মাধ্যমিক ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতা

কাজী নজরুল ইসলা

উত্তর-সহ নোটস (MCQ ও বড় প্রশ্ন)  

Published on: 

 

আজকে  বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, ‘প্রলয়’ বা ধ্বংসের মধ্যেই যে সৃষ্টির নতুন বীজ লুকিয়ে থাকে, পরাধীনতার অন্ধকার ঘুচিয়ে স্বাধীনতার নতুন সূর্য ছিনিয়ে আনতে যে কালবৈশাখীর মতো ভয়ংকর শক্তির প্রয়োজন—সেই বার্তাই কবি এই কবিতায় দিয়েছেন।

 

বিষয়

বিবরণ

কবিতা

প্রলয়োল্লাস

কবি

কাজী নজরুল ইসলাম

গৃহীত (উৎস)

‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থ

বোর্ড: বিষয়বস্তু

1 প্রলয়োল্লাস – কাজী নজরুল ইসলাম (দশম শ্রেণী বাংলা কবিতা)

1.1 প্রলয়োল্লাস কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম (সহজ বাংলা অর্থ) লাইন ধরে

2 দশম শ্রেণী বাংলা প্রলয়োল্লাস কবিতার বহু বিকল্প ভিত্তিক প্রশ্ন উত্তর | Class 10 Praloyollas MCQ Question Answer

3 দশম শ্রেণী বাংলা প্রলয়োল্লাস কবিতার অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর | Class 10 Praloyollas Short Question Answer SAQ

4 ক্লাস ১০ বাংলা প্রলয়োল্লাস কবিতা ৩ নম্বর প্রশ্ন উত্তর | Praloyollas Class 10 3 Marks Question Answer

5 মাধ্যমিক বাংলা প্রলয়োল্লাস কবিতা বড়ো প্রশ্ন ও উত্তর | Madhyamik Bengali Praloyollas 5 Marks Important Question Answer

প্রলয়োল্লাস 

কাজী নজরুল ইসলাম 

(দশম শ্রেণী বাংলা কবিতা) 

 

আজকের এই পোস্টে কাজী নজরুল ইসলাম লেখা  ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটির উৎস,  কবিতার সারাংশ, কবিতার নামকরণের তাৎপর্যতা এবং প্রশ্ন উত্তর খুব সহজ ভাষায় আলোচনা করা হয়েছে।

 

প্রলয়োল্লাস কবিতার উৎস ও কবি পরিচিতি 

 

আলোচ্য ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটির রচয়িতা হলেন বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবি কাজী নজরুল ইসলাম । বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই কবি তাঁর গান ও কবিতার মাধ্যমে আজীবন ইংরেজ শাসন, অন্যায় অবিচার ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেছেন । তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘প্রলয়শিখা’ ইত্যাদি ।

 

প্রলয়োল্লাস কবিতার সারাংশ

 

কবিতার শুরুতেই কবি দেশের আপামর মানুষকে বারবার জয়ধ্বনি করতে বলেছেন ।কারণ, কালবোশেখির ঝড়ের মতো নতুনের নিশান বা কেতন উড়তে শুরু করেছে । পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে অনাগত প্রলয়-নেশায় মত্ত পাগল রূপী কালভয়ংকর শক্তি ধেয়ে আসছে । সেই শক্তি সিন্ধুপারের সিংহদ্বার অর্থাৎ আন্দামানের সেলুলার জেলের মতো ব্রিটিশদের তৈরি করা অন্ধকূপের আগল ভেঙে ফেলছে ।

মহাকালের চণ্ড-রূপে এবং বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে আসা এই শক্তির হাতে রয়েছে রক্তের কৃপাণ বা তরবারি । এই ভয়ংকর প্রলয় বা ধ্বংস দেখে কবি দেশবাসীকে ভয় পেতে নিষেধ করেছেন, কারণ এই প্রলয় আসলে নতুন সৃষ্টির বেদনা । অসুন্দর বা জীর্ণ পুরাতনকে ছেদন বা ধ্বংস করতেই এই নবীনের আগমন ঘটেছে । ধ্বংস বা ভাঙা-গড়ার এই খেলায় চিরসুন্দর নতুন রূপ গড়ে ওঠে, তাই কাল-ভয়ংকরের বেশে আসলে সুন্দরেরই আগমন ঘটে ।

 

প্রলয়োল্লাস কবিতার নামকরণের তাৎপর্য 

 

সাহিত্যে নামকরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘প্রলয়োল্লাস’ শব্দটি ‘প্রলয়’ এবং ‘উল্লাস’— এই দুটি শব্দের মিলনে তৈরি। প্রলয় শব্দের অর্থ হলো চরম ধ্বংস বা বিনাশ, আর উল্লাস মানে গভীর আনন্দ। পরাধীন ভারতবর্ষের বুকে ব্রিটিশ শক্তির নির্মম অত্যাচার ও শোষণকে ধ্বংস করার জন্য যুবশক্তির যে রুদ্ররোষ, তাকেই কবি ‘প্রলয়’ হিসেবে দেখেছেন ।

কিন্তু এই ধ্বংস কোনো নেতিবাচক পরিণতি নয়; বরং এই প্রলয় হলো জরাজীর্ণ, অ-সুন্দর এবং মুমূর্ষুদের বিনাশ ঘটিয়ে নতুন প্রাণ ও নতুন সমাজ সৃষ্টির পূর্বশর্ত । তাই ধ্বংসের এই আগমনকে ভয় না পেয়ে, নবসৃষ্টির আনন্দে উল্লাস প্রকাশ করার জন্য কবি দেশবাসীকে এবং বধূদের প্রদীপ তুলে ধরে জয়ধ্বনি করতে বলেছেন । ধ্বংসের বুকে সৃষ্টির এই আনন্দবার্তাই কবিতার মূল বিষয়বস্তু হওয়ায় “প্রলয়োল্লাস” নামকরণটি সর্বতোভাবে সার্থক ও ব্যঞ্জনাধর্মী হয়েছে।

