দশম শ্রেণি ভূগোল  

“বারিমণ্ডল”

বড়ো প্রশ্ন উত্তর (২/৩/৫ নম্বর)

Class 10 Geography Chapter 3

Long Question Answer

Published on: 

মাধ্যমিক ভূগোলের তৃতীয় অধ্যায় “বারিমণ্ডল” এর মধ্যে সমুদ্র, মহাসাগর, নদী, হ্রদ, জলচক্র, লবণাক্ততা, জোয়ার–ভাটা ও সাগরস্রোতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই পোস্টে বারিমণ্ডল থেকে বাছাই করা ২/৩/৫ মার্কস প্রশ্নের উত্তর গুলি সহজ ভাষায় করে   শেয়ার করা হল।

 

 

বোর্ড: বিষয়বস্তু

1 দশম শ্রেণী মাধ্যমিক ভূগোল তৃতীয় অধ্যায় বারিমন্ডল (২/৩/৫ মার্ক) প্রশ্ন উত্তর

1.1 ক্লাস ১০ ভূগোল তৃতীয় অধ্যায় ২/৩ নম্বর প্রশ্ন উত্তর | Class 10 Geography Chapter 3 2/3 Marks Question Answer

1.2 দশম শ্রেণী ভূগোল তৃতীয় অধ্যায় বারিমন্ডল রচনাধর্মী বড় প্রশ্ন উত্তর | Class 10 Geography Barimondol Long Question Answer

দশম শ্রেণী মাধ্যমিক ভূগোল

তৃতীয় অধ্যায় বারিমন্ডল

(২/৩/৫ মার্ক) প্রশ্ন উত্তর

 

1. ষাঁড়াষাঁড়ি বান বা বান ডাকা কাকে বলে?  ২

উত্তর: ভরা কোটালের সময় সমুদ্রের জলস্ফীতি বেশি হওয়ার নদীর মোহনার মধ্য দিয়ে জল প্রবল বেগে নদীতে প্রবেশ করে এবং নদীর অভিমুখের বিপরীতে প্রবাহিত হয়, ফলে নদীতে প্রবল জলোচ্ছ্বাস ঘটে, একে বান ডাকা বলে। যেমন – পশ্চিমবঙ্গের হুগলী, আর্জেন্টিনার লা-প্লাটা নদীতে বান ডাকা দেখা যায়।

বর্ষাকালে এইসব নদীতে জলের পরিমাণ বেশি থাকায় সেই অবস্থায় ভোরাকোটার হলে তা অতি প্রবল আকার ধারণ করে এবং মোহনার দিকে সমুদ্রের জল প্রবল গর্জন করতে করতে এগিয়ে আসে একে ষাঁড়াষাঁড়ি বান বলে।

2. দুটি মুখ্য ও গৌন জোয়ারের মধ্যে সময়ের ব্যবধান 24 ঘণ্টা 52 মিনিট হয় কেন? ৩

উত্তর: চাঁদ পৃথিবীর চারিদিকে একবার ঘুরে আসতে সময় নেয় 27 দিন 08 ঘন্টা পৃথিবী একবার নিজের মেরুদন্ডের উপর যখন আবর্তন করে তখন চাঁদ 1/27 অংশ অর্থাৎ (360°÷27) = 13° এগিয়ে যায়। এই 13° পথ অতিক্রম করতে পৃথিবী আরও 52 মিনিট বাড়তি সময় নেই। সুতরাং যেকোনো স্থান 24 ঘন্টা 52 মিনিট পর পর একবার করে চাঁদের সামনে আসে, তাই দুটি মুখ্য ও গৌণ জোয়ারের মধ্যে সময়ের ব্যবধান হয় 24 ঘন্টা 52 মিনিট।

এছাড়া একটি নির্দিষ্ট স্থানে একদিনে যে সময়ে মুখ্য জোয়ার হয় সেই দিনটার 12 ঘন্টা 26 মিনিট পর সেখানে গৌণ জোয়ার হয়। আর এই দুটি স্থানের সমকোণে অবস্থিত স্থান দুটিতে ভাটা হয়।

 

3. “জাপান ও নিউফাউন্ডল্যান্ডের উপকূলে সারাবছর কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ থাকে এবং ঝড়-ঝঞ্ঝার সৃষ্টি হয়।” – কেন? ৩

