুলের Rules অনুযায়ী টিচারদের এভাবে দেরী করে আসা বা আগে যাওয়া অপরাধ কি না। যদি হয় তাহলে কী শাস্তির বিধান আছে তার জন্য। কোন কোন ক্ষেত্রে এই নিয়মের ছাড় আছে। টিচারদের স্কুলে আসার ও স্কুল ছেড়ে যাওয়ার নির্ধারিত সময়টা ঠিক কী রকম।সব প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে দেওয়ার চেষ্টা করলাম।
——————————————————————————————-
১) প্রশ্ন – Late Attendance বলতে কী বোঝায় ?
উত্তর – বোর্ড ও এডুকেশন ডিপার্টমেন্ট এর নির্দেশিকা অনুযায়ী যে সময়সীমার মধ্যে স্বাভাবিক নিয়মে একজন কর্মীকে বিদ্যালয়ে হাজির হতেই হবে সেই সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর বিদ্যালয়ে হাজির হওয়াকে Late Attendance বলে।
২) প্রশ্ন – কোন সময়ের পরে বিদ্যালয়ে হাজির হলে Late Attendance বলে ধরা হবে ?
উত্তর – এত দিন বোর্ডের নির্দেশিকা ( মেমো নং – N/S/212 , DATED — 20/03/2013) অনুযায়ী বেলা 10 টা 50 এর পর থেকে 11 টা 05 পর্যন্ত বিদ্যালয়ে হাজির হলে Late Attendance ধরা হতো। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে WBBSE কর্তৃক প্রকাশিত Annual Academic Calendar Annual Academic Calender এর সঙ্গে দেওয়া নির্দেশিকা অনুযায়ী বর্তমানে বেলা 10 টা 40 এর পরে বিদ্যালয়ে হাজির হলে সেই দিনটা Late Attendance বলে ধরা হয়। সাধারনত লেট অ্যাটেনডেন্স হলে অ্যাটেনডেন্স খাতায় সইয়ের নীচে একটা লাল দাগ দিয়ে HOI সে দিনের Late Attendance মার্ক করেন।
৩) প্রশ্ন – কতক্ষণ পর্যন্ত Late Attendance দিয়ে সই করা যায় ?
উত্তর – বর্তমান নির্দেশিকা অনুযায়ী বেলা 11 টা 15 পর্যন্ত।
৪) প্রশ্ন – ১১ টা ১৫ এর পরে কেউ হাজির হলে কী হবে ?
উত্তর – সে দিন তাঁকে অ্যাটেনডেন্স খাতায় সই করতে হবে না এবং সেই দিনটি Absent হিসেবে ধরা হবে। সেই দিনটির জন্য উক্ত স্টাফকে নিজের কোনো ব্যক্তিগত ছুটি নিতে হবে।
৫) প্রশ্ন – কোন কর্তৃপক্ষ Late Attendance মকুব (condone) করতে পারেন ?
উত্তর – বিদ্যালয় প্রধান ( HOI)।
৬) প্রশ্ন – একটি ক্যালেন্ডার মাসে সর্বাধিক কতগুলি Late Attendance করা যায় ?
উত্তর – অর্ডারে কোনও দিন সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি। তবে একটি ক্যালেন্ডার মাসে প্রতি তিন দিন Late Attendance হলে একটি করে CL কাটা যাবে।
৭) প্রশ্ন – এক্ষেত্রে CL কাটা হবে মানে কি পরে কোনও একদিন সেই কর্মী উপস্থিত থাকবেন অথচ তাঁকে সই করতে না দিয়ে সেই দিনে তাঁর অ্যাটেনডেন্স খাতায় CL লিখে দেওয়া হবে ?
উত্তর – না, সেরকম কিছু করার দরকার নেই। ঐ বছরে তাঁর প্রাপ্য CL থেকে একটা CL কেটে নিতে হবে। অর্থাৎ ঐ বছরে তিনি 14 টির জায়গায় 13 টি CL পাবেন। দুটি CL কাটা হলে সেই বছর 12 টি CL পাবেন। এই ব্যাপারে HOI অ্যাটেনডেন্স খাতায় একটি নোট দিয়ে সই করবেন।
৮) প্রশ্ন – যদি কোনও স্টাফ মাসে তিন দিন Late Attendance করেন অথচ তাঁর তখন কোনও CL পাওনা না থাকে তাহলে কী ভাবে ছুটি কাটা হবে ?