প্রলয়োল্লাস কবিতা – কাজী নজরুল ইসলাম

(সহজ বাংলা অর্থ) লাইন ধরে

 

শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতার মূল বিষয়বস্তু বা অর্থ লাইন ধরে ধরে স্তবক অনুযায়ী সহজ ভাষায় নিচে আলোচনা করা হলো:

 

প্রথম স্তবক

 

তোরা সব জয়ধ্বনি কর! তোরা সব জয়ধ্বনি কর! ওই নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়। তোরা সব জয়ধ্বনি কর! তোরা সব জয়ধ্বনি কর! আসছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল, সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল! মৃত্যু-গহন অন্ধকূপে মহাকালের চণ্ড-রূপে ধূম্র-ধূপে বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ংকর!

 

কবি দেশের তরুণ সমাজকে আনন্দে মেতে উঠতে ও জয়ধ্বনি করতে বলছেন। কারণ, কালবৈশাখী ঝড়ের মতো প্রবল শক্তিতে নতুনের পতাকা উড়ছে। সমুদ্রপারের বন্দিশালার (ব্রিটিশদের কারাগার) সমস্ত বাধা ও তালা ভেঙে এক অদম্য শক্তি ধেয়ে আসছে। সে মৃত্যু ও অন্ধকারের বুক চিরে মহাকালের রুদ্র মূর্তিতে, বজ্রের মতো মশাল জ্বেলে এক ভয়ংকর বেশে আবির্ভূত হচ্ছে।

 

দ্বিতীয় স্তবক

ওরে ওই হাসছে ভয়ংকর! তোরা সব জয়ধ্বনি কর! তোরা সব জয়ধ্বনি কর! ঝামর তাহার কেশের দোলায় ঝাপটা মেরে গগন দুলায়, সর্বনাশী জ্বালামুখী ধূমকেতু তার চামর চুলায়! বিশ্বপাতার বক্ষ-কোলে রক্ত তাহার কৃপাণ ঝোলে দোদুল দোলে! অট্টরোলের হট্টগোলে স্তব্ধ চরাচর –

 

সেই রুদ্র বা ধ্বংসের দেবতা অট্টহাসি হাসছে। তার এলোমেলো চুলের ঝাপটায় আকাশ কেঁপে উঠছে। ধূমকেতুর মতো তার রূপ, আর তার বুকেই ঝুলছে রক্তমাখা তরবারি। তার এই প্রবল গর্জনে এবং কোলাহলে গোটা পৃথিবী ভয়ে স্তব্ধ হয়ে আছে। তবুও কবি সবাইকে ভয় না পেয়ে তার আগমনকে স্বাগত জানাতে বলছেন।

 

তৃতীয় স্তবক

ওরে ওই স্তব্ধ চরাচর! তোরা সব জয়ধ্বনি কর! তোরা সব জয়ধ্বনি কর!! দ্বাদশ রবির বহ্নিজ্বালা ভয়াল তাহার নয়নকটায়, দিগন্তরের কাঁদন লুটায় পিঙ্গল তার ত্রস্ত জটায়! বিন্দু তাহার নয়নজলে সপ্ত মহাসিন্ধু দোলে কপোলতলে! বিশ্বমায়ের আসন তারই বিপুল বাহুর পর- হাঁকে ওই ‘জয় প্রলয়ঙ্কর!’

 

তার চোখের দৃষ্টিতে যেন বারোটি সূর্যের সমান আগুন জ্বলছে। তার জটায় দিগন্তের কান্না লুকিয়ে আছে এবং তার চোখের জলেই যেন পৃথিবীর সাতটি মহাসাগর দুলছে। তার এই বিশাল বাহুতেই যেন বিশ্বমায়ের বা জন্মভূমির আসন পাতা রয়েছে।

 

চতুর্থ স্তবক

তোরা সব – জয়ধ্বনি কর! তোরা সব – জয়ধ্বনি কর !! মাভৈঃ মাভৈঃ! জগৎ জুড়ে প্রলয় এবার ঘনিয়ে আ জরায়-মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ-লুকানো ওই বিনাশে! এবার মহানিশার শেষে আসবে ঊষা অরুণ হেসে করুণ বেশে! দিগম্বরের জটায় হাসে শিশু-চাঁদের কর – আলো তার – ভরবে এবার ঘর!

 

সেই ভয়ংকর শক্তি ‘মাভৈঃ’ বা ‘ভয় পেয়ো না’ বলে অভয় বাণী দিচ্ছে। সে আসছে সমাজের জরাজীর্ণ, মুমূর্ষু এবং পুরোনো নিয়মগুলোকে ধ্বংস করতে। দীর্ঘ অন্ধকার রাতের শেষে যেমন ভোরের সূর্য হাসে, তেমনি এই প্রলয়ের শেষেই দিগম্বরের (শিবের) জটায় থাকা নতুন চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় দেশের অন্ধকার ঘর আলোতে ভরে উঠবে।

 

পঞ্চম স্তবক

তোরা সব – জয়ধ্বনি কর! তোরা সব – জয়ধ্বনি কর !! ওই সে মহাকাল-সারথি রক্ত-তড়িৎ চাবুক হানে, রণিয়ে ওঠে হ্রেষার কাঁদন বজ্রগানে ঝড়-তুফানে! ক্ষুরের দাপট তারায় লেগে উল্কা ছুটায় নীল খিলানে! গগনতলের নীল খিলানে! অন্ধ কারার বন্ধ কূপে দেবতা বাঁধা যজ্ঞ-যুপে পাষাণ-স্তূপে! এই তো রে তার আসার সময় ওই রথঘর্ঘর শোনা যায় – ওই রথঘর্ঘর!