উত্তর: জাপানের উপকূল বরাবর উষ্ণ কুরোশিয়ো স্রোত দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর দিকে এবং শীতল বেরিং স্রোত উত্তর দিক থেকে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়।
অনুরূপভাবে, উত্তর আমেরিকার উত্তর-পূর্ব উপকূলে নিউফাউন্ডল্যান্ডের নিকট উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোত দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে এবং শীতল লাব্রাডর স্রোত উত্তর-পূর্ব দিক থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়।

উষ্ণ সমুদ্রস্রোতের প্রভাবে সমুদ্রজলে বাষ্পীভবন বেশি হয়। ফলে এই স্রোতের প্রভাবে সেই অঞ্চলের জলবায়ু উষ্ণ ও আর্দ্র থাকে। অপরপক্ষে শীতল স্রোতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ু শীতল ও শুষ্ক থাকে। এই দুই প্রকার বায়ুর মিশ্রণের ফলে উষ্ণ-আর্দ্র বায়ুর জলীয় বাষ্প শীতল বায়ুর সংস্পর্শে এসে ঘনীভূত হয়ে যায়। ফলে সেই অঞ্চলে ঘন কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

4. শৈবাল সাগর (Sargasso Sea) কাকে বলে? ২

উত্তর: উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যভাগে উপসাগরীয়, উত্তর আটলান্টিক, ক্যানারি ও উত্তর নিরক্ষীয় স্রোতের ঘড়ির কাঁটার দিকে চক্রাকার আবর্তনের ফলে যে স্রোত শূন্য ও সারগাসাম শৈবাল সমৃদ্ধ উপবৃত্তাকার জলাবর্ত বা সাগর সৃষ্টি হয়েছে, তাকে শৈবাল সাগর বলে। এখানে শৈবাল ছাড়া প্ল্যাংকটন, মাছ কিছুই জন্মায় না, তাই একে জীবহীন মরুভূমিও বলা হয়। এটি পৃথিবীর এমন এক সাগর যার কোনো উপকূলরেখা নেই

5. মগ্নচড়া কিভাবে সৃষ্টি হয়? এবং এর গুরুত্ব লেখো। ৩

উত্তর: শীতল স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসা হিমশৈল উষ্ণ স্রোতের সঙ্গে মিলিত হলে গলে গিয়ে হিমশৈলে জমে থাকা নুড়ি, কাঁকর, বালি, পলি ও আগাছা ওজন অনুসারে পর্যায়ক্রমে সমুদ্রতলদেশে অধঃক্ষিপ্ত হয়ে যে অগভীর ও মৃদু ঢালু নিমজ্জিত চড়ার সৃষ্টি হয়, তাকে মগ্নচড়া (Submerged Bank) বলে। যেমন– উ.-পূ. আটলান্টিক উপকূলে শীতল কুমেরু ও উষ্ণ উত্তর আটলান্টিক স্রোতের মিলনে ডগার্স ব্যাংক, রকফল ব্যাংক, গডউইন ব্যাংক, ওয়েলস ব্যাংক,পিটব্যাংক, সিডার ব্যাংক এবং শীতল ল্যাব্রাডার ও উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের মিলনের ফলে উ.-প.আটলান্টিক উপকূলে গ্র্যান্ডব্যাংক, ফেনাব্যাংক, মিড ব্যাংক, জেফ্রিব্যাংক,জর্জেস ব্যাংক, সেন্টপিয়ারিব্যাংক।

১) বাণিজ্যিক মৎস্য ক্ষেত্র :– মগ্নচড়াগুলিতে মাছ ধরার সুবিধা, প্ল্যাংকটন ও ক্রিলের প্রাচুর্যের জন্য বিভিন্ন প্রজাতির মাছেরসমাবেশ, শীতল স্রোতে সার্ডিন, বনিটো, টুনা, হেক, হ্যাডক মাছের আগমন, নাতিশীতোষ, জলবায়ুর জন্য বাণিজ্যিক মৎস্যক্ষেত্রগুলি বিকাশ লাভ করে। যথা-গ্র্যান্ড ব্যাংকঅঞ্চলে উ.প.আটলান্টিক মহাসাগরীয় মৎস্যক্ষেত্র, ডগার্স ব্যাংক অঞ্চলে উ. পূ. আটলান্টিক মহাসাগরীয় মৎস্যক্ষেত্র।

