মাধ্যমিক বাংলা

‘বহুরূপী’ গল্প

প্রশ্ন উত্তর নোটস (MCQ ও বড় প্রশ্ন)  

Published on: 

  আজ আমরা দশম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যক্রমের  প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ রচিত ‘বহুরূপী’ ছোটোগল্প নিয়ে আলোচনা করব। এই গল্পের প্রধান চরিত্র হরিদা, যিনি পেশায় একজন বহুরূপী। চূড়ান্ত দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটালেও, নিজের শিল্পের প্রতি তাঁর যে অগাধ সততা এবং লোভহীন আত্মমর্যাদাবোধ, তা আমাদের বিস্মিত করবে।

‘বহুরূপী’ – সুবোধ ঘোষ

( দশম শ্রেণী বাংলা গল্প)

 

বহুরূপী গল্পের উৎস ও লেখক পরিচিতি 

 

‘বহুরূপী’ গল্পটির রচয়িতা হলেন বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ । বিচিত্র কর্মজীবনের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এই লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে ‘পরশুরামের কুঠার’, ‘ফসিল’, ‘জতুগৃহ’ ইত্যাদি । ছোটোগল্প ছাড়াও তিনি বহু উপন্যাস, প্রবন্ধ ও গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জগত্তারিণী’  স্বর্ণপদক লাভ করেছেন ।

 

বহুরূপী গল্পের সারাংশ 

 

গল্পের প্রধান চরিত্র হরিদা শহরের একটি সরু গলির ছোট্ট ঘরে অত্যন্ত দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করেন । মাঝে মাঝে তাঁর উনানের হাঁড়িতে ভাতের বদলে শুধু জল ফোটে । তা সত্ত্বেও রোজ ঘড়ির কাঁটা ধরে কোনো একঘেয়ে চাকরি করা তাঁর পছন্দ নয় । তাই তাঁর পেশা হলো মাঝে মাঝে বহুরূপী সেজে মানুষকে চমকে দেওয়া এবং তা থেকে প্রাপ্ত সামান্য বকশিশ দিয়ে দিন গুজরান করা । তিনি কখনও পাগল, কখনও রূপসি বাইজি, কখনও বাউল, আবার কখনও দয়ালবাবুর লিচু বাগানে নকল পুলিশ সেজে রোজগার করতেন ।

একদিন হরিদা বন্ধুদের কাছে শোনেন যে, ধনী কৃপণ জগদীশবাবুর বাড়িতে এক হিমালয়বাসী উঁচু দরের সন্ন্যাসী এসেছিলেন, যিনি সারাবছর কেবল একটি হরীতকী খান । জগদীশবাবু সোনার বোল লাগানো কাঠের খড়ম পরিয়ে কৌশলে সেই সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো নিয়েছিলেন এবং জোর করে একশো টাকা প্রণামী দিয়েছিলেন । এই গল্প শুনে হরিদা ঠিক করেন, তিনিও এমন এক ‘জবর খেলা’ দেখাবেন যাতে তাঁর সারা বছরের রোজগার একবারে হয়ে যায় ।

পরিকল্পনামতো, একদিন সন্ধ্যায় হরিদা এক পরম বিরাগীর ছদ্মবেশে জগদীশবাবুর বাড়িতে উপস্থিত হন । তাঁর আদুড় গায়ে ধবধবে সাদা উত্তরীয়, পরনে সাদা থান এবং ঝোলার ভেতর একটি গীতা । তাঁর উদাত্ত ও শান্ত কথাবার্তায় মুগ্ধ হয়ে জগদীশবাবু তাঁকে একশো এক টাকার নোটের তাড়া প্রণামী দিতে চান । কিন্তু একজন খাঁটি বিরাগী সন্ন্যাসীর নিখুঁত অভিনয় বজায় রাখার খাতিরে হরিদা অনায়াসে সেই একশো এক টাকার থলি সিঁড়িতে ফেলেই চলে আসেন । পরে বন্ধুদের অবাক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান যে, বিরাগী সেজে টাকা স্পর্শ করলে তাঁর শিল্পের “ঢং নষ্ট হয়ে যায়” । একজন গরিব বহুরূপী হয়েও খাঁটি শিল্পীর মতো তিনি কেবল তাঁর প্রাপ্য আট-দশ আনা বকশিশটুকুই দাবি করতে চান ।

 