 

মহাকাল যেন বিদ্যুতের চাবুক মেরে তার রথ ছুটিয়ে আনছে। তার ঘোড়ার পায়ের দাপটে আকাশ থেকে তারা বা উল্কা খসে পড়ছে। অন্ধকার কারাগারে পাথরের স্তূপে যেসব দেবতারা (পরাধীন দেশের বন্দি স্বাধীনতা সংগ্রামীরা) শিকলে বাঁধা হয়ে আছেন, তাদের শৃঙ্খল মুক্ত করতেই তার এই রথের চাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে।

 

ষষ্ঠ স্তবক

তোরা সব – জয়ধ্বনি কর! তোরা সব – জয়ধ্বনি কর!! ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন! আসছে নবীন – জীবনহারা অ-সুন্দরে করতে ছেদন! তাই সে এমন কেশে বেশে প্রলয় বয়েও আসছে হেসে- মধুর হেসে। ভেঙে আবার – গড়তে জানে সে চিরসুন্দর!

 

কবি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলছেন, এই ধ্বংসলীলা দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। প্রলয় বা ধ্বংস মানেই হলো নতুন সৃষ্টির প্রসব-যন্ত্রণা। সে পুরোনো ও অসুন্দরকে শেষ করে নতুন জীবন দিতে আসছে। সে যেমন পুরোনোকে ভাঙতে পারে, তেমনি নতুন করে চিরসুন্দর কিছু গড়তেও জানে।

 

সপ্তম স্তবক

তোরা সব – জয়ধ্বনি কর! তোরা সব – জয়ধ্বনি কর !! ওই – ভাঙা-গড়া খেলা যে তার কিসের তবে ডর? তোরা সব জয়ধ্বনি কর! বধূরা প্রদীপ তুলে ধর। কাল-ভয়ংকরের বেশে এবার ওই আসে সুন্দর! – তোরা সব – জয়ধ্বনি কর! তোরা সব – জয়ধ্বনি কর !!

 

 

এই ভাঙা এবং গড়া তার কাছে কেবলই খেলা মাত্র, তাই এতে ডর বা ভয়ের কোনো কারণ নেই। কবি দেশের নারীদের বা বধূদের আহ্বান জানিয়েছেন হাতে প্রদীপ তুলে ধরে এই নতুনকে বরণ করে নিতে। কারণ, কাল-ভয়ংকরের এই রুদ্র মূর্তির আড়ালেই এক অপরূপ ‘সুন্দর’ লুকিয়ে আছে, যে আমাদের জন্য স্বাধীনতা ও নতুন ভোরের আলো নিয়ে আসছে।

দশম শ্রেণী বাংলা

প্রলয়োল্লাস কবিতা

বহু বিকল্প ভিত্তিক প্রশ্ন উত্তর  

 

১. ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটির রচয়িতা কে?
ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খ) কাজী নজরুল ইসলাম
গ) সুকুমার রায়
ঘ) জীবনানন্দ দাশ
উত্তর: খ) কাজী নজরুল ইসলাম

২. কালবোশেখির ঝড় কী ওড়াচ্ছে?
ক) পুরোনো কেতন
খ) নূতনের কেতন
গ) মৃত্যুর কেতন
ঘ) বিজয়ের কেতন
উত্তর: খ) নূতনের কেতন

৩. প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল কোথা দিয়ে আগল ভাঙল?
ক) অন্ধকূপ দিয়ে
খ) যজ্ঞ-যূপ দিয়ে
গ) মহাকাশ দিয়ে
ঘ) সিন্ধুপারের সিংহদ্বার দিয়ে
উত্তর: ঘ) সিন্ধুপারের সিংহদ্বার দিয়ে

৪. ভয়ংকর কিসের মশাল জ্বেলে আসছে?
ক) অগ্নির মশাল
খ) বজ্রশিখার মশাল
গ) বিদ্যুতের মশাল
ঘ) ধূম্র-ধূপের মশাল
উত্তর: খ) বজ্রশিখার মশাল

৫. বিশ্বপাতার বক্ষ-কোলে কী দোদুল দোলে?
ক) চামর
খ) মশাল
গ) রক্ত কৃপাণ
ঘ) কেতন
উত্তর: গ) রক্ত কৃপাণ

৬. কার নয়নজলে সপ্ত মহাসিন্ধু দোলে?
ক) বিশ্বমায়ের
খ) ভয়ংকরের
গ) দেবতার
ঘ) মহাকালের
উত্তর: খ) ভয়ংকরের

৭. দিগম্বরের জটায় কে হাসে?
ক) অরুণ
খ) শিশু-চাঁদ
গ) ঊষা
ঘ) রবি
উত্তর: খ) শিশু-চাঁদ

৮. মহাকাল-সারথি কীসের চাবুক হানে?
ক) বিদ্যুতের
খ) বজ্রের
গ) রক্ত-তড়িৎ
ঘ) মেঘের
উত্তর: গ) রক্ত-তড়িৎ

৯. দেবতা কোথায় বাঁধা আছেন?
ক) সিংহদ্বারে
খ) যজ্ঞ-যূপে
গ) অন্ধকূপে
ঘ) মহাকাশে
উত্তর: খ) যজ্ঞ-যূপে

১০. কবিতায় প্রলয়কে কিসের বেদন বলা হয়েছে?
ক) ধ্বংসের বেদন
খ) মৃত্যুর বেদন
গ) নূতন সৃজন-বেদন
ঘ) জরা-মরণের বেদন
উত্তর: গ) নূতন সৃজন-বেদন

১১. কবি কাদের প্রদীপ তুলে ধরতে বলেছেন?
ক) যুবকদের
খ) শিশুদের
গ) দেবতাদের
ঘ) বধূদের
উত্তর: ঘ) বধূদের

১২. কাল-ভয়ংকরের বেশে এবার কে আসছে?
ক) অসুন্দর
খ) সুন্দর
গ) যম
ঘ) রাক্ষস
উত্তর: খ) সুন্দর

