সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা প্রশ্ন উত্তর
(২/৪/৮ মার্কস)
Class 10 History Chapter 4
Long Question Answer
Published on:
মাধ্যমিক ইতিহাসের চতুর্থ অধ্যায় ‘সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা’ (History Chapter 4) এর মধ্যে মহাবিদ্রোহ বা সিপাহি বিদ্রোহের প্রকৃতি, মহারানীর ঘোষণাপত্র এবং বিভিন্ন সভা-সমিতির মাধ্যমে জাতীয়তাবাদের উত্থানের চমকপ্রদ ইতিহাস এই অংশে খুব সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আজকের আর্টিকেলে এই গুরুত্বপূর্ণ চ্যাপ্টারের বাছাই করা কিছু ২/৪/৮ প্রশ্ন ও উত্তর সাজিয়ে দেওয়া হলো।
বোর্ড: বিষয়বস্তু
1 মাধ্যমিক ইতিহাস চতুর্থ অধ্যায় ‘সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ’ বড় প্রশ্ন ও উত্তর (২/৪/৮ মার্কস) Madhyamik History Chapter 4 Question Answer
1.1 দশম শ্রেণির ইতিহাস চতুর্থ অধ্যায় (সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা) 2 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | Class 10 History Chapter 4 2 Marks Question Answer
1.2 মাধ্যমিক ক্লাস 10 ইতিহাস চতুর্থ অধ্যায় 4 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | Madhyamik Class 10 History Chapter 4 4 Marks Question Answer
1.3 দশম শ্রেণি ইতিহাস চতুর্থ অধ্যায় ৮ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর | Madhyamik Class 10 History 4th Chapter 8 Marks Question Answer
মাধ্যমিক ইতিহাস চতুর্থ অধ্যায়
‘সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ’ প্রশ্ন ও উত্তর (২/৪/৮ মার্কস)
1) উপনিবেশিক অরণ্য আইনের উদ্দেশ্য কি ছিল ?
উত্তর: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহের পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার ভারত শাসনের দায়িত্ব নেওয়ার পর চালু হওয়া বিভিন্ন আইন গুলির উদ্দেশ্য ছিল –
উদ্দেশ্য সমূহ :- ক) ভারতের রেলপথ নির্মাণের উদ্দেশ্যে রেলের স্লিপার তৈরির জন্য কাঠ সংগ্রহ করা।
খ) বাণিজ্য ও যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের জন্য কাঠের জোগান সুনিশ্চিত করা। গ) মূল্যবান কাঠ রপ্তানি করে বনাঞ্চল থেকে রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি করা। ঘ) অরণ্যগুলির উপর উপনিবেশিক কর্তৃত্ব বৃদ্ধি করা।
2) বিদ্রোহ বলতে কী বোঝো ?
উত্তর: বিদ্রোহ :- প্রচলিত প্রথা, রাজনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক নির্দিষ্ট মতবাদ ও আদর্শে দ্বারা চালিত হয়ে মানুষ জোটবদ্ধভাবে সংগ্রাম করে কিন্তু শাসকের দ্বারা পরাজিত হয়, এই ব্যর্থ প্রচেষ্টা বিদ্রোহ নামে পরিচিত। বিদ্রোহের কয়েকটি উদাহরণ হল – চুয়াড় বিদ্রোহ, কোল বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, মুন্ডা বিদ্রোহ, সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, রংপুর বিদ্রোহ, পাবনা বিদ্রোহ প্রভৃতি।
3) অভ্যুত্থান বলতে কী বোঝো ?
উত্তর: অভ্যুত্থান :- অভ্যুত্থান বলতে বোঝায় সেই জাতীয় বিদ্রোহকে, যখন ওই বিদ্রোহের পিছনে ব্যাপক জনসমর্থন থাকে। স্বতঃস্ফূর্ত এই বিদ্রোহ আঞ্চলিক বা গোষ্ঠীগত হতে পারে, আবার সফল বা ব্যর্থ হতে পারে। যেমন – ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় নৌসেনার বিদ্রোহকে অভ্যুত্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। শাসকদের বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্রোহ বা উত্থান হলে তাকে গণ অভ্যুত্থান বলে। আবার উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্রোহকে জাতীয় অভ্যুত্থান বলে।
4) বিদ্রোহ ও বিপ্লবের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করো।
উত্তর: বিদ্রোহ ও বিপ্লবের মধ্যে পার্থক্য গুলি হল –
ক) বিদ্রোহ বলতে বোঝায় প্রচলিত ব্যবস্থার তীব্র বিরোধিতা করা। আর, বিপ্লব হলো প্রচলিত ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করা।
খ) বিদ্রোহের ফলে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক জগতে ব্যাপক কোনো পরিবর্তন ঘটে না। যেমন -সাঁওতাল বিদ্রোহ। আর, বিপ্লবের ফলে কোন দেশের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক এমনকি চিন্তার জগতে ব্যাপক ও সর্বাত্মক পরিবর্তন ঘটে। যেমন – ফরাসি বিপ্লব।
5) খুৎকাঠি প্রথা কী?
উত্তর: খুৎকাঠি প্রথা কথার অর্থ হল যৌথ কৃষিব্যবস্থা। মুন্ডারা বহুকাল ধরে জঙ্গল পরিষ্কার করে কৃষিকাজ করত এবং জমির যৌথ মালিকানা ভোগ করত। ব্রিটিশ আমলে তাদের যৌথ কৃষিব্যবস্থা বা খুৎকাঠি প্রথা-র অবসান ঘটিয়ে ব্যক্তিগত মালিকানা ব্যবস্থা চালু করায় মুন্ডারা ক্ষুদ্ধ হয়।
6) পাইক কাদের বলা হত? পাইকান জমি কি?
উত্তর: পাইক :- চুয়াড়রা মূলত মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও ধলভূম অঞ্চল নিয়ে গঠিত দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার জঙ্গলমহল বনাঞ্চলের অধিবাসী। কৃষিকাজ ও পশুশিকারের পাশাপাশি এরা স্থানীয় জমিদারদের অধীনে সৈনিক বা পাইকের কাজ করত বলে, এদের পাইক বলা হত।
পাইকার জমি :- জমিদারদের অধীনে যারা সৈনিকের কাজ বা পাইক বরকন্দাজের কাজ করত তাদেরকে বেতনের পরিবর্তে জমিদারেরা যে জমি নিঃশুল্কে ভোগদখলের জন্য দিতেন ওই জমিগুলোকে বলা হত পাইকান জমি।
7) কেনারাম ও বেচারাম কি?
