ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি জীবনী ও কর্মগাথা (বক্তৃতা)

Syama Prasad Mukherjee Jiboni Bengali 

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় জীবনী

Updated on: 

স্মৃতিতে শ্যামাপ্রসাদ — এই শিরোনামটি শুধু একটি প্রবন্ধের নাম নয়, এটি একটি জাতির কৃতজ্ঞতার প্রকাশ, একটি বেদনার অভিব্যক্তি। প্রবন্ধের মাধ্যমে আমরা শুধু একজন নেতার জীবনী নয়, বরং একটি যুগের ইতিহাস, একটি দর্শনের বিকাশ এবং একটি আত্মত্যাগের কাহিনি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আগ্রহী পাঠকদের জন্য এই নিবন্ধটি একটি নির্ভরযোগ্য ও তথ্যসমৃদ্ধ উৎস; তাঁর স্মৃতি, আদর্শ ও কর্মগাথা আগামী প্রজন্মের কাছে চিরকাল প্রেরণার আলো হয়ে থাকবে।

 

◆ বিষয়বস্তু ◆

1 ভারত কেশরী ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির জীবনী ও কর্মগাথা | শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় জীবনী

1.1 ◆ ভূমিকা ◆

1.2 ◆ জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

1.3 ◆ শিক্ষাজীবন — মেধার উজ্জ্বল দীপ্তি

1.4 ◆ রাজনৈতিক জীবন — ইস্পাতদৃঢ় সংকল্পের যাত্রা

1.5 ◆ ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠা — নতুন অধ্যায়ের সূচনা

1.6 ◆ স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান — দেশের জন্য সংগ্রাম

1.7 ◆ পশ্চিমবঙ্গ গঠনে অবদান — বাংলার রক্ষাকর্তা

1.8 ◆ কাশ্মীর সমস্যা ও চূড়ান্ত বলিদান — অমর শহিদ

1.9 ◆ লেখালেখি ও চিন্তাজগৎ — কলম ও তরবারি

1.10 ◆ উত্তরাধিকার — যা রয়ে গেল

1.11◆ উপসংহার ◆

ভারত কেশরী ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির জীবনী ও কর্মগাথা 

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় জীবনী

 

“ভারত আমার মাতৃভূমি, এই মাতৃভূমির জন্য আমি সর্বস্ব উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। জাতীয় ঐক্য ও সার্বভৌমত্বের জন্য আমি প্রাণ দিতেও কুণ্ঠিত নই।” ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি

 

◆  ভূমিকা  ◆

 

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় কিছু মানুষের নাম সোনার হরফে লেখা থাকে — যাঁরা শুধু নেতা নন, যুগপ্রবর্তক। যাঁদের জীবন শুধু ব্যক্তিগত উচ্চতার গল্প নয়, সমগ্র জাতির সংগ্রামের মহাকাব্য। ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন — যাঁর নাম উচ্চারণ করলে আজও বুকের ভেতর কোথাও একটা স্পন্দন জেগে ওঠে, আজও মনে হয় যেন অদৃশ্য কোনো শঙ্খধ্বনি বাজে।

ডঃ শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন একাধারে মনীষী, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, রাজনীতিবিদ এবং এক অদম্য দেশপ্রেমিক। বাংলার গর্ব, ভারতের কেশরী — এই অভিধাগুলো তাঁর জন্যই তৈরি হয়েছে। স্বাধীনতার পরবর্তী ভারতকে একটি সংহত, ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি।

 

◆  জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

 

১৯০১ সালের ৬ই জুলাই কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত বাঙালি হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। তাঁর পিতা ছিলেন বিখ্যাত বিচারপতি স্যার আশুতোষ মুখার্জি — যাঁকে বলা হতো ‘বাংলার বাঘ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে আশুতোষ মুখার্জি শিক্ষার যে আলো জ্বেলেছিলেন, তারই উত্তরাধিকারী হয়ে গড়ে উঠলেন শ্যামাপ্রসাদ।

পিতার মহান আদর্শ ও মায়ের অকুণ্ঠ স্নেহ — এই দুইয়ের মেলবন্ধনে তৈরি হয়েছিল শ্যামাপ্রসাদের মানস। ছোটোবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, সংস্কৃতিমনা এবং দেশের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত। পারিবারিক পরিবেশই তাঁর মধ্যে জাতীয়তাবোধের বীজ রোপণ করেছিল।