১৩. কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম প্রকাশিত কবিতা কোনটি?
ক) বিদ্রোহী
খ) প্রলয়োল্লাস
গ) মুক্তি
ঘ) অগ্নিবীণা
উত্তর: গ) মুক্তি

১৪. ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে কোন পত্রিকায় ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়?
ক) ধূমকেতু
খ) বিজলী
গ) লাঙ্গল
ঘ) কল্লোল
উত্তর: খ) বিজলী

১৫. নিচের কোনটি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা কাব্যগ্রন্থ নয়?
ক) অগ্নিবীণা
খ) বিষের বাঁশি
গ) সোনার তরী
ঘ) চক্রবাক
উত্তর: গ) সোনার তরী

১৬. ‘অট্টরোলের হট্টগোলে’ কী স্তব্ধ হয়ে আছে?
ক) মহাসিন্ধু
খ) গগন
গ) চরাচর
ঘ) দিকচক্রবাল
উত্তর: গ) চরাচর

১৭. সর্বনাশী জ্বালামুখী ধূমকেতু তার কী চুলায় (দোলায়)?
ক) কৃপাণ
খ) মশাল
গ) চামর
ঘ) জটা
উত্তর: গ) চামর

১৮. কে জীবনহারা অ-সুন্দরে ছেদন করতে আসছে?
ক) মহাকাল
খ) প্রলয়
গ) ধূমকেতু
ঘ) নবীন
উত্তর: ঘ) নবীন

১৯. কবিতায় ‘ভাঙা-গড়া খেলা যে তার কিসের তবে ডর?’- এখানে ‘ডর’ শব্দের অর্থ কী?
ক) আনন্দ
খ) ভয়
গ) দুঃখ
ঘ) আশা
উত্তর: খ) ভয়

২০. এবার মহানিশার শেষে কে আসবে?
ক) প্রলয়
খ) ঊষা অরুণ হেসে
গ) কালবোশেখি
ঘ) শিশু-চাঁদ
উত্তর: খ) ঊষা অরুণ হেসে

২১. ‘সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে ধমক হেনে ভাঙল…’ শূন্যস্থানে কী বসবে?
(ক) পাথর
(খ) আগল
(গ) শিকল
(ঘ) কপাট
উত্তর: (খ) আগল ।

২২. ‘অট্টরোলের হট্টগোলে’ কী স্তব্ধ?
(ক) আকাশ
(খ) পাতাল
(গ) চরাচর
(ঘ) বাতাস
উত্তর: (গ) চরাচর ।

২৩. ‘দ্বাদশ রবির বহ্নিজ্বালা’ কোথায় দেখা যায়?
(ক) নয়নকটায়
(খ) ললাটে
(গ) জটায়
(ঘ) কৃপাণে
উত্তর: (ক) নয়নকটায় ।

২৪. ক্ষুরের দাপট তারায় লেগে নীল খিলানে কী ছোটায়?
(ক) বিদ্যুৎ
(খ) উল্কা
(গ) ধূমকেতু
(ঘ) অশনি
উত্তর: (খ) উল্কা ।

২৫. কীসের গানে হ্রেষার কাঁদন রণিয়ে ওঠে?
(ক) বজ্রগানে
(খ) মেঘের গানে
(গ) বৃষ্টির গানে
(ঘ) ঝড়ের গানে
উত্তর: (ক) বজ্রগানে ।

২৬. কীসের শব্দ শোনা যায় বলে কবি জানিয়েছেন?
(ক) রণভেরী
(খ) রথঘর্ঘর
(গ) শঙ্খধ্বনি
(ঘ) অশ্বক্ষুর
উত্তর: (খ) রথঘর্ঘর ।

২৭. প্রলয় বয়েও সে কীভাবে আসছে?
(ক) রুদ্র বেশে
(খ) করুণ বেশে
(গ) মধুর হেসে
(ঘ) অট্টহাসিতে
উত্তর: (গ) মধুর হেসে ।

২৮. কবি কাদের প্রদীপ তুলে ধরতে বলেছেন?
(ক) মায়েদের
(খ) বোনেদের
(গ) বধূদের
(ঘ) কন্যাদের
উত্তর: (গ) বধূদের ।

২৯. ‘কাল-ভয়ংকরের বেশে এবার ওই আসে…’ শূন্যস্থানে কী বসবে?
(ক) নবীন
(খ) প্রলয়
(গ) সুন্দর
(ঘ) মহাকাল
উত্তর: (গ) সুন্দর ।

৩০. কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি কোন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়?
(ক) বিজলী
(খ) যুগান্তর
(গ) ধূমকেতু
(ঘ) লাঙল
উত্তর: (ক) বিজলী ।

দশম শ্রেণী বাংলা

প্রলয়োল্লাস কবিতা

অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর 

 

১. ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটির রচয়িতা কে?
উত্তর: ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটির রচয়িতা হলেন কাজী নজরুল ইসলাম ।

২. নূতনের কেতন কীভাবে ওড়ে?
উত্তর: নূতনের কেতন কালবোশেখির ঝড়ের মতো ওড়ে

৩. কবি বারবার দেশবাসীকে কী করতে বলেছেন?
উত্তর: কবি বারবার দেশবাসীকে আগত নতুনের উদ্দেশ্যে “জয়ধ্বনি” করতে বলেছেন ।

৪. “সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে…” — সেখানে কী ঘটেছে?
উত্তর: প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে ধমক হেনে আগল বা তালা ভেঙে ফেলেছে ।

৫. ভয়ংকর কীভাবে আসছে?
উত্তর: ভয়ংকর মহাকালের চণ্ড-রূপে, ধূম্র-ধূপে এবং বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে আসছে ।