(২)খনিজসম্পদ :– অগভীর মগ্নচড়াগুলিতে সাম্প্রতিক কালে খনিজতেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, ফসফেট, পটাশ, ম্যাঙ্গানিজ নুড়ি, সামুদ্রিক লবণ খনিজদ্রব্য উত্তোলন করা হচ্ছে।

6. অ্যাপোজি ও পেরিজির মধ্যে পার্থক্য লেখো।  ৩

বিষয়

অ্যাপোজি

পেরিজি

সংজ্ঞা

পৃথিবীকে পরিক্রমণ করতে করতে চাঁদ থেকে পৃথিবীর দূরত্ব যখন বেশি হয়, সেই অবস্থানকে অ্যাপোজি বলে।

পৃথিবীকে পরিক্রমণকালে চাঁদ থেকে পৃথিবীর দূরত্ব যখন কম হয়, সেই অবস্থানকে পেরিজি বলে।

জোয়ার

এই অবস্থানে অ্যাপোজি জোয়ার বলে।

এই অবস্থানে সৃষ্ট জোয়ারকে পেরিজি জোয়ার বলে।

দূরত্ব

চাঁদ থেকে পৃথিবীর দূরত্ব হয় ৪ লক্ষ ৭ হাজার কিমি।

চাঁদ থেকে পৃথিবীর দূরত্ব হয় ৩ লক্ষ ৫৬ হাজার কিমি।

চাঁদের আকর্ষণ বল

অ্যাপোজি অবস্থানে চাঁদের আকর্ষণ বল অপেক্ষাকৃত কম।

পেরিজি অবস্থানে চাঁদের আকর্ষণ বল অপেক্ষাকৃত বেশি।

জোয়ারের প্রাবল্য

জোয়ারের প্রাবল্য স্বাভাবিকের তুলনায় ২০% কম হয়।

জোয়ারের প্রাবল্য স্বাভাবিকের তুলনায় ২০% বেশি হয়।

7. ভরা কোটাল ও মরা কোটাল কীভাবে সৃষ্টি হয়? ৩

উত্তর: ১) ভরা কোটাল : আবর্তন কালে পূর্ণিমা ও অমাবস্যা তিথিতে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্য একই সরলরেখায় অবস্থান করলে যে জোয়ারের সৃষ্টি হয়, তাকে ভরা কোটাল বলে।

অমাবস্যা তিথিতে ভরা কোটাল :– অমাবস্যা তিথিতে চাঁদ সূর্য পৃথিবীর একই দিকে অবস্থান করে, একে সংযোগ অবস্থান বলে। এই তিথিতে চাঁদ ও সূর্য একই দিকে পৃথিবীকে আকর্ষণ করার ফলে জোয়ারের জল বেশি ফুলে উঠে একে অমাবস্যা তিথিতে ভরা কোটাল বলে।

পূর্ণিমা তিথিতে ভরা কোটাল :– পূর্ণিমা তিথিতে চাঁদ ও সূর্যের মাঝখানে একই সরলরেখায় পৃথিবী অবস্থান করে, এই অবস্থানকে প্রতিযোগ অবস্থান বলে। এই তিথিতে চাঁদের আকর্ষণে পৃথিবীর একদিকে প্রবল জলস্ফীতি ঘটে আর ঠিক তার বিপরীত দিকে সূর্যের আকর্ষণে জোয়ার প্রবলতর হয়, একেই পূর্ণিমার ভরা কোটাল বলে।

২) মরা কোটাল :– শুক্ল ও কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্যের সমকোণে অবস্থান করায় চাঁদ ও সূর্যের আকর্ষণ শক্তি পরস্পরের বিপরীতে কাজ করে। ফলে জলরাশি বেশি স্ফীত হয় না, এর ফলে মরা কোটালে সৃষ্টি হয়।

8.পূর্ণিমা তিথির তুলনায় অমাবস্যা তিথিতে জোয়ার প্রবল হয় কেন? ৩

উত্তর: অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে চাঁদ, সূর্য ও পৃথিবী একই সরলরেখায় অবস্থান করলে চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের আকর্ষণ বলের মিলিত শক্তির প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠে সবচেয়ে প্রবল জোয়ার হয়, একে ভরা কোটাল বা তেজ জোয়ার বলে। পূর্ণিমা এবং অমাবস্যা তিথিতে চাঁদ, পৃথিবী ও সূর্য একই সরলরেখায় অবস্থান করে কিন্তু এই তিনটি জ্যোতিষ্কের অবস্থান এই দুই দিন একই থাকে না।