উত্তর: দামিন-ই-কোহ অঞ্চলে বহিরাগত ব্যবসায়ীরা দুই ধরনের বাটখারা ব্যবহার করত।
ক) কেনারাম :- ব্যবসায়ীরা যখন সাঁওতালদের কাছ থেকে কৃষিপণ্য কিনত তখন বেশি ওজনের বাটখারা ব্যবহার করত, এই বেশি ওজনের বাটখারয় কেনারাম নামে পরিচিত।
খ) বেচারাম :- আবার ব্যবসায়ীরা যখন সাঁওতালদের লবণ, চিনি প্রভৃতি পণ্য বিক্রয় করতো তখন কম ওজনের বাটখারা ব্যবহার করতো, এই কম ওজনের বাটখারাকে বেচারাম বলা হতো ।
8) কামিয়াতি ও হারওয়াহি কী?
উত্তর: কামিয়াতি ও হারওয়াহি হল দুই প্রকারের চুক্তি বা বন্ড, যা ঋনদাতা মহাজন ও ঋণগ্রহীতা সাঁওতালদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়।
কামিয়াতি :– কামিয়াতি হল ঋণ গ্রহীতা যতদিন না ঋণশোধ করতে পারবে ততদিন তাঁকে মহাজনের জমিতে বেগার খাটতে হবে ।
হারওয়াহি :– হারওয়াহি হল ঋন গ্রহীতাকে মহাজনের ভূমিতে বিনা পারিশ্রমিক লাঙল দিতে হবে। আর ৩৩ শতাংশ সুদ-সহ ঋনশোধ করতে হবে।
9) ভগনাডিহির মাঠ স্মরণীয় কেন?
উত্তর: দামিন-ই-হোক বলে পরিচিত রাজমহল পাহাড়সংলগ্ন এলাকার সাঁওতালরা ১৮৫৫ খ্রিঃ জমিদার, মহাজন ও ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে, যা সাঁওতাল বিদ্রোহ নামে পরিচিত।
ভগনাডিহি মাঠের ভূমিকা :- ১৮৫৫ খ্রিঃ ৩০ জুন ভগনাডিহির মাঠে ১০ হাজার সাঁওতাল সমবেত হয়ে সিধু ও কানু-র নেতৃত্বে স্বাধীন সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করে। প্রকৃতপক্ষে ভগনাডিহির মাঠ থেকেই সাঁওতালরা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, তাই সাঁওতাল বিদ্রোহের ইতিহাসে ভগনাডিহির মাঠ বিশেষভাবে স্মরণীয়।
10) তিন কাঠিয়া প্রথা’ বলতে কী বোঝ?
উত্তর: নীলকর সাহেবরা বিহারের চম্পারণ জেলার কৃষকদের প্রতি বিঘা জমির ৩ কাঠায় নীলচাষ করতে বাধ্য করত। প্রতি বিঘায় ৩ কাঠা জমিতে বাধ্যতা মূলক এই চাষের প্রথা ‘তিন কাঠিয়া প্রথা’ নামে পরিচিত।
11) খ্রিস্টান মিশনারিদের জন্য মুন্ডাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবন কীভাবে বিপন্ন হয়েছিল ?
উত্তর: খ্রিস্টান মিশনারি ও বহিরাগতদের আগমনের জন্য মুন্ডাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবন নানাভাবে বিঘ্নিত হয়।
ক) ধর্মীয় :- মুন্ডাদের মধ্যে খ্রিস্ট ধর্মের প্রচার শুরু হলে তাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক ধর্মের উপাসনা অনেকাংশে কমে যায়।
খ) সাংস্কৃতিক :- পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে মুন্ডাদের মধ্যে শিক্ষা-সংস্কৃতিতে বেশ কিছু ধ্যানধারণাগত পরিবর্তন ঘটে। এই ভাবে নতুন ধর্ম, নতুন সংস্কৃতি চালু হলে তাদের চিরাচরিত সংস্কৃতি বিপন্ন হয়।
12) সন্ন্যাসী ও ফকির কাদের বলা হত?
উত্তর: ভারতে মুঘল যুগের শেষের দিকে বিভিন্ন ভ্রাম্যমান সন্ন্যাসী ও ফকির সম্প্রদায়ের মানুষেরা বাংলা ও বিহারের নানা অংশে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন গিরি ও দশনামী সম্প্রদায়ভুক্ত সন্ন্যাসী এবং মাদারি সম্প্রদায়ভুক্ত ফকিরগন। এঁরা বাংলা ও বিহারে বসবাস করে কৃষির মাধ্যামে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকালে এই সকল সন্ন্যাসী ও ফকির সম্প্রদায়ের মানুষেরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন।
13) কবে, কাদের মধ্যে ‘চাইবাসার যুদ্ধ’ হয়েছিল? এই যুদ্ধে কারা পরাজিত হয়?
উত্তর: ১৮২০-২১ খ্রিস্টাব্দে কোল উপজাতি এবং পোড়াহাটের জমিদার ও সেনাপতি রোগসেস এর নেতৃত্বাধীন ইংরেজ বাহিনীর মধ্যে ‘চাইবাসার যুদ্ধ’ হয়েছিল। চাইবাসার যুদ্ধে কোলরা পরাজিত হয়।
14) সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ ব্যর্থ হল কেন?
উত্তর: ১৭৬৩-১৮০০ খ্রিঃ পর্যন্ত বাংলার সন্ন্যাসী ও ফকিররা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন করেছিল, তা ইতিহাসে সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ নামে পরিচিত।
কারণ :- ক) ১৭৬৬ খ্রিঃ থেকে সন্ন্যাসী-ফকিরদের মধ্যে আত্মকলহের ফলে বিদ্রোহীরা দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
খ) মজনু শাহ, ভবানী পাঠকদের মতো নেতারা পরাজিত ও নিহত হলে উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাবে এই বিদ্রোহ স্তিমিত হয়ে পড়ে।
গ) উন্নত আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও সাংগঠনিক শক্তির অভাবে তারা ইংরেজ সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে মোকাবিলা করতে না পারলে এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়।
15) তিতুমির স্মরণীয় কেন ?
উত্তর: বাংলায় ওয়াহাবি আন্দোলনের নেতা ছিলেন মির নিশার আলি বা তিতুমির। তিনি রায়বেরিলির সৈয়দ আহমদ ব্রেলভির সংস্পর্শে এসে ওয়াহাবি আদর্শে অনুপ্রানিত হন এবং আন্দোলন শুরু করেন। তিনি বাংলায় জমিদার, মহাজন, নীলকর ও ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলন সংগঠিত করেন। তিতুমির বাঁশের কেল্লা তৈরি করে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে বীরের ন্যায় মৃত্যুবরণ করেন।
16) বারাসাত বিদ্রোহ কী?
