বিকল্প চিন্তা ও উদ্যোগ প্রশ্ন উত্তর

(২/৪/৮ মার্কস)

Class 10 History Chapter 5

Long Question Answer

Published on:  

মাধ্যমিক ইতিহাসের পঞ্চম অধ্যায় বিকল্প চিন্তা  উদ্যোগ (History Chapter 5) এর মধ্যে উনিশ শতকের বাংলায় ছাপাখানার বিকাশ, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতন বা বিশ্বভারতী ভাবনার মতো দারুণ সব ঐতিহাসিক উদ্যোগ নিয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। আজকের পোস্টে এই চ্যাপ্টার থেকে বাছাই করা ২, ৪ এবং ৮ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তরগুলো শেয়ার করা হল।

 

বোর্ড: বিষয়বস্তু

1 মাধ্যমিক ইতিহাস পঞ্চম অধ্যায় ‘বিকল্প চিন্তা ও উদ্যোগ বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা’ বড় প্রশ্ন ও উত্তর (২/৪/৮ মার্কস) Madhyamik History Chapter 5 Question Answer

1.1 দশম শ্রেণির ইতিহাস পঞ্চম অধ্যায় (বিকল্প চিন্তা ও উদ্যোগ) 2 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | Class 10 History Chapter 5 2 Marks Question Answer

1.2 মাধ্যমিক ক্লাস 10 ইতিহাস পঞ্চম অধ্যায় 4 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | Madhyamik Class 10 History Chapter 5 4 Marks Question Answer

1.3 দশম শ্রেণি ইতিহাস পঞ্চম অধ্যায় ৮ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | Madhyamik Class 10 History 5th Chapter 8 Marks Question Answer

মাধ্যমিক ইতিহাস পঞ্চম অধ্যায়

‘বিকল্প চিন্তা ও উদ্যোগ বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা’

বড় প্রশ্ন ও উত্তর (২/৪/৮ মার্কস)

Madhyamik History Chapter 5 Question Answer

 

দশম শ্রেণির ইতিহাস পঞ্চম অধ্যায়

(বিকল্প চিন্তা ও উদ্যোগ)

2 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর  

 

উত্তর: বাংলা চলনশীল’ বা ‘Movable’ বাংলা হরফ নিমার্তা প্রাচ্যবাদী পন্ডিত চার্লস উইলকিনসকে বাংলার গুটেনবার্গ’ বলা হয়।

■ কারণ :– ১৪৫৫ খ্রী. জার্মানির গুটেনবার্গ ‘চলনশীল’ বা ‘Movable’ মুদ্রাক্ষর তৈরি করে ইউরোপের মুদ্রণ ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন। * অনুরূপভাবে, চার্লস উইলকিনসও ভারতে চলনশীল বাংলা হরফ বা মুদ্রাক্ষর তৈরি করে বাংলা ভাষার বিকাশে অনবদ্য অবদান রাখেন। তাই তাঁকে বাংলার গুটেনবার্গ’ বলা হয়।

 

উত্তর: বাংলা মুদ্রাক্ষর তৈরির ক্ষেত্রে যাঁদের অবদান চিরস্মরণযোগ্য, হুগলির স্বর্নশিল্পী পঞ্চানন কর্মকার তাঁদের মধ্যে ছিলেন অন্যতম।

■ উন্নত বাংলা হরফ নির্মানেরর রূপকার :– তিনি চার্লস উইলকিনস-এর তত্ত্বাবধানে পেশাগত কাজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ছেনি দিয়ে কাটা উন্নত বাংলা হরফ তৈরি করেন।

■ বিভিন্ন গ্রন্থ প্রকাশ :– ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেডের, বাংলা ব্যাকরণ”  “কর্নওয়ালিস কোড” ইত্যাদি গ্রন্থ তাঁর তৈরি উন্নত হরফে মুদ্রিত হয়। তাঁর প্রচেষ্টায় বাংলা হরফ নির্মাণ একটি স্থায়ী শিল্পে পরিণত হয় এবং ছাপাশিল্পের ব্যবসায়িক বিকাশ ঘটতে থাকে।

উত্তর: জাইলোগ্রাফি :– কাঠ বা পাথরের ব্লকের দ্বারা তৈরি মুদ্রণ ব্যবস্থাকে বলা হয় জাইলোগ্রাফি। অষ্টম শতকে চিনে এই পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়। এর ফলে মুদ্রন ব্যবসায় বিশেষ পরিবর্তন আসে।

উত্তর: লাইনো টাইপ :– সুরেশচন্দ্র মজুমদার দ্বারা তৈরি এক ধরনের উন্নত টাইপ লাইনো টাইপ’ নামে পরিচিত। এর দ্বারা বাংলা মুদ্রন ব্যবস্থা আরও উন্নত হয়।

 

উত্তর: বাংলার মুদ্রণ শিল্পের বিকাশে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস এর গুরুত্ব অপরিসীম ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের ১০ জানুয়ারি উইলিয়াম কেরি, মার্শম্যান ও ওয়ার্ডের প্রচেষ্টায় এই ছাপাখানা গড়ে ওঠে।

ক) অনুবাদ প্রকাশনা :– এই ছাপাখানা থেকে ২৬ টি ভাষায় বাইবেলের অনুবাদ প্রকাশ ছাড়াও রামায়ণ, মহাভারত, হিতোপদেশ, বহু গবেষণামূলক গ্রন্থ ইত্যাদি ছাপা হয়।

খ) পত্র-পত্রিকা :– এখান থেকেই বিভিন্ন পত্রিকা, যেমন – দিগদর্শন, সমাচার দর্পণ, ফ্রেন্ড অফ ইন্ডিয়া, প্রকাশিত হয়।

গ) পাঠ্যপুস্তক :– ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক, যেমন – পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, ভূগোল, জ্যোতির্বিদ্যা, শারীরবিদ্যা ইত্যাদি এখানে ছাপানো হয়।

■ গুরুত্ব :– এশিয়ার বৃহত্তম এই ছাপাখানার হাত ধরে বাংলা তথা ভারতের শিক্ষা সংস্কৃতির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়

 

উত্তর: বাংলা ছাপাখানা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে গঙ্গা কিশোর ভট্টাচার্য এক স্মরণীয় নাম। তিনি ছিলেন প্রথম বাঙালি প্রকাশক ও পুস্তক বিক্রেতা। শ্রীরামপুর মিশন ছাপাখানার একজন কম্পোজিটর রূপে কর্মজীবন শুরু করেন। নানা কারণে তিনি সেখান থেকে কলকাতায় চলে আসেন।

■ বাঙ্গাল গেজেটি প্রেস স্থাপন :– 1818 খ্রিস্টাব্দে হরচন্দ্র রায়ের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি বাঙাল গেজেটি প্রেস স্থাপন করেন এখান থেকেই তিনি বাঙ্গাল গেজেটি নামক একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। প্রথম সচিত্র বাংলা বই ভারতচন্দ্রের  অন্নদামঙ্গল তিনি প্রকাশ করেন। মুদ্রণ ব্যবসায়ী, প্রকাশক ও পুস্তক বিক্রেতা রূপে গঙ্গা কিশোর ভট্টাচার্য স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন।

 

উত্তর: ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি সোসাইটির তিনজন সদস্য উইলিয়াম কেরি, মার্শম্যান ও উইলিয়াম ওয়ার্ড একত্রে শ্রীরামপুর ত্রয়ী নামে পরিচিত।

■ শ্রীরামপুর মিশন ও ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা :– তাদের প্রচেষ্টায় ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুরে একটি ব্যাপ্টিস্ট মিশন ও একটি ছাপাখানা নির্মিত হয়। ফলে এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রণশিল্পেও জোয়ার আসে। বাংলা তথা ভারতের নবজাগরণের পটভূমি তৈরিতে শ্রীরামপুর ত্রয়ীর অবদান অনস্বীকার্য।

 

উত্তর: ছাপাখানার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা প্রসারের সম্পর্ক অতি নিবিড়। ইংরেজি শাসিত ভারতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। অতঃপর শিক্ষার প্রসার ও ছাপাখানার বিস্তার একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে।

■ গুরুত্ব :–  

ক) শিক্ষার বিস্তার :– অল্প সময়ে, স্বল্প দামে, ছাপা বই শিক্ষা বিস্তারে সহায়তা করে।
খ) মাতৃভাষার প্রসার :– বাংলা ভাষার বই ছাপা হলে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার বিস্তার ঘটে।
গ) নতুন পেশার উদ্ভব :– ছাপাখানাকে কেন্দ্র করে নতুন পেশার, যেমন – কাগজ বিক্রি, বই বাঁধায়, বই ছাপানো, বই বিক্রি ইত্যাদির উদ্ভব ঘটে।
ঘ) সাহিত্যের উন্নতি :– সমাজ ও ধর্ম সংস্কারের সমর্থনে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও সাহিত্যের উদ্ভব ঘটে।

