বিশ শতকের ভারতে কৃষক, শ্রমিক ও বামপন্থী আন্দোলন

 প্রশ্ন উত্তর (২/৪/৮ মার্কস)

Class 10 History Chapter 6

Long Question Answer

Published on: 

মাধ্যমিক ইতিহাসের ষষ্ঠ অধ্যায় ‘বিশ শতকের ভারতে কৃষক, শ্রমিক ও বামপন্থী আন্দোলন’(History Chapter 6) এর মধ্যে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাধারণ কৃষক, মেহনতি শ্রমিক শ্রেণি এবং বামপন্থী দলগুলোর শক্তিশালী ভূমিকা, কিংবা বারদোলি ও তেভাগা আন্দোলনের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো এই অংশে দারুণভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আজকের পোস্টে এই চ্যাপ্টার থেকে বাছাই করা ২, ৪ এবং ৮ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তরগুলো শেয়ার করা হল।

বোর্ড: বিষয়বস্তু

1 মাধ্যমিক ইতিহাস ষষ্ঠ অধ্যায় ‘বিশ শতকের ভারতে কৃষক শ্রমিক ও বামপন্থী আন্দোলন’ বড় প্রশ্ন ও উত্তর (২/৪/৮ মার্কস) Madhyamik History Chapter 6 Question Answer

1.1 দশম শ্রেণির ইতিহাস ষষ্ঠ অধ্যায় (বিশ শতকের ভারতে কৃষক শ্রমিক ও বামপন্থী আন্দোলন) 2 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | Class 10 History Chapter 6 2 Marks Question Answer

1.2 মাধ্যমিক ক্লাস 10 ইতিহাস ষষ্ঠ অধ্যায় 4 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | Madhyamik Class 10 History Chapter 6 4 Marks Question Answer

1.3 দশম শ্রেণি ইতিহাস ষষ্ঠ অধ্যায় ৮ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | Madhyamik Class 10 History 6th Chapter 8 Marks Question Answer

মাধ্যমিক ইতিহাস ষষ্ঠ অধ্যায় ‘বিশ শতকের ভারতে কৃষক শ্রমিক ও বামপন্থী আন্দোলন’ বড় প্রশ্ন ও উত্তর (২/৪/৮ মার্কস) Madhyamik History Chapter 6 Question Answer

দশম শ্রেণির ইতিহাস ষষ্ঠ অধ্যায় (বিশ শতকের ভারতে কৃষক শ্রমিক ও বামপন্থী আন্দোলন) 2 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | Class 10 History Chapter 6 2 Marks Question Answer

উত্তর:  বঙ্গভঙ্গের ( ১৯০৫ খ্রী.) পিছনে বড়েলাট লর্ড কার্জনের আসল উদ্দেশ্য ছিল–
 (ক) জাতীয় আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাপ্রদেশ ও বাঙালি জাতিকে আঘাত করে জাতীয় আন্দোলনকে দুর্বল করা
 (খ) বাঙালিকে সংখ্যালঘুতে পরিনত করা  (গ) হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা,
 (ঘ) ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভীত সুদৃঢ় করা ইত্যাদি। প্রকাশ্য ব্যাখ্যা অর্থাৎ প্রশাসনিক সুবিধার বিষয়টি ছিল অজুহাতমাত্র।

উত্তর:  নীলকর সাহেবদের শোষন ও অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বিহারের চম্পারণ জেলার নীলচাষিরা ১৯১৬ খ্রী. গান্ধিজির নেতৃত্বে এক আন্দোলন গড়ে তোলে। এটি চম্পারণ সত্যাগ্রহ নামে পরিচিত।

◾️ফলাফল : আন্দোলনের তীব্রতায় সরকার চাষিদের অবস্থা অনুসন্ধানের জন্য ১০ জুন ১৯১৭ খ্রী. একটি তদন্ত কমিটি নিয়োগ করে। এর ফলে ‘চম্পারণ কৃষি বিল’ আইন পাস হয় এবং তিন কাঠিয়া প্রথার অবসান ঘটে।

উত্তর:  বিহারের চম্পারণে নীলকর সাহেবরা চাষিদের জমিতে বিঘা প্রতি (২০ কাঠায় = ১ বিঘা) তিন কাঠা জমিতে নীল চাষ করতে বাধ্য করত। অর্থাৎ চাষিরা ২০ কাঠা জমির মধ্যে তিন কাঠা জমিতে নীল উৎপাদন করতে বাধ্য হত। শুধু উৎপাদন নয়, উৎপাদিত নীল নীলকর সাহেবদের কাছে নির্দিষ্ট দামে বিক্রি করতে বাধ্য করত থাকত। এই ব্যবস্থা ‘তিন কাঠিয়া প্ৰথা’ নামে পরিচিত।

উত্তর:  ১৯১৮ খ্রী. দুর্ভিক্ষ, দুর্যোগ ইত্যাদি কারণে গুজরাটের খেদা বা খেড়া বা কৈরা জেলার কৃষকদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে ওঠে। তা সত্ত্বেও ৩০% রাজস্ব বৃদ্ধি ও রাজস্ব আদায়ের জন্য সরকার কৃষকদের ওপর নানাভাবে উৎপীড়ন শুরু করে। এর বিরুদ্ধে গান্ধিজির নেতৃত্বে ও ইন্দুলাল যাজ্ঞিক, বল্লবভাই প্যাটেল, মোহনলাল পান্ডা প্রমুখের সহযোগিতায় যে আন্দোলন গড়ে ওঠে তা খেদা’ বা ‘খেড়া’ বা ‘কৈরা’ সত্যাগ্রহ আন্দোলন নামে পরিচিত।

উত্তর:  ১৯২০ খ্রী. লালা লাজপত রায়ের সভাপতিত্বে কলকাতায় এক বিশেষ অধিবেশনে কংগ্রেস নরমপন্থা বর্জন করে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব গ্রহন করে। অতঃপর গান্ধিজির নেতৃত্বে সারা দেশে অসহযোগ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। তাই ‘কলকাতা কংগ্রেস অধিবেশন’ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

উত্তর:  ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ৫ ফেব্রুয়ারি উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলার চৌরচৌরি নামক গ্রামে পুলিশের অমানুষিক অত্যাচারে ক্ষিপ্ত হয়ে উত্তেজিত জনতা থানায় আগুন লাগিয়ে দেয়। এতে প্রায় ২২ জুন পুলিশকর্মী জীবন্তবদ্ধ হয়। এটি চৌরিচৌরা হত্যাকান্ড নামে পরিচিত।

অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার :– অহিংস আন্দোলনে হিংসার প্রবেশ ঘটায় ও সরকারের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার আতঙ্কে গান্ধীজী ‘বারদৌলি ঘোষণা’র মাধ্যমে আন্দোলন প্রত্যাহার করেন। তবে গান্ধিজির এরূপ সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন। সুভাষচন্দ্র বসু, জুওহরলাল নেহরু প্রমুখ।

উত্তর:  বাবা রামচন্দ্র ছিলেন অসহযোগ আন্দোলনের সময় যুক্তপ্রদেশের (বর্তমান উত্তরপ্রদেশ) একজন সন্ন্যাসী কৃষক নেতা। তাঁর নেতৃত্বে অযোধ্যা, রায়বেরিলি, সুলতানপুর, প্রতাপগড়, জৌনপুর, ফৈজাবাদ প্রকৃতি অঞ্চলের কৃষকরা জমিদার ও তালুকদারদের শোষণের বিরুদ্ধে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলে।

উদ্দেশ্য : খাজনা হ্রাস, বেগার শ্রম ও ভূমি থেকে উচ্ছেদ ইত্যাদির অবসান ঘটানো ছিল এর উদ্দেশ্য।

গুরুত্ব :→ ১৯২০ খ্রী. ১৪ই আগস্ট মিথ্যা চুরির অভিযোগে সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করলেও আন্দোলনের তীব্রতা লক্ষ্য করে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। যুক্তপ্রদেশের কৃষক আন্দোলনে তাঁর অবদান চিরস্মরনীয়।

উত্তর:  সন্ন্যাসী মাদারি পাশির (১৯২১-২২) খ্রী. নেতৃত্বে যুক্তপ্রদেশের হরদৈ, বারাবাঁকি, সীতাপুর, বারাইচ প্রভৃতি অঞ্চলে শুরু হয় একা আন্দোলন।
কারণ : (ক) কৃষকদের নির্ধারিত করের ওপর আরও বাড়তি ৫০% কর ছাড়াও নানারকম উপকর আরোপ। (খ) কর আদায়ের ক্ষেত্রে কৃষকদের ওপর সীমাহীন অত্যাচার (গ) জমি ও খামারে বিনা মজুরিতে কৃষকদের বেগার শ্রম দানে বাধ্য করা ও কৃষকদের জমি থেকে উৎখাত করা। (ঘ) কংগ্রেস ও খিলাফত নেতাদের উদ্যোগ গ্রহন ইত্যাদি ছিল ‘একা’ বা ‘একতা’ আন্দোলন গড়ে ওঠার প্রধান করেন।