বহুরূপী গল্পের নামকরণের তাৎপর্য

 

 সাহিত্যে নামকরণ রচনার মূল সুরটি ধরিয়ে দেয়। ‘বহুরূপী’ বলতে এমন একজন মানুষকে বোঝায় যিনি বিভিন্ন রূপ বা ছদ্মবেশ ধারণ করে মানুষের মনোরঞ্জন করেন । গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিদা পেশায় একজন বহুরূপী । তিনি কখনও উন্মাদ পাগল, কখনও রূপসি বাইজি, কখনও পুলিশ বা কাবুলিওয়ালা সেজে জীবিকা নির্বাহ করেন । গল্পের চরম মুহূর্তে তিনি এক পরম বিরাগীর রূপ ধারণ করেন এবং ধনী জগদীশবাবুকে মুগ্ধ করেন । কিন্তু তিনি তাঁর ছদ্মবেশের প্রতি এতটাই সৎ ছিলেন যে, একজন বিরাগী হয়ে টাকা স্পর্শ করলে তাঁর “ঢং নষ্ট হয়ে যায়” বলে তিনি একশো এক টাকার প্রণামী অবলীলায় ত্যাগ করেন । তীব্র অভাব থাকা সত্ত্বেও একজন সাধারণ বহুরূপীর এই অসাধারণ শিল্পসত্তা, নির্লোভ মানসিকতা ও সততাই গল্পটির মূল উপজীব্য। তাই বিষয়বস্তুর বিচারে “বহুরূপী” নামকরণটি অত্যন্ত সার্থক ও নিখুঁত হয়েছে ।

দশম শ্রেণী ‘বহুরূপী’ গল্পে

ছোট প্রশ্ন উত্তর (SAQ)

 

১. ‘বহুরূপী’ গল্পের রচয়িতা কে?
উত্তর: ‘বহুরূপী’ গল্পের রচয়িতা হলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ ।

২. হরিদার পেশা কী ছিল?
উত্তর: হরিদার পেশা ছিল মাঝে মাঝে বিচিত্র ছদ্মবেশে বহুরূপী সেজে রোজগার করা ।

৩. হরিদা শহরের কোথায় থাকতেন?
উত্তর: হরিদা শহরের সবচেয়ে সরু গলির ভিতরের একটি ছোট্ট ঘরে থাকতেন ।

৪. জগদীশবাবুর বাড়িতে যে সন্ন্যাসী এসেছিলেন, তিনি কোথায় থাকেন?
উত্তর: সেই উঁচু দরের সন্ন্যাসী হিমালয়ের গুহাতে থাকেন ।

৫. সন্ন্যাসীর বয়স কত বলে অনেকে মনে করেন?
উত্তর: সন্ন্যাসীর বয়স হাজার বছরের বেশি বলে অনেকেই মনে করেন ।

৬. সন্ন্যাসী সারা বছরে কী খেতেন?
উত্তর: সন্ন্যাসী সারা বছরে শুধু একটি হরীতকী খেতেন, এ ছাড়া আর কিছুই খেতেন না ।

৭. জগদীশবাবু কীভাবে সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো নিয়েছিলেন?
উত্তর: জগদীশবাবু একজোড়া কাঠের খড়মে সোনার বোল লাগিয়ে সন্ন্যাসীর পায়ের কাছে ধরেছিলেন । সন্ন্যাসী বাধ্য হয়ে সেই খড়ম পরলে, সেই ফাঁকে তিনি পায়ের ধুলো নিয়েছিলেন ।

৮. বিদায় নেওয়ার সময় জগদীশবাবু সন্ন্যাসীর ঝোলার ভিতর কত টাকা ফেলে দিয়েছিলেন?
উত্তর: জগদীশবাবু জোর করে একশো টাকার একটা নোট সন্ন্যাসীর ঝোলার ভেতরে ফেলে দিয়েছিলেন ।

৯. আড্ডার সময় চা, চিনি আর দুধ কারা নিয়ে আসত?
উত্তর: হরিদার ঘরে আড্ডার জন্য চা, চিনি আর দুধ গল্পকথক (লেখক) এবং তাঁর বন্ধুরাই নিয়ে আসতেন ।

১০. হরিদার উনানের হাঁড়িতে অনেক সময় কী ফোটে?
উত্তর: চরম দারিদ্র্যের কারণে হরিদার উনানের হাঁড়িতে অনেক সময় শুধু জল ফোটে, ভাত ফোটে না ।