■ অমাবস্যায় জোয়ারের বেশি প্রাবল্যের কারণ :– পূর্ণিমা তিথিতে প্রতিযোগ অবস্থায় পৃথিবীর দুপাশে একই সরলরেখায় চাঁদ ও সূর্য থাকে অর্থাৎ চাঁদ ও সূর্যের মাঝে পৃথিবী থাকলে চাঁদের নিকটবর্তী পৃথিবীর জলরাশিতে চাঁদের সর্বাধিক আকর্ষণে মুখ্য চন্দ্র জোয়ার এবং সূর্যের আকর্ষণে গৌণ সৌর জোয়ার (Solar Tide) হয়। এর প্রতিপাদ স্থানটি সূর্যের সামনে আসায় একইভাবে মুখ্য সৌর জোয়ার এবং গৌণ চন্দ্র জোয়ার হয়। দুই ক্ষেত্রে জলরাশি প্রবলভাবে ফুলে উঠে তেজ কোটাল সৃষ্টি হয়।

অপরদিকে, অমাবস্যা তিথিতে সংযোগ অবস্থায় পৃথিবীর একই পাশে একই সরলরেখায় চাঁদ ও সূর্য থাকে অর্থাৎ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝে চাঁদ থাকলে চাঁদের নিকটবর্তী পৃথিবীর জলরাশিতে চাঁদ ও সূর্যের মিলিত আকর্ষণ শক্তির জন্য প্রবলভাবে ফোলে উঠে সর্বাধিক শক্তিশালী তেজ কোটাল বা মুখ্য চন্দ্র ও সৌর জোয়ার সৃষ্টি হয়। পূর্ণিমা তিথিতে চাঁদ-সূর্যের আকর্ষণপরস্পর বিপরীত দিক থেকে আসে। কিন্তু অমাবস্যাতে তা একই দিকে সরাসরি প্রযুক্ত হওয়ায় পূর্ণিমার তুলনায় অমাবস্যা তিথিতে জোয়ারের প্রাবল্য সবচেয়ে বেশি হয়।

দশম শ্রেণী ভূগোল

তৃতীয় অধ্যায়

বারিমন্ডল

রচনাধর্মী বড় প্রশ্ন উত্তর 

Class 10 Geography Barimondol

Long Question Answer

 

1. সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির কারণ গুলি লেখো।

উত্তর: সমুদ্রের পৃষ্ঠ জলরাশির প্রাকৃতিক কারণে এক স্থান থেকে অন্য এক স্থানের দিকে নির্দিষ্ট পথে সারা বছর ধরে নিয়মিতভাবে ধীরে ধীরে একমুখী প্রবাহকে সমুদ্রস্রোত বলে।

 

১) নিয়ত বায়ুপ্রবাহ :– নিয়ত বায়ুপ্রবাহ হল সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির প্রধান কারণ। নিয়ত বায়ু সমুদ্রের জলরাশিকে তার নিজের প্রবাহের দিকে প্রবাহিত করে সমুদ্রস্রোত সৃষ্টি করে। যেমন – পশ্চিমা বায়ু, উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় স্রোত এবং মেরু বায়ু কুমেরু ও সুমেরু স্রোত সৃষ্টি করেছে।

২) পৃথিবীর আবর্তন গতি ও কোরিওলিস বল :– পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য দিক বিক্ষেপের ফলে যে বলের সৃষ্টি হয় তাকে কোরিওলিস বল বলে। এই কোরিওলিস বলের প্রভাবে সমুদ্রস্রোত নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে মেরু অঞ্চলের দিকে সরাসরি উত্তর–দক্ষিণে প্রবাহিত না হয়ে ফেরেলের সূত্র ধরে উত্তর গোলার্ধে ডান দিকে ও দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়।

৩) সমুদ্র জলে লবনতা ও ঘনত্বের তারতম্য :– সমুদ্র জলে লবণতা বৃদ্ধি পেলে জলের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়। বেশি লবণাক্ত ও বেশি ভারী জল অন্তঃস্রোত রূপে কম লবণাক্ত জলের দিকে প্রবাহিত হয়। যেমন – নিরক্ষীয় অঞ্চলের কম লবণাক্ত জল স্রোতের আকারে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়।