৬. ধ্বংস দেখে কবি ভয় পেতে নিষেধ করেছেন কেন?
উত্তর: ধ্বংস দেখে ভয় পেতে নিষেধ করেছেন কারণ, এই প্রলয় হলো নূতন সৃজন-বেদন অর্থাৎ নতুন সৃষ্টির পূর্বাভাস ।

৭. নবীন কী করতে আসছে?
উত্তর: নবীন আসছে জীবনহারা অ-সুন্দরকে ছেদন বা বিনাশ করতে ।

৮. “ভাঙা-গড়া খেলা যে তার…” — সে কী গড়তে জানে?
উত্তর: সে ভেঙে আবার চিরসুন্দরকে গড়তে জানে ।

৯. কাল-ভয়ংকরের বেশে কে আসছে?
উত্তর: কাল-ভয়ংকরের বেশে এবার সুন্দর আসছে ।

১০. বধূদের কবি কী তুলে ধরতে বলেছেন?
উত্তর: আগত সুন্দরকে বরণ করে নেওয়ার জন্য কবি বধূদের প্রদীপ তুলে ধরতে বলেছেন ।

১১. নূতনের কেতন হিসেবে কী উড়ছে?
উত্তর: নূতনের কেতন হিসেবে কালবোশেখির ঝড় উড়ছে ।

১২. ভয়ংকর কী জ্বেলে আসছে?
উত্তর: ভয়ংকর মহাকালের চণ্ড-রূপে বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে আসছে ।

১৩. ‘সর্বনাশী জ্বালামুখী ধূমকেতু’ কী করে?
উত্তর: সর্বনাশী জ্বালামুখী ধূমকেতু তার চামর চুলায় বা দোলায় ।

১৪. বিশ্বপাতার বক্ষ-কোলে কী ঝুলছে?
উত্তর: বিশ্বপাতার বক্ষ-কোলে রক্ত-কৃপাণ ঝুলছে ।

১৫. চরাচর কেন স্তব্ধ হয়ে আছে?
উত্তর: অট্টরোলের হট্টগোলের কারণে চরাচর স্তব্ধ হয়ে আছে ।

১৬. ‘ভয়াল তাহার নয়নকটায়’ কীসের জ্বালা?
উত্তর: ভয়াল নয়নকটায় দ্বাদশ রবির বহ্নিজ্বালা রয়েছে ।

১৭. ‘দিগন্তরের কাঁদন’ কোথায় লুটায়?
উত্তর: দিগন্তরের কাঁদন পিঙ্গল ত্রস্ত জটায় লুটায় ।

১৮. সপ্ত মহাসিন্ধু কোথায় দোলে?
উত্তর: বিন্দু নয়নজলে সপ্ত মহাসিন্ধু কপোলতলে দোলে ।

১৯. বিশ্বমায়ের আসন কোথায় পাতা?
উত্তর: বিশ্বমায়ের আসন বিপুল বাহুর পর পাতা রয়েছে ।

২০. মুমূর্ষুদের প্রাণ কোথায় লুকানো আছে?
উত্তর: জরায়-মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ ওই বিনাশে লুকানো আছে ।

২১. মহানিশার শেষে কে আসবে?
উত্তর: মহানিশার শেষে অরুণ হেসে ঊষা করুণ বেশে আসবে ।

২২. ‘শিশু-চাঁদের কর’ কোথায় হাসে?
উত্তর: শিশু-চাঁদের কর দিগম্বরের জটায় হাসে ।

২৩. মহাকাল-সারথি কী হানে?
উত্তর: মহাকাল-সারথি রক্ত-তড়িৎ চাবুক হানে ।

২৪. দেবতা কোথায় বাঁধা আছেন?
উত্তর: দেবতা অন্ধ কারার বন্ধ কূপে এবং যজ্ঞ-যূপে পাষাণ-স্তূপে বাঁধা আছেন ।

২৫. কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম কবিতা কোনটি এবং কবে প্রকাশিত হয়?
উত্তর: কবির প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’, যা ১৩২৬ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয় ।

 বাংলা প্রলয়োল্লাস কবিতা

৩ নম্বর প্রশ্ন উত্তর  

 

১. “তোরা সব জয়ধ্বনি কর!” – কবি কাদের এবং কেন এই জয়ধ্বনি করতে বলেছেন?

উত্তর: কবি কাজী নজরুল ইসলাম পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকামী তরুণ সমাজ ও সাধারণ দেশবাসীকে জয়ধ্বনি করতে বলেছেন। কারণ, জরাজীর্ণ ও পরাধীন সমাজব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে নতুনের আগমন ঘটছে। কালবৈশাখী ঝড়ের মতো প্রবল শক্তিতে যে প্রলয় বা ধ্বংস আসছে, তা আসলে পুরোনো, মুমূর্ষু নিয়মগুলোকে ধ্বংস করে এক নতুন ও স্বাধীন ভোরের সূচনা করবে। তাই এই অনাগত নতুন ভবিষ্যৎকে স্বাগত জানাতেই কবি দেশবাসীকে জয়ধ্বনি করতে বলেছেন।

 

২. “আসছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল” – ‘প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল’ বলতে কবি কাকে বুঝিয়েছেন এবং সে কীভাবে আসছে?

উত্তর: ‘প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল’ বলতে কবি মূলত ধ্বংসের দেবতা মহাকাল বা নটরাজ শিবকে বুঝিয়েছেন, যা কবিতায় দেশের তরুণ অদম্য শক্তির প্রতীক। সে মৃত্যু ও অন্ধকারের গভীর কূপ থেকে মহাকালের রুদ্ররূপে আবির্ভূত হচ্ছে। সমুদ্রপারের বন্দিশালার (ব্রিটিশদের কারাগার) সিংহদ্বারে প্রবল আঘাত হেনে, আগল ভেঙে এবং হাতে বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে সে অত্যন্ত ভয়ংকর বেশে ধেয়ে আসছে।

 

৩. “প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন!” – এই উক্তিটির মধ্য দিয়ে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?