১১. হরিদা কোন্ ধরনের কাজ পছন্দ করতেন না?
উত্তর: ঘড়ির কাঁটার সামনে সময় বেঁধে দিয়ে নিয়ম করে রোজ একটি বাঁধাধরা চাকরির কাজ করা হরিদার পছন্দ ছিল না ।

১২. চকের বাস স্ট্যান্ডের কাছে দুপুরবেলা কীসের হল্লা বেজে উঠেছিল?
উত্তর: চকের বাস স্ট্যান্ডের কাছে ঠিক দুপুরবেলাতে একটা উন্মাদ পাগলের আতঙ্কের হল্লা বেজে উঠেছিল ।

১৩. পাগলরূপী হরিদার গলায় কীসের মালা ছিল?
উত্তর: পাগলটার গলায় টিনের কৌটার একটা মালা জড়ানো ছিল ।

১৪. পাগলটা বাসের যাত্রীদের দিকে কী হাতে তেড়ে যাচ্ছিল?
উত্তর: পাগলটা একটা থান ইট হাতে তুলে নিয়ে বাসের উপরে বসা যাত্রীদের দিকে তেড়ে যাচ্ছিল ।

১৫. বাসের ড্রাইভারের নাম কী ছিল?
উত্তর: বাসের ড্রাইভারের নাম ছিল কাশীনাথ ।

১৬. রূপসি বাইজির ছদ্মবেশে হরিদার কত টাকা রোজগার হয়েছিল?
উত্তর: বাইজির ছদ্মবেশে হরিদার মোট আট টাকা দশ আনা রোজগার হয়েছিল ।

১৭. পুলিশ সেজে হরিদা কোথায় দাঁড়িয়েছিলেন?
উত্তর: পুলিশ সেজে হরিদা দয়ালবাবুর লিচু বাগানের ভিতরে দাঁড়িয়েছিলেন ।

১৮. দয়ালবাবুর লিচু বাগানে হরিদা কাদের ধরেছিলেন?
উত্তর: দয়ালবাবুর লিচু বাগানে হরিদা স্কুলের চারটে ছেলেকে ধরেছিলেন ।

১৯. স্কুলের মাস্টারমশাইয়ের কাছ থেকে নকল পুলিশ হরিদা কত টাকা ঘুষ নিয়েছিলেন?
উত্তর: স্কুলের মাস্টারমশাইয়ের কাছ থেকে হরিদা আট আনা ঘুষ নিয়েছিলেন ।

২০. “আজ তোমাদের একটা জবর খেলা দেখাব।” – উক্তিটির বক্তা কে?
উত্তর: উক্তিটির বক্তা হলেন হরিদা ।

২১. জগদীশবাবুর বাড়িতে খেলা দেখিয়ে হরিদা কী আশা করেছিলেন?
উত্তর: হরিদা ভেবেছিলেন জগদীশবাবুর বাড়িতে খেলা দেখিয়ে তিনি মোটা মতন কিছু আদায় করে নেবেন, যাতে তাঁর সারা বছর চলে যায় ।

২২. সন্ধ্যায় জগদীশবাবুর বাড়িতে লেখক ও তাঁর বন্ধুরা কীসের জন্য গিয়েছিলেন?
উত্তর: লেখক এবং তাঁর বন্ধুরা স্পোর্টের চাঁদা নেওয়ার জন্য সন্ধ্যায় জগদীশবাবুর কাছে গিয়েছিলেন ।

২৩. জগদীশবাবু বারান্দায় কোথায় বসেছিলেন?
উত্তর: জগদীশবাবু তাঁর বাড়ির বারান্দাতে মস্ত বড়ো একটা আলোর কাছে একটা চেয়ারের উপর বসেছিলেন ।

২৪. বিরাগী সেজে আসা হরিদার পরনে কী ছিল?
উত্তর: বিরাগী সেজে আসা হরিদার আদুড় গায়ে একটি ধবধবে সাদা উত্তরীয় এবং পরনে ছোটো বহরের একটি সাদা থান ছিল

২৫. বিরাগীর ঝোলার ভিতরে কোন্ বই ছিল?
উত্তর: বিরাগীর ঝোলার ভিতরে শুধু একটি বই ছিল, গীতা ।