৪) সমুদ্রের জলের উষ্ণতার তারতম্য :– সূর্য রশ্মির পতন কোণের তারতম্যের জন্য সমুদ্র জলে উষ্ণতার তারতম্য হয়। নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্যের লম্বকিরণে সমুদ্র জল অধিক উত্তপ্ত ও প্রসারিত হয়। ফলে এই জল বহিঃস্রোত রূপে মেরু অভিমুখী হয়। জলের এই শূন্যতা পূরণের জন্য মেরু অঞ্চলের শীতল ও ভারী জল নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়।

৫) হিমবাহের গলন :– মেরু অঞ্চলের সমুদ্রের কোনো অংশের বরফ গলে গেলে সেখানে জলের পরিমাণ বেড়ে যায়। এই জল প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রস্রত সৃষ্টি করে।

৬) উপকূলের আকৃতি :– সমুদ্র স্রোতের দিক পরিবর্তন ঘটিয়ে ভিন্ন স্রোত সৃষ্টি করতে সাহায্য করে উপকূলের আকৃতি। দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত ব্রাজিল অন্তরীপে বাধা পেয়ে দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে দুটি ভিন্ন সমুদ্র স্রোতের সৃষ্টি করে।

2. সমুদ্রস্রোতের প্রভাব আলোচনা করো। অথবা, পৃথিবীর জলবায়ুর উপর সমুদ্রস্রোতের প্রভাব লেখো।

উত্তর: পৃথিবীর আবর্তন, বায়ুরপ্রবাহ, সমুদ্রজলে লবনতার ঘনত্ব ও উষ্ণতার পার্থক্যের জন্য সমুদ্রের জল নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত হয়, সমুদ্র জলের এই গতিকে সমুদ্রস্রোত বলে। সমুদ্রস্রোত পৃথিবীর জলবায়ু ও মানব জীবনের বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। যেমন–

(১) উষ্ণতার উপর প্রভাব :– উষ্ণ ও শীতল স্রোত উপকূল অঞ্চলে উষ্ণতার ভারসাম্য বজায় রাখে। নিম্ন অক্ষাংশ থেকে আগত উষ্ণস্রোত উচ্চ অক্ষাংশের জলবায়ুকে উষ্ণ করে তুলে। অপরদিকে উচ্চ অক্ষাংশ থেকে প্রবাহিত শীতলস্রোত নিম্ন অক্ষাংশের জলবায়ুকে অনেকাংশে প্রভাবিত করে। যেমন – শীতল বেঙ্গুয়েলা স্রোতের প্রভাবে দক্ষিণ আফ্রিকা উপকূলের উষ্ণতা কম থাকে।

(২) বৃষ্টিপাত ও তুষারপাত :– উষ্ণ স্রোতের উপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ু প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প ধারনে সক্ষম হওয়ায় বৃষ্টিপাত ঘটাতে সাহায্য করে। আবার শীতল স্রোতের উপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ু শুষ্ক হওয়ায় বৃষ্টিপাত না ঘটিয়ে তুষারপাত ঘটায়। এই কারণেই শীতল ল্যাব্রাডার স্রোতের প্রভাবে নিউফাউন্ডল্যান্ড অঞ্চলে তুষারপাত ঘটে।

(৩) কুয়াশা ও ঝড়ঝঞ্ঝা :– যেখানে উষ্ণ ও শীতল স্রোত মিলিত হয় সেখানে বৈপরীত্য উষ্ণতার প্রভাবে পরিচলনজনিত কুয়াশা ও ঝড়ঝঞ্ঝার উৎপত্তি ঘটে। নিউ ফাউন্ডল্যান্ড অঞ্চলে শীতল ল্যাব্রাডার ও উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের মিলনে প্রায়ই ঘন কুয়াশা ও ঝড়ঝঞ্ঝার সৃষ্টি হয়।

(৪) মরুভূমি সৃষ্টি :– ক্রান্তীয় মন্ডলের উপকূলের পাশ দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেলে বৃষ্টির সম্ভাবনা প্রায় থাকে না। দীর্ঘকাল ধরে বৃষ্টি না হওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট অঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হয়। যেমন– সাহারার পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে প্রবাহিত শীতল ক্যানারি স্রোত মরুভূমি সৃষ্টিতে সাহায্য করেছে।

