একটি বট গাছের আত্মকথা 

বাংলা প্রবন্ধ রচনা

Ekti Bot Gacher Atmakatha Rachana

Published on: 

প্রবন্ধ রচনা: একটি বট গাছের আত্মকথা| আজ   নিয়ে এলাম একটি কল্পনাধর্মী অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ প্রবন্ধ —“একটি বট গাছের আত্মকথা”। ক্ষুদ্র একটি চারা থেকে শতবর্ষী মহীরুহ হয়ে ওঠার পথে একটি বটগাছ কেবল প্রকৃতির অংশই নয়, সে হয়ে ওঠে গ্রামের ইতিহাস, মানুষের স্মৃতি, সমাজের পরিবর্তন ও সময়ের সাক্ষী।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক সহ বিভিন্ন পরীক্ষায় এই ধরনের আত্মকথনমূলক প্রবন্ধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই যারা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছ, তারা এই প্রবন্ধটি মনোযোগ দিয়ে পড়বে এবং প্রয়োজনে নিজের কাছে সংরক্ষণ করে রাখবে।

 

◆ বিষয়বস্তু ◆

1 প্রবন্ধ রচনা: শতায়ু বটগাছের আত্মকথা

1.1 ভূমিকা:

1.2 জন্ম ও শৈশব:

1.3 যৌবন ও বিস্তার:

1.4 সমাজজীবনের নীরব সাক্ষী:

1.5 জীবজগতের নিরাপদ আশ্রয়স্থল:

1.6 বর্তমানের আক্ষেপ ও শূন্যতা:

1.7 উপসংহার:

প্রবন্ধ রচনা: শতায়ু বটগাছের আত্মকথা

 

                                     “দাঁড়ায়ে আছ তুমি মহিমময়,
                                  কালের সাক্ষী হয়ে, হে মৃত্যুঞ্জয়!”

 

                                                      ভূমিকা:

 

প্রথম কবে আমি অঙ্কুরিত হয়ে অন্ধকার ভূমিগর্ভ থেকে পৃথিবীর আলো দেখেছিলাম তা ঠিক মনে পড়ে না, তবে শিশুচেতনায় এক আশ্চর্য শিহরণ আমার মধ্যে ছিল। আমার বয়স যে ঠিক কত, তা আজ আর আমার নিজেরও মনে নেই। হয়তো একশো কি দেড়শো বছর! আমার এই দীর্ঘ জীবনে আমি অনেক রোদ, বৃষ্টি, ঝড় দেখেছি।

কত প্রজন্মের উত্থান-পতন, কত হাসি-কান্না, কত ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে আমি আজও স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছি। আজ জীবনের এই গোধূলিবেলায় দাঁড়িয়ে বড্ড ইচ্ছে করছে, আমার এই সুদীর্ঘ জীবনের কিছু কথা তোমাদের শোনাই।

 

                                             জন্ম ও শৈশব:

 

আমার জন্মের গল্পটা বেশ অদ্ভুত। আমি কোনো মালির সযত্ন হাতের ছোঁয়ায় জন্মাইনি। অনেক অনেক বছর আগে, কোনো এক শ্রাবণের দুপুরে একটি ছোট্ট পাখি একটি পাকা বটফল মুখে করে উড়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার মুখ থেকে ফলটি খসে পড়ে এই শিবমন্দিরের পাশের নরম মাটিতে।

সেই ফলের ছোট্ট বীজ থেকেই আমার জন্ম। প্রথমদিকে আমি ছিলাম বড্ড ছোটো ও দুর্বল। ছাগল-গোরুর পায়ের চাপে কিংবা রোদের প্রখর তাপে আমার হয়তো মরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রকৃতির পরম মমতায়, রোদ-বৃষ্টির আশীর্বাদে আমি ধীরে ধীরে বড়ো হতে লাগলাম।

                         “কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ, কী মায়া গো —
                       কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।”

 

                                      যৌবন ও বিস্তার:

 

যৌবনে আমি ছিলাম এক বিশাল ও তেজি মহীরুহ। আমার শাখা-প্রশাখা চারদিকে দিগন্তের মতো ছড়িয়ে পড়ল। আমার শরীর থেকে অসংখ্য ঝুরি নেমে এল মাটিতে, যেন তারা আমাকে আরও শক্ত করে মাটির সঙ্গে জাপটে ধরতে চায়।

আমার ঘন সবুজ পাতাগুলো যখন বাতাসে দুলত, তখন মনে হতো যেন আমি আকাশের সাথে কথা বলছি। গ্রীষ্মের কাঠফাটা দুপুরে আমি আমার বিশাল ছায়া বিছিয়ে দিতাম ক্লান্ত পথিকের জন্য। আমার বুকভরা স্নিগ্ধতায় মানুষ জুড়াত তাদের দহনজ্বালা।

