মাধ্যমিক বাংলা

‘অভিষেক’ কবিতা

মাইকেল মধুসূদন দত্ত উত্তর-সহ নোটস

(MCQ ও বড় প্রশ্ন) 

Published on:  

আজকের  আমরা মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত দশম শ্রেণির পাঠ্য ‘অভিষেক’কবিতাটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। প্রমোদকাননের বিলাসবহুল জীবন ত্যাগ করে লঙ্কাপুরী ও স্বজাতির সম্মান রক্ষার্থে কীভাবে একজন প্রকৃত বীর রণসাজে সজ্জিত হন, ভ্রাতৃশোককে শক্তিতে পরিণত করে কীভাবে বীরত্ব ও কর্তব্যের জয়গান গাইতে হয়—সেই বার্তাই কবি এই কবিতায় বীরযোদ্ধা ইন্দ্রজিতের চরিত্রের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন।

বিষয়

বিবরণ

কবিতা

অভিষেক

কবি

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

গৃহীত (উৎস)

‘মেঘনাদবধ কাব্য’ (প্রথম সর্গ)

বোর্ড: বিষয়বস্তু

1 অভিষেক – মাইকেল মধুসূদন দত্ত (দশম শ্রেণী বাংলা কবিতা)

1.1 অভিষেক কবিতা – মাইকেল মধুসূদন দত্ত (সহজ বাংলা অর্থ) লাইন ধরে

2 ক্লাস 10 বাংলা অভিষেক বহুবিকল্প ভিত্তিক প্রশ্ন উত্তর | Class 10 Bengali Abhishek Question Answer MCQ

3 দশম শ্রেণী বাংলা অভিষেক কবিতার অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর | Class 10 Abhishek Short Question Answer SAQ

4 ক্লাস ১০ বাংলা অভিষেক কবিতা ৩ নম্বর প্রশ্ন উত্তর | Abhishek Class 10 3 Marks Question Answer

5 মাধ্যমিক বাংলা অভিষেক কবিতা বড়ো প্রশ্ন ও উত্তর | Madhyamik Bengali Abhishek 5 Marks Important Question Answer

 (দশম শ্রেণী বাংলা কবিতা)

অভিষেক

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

 

আজকের এই পোস্টে মাইকেল মধুসূদন দত্ত লেখা ‘অভিষেক’ কবিতাটির উৎস, কবিতার সারাংশ, কবিতার নামকরণের তাৎপর্যতা এবং প্রশ্ন উত্তর খুব সহজ ভাষায় আলোচনা করা হয়েছে।

 

অভিষেক কবিতার উৎস ও কবি পরিচিতি 

 

আলোচ্য ‘অভিষেক’ কাব্যাংশটি মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত মহাকাব্য মেঘনাদবধ কাব্য’-এর প্রথম সর্গ থেকে নেওয়া হয়েছে।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩) অধুনা বাংলাদেশের যশোহর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যবয়সেই কলকাতায় এসে হিন্দু কলেজে ভর্তি হন এবং সেখানে গ্রিক, ল্যাটিন, সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তিনি বাংলা কাব্যে প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন করেন (‘পদ্মাবতী’ নাটকে)।

তাঁর রচিত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হলো—তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য, বীরাঙ্গনা কাব্য, ব্রজাঙ্গনা কাব্য ও চতুর্দশপদী কবিতা। এছাড়াও তিনি রত্নাবলী, শর্মিষ্ঠা, পদ্মাবতী, কৃষ্ণকুমারী ইত্যাদি নাটক এবং একেই কি বলে সভ্যতা ও বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ নামক দুটি প্রহসন রচনা করে বাংলা সাহিত্যে প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে আছেন ।

অভিষেক কবিতার সারাংশ

 

লঙ্কার রাজপ্রাসাদে ইন্দ্রজিৎ যখন বিলাসব্যসনে মত্ত, তখন তাঁর ধাত্রী প্রভাষার ছদ্মবেশে সমুদ্র-কন্যা (অম্বুরাশি-সুতা) সেখানে উপস্থিত হন। তিনি ইন্দ্রজিৎকে জানান যে, রামচন্দ্রের সাথে ঘোরতর যুদ্ধে তাঁর প্রিয় ভাই বীরবাহুর মৃত্যু হয়েছে এবং শোকে বিহ্বল রাক্ষসরাজ রাবণ স্বয়ং যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রামচন্দ্রকে রাতের যুদ্ধে বধ করার পরও তাঁর পুনর্জীবনের অদ্ভুত খবর শুনে ইন্দ্রজিৎ অত্যন্ত বিস্মিত হন। স্বর্ণলঙ্কার এই চরম বিপদের দিনে নিজেকে নারীদের মাঝে অবস্থান করতে দেখে ইন্দ্রজিৎ নিজেকে ধিক্কার দেন এবং দ্রুত যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হন।

যাত্রাকালে তাঁর স্ত্রী প্রমীলা সুন্দরী তাঁকে বাধা দিলে, ইন্দ্রজিৎ তাঁকে দ্রুত ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে লঙ্কায় পৌঁছান। সেখানে পিতা রাবণকে প্রণাম করে তিনি যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি চান এবং রামচন্দ্রকে সমূলে নির্মূল করার প্রতিশ্রুতি দেন। রাজা রাবণ তাঁর প্রিয় পুত্রকে বারবার মৃত্যুর মুখে পাঠাতে চাননি, কারণ মানুষের পুনর্জীবন তাঁকে আতঙ্কিত করেছিল। কিন্তু ইন্দ্রজিতের তীব্র জেদ ও আত্মবিশ্বাসের কাছে রাবণ নতিস্বীকার করেন। অবশেষে ইষ্টদেবতার পূজা ও নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সাঙ্গ করার নির্দেশ দিয়ে রাজা রাবণ নিয়ম অনুযায়ী গঙ্গাজল দিয়ে ইন্দ্রজিৎকে সেনাপতি পদে বরণ বা ‘অভিষেক’ করেন।

অভিষেক কবিতার নামকরণের তাৎপর্য 

 

সাহিত্যে নামকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ তা রচনার মূল ভাব, চরিত্র বা বিষয়বস্তুর দিকে ইঙ্গিত করে। আলোচ্য কাব্যাংশটির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ‘অভিষেক’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো পবিত্র জল সিঞ্চনের মাধ্যমে কোনো বিশেষ পদে বরণ বা স্নান করানো। এই কাব্যাংশে আমরা দেখি, লঙ্কার ঘোরতর বিপদের দিনে বীরবাহুর মৃত্যুর খবর পেয়ে ইন্দ্রজিৎ প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য উন্মত্ত হয়ে ওঠেন। তিনি রামচন্দ্রকে বধ করার জন্য পিতা রাবণের কাছে অনুমতি চান।

রাবণ প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও ইন্দ্রজিতের বীরত্ব ও আত্মবিশ্বাসের কারণে তাঁকে লঙ্কার সেনাপতি পদে নিযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। কবিতার একেবারে শেষ অংশে দেখা যায়, রাজা রাবণ যথাবিধি গঙ্গাজল নিয়ে পুত্র ইন্দ্রজিৎকে সেনাপতি পদে বরণ করছেন (“যথাবিধি লয়ে / গঙ্গোদক, অভিষেক করিলা কুমারে” )। সমগ্র কাব্যাংশটি মূলত ইন্দ্রজিতের যুদ্ধযাত্রা এবং শেষ পর্যন্ত পিতার দ্বারা তাঁর সেনাপতি পদে অভিষিক্ত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে।

অভিষেক কবিতা – মাইকেল মধুসূদন দত্ত

(সহজ বাংলা অর্থ) লাইন ধরে

 

শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত ‘অভিষেক’কবিতার মূল বিষয়বস্তু বা অর্থ লাইন ধরে ধরে স্তবক অনুযায়ী সহজ ভাষায় নিচে আলোচনা করা হলো:

 

স্তবক – ১
কনক-আসন ত্যজি, বীরেন্দ্রকেশরী
ইন্দ্রজিৎ, প্রণমিয়া, ধাত্রীর চরণে,
কহিলা, – “কি হেতু, মাতঃ, গতি তব আজি
এ ভবনে? কহ দাসে লঙ্কার কুশল।”

 