(৫) মগ্নচড়ার সৃষ্টি :– শীতল স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসা হিমশৈল উষ্ণ স্রোতের সংস্পর্শে এসে গলে যায়। ফলে হিমশৈলীর সঙ্গে থাকা পলি বালি কাঁকর প্রভৃতি সমুদ্রে সঞ্চিত হয়ে অগভীর মগ্নচড়ার সৃষ্টি করে। যেমন- গ্র্যান্ড ব্যাংক, ডোগাস ব্যাংক ইত্যাদি।

 

3. জোয়ার ভাটা সৃষ্টির কারণ গুলি চিত্রসহ ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: সাগর-মহাসাগরের জলরাশি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় অন্তর কোন স্থানে স্ফীত হয় আবার কোন স্থানে অবনমিত হয়। সমুদ্র জলের এই ফুলে ওঠাকে জোয়ার এবং নেমে যাওয়াকে ভাটা বলে।

জোয়ার ভাটা সৃষ্টির কারণ :— পৃথিবীতে প্রধানত দুটি কারণেই জোয়ার ভাটার সৃষ্টি হয়, যেমন –

(১) পৃথিবীর উপর চাঁদ ও সূর্যের আকর্ষণ :– মহাকর্ষ সূত্রানুসারে এই মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু পরস্পরকে আকর্ষণ করে, ফলে চাঁদ ও সূর্যের উভয়ই পৃথিবীকে আকর্ষণ করে। যে বস্তুর ভর যত বেশি তার আকর্ষণ তত বেশি এবং যে বস্তুর দূরত্ব যত বেশি তার আকর্ষণ বল তত কম।
  পৃথিবী থেকে চাঁদ অপেক্ষা সূর্যের দূরত্ব অনেক বেশি এই কারণেই সূর্যের ভর বেশি হওয়ার সত্ত্বেও প্রধানত চাঁদের আকর্ষণ বলের প্রভাবে সমুদ্রের জল স্ফীত হয়ে জোয়ারের সৃষ্টি হয় এবং তার সমকোণস্থ অঞ্চলে ভাটা হয়। অপরদিকে সূর্যের আকর্ষণে জোয়ার হলেও তা প্রবল হয় না, তবে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্য একই সরলরেখায় অবস্থান করলে জোয়ারের তীব্রতা বেশি হয়।

(২) পৃথিবীর আবর্তন গতি জনিত কেন্দ্রাতিগ বল :– পৃথিবীর নিজের অক্ষের চারিদিকে পশ্চিম দিকে পূর্ব দিকে অর্থাৎ ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে আবর্তনের ফলে কেন্দ্রাতিগ বলের সৃষ্টি হয়। কেন্দ্রাতিক বল অভিকর্ষ বলের বিপরীতে কাজ করে। ফলে, পৃথিবীর যেদিকে চাঁদের অবস্থান থাকে ঠিক তার বিপরীত দিকে অর্থাৎ প্রতিপদ স্থানে কেন্দ্রাতিগ বলের প্রভাবে জলরাশি বাইরের দিকে ফুলে ওঠে গৌণ জোয়ারের সৃষ্টি হয়।
  একই সময়ে পৃথিবীর কোন স্থানে মুখ্য জোয়ার ও ঠিক তার বিপরীত স্থানে গৌণ জোয়ারে সৃষ্টি হয় এবং এই দুটি স্থানের সমকোণে অবস্থানকারী অঞ্চলে ভাটার সৃষ্টি হয়।

4. জোয়ার ভাটার ফলাফল গুলি লেখো।

উত্তর: সাগর-মহাসাগরের জলরাশি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় অন্তর কোন স্থানে স্ফীত হয় আবার কোন স্থানে অবনমিত হয়। সমুদ্র জলের এই ফুলে ওঠাকে জোয়ার এবং নেমে যাওয়াকে ভাটা বলে।

জোয়ার ভাটার ফলাফল :— জোয়ার ভাটার ফলাফল গুলিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। যথা –

(১) জাহাজ চলাচলের সুবিধা :– জোয়ারের সময় নদীর জল বেড়ে যায় ফলে জাহাজ চলাচলের সুবিধা হয়। এই কারণেই কলকাতা বন্দরে অধিকাংশ জাহাজ জোয়ারের সময় প্রবেশ করে।