 

                         “মৃদু-ভাষে মিষ্টালাপ কর তুমি কত,
                           মিষ্টালাপি, দেহ-দাহ শীতলি যতনে !
                             দেব নহ; কিন্তু গুণে দেবতার মত।”

 

সমাজজীবনের নীরব সাক্ষী:

 

আমার এই দীর্ঘ জীবনে আমি এই গ্রামের মানুষদের সুখ-দুঃখের নিত্যসঙ্গী। একসময় আমার এই বিশাল ছায়ার নিচেই বসত গ্রামের পঞ্চায়েত বা সালিশি সভা। বিকেলের দিকে গ্রামের বয়স্করা এসে বসতেন, হুঁকো খেতেন আর নিজেদের যৌবনের গল্প করতেন।

রাখাল ছেলেরা দুপুরে গোরু চরাতে এসে আমার ডালে উঠে লুকোচুরি খেলত, আমার ঝুরি ধরে দোল খেত। কত চৈত্র সংক্রান্তির মেলা, কত আনন্দ-উৎসব, কত নববধূর পালকি আমার সামনে দিয়ে গেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আমি যেন এই গ্রামের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ও স্নেহশীল অভিভাবক।

 

জীবজগতের নিরাপদ আশ্রয়স্থল:

 

শুধু মানুষ নয়, আমি ছিলাম অসংখ্য পশুপাখির এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল ও সংসার। আমার ডালে ডালে ছিল শালিক, চড়াই, কাক আর কত নাম-না-জানা পাখির বাসা। কাঠবিড়ালিরা সারাদিন আমার গায়ে ছুটে বেড়াত।

 

          “আমি বৃক্ষ, আমি প্রাণ, আমিই ধরণীর শ্যামল আচ্ছাদন,
         নীরবে সয়েছি ঝড়, বিলিয়েছি ছায়া আর অবারিত জীবন।”

 

আমার কোটরে বাস করত সাপ আর নানা পোকামাকড়। আমি ছিলাম তাদের কাছে পরম মমতাময়ী মায়ের মতো। ভোরবেলা তাদের কলকাকলিতেই আমার ঘুম ভাঙত, আমার প্রতিটি দিন হতো আনন্দময়।

 

                                  বর্তমানের আক্ষেপ ও শূন্যতা:

 

কিন্তু আজ সময় বদলেছে। আমার চারপাশে আজ আর সেই সবুজ প্রান্তর নেই, সেখানে গজিয়ে উঠেছে কংক্রিটের জঙ্গল। চওড়া পিচঢালা রাস্তা তৈরি করতে গিয়ে আমার অনেক গাছ-ভাইদের নির্মমভাবে কেটে ফেলা হয়েছে। গ্রামের মানুষগুলো আজ অনেক ব্যস্ত।

তাদের হাতে আর সময় নেই আমার ছায়ায় এসে একটু বসার বা দুটো কথা বলার। রাখাল ছেলেরা এখন আর আমার ঝুরি ধরে দোল খায় না, তারা মোবাইলে মুখ গুঁজে থাকে। পাখিদের সংখ্যাও কমে গেছে। আমার বুকে আজ বড্ড শূন্যতা আর একাকীত্ব।

                                                  উপসংহার:

 

আমি জানি, আমার সময় ফুরিয়ে আসছে। আমার শরীরে আজ উইপোকার বাসা, বয়সের ভারে আমি আজ বড্ড ক্লান্ত। হয়তো কোনো এক কালবৈশাখীর প্রবল ঝড়ে কিংবা মানুষেরই কুঠারের আঘাতে আমার এই বিশাল দেহ লুটিয়ে পড়বে মাটিতে।

কিন্তু তাতে আমার কোনো আক্ষেপ বা রাগ নেই। কারণ, আমি আমার জীবন দিয়ে এই পৃথিবীকে কেবল দিয়েই গেছি, বিনিময়ে কিছুই চাইনি। আমার যাওয়ার পরে যদি কেউ আমার এই নিঃস্বার্থ ছায়ার কথা একটু ভালোবাসায় মনে রাখে, তবেই আমার এই দীর্ঘ জীবন সার্থক হবে।

 

                                    “দিয়েছি যা কিছু ছিল মোর,
            নিয়েছি কেবলই ধুলো-মাটি-রোদ আর অন্ধকারের ঘোর।”

 

 SOURCE-EDT

©kamaleshforeducation.in(2023)

error: Content is protected !!
Scroll to Top