সোনার সিংহাসন ছেড়ে বীরশ্রেষ্ঠ ইন্দ্রজিৎ তাঁর ধাত্রীমার (প্রভাষার) পায়ে প্রণাম করে জিজ্ঞাসা করলেন— “মা, আজ এখানে কী কারণে আপনার আগমন? আমাকে লঙ্কার বর্তমান অবস্থার কথা জানান।”

 

স্তবক – ২
শিরঃ চুম্বি, ছদ্মবেশী অম্বুরাশি-সুতা
উত্তরিলা;- “হায়! পুত্র, কি আর কহিব
কনক-লঙ্কার দশা! ঘোরতর রণে,
হত প্রিয় ভাই তব বীরবাহু বলী!
তার শোকে মহাশোকী রাক্ষসাধিপতি,
সসৈন্যে সাজেন আজি যুঝিতে আপনি।”

 

ইন্দ্রজিতের মাথা চুম্বন করে ধাত্রীর ছদ্মবেশে থাকা সমুদ্রকন্যা (লক্ষ্মী) উত্তর দিলেন— “হায় পুত্র! সোনার লঙ্কার অবস্থার কথা আর কী বলব! ভয়ংকর যুদ্ধে তোমার প্রিয় ও বলবান ভাই বীরবাহু নিহত হয়েছে। তার শোকে গভীর দুঃখে কাতর হয়ে রাক্ষসরাজ রাবণ নিজে আজ সৈন্যদল নিয়ে যুদ্ধের জন্য সাজছেন।”

 

স্তবক – ৩
জিজ্ঞাসিলা মহাবাহু বিস্ময় মানিয়া; –
“কি কহিলা, ভগবতি? কে বধিল কবে
প্রিয়ানুজে? নিশা-রণে সংহারিনু আমি
রঘুবরে; খন্ড খন্ড করিয়া কাটিনু
বরষি প্রচণ্ড শর বৈরিদলে; তবে
এ বারতা, এ অদ্ভুত বারতা, জননি
কোথায় পাইলে তুমি, শীঘ্র কহ দাসে।”

 

মহাবীর ইন্দ্রজিৎ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন— “দেবী, আপনি এ কী বলছেন! কবে, কে আমার প্রিয় ভাইকে বধ করল? রাতের যুদ্ধেই তো আমি রামচন্দ্রকে হত্যা করেছি। শত্রুদলকে আমার প্রচণ্ড বাণ নিক্ষেপ করে খণ্ড খণ্ড করে কেটেছি। তাহলে, হে মাতা, এমন অদ্ভুত খবর আপনি কোথা থেকে পেলেন, তা আমাকে শিগগির জানান।”

 

স্তবক – ৪
রত্নাকর রত্নোত্তমা ইন্দিরা সুন্দরী
উত্তরিলা; – “হায়! পুত্র, মায়াবী মানব
সীতাপতি; তব শরে মরিয়া বাঁচিল।
যাও তুমি ত্বরা করি; রক্ষ রক্ষঃকুল-
মান, এ কালসমরে, রক্ষঃ- চূড়ামণি!

 

সমুদ্রের শ্রেষ্ঠ রত্ন সুন্দরী ইন্দিরা (লক্ষ্মী) উত্তর দিলেন— “হায় পুত্র! সীতার স্বামী রামচন্দ্র হলেন এক মায়াবী মানুষ। সে তোমার বাণে মারা গিয়েও আবার বেঁচে উঠেছে। হে রাক্ষসকুলের শ্রেষ্ঠ বীর! তুমি তাড়াতাড়ি যাও এবং এই ভয়ংকর যুদ্ধের দিনে রাক্ষসকুলের সম্মান রক্ষা করো।”

 

স্তবক – ৫
ছিঁড়িলা কুসুমদাম রোষে মহাবলী
মেঘনাদ; ফেলাইলা কনক-বলয়
দূরে; পদতলে পড়ি শোভিল কুণ্ডল,
যথা অশোকের ফুল অশোকের তলে
আভাময়! “ধিক্ মোরে” কহিলা গম্ভীরে
কুমার, “হা ধিক্ মোরে! বৈরিদল বেড়ে
স্বর্ণলঙ্কা, হেথা আমি বামাদল মাঝে?
এই কি সাজে আমারে, দশাননাত্মজ
আমি ইন্দ্রজিৎ? আন রথ ত্বরা করি;
ঘুচাব এ অপবাদ, বধি রিপুকুলে।”

 

একথা শুনে মহাবীর মেঘনাদ (ইন্দ্রজিৎ) রাগে নিজের গলার ফুলের মালা ছিঁড়ে ফেললেন এবং হাতের সোনার বালা দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। তাঁর কানের কুণ্ডল পায়ের কাছে পড়ে এমনভাবে শোভা পাচ্ছিল, যেন অশোক গাছের নিচে উজ্জ্বল অশোক ফুল পড়ে আছে। এরপর গম্ভীর স্বরে তিনি নিজেকে ধিক্কার দিয়ে বললেন— “আমাকে ধিক্কার! শত্রুরা সোনার লঙ্কা ঘিরে ফেলেছে, আর আমি এখানে নারীদের মাঝে বসে আছি? আমি দশানন রাবণের ছেলে ইন্দ্রজিৎ, এ কাজ কি আমাকে মানায়? তাড়াতাড়ি আমার রথ আনো, শত্রুদের বিনাশ করে আমি আমার এই অপবাদ ঘোচাব।”

 

স্তবক – ৬
সাজিলা রথীন্দ্রর্যভ বীর-আভরণে,
হৈমবতীসুত যথা নাশিতে তারকে
মহাসুর; কিম্বা যথা বৃহন্নলারূপী
কিরীটী, বিরাটপুত্র সহ, উদ্ধারিতে
গোধন, সাজিলা শূর শমীবৃক্ষমূলে।
মেঘবর্ণ রথ; চক্র বিজলীর ছটা;
ধ্বজ ইন্দ্রচাপরূপী; তুরঙ্গম বেগে

 

রথীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বীর ইন্দ্রজিৎ বীরের সাজে সজ্জিত হলেন। তিনি ঠিক এমনভাবে সাজলেন, যেমনভাবে দেবী দুর্গার পুত্র কার্তিকেয় মহাসুর তারকাসুরকে বধ করার জন্য রণসাজে সেজেছিলেন। অথবা, অজ্ঞাতবাসের সময় বৃহন্নলার ছদ্মবেশধারী অর্জুন যেমন কৌরবদের হাত থেকে বিরাট রাজার গোধন (গরু) উদ্ধার করার জন্য শমীবৃক্ষের নিচে নিজের অস্ত্রশস্ত্রে বীরের সাজে সজ্জিত হয়েছিলেন, ইন্দ্রজিৎও ঠিক সেভাবেই সেজে উঠলেন। তার রথের রং ঘন মেঘের মতো কালো, রথের চাকা ঘুরলে বিদ্যুতের ছটার মতো আলোর দ্যুতি বের হয়। রথের পতাকা দেখতে রামধনুর মতো রঙিন এবং রথের ঘোড়াগুলো প্রচণ্ড দ্রুতগামী।

 

স্তবক – ৭
আশুগতি। রথে চড়ে বীর-চূড়ামণি
বীরদর্পে, হেন কালে প্রমীলা সুন্দরী,
ধরি পতি-কর-যুগ (হায় রে যেমতি হেমলতা আলিঙ্গয়ে তরু-কুলেশ্বরে)
কহিলা কাঁদিয়া ধনি; “কোথা প্রাণসখে,
রাখি এ দাসীরে, কহ, চলিলা আপনি?

 

শ্রেষ্ঠ রথী ইন্দ্রজিৎ বীরের বেশে সেজে বীরদর্পে রথে চড়লেন। ঠিক সেই সময় তাঁর স্ত্রী সুন্দরী প্রমীলা এসে তাঁর দুই হাত জড়িয়ে ধরলেন (যেমন সোনার লতা বড়ো গাছকে পেঁচিয়ে থাকে)। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন— “হে আমার প্রাণের সখা, এই দাসীকে ফেলে তুমি কোথায় চলেছ?”