২৬. আগন্তুক বিরাগী জগদীশবাবুকে কত টাকার সম্পত্তির অহংকারের কথা বলেছিলেন?
উত্তর: আগন্তুক বিরাগী জগদীশবাবুকে তাঁর এগারো লক্ষ টাকার সম্পত্তির অহংকারের কথা বলেছিলেন ।

২৭. জগদীশবাবু বিরাগীর কাছে কীসের উপদেশ শুনতে চেয়েছিলেন?
উত্তর: জগদীশবাবু মনে শান্তি পাওয়ার জন্য বিরাগীজির কাছে কিছু উপদেশ শুনতে চেয়েছিলেন ।

২৮. বিরাগীজি ধন, জন ও যৌবনকে কী বলে উল্লেখ করেছেন?
উত্তর: বিরাগীজি ধন, জন ও যৌবনকে সুন্দর সুন্দর এক-একটি বঞ্চনা বলে উল্লেখ করেছেন ।

২৯. জগদীশবাবু প্রণামী হিসেবে বিরাগীকে কত টাকা দিতে চেয়েছিলেন?
উত্তর: জগদীশবাবু প্রণামী এবং তীর্থ ভ্রমণের জন্য বিরাগীকে থলিভর্তি একশো এক টাকা দিতে চেয়েছিলেন ।

৩০. বিরাগী কেন টাকা স্পর্শ করেননি?
উত্তর: হরিদা টাকা স্পর্শ করেননি কারণ তাতে তাঁর বিরাগী সন্ন্যাসীর ঢং বা চরিত্রের সত্যতা নষ্ট হয়ে যেত ।

৩১. বহুরূপী সাজে টাকা না নিলেও, হরিদা পরে জগদীশবাবুর কাছে কী দাবি করবেন বলে ভেবেছিলেন?
উত্তর: হরিদা ভেবেছিলেন নিজের আসল রূপে জগদীশবাবুর কাছে গিয়ে অন্তত বকশিশটা দাবি করবেন ।

৩২. জগদীশবাবুর কাছে হরিদা বকশিশ হিসেবে বড়োজোর কত টাকা আশা করতে পারেন?
উত্তর: জগদীশবাবুর কাছে হরিদা বকশিশ হিসেবে বড়োজোর আট আনা কিংবা দশ আনা আশা করতে পারেন ।

৩৩. লেখক সুবোধ ঘোষ কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর: প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ বিহারের হাজারিবাগে জন্মগ্রহণ করেন ।

৩৪. সুবোধ ঘোষ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন্ স্বর্ণপদক লাভ করেন?
উত্তর: সুবোধ ঘোষ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জগত্তারিণী’ স্বর্ণপদক লাভ করেন ।

৩৫. লেখক সুবোধ ঘোষের লেখা দুটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের নাম করো।
উত্তর: তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে ‘পরশুরামের কুঠার’, ‘ফসিল’, ‘জতুগৃহ’ ইত্যাদি ।

৩৬. ‘বহুরূপী’ গল্পটির লেখকের নাম কী?
উত্তর: গল্পটির লেখক হলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ ।

৩৭. জগদীশবাবুর বাড়িতে আসা সন্ন্যাসী সারা বছরে কী খেতেন?
উত্তর: সন্ন্যাসী সারা বছরে শুধু একটি হরীতকী খেতেন ।

৩৮. হরিদার জীবনের পেশা কী ছিল?
উত্তর: মাঝে মাঝে বহুরূপী সেজে রোজগার করাই ছিল হরিদার জীবনের পেশা ।

৩৯. হরিদা বাইজি সেজে মোট কত টাকা রোজগার করেছিলেন?
উত্তর: বাইজির ছদ্মবেশে হরিদা মোট আট টাকা দশ আনা রোজগার করেছিলেন ।

৪০. দয়ালবাবুর লিচু বাগানে হরিদা কী সেজে দাঁড়িয়েছিলেন?
উত্তর: দয়ালবাবুর লিচু বাগানে হরিদা পুলিশ সেজে দাঁড়িয়েছিলেন ।

৪১. বিরাগী সেজে হরিদা হাতে কী নিয়ে জগদীশবাবুর বাড়িতে গিয়েছিলেন?
উত্তর: বিরাগী সেজে হরিদার হাতে একটি ঝোলা ছিল, যার ভেতরে শুধু একটি গীতা রাখা ছিল ।