 

 উত্তর: ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দের ৮ জুলাই মহাত্মা ডেভিড হেয়ার ‘ক্যালকাটা স্কুলবুক সোসাইটি স্থাপন করেন। 

 ■ উদ্দেশ্য :– ক) ইংরেজি ও ভারতীয় ভাষায় পুস্তক রচনা, প্রকাশ ও স্বল্প মূল্যে বিতরণ করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
খ) মূলত পাঠ্যপুস্তক ছাপা, শিশু ও শিক্ষার্থীদের কাছে তা পৌঁছে দেওয়াই ছিল এই সোসাইটির উদ্দেশ্য।

 

উত্তর: বাংলার মুদ্রণের ইতিহাসে বটতলা প্রকাশনার গুরুত্ব বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ শোভাবাজারে এর সূত্রপাত ঘটলেও অচিরেই তা দরজিটোলা, কুমারটুলি, আহিরীটোলা, চোরবাগান, জোড়াসাঁকো প্রভৃতি অঞ্চলে বহু ছাপাখানা গড়ে ওঠে। * ১৮৪০-৭০ খ্রিঃ পর্যন্ত সময়কালকে সুকুমার সেন বটতলা ছাপাখানার স্বর্ণযুগ’ বলে অভিহিত করেন।

■ প্রকাশিত গ্রন্থ :– এখানকার ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হত ধর্ম, আইন, নীতিকথা, পাঁচালি, গোপাল ভাঁড় জাতীয় গ্রন্থ, অনুবাদ সাহিত্য, আদিরসাত্মক, কুরুচিপূর্ণ ও ‘অশ্লীল’ অভিধা যুক্ত বহু গ্রন্থ। * হ্যান্ডমেড পেপারের ব্যবহার এবং স্বদেশি কারিগরির মুন্সিয়ানা ইত্যাদির জন্য ‘বটতলা প্রকাশনা’য় প্রকাশিত এই বই-এর দাম সস্তা হওয়ায় বিপুলভাবে এর চাহিদা বৃদ্ধি পায়। উনিশ শতকে শিক্ষার বিস্তারে, বটতলা প্রকাশনার গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

 

 উত্তর: ব্যবসায়িক ভিত্তিতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার কারণ হলো –

 (ক) পেশা হিসাবে :– একাধিক কারণে ব্যবসায়িক ভিত্তিতে ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে উনিশ শতকে বহু ছাপাখানা গড়ে ওঠে। এই সময় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে পাঠ্যপুস্তকের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। একশ্রেণীর শিক্ষিত বাঙালি ছাপাখানার ব্যবসাকে পেশা বা জীবিকা হিসাবে গ্রহণ করে।

 (খ) কল্যাণ সাধনে :– জীবিকা অর্জনের পাশাপাশি শিক্ষাদরদী হয়ে ওঠার কারণে অনেকে ছাপাখানা স্থাপনে উদ্যোগী হন। এক্ষেত্রে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মদনমোহন তর্কালঙ্কার, গঙ্গা কিশোর ভট্টাচার্য প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

 

 উত্তর: ছাপাখানার অগ্রগতির ফলে শিশু-শিক্ষারও বিশেষ অগ্রগতি ঘটে। অল্প দামে সেগুলি বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লে শিশু শিক্ষারও প্রসার ঘটে।   মদনমোহন তর্কালংকারের শিশু শিক্ষা” (১৮৪৯ খ্রি.) গ্রন্থ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয়’ (১৮৫৫ খ্রি.), রামসুন্দর বসাক রচিত ‘বাল্য শিক্ষা’ (১৮৭৭ খ্রি.) গোবিন্দ প্রসাদ দাসের ‘ব্যকরণ সার’ (১৮৫৯ খ্রি.), প্রাণলাল চক্রবর্তীর অঙ্কবোধ’ (১৮৬৬ খ্রি.), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহজপাঠ’, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরির টুনটুনির বই’, ‘ছোটোদের রামায়ন’, ‘ছোটোদের মহাভারত’ প্রভৃতি গ্রন্থ শিশু-শিক্ষার অগ্রগতিতে বিশেষ সহায়তা করে।

 

উত্তর: উনিশ শতকে বাংলায় ছাপাখানার বিকাশে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের (১৮২০-৯০ খ্রি.) ভূমিকা বিশেষ স্মরনীয়। সংস্কৃতে সুপন্ডিত ও সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ এই মহান ব্যাক্তির ঐকান্তিক প্রয়াসে ছাপাখানার বিশেষ অগ্রগতি ঘটে।   ১৮৪৭ খ্রি. সহপাঠী মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সহায়তায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘সংস্কৃত মন্ত্র’ নামে একটি ছাপাখানা। এখান থেকেই শিশু-শিক্ষা বিষয়ক বহু বর্ণপরিচয়-এর প্রথমভাগ ও দ্বিতীয়ভাগ প্রকাশিত হয়।

 

উত্তর: ভারতে কারিগরি শিক্ষার ইতিহাসে শিবচন্দ্র নন্দীর নাম চিরস্মরণীয়। কোনোরকম প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াই তিনি দীর্ঘদিন ধরে টেলিগ্রাম ব্যবস্থা পরিচালনা করেন।    ইংরেজদের অধীনে আলিপুর টাঁকশালের এই কর্মীর প্রচেষ্টায় ১৮৫২ খ্রি. কলকাতার থেকে ডায়মন্ডহারবার পর্যন্ত বাণিজ্যিকভাবে টেলি যোগাযোগ চালু হয়। তাই তাঁকে ভারতের প্রথম ইলেকট্রিক্যাল ও টেলিকম ইঞ্জিনিয়ার বলা হয়।

 

উত্তর: বাংলায় বিজ্ঞান চর্চা ও কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন, শিক্ষা দরদী ও বিশিষ্ট আইনজীবী তারকনাথ পালিত তাদের মধ্যে অন্যতম।

■ কৃতিত্ব :– তারকনাথ পালিত ও স্যার রাসবিহারী ঘোষের অর্থ ও জমিদানের ফলে ১৯৪১ খ্রী. গড়ে ওঠে কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ’। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বালিগঞ্জ ক্যাম্পাসটি তাই তারকনাথ পালিত শিক্ষা প্রাঙ্গণ’ নামেই পরিচিত।

 

উত্তর: বিজ্ঞানকে মানবকল্যানে যে সমস্ত বিজ্ঞানী ব্যবহার করেছেন বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

■ আবিষ্কার :– তিনি ছিলেন ‘রিলেটিভিটি প্রেসার অফ লাইট’, ‘অ্যাস্ট্রো ফিজিক্স’, ‘বিকিরণের চাপ’, ‘বিদ্যুৎ চুম্বকত্ব’, ‘তাপীয় আয়রণ তত্ত্ব’ ইত্যাদির উদ্ভাবক।  

■ প্রতিষ্ঠান :– তাঁরই আন্তরিক প্রচেষ্টায় ‘ইন্সটিটিউট অফ ফিজিক্স’, ‘ইউ পি অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স’ প্রভৃতি সংস্থা গড়ে ওঠে।

 

উত্তর: রাজা রামমোহন রায় ১৮২৩ খ্রী.বড়োলাট লর্ড আমহার্স্টকে একটি চিঠি দেন।  তিনি পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তার বিশেষত অঙ্ক, রসায়ন, অ্যানাটমি প্রভৃতি বিজ্ঞান শিক্ষার বিস্তারে তাঁকে অনুরোধ জানান। তিনি মনে করতেন পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারের মাধ্যমে ভারতবাসীর সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব।

 

উত্তর: টমাস ব্যারিংটন মেকলে ছিলেন শিক্ষার চুঁইয়ে পড়া নীতির প্রবক্তা। তিনি ছিলেন ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের আইন সচিব ও কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশনের সভাপতি।

  ভারতের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রসার না ঘটিয়ে কেবলমাত্র উচ্চ ও মধ্যবিত্ত মানুষের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটানো এবং তারপর তাদের মাধ্যমে ভারতের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার ঘটানোর নীতিই হল শিক্ষার চুইয়ে পড়া নীতি’ বা ‘ফিলট্রেশন থীওরি।

 

■ উদ্দেশ্য :– একদিকে সরকারের ব্যয় সহকোচন অপরদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারে, এই দুই দিক রক্ষা করার জন্য বেন্টিঙ্ক এই নীতি গ্রহণ করেন।

 