উত্তর: এই উক্তিটির মধ্য দিয়ে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, প্রলয় বা ধ্বংস মানেই কেবল বিনাশ বা শেষ নয়, এর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নতুন সৃষ্টির বীজ। নতুন প্রাণ জন্ম দেওয়ার সময় যেমন এক তীব্র প্রসব-যন্ত্রণা থাকে, তেমনি জরাজীর্ণ ও পরাধীন সমাজকে ভেঙে নতুন এক স্বাধীন ও সুন্দর সমাজ গড়তেও এই ধ্বংসাত্মক যন্ত্রণার প্রয়োজন হয়। প্রলয় হলো সেই নতুন পৃথিবী সৃষ্টির অপরিহার্য যন্ত্রণা।

 

৪. “দিগম্বরের জটায় হাসে শিশু-চাঁদের কর” – পঙ্‌ক্তিটির অন্তর্নিহিত অর্থ স্পষ্ট করো।

উত্তর: ‘দিগম্বর’ বলতে এখানে প্রলয়ংকর শিব বা মহাকালকে বোঝানো হয়েছে এবং ‘শিশু-চাঁদ’ হলো সদ্য ওঠা নতুন চাঁদের আলো, যা স্নিগ্ধতা ও নতুন আশার প্রতীক। ধ্বংসের দেবতার রুদ্রমূর্তির ভয়াল জটার আড়ালেই যে এক স্নিগ্ধ, সুন্দর ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে, কবি তা বোঝাতেই এই পঙ্‌ক্তিটি ব্যবহার করেছেন। ভয়ংকর তাণ্ডব ও ধ্বংসের মাঝেও যে সৃষ্টির নতুন আলো উঁকি দিচ্ছে, এটি তারই উজ্জ্বল ইঙ্গিত।

 

৫. “ভাঙা-গড়া খেলা যে তার কিসের তবে ডর?” – কে এই ভাঙা-গড়ার খেলা খেলছে? এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই কেন?

উত্তর: এখানে কাল-ভয়ংকর বা মহাকালের রূপ ধরে আসা নবীন বা তরুণ বিপ্লবী শক্তির ভাঙা-গড়ার কথা বলা হয়েছে। এই ধ্বংসলীলা দেখে সাধারণ মানুষের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই বলে কবি মনে করেন। কারণ, যে শক্তি পুরোনো, জরাজীর্ণ ও অসুন্দরকে নির্মমভাবে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে, সেই শক্তিই আবার নতুন করে সব কিছু সুন্দরভাবে গড়ে তুলতেও জানে। এই ধ্বংসের চূড়ান্ত উদ্দেশ্যই হলো নতুন ও চিরসুন্দর এক জগৎ তৈরি করা।

মাধ্যমিক বাংলা

প্রলয়োল্লাস কবিতা

বড়ো প্রশ্ন ও উত্তর  

 

১. “মাভৈঃ মাভৈঃ! জগৎ জুড়ে প্রলয় এবার ঘনিয়ে আসে”- প্রলয় কীভাবে ঘনিয়ে এসেছিল তা নিজের ভাষায় লেখো। (৫ নম্বর)

উত্তর: কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় কবি পরাধীন ভারতবর্ষের বুকে যে আসন্ন বিপ্লব বা পরিবর্তনের আভাস পেয়েছিলেন, তাকেই ‘প্রলয়’ রূপে কল্পনা করেছেন। এই প্রলয় কোনো সাধারণ ধ্বংসলীলা নয়, এটি নতুনের আবাহন।

কবিতায় বর্ণিত প্রলয় ঘনিয়ে আসার রূপটি ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর ও রুদ্র। কালবোশেখির ঝড়ের মতো তা প্রবল বেগে ধেয়ে আসে। এই প্রলয় হলো ‘প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল’-এর রূপ, যা সিন্ধুপারের সিংহদ্বারে ধাক্কা মেরে সমস্ত আগল বা বাধা ভেঙে চুরমার করে দেয়। মহাকালের চণ্ডরূপে বা রুদ্রমূর্তিতে এই প্রলয় আবির্ভূত হয়। তার হাতে থাকে বজ্রশিখার মশাল, যা অন্ধকারের বুক চিরে আলো জ্বালায়। মহাকাল-সারথি রক্ত-তড়িৎ বা বিদ্যুতের চাবুক হাঁকিয়ে তার রথ ছুটিয়ে নিয়ে আসে, যার ফলে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।

তার এই ভয়ংকর আগমনে চরাচর স্তব্ধ হয়ে যায়। সর্বনাশী ধূমকেতু যেন তার চামর দোলায় এবং তার নয়নের আগুনে দ্বাদশ রবির তেজ জ্বলে ওঠে। এভাবেই এক ভয়াল, রুদ্র ও প্রলয়ংকরী রূপ ধারণ করে জরাজীর্ণ সমাজকে ধ্বংস করতে প্রলয় ঘনিয়ে এসেছিল।

 

২. ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতা অবলম্বনে কবির বিদ্রোহী মানসিকতার পরিচয় দাও। (৫ নম্বর)

উত্তর: ‘বিদ্রোহী কবি’ কাজী নজরুল ইসলাম আজীবন অন্যায়, অবিচার, পরাধীনতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন । ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাতেও তাঁর এই আপসহীন বিদ্রোহী মানসিকতার এক উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটেছে।

প্রথমত, কবি প্রচলিত জরাজীর্ণ ও পরাধীন সমাজব্যবস্থার সম্পূর্ণ উচ্ছেদ চেয়েছেন। তিনি মনে করেন, সমাজকে কলুষমুক্ত করতে গেলে জরায়-মরা মুমূর্ষু বা প্রাণহীন নিয়মকানুনগুলোর বিনাশ একান্ত প্রয়োজন। তাই তিনি কালবোশেখির ঝড় এবং ধ্বংসের দেবতা মহাকালকে সাদরে আহ্বান জানিয়েছেন।