উত্তর: বাংলার ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলেন মির নিশার আলি বা তিতুমির। তিনি জমিদার মহাজন, নীলকর, ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং নিজেকে বারাসাত অঞ্চলের বাদশাহ বলে ঘোষনা করেন। ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে কাযুদ্ধে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। ২৪ পরগণার বারাসাত অঞ্চলে তিতুমির এই আন্দোলন করেছিলেন বলে, একে বারাসাত বিদ্রোহও বলা হয়।
17) দুদু মিঞা স্মরণীয় কেন ?
উত্তর: ফরাজি আন্দোলনের প্রবর্তক হলেন হাজি শরিয়তউল্লাহ। ১৮৪০ খ্রিঃ হাজি শরিয়ৎ উল্লাহ-র মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মহম্মদ মহসিন বা দুদু মিঞা ফরাজি আন্দোলনের পরিচালক হন।
কারণ :-
ক) দুদু মিঞার তত্ত্ব ছিল বৈপ্লবিক । তিনি বলতেন, জমি আল্লাহের দান। সুতরাং, ভূমির উপর কর ধার্য করার অধিকার কারও নেই।
খ) সুদক্ষ সংগঠক দুদু মিঞা বাংলায় তাঁর প্রভাবিত অঞ্চলে ফরাজ-ই ফিলাফৎ নামে এক প্রশাসন গড়ে তোলেন।
গ) তিনি তাঁর প্রভাবিত অঞ্চলকে কয়েকটি হলকায় বিভক্ত করে প্রতি হলকায় একজন ও নীলকরদের অত্যাচার প্রতিহত করা। দুদু মিঞার নেতৃত্বে ফরাজিরা জমিদার ও নীলকরদের আক্রমন করে ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল। এই সকল কারণে দুদুমি স্মরণীয়।
18) ফরাজি আন্দোলন ব্যর্থ হয় কেন?
উত্তর: হাজি শরিয়তউল্লাহ প্রবর্তিত ফরাজি আন্দোলন বিভিন্ন কারণে ব্যর্থ হয়েছিল।
ব্যর্থতার কারণ :-
ক) জন সমর্থনের অভাব :- ফরাজি আন্দোলন সংকীর্ণ ধর্মীয় চেতনার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল বলে রক্ষণশীল মুসলিম সমাজ আন্দোলনকারীদের সমর্থন করেনি।
খ) শক্তির অভাব :- ইংরেজ, জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো শক্তি আন্দোলনকারীদের ছিল না।
গ) নেতৃত্বের অভাব :- দুদু মিঞার পর উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাবে এই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে।
19) ফরাজি আন্দোলন কি নিছক ধর্মীয় আন্দোলন ছিল?
উত্তর: উনিশ শতকে ভারতে মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের পুনরুজ্জীবন নিয়ে যে আন্দোলন চলেছিল, তা পূর্ব বাংলায় ফরাজি আন্দোলন নামে পরিচিত হয়।
আন্দোলনের প্রকৃতি :- ফরাজি আন্দোলনের প্রকৃতি সর্ম্পকে ঐতিহাসিক দের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ক) ধর্মীয় সংস্কার :- ইসলাম ধর্মের শুদ্ধতা রক্ষা, প্রয়োজনীয় সংস্কার-সাধন, সামাজিক কুসংস্কার দূরীকরণ এবং ইসলাম ধর্মের বিশ্ব জনীন আবেদন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই আন্দোলন শুরু হয়।
খ) কৃষক আন্দোলন :- ধর্মীয় রঙের ছোঁয়া লাগলেও এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল কৃষকদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ।
গ) ব্রিটিশবিরোধিতা :- এই আন্দোলন ছিল ইংরেজ ও তার সমর্থক শ্রেণির বিরুদ্ধে পরিচালিত। ঐতিহাসিক বিনয়ভূষণ চৌধুরী বলেছেন, ফরাজি আন্দোলন মূলত প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলন হিসেবে দেখা দিলেও শেষ বিচারে কৃষক আন্দোলনের ব্যাপ্তি লাভ করেছিল।
20) ভিল কারা?
উত্তর: ভারতবর্ষের একটি প্রাচীনতম আদিবাসী সম্প্রদায় হল ভিল। গুজরাটে এবং মহারাষ্ট্রের খান্দেশ ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এই আদিবাসী সম্প্রদায় বসবাস করত। এরা চাষবাস ও পশুপালনের মাধ্যমে স্বাধীন ও স্বনির্ভর জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল। ভিলরা বিভিন্ন কারনে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে, যা ভিল বিদ্রোহ নামে খ্যাত।
21) নীলকর কাদের বলা হত ?
উত্তর: ইংল্যান্ডে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে যে শিল্পবিপ্লব ঘটেছিল, তার প্রভাবে সেদেশে প্রচুর বস্তু উৎপাদিত হতে থাকে। ফলে বস্ত্র রং করার জন্য ব্যবহৃত রঞ্জক, অর্থাৎ নীলের চাহিদাও ক্রমশ বাড়তে থাকে। নীল হল একরকম কৃষিজ বাণিজ্য ফসল। বাংলার মাটি ও আবহাওয়া নীলচাষের উপযোগী ছিল। ১৮৩৩ খ্রিঃ সনদ আইনের সুবিধীয় ইংল্যান্ড ও অন্যান্য দেশ থেকে দলে দলে খামার মালিকেরা বাংলায় আসেন ও নীলচাষ শুরু করে উৎপাদন করতে থাকেন। তারাই নীলকর সাহেব নামে পরিচিত।
22) এলাকা চাষ বা নিছ আবাদি চাষ বলতে কী বোঝো?
উত্তর: ব্রিটিশ শাসনকালে বাংলার নীলকরদের দুরকম নীলচাষের জমি ছিল। যথা – এলাকা চাষ বা নিজ আবাদি চাষ এবং বেএলাকা চাষ বা রায়তি আবাদ।
এলাকা চাষ বা নিজ আবাদি চাষ :- ক) এলাকা চাষ বা নিজ আবাদি চাষ এইরকম নীলচাষের জমি ছিল নীলকরদের জমিদারির খাসভূমি। এই জমিতে নীলের চাষ করতে নীলকরদের নগদ টাকা খরচ করে দূর থেকে শ্রমিক ভাড়া করে আনতে হতো।
(খ) নীল কমিশনের হিসাব অনুসারে নিজ এলাকা বা নিজ আবাদি ১০ হাজার বিঘা জমিতে নীলচাষের জন্য নীলকরদের খরচ পড়ত মোট ২.৫ লক্ষ টাকা।
23) বেএলাকা চাষ বলতে কী বোঝো?