উত্তর: বাংলা সরকারের চিফ সেক্রেটারি কার্লাইল বয়কট’ ও ‘স্বদেশি’ আন্দোলনে ছাত্রদের ভূমিকা দেখে আতঙ্কিত হন। ছাত্রদের দমনের জন্য ও স্বদেশি আন্দোলন থেকে তাদের দূরে সরিয়ে রাখার জন্য তিনি ১৯০৫ খ্রী. ১০ অক্টোবর একটি সার্কুলার জারি করেন। এটি কার্লাইল সার্কুলার’ নামে পরিচিত। ছাত্রদের রাজনৈতিক সভা সমিতি ও পিকেটিং থেকে নিবৃত্ত করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।

 

উত্তর: ১৯০৫ খ্রী. ৪ নভেম্বর ছাত্রনেতা শচীন্দ্র কুমার বসু ও ব্রাহ্মনেতা কৃষ্ণকুমার মিত্রের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটি।

■ উদ্দেশ্য :– বঙ্গ-ভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে যোগদানের অপরাধে কার্লাইল সার্কুলারে যে সমস্ত ছাত্রদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল তাদের শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।

 

উত্তর: উদ্দেশ্য :— বিভিন্ন কারণে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ই মার্চ গড়ে ওঠে ভারতীয় শিক্ষা পরিষদ। যেমন –

 (ক) বিদেশি শিক্ষা সংস্কৃতি বর্জন করে জাতীয় আদর্শ অনুসারে সাহিত্য, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষাদান করা

 (খ) শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা দান করা ও দেশসেবার মনোভাব জাগিয়ে তোলা

 (গ) ব্রিটিশ শিক্ষানীতির সমালোচনা করা 

(ঘ) মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার প্রসার ঘটানো

 (ঙ) কার্লাইল সার্কুলার ও বিশ্ববিদ্যালয় আইনের বিরোধিতা করা ইত্যাদি ছিল এর উদ্দেশ্য।

 

উত্তর: বিপুল আশা-আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠিত হলেও নানা কারণে তা ব্যর্থ হয়। যেমন –

 (ক) এই প্রতিষ্ঠানের প্রদত্ত ডিগ্রি গুরুত্বহীন হওয়ায় অভিভাবকেরা সরকারের শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হয়। 

(খ) স্বল্প বেতনের জন্য বহু শিক্ষক এই প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করে। 

(গ) অর্থ সংকট, সরকারি বাধা, কলকাতাকা কেন্দ্রিকতা, চরমপন্থী কর্তৃক এই পরিষদকে স্বীকৃতি দান না করা ইত্যাদি এর পতন ত্বরান্বিত করে।

 

উত্তর: ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ২৫ শে জুলাই তারকনাথ পালিত-র উদ্যোগে ৯২ আপার সার্কুলার রোডে স্থাপিত হয়েছিল বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট’  ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি জনিত কারণে ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে এটি যাদবপুরে স্থানান্তরিত হয় এবং ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে এর নতুন নাম হয় ‘কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি’।   ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে এটি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে পরিচিত হয়। এখান থেকে পাস করে বহু বাঙালি বাংলায় বহু কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে।

 

উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রাচীন ভারতের তপোবন কেন্দ্রিক শিক্ষার অনুকরণে শান্তিনিকেতনে ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম বা পাঠ ভবন’ বিদ্যালয়টি স্থাপন করেন।

■ উদ্দেশ্য :– এর উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃতি, মানুষ ও শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় সাধন করা এবং গুরু শিক্ষা সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করা ইত্যাদি।

 

 উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেশের প্রচলিত ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে সানন্দ চিত্তে গ্রহণ করতে পারেননি। এতে হৃদয়ের কামনীয় বৃত্তির উন্মোচন ও মানবতাবাদের জাগরণ ইত্যাদি ঘটানোর ব্যবস্থা ছিল না। তাই তিনি এর বিকল্প ব্যবস্থা রূপে ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের ২২ ডিসেম্বর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলেন।

 

■ উদ্দেশ্য :– বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল 

(ক) প্রাচ্যের আদর্শ ও বাণীকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরে পাচ্য-পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সমন্বয় সাধন করা।

 (খ) প্রাচীন ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয় সাধন করা। 

(গ)  মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটানো।

 (ঘ) শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয়ে ব্যবহারিক বিদ্যা শিক্ষা দান করা। (ঙ) প্রকৃতি, মানুষ ও শিক্ষার সমন্বয় সাধন প্রদান করা।

 (চ) একে বিশ্ব মানবতার মিলনক্ষেত্রে ইত্যাদি রূপে গড়ে তোলাই ছিল এর উদ্দেশ্য।

 

উত্তর: ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে আমেরিকার লেনার্ড নাইট এলমহাস্ট -এর প্রচেষ্টায় গড়ে উঠে শান্তিনিকেতন।   শিক্ষার ব্যবহারিক প্রসারের জন্য পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি সংগীত, কৃষিবিদ্যা, চারুকলা, হস্তশিল্প, কারুশিল্প, পোল্ট্রিফার্ম ইত্যাদির উন্নতি সাধন করেছিল এর উদ্দেশ্য।

 

উত্তর: লর্ড কার্জন ১৯০৫ খ্রী. বাংলাকে বিভাজিত করলে এর বিরুদ্ধে স্বদেশী আন্দোলন শুরু হয়। এই সময় বাংলায় বিদেশি শিক্ষা ব্যবস্থা বর্জন করে এর বিকল্প হিসেবে স্বদেশী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা ও প্রসারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয় তার নাম জাতীয় শিক্ষা।

 

 উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা ভাবনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে – প্রথমত, তিনি উপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে ‘শিক্ষা দিবার কল’ ও মাস্টারকে এই কলের অংশ বলে অভিহিত করেন। কারণ এই শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে বিশ্বপ্রকৃতি বা মনুষ্যত্ব বা বিশ্ব মানবআত্মার সম্পর্ক ছিল না। দ্বিতীয়ত, তিনি শিক্ষাব্যবস্থায় ভারতীয় জীবনাদর্শ ও রীতিনীতিকে গুরুত্বদান-এর কথা বলেন। তৃতীয়ত, তিনি সৃজনশীলতার ওপর গুরুত্বদেন এবং প্রকৃতি ও পরিবেশের সান্নিধ্যে শিক্ষা লাভের কথা বলেন।

 

 উত্তর: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, শিক্ষা হল বাহ্য প্রকৃতি ও অন্তপ্রকৃতির সমন্বয় সাধন। তাঁর মতে, শিক্ষা শুধুমাত্র তথ্য পরিবেশন করে না, বরং বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের মাধ্যমে মানবজীবনকে তাৎপর্যপূর্ণভাবে গড়ে তোলে, সংক্ষেপে, এটা বলা যায় যে, দেহ-মনের সমন্বয়সাধনের মাধ্যমে মানবসত্তার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটিয়ে নিজেকে দেশ ও দশের জন্য গড়ে তোলার অপর নাম শিক্ষা।

 

 উত্তর: বিদ্যাসাগরকে ‘বিদ্যাবণিক‘ বলা হয়— কারণ বাংলা ছাপাখানার বিকাশে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম স্মরণীয়। তিনি 1847 খ্রিস্টাব্দে মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে আমহার্স্ট স্ট্রিটে সংস্কৃত ছাপাখানা খোলেন এবং এখান থেকে প্রকাশিত পুস্তক বিক্রির জন্য তিনি সংস্কৃত প্রেস ডিপজিটরি নামে একটি দোকানও খোলেন। এককথায় বিদ্যাসাগর মহাশয় ছিলেন আধুনিক বাংলা বই ব্যাবসার পথপ্রদর্শক।

 

উত্তর: শিক্ষাবিস্তারের উদ্দেশ্যে বিদ্যাসাগর বাংলা বর্ণমালা সংস্কারের পরিচয় দেন তাঁর দু-খণ্ডে প্রকাশিত বর্ণপরিচয় (1855 খ্রিস্টাব্দ) পুস্তিকায়। এর থেকে জানা যায় যে, তিনি পূর্ববর্তী 16 (স্বরবর্ণ) 34 (ব্যঞ্জনবর্ণ) 50টি বর্ণের পরিবর্তে 12 (স্বরবর্ণ) 40 (ব্যঞ্জনবৰ্ণ) মোট 52 টি বর্ণের প্রস্তাব দেন। এইভাবে বাংলা মুদ্রণে ‘বিদ্যাসাগর সাট’ তৈরি হয়।

 