 

স্তবক – ৮
কেমনে ধরিবে প্রাণ তোমার বিরহে
এ অভাগী? হায়, নাথ, গহন কাননে,
ব্রততী বাঁধিলে সাধে করি-পদ, যদি
তার রঙ্গরসে মনঃ না দিয়া, মাতঙ্গ
যায় চলি, তবু তারে রাখে পদাশ্রয়ে
যূথনাথ। তবে কেন তুমি, গুণনিধি,

 

“(তুমি চলে গেলে) তোমার বিরহে এই অভাগী কী করে বেঁচে থাকবে? হায় প্রভু, গভীর বনে হাতিদের দলপতি যদি তার পায়ে জড়ানো লতার প্রেমের আবেদনে সাড়া না দেয়, তাতে মন না দেয়, সে যদি হেঁটে চলে যায়, তবুও কিন্তু সে লতাটিকে তার পায়ের আশ্রয় থেকে ফেলে দেয় না। তবে তুমি, হে গুণবান প্রভু (গুণনিধি), আমাকে কেন ত্যাগ করছ?”

 

স্তবক – ৯
ত্যজ কিঙ্করীরে আজি?” হাসি উত্তরিলা
মেঘনাদ, ইন্দ্রজিতে জিতি তুমি, সতি,
বেঁধেছ যে দৃঢ় বাঁধে, কে পারে খুলিতে
সে বাঁধে? ত্বরায় আমি আসিব ফিরিয়া
কল্যাণি, সমরে নাশি, তোমার কল্যাণে
রাঘবে। বিদায় এবে দেহ, বিধুমুখি।”

 

মেঘনাদ হেসে উত্তর দিলেন— “সতী, তুমি আমাকে যে ভালোবাসার শক্ত বাঁধনে বেঁধেছ, তা কে খুলতে পারে? হে কল্যাণী, তোমার মঙ্গলের জন্যই আমি যুদ্ধে শত্রুকে (রামচন্দ্রকে) বিনাশ করে খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসব। হে সুন্দরমুখী, এখন আমাকে বিদায় দাও।”

 

স্তবক – ১০
উঠিল পবন-পথে ঘোরতর রবে,
রথবর, হৈমপাখা বিস্তারিয়া যেন
উড়িলা মৈনাক-শৈল অম্বর উজলি!
শিঞ্জিনী আকর্ষি রোষে, টঙ্কারিলা ধনুঃ
বীরেন্দ্র, পক্ষীন্দ্র যথা নাদে মেঘ মাঝে
ভৈরবে। কাঁপিল লঙ্কা, কাঁপিল জলধি!

 

ইন্দ্রজিতের শ্রেষ্ঠ রথটি ভীষণ গর্জন করে আকাশে উড়ল। মনে হলো, যেন সোনার ডানাওয়ালা মৈনাক পর্বত আকাশ আলোকিত করে উড়ে চলেছে। বীর ইন্দ্রজিৎ ক্রোধে ধনুকের ছিলা টেনে ধরে ভয়ঙ্কর টঙ্কার দিলেন, যা মেঘের মাঝে পক্ষীরাজ গরুড়ের গর্জনের মতো শোনাল। তাঁর এই বীরবিক্রমে লঙ্কা ও সমুদ্র উভয়ই কেঁপে উঠল।

 

স্তবক – ১১
সাজিছে রাবণ রাজা, বীরমদে মাতি; —
বাজিছে রণ-বাজনা; গরজিছে গজ;
হ্রেযে অশ্ব; হুঙ্কারিছে পদাতিক, রথী;
উড়িছে কৌশিক-ধ্বজ; উঠিছে আকাশে
কাঞ্চন-কণ্ডুক-বিভা। হেন কালে তথা,
দ্রুতগতি উতরিলা মেঘনাদ রথী।

 

রাজা রাবণ বীরের মদে মত্ত হয়ে যুদ্ধের জন্য সাজছেন; সেই সময় রণবাদ্য বেজে উঠল, হাতি গর্জন শুরু করল, ঘোড়ারা ডাকল এবং পদাতিক ও রথী সেনারা হুঙ্কার ছাড়তে লাগল। সিল্কের যুদ্ধের পতাকা বাতাসে উড়ল এবং রাজপ্রাসাদের চূড়ায় সোনার মণ্ডপের দ্যুতি আকাশে ছড়িয়ে পড়ল। ঠিক এই সময়েই, বীর যোদ্ধা মেঘনাদ দ্রুত রথে চেপে সেখানে এসে পৌঁছালেন।

 

স্তবক – ১২
নাদিলা কর্তৃরদল হেরি বীরবরে
মহাগর্বে। নমি পুত্র পিতার চরণে,
করযোড়ে কহিলা;- “হে রক্ষঃ-কুল-পতি,
শুনেছি, মরিয়া না কি বাঁচিয়াছে পুনঃ
রাঘব? এ মায়া, পিতঃ, বুঝিতে না পারি!
কিন্তু অনুমতি দেহ; সমূলে নির্মূল
করিব পামরে আজি! ঘোর শরানলে
করি ভস্ম, বায়ু-অস্ত্রে উড়াইব তারে;
নতুবা বাঁধিয়া আনি দিব রাজপদে।”

 

বীরশ্রেষ্ঠ ইন্দ্রজিৎকে রাজসভায় প্রবেশ করতে দেখে রাক্ষস সৈন্যরা অত্যন্ত গর্ব ও আনন্দের সাথে গর্জন করে উঠল। তখন পুত্র ইন্দ্রজিৎ পিতা রাবণের পায়ে প্রণাম করে, বিনয়ের সাথে হাত জোড় করে বলতে লাগলেন— “হে রাক্ষসকুলপতি পিতা, আমি শুনলাম যে রামচন্দ্র নাকি মরে গিয়েও আবার বেঁচে উঠেছেন? এই অলৌকিক মায়াজাল আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না! কিন্তু আপনি শুধু আমাকে অনুমতি দিন; আমি আজই সেই নরাধমকে বংশসমেত সম্পূর্ণ ধ্বংস করব। ভীষণ তীরের আগুনে পুড়িয়ে তাকে ছাই করে দেব, অথবা বায়ু-অস্ত্র দিয়ে উড়িয়ে দেব; আর তা যদি না করি, তবে তাকে জ্যান্ত বেঁধে এনে আপনার রাজচরণে সমর্পণ করব।”

 

স্তবক – ১৩
আলিঙ্গি কুমারে, চুম্বি শিরঃ, মৃদুস্বরে
উত্তর করিলা তবে স্বর্ণ-লঙ্কাপতি;
“রাক্ষস-কুল-শেখর তুমি, বৎস; তুমি
রাক্ষস-কুল-ভরসা। এ কাল সমরে,
নাহি চাহে প্রাণ মম পাঠাইতে তোমা
বারম্বার। হায়, বিধি বাম মম প্রতি।
কে কবে শুনেছে, পুত্র, ভাসে শিলা জলে,
কে কবে শুনেছে, লোক মরি পুনঃ বাঁচে?”

 

ইন্দ্রজিৎকে বুকে জড়িয়ে ধরে, তাঁর মাথায় চুমু খেয়ে সোনার লঙ্কার রাজা রাবণ শান্ত স্বরে উত্তর দিলেন— “বৎস, তুমি রাক্ষসকুলের শ্রেষ্ঠ বীর এবং তুমিই রাক্ষসদের একমাত্র ভরসা। এই ভয়ংকর যুদ্ধের দিনে তোমাকে বারবার পাঠাতে আমার মন চাইছে না। হায়, ঈশ্বর আমার প্রতি বিরূপ! ছেলে, কেউ কি কখনো শুনেছে যে পাথর জলে ভাসে? কেউ কি শুনেছে যে মানুষ মরে গিয়ে আবার বেঁচে ওঠে?”

 

স্তবক – ১৪
উত্তরিলা বীরদর্পে অসুরারি-রিপু; –
“কি ছার সে নর, তারে ডরাও আপনি,
রাজেন্দ্র? থাকিতে দাস, যদি যাও রণে
তুমি, এ কলঙ্ক, পিতঃ, ঘুষিবে জগতে।
হাসিবে মেঘবাহন; রুষিবেন দেব
অগ্নি। দুই বার আমি হারানু রাঘবে;
আর একবার পিতঃ, দেহ আজ্ঞা মোরে;
দেখিব এবার বীর বাঁচে কি ঔষধে!”