উত্তর:  ১৮২৮ খ্রী. গুজরাটের সুরাট জেলার বারদৌলি অঞ্চলে সর্দার বল্লবভাই প্যাটেলের নেতৃত্বে কৃষকরা এক আন্দোলন গড়ে তোলে। এটি বারদৌলি সত্যাগ্রহ আন্দোলন নামে খ্যাত।
কারণ :→ বন্যার ফলে ফসল নষ্ট, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি সত্ত্বেও সরকার ৩০% রাজস্ব বৃদ্ধি করলে বল্লবভাই প্যাটেল- এর নেতৃত্বে কৃষকরা এই আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলনের তীব্রতায় সরকার খাজনা হ্রাস (৩০% পরিবর্তে ৬.০৩%) করতে বাধ্য হয়।

উত্তর:  ‘হালি প্রথা‘ হল গুজরাটের সুরাট জেলার একধরনের ‘বেগার শ্রম‘। এই প্রথা অনুযায়ী কালিপরাজ গোষ্ঠীভূক্ত নিম্নবর্ণের ভূমিহীন খেতমজুর বা ভাগচাষিরা ‘উজলিপরাজ‘ নামক উচ্চবর্ণের বিত্তবান কৃষকদের জমিতে বিনা পারিশ্রমিকে শ্রমদান করতে বাধ্য হতে। সীমাহীন শোষন, দারিদ্র ও অবজ্ঞার শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত কালিপরাজ শ্রেণিভূক্ত ভূমিহীন ও খেত মজুররা হালি প্রথার অবসানে সোচ্চার হয়।

উত্তর:  ১৯৩০ খ্রী. ৬ই এপ্রিল গান্ধিজির নেতৃত্বে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হলে তাঁর একান্ত অনুগামী আব্বাস। তৈয়েবজী গুজরাটের সুরাট জেলার ধরসানায় ও ওয়াডাতে লবন গোলা লুট করতে গিয়ে বন্দি হন। এই সংবাদে সুরাট সহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে আইন অমান্য আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে। এরপর ধরসানা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন সরোজিনী নাইডু।

উত্তর:  অসহযোগ আন্দোলনকালে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে যে সমস্ত কৃষক আন্দোলন সংঘটিত হয় তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ, ব্যাপক ও রক্তাক্ত আন্দোলনটি হল মালাবার অঞ্চলের ‘মোপালা বিদ্রোহ‘।

 

নেতৃত্ব :– ১৯২১ খ্রী. মহম্মদ হাজি আলি মুসালিয়র, ইয়াকুব হাসান প্রমুখের নেতৃত্বে কেরলের মালাবার অঞ্চলে এই বিদ্রোইটি সংঘটিত হয়।

 

কারণ :– সামন্ততান্ত্রিক শাসন, শোষণ, খলিফার সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের উন্মাদনা ও অসহযোগ আন্দোলনের ঢেউ এই তিনের প্রভাবে মোপলা বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এতে প্রায় ৩০০ জন হিন্দুকে হত্যা করা হয় ও ২৫০০ জন হিন্দুকে ধর্মান্তরিত করা হয়।

 

চরিত্র :– আন্দোলনটি হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় পর্যবসিত হলেও মূল চরিত্রটি ছিল ইংরেজ ও সামন্ততন্ত্র বিরোধী।

 

উত্তর:  কেরলের মালাবার অঞ্চলের হিন্দু জমিদারদের বলা হত ‘জেনমি’ এদের বিরুদ্ধে ১৯২১ খ্রী. যে কৃষক বিদ্রোহটি সংঘটিত হয় তা ইতিহাসে মোপলা বিদ্রোহ নামে পরিচিত।

 

কারণ :– জেনমিদের নির্যাতনে দরিদ্র মুসলিম মোপলাদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। অবশেষে ১৯২১ খ্রী. মহম্মদ হাজি ইয়াকুব হাসানের নেতৃত্বে মোপলারা জেনমিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এতে প্রায় ৩০০ জন নিহত হন, ২৫০০ জন হিন্দু ধর্মান্তরিত হন। বিদ্রোহিরা জমিদারদের বাড়ি, কাছারি, সরকারি দপ্তর, থানা প্রভৃতিতে আক্রমণ চালায়। সরকার কঠোর হাতে বিদ্রোহ দমন করে এবং ২২৩৭ জন মোপলা বিদ্রোহী নিহত হন।

উত্তর:  বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দা জনিত কারণে বখস্ত জমি অর্থাৎ, খাজনা অনাদায়ে জমিদার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত করা ভূমিকে কেন্দ্র করে বিহারে এক কৃষক আন্দোলন গড়ে ওঠে। এটি ‘বখস্ত আন্দোলন’ নামে পরিচিত।
   বামপন্থী নেতা যেমন– কারিয়ানন্দ শর্মা, যদুনন্দন শর্মা, পঞ্চানন শর্মা, রাহুল সাংকৃত্যায়ন প্রমুখের নেতৃত্বে এই আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে। কৃষকদের দাবি ছিল খাজনা অনাদায়ে জমি থেকে কৃষকদের উচ্ছেদ করা যাবে না। উচ্ছেদ হওয়া কৃষকদের জমি ফেরৎ দিতে হবে ইত্যাদি।

উত্তর:  ভারত ছাড়ো আন্দোলনকালে বাংলার মেদিনীপুর জেলার তমলুক মহকুমায় সতীশচন্দ্র সামন্তের নেতৃত্বে (১৭ ডিসেম্বর ১৯৪২ খ্রী.) গড়ে ওঠে ‘তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার’। এক্ষেত্রে তাঁকে সাহায্য করেন অজয় মুখোপাধ্যায়, সুশীল ধাড়া প্রমুখ। ইংরেজ সরকারের সমান্তরাল তাম্রলিপ্ত সরকারের ছিল নিজস্ব বুলেটিন, ডাকবিভাগ, অর্থদপ্তর প্রভৃতি। তমলুক, নন্দীগ্রাম, সুতাহাটা ও মহিষাদল এই চারটি থানা ছিল এই সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ১৯১২ খ্রী. থেকে ১৯৪৪ খ্রী. পর্যন্ত এই সরকার চালু ছিল।

উত্তর:  স্বাধীনতা লাভের প্রাক্কালে 1946-47 খ্রী. বাংলার শাসিত, শোষিত কৃষক সম্প্রদায় ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভা’র উদ্যোগে এবং কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে জমিদার, জোতদার ও ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন গড়ে তোলে তা ‘তেভাগা আন্দোলন’ নামে পরিচিত। 1946 খ্রী. শেষদিকে দিনাজপুর জেলায় এর সূত্রপাত ঘটলেও অচিরেই তা সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় 70 লক্ষ কৃষক এই আন্দোলনে যোগদান করেন।  অধ্যাপক নরহরি কবিরাজ বলেন, তেভাগা আন্দোলন ছিল বর্গাদার ভাগচাষিদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রাম।’

উত্তর:  স্বাধীনতা লাভের উষাকালে 1946 খ্রী. সেপ্টেম্বর মাসে বামপন্থী নেতা কে সি জর্জ এবং টি ভি টমাসের নেতৃত্বে দক্ষিণ ভারতে ত্রিবাঙ্কুর রাজ্যের জনগন যে গনআন্দোলন গড়ে তোলে তা ‘পুন্নাপ্রা–ভায়লায়ের গনসংগ্রাম’ নামে পরিচিত।  আন্দোলনকারীদের স্লোগান ছিল– ‘দেওয়ানের শাসন খতম করো, স্বাধীন ত্রিবাঙ্কুর ও মার্কিন মডেলকে আবর সাগরের জলে ছুঁড়ে ফেলে দাও।

উত্তর:  1920 খ্রী. 31 অক্টোবর লালা লাজপত রায়-এর সভাপতিত্বে বোম্বাই শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় সর্বভারতীয় শ্রমিক সংগঠন ‘নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস’। এক্ষেত্রে তাঁকে সহায়তা করেন বি পি ওয়াদিয়া, বাল গঙ্গাধর তিলক, পি সি যোশী, দেওয়ান চমনলাল, জোসেফা ব্যাপ্তিস্তা, প্রভাত কুমার রায়চৌধুরী প্রমুখ। সমগ্র ভারতের 5 লক্ষ শ্রমিকদের 806 জন প্রতিনিধি এতে যোগদান করেন।