৪২. জগদীশবাবু বিরাগীকে কত টাকা প্রণামী দিতে চেয়েছিলেন?
উত্তর: জগদীশবাবু বিরাগীকে একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চেয়েছিলেন ।

৪৩. বিরাগী টাকা না নিয়ে চলে যাওয়ার কারণ হিসেবে হরিদা বন্ধুদের কী বলেছিলেন?
উত্তর: হরিদা বলেছিলেন, একজন বিরাগী সন্ন্যাসী হয়ে টাকা স্পর্শ করলে তাঁর ঢং নষ্ট হয়ে যায়, তাই তিনি টাকা নেননি ।

  বাংলা বহুরূপী গল্পে

ব্যখ্যামূলক প্রশ্ন উত্তর

(প্রশ্নমান ৩)  

 

১. “খুব উঁচু দরের সন্ন্যাসী” – সন্ন্যাসীর পরিচয় সংক্ষেপে দাও।

উত্তর: সুবোধ ঘোষের লেখা ‘বহুরূপী’ গল্পে উল্লিখিত সন্ন্যাসী ছিলেন খুব উঁচু দরের একজন মানুষ যিনি হিমালয়ের গুহাতে থাকতেন । তাঁর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত কঠোর; সারা বছরে তিনি শুধুমাত্র একটি হরীতকী খেতেন, এছাড়া অন্য কিছুই আহার করতেন না । অনেকেই মনে করতেন যে, এই সন্ন্যাসীর বয়স হাজার বছরেরও বেশি । তিনি এতটাই দুর্লভ প্রকৃতির ছিলেন যে, একমাত্র জগদীশবাবু ছাড়া আর কাউকেই তিনি তাঁর পায়ের ধুলো নিতে দেননি ।

২. “হরিদার জীবনে সত্যিই একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য আছে।” – হরিদার জীবনের নাটকীয় বৈচিত্র্যটি কেমন ছিল?

উত্তর: হরিদা পেশায় ছিলেন একজন বহুরূপী এবং এটাই ছিল তাঁর জীবনের প্রধান বৈচিত্র্য । অত্যন্ত গরিব হওয়া সত্ত্বেও ঘড়ির কাঁটা ধরে নিয়ম করে কোনো অফিসে বা দোকানে চাকরি করা তাঁর একদমই পছন্দ ছিল না । একঘেয়ে অভাবকে সহ্য করতে পারলেও, একঘেয়ে কাজে তাঁর ঘোর আপত্তি ছিল । মাঝে মাঝে তিনি উপোস করতেন এবং তারপর হঠাৎ একদিন সকালে বা সন্ধ্যায় বিচিত্র সব ছদ্মবেশ ধারণ করে অপরূপ হয়ে পথে বের হতেন । তিনি কখনো পাগল, কখনো রূপসি বাইজি, কখনো বাউল, কাপালিক, বোঁচকা কাঁধে কাবুলিওয়ালা, সাহেব কিংবা পুলিশ সেজে মানুষকে চমকে দিতেন । এই বহুরূপী সেজে মানুষকে চমকে দিয়ে যেটুকু রোজগার হতো, তাতেই তিনি নিজের অন্নসংস্থান করতেন । সাধারণ ছকে বাঁধা জীবনের বাইরে বিভিন্ন রূপ ধারণ করে বেঁচে থাকার এই অভিনব পদ্ধতিকেই হরিদার জীবনের ‘নাটকীয় বৈচিত্র্য’ বলা হয়েছে ।

৩. “আপনি কি ভগবানের চেয়েও বড়ো?” – কাকে, কেন এ কথা বলা হয়েছে?

উত্তর: সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পে বিরাগী সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে থাকা হরিদা এই কথাটি শহরের ধনী ব্যক্তি জগদীশবাবুকে বলেছিলেন ।

জগদীশবাবুর বাড়িতে যখন বিরাগীবেশী হরিদা উপস্থিত হন, তখন জগদীশবাবু তাঁর বাড়ির বারান্দায় একটি চেয়ারের উপর বসেছিলেন । সন্ন্যাসীকে দেখে তিনি অভ্যর্থনা জানানোর জন্য শুধু নিজের জায়গায় উঠে দাঁড়ান, কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসেন না । এই আচরণ দেখে বিরাগীবেশী আগন্তুক হাসতে হাসতে তাঁকে প্রশ্ন করেন যে তিনি ভগবানের চেয়েও বড়ো কি না । আগন্তুক তাঁকে আরও স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে, এগারো লক্ষ টাকার সম্পত্তির অহংকারে জগদীশবাবু নিজেকে ভগবানের চেয়েও বড়ো ভাবছেন বলেই তিনি নিচে নেমে আসতে পারছেন না ।