 

অসুরদের শত্রুর (দেবতাদের) রিপু বা শত্রু অর্থাৎ ইন্দ্রজিৎ বীরের দর্পে উত্তর দিলেন, “হে রাজেন্দ্র, রাম তো সামান্য একজন মানুষ, তাকে আপনি ভয় পাচ্ছেন? আপনার এই দাস (ইন্দ্রজিৎ) বেঁচে থাকতে আপনি যদি নিজে যুদ্ধে যান, তবে জগতে এই কলঙ্ক রাষ্ট্র হয়ে যাবে। এটা শুনে দেবরাজ ইন্দ্র হাসবেন এবং অগ্নিদেব রুষ্ট হবেন। আমি এর আগে দুইবার রাঘবকে (রামকে) হারিয়েছি; হে পিতা, আর একবার আমাকে আজ্ঞা দিন, দেখি এবার কোন ঔষধে সেই বীর বেঁচে ফেরে!”

 

স্তবক – ১৫
কহিলা রাক্ষসপতি; – “কুম্ভকর্ণ, বলী
ভাই মম, – তায় আমি জাগানু অকালে
ভয়ে; হায়, দেহ তার, দেখ, সিন্ধু-তীরে
ভূপতিত, গিরিশৃঙ্গ কিম্বা তরু যথা
বজ্রাঘাতে! তবে যদি একান্ত সমরে
ইচ্ছা তব, বৎস, আগে পূজ ইষ্টদেবে, —

 

রাবণ ইন্দ্রজিৎকে বললেন, “আমি ভয় পেয়ে আমার বলবান ভাই কুম্ভকর্ণকে অসময়ে ঘুম থেকে জাগিয়েছিলাম। কিন্তু দেখ, বজ্রাঘাতে ভেঙে পড়া পাহাড়ের চূড়া বা বড় গাছের মতোই তার বিশাল দেহ আজ সমুদ্রের তীরে মাটিতে পড়ে আছে (সে যুদ্ধে মারা গেছে)। এত কিছুর পরেও হে বৎস, তোমার যদি যুদ্ধ করার একান্ত ইচ্ছা থাকে, তবে তার আগে তুমি নিজের ইষ্টদেবের (কুলদেবতা বা অগ্নিদেব) পূজা সম্পন্ন করো।”

 

স্তবক – ১৬
নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সাঙ্গ কর, বীরমণি!
সেনাপতি পদে আমি বরিণু তোমারে।
দেখ, অস্তাচলগামী দিননাথ এবে;
প্রভাতে যুঝিও, বৎস, রাঘবের সাথে।”
এতেক কহিয়া রাজা, যথাবিধি লয়ে
গঙ্গোদক, অভিষেক করিলা কুমারে।

 

“হে বীরশ্রেষ্ঠ, নিকুম্ভিলা যজ্ঞ শেষ করো! আমি তোমাকে সেনাপতি পদে বরণ করলাম। দেখো, সূর্য এখন অস্তাচলে; তাই আজ নয়, কাল সকালে তুমি রাঘবের (রামের) সাথে যুদ্ধ করো।” এই কথা বলে রাজা রাবণ যথাযোগ্য নিয়ম মেনে গঙ্গাজল নিয়ে কুমার ইন্দ্রজিৎকে সেনাপতি পদে অভিষিক্ত করলেন।

অভিষেক কবিতা – মাইকেল মধুসূদন দত্ত

বহুবিকল্প ভিত্তিক প্রশ্ন উত্তর  

 

১. ‘অভিষেক’ কাব্যাংশটি কার রচনা?
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(খ) মাইকেল মধুসূদন দত্ত
(গ) কাজী নজরুল ইসলাম
(ঘ) শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
উত্তর: (খ) মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

২. ইন্দ্রজিৎ কনক-আসন ত্যাগ করে কার চরণে প্রণাম করেছিলেন?
(ক) পিতার
(খ) মাতার
(গ) ধাত্রীর
(ঘ) পত্নীর
উত্তর: (গ) ধাত্রীর।

৩. ছদ্মবেশী ধাত্রী কে ছিলেন?
(ক) প্রমীলা
(খ) হৈমবতী
(গ) রমা
(ঘ) অম্বুরাশি-সুতা
উত্তর: (ঘ) অম্বুরাশি-সুতা।

৪. লঙ্কার ঘোরতর রণে কে নিহত হয়েছেন?
(ক) কুম্ভকর্ণ
(খ) মেঘনাদ
(গ) বীরবাহু
(ঘ) রাবণ
উত্তর: (গ) বীরবাহু ।

৫. বীরবাহুর মৃত্যুতে কে মহাশোকী?
(ক) মন্দোদরী
(খ) রাক্ষসাধিপতি রাবণ
(গ) ইন্দ্রজিৎ
(ঘ) বিভীষণ
উত্তর: (খ) রাক্ষসাধিপতি রাবণ ।

৬. ইন্দ্রজিৎ রাতের যুদ্ধে কাকে সংহার করেছিলেন?
(ক) রঘুবরকে
(খ) লক্ষণকে
(গ) সুগ্রীবকে
(ঘ) হনুমানকে
উত্তর: (ক) রঘুবরকে।

৭. ‘রত্নাকর রত্নোত্তমা’ বলে কাকে সম্বোধন করা হয়েছে?
(ক) প্রমীলাকে
(খ) ইন্দিরাকে
(গ) সীতাকে
(ঘ) মন্দোদরীকে
উত্তর: (খ) ইন্দিরাকে।

৮. অম্বুরাশি-সুতা রামচন্দ্রকে কী বলেছেন?
(ক) মায়াবী মানব
(খ) বীরযোদ্ধা
(গ) কাপুরুষ
(ঘ) মহাপুরুষ
উত্তর: (ক) মায়াবী মানব।

৯. রাগে মেঘনাদ কী ছিঁড়ে ফেলেছিলেন?
(ক) উত্তরীয়
(খ) কুসুমদাম
(গ) হার
(ঘ) কবচ
উত্তর: (খ) কুসুমদাম।

১০. মেঘনাদ দূরে কী ফেলে দিয়েছিলেন?
(ক) রত্নহার
(খ) অস্ত্র
(গ) কনক-বলয়
(ঘ) মুকুট
উত্তর: (গ) কনক-বলয়।

১১. মেঘনাদের পায়ের কাছে পড়ে থাকা কুণ্ডল কিসের মতো শোভা পাচ্ছিল?
(ক) পদ্মফুলের মতো
(খ) জবা ফুলের মতো
(গ) অশোকের ফুলের মতো
(ঘ) রজনীগন্ধার মতো
উত্তর: (গ) অশোকের ফুলের মতো।

১২. ‘দশাননাত্মজ’ কে?
(ক) ইন্দ্রজিৎ
(খ) কুম্ভকর্ণ
(গ) বীরবাহু
(ঘ) বিভীষণ
উত্তর: (ক) ইন্দ্রজিৎ।

১৩. তারকাসুরকে কে নাশ করেছিলেন?
(ক) ইন্দ্র
(খ) হৈমবতীসুত
(গ) শিব
(ঘ) ব্রহ্মা
উত্তর: (খ) হৈমবতীসুত।

১৪. গোধন উদ্ধার করতে কে শমীবৃক্ষমূলে সেজেছিলেন?
(ক) নকুল
(খ) সহদেব
(গ) বৃহন্নলারূপী কিরীটী
(ঘ) ভীম
উত্তর: (গ) বৃহন্নলারূপী কিরীটী।

১৫. ইন্দ্রজিতের রথের বর্ণ কেমন ছিল?
(ক) মেঘবর্ণ
(খ) শ্বেতবর্ণ
(গ) পীতবর্ণ
(ঘ) কৃষ্ণবর্ণ
উত্তর: (ক) মেঘবর্ণ।

১৬. ইন্দ্রজিতের রথের চাকা কেমন ছিল?
(ক) অগ্নির মতো
(খ) বিজলীর ছটা
(গ) সূর্যের মতো
(ঘ) চন্দ্রের মতো
উত্তর: (খ) বিজলীর ছটা।

১৭. রথযাত্রার সময় ইন্দ্রজিতের হাত কে ধরেছিলেন?
(ক) সীতা
(খ) ধাত্রী
(গ) প্রমীলা সুন্দরী
(ঘ) মন্দোদরী
উত্তর: (গ) প্রমীলা সুন্দরী।