 

“পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমি চেয়েছিলাম শিক্ষার আলোয় এই দেশকে আলোকিত করতে। কিন্তু দেশের ডাক পড়লে শিক্ষার মশাল ছেড়ে রাজনীতির যুদ্ধক্ষেত্রে নামতেও আমি প্রস্তুত।” — শ্যামাপ্রসাদ

 

◆  শিক্ষাজীবন — মেধার উজ্জ্বল দীপ্তি

 

শ্যামাপ্রসাদের শিক্ষাজীবন ছিল এক উজ্জ্বল মেধার গল্প। ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক হন তিনি, সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে। এরপর আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৯২৪ সালে বার-অ্যাট-ল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ইংল্যান্ড থেকে। মাত্র তেইশ বছর বয়সে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৩৪ সালে মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সে শ্যামাপ্রসাদ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিযুক্ত হন — ভারতে সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য হিসেবে। পিতার প্রতিষ্ঠিত এই মহান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তিনি আরও উচ্চতায় নিয়ে যান। বাংলা মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার প্রচলনে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। তাঁর নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাভাষার মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর এই অবদান শুধু প্রশাসনিক ছিল না — তিনি নিজেও ছিলেন একজন পণ্ডিত। সংস্কৃত, ইংরেজি, বাংলা — একাধিক ভাষায় তাঁর দক্ষতা ছিল অসাধারণ। এই বহুমুখী মেধাই তাঁকে পরবর্তী জীবনে একজন অসামান্য রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

 

◆  রাজনৈতিক জীবন — ইস্পাতদৃঢ় সংকল্পের যাত্রা

 

শ্যামাপ্রসাদের রাজনীতিতে প্রবেশ ছিল অনেকটা অগ্নিতে ঝাঁপ দেওয়ার মতো — জেনেশুনে, স্বেচ্ছায়, দেশের প্রয়োজনে। ১৯২৯ সালে তিনি প্রথমবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা আইনসভায় নির্বাচিত হন। ধীরে ধীরে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হন, কিন্তু পরবর্তীতে মতভেদের কারণে কংগ্রেস ছেড়ে নিজের পথ তৈরি করেন।

১৯৩৭ সালে বাংলার ফজলুল হক সরকারে মন্ত্রী হিসেবে শ্যামাপ্রসাদ যোগ দেন। কিন্তু ১৯৪২ সালে মহাত্মা গান্ধীর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে সাড়া না দেওয়া নিয়ে মতভেদ সৃষ্টি হলে তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর ১৯৪৩ সালে তিনি হিন্দু মহাসভার সভাপতি নির্বাচিত হন এবং সেই সময় থেকেই তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আরও স্পষ্ট হতে থাকে।

আমি কোনো দলের মানুষ নই, আমি ভারতের মানুষ। আমার কাছে ভারতমাতার স্বার্থই সর্বোচ্চ — দল, পদ, প্রতিষ্ঠা সবকিছু তার নিচে।ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, ভারতীয় সংসদে

 

স্বাধীনতার পর ভারতের প্রথম মন্ত্রিসভায় শ্যামাপ্রসাদ শিল্প ও সরবরাহমন্ত্রী হিসেবে নেহরু সরকারে যোগ দেন। এটি ছিল এক ঐতিহাসিক সংযোগ — দুটি ভিন্ন আদর্শের দুই মহান নেতার একই ছাদের নিচে কাজ করার প্রচেষ্টা। কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে নেহরু-লিয়াকত চুক্তিকে (১৯৫০) কেন্দ্র করে মতভেদ চরমে পৌঁছায়। শ্যামাপ্রসাদ মনে করতেন এই চুক্তি পাকিস্তানে নির্যাতিত হিন্দুদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। ফলে ১৯৫০ সালের ৬ই এপ্রিল তিনি মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন।

 

এই পদত্যাগ ছিল তাঁর ইস্পাতদৃঢ় সংকল্পের প্রকাশ। ক্ষমতার লোভ তাঁকে কখনো বাঁধতে পারেনি। তিনি বিশ্বাস করতেন যে আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়া মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ।

 

◆  ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠা — নতুন অধ্যায়ের সূচনা

 