মাধ্যমিক বাংলা বহুরূপী গল্প

বিশ্লেষণধর্মী বড় প্রশ্ন উত্তর

(প্রশ্নমান ৫)  

 

১. “হরিদার জীবনে সত্যিই একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য আছে।” – হরিদা কে? তাঁর জীবনের নাটকীয় বৈচিত্র্যের সবিস্তার পরিচয় দাও।

উত্তর: প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ রচিত ‘বহুরূপী’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেন হরিদা । শহরের সবচেয়ে সরু গলির ভেতরের একটি ছোট্ট ঘরে বসবাসকারী এই মানুষটি ছিলেন অত্যন্ত গরিব ।

 

জীবনের নাটকীয় বৈচিত্র্য: হরিদার জীবনের নাটকীয় বৈচিত্র্য মূলত তাঁর ছকভাঙা জীবনযাপন এবং বহুরূপীর পেশাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে:

স্বাধীনতাপ্রিয় ও একঘেয়েমি-বিরোধী: হরিদা অত্যন্ত গরিব হলেও ঘড়ির কাঁটায় সময় বেঁধে কোনো অফিসে বা দোকানে নিয়ম করে চাকরি করা তাঁর একদমই পছন্দ ছিল না । অভাবের তাড়নায় তাঁর ভাতের হাঁড়িতে অনেক সময় ভাতের বদলে শুধু জল ফুটলেও, একঘেয়ে কাজ করতে তাঁর ভয়ানক আপত্তি ছিল ।

 

বহুরূপীর পেশা গ্রহণ: একঘেয়েমির বদলে তিনি পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন বহুরূপীর সাজ । মাঝে মাঝে উপোস করার পর হঠাৎ একদিন সকালে বা সন্ধ্যায় তিনি বিচিত্র ছদ্মবেশে পথে বের হতেন ।

নানা রূপের খেলা: তিনি কখনও উন্মাদ পাগল সেজে বাসের যাত্রীদের ভয় দেখাতেন, কখনও রুমঝুম ঘুঙুর বাজিয়ে রূপসি বাইজি সেজে পথে বেরোতেন । এছাড়া বাউল, কাপালিক, কাবুলিওয়ালা, সাহেব কিংবা পুলিশ সেজে তিনি চমৎকার অভিনয় করে মানুষদের চমকে দিতেন ।

অপ্রত্যাশিত চমক: তাঁর সাজ এতই নিখুঁত হতো যে চেনা মানুষেরাও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ত । তাঁর এই অভাবনীয় এবং নিত্যনতুন রূপ ধারণ করে বেঁচে থাকার অভিনব পদ্ধতিটিকেই তাঁর জীবনের ‘নাটকীয় বৈচিত্র্য’ বলা হয়েছে ।

২. ‘বহুরূপী’ গল্প অবলম্বনে প্রধান চরিত্র হরিদার চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পের প্রধান চরিত্র হরিদার চরিত্রে বেশ কিছু অসাধারণ দিক ফুটে উঠেছে:

 

স্বাধীনচেতা মানসিকতা: হরিদা দরিদ্র হলেও অপরের অধীনে ঘড়ির কাঁটা ধরে বাঁধা নিয়মের কাজ করতে রাজি ছিলেন না । অভাব সহ্য করতে তাঁর আপত্তি ছিল না, কিন্তু একঘেয়ে কাজে তাঁর ঘোর অনীহা ছিল ।

নিখুঁত ও নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী: বহুরূপী হিসেবে হরিদা ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান । পাগল, বাইজি, পুলিশ বা বিরাগী সন্ন্যাসী—যে রূপই তিনি ধারণ করতেন, তা একেবারে নিখুঁত হয়ে উঠত । তাঁর পুলিশ সাজ এতই বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে স্কুলের মাস্টারমশাইও ধোঁকা খেয়েছিলেন এবং ক্ষমা চেয়েছিলেন ।

 