১৮. প্রমীলা সুন্দরী মেঘনাদকে কিসের সাথে জড়িয়ে ধরার তুলনা করা হয়েছে?
(ক) তরু-কুলেশ্বরে হেমলতা
(খ) শাখায় পুষ্প
(গ) সাপের বন্ধন
(ঘ) জলের ঢেউ
উত্তর: (ক) তরু-কুলেশ্বরে হেমলতা।

১৯. প্রমীলা সুন্দরী মেঘনাদকে কী বাঁধনে বেঁধেছেন?
(ক) আলগা বাঁধে
(খ) দৃঢ় বাঁধে
(গ) মায়ার বাঁধে
(ঘ) স্নেহের বাঁধে
উত্তর: (খ) দৃঢ় বাঁধে।

২০. ইন্দ্রজিতের রথ কীভাবে আকাশে উড়েছিল?
(ক) পাখির মতো
(খ) মৈনাক-শৈল অম্বর উজলি
(গ) ধূমকেতুর মতো
(ঘ) উল্কার মতো
উত্তর: (খ) মৈনাক-শৈল অম্বর উজলি।

২১. লঙ্কায় কার সাজো সাজো রব পড়েছিল?
(ক) ইন্দ্রজিতের
(খ) রাবণ রাজার
(গ) কুম্ভকর্ণের
(ঘ) বিভীষণের
উত্তর: (খ) রাবণ রাজার।

২২. ইন্দ্রজিৎ পিতা রাবণকে প্রণাম করে কার বিনাশের অনুমতি চাইলেন?
(ক) লক্ষ্মণের
(খ) হনুমানের
(গ) রাঘবের
(ঘ) সুগ্রীবের
উত্তর: (গ) রাঘবের।

২৩. রাবণ ইন্দ্রজিৎকে কী বলে সম্বোধন করেছেন?
(ক) রাক্ষস-কুল-শেখর
(খ) বীরযোদ্ধা
(গ) মহাবীর
(ঘ) সেনাপতি
উত্তর: (ক) রাক্ষস-কুল-শেখর।

২৪. “কে কবে শুনেছে, পুত্র, ভাসে ____ জলে” – শূন্যস্থানে কী বসবে?
(ক) কাঠ
(খ) শিলা
(গ) পাতা
(ঘ) তরী
উত্তর: (খ) শিলা।

২৫. রাবণ কাকে অকালে জাগিয়েছিলেন?
(ক) ইন্দ্রজিৎকে
(খ) বিভীষণকে
(গ) কুম্ভকর্ণকে
(ঘ) বীরবাহুকে
উত্তর: (গ) কুম্ভকর্ণকে।

২৬. কুম্ভকর্ণের দেহ কোথায় পড়ে ছিল?
(ক) প্রাসাদে
(খ) সিন্ধু-তীরে
(গ) অরণ্যে
(ঘ) পাহাড়ে
উত্তর: (খ) সিন্ধু-তীরে।

২৭. ইন্দ্রজিৎকে যুদ্ধের আগে কী যজ্ঞ সাঙ্গ করতে বলা হয়েছিল?
(ক) নিকুম্ভিলা যজ্ঞ
(খ) অশ্বমেধ যজ্ঞ
(গ) রাজসূয় যজ্ঞ
(ঘ) পুত্রেষ্টি যজ্ঞ
উত্তর: (ক) নিকুম্ভিলা যজ্ঞ।

২৮. রাবণ ইন্দ্রজিৎকে কোন পদে বরণ করেছিলেন?
(ক) যুবরাজ
(খ) মন্ত্রী
(গ) রক্ষক
(ঘ) সেনাপতি
উত্তর: (ঘ) সেনাপতি।

২৯. রাবণ কী দিয়ে ইন্দ্রজিতের অভিষেক করেছিলেন?
(ক) সুগন্ধি জল
(খ) পুষ্পবৃষ্টি
(গ) গঙ্গোদক
(ঘ) চন্দন
উত্তর: (গ) গঙ্গোদক।

৩০. ‘অভিষেক’ কবিতাটি কোথা থেকে নেওয়া হয়েছে?
(ক) মেঘনাদবধ কাব্য
(খ) বীরাঙ্গনা কাব্য
(গ) ব্রজাঙ্গনা কাব্য
(ঘ) তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য
উত্তর: (ক) মেঘনাদবধ কাব্য।

দশম শ্রেণী বাংলা অভিষেক কবিতা

অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর  

 

১. ইন্দ্রজিৎ কার কাছে লঙ্কার কুশল সংবাদ জানতে চেয়েছিলেন?
উত্তর: ইন্দ্রজিৎ তাঁর ধাত্রীমার কাছে লঙ্কার কুশল সংবাদ জানতে চেয়েছিলেন।

২. রাক্ষসাধিপতি কেন সসৈন্যে যুদ্ধের সাজে সেজেছিলেন?
উত্তর: ঘোরতর যুদ্ধে প্রিয় পুত্র বীরবাহুর মৃত্যুর শোকে রাক্ষসরাজ রাবণ সসৈন্যে যুদ্ধের সাজে সেজেছিলেন।

৩. ইন্দ্রজিৎ ধাত্রীমার কথা শুনে কেন বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন?
উত্তর: কারণ ইন্দ্রজিৎ রাতের যুদ্ধেই রঘুবরকে বা রামচন্দ্রকে খণ্ড খণ্ড করে কেটে সংহার করেছিলেন, তাই তাঁর পুনর্জীবনের কথা শুনে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন।

৪. রত্নাকর রত্নোত্তমা ইন্দিরা সীতাপতি সম্পর্কে কী বলেছিলেন?
উত্তর: তিনি বলেছিলেন যে সীতাপতি এক মায়াবী মানব, যে ইন্দ্রজিতের বাণে মরেও আবার বেঁচে উঠেছে।

৫. ইন্দ্রজিৎ রাগে কী কী দূরে নিক্ষেপ করেছিলেন?
উত্তর: ইন্দ্রজিৎ রাগে নিজের গলার কুসুমদাম বা ফুলের মালা ছিঁড়ে ফেলেছিলেন এবং হাতের কনক-বলয় দূরে ফেলে দিয়েছিলেন।

৬. “যথা অশোকের ফুল অশোকের তলে আভাময়!” – এখানে কীসের তুলনা করা হয়েছে?
উত্তর: এখানে ইন্দ্রজিতের পদতলে পড়ে থাকা উজ্জ্বল কুণ্ডলের তুলনা করা হয়েছে।

৭. ইন্দ্রজিৎ নিজেকে ধিক্কার দিয়েছিলেন কেন?
উত্তর: শত্রুরা যখন স্বর্ণলঙ্কা ঘিরে ফেলেছে, তখন দশানন-পুত্র ইন্দ্রজিৎ নারীদের মাঝে অবস্থান করছিলেন, তাই এই অপমানের কারণে তিনি নিজেকে ধিক্কার দিয়েছিলেন।

৮. ইন্দ্রজিৎ রথ আনতে বলেছিলেন কেন?
উত্তর: শত্রুকুলকে বধ করে নিজের নারীদের মাঝে বসে থাকার অপবাদ ঘোচাতে তিনি দ্রুত রথ আনতে বলেছিলেন।

৯. কবি ইন্দ্রজিতের রণসাজকে কাদের সাথে তুলনা করেছেন?
উত্তর: তারকাসুরকে বধ করতে যাওয়া হৈমবতীসুত (কার্তিকেয়) এবং বিরাটপুত্রের সাথে গোধন উদ্ধার করতে যাওয়া শমীবৃক্ষমূলে সজ্জিত বৃহন্নলারূপী কিরীটীর (অর্জুন) সাথে তুলনা করেছেন।

১০. ইন্দ্রজিতের রথের অশ্বের গতি কেমন ছিল?
উত্তর: ইন্দ্রজিতের রথের অশ্বের গতি আশুগতি অর্থাৎ অত্যন্ত দ্রুতবেগী ছিল।

১১. প্রমীলা সুন্দরী কীভাবে ইন্দ্রজিৎকে আটকে রাখতে চেয়েছিলেন?
উত্তর: হেমলতা যেমন বড়ো গাছকে (তরু-কুলেশ্বরে) জড়িয়ে থাকে, তেমনি তিনি কেঁদে ইন্দ্রজিতের দুই হাত জড়িয়ে ধরেছিলেন।

১২. প্রমীলা সুন্দরী নিজেকে কী বলে উল্লেখ করেছেন?
উত্তর: প্রমীলা সুন্দরী নিজেকে ইন্দ্রজিতের ‘দাসী’ এবং ‘অভাগী’ বলে উল্লেখ করেছেন।