দ্বিতীয়ত, বিপ্লবের এই ভয়ংকর রূপ দেখে সাধারণ মানুষ ভয় পেলেও কবি কিন্তু উচ্ছ্বসিত। তিনি দেশের তরুণ সমাজকে ‘জয়ধ্বনি’ করার নির্দেশ দিয়েছেন, কারণ এই ধ্বংসের আড়ালেই লুকিয়ে আছে নতুন সৃষ্টির বীজ।

তৃতীয়ত, “অন্ধ কারার বন্ধ কূপে / দেবতা বাঁধা যজ্ঞ-যুপে”- এই পংক্তির মধ্য দিয়ে কবি ব্রিটিশ সরকারের জেলে বন্দি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কথা বুঝিয়েছেন। এই পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার জন্য যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম প্রয়োজন, কবি তাকেই সমর্থন করেছেন। জরাজীর্ণকে ভেঙে নতুন কিছু গড়ার এই অদম্য আকাঙ্ক্ষাই কবিতায় কবির বিদ্রোহী মানসিকতাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে।

 

৩. ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় কবির আশাবাদ কীভাবে ফুটে উঠেছে তা আলোচনা করো। (৫ নম্বর)

উত্তর: ‘প্রলয়োল্লাস’ একটি ধ্বংস ও তাণ্ডবের কবিতা মনে হলেও এর মূল সুর কিন্তু ধ্বংস নয়, বরং এক সুগভীর আশাবাদ। কবি কাজী নজরুল ইসলাম ধ্বংসের মধ্যেই নতুনের সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছেন।

কবি বিশ্বাস করেন যে, প্রলয় কেবল ধ্বংস করে না, তা জঞ্জাল সরিয়ে নতুনের পথ প্রশস্ত করে। তাই তিনি বলেছেন, “প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন”। অর্থাৎ, নতুন কিছু সৃষ্টির যে প্রসব-যন্ত্রণা, প্রলয় হলো তারই প্রতীক। সমাজের বুকে জমে থাকা জরা-ব্যাধি ও অ-সুন্দরকে বিনাশ করতেই এই প্রলয়ের আগমন ঘটে।

কবির সবচেয়ে বড় আশাবাদ ধরা পড়ে যখন তিনি বলেন, “এবার মহানিশার শেষে / আসবে ঊষা অরুণ হেসে / করুণ বেশে!”। দীর্ঘ পরাধীনতার অন্ধকার রাত শেষে স্বাধীনতার নতুন সূর্য উঠবে, এই বিশ্বাস কবির মনে দৃঢ়। তিনি জানেন যে, যিনি ভাঙতে পারেন, তিনি আবার নতুন করে গড়তেও জানেন। তাই কাল-ভয়ংকরের বেশে আসলে ‘সুন্দর’-এরই আগমন ঘটছে। দেশের তরুণ সমাজ ও সাধারণ মানুষকে ধ্বংস দেখে ভয় না পেয়ে, নতুনকে বরণ করে নেওয়ার জন্য প্রদীপ তুলে ধরতে বলে কবি তাঁর অটুট আশাবাদেরই জয়গান গেয়েছেন।

নিশ্চয়ই, আপনার স্টাডি মেটেরিয়ালের সংগ্রহকে আরও সমৃদ্ধ করতে ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতা থেকে আরও ৩টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৫ নম্বর মানের প্রশ্ন ও তার বিস্তারিত উত্তর নিচে প্রস্তুত করে দিলাম। এই প্রশ্নগুলো মাধ্যমিক স্তরের পরীক্ষার জন্য খুবই উপযোগী:

 

৪. “তোরা সব জয়ধ্বনি কর!” – কবি কাদের উদ্দেশ্যে এই আহ্বান জানিয়েছেন? কবির এই আহ্বানের যৌক্তিকতা বুঝিয়ে দাও। (১+৪ = ৫)

উত্তর: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় পরাধীন ভারতবর্ষের মুক্তিকামী তরুণ সমাজ এবং আপামর সাধারণ দেশবাসীর উদ্দেশ্যে এই জয়ধ্বনি করার আহ্বান জানিয়েছেন।

আহ্বানের যৌক্তিকতা: পরাধীন ভারতবর্ষের বুকে তখন ব্রিটিশ শাসনের চরম অত্যাচার এবং সমাজে নানাবিধ কুসংস্কার ও জরাজীর্ণতা বাসা বেঁধেছিল। কবি বুঝতে পেরেছিলেন, এই পচা-গলা সমাজব্যবস্থাকে সমূলে উৎপাটন না করলে নতুন যুগের সূচনা সম্ভব নয়। তাই তিনি কালবৈশাখী ঝড় এবং প্রলয়ংকর মহাকালের আগমন কল্পনা করেছেন।

মহাকাল বা ধ্বংসের দেবতা যখন তার রুদ্রমূর্তিতে বজ্রের মশাল জ্বেলে আসে, তখন সাধারণ মানুষ ভয় পায়। কিন্তু কবি জানেন, এই প্রলয় কেবল ধ্বংস করার জন্য আসেনি, সে এসেছে জরাজীর্ণ, মুমূর্ষু এবং অসুন্দরকে বিনাশ করতে। এই ধ্বংসের আড়ালেই লুকিয়ে আছে নতুন সৃষ্টির বীজ। পরাধীনতার অন্ধকার রাত শেষে যে স্বাধীনতার নতুন সূর্য উঠবে, তার পথ প্রস্তুত করতেই এই ধ্বংসলীলা। যেহেতু এই প্রলয় আসলে আমাদের জীবনে এক চিরসুন্দর ও স্বাধীন ভবিষ্যৎ নিয়ে আসছে, তাই তাকে ভয় না পেয়ে সাড়ম্বরে বরণ করে নেওয়া উচিত। এই অনাগত নতুনকে স্বাগত জানাতেই কবি দেশবাসীকে বারবার জয়ধ্বনি করার যৌক্তিক আহ্বান জানিয়েছেন।