উত্তর:  ‘দ্বিজ’ কথাটির আক্ষরেক অর্থ হল “যার দুবার জন্ম”। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি দু-জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয় বলে একে ‘দ্বিজ’ বলা হয়।

প্রথম :– 1920 খ্রী. অক্টোবর মাসে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের নেতৃত্বে রাশিয়ার তাসখন্দে প্রথম ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়।

দ্বিতীয় :– 1925 খ্রী. ডিসেম্বর মাসে সিঙ্গারভেল্লু চেট্টিয়ার-এর সভাপতিত্বে কানপুরে দ্বিতীয়বার ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়।

 

উত্তর: উদ্দেশ্য :– নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্দেশ্যগুলি ছিল– (ক) সাম্রাজ্যবাদী প্রাধান্যের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেনির স্বার্থ রক্ষা করা

(খ) ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে ওঠা শ্রমিক সংগঠন গুলির মধ্যে যোগসূত্র রক্ষা করা

(গ) শ্রমিক শ্রেনির আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয় আন্দোলনকে জোরদার করা ও শ্রমিক শ্রেণিকে সংগঠিত করা

(ঘ) শ্রমিক শ্রেনির বিভিন্ন দাবিদাবা আদায় করা ইত্যাদি।

 

উত্তর:  সারা ভারত ওয়াকার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টির নেতৃত্বে শ্রমিক আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করলে ব্রিটিশ সরকার শঙ্কিত ও চিন্তিত হয়ে ওঠে।

 

নেতাদের গ্রেপ্তার :– সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও শ্রমিক আন্দোলনে মদত দেওয়ার অভিযোগে সরকার 33 জনকে গ্রেফতার করে। অতপর তাঁদের বিরুদ্ধে শুরু হয় ‘মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা’। অভিযুক্তদের মধ্যে ছিলেন মুজাফ্ফর আহমেদ, শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে, এস ভি ঘাটে, পি. সি যোশী, ফিলিপ স্প্র্যাট, বেঞ্জামিন ব্রাডলি, মিরাজকর, ধরণী গোস্বামী প্রমুখ। চার বছর, মামলা চলার পর অভিযুক্তদের দীর্ঘমেয়াদি কারাদন্ড হয়।

 

উত্তর:  শ্রমিক আন্দোলন কমিউনিস্টদের প্রভাব শ্রমিক সংগঠন AITUC-তে প্রতিফলিত হয়। ফলে কংগ্রেসের দক্ষিণপল্লী গোষ্ঠীর সঙ্গে কমিউনিস্টদের মতভেদ ঘটে। এরই পরিনামে 1931 খ্রী. বি টি রনদিতে, সোমনাথ লাহিড়ি প্রমুখের উদ্যোগে গড়ে ওঠে ‘রেড ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস’। এটি ‘1931 খ্রী. ভাঙ্গন’ নামে পরিচিত। অবশ্য পরবর্তীকালে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের নেতৃত্বে পুনরায় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

 

উত্তর:  বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দাজনিত কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বেকারত্ব বৃদ্ধি, ব্রিটিশ সরকারের বাড়তি রাজস্বের চাপ, ইত্যাদির ফলে ভারতের কৃষক ও শ্রমিকের অবস্থা শোচনীয় হয়ে ওঠে।  এই অবস্থায় কমিউনিস্ট নেতাদের প্রচেষ্টায় শ্রমিক আন্দোলনগুলি তীব্র আকার ধারণ করলে সরকার বিচলিত হয়ে ওঠে।  শ্রমিক আন্দোলনকে দুর্বল করার জন্য ব্রিটিশ সরকার 1938 খ্রী. কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

 

উত্তর:  ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস সমাজতান্ত্রিক দলের গুরুত্ব অপরিসীম

 

ক. সুভাষচন্দ্রের সভাপতি পদ লাভ :– এই দলের প্রভাবে সুভাষচন্দ্র বসু ত্রিপুরি কংগ্রেসের অধিবেশনে সভাপতি পদ লাভ করেন।

 

খ. কংগ্রেসের কর্মসূচি গ্রহন :– এই দলের প্রভাবে জাতীয় কংগ্রেস কৃষি সংস্কার, ভূমি সংস্কার, শিল্প-বিরোধ সমস্যার সমাধান, দেশিয় রাজ্যের প্রজাদের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হন।

 

গ. কৃষক আন্দোলন সংগঠন :– বাংলা, বিহার, কেরালা, যুক্তপ্রদেশ ও অন্ধপ্রদেশে কৃষক আন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে এই দলের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

 

ঘ. 1937 খ্রী. নির্বাচনে প্রভাব :– 1937 খ্রী. নির্বাচনে কংগ্রেসের সাফল্যের ক্ষেত্রে এই দলের প্রভাব বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

 

উত্তর: 1939 খ্রী. ত্রিপুরি কংগ্রেস অধিবেশনে গান্ধিজির মনোনীত প্রার্থী পট্টভি  সীতারামাইরাকে পরাজিত করে সুভাষচন্দ্র বসু দ্বিতীয়বার কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হন। অবশ্য গান্ধিজির অনুগামীরা সুভাষচন্দ্রের ক্ষমতা ও অধিকার হ্রাস করার চেষ্টা করলে ও অসহযোগিতা শুরু করলে তিনি ক্ষুদ্ধ হন ও পদত্যাগ করেন। 1939 খ্রী. ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ নামে তিনি একটি নতুন দল গঠন করেন। ত্রিপুরি কংগ্রেস থেকেই কংগ্রেসের বামপন্থী ও ডানপন্থীদের মতবিরোধ-এর সৃষ্টি হয়।

 

উত্তর:  1939 খ্রী. ত্রিপুরি কংগ্রেস অধিবেশনে সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস সভাপতির পদ লাভ করলেও দক্ষিণপন্থী কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের আচরণ ও অসহযোগিতায় ক্ষুব্ধ হয়ে 27 এপ্রিল কলকাতা অধিবেশনে তিনি সভাপতির পদে ইস্তফা দেন।  এরপর 3 মে, 1939 খ্রী. তিনি ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। গান্ধি পন্থীদের সঙ্গে বিরোধের মোকাবিলা করা ও বামপন্থীদের শক্তিশালী করে ব্রিটিশ শাসনের উচ্ছেদ ঘটানোই ছিল এর উদ্দেশ্য।

মাধ্যমিক ক্লাস 10 ইতিহাস ষষ্ঠ অধ্যায়

4 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর

Madhyamik Class 10 History Chapter 6

4 Marks Question Answer

1. বঙ্গেভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে কৃষকশ্রেণী কেন যোগদান করেনি বা, কৃষক শ্রেণীর আগ্রহ ছিল না কেন? ০৪

উত্তর:১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ অক্টোবর বড়লাট লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ করেন। তবে বাংলার মানুষ এই ঘটনার প্রতিবাদে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল। যা ইতিহাসে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন নামে পরিচিত। নানা কারণে বাংলার কৃষক সমাজ এই আন্দোলন থেকে দূরে সরে ছিল।

কৃষকশ্রেণীর যোগ না দেওয়ার কারন

 

১. কৃষকদের দূরবস্থা :– বাংলায় ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ইংরেজদের লক্ষ্য ছিল যত বেশি সম্ভব রাজস্ব আদায় করা। এর ফলে কৃষকদের উপর আর্থিক চাপ পড়ে। তাই তারা নিজেদের সমস্যা ও দূরবস্থা নিয়ে এতই জেরবার থাকত যে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগদান করার কথা ভাবত না।

 

২. উপযুক্ত কর্মসূচীর অভাব :– বঙ্গ-ভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের প্রধান মুখ ছিল জাতীয় কংগ্রেস। জাতীয় কংগ্রেস উপযুক্ত কর্মসূচী গ্রহণ করে আন্দোলনে কৃষদের সামিল করার চেষ্টা করেনি। ড. সুমিত সরকারের মতে, সুনির্দিষ্ট কৃষি ভিত্তিক কর্মসূচীর অভাবে এই আন্দোলনে কৃষকদের যোগদান করানো সম্ভব হয়নি।

 

৩. শ্রেণীবৈষম্য :– ইংরেজ আমলে বাংলার সমাজে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে ওঠে। এই শ্রেণী গরিব কৃষকদের দুঃখে সমব্যথী ছিলনা। গরিব কৃষকরাও তাই মধ্যবিত্তদের আন্দোলনে যোগদান করেনি। কৃষকদের সাথে রাজনৈতিক নেতাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না।

 