উত্তর: সমাচার দর্পণ এবং দিগ্দর্শন পত্রিকা দুটির সম্পাদক ছিলেন জন ক্লার্ক মার্শম্যান।

 সমাচার দর্পণ হল প্রথম বাংলা সাপ্তাহিক সংবাদপত্র। ১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ মে তারিখে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়।

 দিগ্দর্শনের হল বাংলার প্রথম বাংলা মাসিক সংবাদপত্র। এটি ১৮১৮ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম প্রকাশিত হয় (১২২৫ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে)।

 

উত্তর: বেঙ্গল গেজেট পত্রিকা ছিলো ভারতের প্রথম প্রধান পত্রিকা যা ১৭৮০ সালের ২৯ শে জানুয়ারি প্রকাশিত হয়। যার মালিক, সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন জেমস অগাস্টাস হিকি। এই পত্রিকাটি ছিল ১২ ইঞ্চি দীর্ঘ ও ৮ ইঞ্চি প্রস্থ দুই পৃষ্ঠাযুক্ত। এটি দুই বছর পর্যন্ত প্রকাশ হয়েছিল। ২৩শে মার্চ ১৭৮২ সালে পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়।

উত্তর: বাংলায় মুদ্রণ শিল্পের উদ্ভবের আগে জ্ঞান বা শিক্ষাজগৎ ছিল হাতে লেখা পুথি বা মুখস্থবিদ্যার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু ছাপা বইয়ের ফলে মুষ্টিমেয় ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ জ্ঞান অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, শ্রীরামপুর মিশন, স্কুল বুক সোসাইটির উদ্যোগে বাংলায় পাঠ্যপুস্তক রচনা ও পরিবেশনার কাজও শুরু হয়। মুদ্রণ শিল্পের প্রসারের ফলে ফলে একদিকে যেমন ছাপা বই পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয় এবং এর মাধ্যমে পাশ্চাত্যের জ্ঞান-বিজ্ঞান ছড়িয়ে পড়ে।

উত্তর: ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ১লা জুন জাতীয় শিক্ষা পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয়। রাসবিহারী ঘোষ এই পরিষদের সভাপতি হন এবং আশুতোষ চৌধুরী ও হীরেন্দ্রনাথ দত্ত যুগ্ম সভাপতি হন। এছাড়াও জাতীয় শিক্ষা পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।

উত্তর: রাধানাথ শিকদার একজন বাঙালি গণিতবিদ ছিলেন যিনি মাত্র ১৯ বছর বয়সে “Great Trigonometric Survey” তে যোগদান করেন, যেখানে তার কাজ ছিল ভারতে বিভিন্ন উচু পর্বত শৃঙ্গ গুলির উচ্চতা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিমাপ করা ও সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কোনটি তা নির্ধারণ করা। ১৮৫১ সালে রাধানাথ শিকদার হিমালয় পর্বতমালার ১৫ নং শৃঙ্গের (চূড়া-১৫/Peak XV) উচ্চতা পর্যবেক্ষণের কাজে দার্জিলিং যান। দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণের পর তিনি নিরূপণ করে প্রথম আবিষ্কার করেন যে, চূড়া-১৫/Peak XV বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এবং জানান যে এই পর্বত শৃঙ্গের উচ্চতা ৮৮৩৯.২ মিটার। যেহেতু তিনি পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গের উচ্চতা নির্ধারণ করেন তাই তিনি আজও স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন।

মাধ্যমিক   ইতিহাস

পঞ্চম অধ্যায়

4 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর   

 

1. কারিগরি শিক্ষার বিকাশে ‘বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট’ [BTI] -এর অবদান কি ছিল?  ০৪

উত্তর: ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে বিদেশি শিক্ষার বিকল্প হিসেবে স্বদেশী শিক্ষার জন্য জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠিত হয়। জাতীয় শিক্ষা পরিষদের অধীনে শিক্ষার বিষয় হিসাবে কলাবিদ্যা, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষানিয়ে মতপার্থক্য দেখা যায়। তারকনাথ পালিত কারিগরি বিদ্যা চর্চার বিকাশের জন্য ‘সোসাইটি ফর দ্যা প্রমোশন অফ টেকনিক্যাল এডুকেশন‘ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর উদ্যোগে ‘বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা হয়।

 

১) পঠন পাঠন :– BTI -এর প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন প্রমথনাথ বসু। এখানে দুই ধরনের পাঠক্রম চালু ছিল – (ক) ৩ বছরের অন্তর্বর্তী পাঠ্যক্রম (খ) ৪ বছরের মাধ্যমিক পাঠ্যক্রম। অন্তর্বর্তী পাঠ্যক্রমে তিনটি বিষয় ছিল (i) যন্ত্রবিজ্ঞান ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রবিজ্ঞান (ii) ফলিত রসায়ন (iii) ভূবিদ্যা।

 

২) সমন্বয় :– দেশীয় শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক প্রসারের উদ্দেশ্যে ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ‘বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট’ ও ‘বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ ‘একত্রে মিশে যায় এবং ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে ঐক্যবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নাম হয় ‘কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি’

 

৩) কাজকর্ম :– উভয় প্রতিষ্ঠানসই মিশে যাওয়ার পর কলা বিভাগের পাশাপাশি এখানে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন প্রযুক্তি প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষাদান করা হয়। এর ফলে বাংলার বহু শিক্ষিত যুবক কারিগরি বিদ্যা লাভ করে স্বনির্ভর ও সাবলম্বী হয়ে ওঠে।

 

৪) জার্নাল :– ‘কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির’ ছাত্র-ছাত্রীরা টেক’ নামে একটি জার্নাল প্রকাশ করেন।

 

■ মূল্যায়ন :– ‘বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট’ এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় শিক্ষা দ্বারা বাঙালি যুবকদের কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে তোলা । BTI সাফল্যের সঙ্গে তার কর্মকান্ড পরিচালনা করেছিল। পরবর্তীকালে এটি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয়।

 

2. ঔপনিবেশিক শিক্ষানীতির সমালোচনা করো। ০৪

উত্তরব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার সূচনা ও প্রসার ঘটে। ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক পাশ্চাত্য শিক্ষাকে সরকারি শিক্ষানীতি বলে গ্রহণ করেন। এর ফলে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার বিভিন্ন ত্রুটি বিচ্যুতি তুলে ধরে বিভিন্ন ভারতীয় মনীষী দেশীয় শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসারে উদ্যোগী হন।

 

১) কেরানি তৈরির শিক্ষা :– ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ভারতের ঔপনিবেশিক শিক্ষা প্রবর্তনের উদ্দেশ্য ছিল সস্তায় কেরানি তৈরি করা। কারণ স্বল্প বিতনে কেরানি চাকরি করার জন্য ব্রিটেন থেকে লোক পাওয়া সম্ভব ছিল না। এই কারণে অনেকেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যঙ্গ করে ‘গোলকদিঘির গোলামখানা’ বলতেন।

 

২) প্রাণের ছোঁয়ার অভাব :– উপনিবেশিক শিক্ষা প্রণালীর মাধ্যমে পাশ্চাত্যের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে এদেশে ছাত্রীদের পরিচয় ঘটলেও সেই যোগাযোগে প্রাণের ছোঁয়া ছিল না। তাছাড়া এই বিজ্ঞান শিক্ষার সঙ্গে ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার এবং দর্শনের কোন যোগাযোগ ছিল না।

 

৩) উচ্চ শ্রেণীর শিক্ষা :– ঔপনিবেশিক শিক্ষা ছিল মূলত ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান। এই শিক্ষা সমাজে উচ্চ শ্রেণীর মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তারা ব্যবসা ও পেশাগত কারণে ঔপনিবেশিক শিক্ষাকে গ্রহণ করেছিল। তাছাড়া ভারতের অধিকাংশ মানুষই এই শিক্ষা গ্রহণে বঞ্চিত ছিল।

 

৪) শিক্ষিত ও অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে ব্যবধান :– ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বড়ো ত্রুটি ছিল শিক্ষিত ও অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে বড় ব্যবধান সৃষ্টি। শিক্ষিত ইংরেজি জানা মানুষেরা গ্রামের অশিক্ষিত মানুষদের সঙ্গে একাত্ব হতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একেই কটাক্ষ করে বলেছেন, ” ইংরেজি শিক্ষায় যারা বিশিষ্টতা পেয়েছিল তাদের মনের মিল ছিল না। সর্বসাধারণের সঙ্গে দেশের সবচেয়ে বড়ো প্রভেদ তো এখানেই।”

 

■ উপসংহার :– ভারতীয় পন্ডিতগণ সমালোচনার পাশাপাশি দেশীয় শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসারে উদ্যোগী হয়েছিলেন। এই উদ্যোগে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠিত হয়।