উত্তর: এদেশে নীলচাষের ক্ষেত্রে নীলকর সাহেবদের হাতে এলাকা চাষ এবং বেএলাকা চাষ – এই দুই প্রকার জমি ছিল। ইউনিয়ন ব্যাংক ফেল করার পর নীলকরদের মূলধনে টান পড়ায় তারা ব্যয়সাপেক্ষ এলাকা চাষের বদলে বেএলাকা চাষ বা রায়তি আবাদ-এর দিকে উৎসাহিত হয়।
বেএলাকা চাষ :- ক) বেএলাকা চাষে রায়ত তার নিজ খরচাতেই নীলচাষ করত। বেএলাকা বা রায়তের জমিতে নীলচাষ করতে নীলকরদের সামান্য খরচ পড়ত। কারণ, জমি রায়তের হওয়ায় নীল করদের আর আলাদা করে জমি কিনতে হতো না, বরং তারা কৃষকের জমিতেই কৃষককে বিঘা প্রতি মাত্র ২ টাকা দাদন বা অগ্রিম দিয়ে নীলচাষ করাত।
খ) নীল কমিশনের হিসাব অনুযায়ী ১০ হাজার বিঘা রায়তি জমিতে নীলচাষের জন্য নীলকরের খরচ পড়ত মাত্র ২০ হাজার টাকা।
24) চুয়াড় কারা? কোন বিদ্রোহ চুয়াড় বিদ্রোহ নামে পরিচিত?
উত্তর: চুয়াড় :- ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ধলভূম ও বর্তমান ঘাটশিলা অঞ্চল নিয়ে জঙ্গলমহল গঠিত ছিল। এই জঙ্গলমহলের অধিকাংশ কৃষিজীবীদের ইংরেজ ও ইংরেজ সমর্থকরা চুয়াড় বলে অভিহিত করেন।
চুয়াড় বিদ্রোহ :- ক) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ওই জঙ্গলমহল অঞ্চলে রাজস্ব বৃদ্ধি করলে চুয়াড়রা বিদ্রোহ ঘোষণা করে, এটাই চুয়াড় বিদ্রোহ নামে পরিচিত।
খ) ঘাটশিলার জমিদার জগন্নাথ সিং ধলের নেতৃত্বে ১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দে এই বিদ্রোহ শুরু হয়। ৩২ বছর ধরে এই বিদ্রোহ চলেছিল।
25) বিরসা মুন্ডা স্মরণীয় কেন?
উত্তর: মুন্ডা বিদ্রোহের প্রধান নেতা বিরসা মুন্ডা মুন্ডাদের দীর্ঘদিনের অরণ্য সম্পদের অধিকারের ওপর সরকারি বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে ব্রিটিশরাজের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন মুন্ডারাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।তিনি বলেন বিদেশিদের বহিষ্কার না করলে কখনই স্বাধীনভাবে ধর্মচারণ করা সম্ভব নয়।অচিরেই তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন ও মুন্ডাদের চোখে ভগবান রূপে পুজিত হতে থাকেন। 1900 খ্রিস্টাব্দে এই মহান নেতা মৃত্যুবরণ করেন।
26) ‘জঙ্গল মহল’ বলতে কী বোঝো?
উত্তর: মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও ধলভূম (বর্তমানে ঘাটশিলা) অঞ্চল নিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার ঘন জঙ্গল আচ্ছন্ন বৃহৎ অঞ্চলকে বলা হয় ‘জঙ্গল মহল।
27) নীল বিদ্রোহে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা কীরূপ ছিল?
উত্তর: বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাসের নেতৃত্বে শুরু হওয়া নীল বিদ্রোহের সময় কলকাতার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির অধিকাংশ লোক বিদ্রোহ সম্পর্কে উদাসীন থাকলেও কয়েকজন শিক্ষিত হৃদয়বান ব্যক্তি নীলচাষিদের সমর্থনে কলম ধরেন।
নীল বিদ্রোহে হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা :- হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকার সম্পাদক হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় নীল বিদ্রোহের প্রতি সহমর্মী অবস্থান নিয়েছিলেন। চাষিদের (নীল) দুর্দশা এবং নীলকরদের অত্যাচার সম্পর্কে সুনিশ্চিত প্রবন্ধ রচনা করে তিনি সরকারের চোখ খুলে দেন। ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল–
ক) যে চাষি একবার নীলচাষ করেছে, বেঁচে থাকতে তার আর মুক্তি পাওয়ার উপায় নেই।
খ) নীলচাষে কোনো চাষিই ন্যায্য দাম পায় না, নীলচাষে লাভের চেয়ে ক্ষতি হয় বেশি ইত্যাদি।
মূলত হরিশচন্দ্রের উদ্যোগেই নীল বিদ্রোহের খবরাখবর বাংলা নিশ্চিত জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল।
মাধ্যমিক ক্লাস 10 ইতিহাস চতুর্থ অধ্যায়
4 নম্বরের প্রশ্ন উত্তর
1. দলিত বিষয়ে গান্ধিজি আম্বেদকরের বিতর্ক লেখো। ০৪
উত্তর: জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস নেতা গান্ধিজি ও ভারতের অনুন্নত সম্প্রদায়ের নেতা ভীমরাও রামজি আম্বেদকর উভয়ই অপৃশ্যতা দূরীকরনে ও দলিত শ্রেনীর উন্নয়নে উদ্যোগী হলেও উভয়ের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।
■ গান্ধিজি আম্বেদকর বিতর্ক :—
১) অস্পৃশ্যতা বিষয়ে মতপার্থক্য :– গান্ধিজির লক্ষ্য ছিল ভারতীয় সমাজের সামাজিক ব্যধি অস্পৃশ্যতা দূর করা। অপরদিকে আম্বেদকর চেয়েছিলেন অস্পৃশ্য হিন্দুদের হিন্দু সমাজ থেকে পৃথক করে অস্পৃশ্যদের জন্য একটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠীর স্বীকৃতি আদায় করতে চেয়েছিলেন।
২) হরিজন শব্দ ব্যবহারের মতভেদ :– গান্ধিজি দলিতদের হরিজন বা ইশ্বরের আপনজন বলে অভিহিত করেন। অপরদিকে, আম্বেদকর বলেন হরিজন শব্দটি অস্পৃশ্যতার একটি সুমিষ্ট নাম, তাই তিনি বোম্বাই আইন সভায় হরিজন শব্দ ব্যবহারের বিলের বিরোধিতা করেন।
৩) পৃথক নির্বাচনের দাবি নিয়ে মতভেদ :– আম্বেদকর নিম্নবর্গের হিন্দুদের বা দলিতদের জন্য পৃথক নির্বাচনের দাবি জানালে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র্যামসে ম্যাকডোনাল্ড তা মেনে নেন। কিন্তু গান্ধিজি দলিতদের পৃথক নির্বাচনের বিরোধিতা করেন। তিনি এর বিরুদ্ধে ১৯৩২ খ্রী. ২০ সেপ্টেম্বর জারবেদা জেলে অনশন শুরু করেন।
৪) বর্ণ ব্যবস্থা নিয়ে মতভেদ :– গান্ধিজি হিন্দু সমাজের চতুবর্ণ প্রথায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি দলিতদের বৃক্ষ ও ভারতীয় জাতির ভিত্তি এবং শূদ্রত্বকে ঈশ্বরের দান বলে মনে করতেন।