৪. আঞ্চলিকতা :– লর্ড কার্জন পূর্ব বাংলা সফরের সময় বলেছিলেন, পূর্ব বাংলা একটি পৃথক প্রদেশ হিসাবে গঠিত হলে এখানকার গরিব কৃষকদের উন্নতি হবে। এছাড়া তিনি ঢাকার নবাব সলিম উল্লাহকে একটি মুসলিম প্রদেশ উপহার দানের কথা বলেন। বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব বাংলার মানুষ বঙ্গভঙ্গ সমর্থন করে যাদের অধিকাংশই ছিল মুসলমান ও নমঃশূদ্র কৃষক।

 

মূল্যায়ন :-  এই আন্দোলন ছিল মূলত উচ্চবর্গের। সেখানে উচ্চবর্গের মানুষ নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের অদূরদর্শিতা কৃষকদেরকে আন্দোলনে আকৃষ্ট করতে পারেনি। তাছাড়া এই আন্দোলনে কৃষকদের খাজনা বন্ধ করার কোনো কথা বলা হয়নি। কৃষকদের দূরবস্থা আন্দোলনের নেতাদের প্রভাবিত করতে পারেনি। তাই স্বাভাবিকভাবেই কৃষকরা এই আন্দোলন থেকে দূরে ছিল।

2. ভারত ছাড়ো আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণীর ভূমিকা লেখো। ০৪

উত্তর: ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ৪ আগস্ট গান্ধিজির নেতৃত্ব জাতীয় কংগ্রেসে বোম্বাই অধিবেশনে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রস্তাব করে। গান্ধিজি পরিচালিত শেষ গম আন্দোলন ছিল “ভারত ছাড়ো আন্দোলন”, এই আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণির অংশগ্রহণ ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

শ্রমিকশ্রেণীর ভূমিকা:

 

◾️কর্মসূচী :– ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ৪ আগস্ট বোম্বাই অধিবেশন থেকে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করা হয়। পরদিন কংগ্রেসের অনান্য নেতারা ১২ দফা কর্মসূচীর একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরী করে। এই প্রস্তাবে গান্ধিবাদী সত্যাগ্রহ, শিল্প ধর্মঘট , রেলপথ ও টেলিগ্রাফ লাইন আক্রমন, কর না দেওয়া সমান্তরাল সরকার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়।

 

• বোম্বাই :- এখানে ৯-১৪ আগস্ট গণবিক্ষোভ ঘটে। শিল্পাঞ্চল ও বন্দর এলাকায় ধর্মঘট হয়। সরকারি প্রশাসন লোপ পায়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার পুলিশ ও সেনা তলব করে।

 

• গুজরাট :- আহমেদাবাদে বস্ত্রশিল্পের প্রায় ১,২৫,০০০ শ্রমিক মজদুর মহাজন সংঘের নেতৃত্বে ধর্মঘট শুরু করে। আহমেদাবাদে আজাদ সরকার গড়ে ওঠে। এখানের বস্ত্রশিল্পের শ্রমিকরাটানা সাড়ে তিনমাস ধর্মঘট চালায়।

 

• বিহার :- বিহারের জামসেদপুরে টাটা ইস্পাত কারখানায় ১৩ দিন ব্যাপী ধর্মঘট পালিত হয়। শ্রমিকরা দাবি জানিয়ে বলে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারা কাজ শুরু করবে না। এর ফলশ্রুতিতে ১২ আগস্ট ডালমিয়ানগরে শ্রমিক ধর্মঘট হয়।

 

• অন্যান্য রাজ্য :- ভারতের অন্যান্য রাজ্যের বিভিন্ন শহরে শ্রমিক ধর্মঘট হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য – দিল্লি, লখনউ, কানপুর, নাগপুর, মাদ্রাজ, কলকাতা প্রভৃতি। এখানকার শ্রমিক ধর্মঘটগুলি স্বল্পস্থায়ী হয়। কারণ জাতীয় চেতনার সঙ্গে তাদের পেশাগত স্বার্থ জড়িয়ে ছিল।

 

মূল্যায়ন :– ভারত ছাড়ো আন্দোলন ছিল এর স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। হতাশা ও অনাগত আকাঙ্খা থেকে এই আন্দোলন পরিচালিত হয়। তবে এই আন্দোলন ছিল মূলত শহরকেন্দ্রিক। শহরের শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা এই আন্দোলনে যোগদান করলেও গ্রামীন কুটির শিল্পের শ্রমিকরা এই আন্দোলন থেকে দূরে ছিল। এছাড়াও এই আন্দোলনে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিক শ্রেণীকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করে।

 

3. ভারত ছাড়ো আন্দোলনে কৃষক শ্রেণীর ভূমিকা লেখো। ০৪

উত্তর: ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে ৪ আগস্ট জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারত ছাড়ো বা আগস্ট আন্দোলন শুরু হয়। শুরুতেই এই আন্দোলনকে নিস্তেজ করার জন্য সরকার শীর্ষস্থানীয় নেতা, যেমন – গান্ধীজী, জহরলাল নেহেরু, বল্লভভাই প্যাটেল প্রমুখকে গ্রেপ্তার করলে সমস্ত দেশজুড়ে গণ আন্দোলন শুরু হয়। এক্ষেত্রে কৃষক সম্প্রদায়ের ভূমিকা ছিল বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

 

◾️ ভারত ছাড়ো আন্দোলনে কৃষকদের যোগদানের কারণ :- ভারত ছাড়ো আন্দোলনে কৃষক শ্রেণির যোগদানের কারণগুলি হল – (ক) সম্পূর্ণ কৃষকরা জাতীয়তাবাদী আবেগে আন্দোলনে শামিল হয়  (খ) দরিদ্র কৃষকরা ব্রিটিশ শোষণ থেকে মুক্তির জন্য আন্দোলনে শামিল হয়।

 

◾️ ছাড়ো ছাড়ো আন্দোলন পর্বে বিভিন্ন রাজ্যে কৃষক আন্দোলন

১) বাংলায় কৃষক আন্দোলন :– ভারত ছাড়ো আন্দোলন পর্বে বাংলার মেদিনীপুর জেলার তমলুক মহাকুমা, পটাশপুর, ভগবানপুর, খেজুরি, মহিষাদল, ময়না, পাঁশকুড়া, নন্দীগ্রাম থানার কৃষিজীবী মানুষ আন্দোলনে সামিল হয় এবং খাজনা প্রদান বন্ধ করে দেয়। সতীশচন্দ্র সামন্তের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার। মাতঙ্গিনী হাজরার বীরত্বপূর্ণ আত্মবলিদান, বিদ্যুৎ বাহিনীর বহু কৃষকের জীবন দান কৃষক আন্দোলনকে তীব্র করে তোলে।

 

২) ওড়িশায় কৃষক আন্দোলন :– ওড়িশার কটক, কোলাপুর, তালচের প্রভৃতি অঞ্চলের কৃষকরা লক্ষণ নায়কের নেতৃত্বে থানা আক্রমণ, খাজনা বন্ধ ইত্যাদির মাধ্যমে আন্দোলন জারি রাখে।

 

৩) বিহারে কৃষক আন্দোলন :– ভারত ছাড়ো আন্দোলন পর্বে বিহারের কৃষাণসভার নেতৃত্বে মুঙ্গের, মুজাফফরপুর, ভাগলপুর, পূর্ণিয়া, সাঁওতাল পরগনা প্রভৃতি অঞ্চলে কৃষক আন্দোলন ৮০% ব্যাপক আকার ধারণ করে। প্রায় ৮০% থানায় কৃষকদের দখলে চলে যায়।

 

৪) গুজরাটে কৃষক আন্দোলন :– গুজরাটের সুরাট, ব্রোচ, খান্দেশ প্রভৃতি অঞ্চলের কৃষকরা সরকারি নথিপত্র পুড়িয়ে, রেল যোগাযোগ ছিন্ন করে আন্দোলন চালিয়ে যায়।

   এছাড়াও পাঞ্জাব, উত্তর প্রদেশ, তামিলনাড়ু প্রভৃতি রাজ্যেও কৃষক আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে।

 

মূল্যায়ন :– ভারতছাড়ো আন্দোলনের সময় বাংলায় সংগঠিত কৃষক আন্দোলন ব্রিটিশ সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলে। বাংলার বিভিন্ন স্থানে কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশ অমান্য করে কমিউনিস্টদের যোগদান করে আন্দোলন গুলিকে বিশেষ তাৎপর্যমন্ডিত করে।

4. টিকা লেখো :— ” ওয়ার্কাস অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি “। ০৪

উত্তর: শিল্প বিপ্লবের পর ‘মার্কসীয় ব্যাখ্যা’ শ্রমজীবী মানুষদের শোষণ মুক্তির দিশা দেখায় ও শ্রেনীসংগ্রামের প্রেরণা জোগায়। শ্রমিক ও কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ১৯২৫ খ্রী. ১ নভেম্বর বাংলায় কংগ্রেস দলের ভিতরেই “লেবার স্বরাজ পার্টি অফ দ্য ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস” নামে একটি দল প্রতিষ্ঠিত হয়।