 

3. টীকা লেখো :— বসু বিজ্ঞান মন্দির।

উত্তর:  বসু বিজ্ঞান মন্দির হল কলকাতার বিজ্ঞান গবেষণার একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু । বিশ্বের প্রথম সারির গবেষণাকেন্দ্র গুলির মধ্যে অন্যতম এবং উল্লেখযোগ্য ছিলো।

 

■ প্রতিষ্ঠা :– জগদীশচন্দ্র বসু প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপকের পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন স্বাক্ষর মৌলিক গবেষণার উদ্দেশ্যে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এই উদ্বোধন অনুষ্ঠান দ্যা ফরেজ অ্যাক্ট লাইন শিরোনামের স্বাগত ভাষনে তিনি প্রতিষ্ঠান থেকে জাতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন।

 

■ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য :– স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু এই প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেছিলেন মূলত ভারতবর্ষে বিশ্বমানের বিজ্ঞান চর্চার পরিকাঠামো গড়ে তুলতে এবং এর জন্য তিনি তার পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থের বৃহদাংশ এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে ব্যয় করেন । টাকার অভাবে গবেষণার কাজে সমস্যা দেখা দিলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে অর্থ সাহায্য করেন।

 

■ গবেষণার ক্ষেত্র :– বসু বিজ্ঞান মন্দিরে প্রকৃতি বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। এখানে উদ্ভিদ বিদ্যার সঙ্গে পদার্থবিদ্যার গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এছাড়া পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়নবিদ্যার, উদ্ভিদবিদ্যা, মাইক্রোবায়োলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, বায়ো ফিজিক্স, পরিবেশ বিজ্ঞান  নানা বিষয়ের গবেষণার ব্যবস্থা করেন জগদীশচন্দ্র বসু। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আমৃত্যূ এই প্রতিষ্ঠানে গবেষণা কার্য পরিচালনা করেন। তিনি উদ্ভিদের প্রাণ ও স্পন্দনের বার্তা সম্পর্কিত গবেষণা করেন এবং আবিষ্কার করেন কেস্কোগ্রাফ যন্ত্র।

 

■ আন্তর্জাতিকতা :– বাংলা তথা ভারতের বিভিন্ন বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণা ও বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে বসু বিজ্ঞান মন্দিরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিজ্ঞান চর্চায় বসু বিজ্ঞান মন্দিরের অবদান আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রয়েছে। এখানকার গবেষকগণ পরবর্তী কালে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিজ্ঞানের সেই খ্যাতি অর্জন করেছেন।

 

মূল্যায়ন :— বাংলা তথা ভারতের বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণা ও বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে বসু বিজ্ঞান মন্দির এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তবে এর অবদান শুধুমাত্র বাংলাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক মহলেও। বিজ্ঞানের গবেষণায় জগদীশচন্দ্র বসুর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে তাকে নাইট বা স্যার উপাধি প্রদান করেন।

 

4. বাংলা ছাপাখানার বিকাশে গঙ্গা কিশোর ভট্টাচার্যের অবদান লেখো। ০৪

উত্তরবাংলা তথা ভারতের একজন প্রকাশক, মুদ্রণ শিল্পবিদ, পুস্তক ব্যবসায়ী হিসেবে বাঙালি গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের ভূমিকা বিশেষ স্মরণীয়। পূর্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজ উদ্যোগে ছাপাখানা ও প্রকাশনা ব্যবসায়ী আত্মনিয়োগ করে।

 

১) বাঙ্গাল গেজেটি প্রেস স্থাপন :– ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে হরচন্দ্র রায়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তিনি কলকাতার চোরাবাজার স্ট্রিটে বাঙ্গাল গেজেটি নামে একটি প্রেস স্থাপন করেন। এটি ছিল বাঙালি মালিকানায় প্রথম ছাপাখানা। সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক উদ্যোগে এই প্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়।

 

২) প্রকাশিত গ্রন্থ :– এই প্রেস থেকে নিজের লেখা বিভিন্ন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যেমন– বাংলা গ্রামার, ইংরেজি গ্রামার, গঙ্গা ভক্তি তরঙ্গিনী, লক্ষ্মীচরিত, বেতাল পঞ্চবিংশতি, চাণক্য শ্লোক প্রভৃতি।

 

৩) সচিত্র বই :– গঙ্গাকিশোর ফেরিস অ্যান্ড কোম্পানি প্রেস থেকে ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে কবি ভারতচন্দ্রের সচিত্র “অন্নদামঙ্গল” কাব্যগ্রন্থটি ছাপা হয়। এটি ছিল বাঙ্গালীদের সম্পাদনায় প্রথম সচিত্র বই।

 

৪) সংবাদপত্র ও সাময়িক পত্রের প্রকাশনা :– প্রথম বাঙালি সাংবাদিক হিসেবে তার উদ্যোগে বাঙ্গাল গেজেটি প্রেস থেকে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে ১৪ই মে প্রথম প্রকাশিত হয় “বাঙাল গেজেট” নামক পত্রিকা। তিনি দেশীয় উদ্যোগে সংবাদপত্র ও সাময়িক পত্রের প্রকাশনার পথপ্রদর্শক ছিলেন।

 

উপসংহার :– বাঙ্গালীদের মধ্যে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য ছিলেন প্রথম সংবাদপত্রের সম্পাদক, মুদ্রাকর ও প্রথম বাংলা সচিত্র বইয়ের প্রকাশক। শেষ জীবনে তিনি কলকাতা ছিলেন জন্মস্থানে ফিরে গেলেও মুদ্রণ, প্রকাশনা ও পুস্তক ব্যবসা চালিয়ে যান।

 

5. বাংলায় আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অফ সায়েন্স (IACS) এর অবদান লেখো।  ০৪

 

উত্তর: বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় মৌলিক গবেষণা ও চর্চার উদ্দেশ্যে উনিশ শতকে ভারতে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গড়ে ওঠে সেগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অফ সায়েন্স। এটি ছিল কলকাতায় অবস্থিত একটি বিজ্ঞান গবেষণা এবং একটি উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান।

◾️প্রতিষ্ঠা :– বিখ্যাত চিকিৎসক ড. মহেন্দ্রলাল সরকার বিজ্ঞানের অধ্যাপক ফাদার ইউজিন লাফোর সহযোগিতায় ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে ২৯  জুলাই কলকাতার বউবাজার স্ট্রিটে এটি প্রতিষ্ঠা করেন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অফ সায়েন্স (IACS)। পরবর্তীকালে স্বাধীনতার পর এই প্রতিষ্ঠানটি যাদবপুরে স্থানান্তরিত হয়। এর প্রথম অধিকর্তা ছিলেন প্যারীমোহন মুখোপাধ্যায়। ড. মহেন্দ্রলাল সরকার আমৃত্যু এই প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক ছিলেন।

◾️প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য :– IACS প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল – (ক) ভারতে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার ঘটানো। (খ) ভারতের সাধারণ মানুষকে বিজ্ঞান মনস্ক করা। (গ) পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয়ে আলোচনা করা। (ঘ) পাশ্চাত্যের অনুকরণে ভারতের বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালানো প্রভৃতি।

◾️গবেষণা ও গবেষণা পত্র :– এই প্রতিষ্ঠানে পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় নিয়মিত মৌলিক গবেষণা এবং বিজ্ঞান বিষয়ক বক্তৃতা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। নিজেদের বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণা মূলক কাজ গুলি প্রকাশের জন্য আইএসিএস ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ ফিজিকস নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করে।

◾️অবদান :– এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য এই প্রতিষ্ঠানে গবেষণা করে বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রমন তার বিখ্যাত রমন ক্রিয়া আবিষ্কার করেন যার জন্য তিনি ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান। এইসব গবেষণা ও বক্তৃতা প্রদানের কাজে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন খ্যাতনামা বিজ্ঞানী অংশ নিয়েছেন যার মধ্যে অন্যতম ছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন, মেঘনাথ সাহা, কে. এস. কৃষ্ণান প্রমূখ।

■ মূল্যায়ন :– বর্তমানে বিজ্ঞান চর্চার জন্য অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কিন্তু এখনও IACS একটি স্বায়ত্তশাসিত বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অনেক বিজ্ঞানী এবং গবেষক এখানে গবেষণা করেছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন বলে আশা করা যায়। পরিশেষে বলা যায় এই প্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহে ভারতের আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষাদানের প্রসারে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল।