■ উপসংহার :— দলিত অধিকার বিষয়ে গান্ধিজি-আম্বেদকর বিরোধে মিমাংশা হয়নি। দলিতদের অধিকারের প্রশ্নে গান্ধিজি উদ্দোগকে আম্বেদকর পর্যাপ্ত নয় মনে করে পৃথক নির্বাচনের দাবিতে অটল থাকেন। কিন্তু দীর্ঘ অনশনে গান্ধিজির প্রাণ সংশয় দেখা দিলে আম্বেদকর গান্ধিজির সঙ্গে পুনা চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়।
2. টীকা লেখো :– বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স। ০৪
উত্তর: বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স হল বাংলার একটি বিপ্লবী গুপ্ত সমিতি। ১৯২৮ খ্রী. বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স নামক একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে ওঠে। এই দলের সর্বময় নেতা ছিলেন হেমচন্দ্র ঘোষ এছাড়াও বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত, দীনেশ গুপ্ত প্রমুখ ছিলেন এই দলের মহান বিপ্লবী।
■ বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স-এর বিশিষ্ট সদস্যবৃন্দ :– বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স দলের আদর্শ কার্যকলাপে আকৃষ্ট হয়ে বহু নারী ও পুরুষ বিপ্লবী এর সদস্য হন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন সত্য গুপ্ত, গণেশ ঘোষ, লোকনাথ বল, অনন্ত সিং, বাদল গুপ্ত, সূর্য সেন, বিনয় বসু প্রমুখ।
■ বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স দলের কার্যাবলি :–
(i) জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে সহ সভাপতি মোতিলাল নেহেরুকে এই দলের সদস্যরা সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানায়।
(ii) অপরেশন ফ্রিডম :– বিপ্লবী কার জন্য বিভিন্ন জেলে বন্দিদের মুক্ত করার জন্য এই দল শুরু করে অপরেশন ফ্রিডম।
(iii) অলিন্দ যুদ্ধ :– বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত, দীনেশ গুপ্ত কলকাতা রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান করেন ১৯৩০ খ্রী. ৮ ই ডিসেম্বর। তারা কারা বিভাগের অধ্যক্ষ সিম্পসনকে গুলি করে হত্যা করেন। রাইটার্স বিল্ডিং-এ ইংরেজ পক্ষের সঙ্গে এই গুলি বিনিময় অলিন্দ যুদ্ধ নামে পরিচিত।
(iv) গালিকে হত্যা :– বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের অন্যতম তরুণ বিপ্লবী কানাইলাল ভট্টাচার্য, দীনেশ গুপ্তের ফাঁসির দন্ডদাতা গালিককে আলিপুর জর্জ কোটের ভিতরে গুলি করে প্রতিশোধ নেন।
(v) অন্যান্য কার্যকলাপ :– বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের সদস্য বিমল দাশগুপ্ত ও জ্যোতিজীবন ঘোষ কর্তৃক মেদিনীপুরের জেলাশাসন পেডি, প্রদ্যুৎ ভট্টাচার্য ও নৃপেন দত্ত কর্তৃক ডগলাস, অনাথ পাঁজা ও মৃগেন দত্ত কর্তৃক বার্জ নিহত হন।
■ বেঙ্গল ভলেনটিয়ার্স দলের অবসান :– বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স দলের বিভিন্ন নেতা ও কর্মী কারাদন্ডে দন্ডিত হন। জেলে থাকার সময়ই এই দলের নেতারা আলাপ আলোচনা করে বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স দল ভেঙে দেন। পরবর্তী কালে এই দলের সদস্যরা সুভাষচন্দ্র বসুর ফরওয়ার্ড দলে যোগদান করেন।
■ উপসংহার :— বিংশ শতকের প্রথম থেকে বাংলা বিপ্লবী আন্দোলনের পীঠস্থানে পরিনত হয়েছিল। বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স ছিল এর প্রধান চালিকাশক্তি। মহাত্মা গান্ধি এই দলের কাজকর্মকে বিদ্রূপ করে ‘পার্ক সার্কাসের সাকার্স’ বলে মন্তব্য করেন। এই দলের বিপ্লবীদের দেশপ্রেম আত্মবলিদান ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক চিরস্বরণীয় অধ্যায়।
3. বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা লেখো। ০৪
উত্তর: ব্রিটিশ শাসক লর্ড কার্জন ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে নারীরা ব্যাপক সংখ্যায় অংশগ্রহণ করে।
■ সক্রিয় আন্দোলনে নারী :– (ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘রাখীবন্ধন’ উৎসব উদ্যাপনের আয়োজন করলে মহিলারা ওই অনুষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেন।
(খ) বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করার দিনটিকে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী ‘অরন্ধন’ দিবস হিসেবে পালন করার ডাক দিলে নারীরা ঘরে সেদিন রন্ধনকর্ম থেকে বিরত থাকেন।
(গ) ওইদিন বিকেলে আনন্দমোহন বসু হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতীক হিসেবে আপার সার্কুলার রোডে ‘মিলন মন্দির’ বা ফেডারেশন হলের ভিত্তি স্থাপন করলে নরনারী নির্বিশেষে ভাবাবেগে আপ্লুত হন।
■ বিলিতি পণ্য বর্জন :– বহু নারী বিলিতি পণ্য যেমন– বিলিতি শাড়ি, কাচের চুড়ি, লবণ, ওষুধপত্র ব্যবহার বন্ধ করে এবং দেশীয় মোটা কাপড় ব্যবহার শুরু করে। ঘর থেকে বেরিয়ে তারা মিছিল-মিটিং ও পিকেটিংয়ে অংশ নেন।
■ স্বদেশি প্রচার :– স্বদেশি পণ্যের প্রচারে বিভিন্ন নারী এগিয়ে আসেন। সরলাদেবী চৌধুরানি ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ স্থাপন করে স্বদেশি দ্রব্য বিপণন শুরু করেন। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রতাপাদিত্য উৎসব ও বীরাষ্টমী ব্রত পালন করে বাঙালি যুবকদের মধ্যে শৌর্যবীর্য, দেশপ্রেম ও সাহসিকতার আদর্শ প্রচার করেন। বহু ছাত্রী ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে দেশীয় নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে ভরতি হয়।
■ আন্দোলনে নেতৃত্ব :– সরলাদেবী চৌধুরানি, হেমাঙ্গিনী দাস, কুমুদিনী মিত্র, লীলাবতী মিত্র, সুবলা আচার্য, নির্মলা সরকার প্রমুখ নারী জাতীয় স্তরে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব দেন।
4. টীকা লেখো :– প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। ০৪