◾️প্রতিষ্ঠা :– বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় ১৯২৬ খ্রী. ফেব্রুয়ারি মাসে কৃষ্ণনগরে ড. নরেশ সেনগুপ্তের সভাপতিত্বে “নিখিল বঙ্গ পেজেন্টস অ্যান্ড ওয়ার্কার্স পার্টি” গঠনের চেষ্টা করেন। এরপর ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের কমিউনিস্ট গোষ্ঠীগুলি একটি সমাবেশ করে। এস. এ. ডাঙ্গে, মুজফ্ফর আহমেদ, পিসি যোশি এবং সন্তোষ সিং প্রমুখের নেতৃত্বে ১৯২৭ খ্রী. “ওয়ার্কস অ্যান্ড প্রেজেন্টস পার্টি” প্রতিষ্ঠিত হয়।

 

◾️শাখা সংগঠন :– এরপর বিভিন্ন রাজ্যে এর শাখা সংগঠন গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়। যুক্তপ্রদেশ, বোম্বাই, পাঞ্জাব প্রভৃতি প্রদেশে এই পার্টির শাখা গড়ে ওঠে। ১৯২৮ খ্রী. বিভিন্ন প্রদেশের শাখাগুলিকে যুক্ত করে “সারা ভারত ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস্ পার্টি” প্রতিষ্ঠা হয়। এই দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হন আর এস. নিম্বকার।

 

◾️কর্মসূচী :– শ্রেনি সংগ্রাম, বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি লোপ, শ্রমিষ্ঠদের মজুরি বৃদ্ধি, সংবাদপত্র ও বাক স্বাধীনতা, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার দান প্রভৃতি দাবি করা হয়।

 

◾️কার্যকলাপ :– এইসব শাখা সংগঠন এবং আঞ্চলিক পত্রপত্রিকার মাধ্যমে শ্রমজীবীদের মধ্যে প্রচারের কাজ চালায়, বামপন্থী চিন্তাধারা তাদের প্রভাবিত করে। শোষকশ্রেনিকে তারা চিনতে পারে। নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য তারা যৌথভাবে আলোচনা শুরু করে। সর্বভারতীয় শ্রমিক সংগঠন AITUC তে বামপন্থী প্রভাব বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন শ্রমিকরা সক্রিয়ভাবে যোগদান করে।

 

মূল্যায়ন :– ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টির মূল লক্ষ্য ছিল কৃষক-শ্রমিক স্বার্থে কাজ করা। তবে এই সংগঠন ছিল শহরকেন্দ্রিক, তাই শহরের শিল্প শ্রমিকরা তার আওতায় এসেছিল। এই সংগঠনে কিন্তু গ্রামের কৃষকদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তুলতে পারেনি। এই সংগঠনের হাত ধরে কমিউনিস্ট পার্টি তার সংগঠন বৃদ্ধি করতে সচেষ্ট হয়।

 

5. টীকা লেখো :– একা আন্দোলন।  ০৪

উত্তর:  অসহযোগ খিলাফৎ আন্দোলনের সময় উত্তরপ্রদেশে একটি কৃষক আন্দোলন গড়ে ওঠে, যা একা বা একতা আন্দোলন নামে পরিচিত। সমাজের নিম্নবর্গের কৃষকেরা এই আন্দোলন সংঘটিত করেছিল। এই আন্দোলনের নেতা ছিল মাদারী পাশী।

 

◾️আন্দোলনের কারণ :– একা আন্দোলনের প্রধান কারণ গুলি হল–
ক. কৃষকদের উপর অতিরিক্ত ৫০% নতুন কর আরোপ করা, 
 খ. কর আদায়ের সময় চরম অত্যাচার, 
গ. প্রচুর জমি ও খামারে কৃষককে বিনা বেতনে বেগারশ্রম দিতে বাধ্য করা,
ঘ. উৎপন্ন শস্যের বদলে নগদ অর্থে কর আরোপ করা।

 

◾️নেতৃত্ব :– একা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন মাদারী পাশী ও বাবা গরিব দাস। এদের নেতৃত্বে আন্দোলন উত্তর প্রদেশের হরদৈ, বারাবাঁকি, সীতাপুর, বারাইচ প্রভৃতি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

 

◾️শপথ গ্রহণ :– একা আন্দোলনে আন্দোলনকারীরা শপথ গ্রহণ করে যে তারা,–
ক. অতিরিক্ত কর দেবে না ,
খ. জমি থেকে উচ্ছেদ করলে তারা জমি ছেড়ে যাবে না,
গ. অপরাধীদের সাহায্য করবে না বেগার শ্রম দিবে না,
ঘ. তারা পঞ্চায়েতের যাবতীয় সিদ্ধান্ত মেনে নেবে।

 

◾️কার্যকলাপ :– একা আন্দোলনের নেতারা নিজস্ব পথে চলেন, তারা জাতীয় আন্দোলনের নেতাদের পরামর্শ বা নিয়ম মানেননি। মাদারী পাশী জেলা শাসককে হত্যা এবং ইংরেজ শাসকদের বিতারিত করার ডাক দেন। ফলে কৃষকরা তাদের বাড়ি আক্রমণ করেন। কুমায়ুন হিমালয়ের সংরক্ষিত বনভূমিতে আগুন ধরিয়ে দেয়, খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দেয়।

 

◾️পরিণতি :– একা আন্দোলন উগ্র হয়ে উঠলে সরকার তা দমনে অগ্রসর হয়। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে সরকারের নির্গম দমননীতির সাহায্যে মাদারী পাশী একা আন্দোলনের অবসান হয়।

 

6. টীকা লেখো :– তেভাগা আন্দোলন। ০৪

উত্তর:  ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে ফ্লাউড কমিশনের রিপোর্টে দেখানো হয় যে বাংলায় বহু কৃষক পরিবারের জমিতে কোনো অধিকার নেই। এই কমিশনের সুবাদে ভাগ চাষিরা ৩ ভাগের ১ ভাগ ফসল জমা দিবে বলে স্থির হয়, যা তেভাগা নামে পরিচিত। কিন্তু জমিদার বা সরকার কেউই এটা মানতে রাজি ছিল না। এই অবস্থায় কমিউনিস্ট কৃষক সংগঠন বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভা ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে তেভাগা আন্দোলন শুরু করেন।

◾️ নেতৃত্ব :– উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ির দেবীগঞ্জ এলাকায় বুড়িমার নেতৃত্ব প্রায় প্রবাদে পরিণত হয়েছিল। এছাড়াও দিনাজপুরের গৃহবধূ জয়মনি, দ্বীপেশ্বরী ; কাকদ্বীপের বাতাসী ; মহিষাদলের বিমলা মন্ডল প্রমুখ মহিলার নেতৃত্ব এই আন্দোলনকে পৃথক মাত্রা দিয়েছিল। তেভাগা আন্দোলন মূলত কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত হয়, তাই এই আন্দোলনের কর্মপদ্ধতিটি নির্ধারণ ও পরিচালনার ফলে তারা কৃষক শ্রেণীর কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

 

◾️ গুরুত্ব :– ডি এন ধানগারে তার “প্রেজেন্ট মুভমেন্ট ইন ইন্ডিয়া” গ্রন্থে লিখেছেন – “ভারতের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস এই আন্দোলনে এক অন্য মাত্রায যোগ করেছিল।” এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ব্যাপকভাবে নারীদের নেতৃত্বে সক্রিয়তা লক্ষ্য করা যায়। সাম্প্রদায়িকতার যে কৌশল ব্রিটিশরা এদেশে শাসনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছিল তা এই আন্দোলনকে ব্যর্থ করে দিয়েছিল। এই আন্দোলন জাতি ধর্মের গণ্ডি অতিক্রম করে সমস্ত ধরনের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। যদিও এই আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছিল তাও পরবর্তীকালে ভূমিসত্ত্ব আইন বর্গাদারদের অধিকার জমিদারদের উচ্ছেদের কৌশলে এই আন্দোলনের গুরুত্ব পাওয়া যায়।

 

7. আইন অমান্য আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণীর ভূমিকা লেখো।

উত্তর:  গান্ধীজীর নেতৃত্বে যে সর্বভারতীয় গণ আন্দোলনগুলি পরিচালিত হয় তার মধ্যে অন্যতম ছিল আইন অমান্য আন্দোলন। এই আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণী অংশগ্রহণ করলেও বিশেষ স্থান ও সময় ছাড়া তারা তেমন কোন আগ্রহ দেখায়নি।