শিল্পের প্রতি গভীর সততা: জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগী সেজে যাওয়ার পর জগদীশবাবু তাঁকে তীর্থভ্রমণের জন্য একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চেয়েছিলেন । কিন্তু একজন সন্ন্যাসীর চরিত্র ধারণ করে টাকা স্পর্শ করলে তাঁর “ঢং নষ্ট হয়ে যায়”, শুধুমাত্র এই যুক্তিতে তিনি সেই বিপুল অর্থ প্রত্যাখ্যান করেন । এটি তাঁর নিজের পেশা ও শিল্পের প্রতি গভীর সততার প্রমাণ।

 

পার্থিব লোভহীনতা: অভাব থাকা সত্ত্বেও বিরাগী সন্ন্যাসীর চরিত্রে অভিনয় করার সময় তিনি অবলীলায় টাকার থলি সিঁড়িতে ফেলে রেখে চলে আসেন, সেদিকে ফিরেও তাকাননি । তিনি জানতেন যে তাঁর অদৃষ্ট হয়তো এই ভুল ক্ষমা করবে না, তবু শিল্পের খাতিরে তিনি নির্লিপ্ত থাকতে পেরেছিলেন । খাঁটি মানুষ না হয়েও বহুরূপীর জীবনে এই সততা তাঁর চরিত্রের শ্রেষ্ঠ দিক ।

 

৩. “আমার বুকের ভিতর সব তীর্থ” – উক্তিটির বক্তা কে? কোন্ প্রসঙ্গে তিনি এ কথা বলেছেন? উক্তিটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও।

উত্তর: উদ্ধৃত অংশটির বক্তা হলেন সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র, বিরাগী সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে থাকা বহুরূপী হরিদা ।

প্রসঙ্গ: জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগী সন্ন্যাসীরূপে উপস্থিত হয়ে হরিদা তাঁর গভীর জীবনদর্শনে জগদীশবাবুকে মুগ্ধ করেন । বিরাগী যখন চলে যাওয়ার জন্য সিঁড়িতে এসে দাঁড়ান, তখন জগদীশবাবু তাঁকে তীর্থভ্রমণের খরচের জন্য একটি থলিতে একশো এক টাকা প্রণামী হিসেবে গ্রহণ করতে অনুরোধ করেন । জগদীশবাবুর এই টাকা দেওয়ার ব্যাকুল প্রার্থনার উত্তরেই বিরাগীবেশী হরিদা এই কথাটি বলেছিলেন ।

 

অন্তর্নিহিত তাৎপর্য:

গভীর আধ্যাত্মিক দর্শন: একজন প্রকৃত বিরাগী বা সন্ন্যাসীর কাছে বাহ্যিক তীর্থস্থানের কোনো আলাদা মূল্য নেই। ঈশ্বরের বাস মানুষের হৃদয়ে। তাই মন পবিত্র থাকলে নিজের বুকের ভেতরটাই সবচেয়ে বড়ো তীর্থস্থানে পরিণত হয়, এর জন্য আলাদা করে ভ্রমণ করার দরকার হয় না ।

চরিত্রের সঙ্গে চরম একাত্মতা: হরিদা পেশায় বহুরূপী হলেও বিরাগী চরিত্রে তিনি এতটাই গভীরভাবে মগ্ন হয়েছিলেন যে, প্রকৃত সন্ন্যাসীর মতোই তাঁর মনে হয়েছিল তীর্থভ্রমণের জন্য টাকার কোনো প্রয়োজন নেই ।

 

নির্লিপ্ততা ও শিল্পের জয়: এই উক্তির মাধ্যমে ছদ্মবেশী হরিদার প্রবল নির্লিপ্ততা প্রকাশ পেয়েছে। শিল্পের প্রতি তাঁর এমন দায়বদ্ধতা ছিল যে তিনি সোনা বা টাকাপয়সাকে পথের ধুলোর মতোই অনায়াসে মাড়িয়ে চলে যেতে পারতেন । এই উক্তিটি তাঁর নিখুঁত অভিনয় এবং পার্থিব লোভের ঊর্ধ্বে ওঠার মানসিকতাকে তুলে ধরে।

 

এই পোস্টে সুবোধ ঘোষ রচিত ‘বহুরূপী’ গল্পটি সবিস্তারে আলোচনা করা হল। গল্পটির থেকে কিছু গুরুত্ব প্রশ্ন উত্তর শেয়ার করা হল, যেগুলো তোমাদের পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে সাহায্য করবে । 

©kamaleshforeducation.in(2023)
error: Content is protected !!
Scroll to Top