কলকাতা হাইকোর্টের ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ: শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ

10 Oct 2026 10:50 AM

Calcutta High Court

মূল বক্তব্য: কর্তৃপক্ষের কাছে কোনও প্রতিবাদ অপছন্দনীয় হলেই সেই প্রতিবাদকে অপরাধ বলে গণ্য করা যা না। গণতন্ত্রে সরকারের সমালোচনা, ভিন্নমত প্রকাশ এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

১. মামলার মূল ঘটনা

 

পশ্চিমবঙ্গের স্কুল সার্ভিস কমিশনের (SSC) নিয়োগে কথিত অনিয়মের প্রতিবাদে ২০২১ সালের ৫ আগস্ট কয়েকজন চাকরিপ্রার্থী সল্টলেকের ময়ূখ ভবনের কাছে জমায়েত হন।

তাঁরা স্লোগান দিতে দিতে বিকাশ ভবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।

পুলিশের অভিযোগ ছিল, প্রতিবাদকারীরা—

  • COVID-19 সংক্রান্ত বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করেছেন।

  • ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারার আদেশ অমান্য করেছেন।

  • সরকারি কর্মীদের কাজে বাধা দিয়েছেন।

  • জনসাধারণের চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়েছেন।

এই ঘটনায় ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছয়জন কলকাতা হাইকোর্টে ফৌজদারি কার্যক্রম বাতিলের আবেদন করেন।

 

২. কলকাতা হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ

আদালতের বক্তব্যের সারমর্ম:

“কর্তৃপক্ষের কাছে কোনও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ অপছন্দনীয় হলেই সেটি অপরাধে পরিণত হয় না।”

আদালত মনে করে, অভিযোগে অপরাধের অপরিহার্য উপাদান যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

শুধুমাত্র প্রতিবাদ করার কারণে নাগরিকদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন ফৌজদারি কার্যক্রম চালানো আইনসংগত নয়।

 

৩. গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয়

ক. বেআইনি সমাবেশ — IPC ধারা ১৪১ ও ১৪৩

পাঁচ বা তার বেশি ব্যক্তি একত্রিত হলেই সমাবেশ বেআইনি হয়ে যায় না।

সমাবেশের উদ্দেশ্য ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৪১ ধারায় উল্লিখিত বেআইনি উদ্দেশ্যগুলির অন্তর্ভুক্ত হতে হবে।

শুধুমাত্র জমায়েত হওয়া এবং স্লোগান দেওয়াকে বেআইনি সাধারণ উদ্দেশ্যের প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যায় না।

খ. মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশ — সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৯

অনুচ্ছেদ ১৯(১)(ক): নাগরিকদের বাক্‌স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার প্রদান করে।

অনুচ্ছেদ ১৯(১)(খ): নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হওয়ার অধিকার প্রদান করে।

তবে এই অধিকারগুলি নিরঙ্কুশ নয়। সংবিধান অনুযায়ী যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপ করা সম্ভব।

 

গ. সরকারি আদেশ অমান্য — IPC ধারা ১৮৮

পুলিশ ১৪৪ ধারার নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ লঙ্ঘনের অভিযোগ করলেও সংশ্লিষ্ট আদেশের নথি আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি।

কীভাবে সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি হয়েছে, অভিযোগেও তার যথেষ্ট বিবরণ ছিল না।

ঘ. অন্যায়ভাবে বাধা প্রদান — IPC ধারা ৩৪১

কোন ব্যক্তির আইনসম্মত চলাচলে কীভাবে বাধা দেওয়া হয়েছিল, অভিযোগে তার নির্দিষ্ট বিবরণ থাকা প্রয়োজন।

এই মামলায় সেই উপাদানের অভাব ছিল।

ঙ. সংক্রমণ ছড়ানোর অভিযোগ — IPC ধারা ২৬৯ ও ২৭০

COVID-19 সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা সৃষ্টি করে এমন কোনও নির্দিষ্ট কাজের পর্যাপ্ত বিবরণ অভিযোগে ছিল না।

আবেদনকারীদের সংক্রমণ সম্পর্কে জ্ঞান বা সংশ্লিষ্ট অপরাধের প্রয়োজনীয় মানসিক উপাদানও যথাযথভাবে দেখানো হয়নি।

চ. বিপর্যয় মোকাবিলা আইন, ২০০৫ — ধারা ৫১

কোন নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করা হয়েছিল এবং কীভাবে কর্তব্যরত আধিকারিকের কাজে বাধা দেওয়া হয়েছিল, তা স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

৪. আদালতের বিবেচনায় পূর্ববর্তী গুরুত্বপূর্ণ রায়

১. Association for Protection of Democratic Rights v. State of West Bengal

বৃহৎ প্রতিবাদী জমায়েত হলেই সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেআইনি বলা যায় না।

২. Javed Ahmad Hajam v. State of Maharashtra

গণতন্ত্রে ভিন্নমত প্রকাশ এবং সরকারের সমালোচনা করার স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক অধিকার।

৩. Re: Ramlila Maidan Incident v. Home Secretary, Union of India

১৪৪ ধারার মতো নিষেধাজ্ঞামূলক ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনসম্মত ভিত্তি ও প্রয়োজনীয়তা থাকতে হবে।

৪. State of Haryana v. Bhajan Lal

কোনও অভিযোগে প্রাথমিকভাবে অপরাধের উপাদান প্রকাশ না পেলে অথবা ফৌজদারি কার্যক্রম আইনের অপব্যবহার হিসেবে প্রতীয়মান হলে উপযুক্ত পরিস্থিতিতে তা বাতিল করা যেতে পারে।

৫. কলকাতা হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

আদালত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, অভিযোগগুলি সামগ্রিকভাবে বিচার করলেও আবেদনকারীদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট অপরাধের প্রাথমিক উপাদান প্রতিষ্ঠিত হয় না।

ফলে আদালত—

1. ছয়জন আবেদনকারীর বিরুদ্ধে দায়ের করা FIR বাতিল করে।

2. ওই FIR থেকে উদ্ভূত পরবর্তী ফৌজদারি কার্যক্রম বাতিল করে।

3. সংশ্লিষ্ট G.R. Case No. 901 of 2021 বাতিল করে।

মামলার নাম: Trina Halder & Ors. v. The State of West Bengal & Ors.

৬. সাধারণ নাগরিকদের জন্য রায়ের গুরুত্ব

এই রায় থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নীতি স্পষ্ট হয়।

  • শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

  • সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলেই কোনও ব্যক্তি অপরাধী হয়ে যান না।

  • ফৌজদারি অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অপরাধের আইনগত উপাদান থাকা প্রয়োজন।

  • পুলিশি ক্ষমতা আইনসম্মতভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

  • নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করা আদালতের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

তবে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিরঙ্কুশ নয়। সহিংসতা, আইনবিরুদ্ধ বাধা বা বৈধ বিধিনিষেধ লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

৭. উপসংহার

গণতন্ত্রের শক্তি শুধু সরকারের ক্ষমতায় নয়, নাগরিকের শান্তিপূর্ণভাবে প্রশ্ন তোলার এবং প্রতিবাদ করার স্বাধীনতার মধ্যেও নিহিত।

কলকাতা হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত মনে করিয়ে দেয় যে, গণতান্ত্রিক সমাজে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে কেবল কর্তৃপক্ষের অপছন্দের কারণে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।

শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার; অপরাধের অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করতে হলে আইনের নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হবে।

 source-LIVELAW

©Kamaleshforeducation.in (2023)

 

error: Content is protected !!
Scroll to Top