 

৫. “কাল-ভয়ংকরের বেশে এবার ওই আসে সুন্দর!” – ‘কাল-ভয়ংকর’ কে? তার ভয়ংকর রূপের আড়ালে কীভাবে ‘সুন্দর’ লুকিয়ে আছে, তা কবিতা অবলম্বনে আলোচনা করো। (১+৪ = ৫)

উত্তর: ‘কাল-ভয়ংকর’ বলতে কবি প্রলয়ংকর নটরাজ শিব বা মহাকালকে বুঝিয়েছেন, যা এই কবিতায় মূলত দেশের অদম্য, নবীন বিপ্লবী শক্তির রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

ভয়ংকরের আড়ালে সুন্দরের অবস্থান: ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় কবি ধ্বংস এবং সৃষ্টিকে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ হিসেবে দেখিয়েছেন। মহাকাল যখন কালবৈশাখীর মতো ধেয়ে আসে, তখন তার রূপ অত্যন্ত ভয়ংকর। তার হাতে থাকে রক্তমাখা কৃপাণ, চোখের দৃষ্টিতে থাকে বারোটি সূর্যের সমান আগুন, আর তার পদভারে চরাচর স্তব্ধ হয়ে যায়। এই ভয়াল রূপ দেখে যে কারও মনে ত্রাসের সঞ্চার হওয়া স্বাভাবিক।

কিন্তু কবির দূরদৃষ্টিতে ধরা পড়েছে এক অন্য সত্য। তিনি দেখেছেন, এই ধ্বংস কোনো অন্ধ বিনাশ নয়; এটি হলো জরা, জঞ্জাল এবং পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এক পবিত্র প্রক্রিয়া। যাকে কবি “নূতন সৃজন-বেদন” বলেছেন। সমাজ থেকে ‘জীবনহারা অ-সুন্দর’-কে ছেদন করতেই মহাকালের এই রুদ্ররোষ। পুরোনোকে ভেঙে ফেলার এই তাণ্ডবের শেষেই দিগম্বরের জটায় নতুন চাঁদের স্নিগ্ধ আলো বা ‘সুন্দর’ উঁকি দেয়। মহানিশার অন্ধকার শেষে যেমন ভোরের আলো ফুটে ওঠে, তেমনি এই ভয়ংকর ধ্বংসলীলার পরেই সমাজে সাম্য, স্বাধীনতা ও চিরসুন্দরের প্রতিষ্ঠা হবে। এভাবেই ভয়ংকরের বেশে আসলে সুন্দরেরই আগমন ঘটে।

 

৬. ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় একদিকে ধ্বংসের চিত্র, অন্যদিকে নতুন সৃষ্টির উন্মাদনা কীভাবে ফুটে উঠেছে, তা বিশ্লেষণ করো। (৫)

উত্তর: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটি মূলত পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচন করে এক নতুন স্বাধীন ভারত গঠনের স্বপ্নের কবিতা। এই কবিতায় কবি অত্যন্ত নিপুণভাবে ধ্বংস ও সৃষ্টির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন।

ধ্বংসের চিত্র: কবিতার শুরুতেই আমরা দেখতে পাই এক প্রলয়ংকর রূপ। কালবৈশাখীর ঝড়ের মতো ধেয়ে আসছে ‘প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল’। তার আগমনে সমুদ্রপারের বন্দিশালার আগল ভেঙে যাচ্ছে। মহাকাল-সারথি রক্ত-তড়িতের চাবুক হাঁকিয়ে, বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে ছুটে আসছে। তার এলোমেলো চুলের ঝাপটায় আকাশ কেঁপে উঠছে, আর অট্টহাসির হট্টগোলে সমগ্র পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। ধূমকেতু, রক্ত-কৃপাণ, রথঘর্ঘর ইত্যাদি অনুষঙ্গ ব্যবহার করে কবি কবিতাজুড়ে ধ্বংস ও তাণ্ডবের এক ভয়াল পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন।

নতুন সৃষ্টির উন্মাদনা: তবে এই ধ্বংসের বর্ণনার পাশাপাশি কবিতায় সৃষ্টির উন্মাদনাও প্রবলভাবে উপস্থিত। কবি বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, কালবোশেখির ঝড় আসলে ‘নূতনের কেতন’ বা নতুন যুগের পতাকা ওড়াচ্ছে। প্রলয় হলো নতুন সৃষ্টির প্রসব-যন্ত্রণা। এই ধ্বংসের দেবতা জরাজীর্ণ মুমূর্ষুদের বিনাশ করে নবীন প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে আসে। তাই ভয়ংকর রুদ্রমূর্তির আড়ালেই “দিগম্বরের জটায় হাসে শিশু-চাঁদের কর”। রাতের অন্ধকার ভেদ করে যেমন নতুন ভোর আসে, তেমনি এই ধ্বংসের তাণ্ডব শেষে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন, সুন্দর ও নতুন এক সমাজের সৃষ্টি হবে।

এইভাবেই ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় কবি ধ্বংসের ভয়াল রূপের সাথে নতুনের আবাহন ও সৃষ্টির তীব্র উন্মাদনাকে একসূত্রে গেঁথেছেন।

আজকের পোস্ট এর মধ্যে প্রলয়োল্লাস কবিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা, লাইন ধরে বাংলা অর্থ এবং উত্তর সহ প্রশ্নও আলোচনা করা হল, যেগুলি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিশেষ ভাবে তোমাদের সহায়ক হয়ে উঠবে।

 

 

SOURCE-EDT

 ©kamaleshforeducation.in(2023)

error: Content is protected !!
Scroll to Top