 

◾️ শ্রমিকদের ভূমিকা :– ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে গান্ধীজী লবণ আইন ভঙ্গ করে আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা করে। কমিউনিস্ট পার্টির নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আইন অমান্য আন্দোলন সম্পর্কে শ্রমিকরা সম্পূর্ণরূপে উদাসীন থাকতে পারেনি।

 

১) মহারাষ্ট্র :– গান্ধীজীর গ্রেফতারে মহারাষ্ট্রের সোলাপুরে বস্ত্রশিল্পের শ্রমিকরা সোলাপুরের প্রশাসনকে নিশ্চিহ্ন করে সমান্তরাল প্রশাসন গড়ে তোলে।

 

২) বোম্বাই বন্দর :– আইন অমান্য আন্দোলন চলাকালীন সময়ে বোম্বাই বন্দরে শ্রমিক আন্দোলনের ফলে প্রায় ৩০ কোটি টাকা মূল্যের বিদেশি পণ্য বাজারে আটকে পড়ে এবং বোম্বাই-এ ব্রিটিশ পরিচালিত অনেক সুতোকল বন্ধ হয়ে যায়।

 

৩) বাংলা :– বাংলাদেশেও সীমিত শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়। পাটকলের শ্রমিকরা ধর্মঘট শুরু করে, হাওড়া স্টেশনের কুলিরা মাল বওয়া বন্ধ করে দেয়।

 

৪) রেলপথ সত্যাগ্রহ :– আইন অমান্য আন্দোলন শুরুর দিন, অর্থাৎ ৬ এপ্রিল ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাইয়ে জি আই পি রেলওয়ে মেনস্ ইউনিয়নের শ্রমিকরা সত্যাগ্রহ শুরু করে।

 

৫) অন্যান্য স্থান :– এই সময়ে করাচির বন্দর শ্রমিকরা, কলকাতার পরিবহণ ও কারখানার শ্রমিকরা এবং মাদ্রাজের শিল্পশ্রমিকরা ব্রিটিশ-বিরোধী ধর্মঘটে অংশ নেয়।

 

উপসংহার :– পরিশেষে বলা যায় যে, কমিউনিস্টরা জাতীয় আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভারতের সর্বত্র শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত না হলেও কোথাও কোথাও শ্রমিকরা আইন অমান্য আন্দোলনের পূর্ণস্বরাজের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে।

 

8. অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের পর্বে বাংলার শ্রমিক আন্দোলনের পরিচয় দাও।

উত্তর:  ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে বিভিন্ন শিল্প, কারখানা, ট্রাম, রেলওয়ে, চা বাগানের শ্রমিকরা তাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগদান করে, এর ফলে শ্রমিক আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

 

◾️শ্রমিকের দাবি :– এই পর্বের শ্রমিকদের প্রধান দাবি গুলি ছিল– 1. মজুরি বৃদ্ধি করতে হবে  2. কাজের সময় হ্রাস করতে হবে  3. দেশীয় উদ্যোগে শিল্প গড়ে তুলতে হবে  4. ভারতীয়দের হাতে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দান করতে হবে।

 

◾️ নেতৃত্ব :– এই পর্বে শ্রমিক আন্দোলনে যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন – এম. এন. যোশী, বি. পি. ওয়াদিয়া, চিত্তরঞ্জন দাস, সুরেন্দ্রনাথ হালদার, হেমন্ত সরকার, প্রভাত কুসুম রায়চৌধুরী প্রমুখ।

 

◾️ধর্মঘটের ব্যাপকতা :– বাংলার বিভিন্ন ক্ষেত্রে শ্রমিক মজুর ও কুলিরা অসহযোগ আন্দোলনের সময় ধর্মঘট চালায়। ১৯২০–২১ খ্রিস্টাব্দের মধ্য বাংলায় অন্তত ১৩৭টি ধর্মঘট হয়েছিল। আর এই সমস্ত ধর্মঘটের প্রায় ২ লক্ষ ৪৪ হাজার শ্রমিক অংশগ্রহণ করেছিল।

 

◾️বিভিন্ন স্থানে ধর্মঘট :– অসহযোগ আন্দোলন পর্বে ––
(ক) বাংলার পাট, বস্ত্রশিল্প, ওয়ার্কশপ, রেলওয়ে, বন্দর ও ট্রাম শ্রমিকরা ব্যাপকভাবে ধর্মঘট শুরু করে ।
(খ) স্বামী বিশ্বানন্দ ও স্বামী দর্শনানন্দের নেতৃত্বে রানীগঞ্জ, ঝড়িয়া, প্রভৃতি অঞ্চলের খনির শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে দেয় ।
(গ) আসামে রেলওয়ে শ্রমিক ও চা শিল্প শ্রমিকরা ধর্মঘর শুরু করে ।
(ঘ) বোম্বাই কানপুর শোলাপুর প্রভৃতি শহরের শ্রমিক আন্দোলন চলতে থাকে ।

 

উপসংহার :– যদিও গান্ধীজী অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে শ্রমিক ধর্মঘটকে যুক্ত করতে চাননি। তিনি লিখেছিলেন — “ধর্মঘট অহিংস অসহযোগ পরিকল্পনার আওতায় পড়ে না।” তথাপি অহিংস অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন কংগ্রেসী নেতারা শ্রমিক ধর্মঘটের আয়োজন করে। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করা হলে শ্রমিক আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দুটি পৃথক ধারায় পরিণত হলেও, ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে আইন অমান্য আন্দোলনের সময় উভয় ধারার মিলন ঘটে। তবে এই পর্বে শ্রমিক আন্দোলন হিংসাত্মক হয়নি।

 

9. বিংশ শতকে কৃষক আন্দোলনের পরিচয় দাও।

উত্তর: বিশ শতকে ভারতে কৃষক আন্দোলনে জাতীয় রাজনীতির প্রভাব পড়ে। এই সময় ব্রিটিশ বিরোধী বিভিন্ন জাতীয় আন্দোলনে কৃষক শ্রেণী সক্রিয়ভাবে যোগদান করে।

 

১) বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় কৃষক আন্দোলন: কংগ্রেস নেতাদের উদ্যোগের অভাবে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলনের সময় কৃষক শ্রেণী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেনি। কারণ, এদের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির অভাব ছিল। এছাড়াও পূর্ব বঙ্গের কৃষকরা বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করেছিল।

 

২) অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের সময় কৃষক আন্দোলন: অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের সময় গান্ধিজির ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের বহু কৃষক আন্দোলনের শামিল হয়। যেমন–

(ক) বাংলা: বাংলার মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বীরভূম, জলপাইগুড়ি, দিনাজপুর, পাবনা, রংপুর প্রভৃতি অঞ্চলের কৃষকরা আন্দোলনে অংশ নেয়।

(খ) বিহার: বিহারের ভাগলপুর, মুজাফফরপুর, পূর্ণিয়া, মুঙ্গের, দ্বারভাঙ্গা, মধুমনি প্রভৃতি জেলার কৃষকরা আন্দোলনে যোগ দিয়ে জমিদারদের খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দেয় এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

(গ) যুক্তপ্রদেশ: যুক্তপ্রদেশে বাবা রামচন্দ্রের নেতৃত্বে কৃষক আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই রাজ্যের হরদৈ, বারাবাঁকি, প্রতাপগড় সীতাপুর প্রভৃতি জেলার কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে সামিল হয়, যা একা আন্দোলন নামে পরিচিত।

 

৩) আইন অমান্য আন্দোলনের সময় কৃষক আন্দোলন : আইন অমান্য আন্দোলনের সময় বিভিন্ন প্রদেশে কৃষক শ্রেণীর সক্রিয় হয়ে ওঠে।

(ক) উত্তর প্রদেশ :– রাইবেরেলি, আগ্রা, বারাবাঁকি, প্রতাপগড় সহ উত্তরপ্রদেশে বিভিন্ন স্থানে কৃষকদের ব্যাপক অংশগ্রহণের ফলে এখানে আইন অমান্য আন্দোলন গণ আন্দোলনে পরিণত হয়।
(খ) বিহার :– স্বামী সহজানন্দ, যদুনাথ শর্মা প্রমুখের নেতৃত্বে গঠিত কিষান সভা বিহারের কৃষক আন্দোলনে সামিল হয়।
(গ) বাংলা :– বাংলার মেদিনীপুরের কাঁথি, মহিষাদল, আরামবাগ, শ্রীহট্ট প্রভৃতি স্থানের কৃষকরা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে।

 

৪) ভারত ছাড়ো আন্দোলনে কৃষক আন্দোলন : ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় সারাদেশ উত্তাল হয়ে উঠলে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের কৃষকরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। যেমন–