১৩. ইন্দ্রজিৎ কীভাবে প্রমীলাকে আশ্বস্ত করেছিলেন?
উত্তর: ইন্দ্রজিৎ বলেছিলেন যে প্রমীলার দেওয়া দৃঢ় বাঁধন কেউ খুলতে পারবে না এবং তিনি তাঁরই কল্যাণে সমরে রাঘবকে বিনাশ করে শীঘ্রই ফিরে আসবেন।

১৪. ইন্দ্রজিতের ধনুকের টঙ্কারকে কিসের সাথে তুলনা করা হয়েছে?
উত্তর: মেঘের মাঝে পক্ষীন্দ্র বা গরুর পাখির ভৈরব নাদ বা গর্জনের সাথে তুলনা করা হয়েছে।

১৫. ইন্দ্রজিৎ যখন লঙ্কায় পৌঁছান, তখন সেখানকার যুদ্ধের প্রস্তুতি কেমন ছিল?
উত্তর: সেখানে রণ-বাজনা বাজছিল, হাতি গর্জন করছিল, ঘোড়া হ্রেষারব করছিল এবং পদাতিক ও রথীরা হুঙ্কার দিচ্ছিল।

১৬. লঙ্কায় পৌঁছে ইন্দ্রজিৎ পিতা রাবণকে কী অনুরোধ করেছিলেন?
উত্তর: তিনি পিতা রাবণকে রামচন্দ্রকে বা রাঘবকে সমূলে নির্মূল করার অনুমতি চেয়েছিলেন।

১৭. ইন্দ্রজিৎ কোন অস্ত্রের সাহায্যে রামচন্দ্রকে ওড়ানোর কথা বলেছেন?
উত্তর: তিনি বায়ু-অস্ত্রের সাহায্যে রামচন্দ্রকে ওড়ানোর কথা বলেছেন।

১৮. রাবণ ইন্দ্রজিৎকে কী বলে আশ্বস্ত করেন?
উত্তর: রাবণ তাঁকে ‘রাক্ষস-কুল-শেখর’ এবং ‘রাক্ষস-কুল-ভরসা’ বলে আশ্বস্ত করেন।

১৯. “কে কবে শুনেছে, লোক মরি পুনঃ বাঁচে?” – রাবণ এই কথা কেন বলেছিলেন?
উত্তর: রামচন্দ্র রাতের যুদ্ধে মরে গিয়েও পুনরায় বেঁচে উঠেছেন শুনে রাবণ এই অদ্ভুত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কথাটি বলেছিলেন।

২০. মেঘবাহন হাসবেন কেন?
উত্তর: ইন্দ্রজিতের মতো বীর থাকতে যদি রাজা রাবণ নিজে যুদ্ধে যান, তবে তা জগতের কাছে কলঙ্ক হবে এবং দেবরাজ ইন্দ্র বা মেঘবাহন হাসবেন।

২১. ইন্দ্রজিৎ কতবার রাঘবকে হারিয়েছিলেন?
উত্তর: ইন্দ্রজিৎ দুই বার রাঘবকে বা রামচন্দ্রকে হারিয়েছিলেন।

২২. অকালে জাগানোর ফলে কুম্ভকর্ণের কী দশা হয়েছিল?
উত্তর: তার বিশাল দেহ বজ্রাঘাতে পড়া পর্বতের চূড়া বা গাছের মতো সমুদ্রের তীরে (সিন্ধু-তীরে) মাটিতে পড়ে ছিল।

২৩. রাজা রাবণ ইন্দ্রজিৎকে যুদ্ধযাত্রার আগে কী নির্দেশ দিয়েছিলেন?
উত্তর: তিনি ইন্দ্রজিৎকে আগে ইষ্টদেবতার পূজা করতে এবং নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সাঙ্গ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন

২৪. রাজা রাবণ কখন ইন্দ্রজিৎকে রামের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেন?
উত্তর: দিননাথ বা সূর্য যখন অস্তাচলগামী, তখন তিনি পরের দিন প্রভাতে রামের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেন।

২৫. রাবণ কীসের দ্বারা ইন্দ্রজিতের অভিষেক সম্পন্ন করেছিলেন?
উত্তর: তিনি যথাবিধি গঙ্গাজল বা গঙ্গোদক দিয়ে ইন্দ্রজিৎকে সেনাপতি পদে অভিষেক করেছিলেন।

  বাংলা অভিষেক কবিতা

৩ নম্বর প্রশ্ন উত্তর 

 

১. “জিজ্ঞাসিলা মহাবাহু বিস্ময় মানিয়া;” – ‘মহাবাহু’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? তাঁর বিস্ময়ের কারণ কী? [১+২=৩]

উত্তর: মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত ‘অভিষেক’ কাব্যাংশে ‘মহাবাহু’ বলতে দশানন-পুত্র বীর ইন্দ্রজিৎ বা মেঘনাদকে বোঝানো হয়েছে।

 

বিস্ময়ের কারণ: প্রমোদকাননে ধাত্রী প্রভাষার ছদ্মবেশে থাকা দেবী লক্ষ্মীর (অম্বুরাশি-সুতা) কাছে ইন্দ্রজিৎ জানতে পারেন যে, ঘোরতর যুদ্ধে তাঁর প্রিয় ভাই বীরবাহু নিহত হয়েছেন। এই খবর শুনে ইন্দ্রজিৎ অত্যন্ত বিস্মিত হন, কারণ রাতের যুদ্ধেই তিনি রামচন্দ্রকে তীব্র বাণ নিক্ষেপ করে খণ্ড খণ্ড করে কেটে সংহার করেছিলেন। একজন মৃত মানুষের আবার বেঁচে ওঠার অদ্ভুত খবরটিই তাঁর বিস্ময়ের প্রধান কারণ ছিল।

 

২. “ধিক্ মোরে” – কে, কেন নিজেকে ধিক্কার দিয়েছেন? [১+২=৩]

উত্তর: আলোচ্য উদ্ধৃতিটিতে বীরযোদ্ধা ইন্দ্রজিৎ বা মেঘনাদ নিজেকে ধিক্কার দিয়েছেন।

ধিক্কার দেওয়ার কারণ: ইন্দ্রজিৎ তাঁর ধাত্রীমার কাছ থেকে জানতে পারেন যে, রামচন্দ্রের সাথে যুদ্ধে তাঁর ভাই বীরবাহু নিহত হয়েছেন এবং শোকাচ্ছন্ন পিতা রাবণ নিজে যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হচ্ছেন। শত্রুরা যখন স্বর্ণলঙ্কা ঘিরে ফেলেছে, তখন লঙ্কার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বীরযোদ্ধা হয়েও ইন্দ্রজিৎ দূরে প্রমোদকাননে নারীদের (বামাদল) মাঝে বিলাসিতায় মত্ত ছিলেন। মাতৃভূমির এই চরম বিপদের দিনে নিজের এই নির্লিপ্ততা ও দূরে থাকাকে কাপুরুষোচিত মনে করেই তিনি নিজেকে ধিক্কার জানিয়েছিলেন।

 

৩. “ঘুচাব এ অপবাদ, বধি রিপুকুলে।” – বক্তা কে? কোন অপবাদের কথা বলা হয়েছে? তা তিনি কীভাবে ঘোচাতে চেয়েছেন? [১+১+১=৩]

উত্তর: উক্তিটির বক্তা হলেন রাবণ-পুত্র বীর ইন্দ্রজিৎ।

 

অপবাদ: শত্রুরা স্বর্ণলঙ্কা আক্রমণ করেছে এবং বীরবাহু মারা গেছেন। এই ঘোর বিপদের দিনে লঙ্কার শ্রেষ্ঠ বীর ইন্দ্রজিৎ রণক্ষেত্রে না থেকে প্রমোদকাননে নারীদের মাঝে অবস্থান করছেন—এটিকেই তিনি নিজের জন্য চরম ‘অপবাদ’ বলে মনে করেছেন।

 

অপবাদ ঘোচানোর উপায়: ইন্দ্রজিৎ দ্রুত রথ আনানোর নির্দেশ দেন, যাতে তিনি অবিলম্বে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে শত্রুকুলকে সমূলে বিনাশ করতে পারেন এবং বীরের মতো নিজের হৃত সম্মান ও লঙ্কার গৌরব পুনরুদ্ধার করে এই অপবাদ ঘোচাতে পারেন।

