

একটি কলমের আত্মকথা :
প্রবন্ধ রচনা
Ekti Kolomer Atmakatha
Published on:
প্রবন্ধ রচনা: একটি কলমের আত্মকথা | আজ হাজির করছি একটি কল্পনাভিত্তিক অথচ গভীর ভাবসম্পন্ন আত্মকথনমূলক প্রবন্ধ— “একটি কলমের আত্মকথা”। মানুষ যেমন তার জীবনযাত্রার নানা অভিজ্ঞতা, সাফল্য-ব্যর্থতা আর অনুভূতির গল্প বলতে পারে, তেমনি একটি সাধারণ কলমও নীরবে সাক্ষী থাকে অসংখ্য ইতিহাস, স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সৃষ্টির মুহূর্তের।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকসহ বিভিন্ন পরীক্ষায় এই ধরনের আত্মকথনমূলক প্রবন্ধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই যারা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছ, তারা এই প্রবন্ধটি মনোযোগ দিয়ে পড়বে এবং প্রয়োজনে নিজের কাছে সংরক্ষণ করে রাখবে।
◆ বিষয়বস্তু ◆
1 প্রবন্ধ রচনা: একটি কলমের আত্মকথা
1.1 ভূমিকা:
1.2 জন্ম ও কারখানার দিনগুলি:
1.3 দোকানে আগমন ও নতুন জীবন:
1.4 সুখ-দুঃখের সঙ্গী ও কর্মময় যৌবন:
1.5 বার্ধক্য ও অবহেলা:
1.6 উপসংহার:

প্রবন্ধ রচনা: একটি কলমের আত্মকথা
“অসির চেয়ে মসি বড় — এ কথা সর্বজনবিদিত,
অজ্ঞানতার আঁধার কাটে, আমার কালির আঁচড়ে নিত্য।”
ভূমিকা:
আমি একটি কলম। মানুষের মনের ভাব প্রকাশের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী, সভ্যতার নীরব রূপকার। আজ আমি তোমাদের পড়ার টেবিলের এক কোণে, একটি পুরোনো কলমদানিতে পড়ে আছি। আমার শরীরে এখন আর সেই আগের জৌলুস নেই, কালির জোরও ফুরিয়ে এসেছে। তবু একসময় এই আমিই ছিলাম কারও স্বপ্নের সারথি। আজ অবসরের এই অলস মুহূর্তে আমার ফেলে আসা জীবনের গল্প তোমাদের শোনাতে ইচ্ছে করছে।
জন্ম ও কারখানার দিনগুলি:
আমার জন্ম হয়েছিল শহরের এক বিশাল কারখানায়। প্লাস্টিক গলিয়ে তৈরি হলো আমার সুন্দর নীল রঙের শরীর। তারপর আমার পেটের ভেতর সযত্নে ভরে দেওয়া হলো গাঢ় নীল কালির রিফিল। মুখে পরানো হলো একটি চকচকে রুপোলি খাপ বা টুপি।
কারখানার শেষে যখন আমাকে সুন্দর একটি বাক্সে অন্যান্য বন্ধুদের সঙ্গে প্যাক করা হলো, তখন আমার সে কী আনন্দ! এরপর একটি ট্রাকে চেপে আমরা এসে পৌঁছালাম শহরের এক বড়ো স্টেশনারি দোকানের কাঁচের শোকেসে।
“জন্ম আমার কারখানায়, কিন্তু আমার প্রকৃত সার্থকতা লুকিয়ে থাকে মানুষের হাতের মুঠোয়।”
দোকানে আগমন ও নতুন জীবন:
দোকানের শোকেসে আমি দিনকয়েক ছিলাম। আমার গা থেকে তখন নতুন প্লাস্টিকের গন্ধ বেরোচ্ছে। একদিন এক মেধাবী ছাত্র দোকানে এসে আমাকে কিনে নিল। আমার দাম ছিল মাত্র দশ টাকা, কিন্তু ওই ছাত্রটির কাছে আমি ছিলাম অমূল্য রতন। সে আমাকে তার জামার পকেটে সযত্নে রাখত। তার হাতের উষ্ণ ছোঁয়ায় আমার নতুন কর্মময় জীবনের শুরু হলো।
সুখ-দুঃখের সঙ্গী ও কর্মময় যৌবন:
আমার যৌবন ছিল ভীষণ কর্মব্যস্ত। মালিকের খাতার পাতায় আমি দিনের পর দিন কত প্রশ্নের উত্তর লিখেছি, কত অঙ্কের সমাধান করেছি তার ইয়ত্তা নেই। পরীক্ষার হলে যখন ঘড়ির কাঁটা দ্রুত এগোত, তখন মালিকের আঙুলের চাপে আমিও খাতার ওপর দিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটে চলতাম।
তার সাফল্যের প্রতিটি নম্বরে মিশে আছে আমার কালির ঘাম। শুধু পড়াশোনা নয়, মাঝে মাঝে লুকিয়ে লেখা কোনো কবিতায় বা ডায়েরির পাতায় তার মনের গোপন কথাও আমিই লিখে দিতাম। আমি ছিলাম তার না-বলা কথার একমাত্র বিশ্বাসী সাক্ষী।
“আমার শিরায় বইতে থাকা নীল বা কালো কালি যেন মানুষের হৃদয়েরই আবেগ—কখনো তা বিপ্লবের ডাক, কখনো বা বিষাদের কান্না।”
বার্ধক্য ও অবহেলা:
কিন্তু পৃথিবীতে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। একটানা লিখে লিখে একদিন আমার পেটের কালি ফুরিয়ে আসতে লাগল। আমার নীল রঙের চকচকে শরীরটাও আগের মতো আর মসৃণ নেই, মালিকের দাঁতের কামড়ে আমার পিছনের দিকটা এবড়োখেবড়ো হয়ে গেছে।
যখন আমার কালি পুরোপুরি শেষ হয়ে গেল, তখন মালিক আমাকে আর পকেটে রাখল না। একটা নতুন, আরও দামি কলম আমার জায়গা দখল করে নিল। আর আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হলো এই পুরোনো কলমদানিতে।

উপসংহার:
আজ আমি এখানে বড়ো একা, বড়ো ক্লান্ত। কিন্তু আমার মনে কোনো আক্ষেপ নেই। কারণ আমি জানি, সৃষ্টির এটাই নিয়ম। আমি আজ ফুরিয়ে গেছি ঠিকই, কিন্তু আমার কালির আঁচড়ে যে লেখাগুলো খাতায় বন্দি হয়ে আছে, তা তো চিরকাল থেকে যাবে। আমার কালির সাহায্যেই তো আমার মালিক একদিন বড়ো মানুষ হবে। নিজেকে পুড়িয়ে অন্যকে আলো দেওয়াই তো আমার ধর্ম। একজন সামান্য কলম হিসেবে এর চেয়ে বড়ো সার্থকতা আর কী হতে পারে!
“কালির আঁচড়ে লিখেছি ইতিহাস, এঁকেছি কত স্বপ্ন,
ফুরিয়ে গিয়েও আমি বেঁচে রব, আমি যে অক্ষত রত্ন।”
SOURCE-EDT
|
|