উত্তর – সে ক্ষেত্রে HOI তাঁকে একটা হাফ এভারেজ পে লিভ এর জন্য আবেদন করতে বলবেন। তিনি যদি আবেদন করতে অস্বীকার করেন বা তাঁর হাফ এভারেজ পে লিভ জমা না থাকে তাহলে HOI আর কথা না বাড়িয়ে স্বতঃ প্রণোদিত হয়ে তাঁকে একটি Leave Without Pay বা এক্সট্রা অর্ডিনারি লিভ মঞ্জুর করে দেবেন পরবর্তী এমসি মিটিং এ । তারপর সার্ভিসবুক ও Leave Register এ এই ছুটি যথাযথভাবে নোট করে দেবেন। রেজোলিউশন হয়ে যাওয়ার পর সেই মাসে যদি তখনও স্যালারি রিকুইজিশন সাবমিট না করা হয়ে থাকে তাহলে স্যালারি রিকুইজিশন সাবমিট করার সময় IOSMS পোর্টালে পার্ট স্যালারি করে একদিনের স্যালারি কেটে দেবেন। যদি অন্য কোনো মাসে এই টাকা ফেরত দিতে হয় তাহলে HOI উক্ত স্টাফকে বলবেন TR 7 চালানে একদিনের বেতন ফেরত দিতে। সেটা Acquittance Roll ও সার্ভিসবুকে নোট করে দেবেন।
৯) প্রশ্ন – যদি কোনোও কর্মী নিয়মের ফাঁককে কাজে লাগিয়ে প্রতি ক্যালেন্ডার মাসে এক দিন কি দুই দিন করে Late Attendance করেন অর্থাৎ দেরী করে বিদ্যালয়ে আসেন তাহলে তার তো ছুটি কাটার নিয়ম নেই। সেক্ষেত্রে কী হবে ?
উত্তর – এডুকেশন ডিপার্টমেন্টের গেজেট নোটিফিকেশন মেমো নং- 215 SE, তারিখ -08/03/2018 এর Rule 4 এ টিচারদের Code of Conduct এ বলে দেওয়া হয়েছে যে টিচাররা অ্যাটেনডেন্স এর ব্যাপারে নিয়মানুবর্তী হবে। সুতরাং কেউ যদি কায়দা করে Late Attendance টা অভ্যাসে পরিণত করে ফেলে সে শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে পড়বে। তখন তার বিরুদ্ধে ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশান নেওয়ার জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ বোর্ডের কাছে সুপারিশ করতে পারবে।
১০) প্রশ্ন – উপরে টিচারদের স্কুলে আসা যাওয়ার যে নির্ধারিত সময়ের উল্লেখ করা হলো সেটাকে ভঙ্গ করে একজন টিচার বা নন টিচিং স্টাফ কি বিদ্যালয়ে আসতে পারেন এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই বিদ্যালয় ছেড়ে চলে যেতে পারেন ?
উত্তর – হ্যাঁ পারেন। স্কুলের কোনো অফিসিয়াল কাজে যদি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ( MC / Administrator/ HOI) কোনো স্টাফকে এমন কোনো কাজের দায়িত্ব দেন যেটা স্কুলের সময়ের মধ্যেই কিন্তু স্কুলের বাইরে কোথাও গিয়ে করতে হবে তাহলে সেই কাজ করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত স্টাফ তাঁর কাজ শেষ করে দেরিতে আসতে পারেন অথবা কাজটা করার জন্য আগে চলে যেতেও পারেন। গেজেট নোটিফিকেশন মেমো নং 214 SE, তারিখ -08/03/2018 বলছে যে HOI বা স্কুল কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দিলে যে কোনো স্টাফ যে কোনো অ্যাকাডেমিক ও অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাজ করবেন। অনেক অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাজই বর্তমানে স্কুলের বাইরে করতে হয়। তাই সেই কাজ করার জন্য কোনো স্টাফ নিয়োজিত হলে তাঁর ক্ষেত্রে এই টাইম মেনে Arrival/ Departure এর নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। এমনকি অফিসিয়াল কাজ করার জন্য কোনো স্টাফ অন ডিউটি ও পেতে পারেন। তাই কারন না জেনে শিক্ষক কেন দেরিতে এলেন সেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়া ঠিক কাজ হবে না।
১১) প্রশ্ন – অনেক সময় স্কুল কর্তৃপক্ষ বা HOI এর নির্দেশে অথবা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কোনও অফিসিয়াল কাজ করার জন্য কোনও কর্মীকে দেরী করে স্কুলে আসতে হতে পারে বা আগে বেরিয়ে যেতে হতে পারে। এক্ষেত্রে ARRIVAL/ DEPARTURE কী ভাবে অ্যাটেনডেন্স খাতায় নোট করতে হবে ?
উত্তর – এই ক্ষেত্রে সেই কর্মী যখন Arrival বা যখন Departure করছেন সেই সময়টা দিয়েই অ্যাটেনডেন্স খাতায় সই করবেন। পাশে সেই টাইমিং এর কারনটা লিখে HOI সই করে দেবেন। একই কথা ON DUTY এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য
১২) প্রশ্ন – Early Departure কাকে বলে ?