6. বাংলায় কারিগরি শিক্ষার বিকাশ। ০৪

উত্তর: উনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষার বিকাশ ঘটলে মানুষের মধ্যে যুক্তিবাদের বিকাশ ঘটে। শিক্ষিত বাঙালি বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। এর ফলে বাংলায় দ্রুত কারিগরি শিক্ষার প্রসার ও অগ্রগতি শুরু হয়। এই বিষয়ে কয়েকজনের উদ্যোগ ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

 

১) শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠা :– বাংলায় সর্বপ্রথম উল্লেখযোগ্য কারিগরি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান ছিল ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় রাইটার্স বিল্ডিং-এ প্রতিষ্ঠিত ক্যালকাটা কলেজ অফ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং। কলেজটি ১৮৫৭ সালে শিবপুর স্থানান্তরিত হয় এবং এর নতুন নাম হয় শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ।

 

২) বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট :– কারিগরি শিক্ষার জন্য ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে তারকনাথ পালিতের উদ্যোগে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় বেঙ্গল টেকনিক্যাল কলেজ। এখানে কলা বিভাগের পাশাপাশি রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, শিল্পপ্রযুক্তি প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হয়।

৩) ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স :– ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে ২৯ শে জুলাই ড. মহেন্দ্রলাল সরকার প্রতিষ্ঠা করেন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স নামক একটি বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান। এখানে রসায়ন ও পদার্থ বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে গবেষণা চলতো।

 

৪) কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি :– দেশীয় শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক প্রসারের উদ্দেশ্যে ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট ও বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ একত্রে মিসে যায় এবং এর নতুন নাম হয় বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ এন্ড টেকনিক্যাল স্কুল। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে এই ঐক্যবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নাম হয় কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি।

 

উপসংহার :– ব্রিটিশ শাসক ও শিল্পপতিরা কারিগরি ক্ষেত্রে ভারতীয়দের অধ্যক্ষ মনে করত এজন্য তারা কারিগরি শিক্ষায় পর্যাপ্ত ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ না করায় বাংলায় কারিগরি শিক্ষার প্রসার ব্যাহত হয়। তবে স্বাধীনতার পর ভারতে কারিগরি শিক্ষার প্রসারে বিভান্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

 

7. বাংলা মুদ্রণশিল্পের উন্নয়নে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ও তার ‘ইউ রায় অ্যান্ড সন্স’-এর ভূমিকা লেখো। ০৪

উত্তরবাংলা মুদ্রণশিল্পের উন্নয়নে যে সকল বাঙালি চিরস্বরণীয় হয়ে রয়েছেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী (১৮৬৩-১৯১৫ খ্রী.) তাদের মধ্যে অন্যতম।

 

■ পরিচিতি :— ১৮৬৩ খ্রী. ১২ মে কিশোরগঞ্জ জেলার মশুয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহন করেন। যৌবনে কলকাতায় ব্রাহ্মসমাজের প্রভাবে প্রভাবিত হন। তিনি একাধারে ছিলেন সাহিত্যিক, চিত্রকর, সংগীতজ্ঞ, আলোকশিল্পী, প্রকাশক ও মুদ্রাকর। রঙিন ও হাফটোন ব্লক তৈরি ও গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন।

 

■ ইউ রায় এন্ড সন্স প্রতিষ্ঠা :– বিদেশ থেকে উন্নত মুদ্রণ যন্ত্র এনে কলকাতায় ৩৮/১ শিবনারায়ন দাস লেনে ‘ইউর আই এন্ড সন্স’ নামে ১৯৮৫ খ্রী. একটি ছাপাখানা স্থাপন করেন। পরে এই ছাপাখানাই হয়ে ওঠে দক্ষিণ এশিয়ার সর্বাপেক্ষা উচ্চমানের ছাপাখানা। উপেন্দ্রকিশোর ও তাঁর পুত্র সুকুমার রায়ের হাত ধরে ইউ রায় অ্যান্ড সন্স’ ভারতবর্ষ তথা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছাপাখানাতে পরিণত হয়।

 

■ হাফটোন ব্লক :— তিনি কাঠের পরিবর্তে তামা ও দস্তার পাতে অক্ষর খোদাই করে মুদ্রণ ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। তিনিই প্রথম ভারতে নকশা ছাপার ব্লক বা ফলক প্রচলন করেন। নকশা ছাপার ফলকের সঙ্গে বিভিন্ন আকারের বিন্দু দ্বারা ফটোগ্রাফির রূপায়ণ বা হাফটোন পদ্ধতিও প্রচলন করেন।

 

■ ছবির ব্যবহার :— পশ্চিমি দেশগুলিতে যখন রঙিন ছাপা পদ্ধতি শৈশবাবস্থায় তখন তিনিই রঙিন ছাপা পদ্ধতি প্রবর্তন করে যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটান। তিনি রঙিন মুদ্রণের নানাপ্রকার যন্ত্র যেমন ডায়াফ্রাম পদ্ধতি, স্ক্রিন অ্যাডজাস্টার যন্ত্র, ডায়োটাইপ, রি-প্রিন্ট, ষাট ডিগ্রি স্ক্রিন প্রভৃতি পদ্ধতি ব্যবহার করে রংবেরঙের ছবি দ্বারা মুদ্রণ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটান।

 

■ প্রকাশিত বই :– তাঁর ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হয় বিভিন্ন বই, যেমন—‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’, ‘ছেলেদের মহাভারত’, ‘সেকালের কথা’, ‘টুনটুনির বই’, ‘সন্দেশ’ প্রভৃতি পত্রিকা ।

 

  মূল্যায়ন :— বাংলা তথা ভারতবর্ষে ছাপাখানার উন্নয়নে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর অবদান অপরিসীম। তৎকালীন ব্রিটেনে তাঁর ব্লক তৈরীর প্রযুক্তি প্রশংসিত হয়। তাঁর কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ, তাঁর নাম যুক্ত করে বিভিন্ন যন্ত্রের নামকরণ ঘটে, যেমন ‘রে-স্ক্রিন অ্যাডজাস্টার’ ‘রে-টিন্ট সিস্টেম’ প্রভৃতি।

 

8. ছাপা বইয়ের সঙ্গে শিক্ষা বিস্তারে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করো।  ০৪

উত্তর: উনিশ শতক থেকে বাংলায় বই ছাপা শুরু হয়। আবার এই সময় বাংলার গ্রামেগঞ্জে স্থাপিত হয় শত শত স্কুল। আর ছাপা বই এই সময় থেকে শিক্ষাবিস্তারের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

 

ছাপা বইয়ের সঙ্গে শিক্ষাবিস্তারের সম্পর্ক :—

১) ছাপা বই ও শিক্ষাবিস্তার পরস্পর নির্ভরশীল :– ছাপা বই ও শিক্ষার বিস্তার একে অপরের পরিপূরক। শিক্ষার বিস্তারের জন্য ছাপা বই প্রয়োজন। ছাপা বই না থাকলে শিক্ষার বিস্তার ঘটে না। আবার শিক্ষার বিস্তার না ঘটলে বইয়েরও কদর থাকে না।

 

২) ছাপা বই আধুনিক শিক্ষাবিস্তারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য :– আধুনিক শিক্ষাবিস্তারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল– ছাপা বইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার বিস্তার। আগে পুথির মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করা হত, কিন্তু তখন শিক্ষা অল্পসংখ্যক মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ছাপা বইয়ের মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার সম্ভব হয়।

 

১) সহজলভ্যতা :– ছাপা বই সহজে ও সস্তায় বাজার থেকে কেনা যায়। এর আগে পুথি সহজে পাওয়া যেত না।

২) লেখার স্পষ্টতা :– ছাপা বইয়ের লেখা স্পষ্ট। এর ফলে ছাত্রছাত্রীরা সঠিকভাবে লিখতে ও পড়তে পারে। এর আগে হাতের লেখা দেখে ও শুনে পড়াশোনা করতে হত।

৩) বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষার সমতা :– একই ধরনের অনেক বই ছাপার সুবিধার জন্য সারা দেশে একই ধরনের শিক্ষার বিস্তার সম্ভব হয়। বিভিন্ন বিদ্যালয়ে একই ধরনের বইয়ের ব্যবহার সমগ্র দেশে শিক্ষার ক্ষেত্রে সমতা এনেছিল।

 