উত্তর: বাংলা তথা ভারতের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার একটি বিশিষ্ট নাম। তিনি হলেন ভারতের প্রথম মহিলা শহিদ।
■ জন্ম ও শিক্ষা :– প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ১৯১১ খ্রী. ৫মে চট্টগ্রামের ধলঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। চট্টগ্রামের খাস্তগীর বালিকা বিদ্যালয় থেকে পাশ করার পর তিনি ঢাকার ইডেন মহিলা কলেজ ও কলকাতার বেথুন কলেজে পড়েন।
■ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার-এর অবদান :—
(i) বিপ্লবী দলে যোগদান :– ঢাকাতে পড়ার সময় তিনি লীলা রায়-এর দীপালি সংঘের সঙ্গে যুক্ত হন। এখানে তিনি লাঠি খেলা, চোরা খেলায় প্রশিক্ষণ নেন। পরে তিনি মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে বিপ্লবী কাজে তার জীবন উৎসর্গ করেন। তিনি ফুলতার ছদ্মনাম গ্রহন করেন।
(ii) চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন :– ১৯৩০ খ্রী. ১৮ ই এপ্রিল মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। টেলিগ্রাম, টেলিফোন ধ্বংস, বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করেন।
(iii) ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ :– চট্টগ্রাম শহরের উত্তরে পাহাড়তোলি স্টেশনের কাছে এই ইউরোপীয় ক্লাবটি ছিল ব্রিটিশদের প্রমোদ কেন্দ্র। সূর্য সেনের নির্দেশে ১৯৩২ খ্রী. ২৩ সেপ্টেম্বর প্রীতিলতার নেতৃত্বে ১৫ জন বিপ্লবীর একটি দল এই ক্লাব আক্রমণ করেন। তাদের আক্রমনে ১ জন নিহত হন ও ১১ জন আহত হন। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার আগে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন।
■ উপসংহার :— দেশমাতাকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার জন্য প্রীতিলতার আত্মত্যাগ ভারতীয় বিপ্লবীদের দারুন ভাবে প্রভাবিত করে। তিনি ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম মহিলা শহিদ। তার দেশপ্রেম, সাহসিকতা, আত্মত্যাগ ভারতীয় নারীদের বিপ্লবী কার্যে উদ্বুদ্ধ করে।
5. বিংশ শতকের ছাত্র আন্দোলনের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো। ০৪
উত্তর: বিশ শতকে ভারতের জাতীয়মুক্তি সন্ধানে অপরিহার্য অংশ হিসাবে ছাত্র আন্দোলনের সুচনা হয়। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় প্রথম ছাত্র আন্দোলন শুরু হলেও পরবর্তীকালে জাতীয় আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে ছাত্র আন্দোলনে ব্যাপক অংশগ্রহন লক্ষ করা যায়।
■ বিশ শতকে ভারতে ছাত্র আন্দোলনের বৈশিষ্টসমূহ :—
১) সর্বভারতীয় আন্দোলনের ছাত্র সমাজ :– বিশ শতকে ভারতে যে কয়েকটি সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয়। যেমন– বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন, ভারতছাড়ো আন্দোলন। তার সবকয়টিতে ছাত্র সম্প্রদায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
২) সমাজতান্ত্রিক চেতনার প্রভাব :– ভারতে ছাত্র আন্দোলনের এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সমাজতান্ত্রিক চেতনার প্রভাব। রুল বিপ্লব ভারতের ছাত্র সমাজকে প্রবলভাবে আলোকিত করেছিল। পরবর্তী কালে সেই সমাজতান্ত্রিক আদর্শের দ্বারা ভারতের ছাত্র আন্দোলন প্রভাবিত হয়।
৩) ধর্ম নিরপেক্ষ আন্দোলন :– বিশ শতকে ছাত্র আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল সেগুলি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক ও রক্ষনশীলতামুক্ত।
৪) উচ্চবিত্ত শ্রেনির প্রাধান্য :– বিশ শতকে ভারতের ছাত্র আন্দোলনে যে সমস্ত ছাত্ররা যোগদান করেছিল তাদের অধিকাংশ ছিল ধনী উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। এদের অধিকাংশ পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ছিল।
৫) সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন :– সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে ভারতীয় ছাত্রসমাজ বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেছিল। বিভিন্ন গুপ্তসমিতিতে যোগদানের মধ্য দিয়ে বাংলার ছাত্রসমাজ সশস্ত্র বৈপ্লবিক কাজে অংশগ্রহণ করে।
৬) সমাজ কল্যানমূলক কর্মসূচি :– রাজনৈতিক কার্যকলাপ ছাড়াও দুর্ভিক্ষ, মহামারি, অস্পৃশ্যতা নিবারণ ইত্যাদিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
■ উপসংহার :— ১৯০৫ খ্রী. বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ও কানাইল সার্কুলারকে কেন্দ্র করে যে ছাত্র আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে গান্ধিজির নেতৃত্বে তা আরও ব্যাপকতা ধারণ করে। সমগ্র বিংশ শতকে জুড়ে সারা ভারতের ছাত্র আন্দোলনে যে বিভিন্ন পর্যায় দেখা গিয়েছিল তা জাতীয় মুক্তি সংগ্রামকে এক বিশিষ্ট মাত্রা এনে করেছিল।
6. সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে ভারতের ছাত্রদের অংশগ্রহণ উল্লেখ করো। ০৪
উত্তর: ভারতে বাংলা, পাঞ্জাব ও মহারাষ্ট্রের ছাত্রদের মধ্যে বিপ্লবী আন্দোলনের সর্বাধিক প্রভাব পড়ে।
১) বাংলা :– বাংলায় অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর গোষ্ঠী, ব্রতী সমিতি, সাধনা সমিতি, সুহৃদ সমিতি প্রভৃতি বিভিন্ন বিপ্লবী গুপ্তসমিতি স্থাপিত হয়। হেমচন্দ্র কানুনগো, ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকি, বাঘাযতীন, সূর্য সেন, বিনয়-বাদল-দীনেশ প্রমুখ বিপ্লবী সশস্ত্র নাশকতামূলক কাজকর্মে যুক্ত ছিলেন।