ক) বিহার :– বিহারের ভাগলপুর, মুঙ্গের, মুজাফফরপুর, পূর্ণিয়া, সাঁওতাল পরগনা প্রভৃতি অঞ্চলের অধিবাসী কৃষকরা আন্দোলন শুরু করে। এখানকার ৮০% থানা কৃষকদের দখলে চলে যায়।

খ) গুজরাট :– গুজরাটের সুরাট, ব্রোচ, খান্দেশ প্রভৃতি অঞ্চলে কৃষকরা রেল অবরোধ ও সরকারি দপ্তর আক্রমণ করে।

গ) বাংলা :– ভারত ছাড়ো আন্দোলনের পর্বে মেদিনীপুর, দিনাজপুর, বালুরঘাট প্রভৃতি অঞ্চলের কৃষকরা খাজনা দেওয়া বন্ধ করে আন্দোলনে সামিল হয় ।

◾️উপসংহার :- বিশ শতকের কৃষক আন্দোলন যথেষ্ট সক্রিয় হলেও ভারতের সর্বত্র এই আন্দোলনে কৃষকদের শামিল করা যায়নি। কোনো কোনো কংগ্রেস নেতা কৃষকদের খাজনা বন্ধের আন্দোলনে শামিল করে জমিদারদের ক্ষিপ্ত করতে চাননি। ফলে সর্বক্ষেত্রে কৃষক আন্দোলন সমান গতিতে এগোতে পারেনি।

 

10. টীকা লেখো : বারদৌলি সত্যাগ্রহ।

উত্তর: গুজরাটের সুরাট জেলার বারদৌলি তালুকের কৃষকরা ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করে, যা বারদৌলি সত্যাগ্রহ নামে পরিচিত।

 

◾️কৃষকদের অবস্থা :– গুজরাটের সুরাট জেলার বারদৌলি তালুকের ৬০% মানুষ ছিল নিম্ন বর্ণের কালিপরাজ শ্রেণীভুক্ত। তাদের বেশিরভাগ ছিল ভূমিহীন, ক্ষেতমজুর বা ভাগচাষি। হালি প্রথা অনুসারে তারা বংশানুক্রমে উচ্চবর্ণের জমি মালিকের অধীনে কাজ করত। এই কালিপরাজ কৃষকরা উচ্চবর্ণের উজলিপরাজ জনগোষ্ঠীর দ্বারা শাসিত, শোষিত, নিপীড়িত এবং অবজ্ঞার শিকার হতো।

 

◾️বারদৌলি সত্যাগ্রহ আন্দোলনের কারণ :– বিভিন্ন কারণে বারদৌলি সত্যাগ্রহ আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়।

১) দুর্ভিক্ষ :– ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে বারদৌলির তালুকে বন্যাজনিত কারণে ফসল নষ্ট হলে কৃষকদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে ওঠে।

২) খাজনা বৃদ্ধি :– কৃষকদের শোচনীয় অবস্থা সত্ত্বেও সরকার ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে খাজনার হার প্রথমে ৩০% এবং পরে তা পরিবর্তন করে ২১.৯৭% পার্সেন্ট করলে কৃষকরা প্রতিবাদে সোচ্চার হয়।

৩) খাজনা আদায়ের নির্যাতন :– শুধু খাজনা বৃদ্ধি করেই নয়, খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রেও চরমনির্যাতন শুরু হলে কৃষকরা আন্দোলনের পথে পা বাড়ায়।

 

৪) নেতৃত্ব দান :– এই সময় কল্যাণজী মেহতা ও কুনবের মেহতা নামে দুই ভাই বল্লভ ভাই প্যাটেলকে আন্দোলনে নেতৃত্ব দানের অনুরোধ জানান। এছাড়াও নরহরি পারিক, রবিশঙ্কর ব্যাস, মোহনলান পান্ডে প্রমুখ আন্দোলন গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

 

৫) নারীদের অংশগ্রহণ :– প্যাটেলের আহবানে বহু নারী, যেমন- মিঠুবেন প্যাটেল, মুনিবেন প্যাটেল, সারদা মেহতা, ভক্তি বাই প্রমুখ এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। মহিলারাই প্যাটেলকে সর্দার উপাধি দান করেন।

 

◾️প্রভাব :– আন্দোলনের প্রসার ও তীব্রতা দেখে শেষ পর্যন্ত সরকার নিযুক্ত একটি কমিটি ৬.০৩% খাজনা বৃদ্ধির অনুমোদন করলে কৃষকরা তা দিতে রাজি হয়।

 

◾️উপসংহার :– বারদৌলির কৃষকদের শক্তিশালী আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত ইংরেজ সরকার হার মানতে বাধ্য হয়। আন্দোলনের চাপে ব্লুমফিল্ড ম্যাক্সওয়েল নামে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করলে, এই কমিশন বর্ধিত রাজস্বের হার কমাতে বাধ্য হয়।

11. অসহযোগ আন্দোলনের পর ভারতের কৃষক আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।  ০৪

উত্তর: ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে অসহযোগ আন্দোলন বন্ধ হওয়ার পর কৃষক আন্দোলনে কিছুটা ভাঁটা পড়লেও তা একেবারে নিস্তেজ হয়ে যায়নি। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে বাংলা, বিহার, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, দক্ষিণ ভারত প্রভৃতি অঞ্চলে কৃষক আন্দোলনগুলি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

 

(a) স্বরাজ্য দল :– চৌরিচৌরা ঘটনাকে কেন্দ্র করে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করা হলে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্ব গড়ে ওঠে ‘স্বরাজ্য দল’। এই পর্বে কৃষক আন্দোলনগুলি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়ে। এই পর্বের নেতৃবৃন্দ কৃষকদের সংগঠিত করতে কিংবা তাদের স্বার্থে দাবি আদায়ে ব্যর্থ হন।
(b) কৃষক প্রজা পার্টি :– ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ‘বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ত্ব আইন’কে কেন্দ্র করে ফজলুল হক, আবদুর রহিম ও আক্রম খাঁ প্রমুখের নেতৃত্বে বাংলায় গড়ে ওঠে ‘কৃষক প্রজা পার্টি’। মুসলিম কৃষকদের ওপর এই দলের প্রভাব ছিল লক্ষণীয়।

 

(a) কৃষক প্রজা পার্টি :– ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে শ্রীকৃষ্ণ সিংহ, রাহুল সংকৃত্যায়ণ, কারিয়ানন্দ শর্মা প্রমুখের সহযোগিতায় স্বামী সহজানন্দ সরস্বতী বিহারে গড়ে তোলেন ‘প্রজা পার্টি’। পরে এর নাম হয় ‘কৃষক প্রজা পার্টি’। এর মাধ্যমে বিহারের ভাগলপুর, দ্বারভাঙ্গা পুর্ণিয়া, মুঙ্গের প্রভৃতি অঞ্চলে কৃষক আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বিহারের জমিদারদের জুলুম ও বাড়তি খাজনা ইত্যাদি ছিল কৃষক আন্দোলনের কারণ।

(a) ইউনিয়ানিস্ট দল :– ফজল-ই-হুসেন-এর নেতৃত্বে পাঞ্জাবে গড়ে ওঠে ‘ইউনিয়ানিস্ট দল’। মহাজনি শোষণের হাত থেকে দরিদ্র কৃষকদের রক্ষার জন্যই এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
(b) পাঞ্জাব রিয়াস্তি প্রজামণ্ডল :– ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে আকালি নেতা খড়ক সিং-এর নেতৃত্বে ও জাগির সিং ও মাস্টার হরি সিং-এর সহযোগিতায় গড়ে ওঠে ‘পাঞ্জাব রিয়াস্তি প্রজামণ্ডল’। পাতিয়ালার মহারাজার শিকারের জন্য সংরক্ষিত বনভূমির বণ্যপ্রাণীর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের রক্ষা করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।

 

(a) উত্তরপ্রদেশ কিষাণ সভা :– ‘উত্তরপ্রদেশ কিষাণ সভা’ জমিদার ও সরকারের রাজস্ব নীতির তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদ জানালে বাধ্য হয়ে সরকার ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন করে জমিদারদের একচেটিয়া অধিকার খর্ব করে।

 

(a) অন্ধ্রের কংগ্রেস নেতা অধ্যাপক এন জি রঙ্গ কৃষকদের স্বার্থে গুন্টুরে একটি কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলেন।
(b) কৃয়া-গোদাবরী অঞ্চলের কৃষকরা রাজস্ব বৃদ্ধির প্রতিবাদে টি প্রকাশম, দণ্ড নারায়ণ রাজু, কোন্ডা ভেঙ্কটাপ্পায়া প্রমুখের নেতৃত্বে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে এই অঞ্চলে কৃষক আন্দোলন গড়ে ওঠে।
(c)
 হায়দ্রাবাদে স্বামী রামানন্দ তীর্থের নেতৃত্বে সেখানে একটি শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে ওঠে।