১) শ্রীরামপুর মিশন প্রেস :– বই প্রকাশ করে শিক্ষার বিস্তারের ক্ষেত্রে শ্রীরামপুর মিশনের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীরামপুর মিশনের উদ্যোগে সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনুবাদ করে ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’, ‘হিতোপদেশ’, ‘বত্রিশ সিংহাসন’, ‘ভূগোল’, ‘পদার্থবিদ্যা’, ‘জ্যোতির্বিদ্যা’ প্রভৃতি বই প্রকাশ করা হয়। শ্রীরামপুর মিশন বিভিন্ন ধরনের বই ছাপার ফলে শিক্ষাবিস্তারের সহায়ক হয়েছিল। উইলিয়াম কেরির পুত্র ফেলিক্স কেরি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান বই রচনার পথপ্রদর্শক ছিলেন।

 

২) ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি :– শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠ্যবই জোগান দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটির প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল স্কুল পাঠ্যবই তৈরি করে সুলভ মূল্যে অথবা বিনামূল্যে তা বিতরণ করা ও শিক্ষার প্রসার ঘটানো।

 

  মূল্যায়ন :— উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে ‘ছাপাখানার বিস্তার ও শিক্ষার প্রসারের সম্পর্ক সমানুপাতিক’ –এই উক্তিটি যথার্থ বলেই মনে করা যায়।

 

9. মহেন্দ্রলাল সরকার কেন স্মরণীয়? অথবা, বাংলায় বিজ্ঞান চর্চার বিকাশে মহেন্দ্রলাল সরকারের অবদান লেখো? ০৪

উত্তরভারতে সুশৃঙ্খল প্রাতিষ্ঠানিক বিজ্ঞানচর্চার পথিকৃৎ ছিলেন ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকার। একজন ডাক্তার ও বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি ভারতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন।

 

■ শিক্ষা :– শৈশবে হেয়ার স্কুল, পরে হিন্দু কলেজের শিক্ষা সমাপ্ত করার পর কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে আয় এম এস ডিগ্রি ও ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে এন ডি ডিগ্রি লাভ করেন।

 

■ কর্মজীবন :– এম ডি ডিগ্রি লাভের পর তিনি প্রাইভেট প্র্যাকটিস শুরু করেন। অসাধারণ রোগ নির্ণয় ও নিরাময়ের ক্ষমতা ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকার ‘অচিরেই তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় অ্যানাটমি ও ফিজিওলজির গুরুত্ব না থাকায় তিনি অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা শুরু করেন। পরে ডাঃ রাজেন্দ্রলাল দত্ত, লোকনাথ মৈত্র, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখের প্রভাব ও প্রেরণায় চিকিৎসার ধারা পাল্টে ফেলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম সেরা হোমিওপ্যাথি বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন।

 

■ বৈজ্ঞানিক সংগঠন :– তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি হল ১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জুলাই ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর যা কাল্টিয়েশন অফ সায়েন্স (IACS) প্রতিষ্ঠা। প্রথমে এটি বৌবাজার স্ট্রিটে প্রতিষ্ঠিত হলেও পরে তা যাদবপুরে স্থানান্তরিত হয়। তিনি ছিলেন এর প্রথম ডিরেক্টর। এখানকার গবেষণা পত্র প্রকাশের জন্য ইন্ডিয়ান জার্নাল অব ফিজিক্স’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। এখানকার খ্যাতনামা বিজ্ঞানীরা ছিলেন- পার্থীশচন্দ্র বসু, মেঘনাদ সাহা, নোবেল জয়ী চন্দ্রশেখর ভেঙ্কটরমণ, চুনীলাল বসু প্রমুখ।

 

■ বিজ্ঞানচর্চায় নারীদের উৎসাহ দান :– তিনি নারীদের মধ্যে যুক্তিবোধ ও বৈজ্ঞানিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে উদ্যোগী হন। তাঁরই প্রচেষ্টায় সরলাদেবী চৌধুরাণী ছাত্রদের সঙ্গো একত্রে পাঠগ্রহণের সুযোগ লাভ করেন। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে তিন আইন’ প্রণয়নের ক্ষেত্রেও তিনি সরকারকে পরামর্শ দান করে প্রভাবিত করেন।

 

  উপসংহার :– ভারতে বিজ্ঞানচর্চার প্রসার ও চিকিৎসাবিদ্যার উন্নয়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকারের অবদান অপরিসীম। তাঁর প্রতিষ্ঠিত IACS প্রতিষ্ঠানটি শুধুমাত্র ভারতে নয়, সমগ্র বিশ্বে বিজ্ঞান গবেষণার এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

 

10. ছাপাখানা ও প্রকাশনার অগ্রগতিতে ‘শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের’ কী পরিচয় পাওয়া যায় লেখো। ০৪

উত্তরবাংলাদেশে ছাপাখানা স্থাপন ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে শ্রীরামপুর মিশনারিদের ভূমিকা বিশেষ স্মরণীয়। তাঁদের প্রচেষ্টায় ‘শ্রীরামপুর মিশন প্রেস’ স্থাপিত হয়। এখান থেকে প্রকাশিত গ্রন্থ ও বিভিন্ন ধরনের পত্র-পত্রিকা বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তার ও সমাজ চেতনা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে।

 

১) ছাপাখানা স্থাপন :– ব্যাপটিস্ট মিশনারি সোসাইটির সদস্য ‘শ্রীরামপুর ত্রয়ী’-এর উদ্যোগে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুরে একটি ছাপাখানা স্থাপিত হয়। প্রথম দিকে কাঠের হরফের ব্লক তৈরির মাধ্যমে ছাপার কাজ চললেও পরে ধাতুর তৈরি হরফের মাধ্যমে বাংলা ও ইংরেজিতে ছাপার কাজ চলতে থাকে। এক্ষেত্রে তাঁদের সাহায্য করেন ‘বাংলা মুদ্রণ শিল্পের’ (টাইপের) জনক পঞ্চানন কর্মকার (আসল নাম পঞ্চানন মল্লিক) ও কম্পোজিটর গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য। অচিরেই এই ছাপাখানাটি এশিয়ার সর্ববৃহৎ ও বিশ্বের অন্যতম ছাপাখানা রূপে খ্যাতি লাভ করে।

 

২) অনুবাদ প্রকাশ :– ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুর ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হয় ইংরেজি ছাড়াও হিন্দি, ওড়িয়া, মারাঠি প্রভৃতি ২৬টি ভাষায় বাইবেলের অনুবাদ। এ ছাড়া রামায়ণ, মহাভারত, হিতোপদেশ প্রভৃতির বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদও প্রকাশিত হয়। এক্ষেত্রে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন রামরাম বসু, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার প্রমুখ পন্ডিতগণ।

 

৩) বাংলা ভাষায় বিভিন্ন গ্রন্থ প্রকাশ :– শ্রীরামপুর ছাপাখানা থেকে উইলিয়াম কেরির লেখা ‘বাংলা ব্যাকরণ’, ইঙ্গবঙ্গ অভিধান, কথোপকথন, বিদ্যাহারাবলী, ‘ইতিহাস মালা’ প্রভৃতি প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের ‘বত্রিশ সিংহাসন’, রাজাবলি, রামরাম বসুর ‘জ্ঞানোদয়’, ‘লিপিমালা’, ‘হেডপণ্ডিত’ প্রভৃতি প্রকাশিত হয়। এর ফলে বাংলা গদ্যের বিকাশ ঘটে।

 

৪) পত্রিকা প্রকাশ :– এই মিশন থেকে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় মার্শম্যানের ‘দিগদর্শন’, ‘সমাচার দর্পণ’, ‘ফ্রেন্ড অব ইন্ডিয়া’ প্রভৃতি পত্রিকা।

 

৫) পাঠ্যপুস্তক রচনা :– এই ছাপাখানা থেকেই ছাত্রছাত্রীদের উপযোগী অসংখ্য পাঠ্যপুস্তক ছাপা হয়। এর ফলে ডেভিড হেয়ারের ‘ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি’ (১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে) ‘ক্যালকাটা স্কুল সোসাইটি’র পক্ষে অল্পদামে বা বিনামূল্যে ছাত্রছাত্রীদের হাতে পাঠ্যপুস্তক পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়। এর ফলে বাংলায় গণশিক্ষার ব্যাপক প্রসার শুরু হয়।

 

৬) ব্যবসায়িক উন্নতি :– ক্রমে ‘শ্রীরামপুর মিশন প্রেস’ থেকে অগণিত বই ছাপার ফলে এই প্রেসের ব্যবসায়িক সমৃদ্ধি ঘটতে থেকে। বহু মানুষ মুদ্রণ ব্যাবসাকে জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করে। ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে যেখানে কলকাতায় ১৭টি ছাপাখানা ছিল, ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে তা ২২৯-এ পৌঁছে যায়।

 

  উপসংহার :– শ্রীরামপুর মিশন ছাপাখানা আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

দশম শ্রেণি ইতিহাস

পঞ্চম অধ্যায়

৮ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর  

 

