স্কুলের স্টাফ ও ছাত্র ছাত্রীদের নিরাপত্তা প্রদান, শৃঙ্খলা রক্ষা ও নির্বিঘ্নে প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালনার জন্য ম্যানেজিং কমিটি ও তার অধীনে থাকা সাব কমিটিগুলি (একাডেমিক কাউন্সিল ও স্টাফ কাউন্সিল) ছাড়াও আরও কয়েকটি কমিটি রাখার কথা বলা হয়েছে সরকারি নির্দেশে। হঠাৎ করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে বা কোনো আইনি জটিলতা তৈরি হলে এই কমিটিগুলির গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ অনেক স্কুলেই এগুলি ঠিক ভাবে পরিচালনা করা হয় না। না করলে কিন্তু ভবিষ্যতে যে কোনো সময় সমস্যায় পড়তে পারেন স্কুল কর্তৃপক্ষ তথা স্কুলের স্টাফ। আজকে আলোচনা করবো এই রকম গুরুত্বপূর্ণ তিনটি কমিটির গঠন, কার্যাবলী ও গুরুত্ব নিয়ে।

——————————————————
১) MID DAY MEAL COMMITTEE :
—————————
ক) সরকারি আদেশ : স্কুল এডুকেশন ডিপার্টমেন্টের মেমো নং – 394(26)-ES (CMDMP), তারিখ – 14/12/2018
খ) কমিটির গঠনতন্ত্র :
i) HM/TIC – কমিটির Chairman।
ii) মিড ডে মিলের দায়িত্বপ্রাপ্ত টিচার – কমিটির কনভেনর।
iii) সংশ্লিষ্ট সার্কেলের SI দ্বারা নোমিনেটেড দুই জন অভিভাবক প্রতিনিধি (তিন মাসের টার্ম)– সাধারণ সদস্য
iv) একজন মিড ডে মিলের রাঁধুনি – সাধারণ সদস্য।
গ) কমিটির কাজ –
মিড ডে মিলের খাবারের গুণমান বজায় রাখা, স্বাস্থ্য সম্মত হচ্ছে কি না দেখা, খাবার টেস্ট করা ও খাবার থেকে স্টুডেন্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
ঘ) কমিটির মিটিং –
মিড ডে মিলের দায়িত্বপ্রাপ্ত টিচার অর্থাৎ কমিটির কনভেনর HOI এর সঙ্গে আলোচনা করে প্রতি মাসে অন্তত একটি মিটিং ডাকবেন এবং সেই মিটিংয়ের Resolution এর কপি SI কে পাঠিয়ে দেবেন।
ঙ) কমিটির গুরুত্ব – এই কমিটি কোনো আর্থিক দায়ভার এর সঙ্গে যুক্ত নয়। হিসাব বা বিল ভাউচার নিয়ে তাঁদের তেমন কিছু রোল নেই। মূলত মিড ডে মিলের খাবারের মান রক্ষা হচ্ছে কি না ও স্টুডেন্টদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো কম্প্রোমাইজ হচ্ছে কি না সেটা দেখাই এই কমিটির কাজ। বেনিয়ম দেখলে Resolution এ সেটা লিখবেন। প্রয়োজনে পরামর্শ দেবেন। এটা ভালো ভাবে কাজ করলে মিড ডে মিলের চাপ এককভাবে HOI বা নোডাল টিচারের উপরে থাকবে না। HOI এবং এমসির উচিত হবে কমিটির পরামর্শকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা।

২) STUDENT SAFETY AND SECURITY MONITORING COMMITTEE (SSMC):
ক) সরকারি আদেশ :
স্কুল এডুকেশন ডিপার্টমেন্টের মেমো নং – 235-SSE/17, তারিখ – 26/10/2017 এবং 738-SE (Law) , তারিখ – 26/06/2019)
খ) কমিটি গঠনের উদ্দেশ্য –
বিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
গ) কমিটির গঠনতন্ত্র :
i) HM/TIC – Chairman
ii) একজন শিক্ষিকা (শিক্ষিকা পাওয়া না গেলে একজন শিক্ষক) – সদস্য
iii) President /Administrator – সদস্য
iv) দুইজন অভিভাবক প্রতিনিধি – সদস্য
v) পুলিশ /স্বাস্থ্য বিভাগ/অগ্নিনির্বাপণ / নামী NGO থেকে এক বা একাধিক আমন্ত্রিত সদস্য।
(এখানে উল্লেখ্য পুলিশের একজন প্রতিনিধি পাওয়ার জন্য থানার ওসিকে এবং স্বাস্থ্য বিভাগের একজন প্রতিনিধি পাওয়ার জন্য BMOH কে চিঠি দেবেন HOI। একই ভাবে NGO বা Fire Department কেও চিঠি দিতে পারেন। সেখান থেকে নাম পাবেন।)
নোট – চেয়ারম্যান সহ কমিটির সমস্ত সদস্যদের নাম ও ফোন নাম্বার স্কুল নোটিশ বোর্ডে ও ওয়েবসাইটে (যদি থাকে ) ডিসপ্লে করে দিতে হবে। প্রতি বছর জানুয়ারি মাসের মধ্যে এই তালিকার আপডেট করতে হবে।
ঘ) কমিটির কার্যাবলী –
i) মিড ডে মিল ও পানীয় জল যেন সুরক্ষিত থাকে সেটা দেখা। পানীয় জলের পরীক্ষা লোকাল ল্যাব থেকে করিয়ে নেওয়া। তার রিপোর্ট অনুযায়ী কাজ করা।
ii) বিভিন্ন জীবাণুঘটিত রোগ থেকে ছাত্র ছাত্রীদের সুরক্ষা দেওয়া।