   এভাবে অসহযোগ আন্দোলনের পর ১৯২২-২৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে কৃষক আন্দোলন সংগঠিত হয়।

 

12. বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণির ভূমিকা সংক্ষেপে লেখো।

উত্তর: সাম্রাজ্যবাদী শাসক লর্ড কার্জন ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করলে বাংলা তথা সমগ্র দেশে এর বিরুদ্ধে শুরু হয় ‘বয়কট’ ও ‘স্বদেশি’ আন্দোলন। এই আন্দোলনে ভারতের শ্রমিকশ্রেণি স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগদান করে। ফলে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে।

 

শ্রমিক আন্দোলনের কারণ :– ঐতিহাসিক সুমিত সরকার, বিপানচন্দ্র, অমলেশ ত্রিপাঠী প্রমুখ বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে শ্রমিকদের যোগদানের কতকগুলি কারণ তুলে ধরেছেন। তাঁরা বলেন, স্বল্প মজুরি, দিনে ১৪ ঘণ্টার বেশি কাজে বাধ্য করা, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, জাতিগত অসম্মান, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব ইত্যাদি শ্রমিকদের ক্ষুব্ধ করে। তা ছাড়া, জাতীয়তাবাদী নেতাদের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের আর্থিক ও সামাজিক দাবির প্রতি সমর্থন, শোষণমুক্তির আশ্বাস শ্রমিকদের আন্দোলনে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করে।

 

নেতৃবৃন্দ :– এই সময় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যাঁরা শ্রমিকদের আন্দোলনে উৎসাহিত করেছিলেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা ছিলেন অশ্বিনীকুমার ব্যানার্জী, অপূর্বকুমার ঘোষ, চিত্তরঞ্জন দাশ, বিপিনচন্দ্র পাল, প্রেমতোষ বসু, শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী প্রমুখ।

 

বিভিন্ন ধর্মঘট :– এই সময় বাংলা, বিহার, তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র প্রভৃতি প্রদেশে বহু শ্রমিক ধর্মঘট শুরু হয়। এক্ষেত্রে কলকাতার বিভিন্ন কারখানা, ছাপাখানা, চটকল, রেলওয়ে প্রভৃতি ক্ষেত্রে কর্মবিরতি ট্রাক শ্রমিকদের ধর্মঘট, হাওড়ার বার্ণ কোম্পানির ধর্মঘট, বাউড়িয়ার জুটমিল ধর্মঘট, কলকাতা ও খিদিরপুরের বন্দর শ্রমিকদের ধর্মঘট, বোম্বাই-এর বস্ত্রশিল্প শ্রমিকদের ধর্মঘট, তামিলনাড়ুর তুতিকোরিনে বস্ত্রশিল্পে শ্রমিকদের ধর্মঘট প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

 

বয়কট আন্দোলনে শ্রমিকরা :– ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলে শ্রমিক-মজুররা যেমন‐ ধোপা, নাপিত, মুচি, রাঁধুনি প্রমুখরা শাসক ইংরেজদের সঙ্গে অসহযোগিতা শুরু করে

 

ব্যর্থতার কারণ :– স্বদেশি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাংলা তথা ভারতের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে উঠলেও নানা কারণে তা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির অভাব, সর্বভারতীয় নেতৃত্বের অভাব, সরকারের চরম দমনপীড়ন এক্ষেত্রে দায়ী ছিল।

 

গুরুত্ব :– ব্যর্থতা সত্ত্বেও এই পর্যায়ের শ্রমিক আন্দোলন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গণআন্দোলনের শক্তি অর্জন করে। সরকার শ্রমিকদের সন্তুষ্ট করার জন্য ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে ‘ফ্যাক্টরি আইন’ পাশ করে।

 

দশম শ্রেণি ইতিহাস ষষ্ঠ অধ্যায়

৮ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর 

Madhyamik Class 10 History 6th Chapter

8 Marks Question Answer

 

1. বিশ শতকে ভারতে উপনিবেশিক বিরোধী আন্দোলনে বামপন্থীদের ভূমিকা আলোচনা করো।  ০৮

উত্তর: বিশ শতকে ভারতের সাম্যবাদ ও উপনিবেশিক বিরোধী আন্দোলনে বামপন্থীদের ভূমিকা ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় সাম্যবাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে, ভারতের জাতীয়তাবাদী ও শ্রমিক শ্রেণীর নেতারা এই সাম্যবাদী আদর্শের দ্বারা প্রভাবিত হয়। ফলে বামপন্থী দলগুলির প্রচেষ্টায় শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণি জাতীয় আন্দোলনের মূলধারায় যুক্ত হয়।

 

কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা :– ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে ১৭ অক্টোবর মানবেন্দ্রনাথ রায়ের নেতৃত্বে রাশিয়ার তাসখন্ডে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে কমিউনিস্ট ইন্টারনাল বা কমিন্টার্ন কর্তৃক এই দল স্বীকৃতি লাভ করে।

 

ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা :– ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে কানপুরে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের কমিউনিস্টরা মিলিত হয়ে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। এর সভাপতি ছিলেন সিঙ্গারভেল্লু চেট্টিয়া।

 

অসহযোগ আন্দোলনের ব্যর্থতায় বামপন্থীর প্রসার :– প্রবাসী ভারতীয়দের উদ্যোগে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে কলকাতা, লাহোর, বোম্বাই প্রভৃতি অঞ্চলে কমিউনিস্ট গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। এই সময় গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করলে বামপন্থীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে।

 

সাইমন কমিশনের বিরোধিতা :– ভারতে শাসন সংস্কারের জন্য সাইমন কমিশন ভারতে এলে বামপন্থীদের উদ্যোগে শ্রমিকরা এক সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তোলে। এই সময় দুই বামপন্থী কংগ্রেস নেতা জহরলাল নেহেরু ও সুভাষচন্দ্র বসুর উদ্যোগে গঠিত হয় “Indian Independence League”.

 

মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা :– ঔপনিবেশিক সরকার কমিউনিস্ট দলকে দমন করার জন্য ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ৩২ জন কমিউনিস্ট নেতাকে গ্রেফতার করে এক মামলা শুরু করে, যা মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা নামে পরিচিত। এই মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে ছিলেন মুজাফফর আহমেদ, কিশোরী লাল ঘোষ, এস. এ. ডাঙ্গে প্রমুখ।

 

পূর্ণ স্বরাজ দাবি :– প্রথম থেকেই কমিউনিস্ট দলের সদস্যরা কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন গুলিতে পূর্ণ স্বরাজের দাবি জানাই। পরে ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে লাহোর কংগ্রেসের অধিবেশনে এই দাবি মান্যতা পায়।

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও বামপন্থী আন্দোলন :– দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ভারতে অভূতপূর্ব গণআন্দোলন শুরু হয়, যেমন – তেভাগা আন্দোলন, পুন্নাপ্রা ভায়লার আন্দোলন, রশিদ আলী দিবস পালন ইত্যাদি ক্ষেত্রের কমিউনিস্ট পার্টির বিশেষ ভূমিকা দেখা যায়। এছাড়া তেলেঙ্গানা কৃষক বিদ্রোহের ক্ষেত্রেও এই পার্টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 

মূল্যায়ন :– বাংলায় কমিউনিস্ট আন্দোলন ছিল ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভিত্তির রূপকার। বিশ শতকে উপনিবেশিক বিরোধী আন্দোলনে বামপন্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তারা নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়নি। তবে প্রথম থেকেই সরকার কমিউনিস্ট ভাবধারায় সজাগ ও সচেষ্ট ছিল। নানা রকম দমন নীতি প্রয়োগ করে বামপন্থী ধ্বংসের প্রচেষ্টা চালানো হয়। তার সঙ্গে জাতীয় কংগ্রেসের ব্যাপক প্রভাবের ফলে কমিউনিস্টে পার্টির র প্রভাব মিলিত হয়।

 

আজকের পোস্টে দশম শ্রেণী ইতিহাসের ষষ্ঠ অধ্যায় ‘বিশ শতকের ভারতে কৃষক, শ্রমিক ও বামপন্থী আন্দোলন’ থেকে ২/৪/৮ মার্কস এর বাছাই করা প্রশ্ন উত্তর শেয়ার করা হল যেগুলি   পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিশেষ ভাবে সহায়তা করবে।  

SOURCE-EDT

 ©kamaleshforeducation.in(2023)

error: Content is protected !!
Scroll to Top