১৯৫১ সালের ২১শে অক্টোবর ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভারতীয় জনসংঘ’ — যা আজকের বিজেপির (ভারতীয় জনতা পার্টি) পূর্বসূরি। এই দল প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিল একটাই লক্ষ্য — ‘এক দেশ, এক বিধান, এক নিশান’। ভারতকে একটি সত্যিকারের সংহত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল তাঁর রাজনৈতিক স্বপ্ন।

জনসংঘের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে চেয়েছিলেন। তাঁর বক্তৃতায় থাকত মাটির গন্ধ, জনতার ভাষা, সাধারণের স্বপ্ন। সংসদে তাঁর ভাষণ ছিল তুলনাহীন — শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে তিনি এমন এক ঝড় তুলতেন যা সরকারি বেঞ্চকেও কাঁপিয়ে দিত।

 

“ভারতীয় সংসদে একটিও এমন বিরোধী কণ্ঠস্বর থাকা উচিত যা সরকারের প্রতিটি ভুলকে প্রশ্ন করতে পারে, প্রতিটি অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে। সেই কণ্ঠস্বর হওয়াটাই আমার দায়িত্ব।” — ডঃ শ্যামাপ্রসাদ, লোকসভায়

 

লোকসভায় তাঁর বক্তৃতা শুনতে সংসদ সদস্যরা ভিড় করতেন। এমনকি বিরোধীপক্ষের অনেকেও তাঁর যুক্তির তীক্ষ্ণতায় মুগ্ধ হতেন। তিনি ছিলেন এক দুর্দমনীয় বিরোধী নেতা — যাঁর প্রতিটি কথায় থাকত দেশের প্রতি অপার ভালোবাসা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অগ্নিশপথ।

 

◆  স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান — দেশের জন্য সংগ্রাম

 

শ্যামাপ্রসাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান ছিল বহুমাত্রিক। ১৯৪২ সালে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সময় বাংলায় মুসলিম লীগ-কংগ্রেস বিরোধের প্রেক্ষাপটে তাঁর ভূমিকা ছিল জটিল কিন্তু উল্লেখযোগ্য। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পাশাপাশি হিন্দু স্বার্থ রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে বাংলার দুর্ভিক্ষে তিনি সাধারণ মানুষের পাশে থেকে ত্রাণকার্যে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ মৃত্যুর মুখে পড়েছিল, তখন শ্যামাপ্রসাদ রাস্তায় নেমে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন।

তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ভারত ভাগের বিরুদ্ধে, বিশেষত বাংলা ভাগের পক্ষে তাঁর অনমনীয় অবস্থান। তিনি বিশ্বাস করতেন যে অখণ্ড ভারত থেকে বাংলার একটি হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে রক্ষা করা না গেলে পূর্ব বাংলার হিন্দুরা সম্পূর্ণ নিঃসহায় হয়ে পড়বেন।

 

যদি দেশ ভাগ হয়ই তবে বাংলাও ভাগ হোক। পাকিস্তানে হিন্দুদের থাকার কোনো উপায় নেই। পশ্চিমবঙ্গ যেন ভারতের অংশ থাকে — এটাই আমার একমাত্র দাবি। — — ডঃ শ্যামাপ্রসাদ, ১৯৪৭

 

◆  পশ্চিমবঙ্গ গঠনে অবদান — বাংলার রক্ষাকর্তা

 

পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নাম অমোচনীয়ভাবে লেখা আছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় যখন অখণ্ড ভারত আর রাখা গেল না, তখন শ্যামাপ্রসাদ প্রাণপণে লড়েছিলেন যাতে অন্তত বাংলার হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলো ভারতে থাকে।

তিনিই মূলত বাংলা ভাগের দাবিতে সোচ্চার হন এবং এই দাবি রূপায়ণে সক্রিয় ভূমিকা নেন। ১৯৪৭ সালের ২০শে জুন বাংলা বিধানসভায় বাংলা ভাগের প্রস্তাব পাস হয় — এর পেছনে শ্যামাপ্রসাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টা ছিল। পশ্চিমবঙ্গ নামক এই ভূখণ্ড ভারতের অংশ হিসেবে রক্ষা পায় তাঁরই অদম্য লড়াইয়ের ফলে।

শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী না থাকলে আজকের কলকাতা, আজকের পশ্চিমবঙ্গ হয়তো পাকিস্তানের অংশ হয়ে যেত। এটা অনস্বীকার্য যে পশ্চিমবঙ্গ প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতাকে পাকিস্তানের হাত থেকে রক্ষা করার যে লড়াই তিনি করেছিলেন, সেই লড়াইয়ের কথা প্রতিটি বাঙালির মনে রাখা উচিত।

 

◆  কাশ্মীর সমস্যা ও চূড়ান্ত বলিদান — অমর শহিদ

 

শ্যামাপ্রসাদের জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায় হলো কাশ্মীর প্রসঙ্গ। স্বাধীনতার পর জম্মু ও কাশ্মীরে প্রবেশের জন্য আলাদা পারমিটের ব্যবস্থা চালু ছিল — যা শ্যামাপ্রসাদের কাছে ছিল ভারতের ঐক্যের পরিপন্থী।

এক দেশে দুই বিধান, দুই প্রধান, দুই নিশান — নহি চলেগা! কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ভারতীয় হিসেবে বিনা পারমিটে কাশ্মীরে প্রবেশ করা আমার অধিকার। এই অধিকার আদায় করতে আমি জীবন দিতেও রাজি।” ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, সংসদে

এই বক্তব্যকে কাজে পরিণত করতে ১৯৫৩ সালের মে মাসে শ্যামাপ্রসাদ পারমিট ছাড়াই কাশ্মীরে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন। সীমান্তে গ্রেফতার করা হয় তাঁকে। জম্মুতে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখা হয়। কোনো বিচার নেই, কোনো অভিযোগনামা নেই — শুধু বন্দিত্ব।

বন্দি অবস্থায় তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে। ২৩শে জুন, ১৯৫৩ — মাত্র বায়ান্ন বছর বয়সে হেফাজতে মৃত্যু হয় ভারত কেশরীর। এই মৃত্যু কি স্বাভাবিক ছিল? এই প্রশ্ন আজও অনেকের মনে ঘোরে। কোনো স্বাধীন তদন্ত হয়নি, কোনো ময়নাতদন্তের রিপোর্ট সন্তোষজনক ছিল না।

একজন মানুষ যিনি পুরো জীবন দেশের জন্য উৎসর্গ করলেন, তাঁকে মারা যেতে হলো বন্দি অবস্থায় — এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে? কিন্তু এই মৃত্যুও তাঁকে অমর করে দিয়ে গেল। শহিদ হয়ে তিনি হয়ে উঠলেন কোটি কোটি ভারতীয়ের হৃদয়ের প্রেরণা।

 

◆  লেখালেখি ও চিন্তাজগৎ — কলম ও তরবারি

 

শ্যামাপ্রসাদ শুধু রাজনীতিবিদই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বিদগ্ধ লেখক ও চিন্তাবিদ। তাঁর লেখায় সর্বদা দেশপ্রেমের উত্তাপ, জাতীয়তাবাদের তেজ এবং বাংলা ভাষার প্রতি গভীর মমত্ব পরিস্ফুট হতো।

তিনি বাংলা মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার প্রসারে যে লেখালেখি করেছেন তা তৎকালীন সমাজে বৈপ্লবিক প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধ ও বক্তৃতাগ্রন্থে সংকলিত রয়েছে ভারতীয় রাজনীতি ও সমাজ সম্পর্কে তাঁর গভীর দৃষ্টিভঙ্গি। আমার চিন্তা ও কর্ম‘, ‘রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি‘ — এই ধরনের লেখায় তিনি ভারতীয় সভ্যতার মূলশিকড়ের কথা বলেছেন।

তাঁর বক্তৃতা ছিল মুক্তার মালার মতো — একেকটি শব্দ একেকটি মুক্তো। সংসদে তাঁর ভাষণের রেকর্ড আজও ভারতীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। শব্দের সঙ্গে যুক্তি, আবেগের সঙ্গে তথ্য — এই সমন্বয়ই ছিল তাঁর বক্তৃতার শক্তি।

“বাংলা শুধু একটি ভাষা নয়, এটি একটি সভ্যতার বাহক। এই ভাষায় জ্ঞান না থাকলে বাঙালি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে যাবে। তাই বাংলা মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা আমার কাছে জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন।” — শ্যামাপ্রসাদ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষণে

 

তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূলে ছিল সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের ধারণা — ভারত শুধু একটি ভূখণ্ড নয়, এটি একটি সভ্যতা, একটি সংস্কৃতির উত্তরাধিকার। এই দর্শনই পরবর্তী প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের পথ দেখিয়েছে।

 

  উত্তরাধিকার — যা রয়ে গেল 

 

ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি মাত্র বায়ান্ন বছর বেঁচেছিলেন — কিন্তু এই অল্প সময়ে তিনি যা করে গেছেন তা বহু মানুষের সারাজীবনের কাজকে ছাড়িয়ে যায়। তাঁর উত্তরাধিকার শুধু রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক, শিক্ষামূলক এবং আদর্শগত।

আজকের ভারতীয় জনতা পার্টি যে দলীয় আদর্শ ও কর্মসংস্কৃতি বহন করে, তার ভিত্তি রচনা করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। ‘এক দেশ, এক বিধান‘ যে স্লোগান তিনি দিয়েছিলেন, সেই স্বপ্ন ২০১৯ সালে ৩৭০ ধারা বিলোপের মধ্য দিয়ে আংশিকভাবে পূরণ হয়েছে।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার যে ধারা তিনি চালু করেছিলেন, তা আজও বাংলার শিক্ষাব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। তাঁর নামে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, রাস্তা রয়েছে — এগুলো শুধু নামফলক নয়, একটি জাতির কৃতজ্ঞতার প্রতীক।

প্রতিবছর ২৩শে জুন তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে সারা দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁকে স্মরণ করেন। কারণ তিনি শুধু অতীতের কেউ নন — তিনি আমাদের প্রেরণার উৎস, আমাদের আদর্শের মানদণ্ড।

“মৃত্যু আমাকে ভয় দেখাতে পারবে না। আমি ভয় পাই শুধু এই ভাবনায় যে হয়তো আমার দেশের জন্য আমি যা করতে চেয়েছিলাম তা করার সময় পাব না।” — ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি

◆  উপসংহার ◆

 

ইতিহাসের মঞ্চে এমন কিছু চরিত্র থাকেন যাঁরা মৃত্যুতেও মরেন না। তাঁরা বেঁচে থাকেন প্রজন্মের পর প্রজন্মের হৃদয়ে, তাঁদের কাজের মধ্যে, তাঁদের স্বপ্নের উত্তরাধিকারে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি তেমনই একজন।

একজন শিক্ষক যিনি সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য হলেন, একজন নেতা যিনি মন্ত্রিত্ব ছেড়ে আদর্শ আঁকড়ে রইলেন, একজন সংসদবিদ যাঁর বাগ্মিতা সংসদকে কাঁপিয়ে দিত, একজন দেশপ্রেমিক যিনি বন্দি অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন — এই সব পরিচয় একসাথে ধারণ করেন ভারত কেশরী

বাংলার প্রতিটি সন্তানের উচিত শ্যামাপ্রসাদের জীবনকে জানা, তাঁর আদর্শকে বোঝা এবং তাঁর দেখানো পথে চলার চেষ্টা করা। কারণ তিনি শুধু ইতিহাসের একটি চরিত্র নন — তিনি আমাদের বিবেকের কণ্ঠস্বর, আমাদের জাতীয় গর্বের প্রতীক।

স্মৃতিতে শ্যামাপ্রসাদ— এই শিরোনামের গভীরে আছে একটা বেদনা, একটা অপূর্ণতার অনুভব। কিন্তু সেই বেদনার পাশাপাশি আছে গর্ব — এমন একজন মহামানব এই বাংলার মাটিতে জন্মেছিলেন, এই দেশের জন্য লড়েছিলেন, এই দেশের জন্যই প্রাণ দিয়েছিলেন।

তাঁকে ভুলে যাওয়া কোনো বিকল্প নেই। কারণ তিনি যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন এখনও অসম্পূর্ণ। সেই স্বপ্ন পূরণ করার দায়িত্ব আমাদের, আজকের প্রজন্মের।

জয় হিন্দ! জয় ভারত! শ্যামাপ্রসাদ অমর রহে!

――――― সমাপ্ত ―――――

 

SOURCE-EDT

©kamaleshforeducation.in(2023)

 
error: Content is protected !!
Scroll to Top