২) পাঞ্জাব :– পাঞ্জাবে বহু ছাত্র বিপ্লবী কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ে। লালা হরদয়াল বৈপ্লবিক কাজকর্ম শুরু করলে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে নির্বাসন দেয়। এরপর তিনি আমেরিকায় গদর পার্টি নামে বিপ্লবী দল প্রতিষ্ঠা করেন। কোমাগাতামারু নামক জাহাজে করে কলকাতায় আসার সময় এই দলের ২২ জন সদস্য পুলিশের গুলিতে নিহত হন। লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় (১৯১৫ খ্রি.) দোষী সাব্যস্ত করে পাঞ্জাবের বহু বিপ্লবীকে ফাঁসি বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে বিপ্লবী ভগৎ সিং, রাজগুরু ও আজাদ অত্যাচারী পুলিশ অফিসার সন্ডার্সকে হত্যা (১৯২৮ খ্রি.) করেন। পরের বছর ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত দিল্লি আইনসভায় বোমা নিক্ষেপ করেন।
৩) মহারাষ্ট্র :– মহারাষ্ট্রের বাল সমাজ, আর্যবান্ধব সমাজ প্রভৃতি গুপ্ত বিপ্লবী সমিতি গড়ে ওঠে। বাসুদেব বলবন্ত ফাদকে গোপনে বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তুলে যুবকদের বিপ্লবী আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেন। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চালানোর উদ্দেশ্যে তিনি রামোসিস সম্প্রদায়কে অস্ত্রশিক্ষা দেন। বালগঙ্গাধর তিলক মহারাষ্ট্রে ‘শিবাজি উৎসব’ ও ‘গণপতি উৎসব’ চালু করে যুবকদের মধ্যে বিপ্লবের ভাবধারা প্রচার করেন। দামোদর চাপেকর ও বালকৃয় চাপেকর নামে দুই ভাই মি, র্যান্ড ও তাঁর সহকারী আয়ার্স্টকে হত্যা (১৮৯৭ খ্রি.) করেন। দামোদর বিনায়ক সাভারকার ‘মিত্রমেলা’ ও ‘অভিনব ভারত’ নামে সমিতি প্রতিষ্ঠা করে মহারাষ্ট্রে বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে গতি আনেন।
উপসংহার :— ভারতের ছাত্ররা এদেশের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের অগ্রভাগে থেকে আন্দোলনকে শক্তিশালী করে তোলে। তাদের উদ্যোগে বাংলা, মহারাষ্ট্র ও পাঞ্জাবে বিপ্লবী আন্দোলন সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
7. টীকা লেখো : দীপালি সংঘ। ০৪
উত্তর: সুভাষচন্দ্র বসুর ঘনিষ্ঠ লীলা নাগ (রায়) ১৯২৩ খ্রী.১২ জন মহিলা সহযোগীকে নিয়ে ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেন দীপালি সংঘ। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত, বীনা দাস, শান্তি দাস প্রমুখ ছিলেন এই সংঘেরই সদস্যা। তাঁর সহকর্মী রেনুকা সেনের প্রচেষ্টায় কলকাতায় এই প্রতিষ্ঠানের একটি শাখা প্রতিষ্ঠা হয়। জয়শ্রী ছিল এই পত্রিকার মুখপত্র।
■ দীপালি সংঘ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য :–
(i) নারীদের বিপ্লবী আন্দোলন পরিচালনার জন্য যোগ্য করে তোলা
(ii) তাদের শক্তি ও সাহস বৃদ্ধি করা
(iii) স্বদেশপ্রেম বৃদ্ধি করা
(iv) নারী জাগরণ ঘটানো
(v) নারীদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার ঘটানো ছিল এই সংঘ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য।
এই সংঘের মাধ্যমে ভারতে বৈপ্লবিক কার্যে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
■ প্রশিক্ষণ :– প্রকাশ্যে এই সংঘটি ছিল শরীরচর্চা ও নারীশিক্ষা বিকাশের জন্য। কিন্তু এই সংঘের মাধ্যমে বিপ্লবী আদর্শ প্রচার করা হতো। নারীদের শক্তি ও সাহস বৃদ্ধির জন্য এখানে নিয়মিত লাঠি খেলা, শরীরচর্চা, অস্ত্রচালানো ইত্যাদির প্রশিক্ষন দান করা হতো।
■ শিক্ষার প্রসার :– তাঁর উদ্দোগ্যে মেয়েদের হাতের কাজে, শিল্প ও অন্যান্য কাজে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা হয়। এই সংঘের মাধ্যমে ঢাকার বিভিন্ন স্নানে ১২ টি অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। দীপালি স্কুল, নারী শিক্ষা মন্দির, শিক্ষা ভবন প্রভৃতি ইংরাজী উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়।
■ দীপালি প্রদর্শনী :– দীপালি সংঘের প্রচেষ্টায় ১৯২৪ খ্রী. চালু হয় দীপালি প্রদর্শনী। এতে বাংলার নারীরা খুঁজে পায় মুক্তি সংগ্রামের দিশা।
উপসংহার :— ভারতের নারী মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাসে, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে, বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে লীলা রায় এবং তার দলের গুরুত্ব অপনি অপরিসীম। ১৯২৬ খ্রী. তিনি গড়ে তোলেন দীপালি ছাত্রী সংঘ। এটি ছিল ভারতের প্রথম ছাত্রী প্রতিষ্ঠান। দীপালি সংঘের হাত ধরেই বহু নারী বিপ্লবী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রেরণা লাভ করে।
8. বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা লেখো। ০৪
উত্তর: ব্রিটিশ শাসনের উচ্ছেদের জন্য বিংশ শতকের প্রথমদিকে ভারতের বিপ্লবীরা সশস্ত্র যে প্রচেষ্টা চালায় তাকে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন বলা হয়। বিংশ শতকে ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনে বিভিন্ন নারীও যুক্ত হয়ে পড়েন। তারাও ভারতমাতাকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার জন্য চরম অত্যাচার সহ্য করেছেন, কারাবরণ করেছেন এমনকী নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
■ সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা :—
১) দীপালি সংঘ :– ১৯২৩ খ্রী. লীলা নাগ ঢাকায় নারীদের বিপ্লবে সামিল করার উদ্দেশ্যে দিপালী সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংঘে সদস্যদের লাঠি খেলা, শরীরচর্চা, অস্ত্রচালনো প্রভৃতি শিক্ষা দেওয়া হত।
২) প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার :– প্রীতিলতা চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন, জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধ, ধলঘাটের যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৩২ খ্রী. ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ করে পুলিশের হাতে ধরা পড়ার আগে তিনি পটাশিয়াম সাইনাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন। ইনিই ছিলেন প্রথম মহিলা শহিদ।