 

৪. “হায়, বিধি বাম মম প্রতি।” – বক্তা কে? তিনি কেন এমন কথা বলেছেন? [১+২=৩]

উত্তর: উদ্ধৃত অংশটির বক্তা হলেন রাক্ষসরাজ রাবণ বা স্বর্ণ-লঙ্কাপতি।

 

উক্তির কারণ: বীরবাহুর মৃত্যুর পর রাবণ যখন স্বয়ং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, তখন ইন্দ্রজিৎ এসে রামচন্দ্রকে সমূলে নির্মূল করার জন্য যুদ্ধযাত্রার অনুমতি চান। রাবণ ইন্দ্রজিৎকে রাক্ষসকুলের শ্রেষ্ঠ ভরসা বলে মনে করতেন, তাই এই ভয়ংকর যুদ্ধে তিনি তাঁর প্রিয় পুত্রকে বারবার মৃত্যুর মুখে পাঠাতে চাননি। রাবণের মনে হয়েছিল, নিয়তি বা বিধাতা তাঁর প্রতি বিরূপ (বাম), কারণ রামচন্দ্র মরে গিয়েও পুনরায় বেঁচে উঠছেন, যা জলে পাথর ভাসার মতোই অসম্ভব একটি ঘটনা। এই অদ্ভুত ঘটনাটি দেখেই হতাশ রাবণ মন্তব্যটি করেছিলেন।

 

৫. “সাজিলা রথীন্দ্রর্ষভ বীর-আভরণে” – ‘রথীন্দ্রর্ষভ’ বলতে কার কথা বলা হয়েছে? তাঁর রণসজ্জার তুলনাগুলি উল্লেখ করো। [১+২=৩]

 

উত্তর: ‘রথীন্দ্রর্ষভ’ (রথী + ইন্দ্র + ঋষভ) বা রথীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলতে এখানে বীরেন্দ্রকেশরী ইন্দ্রজিৎ বা মেঘনাদকে বোঝানো হয়েছে।

রণসজ্জার তুলনা: মাতৃভূমির চরম বিপদের কথা শুনে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ইন্দ্রজিৎ দ্রুত বীরের সাজে সজ্জিত হন। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর এই রণসজ্জাকে দুটি পৌরাণিক ঘটনার সাথে তুলনা করেছেন। প্রথমত, তারকাসুরকে বধ করার জন্য শিব-পার্বতীর পুত্র কার্তিকেয় (হৈমবতীসুত) যেভাবে সেজেছিলেন; এবং দ্বিতীয়ত, বিরাট রাজার গোধন উদ্ধার করার জন্য শমীবৃক্ষমূলে অর্জুন (বৃহন্নলারূপী কিরীটী) যেভাবে বীরবেশে সজ্জিত হয়েছিলেন।

মাধ্যমিক বাংলা অভিষেক কবিতা

বড়ো প্রশ্ন ও উত্তর  

 

১. “ইন্দ্রজিৎ চরিত্রের বীরত্ব ও দেশপ্রেমের পরিচয় দাও।” [৫]

উত্তর: মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এর অন্তর্গত ‘অভিষেক’ কাব্যাংশে মূল কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো দশানন-পুত্র ইন্দ্রজিৎ বা মেঘনাদ। আলোচ্য কবিতায় তাঁর চরিত্রের বীরত্ব এবং গভীর দেশপ্রেমের এক অপূর্ব প্রকাশ ঘটেছে।

 

গভীর দেশপ্রেম ও আত্মধিক্কার: প্রমোদকাননে ধাত্রীমার কাছ থেকে লঙ্কার ঘোরতর বিপদ এবং ভাই বীরবাহুর মৃত্যুর খবর শুনে ইন্দ্রজিৎ গভীরভাবে মর্মাহত হন। মাতৃভূমি যখন শত্রুদের দ্বারা আক্রান্ত, তখন একজন বীরযোদ্ধা হয়েও তিনি নারীদের মাঝে বিলাসিতায় মত্ত ছিলেন—এই চিন্তায় তাঁর দেশপ্রেমিক সত্তা জেগে ওঠে এবং তিনি নিজেকে তীব্র ধিক্কার জানান (“ধিক্ মোরে”)। রাগে তিনি নিজের গলার মালা ও হাতের সোনার বালা দূরে ছুঁড়ে ফেলেন।

 

অতুলনীয় বীরত্ব ও আত্মবিশ্বাস: ইন্দ্রজিতের বীরত্বের কোনো তুলনা হয় না। রামচন্দ্রকে তিনি রাতের যুদ্ধেই খণ্ড খণ্ড করে কেটেছিলেন। মায়াবী রাম পুনরায় বেঁচে উঠেছেন শুনে তিনি বিস্মিত হলেও ভয় পাননি। তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পিতা রাবণকে বলেন যে, তিনি শত্রুকে সমূলে নির্মূল করবেন। তীরের আগুনে ভস্ম করে বা বায়ু-অস্ত্রে উড়িয়ে দিয়ে রামচন্দ্রকে ধ্বংস করার প্রবল হুঙ্কার তাঁর বীরত্বেরই প্রমাণ দেয়।

 

দায়িত্ববোধ: ইন্দ্রজিৎ মনে করেছেন, তিনি বেঁচে থাকতে তাঁর বৃদ্ধ পিতা রাবণ যদি যুদ্ধে যান, তবে তা সমগ্র জগতে তাঁর জন্য কলঙ্কের কারণ হবে। তাই তিনি সেনাপতির দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।

 

সংক্ষেপে বলা যায়, ‘অভিষেক’ কবিতায় ইন্দ্রজিৎ কেবল একজন পরাক্রমশালী যোদ্ধাই নন, তিনি একজন দায়িত্বশীল পুত্র এবং নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক হিসেবেও পাঠকের মন জয় করেছেন।

 

২. “‘ঘুচাব এ অপবাদ, বধি রিপুকুলে।’ – বক্তা কে? কোন অপবাদের কথা বলা হয়েছে? উক্ত অপবাদ ঘোচানোর জন্য তিনি কীরূপ প্রস্তুতি নিয়েছিলেন?” [১+১+৩=৫]

উত্তর: উদ্ধৃত অংশটির বক্তা হলেন লঙ্কার শ্রেষ্ঠ বীর মেঘনাদ বা ইন্দ্রজিৎ।

 

অপবাদ: শত্রুরা স্বর্ণলঙ্কা আক্রমণ করেছে, ঘোরতর যুদ্ধে ভাই বীরবাহু মারা গেছেন এবং পিতা রাবণ স্বয়ং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। লঙ্কার এই চরম বিপদের দিনে রক্ষকূলের শ্রেষ্ঠ রথী ইন্দ্রজিৎ যুদ্ধক্ষেত্রে না থেকে প্রমোদকাননে নারীদের (বামাদল) মাঝে বিলাসিতায় মত্ত ছিলেন। দশানন-পুত্রের এই কাপুরুষোচিত আচরণকেই তিনি নিজের জন্য চরম ‘অপবাদ’ বা কলঙ্ক বলে মনে করেছেন।

 

অপবাদ ঘোচানোর প্রস্তুতি: এই অপবাদ ঘোচানোর জন্য ইন্দ্রজিৎ দ্রুত তাঁর রথ আনতে নির্দেশ দেন এবং রণসাজে সজ্জিত হন। তাঁর রণসজ্জার বিশালতা বোঝাতে কবি দুটি পৌরাণিক উপমার আশ্রয় নিয়েছেন। তারকাসুরকে বধ করার জন্য কার্তিকেয় যেভাবে সেজেছিলেন অথবা বিরাট রাজার গোধন উদ্ধার করার জন্য শমীবৃক্ষমূলে অর্জুন যেভাবে বীরবেশে সজ্জিত হয়েছিলেন, ইন্দ্রজিৎ ঠিক সেভাবেই সেজেছিলেন। তাঁর রথের বর্ণ ছিল মেঘের মতো, চাকার ঝলকানি ছিল বিদ্যুতের মতো এবং ঘোড়াগুলি ছিল অত্যন্ত দ্রুতবেগী। তিনি বীরদর্পে রথে উঠে ধনুকে টঙ্কার দিয়ে এমন ভয়ংকর গর্জন করেছিলেন যে, তাতে সমগ্র লঙ্কা ও সমুদ্র কেঁপে উঠেছিল।