1. টীকা লেখো :— জাতীয় শিক্ষা পরিষদ। ০৮

উত্তর: লর্ড কার্জন ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলাকে দু’ভাগ করার পর স্বদেশী আন্দোলন শুরু হয়। এই সময় ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে স্বদেশী ধাঁচে একটি শিক্ষা ব্যবস্থার গড়ে তোলার উদ্যোগ শুরু হয়। এর বাস্তব রূপায়ণ হল ‘জাতীয় শিক্ষা পরিষদের প্রতিষ্ঠা’

 

১) প্রতিষ্ঠা :– সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে ৯২ জন সদস্য নিয়ে ‘জাতীয় শিক্ষা পরিষদ’ গড়ে ওঠে। এর প্রথম সম্পাদক হন ‘রাজবিহারী ঘোষ

 

২) আর্থিক সহায়তা :– জাতীয় শিক্ষা পরিষদ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ব্রজেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরী ৫ লক্ষ টাকা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী ২.৫ লক্ষ টাকা এবং রাজা সুবোধচন্দ্র মল্লিক ১ লক্ষ টাকা দান করেন।

৩) উদ্দেশ্য :– জাতীয় শিক্ষা পরিষদ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য গুলি হল – ক) ব্রিটিশ পরিবর্ত শিক্ষা নীতির বিরোধিতা করা। (খ) দেশের প্রয়োজনে স্বদেশ ধাঁচে বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা।

 

৪) কার্যাবলী :– পরিষদ পক্ষ নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য সাহিত্য, কলা, বিজ্ঞান’ কারিগরি প্রভৃতি শিক্ষা  বিষয়ে নিজেরাই পাঠক্রম তৈরি করে। জাতীয় শিক্ষা পরিষদের আধীনে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে ‘বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ’ প্রতিষ্ঠা হয়। এর অধ্যক্ষ হন ‘অরবিন্দ ঘোষ‘ এছাড়াও এই পরিষদের অধীনে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্কুল গড়ে ওঠে ।

 

■ ব্যর্থতার কারণ :— জাতীয় শিক্ষা পরিষদ শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। জাতীয় শিক্ষা পরিষদের ব্যর্থতার কারণ গুলি হল —

ক) চাকরীর ক্ষেত্রে অসুবিধা :– চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতা হিসেবে জাতীয় শিক্ষা পরিষদের ডিগ্রির কোন মূল্য ছিল না। ফলে সমাজের বেশিরভাগ মানুষ এতে আকৃষ্ট হয়নি।

 

খ) সরকারি দমন নীতি :– জাতীয় শিক্ষা পরিষদ পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি সরকার ভালো চোখে দেখেনি। ফলে সরকারের বিরোধিতা ও দমন নীতির ব্যর্থতা এর অন্যতম কারণ।

 

গ) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতি :– কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলেন। তিনি এখানে উৎকৃষ্ট শিক্ষা ও গবেষণাগারের ব্যবস্থা করেন। ফলে জাতীয় শিক্ষা পরিষদের আকর্ষণ কমে যায়।

 

ঘ) কংগ্রেসের চরমপন্থী বিদ্রোহ :– কংগ্রেসের চরমপন্থী নেতারা জাতীয় শিক্ষা পরিষদকে স্বীকার করেনি। তাদের বিরোধিতা জাতীয় শিক্ষা পরিষদের ব্যর্থতার জন্য দায়ী ছিল।

 

■ মূল্যায়ন :– ১৯১০ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে জাতীয় শিক্ষা পরিষদের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। কারণ জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করা ছাত্রদের সরকারি চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। তবে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ প্রথম জাতীয় স্তরের শিক্ষা নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল।

 

2. মানুষ, প্রকৃতি ও শিক্ষার সমন্বয় বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার পরিচয় দাও। ০৮

উত্তর: রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, “একটি শিশু বড় হয়ে উঠে প্রকৃতির কোলে, সে প্রকৃতির সন্তান।” তাই তিনি শিক্ষাকে মানুষ ও প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় বলে মনে করতেন না। তিনি মনে করতেন শিক্ষার সঙ্গে প্রকৃতির ও মানুষের সমন্বয় গঠিত হওয়া দরকার। তার শিক্ষা ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ‘প্রকৃতির ভাবনা‘।

 

১) অরণ্য ধ্বংসের বিপদ :– রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যে, “সকল জীববৃক্ষদের অবলম্বন করে বেঁচে থাকে, কিন্তু আজ মানুষ নির্মমভাবে অরণ্য ধ্বংসের মরুভূমিকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন।” রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন অরণ্য সংরক্ষণ, তাই তিনি অরণ্য দেবতা প্রবন্ধে বলেছেন, “অনেক মানুষ অরণ্যকে ছেদ করে নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি ডেকে এনেছেন। বায়ুকে নির্মল করার ভার গাছের উপর, যার পত্র ঝরে গিয়ে ভূমিকে উর্বরতা দেয়, তাকেই সে নির্মূল করেছে।”

 

২) প্রকৃতির মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থা :– রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যে, “এই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে গেলে আবার আমাদের আহ্বান করতে হবে সেই বরদাত্রী বনলক্ষ্মীকে..। তিনি শান্তিনিকেতনের প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে তার আদর্শ শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।

 

৩) গ্রামের উন্নয়নের ভাবনা :– পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে জমিদারী দেখাশোনার দায়িত্ব পেয়ে রবীন্দ্রনাথ গ্রামের আসল রূপটিকে চিনতে পারেন। তাই তিনি উপলব্ধি করেন “গ্রামই ভারতের প্রাণ, গ্রাম ছাড়া দেশের উন্নতি সম্ভব নয়”। তাই তিনি শিলাইদহে ‘মহর্ষি দাতব্য চিকিৎসালয়‘ স্থাপন করেন ও কুটির শিল্পের বিকাশে উদ্যোগ নেন।

 

৪) কৃষি উন্নয়ন :– রবীন্দ্রনাথ পল্লীগ্রামের মানুষের কল্যাণের উদ্দেশ্যে কৃষিকাজের উন্নতি বিষয় নানা রকম চিন্তা ভাবনা করেন। তিনি শিলাইদহে আদর্শ কৃষিক্ষেত্র স্থাপন করে সেখানে ট্রাক্টর, পাম্পসেট ও জৈব সারের ব্যবহার  করে কৃষি ক্ষেত্রে বিপ্লব আনেন। এছাড়া শিলাইদহে কুটি বাড়ির ৮০ বিঘা জমিতে আধুনিক কৃষিখামার গড়ে তোলেন।

 

৫) হিতৈষী তহবিল :– রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগ প্রচারে বকেয়া খাজনার উপর সামান্য হিতৈষি শুল্ক ধার্য করেন। এবং জমিদারি থেকে তার সমপরিমাণ অর্থ ভূর্তকি দিয়ে হিতৈসি তহবিল গড়ে তোলা হয়। এই তহবিলের অর্থ বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা হত।

 

৬) সম্প্রীতি :– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ দূর করা। তিনি তার কর্মক্ষেত্রে হিন্দু, মুসলমান, ব্রাহ্মণ, চন্ডালের ভেদাভেদ দূর করে নতুন প্রাণের সঞ্চালন করেন।

 

৭) অন্যান্য উদ্যোগ :– রবীন্দ্রনাথ আধুনিক পঞ্চায়েতের ধাঁচে গ্রামের পরিচালন কাঠামো গড়ে ছিলেন। তিনি চাষিদের স্বল্প সুদে ধন-দানের জন্য প্রতিসর কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন এবং ফসলের ন্যায্য মূল্য যাতে চাষিরা পায় তার জন্য ‘Tagore and Company‘ প্রতিষ্ঠা করেন।

 

■ উপসংহার :– রবীন্দ্রনাথ তার জীবনস্মৃতি গ্রন্থে লিখেছিলেন, “আমার শিশুকালেই বিশ্ব প্রকৃতির সাথে আমার খুব একটি সহজ ও নিবিড়যোগ ছিল। প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে মানুষের জীবন সহ-অবস্থায় তার শিক্ষাচিন্তার দেখা যায়।”

 

আজকের পোস্টে দশম শ্রেণী ইতিহাসের পঞ্চম অধ্যায় ‘বিকল্প চিন্তা ও উদ্যোগ’ থেকে ২/৪/৮ মার্কস এর বাছাই করা প্রশ্ন উত্তর শেয়ার করা হল যেগুলি   পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিশেষ ভাবে সহায়তা করবে।  

SOURCE-EDT

 ©kamaleshforeducation.in(2023)

error: Content is protected !!
Scroll to Top