৩) কল্পনা দত্ত :– কল্পনা দত্ত ছিলেন ছাত্রী সংঘ ও রিপাবলিক্যান আর্মির সদস্যা, তিনি বিপ্লবীদের পালানোর সুযোগ করে দিতে কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে বিষ প্রয়োগ করেন। তিনিও ইউরোপিয় ক্লাব আক্রমণের দায়িত্ব পান কিন্তু আক্রমনের আগেই ধরা পড়েন এবং যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দণ্ডিত করেন।
৪) বীনা দাস :– বীনা দাস ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুর শিক্ষাগুরু বেণীমাধব দাসের কন্যা। ১৯৩২ খ্রী. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে লক্ষ্য করে গুলি চালালে তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় ফলে গ্রেপ্তার হন এবং ৯ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়।
৫) ঝাঁসি বাহিনী :– আজাদ হিন্দ ফৌজের নারীবাহিনীর নাম ছিল ঝাঁসি বাহিনী। এই বাহিনীর নেত্রী ছিলেন লক্ষ্মী স্বামীনাথন। ১৯৪৪ খ্রী. আজাদ হিন্দ বাহীনি ব্রিটিশদের হাতে পরাজিত হলে লক্ষ্মী স্বামীনাথন গ্রেপ্তার হন। এছাড়াও সুনীতি চৌধুরি, শান্তি দাস, উজ্জ্বলা মজুমদার প্রমুখ সশস্ত্র নারী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৩১ খ্রী. ১৪ ই ডিসেম্বর সুনীতি চৌধুরি ও শান্তি দাস জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেনকে হত্যা করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।
■ উপসংহার :— বাংলা তথা ভারতে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন অপরিসীম হলেও মূলত বাংলার নারীরা বিপ্লবী আন্দোলনে অনেক বেশি সংখ্যায় অংশগ্রহণ করেনি। এবং এই আন্দোলন ছিল শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সর্বস্তরের নারীরা এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেনি।
দশম শ্রেণি ইতিহাস চতুর্থ অধ্যায়
৮ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর
1. বাংলার নমঃশূদ্র আন্দোলন সম্পর্কে লেখো। ০৮
উত্তর: নমঃশূদ্র হল বাংলার হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বড়ো জনগোষ্ঠী, ঔপনিবেশিক শাসনকালে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে দলিত সম্প্রদায় নিজ নিজ সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন গড়ে তোলে। এগুলির মধ্যে বাংলার নমঃশূদ্র আন্দোলন ছিল অন্যতম। শ্রী হরিচাদ ঠাকুর ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে নমঃশূদ্ররা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করেন।
■ নমঃশূদ্র আন্দোলনের কারণ :— বিভিন্ন কারণে নমঃশূদ্ররা আন্দোলন শুরু করেছিল।
১) সামাজিক মর্যাদা হীনতা :– নমঃশূদ্ররা নিম্ন সম্প্রদায়ভুক্ত বলে তাদের ঘৃণার চোখে দেখা হত। তাদেঁর অস্পৃশ্য বলে মনে করা হত। ১৮৭২ খ্রী. ফরিদপুর, বাখরগঞ্জ অঞ্চলের একজন বিশিষ্ট নমঃশূদ্র নেতার মায়ের সাধ্য অনুষ্ঠানে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা যোগ দান করতে অস্বীকার করলে এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে।
২) দারিদ্রতা :– নমঃশূদ্ররা অন্যের কৃমিভূমিতে মজুরের কাজ, মাছ ধরা, তাঁত বোনা, অন্যের বাড়ি দীনমুজুরের কাজ করা প্রভৃতি নিম্ন আয়ের পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এইসব কারণে প্রচলিত সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাদের মনে ক্ষোভ জমে ছিল।
৩) সাম্প্রদায়িকতা :– শুধু উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা নয় মুসলমান সম্প্রদায়ও নমঃশূদ্রদের ওপর চরম অত্যাচার চালাত বল-পূর্বক নমঃশূদ্রদের ফসল কেটে নিতে, ফসল নষ্ট করত, গোরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি কেড়ে নিয়ে যেতে আবার বাঁধা দিলে তাদের ওপর চরম অত্যাচার করত।
৪) বিভিন্ন ক্ষেত্রে বঞ্চনা :– নিম্নসম্প্রদায়ভুক্ত বলে সমাজের সকলের সঙ্গে শিক্ষাগ্রহণ, চিকিৎসার সুযোগ সুবিধা লাভ ইত্যাদি থেকে তারা ছিল বঞ্চিত। ফলে অজ্ঞতা, কুসংস্কার প্রভৃতির জন্য তাদের জীবন ছিল অন্ধকারাছন্ন।
■ নেতৃত্ব :— নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের সামাজিক মর্যাদা আদায় ও অর্থনৈতিক শোষন থেকে মুক্তির জন্য কয়েকজন নেতার আবির্ভাব ঘটে। এরা হলেন প্রভু জগবন্ধু, শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর, শ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর এছাড়াও মুকুন্দ বিহারী মল্লিক, বিরাটচন্দ্র মন্ডল, যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল প্রমুখ।
■ নমঃশূদ্রদের সামাজিক আন্দোলন :— নমঃশূদ্ররা তাদের অসম্মানজনক চন্ডাল নামের পরিবর্তে নমঃশূদ্র নামে অনুমোদন চেয়েছিল। নমঃশূদ্ররা সমাজের উঁচুনীচু বিভেদ দূর করতে এবং তাদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতীক গ্রহন করতে থাকে –
(i) তারা নিজেদের ব্রাহ্মন বলে দাবি করে এবং তার সপক্ষে প্রমাণ দাখিল করে।
(ii) তারা ব্রাহ্মনদের মতো উপবীত ধারণ করা শুরু করে।
(iii) পরিবারের মহিলাদের বাজার যাওয়া বন্ধ করে।
(iv) ১১ দিন অশৌচ পালন করে।
■ মূল্যায়ন :— নমঃশূদ্র আন্দোলন দলিত আন্দোলন হিসাবে শুরু হলেও তা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়। নমঃশূদ্ররা তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের জন্য তাদের আন্দোলনকে কখনও জাতি ভিত্তিক কখনও সাম্প্রদায়িক আবার কখনও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে পরিচালিত হয়েছিল।