(২) নদীর নাব্যতা বজায় :– ভাটার টানে নদীর পলি সাগরে চলে যায় ফলে নদীর গভীরতা ও নাব্যতা বজায় থাকে।

(৩) বরফমুক্ত বন্দর :– শীত প্রধান অঞ্চলে সমুদ্রের লবণাক্ত জল প্রবেশের কারণে অনেক সময় বন্দর বড়মুক্ত থাকে, ফলে জাহাজ চলাচলের সুবিধা হয়।
এছাড়াও জোয়ার ভাটার ফলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও মাছ ধরার ক্ষেত্রে অনেক সুবিধা হয়।

(১) সেচ ও পানীয় জলের ওপর প্রভাব :– জোয়ারের কারণেই সমুদ্রের লবণাক্ত জল নদীতে প্রবেশ করে। ফলে নদীর জল পানীয় ও সেচের কাজে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে।

(২) বন্যা ও ক্ষয়ক্ষতি : প্রবল জোয়ারে নদীর পাড় ভেঙে বন্যার সৃষ্টি হয় ও বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়ে জমিতে লবণাক্ত জল প্রবেশ করে ফলে জমি চাষের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এছাড়াও উপকূলের পাড় ভেঙ্গে যায় ও ঘরবাড়ি নষ্ট হয়।

(৩) নৌকা ও জাহাজের ক্ষয়ক্ষতি :– প্রবল জোয়ারে নৌকা ও জাহাজের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়।

5. সমুদ্র তরঙ্গ ও সমুদ্র স্রোতের মধ্যে পার্থক্য লেখো।

বিষয় সমুদ্র তরঙ্গ সমুদ্রস্রোত
প্রকৃতি এটি সমুদ্র জলপৃষ্ঠের ছন্দোবদ্ধ ওপর নীচ আলোড়ন এটি সমুদ্র জলরাশির অনুভূমিক সম্মুখ প্রবাহ
স্থান পরিবর্তন সমুদ্রতরঙ্গের জলরাশির কোনো স্থান পরিবর্তন হয় না। একই স্থানে আবদ্ধ থেকে উল্লম্বভাবে ওঠানামা করে। তাই এটি স্থানিক। তবে তরঙ্গের অবয়ব এগিয়ে চলে জলরাশি সুনির্দিষ্ট দিকে সর্বদা স্থান পরিবর্তন করে। একই স্থানে আবদ্ধ থাকে না । এটি অগ্রগতি সম্পন্ন। সুনির্দিষ্ট পথে জলরাশি চলাচল করে
নিয়ন্ত্রক বায়ুপ্রবাহ, ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত সমুদ্র তরঙ্গের উৎপত্তি ঘটায়। সমুদ্রের উন্মুক্ততা, জলের গভীরতা তরঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ করে নিয়ত বায়ুপ্রবাহ, জলের উয়তা, লবণতা, ভূখণ্ডের অবস্থান সমুদ্রস্রোতের উৎপত্তি ঘটায়
উপকূলের সঙ্গে সম্পর্ক সমুদ্রতরঙ্গের জলরাশি উপকূলরেখার সঙ্গে প্রায়সমকোণে এসে উপস্থিত হয় এবং তটভূমিতে আছড়ে পড়ে স্রোত উপকূলরেখার সঙ্গে অনুভূমিকভাবে বয়ে চলে যায়। তটভূমিতে আছড়ে পড়ে না
কার্য সামুদ্রিক ক্ষয় ও সঞ্চয় কাজে তরঙ্গের গুরুত্ব সর্বাধিক সামুদ্রিক বহনকাজে সমুদ্রস্রোতের গুরুত্ব সর্বাধিক
প্রভাব এটি উপকূলীয় জলবায়ুকে কোনো ভাবে প্রভাবিত করে না এটি উপকূলীয় জলবায়ুকে দারুণ নিয়ন্ত্রণ করে

সঠিকভাবে বারবার অনুশীলন করলে মাধ্যমিক ভূগোলের তৃতীয় অধ্যায় “বারিমণ্ডল” থেকে নম্বর তোলা একদম কঠিন নয়—তাই দেরি না করে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো ভালোভাবে পড়ে নিতে হবে  ।

 

SOURCE-EDT

 ©kamaleshforeducation.in(2023)

error: Content is protected !!
Scroll to Top