 

৩. “‘অভিষেক’ কবিতা অবলম্বনে রাক্ষসরাজ রাবণ চরিত্রের অসহায়তা ও পুত্রস্নেহের পরিচয় দাও।” [৫]

উত্তর: মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘অভিষেক’ কাব্যাংশে রাক্ষসরাজ রাবণের এক অন্য রূপ দেখা যায়। এখানে তিনি কেবল এক অহংকারী রাজা নন, বরং এক স্নেহশীল ও অসহায় পিতা।

পুত্রশোক ও হতাশা: কবিতার শুরুতেই আমরা জানতে পারি, ঘোরতর যুদ্ধে প্রিয় পুত্র বীরবাহুর মৃত্যুতে রাবণ ‘মহাশোকী’। এই শোক তাঁকে এতটাই আঘাত করেছে যে, তিনি নিজেই সৈন্যদল নিয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছেন।

গভীর পুত্রস্নেহ: ইন্দ্রজিৎ যখন লঙ্কায় ফিরে রামচন্দ্রকে বধ করার অনুমতি চান, তখন রাবণ তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুম্বন করেন। তিনি ইন্দ্রজিৎকে ‘রাক্ষস-কুল-শেখর’ এবং লঙ্কার একমাত্র ভরসা বলে উল্লেখ করেন। এই ভয়ংকর যুদ্ধে তাঁর শ্রেষ্ঠ পুত্রকে বারবার মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে তাঁর পিতৃ হৃদয় রাজি হয়নি।

অসহায়তা ও নিয়তির প্রতি আক্ষেপ: রাবণ একজন পরাক্রমশালী রাজা হয়েও নিয়তির কাছে নিজেকে অসহায় মনে করেছেন। রাতের যুদ্ধে ইন্দ্রজিতের হাতে মারা যাওয়ার পরও রামচন্দ্রের পুনরায় বেঁচে ওঠার অদ্ভুত ঘটনাটি তাঁকে হতবাক করেছে। হতাশায় তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, “হায়, বিধি বাম মম প্রতি।” জলে পাথর ভাসার মতো অসম্ভব ঘটনাও যে রামের ক্ষেত্রে সম্ভব হচ্ছে, তা ভেবেই তিনি অসহায় বোধ করেছেন।

পরিশেষে বলা যায়, বীরত্ব ও রাজকীয় অহংকারের আড়ালে রাবণের অন্তরের এই স্নেহশীল ও অসহায় রূপটি পাঠককে তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল করে তোলে।

৪. “‘বিদায় এবে দেহ, বিধুমুখি।’ – ‘বিধুমুখি’ কে? তাঁর কাছে বক্তার বিদায় নেওয়ার মুহূর্তটি নিজের ভাষায় বর্ণনা করো।” [১+৪=৫]

উত্তর: মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত ‘অভিষেক’ কাব্যাংশে ‘বিধুমুখি’ বলতে ইন্দ্রজিতের স্ত্রী প্রমীলা সুন্দরীকে বোঝানো হয়েছে। চাঁদের মতো সুন্দর মুখ যাঁর, তাঁকেই বিধুমুখী বলা হয়।

বিদায় নেওয়ার মুহূর্ত: লঙ্কার ঘোরতর বিপদের কথা শুনে ইন্দ্রজিৎ যখন রণসাজে সজ্জিত হয়ে রথে ওঠেন, ঠিক সেই সময় তাঁর স্ত্রী প্রমীলা সুন্দরী এসে তাঁর দুই হাত জড়িয়ে ধরেন। কবি এই দৃশ্যটিকে উপমা দিয়ে বুঝিয়েছেন যে, সোনার লতা যেমন বড়ো গাছকে পেঁচিয়ে থাকে, প্রমীলাও ঠিক সেভাবেই ইন্দ্রজিৎকে জড়িয়ে ধরেছিলেন।প্রমীলা কাঁদতে কাঁদতে বলেন যে, তাঁকে একলা ফেলে তাঁর ‘প্রাণসখা’ কোথায় চলেছেন! তিনি নিজেকে অভাগী বলে উল্লেখ করে জানান যে, ইন্দ্রজিৎকে ছাড়া তাঁর প্রাণ বাঁচবে না। বনের হাতি পায়ে লতা জড়িয়ে গেলে তা ছিঁড়ে না ফেলে আশ্রয় দেয়, এই উদাহরণ দিয়ে প্রমীলা ইন্দ্রজিৎকে তাঁকে ছেড়ে না যাওয়ার অনুরোধ করেন।স্ত্রীর এই গভীর ভালোবাসা ও আবেগ দেখে মেঘনাদ হাসেন। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন যে, প্রমীলা তাঁকে যে ভালোবাসার দৃঢ় বাঁধনে বেঁধেছেন, তা কেউ খুলতে পারবে না। স্ত্রীর কল্যাণের জন্যই তিনি দ্রুত যুদ্ধে শত্রুকে বিনাশ করে ফিরে আসবেন—এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইন্দ্রজিৎ তাঁর বিধুমুখী স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নেন।

৫. “ইন্দ্রজিতের সেনাপতি পদে অভিষেকের প্রেক্ষাপট ও ঘটনাটি নিজের ভাষায় বর্ণনা করো।” [৫]

উত্তর: ‘অভিষেক’ কাব্যাংশের একেবারে শেষ পরিণতি হলো লঙ্কার সেনাপতি পদে ইন্দ্রজিতের অভিষেক।

প্রেক্ষাপট: ধাত্রীমার কাছে লঙ্কার বিপদ ও ভাই বীরবাহুর মৃত্যুর খবর পেয়ে ইন্দ্রজিৎ রণসাজে সেজে লঙ্কায় উপস্থিত হন। সেখানে তিনি দেখেন, রাবণ স্বয়ং যুদ্ধের জন্য বিশাল আয়োজন করেছেন। ইন্দ্রজিৎ পিতা রাবণকে প্রণাম করে এই ভয়ংকর যুদ্ধে নিজে যাওয়ার অনুমতি চান এবং রামচন্দ্রকে সমূলে বিনাশ করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু রামচন্দ্রের অদ্ভুত পুনর্জীবনের কারণে এবং পুত্রস্নেহের বশবর্তী হয়ে রাবণ তাঁকে বারবার মৃত্যুর মুখে পাঠাতে অস্বীকার করেন।

অভিষেকের ঘটনা: পিতার অমত শুনে ইন্দ্রজিৎ যুক্তি দেখান যে, তিনি বেঁচে থাকতে তাঁর পিতা যদি যুদ্ধে যান, তবে তা জগতে কলঙ্ক ছড়াবে এবং দেবরাজ ইন্দ্র ও অগ্নিদেব হাসাহাসি করবেন। তিনি পিতাকে এও মনে করিয়ে দেন যে, তিনি দু-বার রামকে যুদ্ধে হারিয়েছেন, তাই তাঁকে শেষবার সুযোগ দেওয়া হোক।পুত্রের এই অকাট্য যুক্তি, জেদ এবং বীরদর্পের কাছে অবশেষে রাক্ষসরাজ রাবণ হার মানেন। তিনি ইন্দ্রজিৎকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দেন, তবে তার আগে ইষ্টদেবতার পূজা করে ‘নিকুম্ভিলা যজ্ঞ’ সাঙ্গ করার উপদেশ দেন। যেহেতু পরদিন সকালে যুদ্ধযাত্রা হবে, তাই নিয়ম ও শাস্ত্র মেনে রাজা রাবণ গঙ্গাজল দিয়ে তাঁর বীর পুত্র ইন্দ্রজিৎকে লঙ্কার সেনাপতি পদে বরণ করেন বা অভিষেক করেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়েই কাব্যাংশটির সমাপ্তি ঘটে।

আজকের পোস্ট এর মধ্যে অভিষেক কবিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা, লাইন ধরে বাংলা অর্থ এবং উত্তর সহ প্রশ্নও আলোচনা করা হল, যেগুলি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিশেষ ভাবে তোমাদের সহায়ক হয়ে উঠবে।

 

SOURCE-EDT

©kamaleshforeducation.in(2023)

 

 

 

 

error: Content is protected !!
Scroll to Top