iii) স্টুডেন্টদের সাইবার নিরাপত্তা প্রদান করা। এই ব্যাপারে তাদের সচেতন করা।
iv) স্কুল চত্বরে অপ্রয়োজনীয় বাইরের লোকের এন্ট্রি নিয়ন্ত্রণ করা। ঢুকলেও প্রপার চেকিং এর পরে তবেই পারমিশন দেওয়া।
v) সমগ্র স্কুল চত্বরে এবং যে সব জায়গায় শিশুরা যাতায়াত করে সেখানে CCTV ক্যামেরা লাগানো এবং সেগুলি যাতে সর্বক্ষণ চালু থাকে সেটা নিশ্চিত করা। ভালো করে খেয়াল করুন সমস্ত “Vulnerable Area” তে CCTV লাগানোর কথা বলা হচ্ছে এই অর্ডারে।
vi) শিশুদের যৌন হেনস্তা প্রতিরোধ আইন 2012 অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া। শিশুদের গুড টাচ ও ব্যাড টাচ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া।
vii) পথ নিরাপত্তার শিক্ষা দেওয়া।
viii) Self Defence এর শিক্ষা দেওয়া।
ix) ইলেকট্রিকের ওয়ারিং বা যন্ত্রাংশ থেকে শিশুদের যাতে ক্ষতি না হয় সেটা দেখা।
x) Parent Teacher মিটিংয়ে শিশু নিরাপত্তার বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করা।
xi) শিশুদের যৌন হেনস্তা বা অন্য কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে SSMC প্রথমেই ব্যাপারটা সম্পর্কে খোঁজ খবর নেবে, তথ্য সংগ্রহ করবে, লিখিত রেকর্ড রাখবে, HOI কে এবং শিশুর ফ্যামিলিকে জানাবে।
xii) SSMC প্রতি বছর নির্ধারিত ফর্ম্যাটে সেফটি অডিট করবে এবং তার কপি SI কে পাঠিয়ে দেবে। SI সেটা ফরোয়ার্ড করবেন Sub Divisional Nodal Committee এর কাছে।
xiii) শিশুদের যৌন হেনস্তার কেস হলে SSMC উক্ত শিশুর ও অভিযুক্তের নাম পরিচিতি সম্পর্কে গোপনীয়তা বজায় রাখবে।
xiv) SSMC বছরে চারবার তিন মাস অন্তর রিভিউ মিটিং করবে এবং শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করবে। HOI কে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবে। এই ব্যাপারে তারা একটা রেজোলিউশন খাতা মেনটেন করবে।
ঙ) Student Safety and Security Monitoring Committee(SSMC) এর গুরুত্ব –
স্কুলের সমস্ত ছাত্র ছাত্রীদের খেয়াল রাখা একা HOI এর পক্ষে সম্ভব নয়। কমিটির সবাই দায়িত্ব ভাগ করে নিলে কাজটা অনেক সহজ হবে। সর্বোপরি স্কুলে যদি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা কখনও ঘটে যায় তখন কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এই কমিটির ভূমিকা দেখতে চাইবে। এই কমিটি না থাকলে কর্তব্যে অবহেলার দায়ে পড়বেন HOI।
৩) COMPLAINT COMMITTEE UNDER VISHAKHA GUIDELINES: –
ক) সরকারি আদেশ :
ডিরেক্টরেট অফ স্কুল এডুকেশনের মেমো নং – 03/1(2)-SC/G, তারিখ – 02/01/2012
খ) কমিটি গঠনের উদ্দেশ্য –
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বিশাখা গাইডলাইন মেনে কর্মক্ষেত্রে কর্মরত মহিলাদের যৌন হেনস্তা থেকে সুরক্ষিত রাখা।
গ) কমিটির গঠনতন্ত্র –
i) কমিটির সদস্য সংখ্যা নির্দিষ্ট নয়।
ii) কমিটিতে অন্তত একজন স্কুলের বাইরের মেম্বার থাকবেন। সেটা কোনো NGO এর প্রতিনিধি হতে পারে অথবা পুলিশ বা স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিনিধি হতে পারে।
iii) আমরা ধারণা করতে পারি যে কমিটিতে HOI থাকবেন পদাধিকার বলে। তাঁকে কমিটির চেয়ারম্যান বা কনভেনর করা যেতে পারে।
iv) প্রেসিডেন্ট বা অ্যাডমিনিস্ট্রেটর সদস্য হিসাবে থাকতে পারেন।
v) কমিটিতে একজন শিক্ষিকা বা মহিলা নন টিচিং স্টাফ চেয়ার পার্সন হিসাবে কাজ করতে পারবেন। তিনিই হবেন এই কমিটির হেড।
vi) আরো এক বা একাধিক টিচিং ও নন টিচিং স্টাফ কমিটির সদস্য হবেন।
vii) দেখতে হবে মোট সদস্য সংখ্যার কম করে 50 % সদস্য যেন মহিলা হন।
গ ) কমিটির কাজ :
i) Complaint কমিটির কাছে যৌন হেনস্তার নিম্নলিখিত ঘটনাগুলির জন্য কমপ্লেইন করতে পারেন একজন কর্মী —
a) Physical Contact and advances.