উত্তর – স্কুল ছুটি হয় বিকাল সাড়ে চারটার সময়। বোর্ডের নির্দেশিকা অনুযায়ী সাড়ে চারটার আগে কোনও কর্মী যদি স্কুল ত্যাগ করতে পারেন না। যদি করেন তাহলে সেটাকে Early Departure বলা হবে।
১৩) প্রশ্ন – Early Departure কি আইনসিদ্ধ ?
উত্তর – হ্যাঁ , করা যায়। গেজেট নোটিফিকেশন মেমো নং – 214 SE, তারিখ -08/03/2815 অনুযায়ী বলা যায় যে বিশেষ প্রয়োজনে কোনো স্টাফ HOI এর পারমিশন নিয়ে Early Departure করতে পারেন অর্থাৎ সাড়ে চারটের আগে বিদ্যালয় ছেড়ে চলে যেতে পারেন।
১৪ ) প্রশ্ন – Early Departure করতে গেলে কি করতে হয় ?
উত্তর – HOI এর কাছ থেকে পারমিশন নিতে হয়। লিখিত আবেদন করে।
১৫) প্রশ্ন – Early Departure করলে অ্যাটেনডেন্স খাতায় Departure time লিখতে হবে ?
উত্তর – হ্যাঁ, লিখতে হবে। পাশে HOI তাঁর Remarks লিখে সই করবেন।
১৬ ) প্রশ্ন – Late Attendance এর মতো এক মাসে তিনটের বেশি Early Departure এর ক্ষেত্রেও কি CL কাটা যায় ?
উত্তর – না। Early Departure এর সঙ্গে CL কাটার কোনও নিয়ম নেই।
১৭) প্রশ্ন – এক মাসে মোট কতগুলি Early Departure করা যায় ?
উত্তর – কোনও বাঁধাধরা নিয়ম নেই। কেবলমাত্র বিশেষ প্রয়োজনে HOI এর অনুমতি নিয়ে Early Departure করা যায়।
১৮ ) প্রশ্ন – তাহলে কেউ যদি HOI এর বিনা অনুমতিতে Early Departure করেন বা Early Departure কে একটা অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেন সে ক্ষেত্রে কি হবে ?
উত্তর – সেটা টিচারদের কোড অফ কন্ডাক্ট এর ভঙ্গ করা হবে। WBBSE তার 11/07/1980 তারিখের একটি অর্ডারে পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছে Early Departure কে অভ্যাসে পরিণত করে ফেললে তার দায়ে অভিযুক্ত স্টাফের বিরূদ্ধে ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশান নেওয়া হতে পারে।
১৯) প্রশ্ন – অনেকে টিফিনের সময় ( tiffin hours) কারোর অনুমতি না নিয়ে বিদ্যালয় থেকে নানা কারনে বেরিয়ে যান। এটা কি করা যায় ?
উত্তর – বোর্ড ( WBBSE) তার মেমো নং – DS (Aca) /370/M/57, তারিখ – 22/05/2023 দ্বারা বলে দিয়েছে যে স্কুলে সময়ানুবর্তিতা রক্ষা করার জন্য স্কুলের সমস্ত স্টাফ ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্টের অর্ডার ( মেমো নং – 3370 – F ( P2) , তারিখ – 20/05/2023 ) অনুযায়ী কাজ করবে। ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্টের উক্ত অর্ডারটিতে বলেছে একজন স্টাফ অফিসের সময় ( Office Hours ) অফিস হেডের পারমিশন ছাড়া অফিস ত্যাগ করতে পারবেন না। একজন কর্মী টিফিন ব্রেকটাকে ( 1.30 থেকে 2.00 ) শুধুমাত্র টিফিন করার কাজেই ব্যবহার করতে পারবেন , অন্য কোনো কাজে নয়। এই নিয়ম স্কুলের কর্মীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ একজন টিচিং বা নন টিচিং স্টাফ টিফিনের সময় শুধুমাত্র টিফিন করার উদ্দেশ্যেই বাইরে যেতে চাইলে বিদ্যালয় প্রধানের অনুমতি নিয়ে তবে যেতে পারবেন ।
বিঃ দ্রঃ – উপরে এতক্ষণ আইনের কথা হলো। নিয়ম নিয়ে আলোচনা হলো। এ কথা অনস্বীকার্য যে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও কাঠামো ধরে রাখার ক্ষেত্রে আইন বা নিয়মের গুরুত্ব অপরিসীম এবং যতদূর সম্ভব নিয়ম মেনেই চলা উচিত। কিন্তু স্কুল এমন একটা প্রতিষ্ঠান যেখানে শুধু ফাইল নড়া চড়ার কাজ হয় না। অনেক ধরনের , অনেক আর্থ সামাজিক অবস্থার, বিভিন্ন বয়সের stakeholders নিয়ে এটি প্রায় ছোটো খাটো একটি সমাজ। এখানে আইনের বাইরেও কিছু কথা থাকে। সেটা না থাকলে এটা প্রাণহীন হয়ে যায় ।এই সত্যটাও সবাইকেই বুঝতে হবে।