b) A demand or request for sexulal favours.
c) Sexually coloured remarks.
d) Showing pornography.
e) Any unwelcome physical, verbal, or non verbal conduct of sexual nature। —
ii) প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মীর থেকে উপরে উল্লেখিত কোনো অভিযোগ পেলে প্রথমেই সেটা বন্ধ করতে উদ্যোগ নেবে কমিটি।
iii) কর্মক্ষেত্রে মহিলা কর্মীদের যাতে এসব অবাঞ্ছিত সমস্যায় পড়তে না হয় সেটা নিশ্চিত করবে কমিটি।
iv) Complaint পাওয়ার পর অভিযোগকারীর যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সেটা নিশ্চিত করার জন্য কমপ্লেইন কমিটি বিষয়টি দ্রুত HOI এর নজরে আনবেন। MC তে আলোচনা হতে পারে ব্যাপারটা নিয়ে। কমপ্লেইন কমিটি এই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সাহায্য করবে। অভিযোগকারীর নিরাপত্তার স্বার্থে অভিযুক্তের বা অভিযোগকারীর ট্রান্সফার এর সুপারিশ করতে পারবে কমিটি।
v) কমপ্লেইন অভিযোগের কমিটি তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করবে। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে রেজোলিউশন করবে নিজেদের মতামত জানিয়ে। সেটা HOI কে জমা দেবেন।
vi) যদি অভিযোগের সত্যতা আছে বলে মনে করে কমপ্লেইন কমিটি তাহলে তারা অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশান নেওয়ার জন্য HOI কে অনুরোধ করবে। HOI সেই সুপারিশ এমসিতে আলোচনা করে প্রয়োজনে বোর্ডে পাঠিয়ে দেবেন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশান নেওয়ার জন্য।
vii) Complaint Committee অবশ্যই নিশ্চিত করবে যে ভিকটিম যেন নির্ভয়ে তার অভিযোগ জমা করতে পারে। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে যেন ব্যবস্থা নেওয়া।
viii) প্রতি বছর এই সমস্ত কমপ্লেইন নিয়ে একটা অ্যানুয়াল রিপোর্ট তৈরি করে HOI এর কাছে পেশ করবে এই কমিটি। HOI সেটা ডি আই কে ফরোয়ার্ড করে দেবেন।
ঘ) Vishakha Complaint Committee এর গুরুত্ব –
ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এই কমিটি। মহিলা কর্মীর স্বার্থে, তাঁর সহকর্মীদের স্বার্থে, তাঁর অফিস হেডের স্বার্থে। কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্তা খুব একটা আনকমন ব্যাপার নয় আমাদের দেশে। এর প্রতিকার হওয়া দরকার। আবার মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসিয়ে দেওয়ার ঘটনাও সামনে আসে। কমপ্লেইন কমিটি ঠিক ভাবে কাজ করলে ন্যায় বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যায়। পরে প্রশাসনিক তদন্ত হলে এই কমিটির রিপোর্ট সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। তাই এই কমিটি ঠিক ভাবে চলা উচিত। সবার স্বার্থেই।
****** শেষ কথা *****
এই কমিটিগুলি সুপ্রিম কোর্টের রায় বা বিভিন্ন আইনের পরিপ্রেক্ষিতে Govt Order জারি করে তৈরি করতে বলা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এদের তেমন কোনো কাজ না থাকলেও সংকটের সময়ে এদের প্রয়োজন বুঝতে পারা যাবে। আইনি জটিলতায় অথবা প্রশাসনিক অ্যাকশনের সামনে শিক্ষক শিক্ষিকা, HOI, তথা স্কুল কর্তৃপক্ষের রক্ষাকবচ হতে পারে এগুলি। যদি এই কমিটিগুলি না থাকে এবং এই সংক্রান্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যায় তখন কিন্তু সব দায় কিন্তু চলে আসবে স্কুল কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে বিদ্যালয় প্রধানের উপরে। তাই এগুলি গুরুত্ব নিয়ে তৈরি করা উচিত। এদের রুটিন ফাংশানও চালু রাখা উচিত। ছাত্র, শিক্ষক, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সবার স্বার্থেই।